ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, একটা বিষয় স্পষ্ট — একটা ক্রিটিকাল সময় আসতে চলেছে। বিজেপি যেভাবে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলা দখলে নেমেছিল তাতে এটা স্পষ্ট যে ফাইনাল লড়াইয়ের সময় আগতপ্রায়। এই লড়াইটা আমাদেরই লড়তে হবে, আর এখানে লড়তে গেলে, কার বিপক্ষে, কীসের বিপক্ষে লড়ছি সেটাও তো জানা দরকার। কাজেই, আবার একটু ইতিহাসের জ্ঞান...যদিও এগুলো কোনোটাই বিশেষ অজানা কথা নয়। একটু চোখকান খোলা রাখলে, একটু বইপত্র পড়লে এগুলো জানা এবং বোঝার কথা। তাও ডকুমেন্ট করে রাখছি, শুধুমাত্র স্কেলটা বোঝানোর জন্যে।
বিষয়: আরএসএস-এর স্কুল — যাকে ওরা শিক্ষার মন্দির বলে, সেগুলো কেন আসলে ঘৃণার মন্দির। Saffron Temples of Hate.
সরস্বতী শিশু মন্দিরের দিকে একবার তাকালে দেখতে পাবেন বাচ্চারা প্রার্থনা করছে, গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, বন্দে মাতরম গাইছে। কী মনে হয়? একদম নিষ্পাপ শাশ্বত ভারতীয় সংস্কৃতি, তাই না? আজ্ঞে না। বাস্তবে এই সরস্বতী শিশু মন্দির হিন্দুরাষ্ট্রের কারখানা; একটা প্রোজেক্ট যেটা বহু বছর ধরে নি:শব্দে চলে এসেছে। ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিন (দশমীর সিগনিফিকেন্সটা মাথায় রাখবেন — রামের হাতে রাবণের মৃত্যু) এক মারাঠি ব্রাহ্মণ, কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার, ওরফে ডক্টরজী, প্রতিষ্ঠা করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের। ঘোর কলোনিয়াল শাসনের সময় হলেও হেডগেওয়ারের লক্ষ্য ছিল ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় আর তাঁর চোখে সবচেয়ে বড় সামাজিক ব্যাধি — হিন্দু-মুসলমান ঐক্য। হেডগেওয়ারের উত্তরাধিকারী, মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর, আরেক মারাঠি ব্রাহ্মণ, একাধিকবার হিটলারের জার্মানির প্রশংসাও করেছিলেন — বিশেষ করে জার্মানি যেভাবে সেমিটিক (এক্ষেত্রে ইহুদী) সম্প্রদায়ের মানুষদের দেশ থেকে তাড়িয়েছিল, তার। গোলওয়ালকরের লেখায় (We or Our Nationhood Defined) এমনও ঘোষণা পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলছেন অহিন্দুরা ভারতে থাকতে চাইলে তাদের হিন্দুদের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে হবে, এবং তাদের নাগরিক অধিকার বলে কিছু থাকবে না। আরএসএস আজ অবধি হেডগেওয়ার এবং গোলওয়ালকরের কথাকে অস্বীকার করেনি। পঞ্চাশের দশক থেকে তৈরী হয়ে আসা সঙ্ঘের কয়েক হাজার স্কুলে এই মুহূর্তে পড়াশোনা করা চল্লিশ লক্ষের কাছাকাছি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এই ধারণাই বয়ে চলেছে। আজও।
আরএসএস স্কুল বলে না। বলে মন্দির। এখানে উদ্দেশ্য স্বাক্ষরতা বা শিক্ষা নয়। উদ্দেশ্য হিন্দু রাষ্ট্রের পুজো করতে শেখানো — এমন রাষ্ট্র যেখানে মুসলমান, ক্রিশ্চান আর দলিতরা হয় শত্রু, নয় ভৃত্য। স্কুলের মধ্যে বা পাশেই মন্দির একটা থাকবেই। স্কুলের ভিতরে দেওয়ালে ঝুলবে রাম, রাণা প্রতাপ, শিবাজীর ছবি — বিদেশী, বিশেষ করে মুসলমানদের খতম করা বীর যোদ্ধা হিসেবে। থাকবে হেডগেওয়ার আর গোলওয়ালকরের ছবিও। ভারতের ম্যাপের বদলে ঝুলবে অখন্ড ভারতের ম্যাপ, আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার অবধি বিস্তৃত ভূখন্ডের ছবি যেখানে বিরাজ করেন ভারতমাতা। স্কুলে আলাদা করে অযোধ্যার রামজন্মভূমি নিয়ে বক্তৃতা হবে; কোনো স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা গর্ব করে বলবেন কীভাবে সেই বক্তৃতা শুনে ক্লাস ফাইভের ছেলেমেয়েরা রাগে, প্রতিশোধের স্পৃহায় হাত মুঠো করে ফেলেছিল। আরেক প্রধানশিক্ষক বলবেন কীভাবে তাঁর স্কুলের ছাত্ররা ১৯৯০ সালে করসেবায় যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গী হয়েছিল। সরকারি আইনরক্ষকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের কথা স্মরণ করা হবে স্কুল অ্যাসেম্বলিতে।
