Tuesday, September 23, 2008

দেশে ফেরা ফর ডামি'জ

দেশে ফিরছেন? কলকাতায়? অনেককাল বিদেশে আছেন কি? এই ধরেন আট-দশ-বারো বছর? একা না দোকা? নাকি পোঁটলা-পুঁটলি, থুড়ি ছানা-পোনাও আছে? তাইলে পড়ুন ভাট প্রকাশনী থেকে সদ্য প্রকাশিত "দেশে ফেরা ফর ডামিজ' - অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি পান, জেনে নিন কি কি আপনার জন্যে অপেক্ষা করে আছে, কোথায় কখন কি করবেন এবং করবেন না৷ এই বই এক কথায় আপনাকে তৈরী করে দেবে দেশে পা রাখার জন্যে৷

তাইলে আর কি - চলুন বেড়িয়ে আসি, সরি, ঘরে ফিরি৷

এয়ারপোর্টে নামুন, লাইনে দাঁড়ান, পাসপোর্টে ছাপ্পা লাগান, কাস্টমস ক্লিয়ার করুন - এসব সিম্পল সিম্পল কাজকম্মোগুলো শেষ করে চলুন বেরোই৷ বাড়ির গাড়ি থাকলে তাতে, নয়তো "কলকাতা ক্যাব'-ও আছে৷ আর নেহাত পুরনোপন্থী হলে হলদে ট্যাক্সিও - ওই যে আকাশ থেকে হলদে মোজাইকটা দ্যাখেননি? শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে...না: আসলে মনে হয় কোটি কোটি৷

গাড়িতে উঠে রেডিও চালিয়ে দিন - 91.9FM - কলকাতার নতুন ক্রেজ - ফ্রেণ্ডস এফএম৷ অটটা থেকে দশটা, দশটা থেকে বারোটা - সিনেমার শোয়ের মতন খেপে খেপে প্রোগ্রাম - টক শো৷ গান শুনতে পাবেন, চাইলে ফোন করুন৷ আঙুলে বাত থাকলে ভালো ব্যায়াম হবে৷ ফোনে আড্ডা মারুন টক শো হোস্টের সঙ্গে৷ উত্তর দিন "উত্তমকুমার অভিনীত নায়ক সিনেমার নায়কের ভূমিকায় কে অভিনয় করেছিলেন' গোছের প্রশ্নের এবং জিতে নিন গিফট ভাউচার৷ তবে ফোন করার আগে নিজের বাংলা স্টাইলটা একটু ঝালিয়ে নিন৷

"হাই নীলানzনা, তুমি কেয়া say কড়ছিলে? ইসবার পূযোড় সময় হোয়াট আড় ইউ ডুইং?"
"আমি থিংক কড় ড়হি থি ekbar ক্যালিম্পং ভিzইট কড়ে আসি।"

ভাবছেন বানান ভুল? ব্যকরণ ভুল? এক্কেরে না৷ এগুলো সঅঅঅঅঅব ঠেকে শেখা - কলকাতার হালফিলের ভাষা-বিপ্লব৷ শপিং মলে আচ্ছন্ন ড্যাশিং কলকাতার ড্যাশিং ইয়ং বেঙ্গলের সাথে বাতচিত করতে হলে আপনাকে এই ভাষাবিপ্লবে ভাগ নিতে হবে৷

আপিস কোথায়? সেক্টর ফাইভে? আগে বাটার দোকানে গিয়ে একটা গামবুট কিনে আনুন, অভাবে রবারের জুতো৷ ল্যাপটপের ব্যাগের মধ্যে বা অন্য ব্যাগে সেগুলো ভরে আপিস চলুন - কারণ নবদিগন্ত বর্ষায় সত্যিই দিগন্তবিস্তৃত জলাশয়৷ সাড়ে ন'টায় আপিস? অবশ্যই কখন বেরোবেন সেটা নির্ভর করবে আপনার বাড়ি কোথায় তার ওপর৷ দক্ষিণ কলকাতার শহরতলি এলাকায় থাকলে এই সাড়ে সাতটা নাগাদ বেরিয়ে পড়াই ভালো কারণ ভূতল পরিবহণ নিগমের দ্রুতগামী বাসগুলো প্রতি দশ মিটারে একবার দাঁড়াবে যাত্রী তোলার জন্যে৷ যত পারবেন রোগা হয়ে যান, নইলে বাসে চড়া কঠিন হবে৷ কে বলে যানবাহনের অভাব? এত শাটল আছে কি করতে? রাস্তায় যদি দেখেন একটা গাড়ির (সাধারণত: অ্যাম্বাস্যাডর বা ইন্ডিকা) দিকে জনা পঞ্চাশেক লোক ছুটে যাচ্ছে, বুঝে নেবেন ওইটি শাটল৷ পারলে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে জায়গা করে নিন - অ্যাম্বাস্যাডরে ছয়জন, ইন্ডিকায় পাঁচ৷ ওই যে বল্লাম - একটু সরু হয়ে যান, ছোট হয়ে যান৷ এই হবে আপনার জীবনমন্ত্র - নইলে বাস, মেট্রো, অটো - কোথাওই চড়তে পারবেন না৷

