Friday, May 01, 2026

Saffron Temples of Hate

ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, একটা বিষয় স্পষ্ট —  একটা ক্রিটিকাল সময় আসতে চলেছে। বিজেপি যেভাবে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলা দখলে নেমেছিল তাতে এটা স্পষ্ট যে ফাইনাল লড়াইয়ের সময় আগতপ্রায়। এই লড়াইটা আমাদেরই লড়তে হবে, আর এখানে লড়তে গেলে, কার বিপক্ষে, কীসের বিপক্ষে লড়ছি সেটাও তো জানা দরকার। কাজেই, আবার একটু ইতিহাসের জ্ঞান...যদিও এগুলো কোনোটাই বিশেষ অজানা কথা নয়। একটু চোখকান খোলা রাখলে, একটু বইপত্র পড়লে এগুলো জানা এবং বোঝার কথা। তাও ডকুমেন্ট করে রাখছি, শুধুমাত্র স্কেলটা বোঝানোর জন্যে।

বিষয়: আরএসএস-এর স্কুল — যাকে ওরা শিক্ষার মন্দির বলে, সেগুলো কেন আসলে ঘৃণার মন্দির। Saffron Temples of Hate.

সরস্বতী শিশু মন্দিরের দিকে একবার তাকালে দেখতে পাবেন বাচ্চারা প্রার্থনা করছে, গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, বন্দে মাতরম গাইছে। কী মনে হয়? একদম নিষ্পাপ শাশ্বত ভারতীয় সংস্কৃতি, তাই না? আজ্ঞে না। বাস্তবে এই সরস্বতী শিশু মন্দির হিন্দুরাষ্ট্রের কারখানা; একটা প্রোজেক্ট যেটা বহু বছর ধরে নি:শব্দে চলে এসেছে। ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিন (দশমীর সিগনিফিকেন্সটা মাথায় রাখবেন — রামের হাতে রাবণের মৃত্যু) এক মারাঠি ব্রাহ্মণ, কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার, ওরফে ডক্টরজী, প্রতিষ্ঠা করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের। ঘোর কলোনিয়াল শাসনের সময় হলেও হেডগেওয়ারের লক্ষ্য ছিল ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় আর তাঁর চোখে সবচেয়ে বড় সামাজিক ব্যাধি — হিন্দু-মুসলমান ঐক্য। হেডগেওয়ারের উত্তরাধিকারী, মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর, আরেক মারাঠি ব্রাহ্মণ, একাধিকবার হিটলারের জার্মানির প্রশংসাও করেছিলেন — বিশেষ করে জার্মানি যেভাবে সেমিটিক (এক্ষেত্রে ইহুদী) সম্প্রদায়ের মানুষদের দেশ থেকে তাড়িয়েছিল, তার। গোলওয়ালকরের লেখায় (We or Our Nationhood Defined) এমনও ঘোষণা পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলছেন অহিন্দুরা ভারতে থাকতে চাইলে তাদের হিন্দুদের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে হবে, এবং তাদের নাগরিক অধিকার বলে কিছু থাকবে না। আরএসএস আজ অবধি হেডগেওয়ার এবং গোলওয়ালকরের কথাকে অস্বীকার করেনি। পঞ্চাশের দশক থেকে তৈরী হয়ে আসা সঙ্ঘের কয়েক হাজার স্কুলে এই মুহূর্তে পড়াশোনা করা চল্লিশ লক্ষের কাছাকাছি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এই ধারণাই বয়ে চলেছে। আজও।

আরএসএস স্কুল বলে না। বলে মন্দির। এখানে উদ্দেশ্য স্বাক্ষরতা বা শিক্ষা নয়। উদ্দেশ্য হিন্দু রাষ্ট্রের পুজো করতে শেখানো — এমন রাষ্ট্র যেখানে মুসলমান, ক্রিশ্চান আর দলিতরা হয় শত্রু, নয় ভৃত্য। স্কুলের মধ্যে বা পাশেই মন্দির একটা থাকবেই। স্কুলের ভিতরে দেওয়ালে ঝুলবে রাম, রাণা প্রতাপ, শিবাজীর ছবি — বিদেশী, বিশেষ করে মুসলমানদের খতম করা বীর যোদ্ধা হিসেবে। থাকবে হেডগেওয়ার আর গোলওয়ালকরের ছবিও। ভারতের ম্যাপের বদলে ঝুলবে অখন্ড ভারতের ম্যাপ, আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার অবধি বিস্তৃত ভূখন্ডের ছবি যেখানে বিরাজ করেন ভারতমাতা। স্কুলে আলাদা করে অযোধ্যার রামজন্মভূমি নিয়ে বক্তৃতা হবে; কোনো স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা গর্ব করে বলবেন কীভাবে সেই বক্তৃতা শুনে ক্লাস ফাইভের ছেলেমেয়েরা রাগে, প্রতিশোধের স্পৃহায় হাত মুঠো করে ফেলেছিল। আরেক প্রধানশিক্ষক বলবেন কীভাবে তাঁর স্কুলের ছাত্ররা ১৯৯০ সালে করসেবায় যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গী হয়েছিল। সরকারি আইনরক্ষকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের কথা স্মরণ করা হবে স্কুল অ্যাসেম্বলিতে।