ইতিহাস শেখানো হবে না। ইতিহাসকে ওয়েপনাইজ করা হবে। বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হবে "ভারতীয় সংস্কৃতি" বলে একটা আলাদা বিষয়। সেখানে বাচ্চারা শিখবে মুসলমান মানে আক্রমণকারী, ধর্ষক, যারা মন্দির ভাঙে, যারা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে এসেছে চিরকাল। হিন্দুরা চিরকেলে নির্যাতিত, কাজেই তার বদলা নিতে হিংসার আশ্রয় নেওয়া জায়েজ। আজকের সাধারণ মুসলমান নাগরিক আর মধ্যযুগের মুসলমান শাসক একই। মহাকাব্য, মাইথোলজি আর ইতিহাসের বাউন্ডারি আবছা করে দেওয়া হবে এমনভাবে যাতে নায়কের রোলে মানুষ আর দেবতার মধ্যে বিশেষ ফারাক না থাকে, আর খলনায়কের চরিত্রে অসুর, কলোনিয়াল শাসক আর মুসলমানকেও একই খোপে ফেলে দেওয়া যায়। নায়করা সকলকে অবশ্যই হিন্দু এবং অবশ্যই উচ্চবর্ণের হতে হবে। মেয়েদের দেখানো হবে "সতী" হিসেবে — যারা সম্ভ্রম বাঁচাতে আগুনে পুড়ে মরতেও পিছপা হয় না। ক্লাস ফোরের টেক্সটবইয়ে থাকবে ১৯৯০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙতে গিয়ে "শহীদ" হওয়া করসেবকদের ছবি। শেখানো হবে সমস্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আসল উৎস সুমহান ভারতের প্রাচীন হিন্দু স্ক্রিপচারেই। বাচ্চাদের ক্যুইজের প্রশ্ন করা হবে: "কোন অত্যাচারী শাসক গুরু গোবিন্দ সিংহের ছেলেদের জীবন্ত কবর দিয়েছিল"? তারা উত্তর মুখস্থ করবে: "ঔরঙ্গজেব"। প্রেক্ষাপটহীন জ্ঞানের মোড়কে বিক্রি হবে ঘৃণা।
শুধু শরীর তৈরী হবে। মানবিকতা নয়। যোগাসন বাধ্যতামূলক হবে বাচ্চাদের হিন্দুরাষ্ট্রের যোগ্য সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। লাঠি, তরোয়াল, বর্শার ব্যবহার শেখানো হবে — আধুনিক যুদ্ধে লড়বার জন্যে নয়, বরং নিরস্ত্র গরীব মুসলমান সহনাগরিকদের পিটিয়ে খুঁচিয়ে মারার জন্যে। বাচ্চাদের জন্মদিন পালন হবে পবিত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে, সংস্কৃত মন্ত্রের উচ্চারণে আর ক্যাসেটে ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী গান বাজিয়ে; কেক কেটে নয়, কারণ সেটা পশ্চিমী সংস্কৃতি, যতই জনপ্রিয় হোক না কেন। বাচ্চাটাকে মালা পরানো হবে, সাজানো হবে দেবতার সাজে। ব্যক্তিগত আনন্দের জায়গা নেবে সমষ্টিগত আচার। আরএসএসের নিজস্ব ম্যানুয়ালে লেখে — "Without a suitable technique no ideal can be realized. We have evolved a technique, an emblem, a mantra, a code of discipline" — সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার সর্বগ্রাসী মনোভাব; ময়ূরকে আফিম খাইয়ে পোষ মানানোর মতন, যেখানে দশ-বারো-চোদ্দ বছরের বাচ্চারাও এই হিন্দুরাষ্ট্রকে দেশ ভেবে দেশপ্রেমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে।
নজরদারি চলবে পরিবারের ভিতরেও। স্কুলের শিক্ষকরা নিয়মিত পৌঁছে যাবেন ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতেও; সম্পর্ক গড়ে তুলবেন বাবা-মা, পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে। আরএসএসের বর্ধিত শাখার অংশ হয়ে উঠবে স্কুল। পরিবার সঙ্ঘের আদর্শে আপত্তি করলে ছাত্র বা ছাত্রীকে বলা হবে অপেক্ষা করতে; আস্তে আস্তে ভিতর থেকে পরিবারকে বদলাতে; এই কাজে সাহায্য করবেন শিক্ষকেরা। পেরেন্ট-টিচার মিটিং বাচ্চার পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়ে হবে না; হবে সংস্কার নিয়ে — কীভাবে বাচ্চার মধ্যে হিন্দু সংস্কার গড়ে তুলতে হবে — বশ্যতা, আনুগত্য, শ্রদ্ধা আর "ওদের" প্রতি ঘৃণা। "ওরা" মানে মুসলমান বা ক্রিশ্চান বা দলিত নীচু জাতের মানুষ। সঙ্ঘের মহিলা শাখা — রাষ্ট্রসেবিকা সমিতি — মেয়েদের মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেয়, কিন্তু শেখায়: "হাম ঘর তোড়নেওয়ালে নেহি হ্যায়"। স্কুলের মেয়েরা বড় হলে, বিয়ের পর পারিবারিক অত্যাচারের মুখে পড়লে, আইনি সহায়তা থাকে না, পণপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকে না, বিচ্ছেদের সুযোগ থাকে না। থাকে শুধু একটা গেরুয়া খাঁচা।