নিজে গাড়ি কিনবেন? একবার Q-এর সাথে পারলে দেখা করুন - জেমস বণ্ডের মতন গেজেট লাগাতে হবে গাড়িতে, পাশের গাড়ি খুব কাছে এসে গেলেই যাতে আপনার গাড়ি থেকে ইস্পাতের ফলা বেরিয়ে আসে - নইলে আপনি আপনার গাড়িতে আছেন না পাশের গাড়িতে এই ধাঁধা উদ্ধার করতে করতে আপনার গাড়ির কোন একটা অংশ হাপিস হয়ে যাবে৷ রাস্তায় গাড়ি চালানোর আগে মন দিয়ে মাসখানেক অবস্ট্যাকল রেস অভ্যেস করুন, গাড়ি নিয়ে - ওই ফুটবল মাঠে ট্রেনিং হয় দেখেছেন - ফুটবলাররা প্র্যাকটিস কোনের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে ছোটে বল নিয়ে - সেরকম৷ আর কব্জির ব্যায়াম করুন - রজার ফেডারারের চেয়েও নমনীয় কব্জি চাই - নইলে ওই অবস্ট্যাকল রেসে কূল পাবেন না৷ ও হ্যাঁ, যদি সাবধানী ড্রাইভার হয়ে থাকেন কখনো, বা ভালোভাবে গাড়ি চালানো শিখে থাকেন, তাহলে চেষ্টা করুন সে সব ভুলে যেতে, নইলে গাড়ি স্টার্ট করে দাঁড়িয়েই থাকতে হবে৷ মুজতবা আলির দেশেবিদেশে পড়ে নেবেন - বিশেষ করে পেশোয়ারের রাস্তার বর্ণনা৷ শুধু মনে রাখবেন যতক্ষণ না মানুষের গায়ে ছোঁয়া লাগছে ততক্ষণ সবাই পাঠানদের মতন নির্লিপ্ত, ছোঁয়া লেগে গেলে আপনি সবসময়েই দোষী৷ ভালো দৌড়তে পারলে হয়তো বেঁচে গেলেও যেতে পারেন৷

