Monday, June 11, 2012

ধুত্তেরি

শহর থেকে শহরে সিরিজের লেখাগুলো আরেক জায়গা থেকে কপি করেছিলাম - যা বুঝছি - ওগুলো ঠিকমত ইউনিকোডায়িত হয়নি। আবার সব ঠিক করতে হবে - দেখি কবে সময় পাই। আপাতত ওই লেখাগুলো এখানে পাবেন - http://www.banglalive.com/Blog/Other/5345

Friday, May 11, 2012

শহর থেকে শহরে - ১৫

ইট ফুটি, স্লিপ ফুটি, ড্রিঙ্ক অনলি নিউক্যাসল ব্রাউন
==========================

ঘিঞ্জি স্যাঁতস্যাঁতে ঠাণ্ডা এই শহরটার সাথে ছয় বছরের অ্যাটাচমেন্ট প্রায় শেষ হওয়ার মুখে। বাক্স গোছানো, ডেস্ক খালি করা, তড়িঘড়ি প্রোজেক্টের কাজ এগনোর মত বোরিং জীবনে এই শেষ কয়েক সপ্তাহের একমাত্র আকর্ষন - বলা ভালো টেনশন - সীজন শেষে এই সাদা-কালো শহরটার সাদা-কালো ফুটবল দলটা ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে কোন তলায় থাকবে। মাসটা মে মাস, ২০০৮।

ফুটবল তো সব শহরেই খেলে - লন্ডনে নয় নয় করে চার থেকে পাঁচটা দল প্রিমিয়ার লীগে খেলে - আর্সেনাল, চেলসী, ফুলহ্যাম, টটেনহ্যাম, ওয়েস্ট ব্রমউইচ অ্যালবিয়ন...। কিন্তু এই শহরটার স্কাইলাইনের সবচেয়ে প্রমিনেন্ট চিহ্ন - সেন্ট জেম্‌স পার্কে - একটা বল নিয়ে এগারোজন সাদা-কালো মানুষের নব্বই মিনিটের দৌড় টাইনসাইডের লোকজনের কাছে শুধু একটা ফুটবল ম্যাচ নয়। লন্ডন অঞ্চলে ফুটবল রিক্রিয়েশন হতে পারে - নর্থ-সাউথ ডিভাইড পেরিয়ে টাইনসাইড বা টীজসাইড বা উইয়ারসাইডে ফুটবল ওই লন্ডনের সাথে টক্কর দেওয়ার মাধ্যম। টাইনসাইডের ফুটবল ফিলোজফিটা এর মধ্যে আবার একটু অন্যরকম - দাঁতে দাঁত চেপে ম্যাচ বাঁচানোর চেয়ে বিপক্ষকে কাঁপিয়ে হেরে যাওয়াও অনেক বেশি প্রিয়। নব্বইয়ের দশকের সেই কীগানের জমানার এন্টারটেইনার্সদের পর ববি রবসনের কার্পেট ফুটবল অবধি এই ফিলোজফিই মেনে এসেছে টাইনসাইডের জর্ডিরা। ফুটবল মানে এন্টারটেইনমেন্ট - লন্ডনে লোকের মনোরঞ্জন ওয়েস্ট এণ্ডে থিয়েটার বা অপেরা - হপ্তাভর কাজের পর টাইনসাইডের এককালের খনিমজুরদের মনোরঞ্জনের জায়গা ফুটবল মাঠ আর পাব। নব্বই মিনিটের দৌড় আর লাগাতার বীয়ার।

কয়েকমাস আগের কথা। কার্পেট ফুটবলের যুগ শেষ হয়েছে বছর তিনেক আগে। তখনকার চেয়ারম্যান ফ্রেডি শেফার্ডের অবিমৃষ্যকারিতায় স্যার ববির দিন শেষ। গ্রেম সোনেসের নেগেটিভ ট্যাকটিক্স, তারপর গ্লেন রোডারের পাস অ্যাণ্ড মুভের অল্প কিছুদিন পর টাইনসাইডে বোল্টন-খ্যাত এক নার্সিসিস্ট ম্যানেজার - বিগ স্যাম। এফ-এ কাপের তৃতীয় রাউন্ডে দ্বিতীয় ডিভিশনের স্টোক সিটির সাথে কোনোরকমে ম্যাচ ড্র করার পর *উল্লসিত* ম্যানেজারের মুখের ওপর ক্লাব সমর্থকদের তুমুল অসন্তোষ - তার আগের বেশ কিছু খেলায় নার্সিসিস্ট বিগ স্যামের বিরক্তিকর লং বল ট্যাকটিক্স আর কোনোরকমে ম্যাচ বাঁচানোর খেলায় তিতিবিরক্ত গোটা টাইনসাইড। স্টোক সিটির সাথে প্রথম লেগের খেলার দিন দুই পর সেই ম্যানেজার ছাঁটাই, তারপর বেশ কিছুদিন ধরে খবরের কাগজে নানান উড়ো গুজব, অনেক বড় বড় লোকের নাম জড়িয়ে - কখনো *স্পেশ্যাল ওয়ান* মোরিনহো, কখনো বা অন্য একটা কেউ। সাউথহ্যাম্পটন গেলুম - সেখানে ট্যাক্সিচালক আমাকে খবর দিলো এর পরের ম্যানেজার নাকি *অ্যারি* রেডন্যাপ। দিন কয়েক এই সোপ অপেরা চলার পর সেদিন ছিলো ওই স্টোক সিটির সাথে দ্বিতীয় লেগের খেলা - সেন্ট জেম্‌স পার্কে। ম্যানেজারহীন নিউক্যাসল নিয়ে কেউ আর কিছু আশা করে না - কট্টর সমর্থকেরাও না। সব বদলে গেলো ক্লাবের তরফে আসা একটা টেক্সট মেসেজে - সন্ধ্যেবেলায় ক্লাবের সাইটে রেজিস্টার্ড সব সমর্থকে মোবাইলে একটা দুই লাইনের মেসেজ এলো নতুন মালিকদের তরফে - "দ্য কিং ইজ ব্যাক, মোর টু ফলো"।

গোটা টাইনসাইড একটি মানুষকে রাজা বলে চেনে - এককালের খেলোয়াড়, পরে নব্বইয়ের শেষের দিকে এন্টারটেইনার্সদের কম্যাণ্ডার - ম্যানেজার - কেভিন কীগান। ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফেরার পথে দেখলুম শহরটার অন্য চেহারা - রাম অযোধ্যায় ফেরার সময় অযোধ্যাবাসীরা মনে হয় এমনই আনন্দ করেছিলো...সেন্ট জেম্‌স পার্কের সামনে হাজার দশেক লোকের ভিড় জমতে আধ ঘন্টাও লাগেনি। মাঠের মধ্যে চেগে ওঠা নিউক্যাসল যখন প্রথম গোলটা দিচ্ছে তখনও সমর্থকদের দল ডিরেক্টর বক্সের দিকে তাকিয়ে - রাজা কখন আসবেন। পরের দিন নিউক্যাসল ক্রনিকল লিখলো - "দ্য রিটার্ন অব দ্য কিং - কেভ কাম্‌স ব্যাক টু সেট্‌ল আনফিশড বিজনেস"। আট-দশ বছর বয়সী ছেলেমেয়ের দল - কীগানের আগের আমলে এরা কেউ জন্মায়নি - শুধু গল্প শুনেছে বাপমায়ের কাছে - রিজার্ভ দলের খেলায় *কিং কেভকে* গ্যালারীতে দেখে তাদের উচ্ছ্বাস দেখলে চমক লাগে। হুজুগ? পাগলামি? কিন্তু কেনই বা?

ছয় বছরের কিছু বেশি সময় এই সাদা-কালো শহরটাতে থাকতে থাকতে বুঝেছি এই আবেগ আসে অনেক ভিতর থেকে। বাইরে থেকে দেখলে হুজুগ বা পাগলামি মনে হলেও এর পিছনে আছে একটা স্বপ্ন, আরেকবার উঠে দাঁড়ানোর স্বপ্ন - পুরনো জৌলুষ আর সম্মান ফিরে পাবার ইচ্ছে। রোমান সম্রাট হেড্রিয়ানের সময় থেকে মঙ্কচেস্টার হয়ে শিল্পবিপ্লবের সময়কার নিউক্যাসলের জৌলুষকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন। কয়েক দশকের বঞ্চনার ইতিহাস - বন্ধ হয়ে যাওয়া কয়লাখনি, রুগ্ন জাহাজশিল্প - ধুলো ঢাকা সোয়ান হান্টারের ইতিহাসকে চাপা দিতে *জর্ডি-প্রাইড* ঘুরে চলেছে সেন্ট জেম্‌স পার্কে ছুটে বেড়ানো সাদা-কালো জার্সি পরা এগারোটা ছেলেকে ঘিরে।

স্যার জন হলের কথা লিখেছি আগে, মনে পড়ে? মেট্রো-সেন্টারখ্যাত প্রোমোটার স্যার জন হল এই *জর্ডি-প্রাইডকে* খুঁচিয়ে তুলেছিলেন। "The Geordie nation, that's what we're fighting for. London's the enemy! You exploit us, you use us"...শুরুও করেছিলেন চমক দিয়ে - খেলোয়াড় হিসেবে একসময় সমর্থকদের প্রিয়পাত্র কেভিন কীগানকে ম্যানেজার হিসেবে এনে। দ্বিতীয় ডিভিশনের তলার দিকে ধুঁকতে থাকা নিউক্যাসল ইউনাইটেডকে কীগান তুলে আনেন প্রথম ডিভিশনে, আর তার পরের কয়েক বছর জর্ডি স্মৃতিতে সোনায় বাঁধানো। আপাদমস্তক জর্ডি এবং নিউক্যাসল ইউনাইটেড ফ্যানজিন ট্রু-ফেইথের এডিটর মাইকেল মার্টিনের তাঁর ছেলেবেলায় কীগানের এন্টারটেইনার্সদের খেলা দেখে ফুটে ওঠা জর্ডি রক্তের কথা মনে পড়ে - সেই সময়ের আরো অসংখ্য জর্ডি সমর্থকদের মতন - "John Hall tapped into something latent, the pride and the apartness of the north-east. Newcastle was depressed; industries like mining and shipbuilding had been destroyed. We bought into the idea of the club as the flagship of revival."

জর্ডি নেশনের সেন্টিমেন্ট ছড়িয়ে দিয়ে হল পরিবার ভালো রোজগার করে নিলেন - সীজন টিকিট, দোকানে হটকেকের মতন বিক্রি হওয়া রেপ্লিকা শার্ট - সারভাইভালের স্বপ্নে বুঁদ গোটা টাইনসাইড সাদা-কালো ইউনিফর্মে ছেয়ে গেলো। উচ্চবিত্ত পশ লন্ডন ব্যাঙ্গ করে নাম দিলো *বারকোড*। তবুও চার বছরের বাচ্চা থেকে আশি বছরের বৃদ্ধা অবধি মাঠে আসে এই ইউনিফর্মে - শেষ জেতা ট্রফি সেই কবে ১৯৫৯-এ অধুনা-লিপ্ত ফেয়ার্স কাপ হলেও। কীগান সেই স্বপ্নটাকে কিছুদিনের জন্যে হলেও অনেকটাই বাস্তবরূপ দিতে পেরেছিলেন - ১৯৯৫/৯৭/৯৭-এর প্রিমিয়ার লীগে সাদা-কালো জার্সির দৌড় পাঁড় কক্‌নি ওয়েস্ট হ্যাম সমর্থকেরাও ভোলেনি - আর জর্ডিরাও তাই কীগানকে রাজা বানিয়ে রেখেছে। হল পরিবার নিউক্যাসল ইউনাইটেডকে *ক্যাশ কাউ* হিসেবে দেখলেও জর্ডিদের কাছে ক্লাবটা *ফ্ল্যাগশিপ অব সারভাইভাল* হিসেবেই রয়ে গেছে। হল পরিবারের হাত থেকে ক্রমে পিএলসি, তারপর চাকা ঘুরে আরেক মালিক - দিন পাল্টেছে, কিন্তু সেই জর্ডি-প্রাইড বা প্যাশন কমেনি। বাপ-মায়ের হাত থেকে ব্যাটন এসেছে তাদের ছেলেমেয়েদের হাতে, সেখান থেকে তাদের ছেলেমেয়ের হাতে, যাবে তাদের ছেলেমেয়েদের কাছে - জেনারেশন থেকে জেনারেশন...

ফুটবল আর সামাজিক পরিচয় নিয়ে অনেক লেখালেখি আছে - গ্লাসগোর দুই দল, সেল্টিক আর রেঞ্জার্সের মধ্যে রেষারেষি শুধু দুটো ফুটবল দলের মধ্যে রেষারেষি নয় - ওর পরিধি অনেক বিস্তৃত - উত্তর আয়ারল্যান্ডের শিন ফেন আর ইউনিয়নিস্টদের লড়াই অবধি, ক্যাথলিক-প্রোটেস্টান্টদের বিভেদ অবধি - সেল্টিকের সবুজ-সাদা জার্সি আর সেল্টিক পার্ক ছেয়ে যাওয়া আয়ারল্যান্ডের সবুজ পতাকা প্রমাণ দেয় এই সামাজিক পরিচিতির। ফুটবল আর সমাজের গবেষণায় বলা হয় যে ফুটবল মাঠে একটা জিৎ আর তার সাথে যুক্ত মিডিয়া কভারেজ, সোশ্যাল ইভেন্ট, নিজের দলের জার্সি পরা - বা দলের এমব্লেম আর চিহ্ন জমিয়ে রাখা - এসব শুধু খেলা নয় - এর সাথে রয়েছে কয়েকশো বছরের ইতিহাস - সামাজিক ভেদাভেদ, দৈনন্দিন বাস্তব। ঠিক তাই হয় সেল্টিক আর রেঞ্জার্সের মধ্যে, বা এইখানে - এই টাইনসাইডে। ঠিক তাই হয়েছিলো ১৯১১ সালে অন্য এক দেশের অন্য এক শহরে - যখন অন্য আরেকটা দল গোরা ইস্ট ইয়র্ককে হারিয়ে প্রথম স্বদেশী দল হিসেবে শিল্ড জিতেছিলো - যাকে লোকে সেদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে এক জায়গায় বসিয়েছিলো। সেই একইভাবে নিউক্যাসল ইউনাইটেড জর্ডি রিভাইভালের ফ্ল্যাগশিপ হয়েছে। প্রায় একই ঘটনা উইয়ারসাইডে সান্ডারল্যান্ডের ক্ষেত্রে। টীজসাইডে মিড্‌লসবরোর ক্ষেত্রে। উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ডের তিনটে শহর একইভাবে আঁকড়ে আছে তাদের ফুটবল ক্লাবগুলোকে। একই নর্থ-সাউথ ডিভাইডের ফসল এরা।

১৬৫৩ সালে কেউ একটা গান লিখেছিলেন -

"England's a perfect World; has Indies too.
Correct your Maps; Newcastle is Peru."