বিপদটা শুধু সাম্প্রদায়িকই নয়, ভয়ানকভাবে গণতন্ত্রবিরোধীও। সরকারি স্কুলগুলোর পরেই, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্কুল চেইন চালায় বিদ্যা ভারতী, গোটা দেশে প্রায় পঞ্চাশ হাজার; লক্ষ্য ভারতের প্রতিটি ব্লকে অন্তত: একটা করে স্কুল তৈরী। সেখানে বাচ্চারা গণতন্ত্র শেখে না। "গুরুজী" গোলওয়ালকর তো কবেই গণতন্ত্রকে বিষ বলে দিয়েছেন। সঙ্ঘের আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা হল উচ্চবর্ণের শিক্ষকদের নিয়ে তৈরী গুরুসভা — যাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে ৩০টা ভোট, যারা ছাপিয়ে যাবে লোকসভার ক্ষমতাকেও। এখানে জাতিভেদের সমালোচনা হবে না, "জাতিবাদসে আজাদী" স্লোগানকে বলা হবে দেশবিরোধী। হিন্দুধর্মের এই জাতিভেদপ্রথার কট্টর সমালোচক হিসেবে আম্বেদকরের ভূমিকা ভুলিয়ে দেওয়া হবে। দলিতদের বলা হবে "অজ্ঞ শিশু" — যাদের অধিকার নয়, বরং এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়েই ভুলিয়ে দেওয়া যাবে। মেয়েরা বাচ্চাবয়স থেকেই শিখবে যে অধিকারের ধারণা আসলে একটা করাপ্ট পাশ্চাত্য ধারণা; তারা জানবে যে তাদের ভবিতব্য, তাদের লক্ষ্য, শুধুমাত্র একজন "আদর্শ মা" হয়ে ওঠা, যিনি কখনো অভিযোগ করেন না, অধিকারের দাবী করেন না, তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না; পরিবারের মঙ্গলই তাঁর একমাত্র আশা আকাঙ্খা কর্তব্য।
একে কি শিক্ষা বলব? নাকি ফ্যাসিবাদী ভবিষ্যতের মতাদর্শের দীক্ষা বলা উচিত? আরএসএসের স্কুলে পড়া বাচ্চাদের সরাসরি মিথ্যা শেখানো হচ্ছে না, বরং দেশপ্রেমের মোড়কে অর্ধসত্য শেখানো হচ্ছে — যা আরো ভয়ঙ্কর। তারা বড় হচ্ছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে গরীব নিরস্ত্র মুসলমান সহনাগরিককে পিটিয়ে মারা বা বাস্তুচ্যুত করা আসলে আত্মরক্ষা; শিখছে যে গণতন্ত্র আসলে দুর্বল এবং করাপ্ট পশ্চিমী ধারণা; শিখছে নারীর অধিকার আসলে সনাতনী পরিবারকে ধ্বংস করে; আর জানছে যে তাদের সাবর্ণ হওয়ার সমস্ত সুযোগ সুবিধা আসলেই ডিভাইন রাইট। ঈশ্বরপ্রদত্ত। আরএসএসের পরিকল্পনা ছিল যে এরাই একদিন বড় হবে। নাগরিক হিসেবে ভোট দেবে। আইনরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। আদালতে বিচার করবে। আইনসভায় আইন পাশ করবে।
আর, ঠিক এইটাই হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সঙ্ঘের স্কুলে এই শিক্ষা পেয়ে বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা আজকে কেউ পুলিশ, কেউ বিচারক, কেউ উকিল...তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রে এই শিক্ষার ছাপ তারা ক্রমাগত রেখে চলেছে। বিশ্বাস না হলে আপনার কাছাকাছি সরস্বতী শিশু মন্দির বা বিদ্যাভারতী স্কুলে গিয়ে ক্লাস ফাইভের সংস্কৃতি বইটা চেয়ে হাতে নিয়ে দেখে নিতে পারেন, বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করুন তারা ইতিহাস বলে কী শিখছে। আর তারপর একবার টিভি চালিয়ে দেখে নিন গণতন্ত্রের প্রথম তিনটে পিলারের মানুষজন কোন ভাষায় কথা বলছে আর চতুর্থ পিলার মিডিয়াই বা কোন সুরে গাইছে...
তারপর সিদ্ধান্ত নিন...
সূত্র:
▪️Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
▪️Khaki Shorts & Saffron Flags - a Critique of the Hindu Right, Tapan Basu et al, Orient Blackswan