পোঁটলা-পুঁটলি আছে বলেছিলেন না? স্কুলে ভর্তি করবেন নিশ্চয়৷ স্টেটাস বড় হলে আপনার জন্যে আছে হেরিটেজ বা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, তবে হেরিটেজ কি নামে হয়? সেই হেরিটেজ যদি আপনার চাহিদা হয়ে থাকে তাহলে আপনাকে ভিক্ষাপাত্র নিয়ে বেরোতে হবে - স্কুলে স্কুলে৷ ছানাপোনা পয়দা করে আপনি মহা অন্যায় করেছেন সেটা স্কুলের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আপিস থেকে হেডমাস্টার অবধি সবাই আপনাকে সফলভাবে বুঝিয়ে দেবেন৷ হ্যাঁ, ব্যতিক্রম আছে বৈকি - ছেলেমেয়ের ক্রিমিন্যাল বাপ-মা হিসেবে আপনার কর্তব্য সেই ব্যতিক্রম খুঁজে বের করা৷ কিন্তু তারপরেও কি পার পেয়ে যাবেন ভাবছেন? সে সিঙ্গুরে বালি - ছেলেমেয়ের স্ক্র্যাপবুকের জন্যে ছবি লাগবে - আঁকলে হবে না - দোকানে ঘুরে ঘুরে খুঁজুন কোথায় কামিনী/কাঞ্চন/দোপাটি ইত্যাদি ফুলের ছবি আছে, বর্ষার ফুলের চারখানি নমুনা লাগবে, তাও ছেলেমেয়ের ইস্কুলের খাতায় দিদিমণি যে ফুলগুলোর নাম বলেছেন সেগুলোই৷ হপ্তায় পঁয়তাল্লিশ ঘন্টা আপিসে কাজ করতে হবে - শ্রম আইনের মুখে জুতো মেরে - কম করেও রাত সাড়ে আটটা-নটায় ধুঁকতে ধুঁকতে বাড়ি ফিরে ছেলেমেয়েকে হোমওয়ার্ক করাতে বসান৷ ওদের এখন আর্লি টু বেড, আর্লি টু রাইজ নয় - লেট টু বেড, আর্লি টু রাইজ৷ নইলে আপনার পথে তারা হাঁটবে কি করে? অবশ্য আপনি যদি ওদের ওই পথেই একশো মিটার স্প্রিন্টের গতিতে দৌড় করাতে চান তাহলে হয়তো সিস্টেমটা আপনার পছন্দ হয়ে গেলেও যেতে পারে৷ কথিত আছে যে কিছু স্কুলে যেখানে হোমওয়ার্কের চাপ তুলনামূলকভাবে কম, সেখানে অভিভাবকরা সোরগোল তোলেন কেন তাঁদের ছয়-সাত বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের অমুকতমুক স্কুলের চেয়ে কম কাজ করানো হচ্ছে৷ ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যতের গোটা প্ল্যানিংটা এক্ষুণি করে ফেলবেন কিনা সেটা অবশ্যই আপনার হাতে৷

সপ্তাহের শেষে বেড়াতে যাবেন? বা খেতে যাবেন? এই দুটো ব্যাপারে কলকাতা অভাবনীয় উন্নতি করেছে৷ সাউথ সিটি মল, প্যান্টালুনস, ওয়েস্ট সাইড, সিটি সেন্টার, ফ্যাবইন্ডিয়া - মলের কমতি আছে নাকি? ইরেসপেক্টিভ অব পকেটের ওজন, বেড়ানোর পক্ষে আইডিয়াল৷ ঠাণ্ডা হাওয়া পাবেন, চলমান সিঁড়ি পাবেন, মনের বয়স থাকলে পরস্পরের চোখ এড়িয়ে সুন্দর দৃশ্য পাবেন৷ পকেট ভারি হলে হালকা করুন, হালকা হলে গন্ধ শুঁকে অর্ধভোজন করুন - মানে উইন্ডো শপিং করুন৷ আর ভোজন - খাদ্যরসিক হলে কলকাতা এই মুহুর্তে আপনাকে দুই হাত তুলে স্বাগত জানাবে৷ ডেকার্স লেন এখনও আছে, ব্যাঙ্কশাল কোর্টের আশেপাশে বা শিপিং অথরিটির আশেপাশে সেই রাস্তার ধারের খাবারের দোকান থেকে শুরু করে সেক্টর ফাইভের "ঝুপস"; মাঝারি পকেটের জন্যে ভজহরি মান্না বা ফিঙ্গারটিপস; ভারী পকেটের জন্যে অর্কজ ইত্যাদি৷ নির্ভর করবে আপনি কুলপি কি ভাবে খান - দাম দেখে না স্বাদ দেখে, কারণ যে কুলপি ছেলেবেলায় আপনি আট টাকায় খেতেন, অর্কজে সেই কুলপিই পাবেন একশোকুড়ি টাকায়৷ বিশদ জানতে চাইলে অপেক্ষা করুন অদূর ভবিষ্যতের বই "কলকাতার খাবারদাবার ফর ডামিজ'-এর জন্যে৷