ইতিহাস শেখানো হবে না। ইতিহাসকে ওয়েপনাইজ করা হবে। বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হবে "ভারতীয় সংস্কৃতি" বলে একটা আলাদা বিষয়। সেখানে বাচ্চারা শিখবে মুসলমান মানে আক্রমণকারী, ধর্ষক, যারা মন্দির ভাঙে, যারা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে এসেছে চিরকাল। হিন্দুরা চিরকেলে নির্যাতিত, কাজেই তার বদলা নিতে হিংসার আশ্রয় নেওয়া জায়েজ। আজকের সাধারণ মুসলমান নাগরিক আর মধ্যযুগের মুসলমান শাসক একই। মহাকাব্য, মাইথোলজি আর ইতিহাসের বাউন্ডারি আবছা করে দেওয়া হবে এমনভাবে যাতে নায়কের রোলে মানুষ আর দেবতার মধ্যে বিশেষ ফারাক না থাকে, আর খলনায়কের চরিত্রে অসুর, কলোনিয়াল শাসক আর মুসলমানকেও একই খোপে ফেলে দেওয়া যায়। নায়করা সকলকে অবশ্যই হিন্দু এবং অবশ্যই উচ্চবর্ণের হতে হবে। মেয়েদের দেখানো হবে "সতী" হিসেবে — যারা সম্ভ্রম বাঁচাতে আগুনে পুড়ে মরতেও পিছপা হয় না। ক্লাস ফোরের টেক্সটবইয়ে থাকবে ১৯৯০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙতে গিয়ে "শহীদ" হওয়া করসেবকদের ছবি। শেখানো হবে সমস্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আসল উৎস সুমহান ভারতের প্রাচীন হিন্দু স্ক্রিপচারেই। বাচ্চাদের ক্যুইজের প্রশ্ন করা হবে: "কোন অত্যাচারী শাসক গুরু গোবিন্দ সিংহের ছেলেদের জীবন্ত কবর দিয়েছিল"? তারা উত্তর মুখস্থ করবে: "ঔরঙ্গজেব"। প্রেক্ষাপটহীন জ্ঞানের মোড়কে বিক্রি হবে ঘৃণা।

শুধু শরীর তৈরী হবে। মানবিকতা নয়। যোগাসন বাধ্যতামূলক হবে বাচ্চাদের হিন্দুরাষ্ট্রের যোগ্য সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। লাঠি, তরোয়াল, বর্শার ব্যবহার শেখানো হবে — আধুনিক যুদ্ধে লড়বার জন্যে নয়, বরং নিরস্ত্র গরীব মুসলমান সহনাগরিকদের পিটিয়ে খুঁচিয়ে মারার জন্যে। বাচ্চাদের জন্মদিন পালন হবে পবিত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে, সংস্কৃত মন্ত্রের উচ্চারণে আর ক্যাসেটে ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী গান বাজিয়ে; কেক কেটে নয়, কারণ সেটা পশ্চিমী সংস্কৃতি, যতই জনপ্রিয় হোক না কেন। বাচ্চাটাকে মালা পরানো হবে, সাজানো হবে দেবতার সাজে। ব্যক্তিগত আনন্দের জায়গা নেবে সমষ্টিগত আচার। আরএসএসের নিজস্ব ম্যানুয়ালে লেখে — "Without a suitable technique no ideal can be realized. We have evolved a technique, an emblem, a mantra, a code of discipline" — সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার সর্বগ্রাসী মনোভাব; ময়ূরকে আফিম খাইয়ে পোষ মানানোর মতন, যেখানে দশ-বারো-চোদ্দ বছরের বাচ্চারাও এই হিন্দুরাষ্ট্রকে দেশ ভেবে দেশপ্রেমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে।