গানটা তখনকার নর্দাম্বারল্যান্ড অঞ্চলের উন্নতি আর সম্পদের কথা বোঝাত - অ্যাজটেক আর মায়ার পেরুর সাথে তুলনা করে। সেই যখন কয়লাখনি আর জাহাজ শিল্পের দৌলতে নিউক্যাসল আর সান্ডারল্যান্ড আগেকার *অসভ্য* আর *পশ্চাৎপর* দিন থেকে বেরিয়ে নতুনভাবে এগোচ্ছে। "The growth of the coal industry since 1560 had had a profound impact; a rural world of corn-laden mules and cottage collieries had been transformed into England's first industrial landscape, dominated by coal-filled wagons, pit-heads, and the great wharfs of the Tyne and Wear. Newcastle and Sunderland had grown into major centres surrounded by prospering agricultural hinterlands aided by the recent enclosure of fields. Newcastle was England's third largest city, with a population of 12,000 in 1660, and had been described in 1633 by William Brereton - widely travelled in Britain and the Low Countries - as 'beyond all compare the fairest and richest town in England, inferior for wealth and building to no city save London and Bristol'. North-east England was anything but a backwater, and for some, Newcastle was a place of fine living, wining and dining: a true capital of culture." [Cattle to Claret: Scottish economic influence in North-East England, 1660-1750 - Mathew Greenhall]

আর এই ২০০৮-এ এই উত্তর-পূর্ব ইংল্যান্ড একটা এলিয়েন টেরিটরি - রুগ্ন শিল্পাঞ্চল, ধোঁয়াটে আকাশ - দক্ষিণ ইংল্যান্ডের স্বচ্ছল কক্‌নি সম্প্রদায়ের কাছে পশ্চাৎপর, দূষিত ব্যাকওয়াটার। গার্ডিয়ানে স্টুয়ার্ট জেফরিজ লেখেন - "There is something different, not just about Newcastle and its football club, but about the north-east. Newcastle's like Liverpool - only more so - and nothing in the rest of England quite prepares you for it."

দক্ষিণের নাক সিঁটকোনোতে অভ্যস্ত এখানকার লোকে নিজেদের অঞ্চল আর তার ইতিহাস নিয়ে অসম্ভব গর্বিত - এই অঞ্চলটা আলাদা, কারণ এখানকার লোকে মনে করে এটা আলাদা - "pride in immutability and apartness are Geordie sentiments" - জর্ডিরা এভাবেই ভাবতে ভালোবাসে। আর এই ভাবনা থেকে তৈরী হয় একটা সলিডারিটির প্ল্যাটফর্ম, অসম্ভব গভীর ফেলো-ফিলিং - যেটা শুধু ফুটবল ক্লাব নয়, এই অঞ্চলের যে কোনো কিছু ঘিরেই গড়ে ওঠে, উদাহরণ *নর্দার্ন রক্‌*। নর্দার্ন রক্‌ যখন মুখ থুবড়ে পড়লো, আঞ্চলিক খবরের কাগজ নিউক্যাসল ক্রনিকলে একটা অ্যাপীল বেরিয়েছিলো - ব্যাঙ্কটাকে বাঁচানোর জন্যে - "In the past 10 years 1,520 organisations have received £175m from the Northern Rock Foundation. NOW IT'S YOUR TURN TO HELP" - কোনো আর্থিক সংস্থা সম্পর্কে এই মনোভাব আর ক্তোহাও দেখা সম্ভব নয়, কেউ চিন্তাও করবে না। আর এই অ্যাপীলে লোকে সাড়াও দিয়েছিলো - লণ্ডনে যখন লোকে নর্দার্ন রকের কাউন্টারে লাইন দিয়েছে টাকা তুলে নেবার জন্যে, এই অদ্ভুত জায়গাটাতে লোকে যেচে এসে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলেছে।

পাগলের আরেক নাম জর্ডি।

************

পাগলের আরেক নাম বাঙালীও। আবেগপ্রবণ হুজুগে বাঙালী - এদের দেখতে দেখতে আমিও প্রায়-জর্ডি এক বাঙালী হয়ে উঠি। এই শেষ প্রেমটা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে বসে পাঁজরের ভিতরটায়। ওপরের লেখাটার কয়েক সপ্তাহ পরেই নিউক্যাসল ছেড়ে ফিরে আসি - সঙ্গে নিয়ে আসি আমার নিজের আর আমার ছেলের সাদা-কালো জার্সি, অনেক ছবি, লিট্‌ল ব্লু-তে লাগানো নিউক্যাসল ইউনাইটেডের একটা এমব্লেম - যেটা এখন আমাদের *ফ্যাট গ্রে*-তে লাগানো আছে। কলকাতার প্রেমে পড়েছিলাম, দিল্লীরও - কিন্তু কোনো শহরকে ছেড়ে আসার সময়ে গলার কাছে বাষ্প জমে উঠেছিলো এই একবারই। প্লেনটা যখন মাটি ছেড়ে উঠেছিলো তখন শেষবার শহরটাকে দেখে একটা কথাই বলেছিলাম - একদিন ঠিক আসবো তোমার সঙ্গে দেখা করতে। আসবোই।

তার পর নিউক্যাসল ইউনাইটেড প্রিমিয়ার লীগ থেকে নেমে গেছিলো এক বছরের জন্যে - ভিলা পার্কে শেষ খেলায় হেরে গিয়ে। কলকাতায় বসে থেকেও আমি টের পেয়েছিলাম সেদিন ভিলা সমর্থকদের হাতে অপমানিত হয়ে গোটা শহরটা কেঁদেছিলো। পরের বছর চ্যাম্পিয়ন হয়ে আবার প্রিমিয়ার লীগে উঠে আসার খুশী আমি এখানে বসে দেখেছিলাম। প্রিমিয়ার লীগে ফিরে আসার পর সেন্ট জেম্‌স পার্কে যখন ভিলাকে ছয় গোলে হারালো এই সাদা-কালো ছেলেগুলো সেদিন দু বছর আগের অপমানের বদলা আমিও নিয়েছিলাম ওদের সঙ্গে মিশে গিয়ে।

আমি জানি একদিন আবার দেখা হবেই এই শহরটার সঙ্গে। হয়তো ওয়েমব্লিতে, হয়তো সেন্ট জেম্‌স পার্কে - যেদিন নিউক্যাসলের হাতে আবার একটা ট্রফি উঠবে। শহরের ইতিকথা শুধু সেদিনই শেষ হবে।

শহর থেকে শহরে - ১৪

রোজবেরি টপিং, ফাটা প্যান্ট এবং মাউন্টেন রেসকিউ
===========================

২০০৬ সালের জুলাইয়ের এক রবিবার নিউক্যাসল জার্নালে হয়তো আরেকটু হলে হেডলাইন হত - "মাউন্টেন রেসকিউ সেভস কাপল ফ্রম রোজবেরি স্লোপ" বা "আ ডেয়ারিং রেসকিউ বাই দ্য মাউন্টেন রেসকিউ টীম"...

গল্পটা বলি শোন।

তখন প্রতি সপ্তাহেই কোথাও না কোথাও যাই - বয়স হচ্ছে, ওজন বাড়ছে - তাই হাঁটতে যাই, বেড়ানোও হয়, সাথে একটু গা-ঘামানো - এই করে যদি ওজনটা কমে। ব্রিটিশরা হাঁটতে খুব ভালোবাসে, তাই হাঁটার র‌্যুট নিয়ে প্রচুর ওয়েবসাইট আছে, ওয়াকিং র‌্যুটগুলো খুব ভালো করে মেইনটেইন করা হয়, রীতিমতন ভালো ডিরেকশন দেওয়া...তো সেই রকম এক সাইট থেকে রোজবেরি টপিং-এর খবর যোগাড় হয়েছিলো। মিড্‌লসবরোর কাছে নর্থ ইয়র্ক মুর-এর একদম শুরুর দিকে, মাইল চারেকের পথ, ক্যাটেগরি "strenuous" (যদৈ সেটা আগে খেয়াল করে দেখা হয়নি) - হেঁটে একটা পাহাড়ের মাথায় ওঠা এবং নামা। পথটা একটা বনের মধে দ্যিয়ে গেছে, আশেপাশের দৃশ্য অতীব সুন্দর - এরকমই দাবী ছিলো লিফলেটে। তাই গেলুম। পার্কিং লটে লিট্‌ল ব্লু-কে দাঁড় করি একটু খেয়ে হাঁটার শুরু।

কিছুদূর গিয়ে দেখলুম রাস্তা দু ভাগ হয়েছে, একটা পথ বাঁদিকে চলে গেছে - দিব্যি সুন্দর ফুটপাথ, আরেকটা সিধে ওপরদিকে উঠেছে, ভালো চড়াই (সেটা কতদূর ভালো তা ক্রমশঃ প্রকাশ্য)। সিধে রাস্তায় দেখলাম বেশ ওপরে জনা দুই লোক উঠছে, আমরাও ভাবলুম এটাতেই যাই। একবার সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলুম বটে - একটা পুঁচকে ছেলে আছে, ফুটপাথ ধরে গেলে ভালো হয় না...কিন্তু...তো যাই হোক, এই ভোটের ফল তো জানা - ভোট নয়, ভেটো - চড়াইটা ধরাই ঠিক হল।

চাড়িতে তিনটে ধাপ - প্রথম ধাপটা ছোট - ফুট পঞ্চাশেক হবে - খুব বেশি খাড়া নয়, কিন্তু ঝুড়ো মাটি। তার মধ্যে যে পাথর-টাথরগুলো আটকে আছে সেই ধরে প্রথম ধাপের মাথা অবধি তো পৌঁছনো গেলো। সেখানে আবার মোলাকাত সেই আগের ছেড়ে আসা ফুটপাথের সাথে - চড়াইয়ে উঠছি - কাজেই সেটাকেইগ নোর মোডে ফেলে দেওয়া হল। এবার দ্বিতীয় ধাপ। প্রথম কুড়ি তিরিশ ফুট অবধি ঠিকঠাক, কিন্তু হাত ব্যবহার না করে শুধু হেঁটে ওঠা অসম্ভব। আমি সুমনাকে বল্লুম - তুমি আর ঋক আগে ওঠ, আমি পিছনে আসছি - কেউ গড়ালে ধরতে পারবো। কিন্তু সে প্ল্যান খাটলো না, ঋকবাবু মায়ের স`ঙ্গে যাবেন না, এবং তাঁর প্রথম আপত্তি হল হাতে মাটি লাগবে। একটু চেষ্টা-চরিত্তির করতে করতেই তিনি একবার ধপাস্‌ হয়ে ভ্যাঁ জুড়লেন - অগত্যা আমার হাত ধরে তাঁর ওঠা শুরু হল। আমি এক হাতে ঋককে একটু করে তুলছি, তারপর নিজে উঠছি, পিঠে ব্যাগ, পিছনে সুমনা আসছে। এবার যত উঠি, তত দেখি স্লোপটা খাড়া হচ্ছে। সামনের প্রায় শ তিনেক ফুট বেশ খাড়া - আমাকেও হাত-পা ব্যবহার করে রীতিমতন স্ক্র্যাম্বল করে উঠতে হচ্ছে, আর ঋককে নিয়ে ওঠা ক্রমশঃ আরো মুশকিল হ্ছ্হে। কিন্তু ততক্ষণে প্রায় পঞ্চাশ-ষাট ফুট উঠে এসেছি, ওই পথে নামা আরোই কঠিন। আমি আগে পুরুলিয়ার পাহাড়ে চড়েছি দড়িদড়া নিয়ে - আমি পারলেও ঋককে নামাতে পারবো না, আর সুমনা বলেই দিলো ও নামবে না, মানে পারবে না। সুতরাং উঠে যাওয়াই একমাত্র উপায়।

প্রায় মাঝামাঝি যখন পৌঁছেছি, তখন আরেকটা কোনোক্রমে দাঁড়ানো বা বসার জায়গা, সেখানে ঋককে বসিয়ে ভালো করে ওপর-নীচ খতিয়ে দেখলুম। সামনে আরো অন্ততঃ দেড়শো ফুট, প্রায় ন্যাড়া, মাটিতে অল্প ঘাস, কিন্তু সে ঘাস ধরে ওঠার চেষ্টা করলে ঘাস উপড়ে আসবে। আগে অন্যান্য লোক গেছে, এবং ভেজা অবস্থায় গেছে নির্ঘাৎ - তাই কিছু খোঁদল রয়েছে - জুতোর খোঁদল। ওগুলো ধরে ওঠা ছাড়া কোনো গতিক নেই। আরেকবার বহ্বালুম নেমে যাবো কিনা - কিন্তু ততক্ষণে সেও অসম্ভব হয়ে গেছে। সুমনা যখন ওই ছোট ধাপের কাছাকাছি পৌঁছেছে তখন আমি ঋককে নিয়ে আবার উঠতে শুরু করলুম - এবার আর কোথাও দাঁড়ানোর উপায় নেই। নীচে নেমে সুমনাকে যে টেনে তুলবো তাও সম্ভব নয়। এক হাতে ঋককে একটু করে তুলছি, এবার ওকেও বাধ্য হয়ে হাত দিয়ে খামচে উঠতে হচ্ছে। একটা জুতোর গর্তে ঋক যখন পা রাখছে ওকে পিছন থেকে ধরে আমি নিজে এক ধাপ উঠছি। মাঝে মাঝেই ঋক আমার ঘাড়ে ওঠার জন্যে বায়না করছে - ঘাড়ে উঠবে কী - পিঠে বাঁধা গেলে হয়তো ওঠা সম্ভব। হঠাৎ ">pharhaa`t<" - আমার সাধের আউটডোর ট্রাউজারের পায়ের ভ্তিঅরের দিকে যে সেলাই থাকে সেখানে ফাটলো। প্রথমে ছোট। তারপর কে ধাপ উঠছি, আরেকটু ">pharhaa`t<" - ঋকের কান্না, ওই ফড়াৎ ফড়াৎ, আর সুমনার "এবার কোনদিকে" শুনতে শুনতে আর ঋককে কোনোমতে ঠেলতে ঠেলতে দ্বিতীয় ধাপের মাথায় তুলে ধপ্‌ করে বসে পড়লুম। ঋককে একটা পাথরের মাথায় বসিয়ে নীচের দিকে তাকিয়ে দেখে চমৎকৃত - ওখান থেকে পড়লে আর দেখতে হবে না, গড়গড়িয়ে সোজা নীচে, তাতে মরণ না হলেও হাসপাতালে গমন অবশ্যম্ভাবী। দ্বিতীয় চমক নিজেকে দেখে - বেল্টের ঠিক নীচ থেকে হাঁটুর তলা অবধি - প্যান্টটা পুরো পতাকা হয়ে ঝুলছে, পুলিশে চাইলে ইনডিসেন্ট এক্সপোজারের জন্যে হাজতে ভরতে পারে। একদম কেলেংকারী কেস নয় যদিও, তবুও...

