"হিন্দু খতরে মে হ্যায়" - এই কথাটা তো কয়েক লক্ষ বার শুনে ফেলেছেন। অথচ, ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী (দুঃখিত, ২০১১ সালই ধরতে হবে, কারণ মোদী সরকার তার পরের সেন্সাস করেই উঠতে পারেনি) ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা জনসংখ্যার ৭৯.৮%, মুসলমানের সংখ্যা ১৪.২%, ক্রিশ্চান ২.৩%, শিখ ১.৭%, বৌদ্ধ ০.৭%, জৈন ০.৪% আর অন্যান্য ০.৯% মতন। অর্থাৎ, এদের দাবী অনুযায়ী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও হিন্দু বিপদে। শুধু আজ নয়, আরএসএসের জন্মলগ্ন থেকেই।
তো, আপনার কখনও মনে হয়নি যে এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্যশালী জনগোষ্ঠী এমন নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের মত বায়নাক্কা করে কেন?
ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলটের লেখায় একটা স্টিগমাটাইজেশন/এমুলেশন ফ্রেমওয়ার্কের কথা পেয়েছিলাম এবং লিখেওছিলাম - আগে যারা 'অপর', তাদের আচার আচরণের তুমুল নিন্দা করে সেগুলোকে স্টিগমাটাইজ করতে হবে, সেই লোকগুলোকে শয়তানের অবতার বলে দাগিয়ে দিতে হবে, আর তারপর তাদের কাউন্টার করতে সেই একই পদ্ধতিগুলোকে আপন করে নিতে হবে। কিন্তু এই ব্যাপারটা আসে আগে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ এসট্যাবলিশ হওয়ার পরে। সেটার কারণ খুঁজতে গিয়ে তনিকা সরকারের লেখায় কিছু পয়েন্টার পেলাম।
(ডিঃ আমি তনিকা ম্যাডামের পাক্কা ফ্যান হয়ে গেছি, শুরুর দিকে কষ্ট করে বুঝতে হলেও, এরকম ক্ল্যারিটি খুব কম লোকের লেখায় পাই)
এই পার্সিকিউটেড মানসিকতাটা কোনও ম্যাজিক ট্রিক নয়। বরং, রাইট উইং হিন্দুত্বের নেতৃস্থানীয় লোকজনের জেনুইন সাইকোলজিক্যাল ও পলিটিকাল রিয়েলিটি...
প্রথম ধাপ — আরএসএস এবং বিজেপি-বজরঙ্গ দল-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতৃত্ব আর ফুট সোলজারদের আলাদা করে দেখতে হবে। এই ফুট সোলজার আর ভোটারদের পপুলেশনটা যথেষ্ট ডাইভার্স। এদের মধ্যে তথাকথিত নীচু জাতের লোকজন, দলিত, এবং গরীব মানুষও রয়েছে। এই গোষ্ঠীটা কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। এবার দেখুন সঙ্ঘ পরিবারের অ্যাক্টিভিস্টদের (প্রচারক বা নেতৃত্বকে) - মূলতঃ উঁচু জাতের লোক, মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত। এই ছোট অথচ শক্তিশালী গোষ্ঠীটাই সঙ্ঘের মতাদর্শের পরিচালক। কাজেই, বাস্তব হল, সঙ্ঘ পরিবারের মাথায় বসে থাকা লোকগুলো গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই একটা ছোট্ট অংশ, সংখ্যার বিচারে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি নয়। এরা যখন সেন্সাসের ডেটার দিকে তাকায়, তখন এদের চোখে ৮০ শতাংশ হিন্দু ধরা পড়ে না, বরং এরা ভাবে যে তাদের নির্দিষ্ট সম্প্রদায়টা খুবই ছোট, আর তাই, তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বড়ই নড়বড়ে...