নজরদারি চলবে পরিবারের ভিতরেও। স্কুলের শিক্ষকরা নিয়মিত পৌঁছে যাবেন ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতেও; সম্পর্ক গড়ে তুলবেন বাবা-মা, পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে। আরএসএসের বর্ধিত শাখার অংশ হয়ে উঠবে স্কুল। পরিবার সঙ্ঘের আদর্শে আপত্তি করলে ছাত্র বা ছাত্রীকে বলা হবে অপেক্ষা করতে; আস্তে আস্তে ভিতর থেকে পরিবারকে বদলাতে; এই কাজে সাহায্য করবেন শিক্ষকেরা। পেরেন্ট-টিচার মিটিং বাচ্চার পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়ে হবে না; হবে সংস্কার নিয়ে — কীভাবে বাচ্চার মধ্যে হিন্দু সংস্কার গড়ে তুলতে হবে — বশ্যতা, আনুগত্য, শ্রদ্ধা আর "ওদের" প্রতি ঘৃণা। "ওরা" মানে মুসলমান বা ক্রিশ্চান বা দলিত নীচু জাতের মানুষ। সঙ্ঘের মহিলা শাখা — রাষ্ট্রসেবিকা সমিতি — মেয়েদের মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেয়, কিন্তু শেখায়: "হাম ঘর তোড়নেওয়ালে নেহি হ্যায়"। স্কুলের মেয়েরা বড় হলে, বিয়ের পর পারিবারিক অত্যাচারের মুখে পড়লে, আইনি সহায়তা থাকে না, পণপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকে না, বিচ্ছেদের সুযোগ থাকে না। থাকে শুধু একটা গেরুয়া খাঁচা।

বিপদটা শুধু সাম্প্রদায়িকই নয়, ভয়ানকভাবে গণতন্ত্রবিরোধীও। সরকারি স্কুলগুলোর পরেই, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্কুল চেইন চালায় বিদ্যা ভারতী, গোটা দেশে প্রায় পঞ্চাশ হাজার; লক্ষ্য ভারতের প্রতিটি ব্লকে অন্তত: একটা করে স্কুল তৈরী। সেখানে বাচ্চারা গণতন্ত্র শেখে না। "গুরুজী" গোলওয়ালকর তো কবেই গণতন্ত্রকে বিষ বলে দিয়েছেন। সঙ্ঘের আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা হল উচ্চবর্ণের শিক্ষকদের নিয়ে তৈরী গুরুসভা — যাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে ৩০টা ভোট, যারা ছাপিয়ে যাবে লোকসভার ক্ষমতাকেও। এখানে জাতিভেদের সমালোচনা হবে না, "জাতিবাদসে আজাদী" স্লোগানকে বলা হবে দেশবিরোধী। হিন্দুধর্মের এই জাতিভেদপ্রথার কট্টর সমালোচক হিসেবে আম্বেদকরের ভূমিকা ভুলিয়ে দেওয়া হবে। দলিতদের বলা হবে "অজ্ঞ শিশু" — যাদের অধিকার নয়, বরং এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়েই ভুলিয়ে দেওয়া যাবে। মেয়েরা বাচ্চাবয়স থেকেই শিখবে যে অধিকারের ধারণা আসলে একটা করাপ্ট পাশ্চাত্য ধারণা; তারা জানবে যে তাদের ভবিতব্য, তাদের লক্ষ্য, শুধুমাত্র একজন "আদর্শ মা" হয়ে ওঠা, যিনি কখনো অভিযোগ করেন না, অধিকারের দাবী করেন না, তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না; পরিবারের মঙ্গলই তাঁর একমাত্র আশা আকাঙ্খা কর্তব্য।

একে কি শিক্ষা বলব? নাকি ফ্যাসিবাদী ভবিষ্যতের মতাদর্শের দীক্ষা বলা উচিত? আরএসএসের স্কুলে পড়া বাচ্চাদের সরাসরি মিথ্যা শেখানো হচ্ছে না, বরং দেশপ্রেমের মোড়কে অর্ধসত্য শেখানো হচ্ছে — যা আরো ভয়ঙ্কর। তারা বড় হচ্ছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে গরীব নিরস্ত্র মুসলমান সহনাগরিককে পিটিয়ে মারা বা বাস্তুচ্যুত করা আসলে আত্মরক্ষা; শিখছে যে গণতন্ত্র আসলে দুর্বল এবং করাপ্ট পশ্চিমী ধারণা; শিখছে নারীর অধিকার আসলে সনাতনী পরিবারকে ধ্বংস করে; আর জানছে যে তাদের সাবর্ণ হওয়ার সমস্ত সুযোগ সুবিধা আসলেই ডিভাইন রাইট। ঈশ্বরপ্রদত্ত। আরএসএসের পরিকল্পনা ছিল যে এরাই একদিন বড় হবে। নাগরিক হিসেবে ভোট দেবে। আইনরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। আদালতে বিচার করবে। আইনসভায় আইন পাশ করবে।