এবার তৃতীয় সমস্যা হল সুমনাকে দেখতে পাচ্ছি না। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে, তার নীচের বেশ কিছুটা অতি খাড়া, তার নীচে খানকয়েক ঝোপঝাড়, কিন্তু সুমনা নেই। হাঁক পাড়লুম - ঝোপের আড়াল থেকে সাড়া এলো। সুমনা ওখানে আটকে আছে, আর এগোতে পারছে না। অনেক হাঁকডাকের পর মাথাটা বেরলো, তারপর বাকিটা - ওখানে চারটে খোঁদলে হাত-পা আটকে সুমনা প্রায় ত্রিশঙ্কু। বেশ কিছুটা মেহনত করে ফুট কয়েক উঠলো, কিন্তু এমন একটা জায়গায় চলে গেছে যেখান থেকে ধরে ওঠার মতন কিছু নেই। আমি যে গর্তগুলো বেয়ে উঠেছি সেগুলো থেকে বেশ কিছুটা ডানদিকে সরে গেছে। এবার আমি যত বলি গর্তগুলোর কাছে আসতে সে আর পারে না। বলে - আমি আর উঠতে পারবো না, নামতেও পারবো না, তুমি এমার্জেন্সী ডায়াল করো। মুশকিল হল আমি ঋককে বসিয়ে যেতেও পারছি না - কারণ আমি নামলেই তিনি ধারে এসে পর্যবেক্ষণ শুরু করবেন - তাহলে পড়ে যাবার প্রভূত সম্ভাবনা। দড়িও নেই যে দড়ি নামিয়ে দেবো...আর অন্য কেউ সেদিক দিয়ে আসছেও না যে সাহায্য করবে। গতিক না দেখে করলুম ৯৯৯ - তারা বললে "ফায়ার, অ্যামবুলেন্স না পুলিশ" - আমি বললুম "মাউন্টেন রেসকিউ" - তো সেখানে ট্রান্সফার করে দিলে। ওদের পুরো অবস্থাটা বললুম - যে আমার বউ রোজবেরি টপিং-এর স্লোপে ঝুলছে, উঠতেও পারছে না, নামাও সম্ভব নয়, বাঁচাও। সে কত প্রশ্ন - তোমার নাম কী, বউয়ের নাম কী, বয়স কত, তোমার সাথে আর কেউ আছে কিনা, বাচ্চা-টাচ্ছা - বললুম হ্যাঁ, একটা ছোট ছেলে আছে, কিন্তু সে সেফ...তখন বললে হ্যাঙ্গ অন, আমরা আসছি।

এর ঠিক পরেই দেখি একটা অল্পবয়সী ছেলে আর তার বাবা ওই পথেই উঠছে। ছেলেটা রীতিমতন মাউন্টেনিয়ারিং জানে, চটপট উঠছে, তার বাবাও তাই। ওরা পাশ দিয়ে আসার সময় সুমনাকে বললো যে ওরা যেখান দিয়ে যাচ্ছে, সেখান দিয়ে আসতে। ছেলেটার বাবা বেশ ভারিক্কী চেহারার - ওকে দেখে সুমনার মনে হয় ভরসা কিছুটা বাড়লো, হাঁচোড়-পাঁচড় করে মাথা অবধি চলে আসার পর আমি টেনে নিলুম। সাথে সাথেই মাউন্টেন রেসকিউয়ের ফোন - যে আমরা রওনা দিয়েছি, তোমরা ঠিক আছো কি? আমি ববলুম যে আরেকটা টীম আসছিলো, তারা সাহায্য করেছে, আমার বউ উঠে এসেছে...

এর পর আর গপ্পো নেই। আমার প্যান্ট তো ওইরকম পতাকা হয়ে রয়েছে, ব্যাগ থেকে ঋকের একটা স্পেয়ার জামা নিয়ে পায়ের ফাঁক দিয়ে বাঁধলুম, হাঁটুর কাছে নিজের রুমালটা বাঁধলুম, সুমনার কাছে সেফটিপিন ছিলো - সেই দিয়ে নিজের জামাটা প্যান্টের সঙ্গে আটকে দিলুম - যাতে কোনোরকমে রেখেঢেকে রাখা যায়। কিন্তু মুশকিল হল - এক পা করে হাঁটছি, আর ফুট্‌ করে আরেকটু ছিঁড়ছে...দেখলুম ওই করে আর পুরো পাহাড়ের মাথা অবধি যাওয়া যাবে না, তাহলে আর প্যান্টটাই থাকবে না...অগত্যা নেমে এলুম, এবার সেই সেই ফেলে আসা ফুটপাথ দিয়েই... ততক্ষণে সুমনার প্যানিক তৈরী হয়ে গেছে - রাস্তটা মাঝরি স্লোপের - কিন্তু তাতেও ভয়...ধরে ধরে নামলো।

সেদিন কয়েকটা জিনিস শিখেছিলুম।

(১) আউটডোর ট্রাউজার কক্ষণো সেল-এ কিনতে নেই।
(২) দড়ি আর হুক ছাড়া এমনভাবে যেতে নেই।
(৩) ফুটপাথ ছেড়ে শর্টকাট ধরতে নেই।


শহর থেকে শহরে - ১৩

আ জার্নি ফ্রম নর্দাম্বারল্যান্ড স্ট্রীট টু বারাক রোড
=========================

জানুয়ারী ২১, ২০০২ - সেই দিনটা যেদিন মেরিল্যান্ড থেকে এসেছিলাম নিউক্যাসলে ইন্টারভিউ দিতে - সেই দিনটা ছিলো সেই বছরের সবচেয়ে ঠান্ডা দিন, আর রেকর্ড-ভাঙা জোরে হাওয়া বইছিলো। এতই জোর সেই হাওয়ার যে চুরাশি কেজির লাশ নিয়ে আমি সোজা হয়ে হাঁটতে পারিনি! হাত থেকে ক্যামেরার ব্যাগ উড়ে চলে যাচ্ছিলো প্রায়। ছয় বছর পর, ইউনিভার্সিটির কফি রুমে বসে পল ওয়াটসন বলেছিলো যে - ও ভাবেনি আমি শেষ অবধি নিউক্যাসলে আসবো, ওই আবহাওয়া দেখে হয়তো পিট্‌টান দেবো। পল ওয়াটসন - আমাদের প্রিন্সিপাল ইনভেস্টিগেটর, ইউনিভার্সিটির স্কুল অব কম্পিউটিং সায়েন্সে প্রোফেসর, এবং আমার পিএইচডি গাইড। অচেনা শহরে নিজেকে খুঁজে নিতে যে কয়েকজনের নাম সবার আগে মনে পড়ে তার মধ্যে পল ওয়াটসন আর পীট লী (আরেকজন প্রোফেসর) দুজন। আরো ছিলো - পিটার লি, অনিল ওয়াইপ্যাট, অ্যাঙ্কে জ্যাকসন, ডেবি করবেট...সকলেই ইউনিভার্সিটির - কম্পিউটিং সায়েন্সের স্টাফ আর রিসার্চার। ছিলো প্যাম বনার - ইউনিভার্সিটি অ্যাকোমোডেশন সার্ভিসের। এই প্যামের কথা লিখবো সবার আগে।

শহরে পৌঁছে তো উঠলাম উইন্ডসর টেরাসের টেম্পোরারি এক কামরার ফ্ল্যাটে - পনেরোদিনের বুকিং করে এসেছিলাম। বাড়ি খুঁজতে গিয়ে দেখলাম বাজারে যে কোনো বাড়ি কমপক্ষে চারশো পাউন্ড, তার সাথে এক মাসের সিকিউরিটি ডিপোজিট। ওদিকে আমেরিকা থেকে আনা ব্যাঙ্কার্স চেক ক্যাশ হতে সময় নেবে কমপক্ষে এক মাস। প্যামকে গিয়ে ধরলাম - উইন্ডসর টেরাসে আরো কিছুদিন এক্সটেন্ড করার জন্য। বিবাহিত স্টুডেন্টদের অ্যাকোমোডেশন পাওয়া দুষ্কর, তাছাড়া আমি তো তখনো শুধু রিসার্চ স্টাফ - পার্ট টাইম স্টুডেন্ট হিসেবে রেজিস্টার করতে আরো কিছুটা সময় লাগবে। হাতে পয়সা নেই যে তক্ষুণি বাড়ি খুঁজে নেবো। প্যামের কাছে পুরো সারেন্ডার করলাম - দ্যাখো, আমার চেক ক্যাশ হতে দেরী আছে, কাজেই নিজে নিজে বাড়ি খুঁজে বের করা অসম্ভব, তুমি একটা ব্যবস্থা করে দাও। প্যাম উইন্ডসর টেরাসে এক্সটেন্ড করতে পারলো না বটে, কিন্তু ক্যাসল লীজেস-এ আবার কিছুদিনের ব্যবস্থা করে দিলো, আর ইউনিভার্সিটির প্রাইভেট অ্যাকোমোডেশন স্কীমে একটা ফ্ল্যাটও খুঁজে দিলো - যতদিন না সেই ফ্ল্যাটটা খালি হচ্ছে ততদিন ক্যাসল লীজেস, দিন পনেরোর জন্যে। প্রাইভেট অ্যাকোমোডেশন স্কীমেও স্টুডেন্ট রেজিস্ট্রেশনের দরকার - তার জন্যে আবার গিয়ে ধরলাম পল ওয়াটসনকে। ওই দুই সপ্তাহের মধ্যেই দুজনে খেটেখুটে একটা রিসার্চ প্রোপোজাল নামিয়ে রেজিস্ট্রেশনও সেরে ফেললাম। আমি তখন ইউনিভার্সিটি স্টাফ, একই সাথে পার্ট-টাইম পিএইচডি স্টুডেন্ট - রিসার্চ প্রোজেক্টের কাজের মধ্যে থেকেই পিএইচডি-র কাজ খুঁজে নিতে হবে - সুবিধা এই যে টিউশন ফী-টা আমার মকুব - ইউনিভার্সিটি স্টাফ হওয়ার দৌলতে। ২০০২-এর জুনের প্রথম সপ্তাহ থেকে আমার ঠিকানা হল ১০৪ ওয়ারউইক স্ট্রীট, পরের কয়েক বছরের জন্যে।

প্রথম প্রথম একা লাগতো। তিন মাসের ছেলেটা তখন আরো কত বড় হল, কী কী করতে শিখলো - এই সব খোঁজ নিতাম বাড়িতে ফোন করে। মেরিল্যান্ড থেকে কয়েকটা বাক্সে ঘরোয়া জিনিসপত্র পাঠিয়েছিলাম - সেসব তখনো এসে পৌঁছয়নি বলে রান্নার পাট শুরু করিনি। সকালটা মাফিন, দুপুরে হে-মার্কেট স্টেশনের পাশের বেকার্স কর্নার আর রাত্তিরে রাস্তার কোণের কর্নার শপ থেকে কিনে আনা ফ্রোজেন খাবার গরম করে সাথে পাঁউরুটি। শনি-রবি দুপুরবেলা হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম সিটি সেন্টারের দিকে - সেখানে গোল্ডেন বেঙ্গলে খেতে খেতে আলাপ হয়ে গেলো রেস্তোরাঁর মালিক সাদাতভাইয়ের সঙ্গে। সিলেটের লোক, বাঙালী। চাকরির খোঁজে এই মুল্লুকে এসে একটা ছোট রেস্তোরাঁয় কাজ শুরু করে আজ নিজেই একটা চালান। ছেলেকে ভর্তি করেছেন নর্দামব্রিয়া ইউনিভার্সিটিতে, যাতে সে রেস্তোরাঁ থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো একটা ভালো চাকরি করে। আমার দুপুরের খাওয়া (একটা স্টার্টার, ভাত, সাথে একটা নন-ভেজ ডিশ আর আইসক্রীমের তিন-কোর্স খাওয়া) শেষ হলে দু কাপ ক্রীম দেওয়া কফি (এক কাপ নিজের, এক কাপ আমার, আর সেটা ফ্রী) নিয়ে এসে বসতেন আমার সাথে - আর গল্প করতেন - বাড়ির গল্প - ওঁর, আমার...

আলাপ হয়ে গেলো সিড-এর সঙ্গে - আমির সিদ্দিকি - ওয়ারউইক স্ট্রীটে আমার ফ্ল্যাটের লাইনের শেষে যে কর্নার শপ-টা ছিলো, যার দোকান থেকে আমি ফ্রোজেন খাবার কিনে আনতুম - তার মালিক। পাকিস্তানের পঞ্জাবের লোক। এমন আলাপ হয়ে গেলো যে পরের দিকে ঋককে নিয়ে কখনো ওর দোকানে গেলে ও ঋককে এত লজেন্স/ক্যান্ডি ধরিয়ে দিত যে আমি লজ্জায় ঋককে না নিয়ে যাওয়া শুরু করেছিলুম। সিড আমাকে খোঁজ দিলো ফেনহ্যামের কোথায় দেশী মাছ পাওয়া যায়, কোথায় ফার্মার্স মার্কেটে টাটকা সব্জি পাওয়া যায়। আর নিউক্যাসল ইউনাইটেডের সাথে আমার চেনাশোনার শুরুও এই সিডের দোকানে। দোকান সামলাতে সামলাতে সিড রেডিও শুনতো, আমিও দাঁড়িয়ে পড়তাম আর দু তিনজনের সঙ্গে। ওয়ারউইক স্ট্রীটের বাড়ির পিছনের সিঁড়ির মাথায় দাঁড়ালে সিটিসেন্টারে সেন্ট জেম্‌স পার্কের আলো ঝলমল ছাদটা দেখা যেত। ভেসে আসতো পঞ্চাশ হাজার লোকের চিৎকার। তখন ববি রবসনের নিউক্যাসল - কেভিন কীগ্যানের এন্টারটেইনারদের পর আবার আরেকটা দল যারা জর্ডি রক্তকে গরম করতে শুরু করেছে...

