Monday, March 16, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: হুসেইন ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স

দুদিন আগে সাইকস-পিকট চুক্তি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এই সিরিজটা নিয়ে এগোনোর আগে পটভূমিটা আরও একটু ব্যাখ্যা করা জরুরী।

ঐতিহাসিক টাইমলাইন দেখলে ঘটনাপ্রবাহের শুরু ১৯০৮ সালে পারস্যে মাটির নীচে তেলের খোঁজ পাওয়া থেকে। খুব স্পেসিফিকালি বলতে গেলে ১৯০৮ সালের ২৬শে মে, পারস্যের দক্ষিণ পশ্চিমে মসজিদ সুলেইমান নামের এক প্রত্যন্ত এলাকায় ব্রিটিশ ড্রিলিং টিম প্রথম তেল স্ট্রাইক করে - বাণিজ্যিকভাবে তাৎপর্য্যপূর্ণ প্রথম অয়েল স্ট্রাইক, যেটা পরবর্তীকালে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে প্রবলভাবে বদলে দেবে। এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই, ১৯০৯ সালে তৈরী হয় অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি (APOC) আর ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের তৎকালীন ফার্স্ট লর্ড অফ অ্যাডমিরালটি উইনস্টন চার্চিলের সুপারিশে ব্রিটিশ সরকার এই নতুন কোম্পানির ৫১% শেয়ার কিনে নেয়, রয়্যাল নেভির জন্যে শস্তায় তেলের ব্যবস্থা করার জন্যে। সেই সময়েই রয়্যাল নেভি নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলোকে কয়লার শক্তি থেকে তেলে নিয়ে যাওয়া শুরু করে।
তেলের এই আবিষ্কার নিমেষের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যকে বিশ্বের তেল-মানচিত্রে জায়গা করে দেয় আর গোটা এলাকার কৌশলগত গুরুত্বকে আমূল বদলে দেয়। যে এলাকা এতদিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের এক অখ্যাত অঞ্চল, সেটাই এরপর হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। আজও ঠিক তাই।

১৯১৪ সালের ২৮শে জুন, সারায়েভোতে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্দ আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সেইদিনই টার্কিশ অয়েল কোম্পানি মেসোপটেমিয়ায় (আজকের ইরাক) তেলের খোঁজ করার বরাত পায়। এই টার্কিশ অয়েল কোম্পানির মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার ছিল অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি, বকলমে ব্রিটিশ সরকার। এর ঠিক এক মাস পর, ২৮শে জুলাই, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কয়েকদিনের মধ্যেই জারের রাশিয়া সার্বিয়াকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। এবং জার্মানি যুদ্ধ ঘোষণা করে রাশিয়া এবং রাশিয়ার বন্ধুদেশ ফ্রান্সের বিপক্ষে। ইংল্যান্ডও জড়িয়ে পড়ে এই যুদ্ধে। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আগস্ট মাসে রাশিয়ার আক্রমণের ভয়ে এবং নিজেদের হারানো এলাকা ফিরে পাওয়ার আশায় জার্মানির সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ক্ষয়িষ্ণু অটোমান সাম্রাজ্যও। ১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে মিত্রশক্তি পৌঁছয় অটোমান সাম্রাজ্যয়ের গ্যালিপোলি উপকূলে। এর কিছুদিনের মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটে যায়, যেটা পরের দিকে গোটা অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহের ওপর ছাপ ফেলে যাবে। সাইকস-পিকট চুক্তির মতই, ইজিপ্টের ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমোহন আর মক্কার শরিফ, হুসেইন বিন আলি আল-হাশিমির মধ্যে চিঠিচাপাটির ঘটনা শুনতে অকিঞ্চিৎকর ঠেকলেও, বাস্তবে প্রচণ্ডই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯১৫ সালের জুলাই থেকে ১৯১৬ সালের মার্চের মধ্যে, হুসেইন বিন আলি এবং স্যার হেনরির মধ্যে খান দশেক চিঠি লেখালেখি চলে - আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে যেটা এখনও একটা অনগোয়িং ডিবেট। ‘ম্যাকমোহন-হুসেইন করেসপন্ডেন্স’ হিসেবে খ্যাত এই চিঠিগুলোয় অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহের বিনিময়ে আরবদের স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার, কারণ সেই সময়ে জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়া অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে ইংল্যান্ড মরিয়া হয়ে বন্ধু খুঁজতে ব্যস্ত। মজার ব্যাপার হল, পরোক্ষভাবে ভারত ঠিক এইখানেই এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের কোনোকিছুই যে আইসোলেটেড নয়, তার অন্যতম প্রমাণ এই ধরণের ঘটনা থেকেই পাবেন।