আর, ঠিক এইটাই হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সঙ্ঘের স্কুলে এই শিক্ষা পেয়ে বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা আজকে কেউ পুলিশ, কেউ বিচারক, কেউ উকিল...তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রে এই শিক্ষার ছাপ তারা ক্রমাগত রেখে চলেছে। বিশ্বাস না হলে আপনার কাছাকাছি সরস্বতী শিশু মন্দির বা বিদ্যাভারতী স্কুলে গিয়ে ক্লাস ফাইভের সংস্কৃতি বইটা চেয়ে হাতে নিয়ে দেখে নিতে পারেন, বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করুন তারা ইতিহাস বলে কী শিখছে। আর তারপর একবার টিভি চালিয়ে দেখে নিন গণতন্ত্রের প্রথম তিনটে পিলারের মানুষজন কোন ভাষায় কথা বলছে আর চতুর্থ পিলার মিডিয়াই বা কোন সুরে গাইছে...

তারপর সিদ্ধান্ত নিন...

This is the army standing against us. This is a battle we have to win. Whatever it takes...

সূত্র:
▪️Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
▪️Khaki Shorts & Saffron Flags - a Critique of the Hindu Right, Tapan Basu et al, Orient Blackswan

হিন্দু খতরে মে হ্যায় - পর্ব দুই

"হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ কীভাবে তৈরী হয় সেইটা নিয়ে গতকাল লিখেছিলাম। সঙ্ঘপরিবারের নেতৃত্ব ও কর্মী - যারা প্রায় সকলেই উচ্চবর্ণের - গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই ছোট একটা অংশ হওয়ার জন্যে তাদের নিজেদের ডেমোগ্রাফিক অ্যাংজাইটি এবং বাদবাকি নীচু জাত আর দলিতদের কাছে ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকে আসে এই রাজনৈতিক কৌশল, যেখানে অন্য কাউকে (যেমন ধরুন সেকুলার, কমিউনিস্ট, মুসলমান) ভিলেন খাড়া করে বাকি হিন্দু সম্প্রদায়ের টার্গেট বদলে দেওয়া হয়...

স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে যে এইটা তো উচ্চবর্ণের অ্যাক্টিভিস্টদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সঙ্ঘপরিবারের ফুট সোলজার যারা, বা ভোটার যারা - তাদের ডেমোগ্রাফিক কম্পোজিশন তো অনেক ডাইভার্স - সেখানে নীচু জাত আছে, ওবিসি আছে, দলিত আছে, আদিবাসী সম্প্রদায় আছে। তাদের ক্ষেত্রে এই "লিভড এক্সপিরিয়েন্স" তত্ত্ব খাটছে কী করে? বরং তারা তো সেই উচ্চবর্ণের হাতেই নানাভাবে এক্সপ্লয়েটেড। বা, অবহেলিত। সঙ্ঘপরিবারের বিভিন্ন নেতা পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য রাজ্যে গিয়ে ঘটা করে কোনও দলিত বা আদিবাসী পরিবারের দাওয়ায় বসে পাত পেড়ে খেয়ে ফটোসেশন করেন, তারপর ভুলে যান। সেই পরিবারকে তাদের প্রতিদিনের সমস্যাগুলো মেনে নিয়েই চলতে হয় একদিন অমিত শাহ বা মোহন ভাগবত  বা শমীক ভট্টাচার্য্যের "সেবা" করার মত গুরুদায়িত্ব পেয়েও...এসবের পরেও তারা সঙ্ঘের আদর্শকে সাপোর্ট করে কেন, বা বিজেপিকে ভোট দেয় কেন?

খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন। এবং এর উত্তরও আছে। আজকে সেইটা লিখব।

ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাস্তবে চারটে ফ্যাক্টরের ওপর কাজ করে, আর এগুলোর কোনটার জন্যেই আগে লেখা উচ্চবর্ণের উদ্বেগ বা শঙ্কাকে অনুভব করার দরকার পড়ে না।