গাড়ির বড় একটা দরকার ছিলো না - বাসেই যাতায়াত করতাম। কিন্তু বেড়ানোর নেশা, বলা ভালো খোলা রাস্তায় গাড়িকে দৌড় করানোর নেশা। বাড়িতে এলো লিট্‌ল ব্লু - নামটা ঋকের দেওয়া। লিট্‌ল নয় আদৌ, সাধারণ সেডান, ঋক কেন লিট্‌ল ব্লু নাম দিয়েছিলো সেটা ওই জানতো। নতুনও নয়, ইউনিভার্সিটিতে চাকরি করা পুওর অ্যাকাডেমিক বলে নতুন গাড়ি নাগালের বাইরে ছিলো। কিন্তু সেই গাড়িই আস্তে আস্তে আমাদের সঙ্গে জড়িয়ে গেলো। এত মায়া মনে হয় আর কোনো জিনিসের ওপর পড়েনি। সেই গাড়ি নিয়ে আমরা দৌড়ে বেরিয়েছি ইংল্যান্ডের এমাথা থেকে ওমাথা - নিউক্যাসলের কাছেই সী-সাইড থেকে পশ্চিমে লেক ডিস্ট্রিক্ট অবধি, দক্ষিণে ডেভন/কর্নওয়াল থেকে উত্তরের হাইল্যান্ডস ছাড়িয়ে জন ও গ্রোটস অবধি। শনিবার সকালে উঠে মনে হল চলো বেরিয়ে পড়ি - অল্প কিছু লাঞ্চ প্যাক করে আমরা তিনজন বেরিয়ে পড়তাম - থুড়ি - চারজন - লিট্‌ল ব্লুকে নিয়ে। নর্দাম্বারল্যান্ডের অলিগলি জঙ্গল, ডারহাম-ইয়র্কশায়ারের দিগন্তবিস্তৃত dales, লেক ডিস্ট্রিক্টের ছড়িয়ে থাকা শান্ত জলরাশি...এসবই ছিলো উইকেন্ডে একদিন বা দুদিনের বেড়ানোর জায়গা। খুঁজে খুঁজে বের করতাম কোন পথ দিয়ে গেলে আরো বেশি সবুজ পাবো - ইংল্যান্ডের সবুজের এক অসাধারণ চোখ জুড়নো সুওন্দর্য আছে। সেই সবুজ খুঁজতে গিয়ে দুর্গম রাস্তা পড়লে পোয়াবারো - পাহাড়ের মধ্যে সরু রাস্তায় এঁকে বেঁকে না গেলাম তো কিসের গাড়ি চালানো? একদিন খুঁজে পেলাম হার্ডনট এবং রাইনোজ পাস - বিবিসি লিখেছিলো "These days the pass is mostly used by intrepid motorists determined to test their nerve – and their car’s brakes – on the toughest of England’s roads." সেও ঘুরে এলাম - রাইনোজ আর হার্ডনট পেরিয়ে লেক ডিস্ট্রিক্টের একেবারে পশ্চিমে ওয়াস্টওয়াটার লেক - যেটা সেই বছর most serene tourist spot হিসেবে নাম করেছিলো। হাঁটতেও যেতাম - ডারহাম বা ইয়র্কশায়ার বা লেক-ডিস্ট্রিক্টের উঁচু নীচু পাহাড়ের গায়ে - গরডেল স্কার, মালহাম কোভ, লাফরিগ সামিট। ঋকও যেত - ওই চার পাঁচ বছর বয়সেই অক্লেশে পাঁচ-ছয় মাইল পাহাড়ি পথে হেঁটে দিত।

এই রকম একটা ট্রিপে একবার মাউন্টেন রেসকিউয়ের দরকার হয়েছিলো প্রায়। রোজবেরি টপিং-এ।

শহর থেকে শহরে - ১২

আজকের নিউক্যাসলের ইতিহাস বঞ্চনার। তাই মনে হয় আরো বেশি চেনা চেনা লাগে। আমার চেনা অন্য আরেকটা শহরের মতন। সেই ইতিহাসের আরেকটা ঝলক - নিউক্যাসল, ২০০৬।

হেডলাইন
=====

২০০৬-এর গরমলাকের একটা দিনে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন কাগজের হেডলাইন -

(১) এখন গরমকাল। বেজায় গরম, যাকে বলে পীক সামার। গোটা ইংল্যান্ডে লোকে হাঁসফাঁস করছে। আশ্চর্য নয় - শীতপ্রধান দেশ, সেখানে দুম করে বত্রিশ-তেত্রিশ, কোথাও পঁয়ত্রিশ ডিগ্রী তাপমাত্র অস্বস্তিকর তো বটেই। জল্পনা চলে - উনিশশো এগারোর রেকর্ড (সাঁইত্রিশ ডিগ্রী) হয়তো ভাঙতেও পারে এবার। সকালের মেট্রোতে খবর - "Commuters in London are travelling in temperatures higher than those in which cattle are transported. Buses in London have reached 52 degree Celcius, while the tube reached 47 degrees. According to the EU guidelines, cattle are not to be transported in temperatures above 27 degrees." হাঁসফাঁসানো লোকে কটিবস্ত্র গলিয়ে ঝাঁক বেঁধে দৌড়চ্ছে সমুদ্রের ধারে। লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে ঘুরতে গেলে দেখা যায় অগণিত স্নানদৃশ্য।

(২) এইচ এম এস গ্লস্টার - যে কিনা বেইরুট থেকে একশো আশি জন আটকে পড়া ব্রিটিশ নাগরিককে সাইপ্রাসে নিয়ে এসেছে, ক্রমশঃ আরো আসবে, হয়তো হাজার কুড়ি আরো - ডানকার্কের পর এই প্রথম এত বড় স্কেলে ইভ্যাকুয়েশন।

(৩) লেবাননের ওপর আরো ইজরায়েলি বোমাবর্ষন।

(৪) জি-৮ সামিটে বড়দাদা বুশ এবং ছোট ভাই ব্লেয়ারের ঘনিষ্ঠ কথোপকথন - যেখানে রাষ্ট্রপুঞ্জ, হেজবোল্লা, প্যালেস্টাইনের পাশাপাশি আলোচনার বিষয়বস্তু একটা সোয়েটার।

(৫) ফুটবলের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ সেল - জুভেন্টাস, লাজিও, ফিওরেন্টিনা আর এ সি মিলানের শাস্তির পর বাজারে তাদের কোন ফুটবলারের কত দাম।

(৬) তৃতীয়বার বাবা হলেন গর্ডন ব্রাউন।

.......

এর মাঝে দুটো খবর এক ঝলকের জন্যে সামনে এসেই মিলিয়ে যায়। আন-ইম্পরট্যান্ট, ফালতু খবর...

(১) সেই নিরীহ ব্রাজিলীয় ইলেক্ট্রিশিয়ানের কথা মনে পড়ে? সেই জাঁ চার্লস ডি মেনেজেস? বাইশে জুলাই ২০০৫ যাকে সশস্ত্র পুলিশবাহিনে স্টকওয়েল টিউব স্টেশনের ভিতর গুলি করে মারে সুইসাইড বম্বার সন্দেহে - কোনো প্রশ্ন না করে, কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে? প্রায় এক বছর পর, ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের রায় - কোনো পুলিশকর্মীর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই, হ্যাঁ, কিছু ভুল হয়েছিলো বটে।

"Despite mistakes made in planning and communication by officers, there had been 'insufficient evidence to provide a realistic prospect of conviction against any individual police officer'."

ইন্ডিপেন্ডেন্ট পুলিশ-কমিশনের রিপোর্ট অন্ধকারে থেকে যায়, সম্ভবতঃ পুরো ঘটনার কঠোর সমালোচনার জন্য। ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের রায় - ১৯৭৪ সালের "কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য এবং সুরক্ষা" আইনের সেকশন তিন এবং তেত্রিশ নম্বর ধারার আওতায় মেট্রোপলিটান পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্ত হোক - for "failing to provide for the health, safety and welfare" of Mr Menezes on 22 July - খুন নয়, ফেইলিং টু প্রোভাইড হেলথ্‌, সেফটি অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার। পুলিশ খুন করে না।

সাঁইত্রিশ ডিগ্রী তাপমাত্রায় স্টকওয়েল টিউব স্টেশনের পাশে জাঁ চার্ল্স ডি মেনেজেসের অস্থায়ী স্মৃতিসৌধে পড়ে থাকা ফুলগুলো শুকোতে থাকে...

(২) সোয়ান হান্টার শিপইয়ার্ড থেকে ধীরগতিতে বেরিয়ে যায় ইয়ার্ডে তৈরী হতে থাকা শেষ জাহাজটা - কাজ শেষ হবে গ্লাসগোতে। টাইন নদীর দুই ধার নীরব চোখে চেয়ে থাকে ক্রমশঃ দূরে সরে যেতে থাকা ষোল হাজার টনের RFA Lyme Bay-র দিকে। একশো ছেচল্লিশ বছরের জাহাজ তৈরীর ইতিহাস শেষ। বন্ধ হল টাইনের ধারের শেষ জাহাজ তৈরীর কারখানা। প্রতিরক্ষা দপ্তরের বক্তব্য - ক্রমবর্ধমান খরচ এবং কাজ শেষ হতে দেরীই এই কনট্র্যাক্ট বাতিলের কারণ, এবং তার জন্যে দায়ী সোয়ান হান্টারের ম্যানেজমেন্ট। জাহাজের কোয়ালিটি নিয়ে কোনো বিতর্কই নেই।

কয়েক দশক আগেও এই একই সোয়ান হান্টারে কাজ করতো প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার শ্রমিক, নয় নয় করে ষোলশর বেশি জাহাজ তৈরী হয়ে বেরিয়েছে এই ইয়ার্ড থেকে...কিন্তু নর্থ-সাউথ ডিভাইড অন্যান্য ইয়ার্ড আর কয়লাখনির মত এরও শেষ বাঁশি বাজিয়ে দিলো।

সাঁইত্রিশ ডিগ্রী তাপমাত্রায় পুড়তে থাকে ধুলো ঢাকা নির্জন সোয়ান হান্টার - টাইন নদীর ধারের শেষ শিপইয়ার্ড। হয়তো এবার সেখানে জাহাজ ভাঙা হবে...

শহর থেকে শহরে - ১১

সেন্ট জেমস-এর ইতিকথা
============

তখন মেরিল্যান্ডে ভেরাইজনে চাকরি করি - বলা ভালো বেগার খাটি, আর পালানোর কথা ভাবি। অবাক লাগে, তাই না? যে দেশে সবাই আসতে চায়, যে দেশকে সবাই "সব পেয়েছির দেশ" বলে জানে, সেখান থেকে পালানোর কথা ভাবে - এ লোকটা কে রে!!! থেকে বুঝছিলাম সে দেশটা আমার জন্যে নয়। শুধু পয়সার বাইরে যদি জীবন খোঁজেন, সে দেশ আপনারও হয়তো ভালো লাগবে না। দেশটা সব পেয়েছির দেশ হলেও। আমারও অসহ্য লাগতো, বিশেষ করে প্রতিদিনের চিন্তা - কাল আমার কিউবমেটের হাতে গোলাপী কাগজ ধরিয়েছে, আজ আমাকেও দেবে না তো? প্রোজেক্টে পয়সা নেই, সুতরাং তোমার দামও নেই, দাম শুধু ওপরতলার ম্যানেজার-ভাইসপ্রেসিডেন্টদের - ওদের প্রাইভেট জেট কখনো বন্ধ হয় না। আজ প্রোজেক্টে পয়সা নেই, তুমি যাও ভাই, আগের সপ্তাহে সেরা কর্মী হয়ে থাকলেও...তার ওপর সদ্য ঘটা ৯/১১...বিদেশীদের দিকে সন্দেহের চোখ...দেড় বছরের চেনা সিকিউরিটি গার্ড তখন রোজ খুঁটিয়ে আইডেন্টিটি কার্ড দেখে আগের দেড় বছর ধরে প্রতিদিন আমাদের দেখেও...এ দেশ ছেড়ে যাওয়াই ভালো।

একদিন নিউক্যাসলে এলাম ইন্টারভিউ দিতে, ইউনিভার্সিটিতে, রিসার্চের কাজ। সেদিন চোখ টানেনি শহরটা, কেমন যেন বিষন্ন, মেঘে ঢাকা, স্যাঁতস্যাঁতে...ইউনিভার্সিটির বাড়িটা অনেকটা বিই কলেজের মতন...জমে থাকা ধুলো, নোংরা...কোথায় ভেরাইজনের ঝাঁ-চকচকে অফিসবাড়ি...কোথায় গেথার্সবারের্গ ঝাঁ-চকচকে লেক ফরেস্ট মল...

কিন্তু চলে এলাম, মাস কয়েকের মধ্যে আমেরিকার পাততাড়ি গুটিয়ে...শুরুর ঠিকানা উইন্ডসর টেরাসের এক কামরার শেয়ার্ড অ্যাকোমোডেশন। ততদিনে দুজন থেকে তিনজন হয়েছি, সুমনা আর ছোট্ট ঋক গেছে কলকাতায়, যে প্লেনে ওয়াশিংটন ডিসি থেকে লন্ডন এসেছি, সেই প্লেনেই। আমি একা এসেছি নিউক্যাসলে। মাথা গোঁজার ব্যবস্থা হলে ওরা আসবে। কয়েকমাস পর নতুন ঠিকানা হল ওয়ারউইক স্ট্রীট, কলকাতা থেকে নিয়ে এলাম ওদের, সুমনা স্কট উইলসনে চাকরি পেয়ে গেলো। দেখতে দেখতে দিন কাটতে লাগলো, ওয়ারউইক স্ট্রীট থেকে হেল্মস্লে রোড, ঋক এখন চার পেরিয়েছে, আর আমি নিউক্যাসল ইউনাইটেডের ভক্ত হয়ে গেছি। এই শহরটার কথাই লিখবো এবার।

রোমান আমলে তৈরী শহর, রোমান সম্রাট হেড্রিয়ানের তৈরী হেড্রিয়ান্‌স ওয়ালের ধ্বংসাবশেষ এখনও আছে। রোমানরা চলে যাওয়ার পর এর নাম হয় মঙ্কচেস্টার, শক্তিশালী অ্যাংলো-স্যাক্সন রাজার রাজত্বের অংশ। পর পর যুদ্ধবিগ্রহে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাওয়া মঙ্কচেস্টারের বুকের ওপর রবার্ট কার্থোজের আমলে তৈরী হয় নোভাম ক্যাস্টেলাম - বা - নিউক্যাসল। শিল্পবিপ্লবের সময় মাথা তোলে নিউক্যাসল - আশে পাশে অপর্যাপ্ত কয়লার যোগানের দৌলতে। ১৫৩৮ সাল থেকে চালু হয় প্রবাদ - ক্যারিয়িং কোল্‌স টু নিউক্যাসল - সেও এই কয়লাখনির দৌলতে। তৈরী হয় জাহাজের কারখানা, ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প - এসবের জোরে নিউক্যাসল পাল্লা দিতে থাকে ম্যাঞ্চেস্টার আর লিভারপুলের সাথে। সে অনেকদিন আগের কথা।

তারপর টাইন নদী দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে, টাইনের কালো জলে নিউক্যাসলের সেদিনের স্বচ্ছতা ধুয়ে গেছে। শেষ কয়লাখনির দরজা বন্ধ হল কয়েকবছর আগে। জাহাজের কারখানা রুগ্ন, ইংল্যান্ডের ক্রমশঃ বাড়তে থাকা নর্থ-সাউথ ডিভাইডের কবলে পড়ে নিউক্যাসল আজ অক্সিজেনের অভাবে ধুঁকতে থাকা এক হাঁপানির রুগী - যার আরেকটি বার উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছের কোনো খামতি নেই - শুধু উঠে দাঁড়ানোর জন্যে সম্বল কিচ্ছু নেই। শিল্পের সম্বলহীন নিউক্যাসল কয়েক দশক ধরে আঁকড়ে রয়েছে শুধু একটা ফুটবল ক্লাবকে - নিউক্যাসল ইউনাইটেড...

শুধুমাত্র গত দুই তিন বছরে নতুন কিছু হচ্ছে এখানে - মিলেনিয়াম ব্রীজ, বল্টিক, নতুন করে সাজানো কী-সাইড, সায়েন্স সিটি...তাও জর্ডি-প্রাইড অবর্তিত হয় নিউক্যাসল ইউনাইটেডকে ঘিরে...

জর্ডি - মানে টাইন নদীর আশেপাশের মানুষজন...