অটোমান খলিফা তখন মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন, এবং ব্রিটিশদের আশঙ্কা ছিল এই জিহাদ যদি ভারতে (ভারতে তখন প্রায় সাত কোটি মুসলমানের বাস) ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের সাধের ক্রাউন জুয়েল হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। খেয়াল রাখবেন, ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। কংগ্রেস ক্রমশঃ শক্তিশালী হচ্ছে, আরও নানা ধরণের বৈপ্লবিক কাজকর্মও চলছে ভারতে। কাজেই, অটোমান খলিফার জিহাদের আহ্বানকে কাউন্টার করার জন্যে জরুরী হয়ে ওঠে এই আরব বিদ্রোহের পরিকল্পনা, এবং ইসলামের পবিত্রতম তীর্থস্থানের রক্ষক হিসেবে শরিফ হুসেইনের ক্ষমতা ছিল অটোমান সুলতানের ধর্মীয় আবেদনের কাউন্টার করার। তাছাড়াও, তার কিছুদিন আগেই হুসেইনের বড় ছেলে ফয়সলের কাছে আরবের বিভিন্ন গোপন জাতীয়তাবাদী সংগঠনের কাছ থেকে আবেদন আসে অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের।
অন্ততঃ দশটা পারস্পরিক চিঠির মধ্যে ১৯১৫ সালের ২৪শে অক্টোবর তারিখে লেখা ম্যাকমোহনের চিঠিটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই চিঠিতেই ম্যাকমোহন লেখেন যে শরিফের দাবী মেনে একটা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আরবদের স্বাধীনতাকে ব্রিটিশ সরকার স্বীকৃতি দেবে ও সমর্থন জানাবে। ম্যাকমোহন কিছু এলাকাকে সুস্পষ্টভাবে এই সীমানার বাইরে রাখেন - যেমন মেরসিন ও আলেকজান্দ্রেত্তা অঞ্চল, আর দামাস্কাস, হোমস, হামা ও আলেপ্পো এলাকাসমূহের পশ্চিমে অবস্থিত সিরিয়ার অংশবিশেষ - কারণ এই এলাকাগুলোকে নির্দিষ্টভাবে আরব এলাকা বলা যায় না।

প্যালেস্টাইন নিয়ে ধোঁয়াশার শুরুও এইখান থেকেই। ব্রিটিশরা, তাদের স্বভাবমতনই, প্যালেস্টাইন সম্পর্কে অস্পষ্টতা রেখে দিয়েছিল চিঠিতে। আন্দাজ করা যেতে পারে এর কারণ জায়নিস্টদের প্রতি পক্ষপাতই হবে, কারণ ১৯০৫ সালে থেকেই জায়নিস্টদের একমাত্র ফোকাস ছিল প্যালেস্টাইনের ওপরে।

শরিফ হুসেইন এবং অধিকাংশ আরবের কাছেই প্যালেস্টাইন ছিল আরব এলাকা, কাজেই আরবদের স্বাধীন এলাকার মধ্যে তাঁরা প্যালেস্টাইনকেও ধরে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা অন্য কথা বলে - যেহেতু অটোমান আমলে সুলতান বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে জেরুজালেমে বসবাস করার অনুমতি দিয়েছিলেন, কাজেই প্যালেস্টাইনকে শুধুমাত্র আরব এলাকা হিসেবে দেখা যাবে না।

দুপক্ষের চিঠিগুলো আনঅফিশিয়ালি প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে, আর তারপর অফিশিয়ালি ১৯৩৯ সালে। এর মধ্যে ১৯১৯ সালে প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ জোরালোভাবে বলেছিলেন যে এই ম্যাকমোহন-হুসেইন করেসপন্ডেনস দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাধ্যবাধকতার মধ্যেই পড়া উচিত। কিন্তু সাইকস-পিকট চুক্তি আর বালফ্যুর ডিক্লারেশন যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন দেখা যায় যে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের গোপন বোঝাপড়া আর জায়নিস্টদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি, দুইই ম্যাকমোহনের প্রতিশ্রুতির একেবারে উলটো।

এই জটের শেষ কম্পোনেন্ট বালফ্যুর ডিক্লারেশন। কিন্তু তার আগে আরব বিদ্রোহের গল্পটাও লিখব। ভীষণই ইন্টারেস্টিং। বালফ্যুর ডিক্লারেশন আসবে তার পরের পর্বে। সঙ্গে থাকুন।

No comments:

Post a Comment