(১) সঙ্ঘ খুব সফলভাবে সমস্ত ভার্টিকাল কনফ্লিক্ট - যেমন দলিতদের ওপর উঁচু জাতের অত্যাচার - মুছে দিয়ে একটা হরাইজন্টাল কনফ্লিক্টের গল্প ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। একজন দলিতের নিজের জীবনে হয়ত গ্রামের ঠাকুর তার ওপর অত্যাচার করে, তাকে বিনা মজুরিতে খাটায়, গ্রামের কুয়ো থেকে তার জল তোলা মানা। হিন্দু রাইট উইং তাকে বোঝায় - "তোমার ঘরে জলের অভাব কারণ মুসলমানের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, আর ওরা তোমার ভাগে থাবা বসাচ্ছে। তোমার অপমানের আসল কারণ হল হাজার বছর ধরে চলা ইসলামী আগ্রাসন - তোমার আত্মসম্মানবোধ ভেঙে চূর্ণ করে দিয়েছে মুসলমান শাসকেরা। তোমাকে আগে তোমার হিন্দুত্বের গর্ব ফিরিয়ে আনতে হবে"। দলিত লোকটার কাছে এটা একটা সাইকোলজিক্যাল প্রশ্ন। সে ভারতের জাতপাতের কাঠামোর একেবারে নীচের তলায় পড়ে আছে। অথচ একজন হিন্দু হিসেবে সে নিজেকে এক গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার অঙ্গ হিসেবে দেখতে পারে। এই সাময়িক আপলিফটমেন্ট খানিকটা মরফিনের মত তাকে বর্ণাশ্রমের দাসত্বের যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়।

(২) আজকের দিনে, ভোট ব্যাপারটা পুরোপুরিই ট্রাঞ্জ্যাকশনাল - পাওনাগণ্ডা বুঝে নেওয়া। অনেক ভোটারের কাছে এই গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতা বা জাতপাতের টেনশন ইত্যাদি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই, সময়ও নেই। কাজেই এখানে একটা অলিখিত চুক্তি কাজ করে - "আমি আপনাকে ভোট দেব - এই কারণে নয় যে আমি মনে করি মুসলমানেরা আমাদের দেশ দখল করে ফেলবে বা আমি হিন্দু ধর্মের বীর যোদ্ধা ইত্যাদি। আমি ভোট দেব যদি আপনি আমাকে একটা বেশি গ্যাসের কানেকশন করিয়ে দেন। আপনার মন্দিরের রাজনীতি আমি মেনে নেব যদি আপনি আমার জন্যে বিশুদ্ধ জল বা শৌচাগারের ব্যবস্থা করে দেন"। এই হিসেবটা সবচেয়ে সহজ কারণ এখানে আদর্শ, উদ্বেগ ইত্যাদি কঠিন কথাবার্তার কোনও জায়গাই নেই। শুনতে খারাপ লাগলেও এই বাস্তবটাকে এড়ানো কঠিন।

(৩) রাষ্ট্রের করা  Sanskritization - অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী (ওবিসি) এবং দলিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সবচেয়ে সংগঠিত অংশের জন্য হিন্দু রাইট উইং প্রচলিত বর্ণপ্রথার স্টিগমা এড়ানোর একটা রাস্তা দেখায়, আর সেটা হল ইকোনমিক ন্যাশনালিজম আর ইউনিফর্মিটি। অনেক ওবিসি বা দলিত ভাবে - "পুরনো কংগ্রেস/দলিত দলগুলো চায় আমি ভিক্টিম হয়ে থাকি, সংরক্ষণের মাধ্যমে যেটুকু পাওয়া যায় তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি"। হিন্দুত্ববাদীরা বোঝায় – "তুমি আসলে দেশপ্রেমিক হিন্দু। তুমিও বড় ব্যবসায়ী হতে পারো, মালিক হতে পারো, তোমাকে আমাদের সঙ্গে আসতে হবে"। ফলাফল - সামাজিকভাবে আপওয়ার্ডলি মোবাইল হওয়ার চক্করে উচ্চবর্ণের কাস্টম, ট্র্যাডিশনকে আপন করে নেওয়া - উগ্র ধার্মিকতা, নিরামিষাশী হয়ে যাওয়া, মুসলমানবিরোধী হয়ে যাওয়া...মাথায় একটা সিগন্যাল পৌঁছয় – "আমি আর শুধু একটা বর্ণ নই, আমিও সেই গৌরবোজ্বল হিন্দু সভ্যতার অঙ্গ, হিন্দু জাতি (নেশন)"।

(৪) এর বাইরে একটা বাস্তব সমস্যা থেকে যায়। কাস্ট-সংক্রান্ত বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পের অভাব। ভোটার তার রাজ্যের বিকল্পগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে সেগুলো প্রায়ই কোনও একটা প্রভাবশালী যাদব বা কুর্মি পরিবারের মৌরসিপাট্টা - অধিকাংশ সুযোগ সুবিধা সেই সম্প্রদায়ের মধ্যেই কুক্ষিগত হয়ে থাকে। সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনজাতি বা দলিতরা উপেক্ষিতই থেকে যায়। আর এইসব দেখে শেষ অবধি সে ভাবতে শুরু করে যে এই উঁচুজাতের দলটা তো অন্তত আমাকে হিন্দু মনে করছে...ওই ওবিসিদের দলটা তো আমার দিকে ফিরেই তাকায় না...