নিউক্যাসল ইউনাইটেড এখানকার মানুষের কাছে শুধু একটা ফুটবল ক্লাব নয় - অনেক বেশি - গোটা অঞ্চলের উঠে দাঁড়ানোর হাতিয়ার। "The Geordie nation, that's what we are fighting for. London's the enemy! You exploit us, you use us." - নর্থ-সাউথ ডিভাইডের প্রত্যক্ষ ফসল, স্যার জন হল-এর ব্যবসাবুদ্ধির শুরু।

গার্ডিয়ান লেখে - Michael Martin, the editor of the True Faith fanzine, recalls his own Geordie blood stirring as Keegan's rejuvenated side galloped into the breakaway Premier League. "John Hall tapped into something latent, the pride and the apartness of the north-east. Newcastle was depressed; industries like mining and shipbuilding had been destroyed. We bought into the idea of the club as the flagship of revival."

স্যার জন হল শুধুমাত্র ব্যবসার খাতিরে জর্ডি-প্রাইডকে খুঁচিয়ে তুললেও এখানকার মানুষ কিন্তু নিউক্যাসল ইউনাইটেডকে আঁকড়ে থাকার অভ্যেস ছাড়তে পারেনি। উঠে যাওয়া জাহাজ কারখানার শ্রমিক, বন্ধ হয়ে যাওয়া খনির মজুর, রিটেল শপের কর্মী - এরাই দলটার নাছোরবান্দা সমর্থক - মাসমাইনের অর্ধেক দিয়ে খেলার টিকিট কাটে - প্রতি সপ্তাহে অন্তত পঞ্চাশ হাজার মানুষ ভিড় করে সেন্ট জেম্‌স পার্কে, মদের বোতল আর অবিশ্রান্ত বকর বকর করা ছাড়া এই এদের এন্টারটেইনমেন্ট। প্রতি সপ্তাহে এরা স্বপ্ন দেখে অ্যালান শিয়ারার, নবি সোলানো, শে গিভেনদের নিয়ে...মাঠের ভিতরে ডায়ার আর লী বোওইয়ার নিজেদের মধ্যে মারামারি করলে কান্নায় ভেঙে পড়ে এরা...প্রিমিয়ার লীগে দুই বা তিন থেকে পাঁচে নেমে গেলে ক্ষুব্ধ হয় এরা, আবার গ্রেম সোনেসের হাতে পড়ে তলানিতে ঠেকে গিয়ে গ্লেন রোডারের হাত ধরে তেরো নম্বর থেকে সাতে উঠে আসায় এরাই আবার নতুন করে স্বপ্ন দেখে...

মায়া পড়ে যায়। এদের দেখতে দেখতে আমিও কবে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের সমর্থক হয়ে গেছি নিজেই জানি না। এখন আমিও প্রতি হপ্তায় রেডিওতে খেলা শুনতে শুনতে চেঁচাই, নিউক্যাসল ইউনাইটেড হেরে গেলে রাতের খাবারটা বিস্বাদ লাগে, পরের দিন ইউনিভার্সিটিতে কফি খেতে খেতে এই নিয়েই কথা বলি...ব্লগে মোহনবাগানের পাশে নিউক্যাসল ইউনাইটেডের লিংক রাখি...

চার বছরের ছেলেটা ফুটবল বোঝে না কিছুই, কিন্তু অ্যালান শিয়ারারকে একশোবার চেনে, চেয়েচিন্তে সাদাকালো জার্সি বাগিয়েছে - পিছনে শিয়ারারের নয় নম্বর আর নাম লেখা...ওই পরে ও নার্সারীতে শিয়ারার হয়। অ্যালান শিয়ারারের টেস্টিমোনিয়াল ম্যাচের দিন গোটা শহরটা যখন সাদা-কালো হয়ে ওঠে, আমিও নিউক্যাসল ইউনাইটেডের সাদা-কালো জামা পরি...

এই শহরে বেশিদিন থাকবো না। জানি। পড়াশোনাটা শেষ করে ফিরে যাবো সেই আমার পুরনো শহরে। কিন্তু এই শহরটার স্মৃতি থেকে যাবে - ওই সাদা-কালো জামাটার মধ্যে। কখনো এই শরটার সঙ্গে আবার দেখা হলে আমিই জিজ্ঞেস করবো - "how gadgie , ya'aalreet deein?"

পাকাপাকি প্রেমে মনে হয় এবারই পড়লাম।

শহর থেকে শহরে - ১০

সব পেয়েছির দেশে - অল্প কিছুদিন
==================

দিল্লী ছাড়ার পরের ঠিকানা সিলভার স্প্রিং, মেরিল্যান্ড। ডিসেম্বরের শেষ, চারদিক সাদা, এবং ক্রিসমাসের ছুটির ঠিক আগে। ডাউনটাউন সিলভার স্প্রিং-এর একটা মোটেলে থেকে প্রথম দু তিনদিন অফিস, তারই মধ্যে অফিসের মাইল চারেকের মধ্যে একটা অ্যাপার্টমেন্টে থাকার ব্যবস্থা হল। কিন্তু ভালো লাগতো না। চতুর্দিক সাদা, কনকনে ঠান্ডা, চেনা লোক একটাও নেই, কথা বলার কেউ নেই - অফিসে টুকটাক কথা ছাড়া। বাড়িতে তখনও কিছুই নেই - কাছের একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোর থেকে কেনা দুটো কমফর্টার আর দুটো ছোট টেবিলল্যাম্প ছাড়া। বাড়ি ফিরে সন্ধ্যেবেলা দুজন ভুতের মতন বসে থাকতাম ওই অল্প আলোয়। সময় কাটানোর সম্বল বললে মার্কেজের তিনটে বই। প্রথম পনেরোদিনের চেকটা হাতে পেয়ে একটা টিভি আর টেপ-কাম-রেডিও কিনে অল্প একটু স্বস্তি। তাও একা লাগতো - দুজন হয়েও। দম বন্ধ করা একা।

অভ্যেস হতে শুরু করলো। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে আধ মাইল দূরে বাসের জন্যে দাঁড়াতাম, কখনো কয়েক মিনিট, কখনো আধ ঘন্টাও। ফেরার সময় অফিসের পিছনের রাস্তায় ঘন্টাখানেকও দাঁড়িয়েছি একটা বাস মিস্‌ করার পর। এদিক ওদিক চেনাপরিচিতদের মাধ্যমে যোগাযোগ হল শ্যামলদার সঙ্গে - প্রাক্তন বিই কলেজ, সেই সুত্রে দিদি-জামাইবাবুদের সাথে প্রচন্ডই আলাপ এবং দারুন সম্পর্ক - সেই সুত্রে আমাদের সঙ্গেও সম্পর্কটা শুরু হয়ে গেলো। নিজেই আমাদের ওই ভুতের অ্যাপার্টমেন্টে এসে আমাদের নিয়ে গেলেন ওঁর বাড়িতে, তার পরে ওয়াশিংটন ডিসি এলাকার সংস্কৃতির সরস্বতী পুজোয়। গাড়ি একটা খুব দরকার - চারপেয়ে বাহন ছাড়া ওই মুল্লুকে জীবন অচল - শ্যামলদা নিজেই বিভিন্ন শোরুমে নিয়ে গেলেন - গাড়িও একটা কেনা হল। আরো কিছুটা স্বস্তি। বাজার টাজার ঠিকঠাক করা যাবে, এদিক ওদিক যাওয়াও যাবে। তার আগে অবধি তো ঘরে বন্দী, বাজার করে ফেরা মানে দুজনের হাতে পেল্লায় চার পাঁচটা ব্যাগ নিয়ে কোনো রকমে আড়াই মাইল হেঁটে বাড়ি ফেরা...

ওদেশে থাকতে থাকতে একটা অভ্যেস ভালো রপ্ত হয়েছিলো - গাড়ি নিয়ে দূর দূরে ঘুরে বেড়ানো। সে অবশ্য সিলভার স্প্রিং-এর আগেই। দিল্লী থেকে কাজের সুত্রে যেতাম কলোরাডো - বাহন ছাড়া সেখানেও জীবন অচল। কিন্তু কাজের সুত্রে যাওয়ার ফলে অফিস থেকে রেন্টাল গাড়ি দিত। ওই কলোরাডোতে থাকতে থাকতেই গাড়ি চালানো শিখেছিলাম - আর তখন থেকেই আলপটকা দূরে দূরে ঘুরতে যাওয়ার অভ্যেসটাও গায়ে লেগে গেছিলো। লাইসেন্স পাওয়ার অল্প কয়েকদিনের মধ্যে প্রায় সাড়ে আটশো মাইল দূরে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে ঘুরতে চলে গেছিলাম আমি আর শ্রীকৃষ্ণ (তখনকার কলীগ)। তারপর আরো দু তিনজন মিলে প্রায় এগারোশো মাইল দূরে লস এঞ্জেলস। এই নেশার শুরু তখনই।

মেরিল্যান্ডেও যখন ভালো লাগতো না, এটাই ছিলো ওষুধ। কখনো স্মোকি মাউন্টেন, কখনো ভার্জিনিয়া বীচ বা অ্যাটলান্টিক সিটি, কখনো শেনানডোয়া ন্যাশনাল ফরেস্ট, কখনো নায়াগ্রা। হাতের কাছে পোটোম্যাকের ওপর মেরিল্যান্ড আর ভার্জিনিয়ার বর্ডারে গ্রেট ফল্‌স তো ছিলোই।

অভ্যেস হতে থাকলো, কিন্তু ভালো লাগলো না। এখনও খুব একটা ভালো স্মৃতি খুঁজে পাই না - শুধু অল্প কিছু ছাড়া। এক এই গাড়ি নিয়ে যেদিকে দুচোখ যায় বেড়িয়ে পড়া, আর অন্যটা ঋক। মেরিল্যান্ডে থাকতে থাকতেই ঋক আসার খবর জানান দিলো। ততদিনে সিলভার স্প্রিং-এর অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে আমরা গেথার্সবার্গে চলে গেছি - সুমনার অফিস থেকে কাছে হত বলে।

ওদিকে ততদিনে ডট কম বাব্‌ল ফেটে গেছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে অস্বাভাবিক ডিপ্রেসিং অবস্থা। যে জন্যে গেছিলাম - যে চাকরি করতে করতে পড়াশোনাটা এগিয়ে নিয়ে যাবো আরেকটু - সেই রাস্তাও হতাশাজনকভাবে বন্ধই। কারণ চাকরির বাজার পড়তে শুরু করে মোটামুটি ২০০১-এর শুরুর দিক থেকেই। তার ওপর এলো ২০০১-এর ১১ই সেপ্টেম্বর।

সেদিন আমি যেমন সময়ে অফিস যাই, তেমন সময়েই গেছি। অভ্যাসমত কম্পিউটারে সিএনএন খুলেছি। খোলার সাথে সাথেই চোখে পড়লো টুইন টাওয়ারের জ্বলন্ত ছবি। অফিসে তখন সকলে এখানে ওখানে আলোচনায় ব্যস্ত। এর মধ্যে খবর এলো পেন্টাগনের। মোবাইল নেটওয়ার্ক জ্যামড। বাড়িতে খবর দেওয়ার উপায় নেই। অফিস বন্ধ করে দেওয়া হল - কারণ সিলভার স্প্রিং-এর ভেরাইজনের অফিসটা ডিসি থেকে খুব দূরে নয়। গাড়ি নিয়ে যখন ওয়াশিংটন বেল্টওয়েতে পড়ি তখন সেখানে মাইলের পর মাইল লম্বা শুধু গাড়ির লাইন - সকলে ব্যস্ত হয়ে বাড়ির পথে বেরোয়েছে। আর আকাশে চক্কর দিচ্ছে কয়েকটা ফাইটার। সবকিছু আরো পাল্টে গেলো সেদিনের পর।

গেথার্সবার্গের অ্যাপার্টমেন্টে একদিন বিকেলে কমকাস্টের লোকের আসার কথা ছিলো কেবল কানেকশনের জন্যে। অভ্যাসমত আমি বাড়িতে পাজামা-পাঞ্জাবি পরে। লোকটি আমার দিকে বার দুয়েক দেখে প্রশ্ন করলো - "আর ইউ আ মোসলেম?" সাধারণ লোকের চোখে অবিশ্বাস দেখার শুরু সেদিন। লেক ফরেস্ট মল-এ বইয়ের দোকানে উইলিয়াম শিরারের "রাইজ অ্যাণ্ড ফল অব দ্য থার্ড রাইখ" কিনে কাউন্টারে দাম দেওয়ার সময়ও দেখলাম কাউন্টারের মেয়েটি বারকয়েক মেপে নিলো। অফিসের সিকিউরিটি গার্ডরা তো দিনে বার দশেক কার্ড চেক করতোই - বছর দেড়েক রোজ সামনে দিয়ে ঢুকতে বেরোতে দেখার পরেও। সুমনার অফিসের ভারতীয় মালিক একদিন ওকে বললেন পারলে চুড়িদার অ্যাভয়েড করতে আর একটা টিপ পরতে - সে অবশ্য ভালো মনেই - কারণ অবস্থাটা উনিও জানতেন।

মনটা কোনোদিন বসেওনি, আর এর পর তো একেবারেই উড়ে গেলো। চাকরি বদলানোর আশা নেই, কাজেই চাকরি করতে করতে পড়াশোনা করার আশাও নেই। জিআরই স্কোর ছিলো, কিন্তু চাকরি ছেড়ে পুরো সময়ের পড়াশোনাটা অর্থনৈতিকভাবে বেশি রিস্ক মনে হল। অন্য উপায় খুঁজতে শুরু করলাম - অন্য কোথাও, অন্য দেশে। হতাশ লাগতো - বিশেষ করে দুটো ভালো সুযোগ ছেড়ে এদেশে আসায়। একটা ছিলো নোকিয়া ফিনল্যান্ডে পাকা চাকরি - অন্যটা কমনওয়েল্থ স্কলারশিপ। দ্বিতীয়টার জন্যে বেশি হতাশ লাগতো - পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের সৌজন্যে চিঠিটা এসে পৌঁছেছিলো ডেডলাইনের দেড় মাস পর, ততদিনে কিছু জানতে না পেরে হয়নি ধরে নিয়ে আমেরিকার অফারটা অ্যাকসেপ্ট করে চলে এসেছিলাম।

খুঁজতে খুঁজতে সুযোগও এলো - অন্য দেশে। ইন্টারভিউ দিলাম, পেয়েও গেলাম। তার কিছুদিন পরেই ঋক জন্মালো ট্যাকোমা পার্কের এক হাসপাতালে। ঋকের তিন মাস বয়স হওয়া অবধি অপেক্ষা করতে হল - নয়তো অত ছোট একটা পুঁটলি নিয়ে অত দূর ট্র্যাভেল করা অসুবিধার। এর মধ্যে ভেরাইজনও আমি চলে যাবো জানতে পেরে নানা রকম অফার দিতে শুরু করলো - কিন্তু লোকজনের সঙ্গে কথা বলে মনে হত যতই অফার দিক, সব পেয়েছির দেশের প্রেশার আমার জন্যে নয় - চোখের সামনে এক এক দিন এক এক জন নতুন কিউব-মেট দেখার প্রেশার বড্ড বেশি আমার মত ছাপোষা লোকের পক্ষে। ও দেশটাও আমার জন্যে নয়।