এরপর দ্বিতীয় ধাপ। শক্তি আর দুর্বলতার চরম স্ববিরোধী পার্সেপশন - যেটা হিন্দুত্ববাদীদের থিওরির মূল পিলার। এরা একদিকে ভাবে - "আমরা রাষ্ট্রশক্তি, অর্থনীতি, এবং পাবলিক ডিসকোর্স নিয়ন্ত্রণ করি। সংখ্যায় আমরা নগণ্য"। আবার এরাই আরেকদিকে ভাবে - "আমরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করি, আমাদের অন্যরা (নীচু জাত, দলিত, মুসলমান) ঘিরে ফেলছে"। ইয়ার্কি নয়, ইল্যুশন নয়, এইটাই একটা সংখ্যায় নগণ্য আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা - এমন একটা গোষ্ঠী যাদের হাতে সমস্ত ধরণের মেটিরিয়াল পাওয়ার (সম্পদ, শিক্ষা, মিডিয়া) থাকলেও তারা একটা ডেমোগ্রাফিক অ্যাংজাইটিতে ভোগে - পাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ (গরীব, নীচু জাত, দলিত) তাদের গিলে খেয়ে ফেলে...
তৃতীয় ধাপে ঘটে সবকিছুকে মনোলিথিক স্ট্রাকচার দিয়ে বাকি সমস্ত ন্যারেটিভকে উধাও করে দেওয়ার খেলা - রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এইটাই আসল ধাপ। হিন্দুত্ববাদীরা মনে করে যে সমস্ত হিন্দুই একটা অখণ্ড গোষ্ঠী এবং তারাই এই গোষ্ঠীর প্রতিনিধি, কাজেই এই জায়গা থেকেই আসে রাম, হনুমান, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান, এক ভাষা-এক ধর্ম-এক খাদ্যাভ্যাস-এক পোশাক ইত্যাদির ইউনিফর্মিটির দাবিদাওয়া। খুব সুনির্দিষ্টভাবে সমস্ত বৈচিত্রকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া। কারা এই রাজনৈতিক ন্যারেটিভ থেকে উধাও হয়ে যায়? গরীব মানুষ, কারণ রুটিরুজির সমস্যার জায়গা নেয় সাংস্কৃতিক ইস্যুগুলো; নীচু জাত আর দলিত জনগোষ্ঠী, কারণ উঁচুজাতের সমস্ত অত্যাচারের কাহিনী মুছে ফেলা হয়; এলজিবিটি বা ক্যুইয়ার মানুষ, কারণ এই চিন্তাভাবনাটাই "বহিরাগত", পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করা; আদিবাসী আর বাস্তুচ্যুত মানুষ, কারণ তাদের ভূমির অধিকার চাপা পড়ে যায় জাতীয় উন্নতির ন্যারেটিভের নীচে। আর, এত রকমের মানুষকে মুছে দিয়ে তাদের জায়গা নেয় "নিপীড়িত হিন্দু" - দলিতদের ওপর উঁচুজাতের অত্যাচারের ন্যারেটিভ বদলে গিয়ে তৈরী হয় "মুসলমানদের চারটে বিয়ে আর দশটা বাচ্চা, ওরা হিন্দুদের ঘিরে ফেলছে; আর, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির হাতে হিন্দুরা আক্রান্ত"...