আজকের এই হিন্দুত্ববাদী ডিসকোর্স গোটা আলোচনার পরিসরকেই গিলে ফেলে গরীব প্রান্তিক মানুষের সামনে দুটো পথ খোলা রাখে—

হয় হিন্দু ঐক্যের আবহে নিজেদের অস্তিত্বহীন করে তোলো, আর নয়তো জাতি-ভিত্তিক রাজনীতির গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে খণ্ড খণ্ড ও ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ো। 

সাধারণ ভোটারের কাছে প্রথমটাই কম ঝুঁকির; উচ্চবর্ণের শর্তাধীনে হলেও সে কোনোভাবে ক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছনোর স্বপ্ন দেখতে পারে।

হিন্দু খতরে মে হ্যায় - পর্ব এক

"হিন্দু খতরে মে হ্যায়" - এই কথাটা তো কয়েক লক্ষ বার শুনে ফেলেছেন। অথচ, ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী (দুঃখিত, ২০১১ সালই ধরতে হবে, কারণ মোদী সরকার তার পরের সেন্সাস করেই উঠতে পারেনি) ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা জনসংখ্যার ৭৯.৮%, মুসলমানের সংখ্যা ১৪.২%, ক্রিশ্চান ২.৩%, শিখ ১.৭%, বৌদ্ধ ০.৭%, জৈন ০.৪% আর অন্যান্য ০.৯% মতন। অর্থাৎ, এদের দাবী অনুযায়ী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও হিন্দু বিপদে। শুধু আজ নয়, আরএসএসের জন্মলগ্ন থেকেই। 

তো, আপনার কখনও মনে হয়নি যে এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্যশালী জনগোষ্ঠী এমন নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের মত বায়নাক্কা করে কেন?

ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলটের লেখায় একটা স্টিগমাটাইজেশন/এমুলেশন ফ্রেমওয়ার্কের কথা পেয়েছিলাম এবং লিখেওছিলাম - আগে যারা 'অপর', তাদের আচার আচরণের তুমুল নিন্দা করে সেগুলোকে স্টিগমাটাইজ করতে হবে, সেই লোকগুলোকে শয়তানের অবতার বলে দাগিয়ে দিতে হবে, আর তারপর তাদের কাউন্টার করতে সেই একই পদ্ধতিগুলোকে আপন করে নিতে হবে। কিন্তু এই ব্যাপারটা আসে আগে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ এসট্যাবলিশ হওয়ার পরে। সেটার কারণ খুঁজতে গিয়ে তনিকা সরকারের লেখায় কিছু পয়েন্টার পেলাম। 

(ডিঃ আমি তনিকা ম্যাডামের পাক্কা ফ্যান হয়ে গেছি, শুরুর দিকে কষ্ট করে বুঝতে হলেও, এরকম ক্ল্যারিটি খুব কম লোকের লেখায় পাই) 

এই পার্সিকিউটেড মানসিকতাটা কোনও ম্যাজিক ট্রিক নয়। বরং, রাইট উইং হিন্দুত্বের নেতৃস্থানীয় লোকজনের জেনুইন সাইকোলজিক্যাল ও পলিটিকাল রিয়েলিটি...

প্রথম ধাপ — আরএসএস এবং বিজেপি-বজরঙ্গ দল-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতৃত্ব আর ফুট সোলজারদের আলাদা করে দেখতে হবে। এই ফুট সোলজার আর ভোটারদের পপুলেশনটা যথেষ্ট ডাইভার্স। এদের মধ্যে তথাকথিত নীচু জাতের লোকজন, দলিত, এবং গরীব মানুষও রয়েছে। এই গোষ্ঠীটা কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। এবার দেখুন সঙ্ঘ পরিবারের অ্যাক্টিভিস্টদের (প্রচারক বা নেতৃত্বকে) - মূলতঃ উঁচু জাতের লোক, মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত। এই ছোট অথচ শক্তিশালী গোষ্ঠীটাই সঙ্ঘের মতাদর্শের পরিচালক। কাজেই, বাস্তব হল, সঙ্ঘ পরিবারের মাথায় বসে থাকা লোকগুলো গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই একটা ছোট্ট অংশ, সংখ্যার বিচারে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি নয়। এরা যখন সেন্সাসের ডেটার দিকে তাকায়, তখন এদের চোখে ৮০ শতাংশ হিন্দু ধরা পড়ে না, বরং এরা ভাবে যে তাদের নির্দিষ্ট সম্প্রদায়টা খুবই ছোট, আর তাই, তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বড়ই নড়বড়ে...