নাটক সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন তো অনেক সিনেমা হল আছে, মাল্টিপ্লেক্স গোছের৷ গ্রুপ থিয়েটার এখনও হয়৷ তবে চব্বিশ ঘন্টা নিরবচ্ছিন্ন নাটক দেখতে হলে টিউন ইন করুন বাংলা চব্বিশ ঘন্টার খবরের চ্যানেলগুলোতে৷ তারকাখচিত কাস্টিং৷ একদিকে রাজনীতির জগতের তারকারা, সাথে সঙ্গত করেন সুশীল তারকাদের এক মহা ব্যাটেলিয়ন, এবং কে নেই তাতে৷ কেউ ধর্না দেন তো কেউ মহামিছিল করেন তো কেউ মৃত্যুঘন্টার সাথে ভায়োলিনের সঙ্গত করেন তো কেউ মোমবাতির চাষ করেন৷ চব্বিশ ঘন্টা ঘটতে থাকা নানান নাটক ফলো করতে চাইলে এই নিউজ চ্যানেলগুলোর টেলিকাস্ট আর রিটেলিকাস্ট ছাড়া আপনার জীবন অন্ধকার৷ আপিস থেকে ফিরে এই চ্যানেলগুলো আপনার সঙ্গী, নিরবচ্ছিন্ন এন্টারটেইনমেন্টের জন্যে৷ কখনো সখনো একটু বোর হয়ে গেলে চ্যানেল ঘুরিয়ে দেখে নিন চলতে থাকা অসংখ্য রিয়েলিটি শো-র কোনো একটা - কচি ছেলেমেয়েরা সুপার ট্যালেন্ট হওয়ার লক্ষ্যে আপনার মন ভোলাবে "ধক্ ধক্ করনে লাগা" বা "তু চীজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত" দিয়ে, আর ফাউ হিসেবে সমস্ত হিট হতে চাওয়া বাবা-মা-অভিভাবকদের ইঁদুরদৌড়ও পেয়ে যাবেন, বিচারকদের "কনস্ট্রাকটিভ" সমালোচনা - যেগুলো কিনা প্রতিযোগীদের মানসিকভাবে ধাক্কা দেয় - সরি সরি - শক্ত করে - সেগুলোও পাবেন এন্টারটেইনমেন্ট হিসেবে...

এই ভাবেই চলবে - ততদিন যতদিন আপনি তাল রেখে চলতে পারবেন৷ তাল রাখতে না পারলে এই কলকাতা আর আপনার জন্যে নয়৷ কলকাতা আপনাকে কখনও চায়নি, আপনি কলকাতাকে চেয়ে থাকলেও৷ আপনি পিছিয়ে আছেন, কলকাতা অনেক এগিয়ে গিয়েছে ব্ল্যাক হোলের দিকে - এর সাথে দৌড়নোর বয়স আপনার চলে গেছে৷ আপনার দৌড়নোর ক্ষমতা কতদূর সেটা জানতে হলে বরং আগে কিছুদিন ট্রায়াল দিয়ে নেবেন ফাইনাল সাইনিং-এর আগে - মানে বাক্সো-ডেক্সো গুটিয়ে নিয়ে আসার আগে৷ মাঝের এই বছরগুলোতে আপনাকে বাদ দিয়ে আপনার বাড়ি কতটা অভ্যস্ত হয়ে গেছে সেটাও সেই ট্রায়ালের সময় আপনার কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠবে৷ আর সেটা আপনার পক্ষে বরং উপকারী - কারণ ওই একটা জায়গায় তাল কেটে গিয়ে থাকলে আপনি এই "দেশে ফেরা ফর ডামিজ" হাজারবার পড়েও নিজেকে তৈরী করতে পারবেন না৷

যদি তাল রাখতে পারেন তাহলে এই বইয়ের পরের এডিশন লেখার জন্যে প্রকাশক আপনার বাড়ি ধাওয়া করবে৷

(মূল লেখা এখানে)

3 comments:

Aparna Ray said...

কলকাতায় নাকি? তাহলে একদিন আড্ডা হয়ে যাক!

Aumit Ahmed said...

মনে হলো ঠিক যেনো আমাদের ঢাকার কথা বলা হচ্ছে। এক কপি তাই এই অধমের জন্যও রাখবেন।

The Hidden God said...

লেখাটা একটু অতিরঞ্জিত হলেও বেশ ভালো হয়েছে । তবে ভূতল পরিবহন নিগমের বাসগুলি মোটেও ১০ মিটার অন্তর দাঁড়ায় না । লোক ভর্তি থাকলে মোটে দাঁড়াতেই চায় না । সার্ভিস ভালোই । আর শাটলের কথাটা একেবারে সত্যি । গাদাগাদি করে প্রচুর লোক তোলে ।