২০০২-এর মে মাসে আবার বাক্সো-প্যাঁটরা গুছিয়ে রওনা দিলাম অন্য দেশের দিকে। লন্ডনে প্লেন নামার পর ঋককে একবার কোলে নিয়ে আদর করে আমি চলে গেলাম ডোমেস্টিক টার্মিনালের দিকে - সেখান থেকে যাবো উত্তর ইংল্যান্ডে নিউক্যাসল আপন টাইন বলে শিল্পবিপ্লবের সময়কার এক শহরে। ঋক আর সুমনা ফিরবে কলকাতায় - কিছুদিনের জন্যে। নিউক্যাসলে বাড়িঘরের ব্যবস্থা করে ওদের নিয়ে আসবো।

শহর থেকে শহরে - ৯

আমি, আমরা আর সে (দিল্লী)
===============

জুলাইয়ের গরমে দিল্লী ফিরলাম। এসে উঠলাম সেই মন্টু সিং-এর বাড়িতেই। সেই বাড়িও অনেক বদলেছে তিন মাসে। আমাদের গোয়ালের কেউই আর নেই, কয়েকটা নতুন ছেলে উঠেছে, পড়তে এসেছে দিল্লীতে। ওখানে থেকেই বাড়ি খোঁজার পালা শুরু। রাজিন্দার নগরে ভাড়ার ফ্ল্যাট দরে পোষালো না। চিত্তরঞ্জন পার্কের কথা মনে হল - সেও নাগালের বাইরে। কালকাজীর ফ্ল্যাট, যেগুলো নাগালের মধ্যে, সেগুলো পছন্দ হল না। অবশেষে আরেক বন্ধুর মাধ্যমে মুনিরকা বাজারের পিছনে একটা ফ্ল্যাট পেলাম - চারতলায়, ছোট, কিন্তু চলে যায় - সবচেয়ে বড় কথা নাগালের মধ্যে। তারপর খাট, বিছানা, আলমারীর খোঁজে দিল্লী চক্কর কাটলাম - সেসব ব্যবস্থা করে ফ্ল্যাট যখন বাসযোগ্য হল তখন জুলাই শেষের মুখে। আগস্টের শুরুতে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে চলে গেলাম কলকাতা।

৯৮-এর আগস্টের কোনো এক দিন তল্পিতল্পা, লটবহর এবং আস্ত আরেকটা মানুষ - যার নাম সুমনা - তাকে সঙ্গে নিয়ে ফের দিল্লীতে পদার্পন। ট্যাক্সি নিয়ে সোজা মুনিরকার ফ্ল্যাটে। ফ্ল্যাটের চেহারা দেখে তাঁর চক্ষুস্থির। আসলে যাওয়ার আগে তাড়াহুড়োয় ফ্ল্যাট পরিষ্কার করাতে পারিনি। এক পরিচিত পরিবারের কাছে চাবি দিয়ে এসেছিলাম - তারা বলেছিলো তাদের লোককে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে রাখবে - সে করায়নি আর। সুতরাং, নতুন সংসারে ঢুকেই দুজনের কাজ শুরু হল গোটা ফ্ল্যাট ঝেড়ে বালতি বালতি জল দিয়ে সে পরিষ্কার করা দিয়ে। অসাধারণ রোম্যান্টিক কোনো সন্দেহ নেই।

পরিষ্কার শেষে ভাবতে শুরু করলাম হাতের তিন দিনের ছুটিতে কোথায় যাওয়া যায় - রোম্যান্টিক কোনো জায়গা। সিমলা যাবো ভাবলাম। ওদিকে তখনো একটা প্রচন্ড জরুরী জিনিস কেনা হয়নি - একটা ফ্রীজ। সেটা কিনতে গেলে ভাঁড়ারে টান পড়ে, অথচ না কিনে উপায় নেই। পরের মাসে মাইনে পেতে আরো দিন দশেক। ফ্রীজ কেনার পর আমার ব্যাঙ্কে সাকুল্যে সাতশোটি টাকা। সেই টাকা, আর সুমনার আনা অল্প কিছুকে সম্বল করে রাতের বাসে সিমলা পৌঁছলাম। সিমলার সেই ছবিগুলোকে এখন উল্টে পাল্টে দেখি, আর ভাবি...কী ভাবি? থাক। বারো তেরো বছর পর সেই ভাবনাগুলো কমন ভাবনা;-)

দিন কাটতে লাগলো। অফিসে নতুন প্রোজেক্ট - সেই সময় গোটা কোম্পানিতে ওই টেকনোলজিতে প্রথম কাজ - মানে দিন রাত এক করে লেগে থাকতে হচ্ছে। সুমনা কয়েকদিন এদিক ওদিক ঘুরে নিজেও একটা চাকরি বাগিয়ে নিয়েছে। রোজ সকালে বেরোই দুজনে, সুমনা ফিরে আসে সাড়ে ছটা নাগাদ, আমার ফিরতে কোনোদিন দশটা, এগারোটা, কখনো কখনো আরো দেরী। রেগুলার রান্নাবান্নার পাট উঠেছে। একদিন রান্না করে দুই তিন দিন চালানো হয়, তারপর কোনো দোকান থেকে খাবার এনে। মুনিরকা বাজারে ছিলো পরাঠা পয়েন্ট - আলুর পরোটা, কপির পরোটা, মূলোর পরোটা তো আম ব্যাপার - আর কিসের পরোটা চান? টমেটো? ডিম? পনীর? সব পাওয়া যেত সেখানে।

মুনিরকায় দুটো সমস্যা ছিলো - এক তো লোডশেডিং। তায় যত না রেগুলার পাওয়ার কাট, তার চেয়ে বেশি লাইন চলে যাওয়া। তার কারণও ছিলো। গলিতে বেরিয়ে ওপরের দিকে তাকালে উঁচু উঁচু বাড়িগুলোর ফাঁকে আকাশ দেখা যেত না। দেখা যেত তারের জঙ্গল। ল্যাম্পপোস্টগুলো দেখে মনে হত গাছ, ইলেক্ট্রিক তারের। তো সেখানে এর গায়ে ও লেগে লাইন যাবে সে আর আশ্চর্য কী? দ্বিতীয় সমস্যা - জল। স্টাও বেশিটা কারেন্ট না থাকার জন্যে। দিল্লীতে এমনিতেই জলকষ্ট - কিছু কিছু জায়গায় বিশেষ করে বেশি। সেখানে কারেন্ট না থাকা মানে মাঝে মাঝে রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরে একতলার আন্ডারগ্রাউন্ড ট্যাঙ্ক থেকে বালতি করে চারতলায় জল তুলতে হত।

আরেকটা বড় সমস্যা এসে দাঁড়িয়েছিলো। নতুন এই প্রোজেক্টের কাজে আমাকে প্রায়ই কলোরাডো যেত হচ্ছিলো। আগস্টে কলকাতা থেকে ফিরে ডিসেম্বরে প্রথমবার। তিন মাসের মধ্যেই। অবস্থাটা ভাবুন। সেই বিরানব্বই সাল থেকে অপেক্ষা করে করে দুজনে এক ছাদের নীচে আসার তিনমাসের মধ্যেই কয়েক হাজার মাইল দূরে পাঠিয়ে দিলো অফিস থেকে। মাস তিনেক পরে ফিরলাম, আবার এক মাস পরেই যেতে হল। সেবার অবশ্য সুমনা কিছুদিনের জন্যে গেছিলো, কারণ আগেরবার আমি হাত ভেঙেছিলুম, তাই খেতে পাবো না বলে অফিস বউকে পাঠাতে রাজী হয়েছিলো। পুরো তিনমাস থাকেনি, কারণ নিজের চাকরি। কিন্তু এই ক্রমাগত যাওয়া-আসায় দুজনের ওপরই চাপ পড়ছিলো, বিশেষ করে মুনিরকার ওই ফ্ল্যাটে একা থাকতে অসুবিধাই হত।

বাড়ি পাল্টালাম। এবার ঠিকানা লাজপত নগর, অমর কলোনী। ততদিনে নিজেদের পাগুলো আরো একটু মজবুত হয়েছে বলে নাগালের বাইরে হাত বাড়ানোর সাহস হয়েছিলো। লাজপত নগরের বাড়িটা দেখেই খুব পছন্দ হল - বড় বড় ঘর, মার্বেলের মেঝে, একদম ওপরে নয় বলে ঠান্ডা থাকে। ভাড়া একটু বেশি বলে আর্জি জানালুম কম করার - ভদ্রলোক প্রথমে রাজী হচ্ছিলেন না। তারপর একবার ভিতর থেকে ঘুরে এসে রাজী হয়ে গেলেন। ওঁর স্ত্রীর নাকি আমাদের দুজনকে খুব পছন্দ হয়ে গেছে - উনি আমাদেরই দিতে চান, তাই একটু কমিয়ে ফেলতে অসুবিধা নেই। আমাদেরও ভালোই হল। এই আঙ্কল আর আন্টি পরেও আমাদের নিজেদের ছেলে-মেয়ের মত দেখতেন। এর পরেও আমি কলোরাডো গেছি - হয়তো মাস খানেক কি দু মাসের জন্য। আঙ্কল বা আন্টি কেউ না কেউ রোজ এসে সুমনার খোঁজ নিয়ে যেতেন - সে বাড়ি এসেছে কিনা, খেয়েছে কিনা...

অর্ণব - সর্দারজী বাড়িওয়ালার কথা বলছিলেন না? আমার দেখা একজন বাড়িওয়ালা এই আঙ্কল।

দিল্লী একটু রাফ - সন্দেহ নেই। এই আঙ্কল আর আন্টিও বাইরে থেকে হয়তো সেরকমই। কিন্তু কী করে ভুলি এঁদের? কী করে ভুলি - যে একদিন যখন জল আসেনি বলে বাড়িতে রান্না করারও জল ছিলো না তখন এঁরা দু তিনটে বালতি ভরে জল পাঠিয়ে দিয়েছেন আমাদের?

দিল্লী খুব একটা সেফ জায়গা নয় - মেয়েদের পক্ষে। কাগজে পড়ি। এখনো। নিজে যখন ছিলাম তখনো শুনেছি। লাজপত নগর থেকে দিল্লী আইআইটির দিকে যাওয়ার সময় ব্লু-লাইনে কেউ সুমনার কামিজের পিছনটা ফালি ফালি করে কেটে দিয়েছিলো। অথচ কী করে ভুলি সেই মধ্যবয়সী পাঞ্জাবী মহিলাকে যিনি নিজের ওড়না দিয়ে আড়াল করে ওকে অটোতে বসিয়ে দিয়েছিলেন যাতে ও বাড়ি ফিরে আসতে পারে?

এইভাবে কাটছিলো।

কখনো দিল্লীর অলিগলির গল্পগুলোকে খুঁজে বেরিয়ে - কুতব মিনারে, হুমায়ুনের সমাধিতে, পুরানা কিল্লায়...

কখনো দিল্লী থেকে বাইরের দিকে গিয়ে আগ্রা ফোর্ট বা ফতেপুর সিক্রিতে বা জয়পুরে...

কখনো দিল্লীর সিরি ফোর্টে রশিদ খাঁয়ের গানের সুরে...

বা প্রিয়া/পিভিআর-এ দেখা কোনো সিনেমায়...

বা পরাঠেওয়ালে গলিতে, দিল্লী হাটের মোমোয়, নাগপালের ছোলে-বটুরেতে...

তখনো আমার রাতে ফেরার কোনো ঠিক নেই। এগারোটা তো নর্মাল, কখনো দুটো-তিনটেও বাজে। একদিন সাড়ে তিনটে বেজে গেছিলো - পরের দিন সকালে আমাকে একজোড়া প্যান্ট-শার্ট ধরিয়ে দিয়ে বললো - আর বাড়ি আসতে হবে না, অফিসেই থাকো।

তখন ভাবতে হল - এভাবে তো চলবে না। হয় মাসের পর মাস বাইরে থাকি, আর যখন দিল্লীতে থাকি তখন দিনে ষোল ঘন্টা অফিসে। এর চেয়ে বাইরে যেখানে যেতে হয়, সেখানে গিয়ে থাকলেই তো হয়! আর সেখানে নিজের পড়াশোনাটাকেও যদি আরো একটু এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়...অনেক বড় কোম্পানিই তো আছে যারা এই সুযোগটা দেয়। এইসব ভেবে খোঁজা শুরু...চাকরি একটা মিলেও গেলো ঠিক...বাকি ব্যবস্থা সেখানে পৌঁছে হবে ভেবে রাজী হয়ে গেলুম।

তারপর? প্রায় চার বছরে গেঁড়ে বসতে থাকা শিকড়টাকে উপড়ে ফেলার শুরু। চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে, জিনিসপত্র যতটা সম্ভব বিক্রি করে (সুমনা পরে আমার মা'কে বলেছিলো - অরিজিৎ আমার সংসারটা ন হাজার টাকায় বিক্রি করে এসেছে), বাকি জিনিসের পোঁটলা বেঁধে একদিন আবার সেই রাজধানীতে চেপে কলকাতায় এসে নামলাম। অল্প কয়েকদিনের জন্যে। মেরিল্যান্ড যাওয়ার টিকিট/ভিসা সব রেডি।

ট্যাক্সিতে চড়ছি যখন, তখন আন্টি দরজার দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলেছিলেন।

শহর থেকে শহরে - ৮

ইন দ্য ল্যান্ড অব লেক্‌স
============

এই দেশটাতে লেকের সংখ্যা দুই লক্ষ, আর লোকের সংখ্যা পঞ্চাশ লক্ষ। মানে এক একটা লেক (বা পুকুর) পিছু মাত্র কুড়িটা লোক। পাড়ার যে কোনো পুকুরের কথা একবার চোখ বন্ধ করে ভেবে নিন।

লুফ্‌তহান্‌সার বোম্বাই সাইজের প্লেনে চেপে গেলুম ফ্র্যাঙ্কফুর্ট, সেখান থেকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান এয়ারলাইন্‌সের পুঁচকে একটা প্লেনে হেলসিঙ্কি। এই পুঁচকে প্লেনটা আবার সেই বড় বড় প্রোপেলারওয়ালা - আওয়াজে কান ঝালাপালা করে দেয়। তো সেই আওয়াজের মধ্যেই ওপর থেকে সবুজের রমরমা দেখে বুঝলাম এক অন্য দুনিয়ায় এসে গেছি।

এয়ারপোর্ট থেকে ট্যাক্সিতে হোটেল - প্রিভাতেল - হোটেলের চেয়ে সঠিক হবে যদি সার্ভিসড অ্যাপার্টমেন্ট বলি। আসলে তখন তো এই সব ফান্ডাও ছিলো না। জনাপিছু এক একটা ঘর, সেখানে রান্না-বান্নার সমস্ত ব্যবস্থা রয়েছে, শুধু সকালের ব্রেকফাস্ট হোটেলে। জায়গাটা হেলসিঙ্কি থেকে অল্প দূরে একটা ছোট গ্রামে, যার স্টেশনের নাম লেপ্পাভারা। আরেকটা নাম - সুইডিশ ভাষায় - আলবার্গা। এদেশের দ্বিতীয় ভাষা হল সুইডিশ - যেহেতু ফিনল্যান্ড অনেকদিন সুইডেনের কব্‌জায় ছিলো। তবুও, আমরা তো কোনো একটা জায়গার নাম বাংলা বা হিন্দিতে যা, ইংরিজীতেও তাই দেখে অভ্যস্ত - কাজেই এই ফিনিশ ভাষায় এক নাম, আর সুইডিশ ভাষায় আরেক নাম দেখে নতুন লেগেছিলো। স্টেশন থেকে প্রিভাতেল প্রায় দুই মাইল দূরে, তায় একজায়গায় একশো চুয়াল্লিশটা সি`ঁড়ি ভাঙতে হত। হোটেল থেকে স্টেশন যেতে কষ্ট নেই, কিন্তু উল্টো পথে আসতে দম বেরিয়ে যেত। যে সময়ে গেছি সেটা গরমকাল। গরম বলতে দিনে হয়তো বিশ ডিগ্রী, রাতে একটু কম। বেশ আরামদায়ক। চমকটা অপেক্ষা করছিলো রাতের দিকে - ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে, আটটা - নটা - দশটা - অথচ দিনের আলো কমার নাম নেই। কারণটা খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু নতুন তো!