এই ন্যারেটিভ হিন্দুত্ববাদী দলের কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে চার নম্বর ধাপে। কর্মী বা অ্যাক্টিভিস্টরা বেশিরভাগই উচ্চবর্ণের। তাদের কাছে ওপরের এই ন্যারেটিভটা বলা যায় "লিভড এক্সপিরিয়েন্স" বা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। এরা ভাবে - "আমি শিক্ষিত ব্রাহ্মণ, কিন্তু ভারতের জনসংখ্যার মোটে ৪ শতাংশের মধ্যে পড়ি। নীচু জাত আর দলিতেরা যদি মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেলে, আমি আমার সর্বস্ব হারাব"। হিন্দুত্ববাদী দলের নেতৃত্ব তাকে বলে - "তুমি মোটেও প্রিভিলেজড শোষক নও, বরং তুমি একজন বীর হিন্দু যোদ্ধা, তোমার হাতেই হিন্দু সভ্যতার রক্ষার ভার রয়েছে"। শ্রেণী বা জাতিগত প্রিভিলেজ হয়ে ওঠে জাতীয় বা ধর্মীয় কর্তব্য।
একদম সহজ ভাষায় উদাহরণ দিয়ে বলি। মনে করুন কোনও এক শহরে, কয়েকটা অত্যন্ত ধনী উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী পরিবার থাকে। শহরটা মূলতঃ হিন্দু অধ্যুষিত, ধরা যাক ৮০ শতাংশ মানুষই হিন্দু। আর ওই উচ্চবর্ণের অভিজাত পরিবারগুলো সেই জনসংখ্যার মোটে ১৫ শতাংশ। শহরের সমস্ত ব্যবসাবাণিজ্য, খবরের কাগজ ইত্যাদির মালিকানা রয়েছে এই কয়েকটা পরিবারের হাতেই, তারাই চালায় শহরের মিউনিসিপাল কাউন্সিল। অর্থাৎ, তাদের হাতেই রয়েছে সমস্ত ক্ষমতা। কিন্তু, তারা এও জানে, যে শহরবাসীরা যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া না করে একজোট হয়ে যায়, আর বুঝে ফেলে যে ওরা সংখ্যায় এই ক্ষমতা ধরে রাখা লোকগুলোর চেয়ে প্রায় নয় গুণ বেশি, তাহলে অচিরেই তাদের হাত থেকে ক্ষমতা সরে যাবে, তাদের নিজেদের অস্তিত্বই টিঁকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। সুতরাং, তাদের অবভিয়াস রাজনৈতিক চাল হল "বহিরাগত তত্ত্ব" আমদানি করা - যেমন, পাশের গ্রামের লোকগুলো আমাদের জল চুরি করে নিতে চাইছে, বা বাইরের শহর থেকে লোকজন এসে আমাদের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে...শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের নজর এইদিকে আটকে রেখে তাদের ভুলিয়ে দেওয়া যে শহরের আসল ক্ষমতা রয়েছে মুষ্টিমেয় কয়েকটা লোকের হাতেই। আর মজার ব্যাপার হল, এই মুষ্টিমেয় ক্ষমতাবান সত্যিই বিশ্বাস করে যে তারা দুর্বল ও বিপন্ন।
ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময় হার্মান গোয়েরিং একটা কথা বলেছিলেন - "Voice or no voice, the people can always be brought to the bidding of the leaders. That is easy. All you have to do is tell them they are being attacked, and denounce the pacifists for lack of patriotism and exposing the country to danger. It works the same in any country."
হিন্দুত্ববাদী চালচলন সবই নাৎসিদের সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় - শুধু বর্ণ (caste) বদলে যায় জাতিতে (race)। এক্ষেত্রেও কোনও অন্যথা হয়নি...
▪️এইদিকে সমস্ত ক্ষমতা আর ডিসকোর্স নিয়ন্ত্রণ করা অভিজাত উচ্চবর্ণ; ওইদিকে অসন্তুষ্ট পেটি-বুর্জোয়া এবং "ভোল্কিশ' বুদ্ধিজীবী।
▪️এইদিকে ভারতীয় সভ্যতার বিশালত্ব এবং হিন্দু খতরে মে হ্যায়; ওইদিকে জার্মানি হল "হেরেনভোক' (মাস্টার রেস), একই সঙ্গে জার্মানি "উমভোক্ট' (স্লাভিক বা ইহুদীদের দ্বারা দূষিত)।
▪️এইদিকে হিন্দু ঐক্য আর অখণ্ড ভারতের আড়ালে শ্রেণী ও বর্ণসংঘাত চাপা দেওয়া; ওইদিকে "ভোক্সগেমাইনশাফট' (জাতিগত সম্প্রদায়)-এর আড়ালে শ্রেণী সংঘাত (শ্রমিক বনাম পুঁজিপতি) চাপা দেওয়া।
▪️এইদিকে দুর্বলতার উৎস হল আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা (সেকুলারিজম, নাস্তিকতা, কমিউনিজম), আর তার সঙ্গে বাইরের আক্রমণ (ইসলাম); ওইদিকেও আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা (জুডিও-বলশেভিজম) আর বাইরের আক্রমণ (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স)।


No comments:
Post a Comment