এরপর দ্বিতীয় ধাপ। শক্তি আর দুর্বলতার চরম স্ববিরোধী পার্সেপশন - যেটা হিন্দুত্ববাদীদের থিওরির মূল পিলার। এরা একদিকে ভাবে - "আমরা রাষ্ট্রশক্তি, অর্থনীতি, এবং পাবলিক ডিসকোর্স নিয়ন্ত্রণ করি। সংখ্যায় আমরা নগণ্য"। আবার এরাই আরেকদিকে ভাবে - "আমরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করি, আমাদের অন্যরা (নীচু জাত, দলিত, মুসলমান) ঘিরে ফেলছে"। ইয়ার্কি নয়, ইল্যুশন নয়, এইটাই একটা সংখ্যায় নগণ্য আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা - এমন একটা গোষ্ঠী যাদের হাতে সমস্ত ধরণের মেটিরিয়াল পাওয়ার (সম্পদ, শিক্ষা, মিডিয়া) থাকলেও তারা একটা ডেমোগ্রাফিক অ্যাংজাইটিতে ভোগে - পাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ (গরীব, নীচু জাত, দলিত) তাদের গিলে খেয়ে ফেলে...

তৃতীয় ধাপে ঘটে সবকিছুকে মনোলিথিক স্ট্রাকচার দিয়ে বাকি সমস্ত ন্যারেটিভকে উধাও করে দেওয়ার খেলা - রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এইটাই আসল ধাপ। হিন্দুত্ববাদীরা মনে করে যে সমস্ত হিন্দুই একটা অখণ্ড গোষ্ঠী এবং তারাই এই গোষ্ঠীর প্রতিনিধি, কাজেই এই জায়গা থেকেই আসে রাম, হনুমান, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান, এক ভাষা-এক ধর্ম-এক খাদ্যাভ্যাস-এক পোশাক ইত্যাদির ইউনিফর্মিটির দাবিদাওয়া। খুব সুনির্দিষ্টভাবে সমস্ত বৈচিত্রকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া। কারা এই রাজনৈতিক ন্যারেটিভ থেকে উধাও হয়ে যায়? গরীব মানুষ, কারণ রুটিরুজির সমস্যার জায়গা নেয় সাংস্কৃতিক ইস্যুগুলো; নীচু জাত আর দলিত জনগোষ্ঠী, কারণ উঁচুজাতের সমস্ত অত্যাচারের কাহিনী মুছে ফেলা হয়; এলজিবিটি বা ক্যুইয়ার মানুষ, কারণ এই চিন্তাভাবনাটাই "বহিরাগত", পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করা; আদিবাসী আর বাস্তুচ্যুত মানুষ, কারণ তাদের ভূমির অধিকার চাপা পড়ে যায় জাতীয় উন্নতির ন্যারেটিভের নীচে। আর, এত রকমের মানুষকে মুছে দিয়ে তাদের জায়গা নেয় "নিপীড়িত হিন্দু" - দলিতদের ওপর উঁচুজাতের অত্যাচারের ন্যারেটিভ বদলে গিয়ে তৈরী হয় "মুসলমানদের চারটে বিয়ে আর দশটা বাচ্চা, ওরা হিন্দুদের ঘিরে ফেলছে; আর, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির হাতে হিন্দুরা আক্রান্ত"...

এই ন্যারেটিভ হিন্দুত্ববাদী দলের কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে চার নম্বর ধাপে। কর্মী বা অ্যাক্টিভিস্টরা বেশিরভাগই উচ্চবর্ণের। তাদের কাছে ওপরের এই ন্যারেটিভটা বলা যায় "লিভড এক্সপিরিয়েন্স" বা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। এরা ভাবে - "আমি শিক্ষিত ব্রাহ্মণ, কিন্তু ভারতের জনসংখ্যার মোটে ৪ শতাংশের মধ্যে পড়ি। নীচু জাত আর দলিতেরা যদি মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেলে, আমি আমার সর্বস্ব হারাব"। হিন্দুত্ববাদী দলের নেতৃত্ব তাকে বলে - "তুমি মোটেও প্রিভিলেজড শোষক নও, বরং তুমি একজন বীর হিন্দু যোদ্ধা, তোমার হাতেই হিন্দু সভ্যতার রক্ষার ভার রয়েছে"। শ্রেণী বা জাতিগত প্রিভিলেজ হয়ে ওঠে জাতীয় বা ধর্মীয় কর্তব্য।