চাপে পড়লাম বাজার করতে গিয়ে। একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে ঢুকে দেখি অজস্র জিনিস, আলু-পেঁয়াজ-ফুলকপি ইত্যাদি দেখে চেনা যাচ্ছে, কিন্তু বাদবাকি জিনিস দেখে তো চেনা যায় না, নাম দেখে বোঝারও উপায় নেই - কারণ যা কিছু লেখা আছে সবই ফিনিশ এবং সুইডিশে। চেনা জিনিস কেনা ছাড়া পথ নেই। একবারই দেখে কিনতে গিয়ে ঝাড় হয়েছিলো - একটা প্যাকেট দেখে মনে হয়েছিলো বেসন জাতীয় কিছু - ছোলার মতন কিছু ছবি লাগানো ছিলো। হোটেলের ঘরে বাঁধাকপির বড়া বানাতে গিয়ে সে ঘেঁটে চচ্চড়ি হয়ে গেলো। পরে একজনকে দেখিয়ে জেনেছিলাম সেটা gram flower নয়, সয়াবীনের গুঁড়ো।

এভাবেই চললো দিনগুলো। আগে কখনো নিজে রান্না করিনি - বাড়িতে ক্চিৎ কখনো ডিমটা ভাজা বা সুজিটা বানানো ছাড়া। আর এখেনে রান্না না করতে পারলে কপালে হরিমটর, কারণ সতেন্দার আর গুরপ্রীতেরও অবস্থা আমারই মত - শুধু চা টুকু বানাতে পারে। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে মনে হল ইমেল ভরসা। নোকিয়ার অফিসে ইমেল/ইন্টারনেট অবাধ - দিল্লীর গোয়ালে যেটা ভাবাই যেত না। দিদি তখন ম্যাঞ্চেস্টারে, কাজেই ইমেলে রেসিপি আসতে শুরু করলো, কখনো কখনো ফোনে ইনস্ট্রাকশনও। স্টিলের ডেকচি টাইপের জিনিসে রান্না চলছে, আর ফোনে শুনছি - এবার জিরেগুঁড়োটা দে, এবার হলুদটা দে। জিরে-হলুদ কোত্থেকে এলো? ওসব ওখানে পাবেন না, পেলেও ভরসা করে চিনে কিনতে পারবেন না - জিরের বদলে হয়তো ব্রাউন লঙ্কার গুঁড়ো নিয়ে এলেন। সতেন্দার আর গুরপ্রীত - দুজনেরই বাড়ি থেকে চাল আর রোজকার কিছু মশলা বেঁধে দিয়েছিলো - তাতেই আমরা অত হাতের কাজ দেখানোর সুযোগ পেতুম। তা এভাবে চলছিলো মন্দ না - ফুলকপির তরকারিটা, বা মুরগীর ঝোলটা মোটামুটি নেমেও যাচ্ছিলো। সাহস করে রুটিও বানাতে শুরু করলাম। চাকী-বেলুন নেই তো কী? বীয়ারের বোতল তো আছে, আর রান্নার টেবিলটাও পরিষ্কার। রুটিগুলো পাঁপড় বলছেন? ঘিয়ের ডাব্বা আছে, ঘি মাখাও, গরমাগরম খেয়ে নাও।

নোকিয়ার অফিসেও পুরোদমে কাজ চলছে। সাধারণতঃ শুনতে পেতুম অনসাইটে প্রচণ্ড চাপ, ক্লায়েন্ট অফিসে অফশোর থেকে আসা লোকজনকে বাঁকা চোখে দেখে। সে সব বালাই এখানে নেই। ফিনল্যান্ড চলে ঢিমে তে-তালায়, অফিসের কাজও তাই। লোকজনের মুখে শুনি তারা বেশ থার্ড ইয়ারে পড়তে পড়তে ড্রপ দিয়ে দু বছর দুনিয়া ঘুরতে চলে যায়। এও শুনি যে আমাদের যে বড় আর্কিটেক্ট - সে কোনো কলেজ গ্র্যাজুয়েট নয় - এক কালে ড্রাম বাজাতো কোনো এক ব্যান্ডে, এখন প্রোগ্রামিং শিখে ধুরন্ধর লিড আর্কিটেক্ট! নোকিয়া সবাইকে বাকি সমস্ত অফিসে যাওয়ার অ্যাকসেস দিয়েছে, তার মধ্যে লেপ্পাভারা থেকে আরো এগিয়ে একটা জায়গায় একটা দুর্দান্ত ফিটনেস সেন্টারও আছে - যেখানে মাল্টিজিম, সুইমিং পুল আর সাওনা দেখে চোখ কপালে ওঠার যোগাড়। চোখদুটো খসে পড়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেয়েছিলো যেদিন জানতে পেরেছিলুম সাওনাগুলো ইউনিসেক্স - যখন নোকিয়ার অফিসেরই দুজন কলীগ সাওনায় ঢুকে নিশ্চিন্তে নিজেদের টাওয়েলগুলো সরিয়ে বসে পড়লেন। ওদিকে ততদিনে আমরা একবারও বিনা-টাওয়েলের কথা ভাবিওনি। অস্বস্তি হয়েছিলো, পালিয়ে এসেছিলাম। পরে মনে হয়েছিলো হয়তো সেটা ঠিক হয়নি - ওদের সমস্ত ডেফিনেশনগুলোই অন্যরকম। ওদের কাছে যেগুলো স্বাভাবিক, আমাদের কাছে সেগুলো অস্বস্তিকর। আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ সুযোগ খুঁজে বেড়াই, অথচ ওদের এই স্বাভাবিক প্রকৃতি দেখে আমাদের অস্বস্তি হয় - বা অস্বস্তির ভান করি।

সুযোগ যে খুঁজি সে তো দেখলামই। নোকিয়ায় ওই সময় আমাদের গোয়ালের বেশ কয়েকজন গরু ছিলো। উইকেন্ডে সকলে যেত ডিস্কোতে। একদিন আমিও গেলুম। নাচতে তো ভারি পারি - বিশ্বকাপের মরসুম বলে রিকি মার্টিনের অলে-অলে চলছিলো গাঁক গাঁক করে - তর সাথে কিছুক্ষন হাত-পা ছুঁড়ে দম বেরিয়ে গেলো। চেয়ারে বসে সিগারেট ধরিয়েছি, দুটি মেয়ে এসে সিগারেট চাইলো। ওই জিনিসটার ওখানে বেদম দাম বলে পাউচ কিনেছিলুম - সেটা ওদের দেখাতে ওরা সাহস করলো না। আরেকজন এসে ওদের সিগারেট দেওয়ার সময় রিটার্ন কিছু পাওয়া যাবে কিনা জিগ্গেস করলো। মেয়েদুটো মনে হয় অভ্যস্ত - হেসে চলে গেছিলো। নাচের সময় দেখেছি কয়েকজনকে কতরকমভাবে সুযোগ খুঁজতে। নিজের লজ্জা করেছে। তারপর মনে হয়েছে আমি শালা বলার কে...আমি হয়তো ডরপোক বলে বসে বসে এই সব ভাবছি। হয়তো তাই - হয়তো আমি ডরপোক, বা অন্য কিছু - সেদিন নাইট ক্লাবেও মিনিট পনেরোর বেশি বসে থাকতে পারিনি - খুবই বোরিং লেগেছিলো ওই পোল ডান্সিং ব্যাপারটা - বাকিদের ফেলে রেখে হোটেলে ফিরে এসেছিলুম।

চোখে লেগেছিলো অল্প বয়সীদের মধ্যে অ্যালকোহলের চলটা। ফিটনেস সেন্টার থেকে ফিরছি - স্টেশনের সিঁড়ি দিয়ে প্ল্যাটফর্মে নামছি, এক দঙ্গল মেয়ে পাশ দিয়ে গেলো। তাদের মধ্যে একজন হঠাতই সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে একদম নীচে। বাকিদেরও পা টলছে, সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতা কারো নেই। তাও, সকলে সেই মেয়েটাকে ধমকানো শুরু করলো - কারণ ওই পড়ে যাওয়ার জন্যে ওদের ট্রেনটা বেরিয়ে গেছে। বা, সেদিনের কথা - যেদিন মিডনাইট সান - ২১শে জুন...আমরা গেছিলাম হেলসিঙ্কি থেকে সামান্য দূরে সুয়োমিলেনা বলে একটা দ্বীপে - সেখানে একটা পরিতক্ত্য দুর্গ রয়েছে। ফেরার সময় দেখি একটা ট্রাম দাঁড়িয়ে পড়েছে, তার পিছনে সার দিয়ে দিয়ে আরো ট্রাম। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে সামনের ফুটপাথে এমনভাবে বসে যে তাদের পা দুটো ট্রামলাইনের ওপরে - দুজনের কারো হুঁশ নেই, লোকে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়েও তাদের পা সরাতে পারছে না।

অথচ দেশটাকে ক্রাইম বলতে গেলে কিছুই নেই। হতে পারে বছরের ছটা মাস এরা অন্ধকার আর ঠান্ডায় থাকে বলে...শীতের ওই ছটা মাস যে কিরকম সেটা ওদের মুখেই শোনা - আলো ফোটে না সারাদিন, পাঁচ-ছয় ফুট বরফ জমে থাকে রাস্তায় - সে ভয়ঙ্কর কষ্টের সময়। হয়তো সেই কষ্টটাকে সুদে আসলে পুষিয়ে নেয় গরমের দিনগুলোতে...

দেখতে দেখতে ফিনল্যান্ডে তিন মাস কাটলো। জুলাই এলো, আমার দিল্লী ফেরার সময়ও। এবার দিল্লীতে ফিরে অনেক কাজ - একটা বাড়ি দেখতে হবে, কিছু আসবাব কিনে সেই বাড়ি রেডি করতে হবে। হাতে বেশিদিন সময় নেই - দিল্লী থেকে যাবো কলকাতা, তারপর তো একা দিন কাটানোর দিন শেষ...

শহর থেকে শহরে - ৭

দ্বিতীয়বার প্রেমে পড়লাম - দিল্লীর। যে দিল্লীকে চিনেছিলাম অন্যের চোখ দিয়ে, সেই দিল্লী তার সমস্ত রহস্য নিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ততদিনে। একদিকে দিল্লীর অলিতে গলিতে ছড়ানো আগের সাতটা দিল্লীর গল্প, অন্যদিকে আস্তে আস্তে পরিচয় হতে থাকা দিল্লীর লোকজন, আর তার সাথে নাহারি - পায়া - তাওয়া চিকেন - বাটার চিকেনের দিল্লী। পাশাপাশি, স্ট্যান্ডার্ডে গেলে ইতিউতি ব্লাডি মেরি বা স্ক্রু ড্রাইভারের সাথে চিকেন স্ট্রোগানফ। রসিকজনের দিল্লী।

এর মধ্যে ফুটবলও জুটে গেলো। অফিসের কেউই ফুটবল নিয়ে খুব একটা আগ্রহী নয়। অগত্যা যাদবপুরেরই আরেক পাবলিকের সঙ্গে আমি যাওয়া শুরু করলাম আম্বেদকর স্টেডিয়ামে। অমল মিত্র তখন মোহনবাগানের কোচ - ডায়মন্ড ফর্মেশনে মোহনবাগান তখন দুরন্ত খেলছে। অফিস থেকে ক্যাজুয়াল লীভ নিয়ে আমরা চলে যেতুম আম্বেদকর স্টেডিয়ামে - ডিসিএম, ডুরান্ডের খেলা দেখতে। অন্যেরা আওয়াজ দিত - কেয়া পাগলপন হ্যায় ইয়ার - বংগালী লোগ - ম্যাচ দেখনে কে লিয়ে ছুট্টি লেতা হ্যায়। আমরা বলতুম - তোরা কি বুঝবি রে ব্যাটা, দেখিস তো শুধু ওভারহাইপড ডাংগুলি। এগারোটা ছেলে যখন বল নিয়ে মাঠে দৌড়য়, তার মজা আর তোরা কি বুঝবি। এই আম্বেদকর স্টেডিয়ামে একজন মজাদার লোকের সাথে আলাপ হয়েছিলো - আরেক সর্দারজী - ফুটবলপাগল একটা চরিত্র। খেলা শুরু হওয়ার আধ ঘন্টা আগে তিনি মাঠে ঢুকতেন - ট্রেডমার্ক দুটো ভেঁপু নিয়ে - সে যার খেলাই হোক না কেন। মাঠের রেগুলার দর্শকেরা সকলেই এঁকে চিনতো - ডাকাডাকি করতো। ইনি মাঠের লম্বালম্বি গ্যালারীর মাঝামাঝি একটা জায়গায় রোজ এসে বসতেন - এবং যতক্ষণ খেলা চলতো ততক্ষণ ভেঁপু বাজিয়ে জমিয়ে রাখতেন - সে মোহনবাগান গোল করলেও, বা জেসিটি গোল করলেও।

মন্টু সিং-এর বাড়িতেই থাকি। মাঝে একবার বন্ধুরা মিলে ভাবনাচিন্তা করলুম যে নিজেরা বাড়ি ভাড়া নেবো, রান্না করে খাবো। ঐক্যমত্য হল না। কারণ মণিময়। সে নাকি আরবিট খাবার খেলে মরেই যাবে। তাকে বোঝানোর চেষ্টা চলতে চলতেই মণিময় আর কিশোর অন্য চাকরি পেয়ে পাত্তারি গুটিয়ে ব্যাঙ্গালোর চলে গেলো এই অফিস আর তার বন্ডকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে। আমিও একটা চান্স পেলাম, কিন্তু বন্ডের ভয়টা কাটাতে না পেরে ভরসা পেলাম না। আর তাছাড়া কথাবার্তা যখন বেশ খানিকটা এগিয়েছে তখন জানা গেলো সেই কোম্পানির সাথে সুখরামের কিছু একটা যোগাযোগ আছে - এবং সুখরাম তখন কেলেংকারীতে অলরেডি গলা অবধি ডুবে - কাজেই বাবাগো-মাগো বলে সেই কোম্পানিকে পিছু ছাড়াতে হল।