একদম সহজ ভাষায় উদাহরণ দিয়ে বলি। মনে করুন কোনও এক শহরে, কয়েকটা অত্যন্ত ধনী উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী পরিবার থাকে। শহরটা মূলতঃ হিন্দু অধ্যুষিত, ধরা যাক ৮০ শতাংশ মানুষই হিন্দু। আর ওই উচ্চবর্ণের অভিজাত পরিবারগুলো সেই জনসংখ্যার মোটে ১৫ শতাংশ। শহরের সমস্ত ব্যবসাবাণিজ্য, খবরের কাগজ ইত্যাদির মালিকানা রয়েছে এই কয়েকটা পরিবারের হাতেই, তারাই চালায় শহরের মিউনিসিপাল কাউন্সিল। অর্থাৎ, তাদের হাতেই রয়েছে সমস্ত ক্ষমতা। কিন্তু, তারা এও জানে, যে শহরবাসীরা যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া না করে একজোট হয়ে যায়, আর বুঝে ফেলে যে ওরা সংখ্যায় এই ক্ষমতা ধরে রাখা লোকগুলোর চেয়ে প্রায় নয় গুণ বেশি, তাহলে অচিরেই তাদের হাত থেকে ক্ষমতা সরে যাবে, তাদের নিজেদের অস্তিত্বই টিঁকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। সুতরাং, তাদের অবভিয়াস রাজনৈতিক চাল হল "বহিরাগত তত্ত্ব" আমদানি করা - যেমন, পাশের গ্রামের লোকগুলো আমাদের জল চুরি করে নিতে  চাইছে, বা বাইরের শহর থেকে লোকজন এসে আমাদের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে...শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের নজর এইদিকে আটকে রেখে তাদের ভুলিয়ে দেওয়া যে শহরের আসল ক্ষমতা রয়েছে মুষ্টিমেয় কয়েকটা লোকের হাতেই। আর মজার ব্যাপার হল, এই মুষ্টিমেয় ক্ষমতাবান সত্যিই বিশ্বাস করে যে তারা দুর্বল ও বিপন্ন।

ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময় হার্মান গোয়েরিং একটা কথা বলেছিলেন - "Voice or no voice, the people can always be brought to the bidding of the leaders. That is easy. All you have to do is tell them they are being attacked, and denounce the pacifists for lack of patriotism and exposing the country to danger. It works the same in any country."

হিন্দুত্ববাদী চালচলন সবই নাৎসিদের সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় - শুধু বর্ণ (caste) বদলে যায় জাতিতে (race)। এক্ষেত্রেও কোনও অন্যথা হয়নি...

▪️এইদিকে সমস্ত ক্ষমতা আর ডিসকোর্স নিয়ন্ত্রণ করা অভিজাত উচ্চবর্ণ; ওইদিকে অসন্তুষ্ট পেটি-বুর্জোয়া এবং "ভোল্কিশ' বুদ্ধিজীবী।

▪️এইদিকে ভারতীয় সভ্যতার বিশালত্ব এবং হিন্দু খতরে মে হ্যায়; ওইদিকে জার্মানি হল "হেরেনভোক' (মাস্টার রেস), একই সঙ্গে জার্মানি "উমভোক্ট' (স্লাভিক বা ইহুদীদের দ্বারা দূষিত)।

▪️এইদিকে হিন্দু ঐক্য আর অখণ্ড ভারতের আড়ালে শ্রেণী ও বর্ণসংঘাত চাপা দেওয়া; ওইদিকে "ভোক্‌সগেমাইনশাফট' (জাতিগত সম্প্রদায়)-এর আড়ালে শ্রেণী সংঘাত (শ্রমিক বনাম পুঁজিপতি) চাপা দেওয়া।

▪️এইদিকে দুর্বলতার উৎস হল আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা (সেকুলারিজম, নাস্তিকতা, কমিউনিজম), আর তার সঙ্গে বাইরের আক্রমণ (ইসলাম); ওইদিকেও আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা (জুডিও-বলশেভিজম) আর বাইরের আক্রমণ (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স)।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে হিন্দুত্ববাদীদের বক্তব্যগুলো শুনে নিন - দেখবেন খাপে খাপ মিলে যাবে। শুধু, এরা এতটাই অশিক্ষিত যে একইসঙ্গে বলে ফেলে যে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ হয়ে যাবে, আর পশ্চিমবঙ্গের ভাষা হয়ে যাবে ঊর্দু...এদের বাবা, স্বয়ং অ্যাডলফবাবু অবধি, এসব বলদমার্কা কথা শুনলে মিলিটারি বুট ছুঁড়ে মারতেন।