সাতানব্বইয়েরই পুজোর সময় সম্ভবতঃ একদিন মন্টুদা ফিস্টি দিলেন - অষ্টমীর দিনই মনে হয় - রাতে রুটি আর মাংস। এমনিতে প্রকাশজীর রান্না খেয়ে খেয়ে বোর হয়ে গেলেও সেদিন ব্যাপারটা স্পেশ্যাল ছিলো। অতএব খাওয়া শুরু, খেতে খেতে খাওয়ার কম্পিটিশন শুরু। সাতজনার টেবিলে রুটি আসছে আর উড়ে যাচ্ছে। খান দশেক গড়ে মনে হয় সকলেই খেয়েছিলো, তারপর বাকিরা রিটায়ার করা সত্ত্বেও আমি আর দীপান তখনও ব্যাটিং। দুজনের সতেরো-সতেরো টাই চলছে যখন, প্রকাশজী আর একটি রুটি হাতে কাঁদো কাঁদো মুখে এসে বললেন - আটা শেষ, এবং একশোরও বেশি রুটি বানানোর পর আর তিনি টানতে পারছেন না। সেই শেষ রুটিটা দুভাগ করে খেয়ে আমি আর দীপান ম্যাচ টাই করে হাত মেলালুম। প্রকাশজীর সেই মুখটা এখনও পনে পড়ে - হাসিও পায়, বেচারার জন্যে দুঃখও হয়।

আটানব্বই সাল এলো, দিল্লীতে এক বছরও পেরিয়ে গেলো সেই এপ্রিলে। ততদিনে অন্য একটা চাপ শুরু হয়েছে - কলকাতায় তাঁর আর ভালো লাগছে না, যাদবপুরের মাস্টার্সও তাঁর শেষের পথে। তখনও আমার ভাঁড়ার ঢু ঢু। এই সময় প্রোজেক্টের ইমপ্লিমেন্টেশনের জন্যে ফিনল্যান্ড যাওয়ার অফার এলো - দেখলাম ভাঁড়ারের অবস্থা সম্মানজনক করতে এর চেয়ে বড় আশীর্বাদ নেই, কাজেই অফিসে হ্যাঁ বলে দিলুম। নতুন বাক্স কেনা, চশমা করানো (এসবের জন্যে অফিস থেকে টাকা দিত), ভিসা করানো - এই সবে কিছুদিন দৌড়ঝাঁপ গেলো। একটা বাক্সে বাড়তি কিছু জিনিস আর অন্য দুটি সম্পত্তি - সবেধন নীলমণি বেহালাটা আর ক্যাসেট প্লেয়ারটা মন্টুদার জিম্মায় রেখে একদিন লুফৎহান্‌সায় চেপে রওনা দিলুম ফ্র্যাঙ্কফুর্ট হয়ে হেলেসিঙ্কির দিকে।

আমার প্রথম প্লেনে চাপা, সেও অত দূরে।

শহর থেকে শহরে - ৬

ইন লাভ উইথ Delhi
===========

ন্যাবা, মানে অর্ণব চ্যাটার্জী, সত্যিই ন্যাবা। নইলে বেকুবের মতন কেউ বলে যে দিল্লী অতি খাজা জায়গা? জয়িতা শুধু "দিল্লী ইজ সুপার" বলে ছেড়ে দিয়েছিলো - ভালো মেয়ে, তাই। আমার সামনে বললে না...

দিল্লীতে তখন প্রাণান্তকর গরম আর লোডশেডিং, গুরগাঁওএর অবস্থা আরো ভয়ানক। দুপুরে অফিস থেকে বেরোলে মনে হত মরুভূমির মধ্যে হাফ প্যান্ট পরিয়ে খালি পায়ে কেউ দাঁড় করিয়ে রেখেছে। তার ওপর অফিসের গোয়ালের ট্রেনিং - বিরক্তিকর বোকা বোকা - বিভিন্ন প্রোজেক্ট থেকে যারা ক্লাস নিতে আসতো তাদের দেওয়া সেই ট্রেনিং-এর নমুনা দেখে নানা রকম কার্টুনের কথা মনে হত সবার আগে। ট্রেনিং আবার হত শিফ্‌টে। কিছুদিন ভোরবেলা, কিছুদিন ভরদুপুরের শিফ্‌টে - কারণ জায়গার অভাব। তো রোজ দিল্লী-গুরগাঁও ঠেঙিয়ে অফিস করে আর তার ফাঁকে রাজিন্দার নগর, করোলবাগ, কনট প্লেস - এই সব চত্ত্বরের রেস্তোরাঁয় খেতে খেতে আমার ধারণা হয়েছিলো দিল্লী নির্ঘাৎ মেয়ে। নইলে ছেলেদের মনে জায়গা বানাতে হলে পেটের মধ্যে দিয়ে ঢুকতে হয় - এই চিরন্তন সত্য দিল্লীর পক্ষে জানা সম্ভব ছিলো না।

এর মধ্যে একদিন কোনো কারণে অটোয় করে ধওলাকুঁয়া থেকে রাজিন্দর নগর আসতে হয়েছিলো - রিজ্‌ (Ridge) রোড ধরে। দিল্লীর অত কাছে, বলা ভালো দিল্লীতেই, পাহাড়ী রাস্তার মত অত সুন্দর রাস্তা দেখে চমক লেগেছিলো। তার পর, মাঝে মাঝে শনি-রবিবার কিছু করার না থাকলে একা একা শঙ্কর রোড ধরে কিছুটা উজিয়ে ওই রাস্তা ধরে হাঁটতুম। একদিকে পাহাড়ি এলাকা, বেশ ঘন জঙ্গল, অন্য দিকে খাদ, রাস্তা দিয়ে প্রচণ্ড স্পীডে ছুটে যাওয়া গাড়ি। আরাবল্লির এক্সটেনশন এই দিল্লী রিজ্‌। দৃশ্য এতই সুন্দর, যে অন্য কোনো বিপদ যে থাকতে পারে সে কথা কখনো মনে আসেনি। এরকম এক বিকেলে, তখন আস্তে আস্তে সন্ধ্যে নামছে - আমি আবার ওইদিকে ঘুরতে গেছিলুম। হেঁটে ফিরছি, শঙ্কর রোড ধরতে তখনো মিনিট কুড়ি তো হবেই - একটা গাড়ি পাশে এসে থামলো - এক বৃদ্ধ সর্দারজী গাড়ি থেকে নেমে - তু আব্‌হি ইসি ওয়াক্ত গাড়ি মে বৈঠ - বলে টেনে গাড়িতে বসালেন। কিডন্যাপিং ভেবে ভয় পাবো কিনা ভাবছি - ভুল ভাঙলো। বেটা তু পাগল হ্যায় কেয়া - তেরে ঘরমে মা-বাপ নহি হ্যায় - বলে সেই সর্দারজী পিঠে হাত রাখলেন - এই রাস্তায় এই সময়ে কেউ একলা একলা ঘোরে? শুনলাম চুরি-ডাকাতি ওই রাস্তায় খুবই সাধারণ ঘটনা। ওই সর্দারজী এবং ওঁর স্ত্রী সেদিনের আগেও এক দুই দিন আমাকে হাঁটতে দেখেছেন। সেদিন সন্ধ্যে হয়ে আসছিলো বলে ওঁর স্ত্রী ওঁকে বলেন আমাকে গাড়িতে তুলে নিতে, আর একটু ধমকাতে। আমি মুজতবা, বৃদ্ধ সর্দারজী হলেন মুইন-উস-সুলতানে, আর ওঁর স্ত্রী - কাওকাব। সাতানব্বই সালের কোনো এক সময়ে দিল্লীর পথ হয়েছিলো কাবুল - আমার কাছে।

আনজান শহর দিল্লীতে সাধারণ মানুষকে চেনা সেই শুরু।

এর পরের পরিচয় এক চায়ে-ওয়ালি মওসির সঙ্গে। তখন দুপুরের শিফ্‌ট। প্রচন্ড রোদে রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে আছি - বাস দেরী করছে। সেই বাস তখন সকালের শিফ্‌টের ছেলেমেয়েদের নামিয়ে দুপুরের শিফ্‌টের লোকদের তুলে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝেই দেরী হয়। কিন্তু সেদিন একটু বেশিই দেরী হচ্ছে। রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কেমন অস্বস্তি শুরু হল, কপাল টিপ্‌টিপ্‌ করছে, দাঁড়াতে পারছি না। উল্টোদিকের চায়ের দোকানের বুড়ি অনেকক্ষণ ধরে আমাকে লক্ষ্য করছিলো। রাস্তা পেরিয়ে এপারে এসে আমাকে প্রায় হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে গেলো নিজের দোকানে। খাটিয়ায় বসিয়ে বললো - পরের দিন থেকে আমি যেন আর রোদে না দাঁড়িয়ে থাকি - তেরেকো কুছ খরিদনেকা জরুরৎ নহি হ্যায়, সির্ফ ইঁহা বৈঠ। তার পর আর বেশিদিন দুপুরের শিফ্‌ট করতে হয়নি - কারণ এর সপ্তাহখানেকের মধ্যেই ট্রেনিং শেষ করে পার্মানেন্ট প্রোজেক্ট পেয়ে যাই - কিন্তু ওই কয়েকদিন আর রোদে দাঁড়াতে হয়নি।

এর পরের তিন-সাড়ে তিন বছরে অনেকবার দেখেছি - অটোওয়ালা, বা ডিটিসির কন্ডাক্টর, বা রাস্তার ধারের লস্যিওয়ালা - কতবার এভাবে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ বাইরে থেকে এরা কাঠখোট্টা, রসকষহীন, সবাই বলে রূঢ়। কিন্তু এরকম দু চারটে ঘটনা আমাকে কলকাতার কথা মনে পড়িয়ে দিত।

এর মাঝে একদিন বন্ধুরা মিলে গেলাম পুরনো দিল্লী ঘুরতে। ঘরে গান শোনার মত কিছু ছিলো না - লক্ষ্য চাঁদনী থেকে শস্তায় একটি টেপ-রেকর্ডার কেনা আর একই সাথে পুরনো দিল্লী ঘুরে আসা। কনট প্লেস থেকে তখন ভটভটি যেত পুরনো দিল্লী অবধি - সেই ভটভটি চেপে দিল্লী গেট পেরিয়ে পুরনো দিল্লীতে জামা মসজিদের সামনে। মোগল স্থাপত্যের সাথে প্রথম পরিচয় সেখানে। প্রথমে জামা মসজিদ - এদিক ওদিক ঘুরে দেখলাম কোনের দিকে একটা ছোট কাউন্টারে টিকিট কেটে লোকে কোথাও একটা যাচ্ছে। আমরাও গেলাম। অন্ধকার সরু সিঁড়ে বেয়ে উঠছি তো উঠছিই - বেশ কিছুক্ষণ পর বেরোলাম জামা মসজিদের একটা তোরণের মাথায়। সেখানে দাঁড়ালে সামনেই চোখে পড়ে শাহজাহান-আওরঙ্গজেবের দিল্লী, আরো দূরে পূবদিকে যমুনা, আর দূরে দক্ষিণদিকে সার এডুইন লুটিয়েন্স এবং সার হার্বার্ট বেকারের তৈরী নতুন দিল্লী - অষ্টম দিল্লী।

দুপুরের খাওয়া - আসল অথেন্টিক মোগলাই খাওয়া হবে। খোঁজ কোথায় করিম্‌স। জামা মসজিদের পাশের গলির মধ্যে তস্য গলি - গলি কবাবিঞা - সেই গোলকধাঁধার মধ্যে এক কোণে করিম্‌স - বাহাদুর শাহ জাফরের রাঁধুনীর বংশের রেস্তোরাঁ। বাইরে থেকে দেখলে যতটা অভক্তি আসবে, ভিতরে একবার খেলে সেই অভক্তি কোথায় চলে গিয়ে আসবে তার দশ-বিশ-পঞ্চাশগুণ ভক্তি। আহা সে কি স্বাদ। তার বর্ণনা দেওয়া আমার অক্ষম কলমে সম্ভব নয় - কিন্তু কেউ কখনো দিল্লী যাচ্ছে শুনলে তাকে অন্ততঃ একটা টিপ্‌স দেওয়াটা আমার অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে।

তারপর একবার চৌরি বাজারের বইয়ের দোকান, আরো এগিয়ে ঘন্টেওয়ালার মিষ্টির দোকান ঘুরে ঢুকলাম লালকেল্লায়। তখনো দুটাকা করে টিকিট। ভিতরটা প্রথম দর্শনে অত ইমপ্রেসিভ লাগে না, তবে দেওয়ান-ই-আম বা দেওয়ান-ই-খাস তার যৌবনকালে কী ছিলো সেটা আজ তার বার্ধক্যেও দেখলে আন্দাজ করা যায়। মোতি মসজিদও। কিন্তু যে জিনিসটা আমাকে পাকাপাকিভাবে দিল্লীর প্রেমে পড়িয়ে দিলো - সেটা হল লালকেল্লার সন-এ-লুমিয়ের। লাইট অ্যাণ্ড সাউন্ড শো আগেও দেখেছি, পরেও আরো দেখবো। দিল্লীতেই আজ শুনেছি পুরানা কিল্লায় নতুন সন-এ-লুমিয়ের শুরু হয়েছে - আরো হাইটেক। কিন্তু দিল্লী নিয়ে লেখাটা শুরু করেছিলাম যে লাইনটা দিয়ে - যুদ্ধ-রক্ত-প্রতিহিংসা-প্রেম-যৌনতা-বিলাস থেকে ট্র্যাজেডির শহর দিল্লী - সেই দিল্লীকে প্রথম চেনালো লালকেল্লার এই লাইট-অ্যাণ্ড-সাউন্ড। আমি চোখের সামনে দেখলাম দিল্লীর পত্তন, জহান-আরার তৈরী সন্ধ্যে বেলায় আলো ঝলমল মীনা বাজারের হসি-কলোরোল, শুনলাম মোতি মসজিদের গায়ে ফেলা আলোর মধ্যে ভেসে আসা আওরঙ্গজবের শেষ প্রার্থনা - ক্ষমা করো মরাঠা - ক্ষমা করো রাজপুত। দেখলাম খোলা তরোয়াল হাতে নাদির শাহকে রঙ মহলের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে যখন দিল্লীতে চলছে উন্মত্ত হত্যালীলা, লক্ষ্ণৌ থেকে আসা বিদ্রোহী সেপাইদের সামনে বৃদ্ধ বাহাদুর শাহ জাফর, আর তারপর হুমায়ুনের সমাধিতে নিরস্ত্র বাহাদুর শাহ-এর ছেলেদের নৃশংস হত্যা...

And I fell in love - for the second time.

শহর থেকে শহরে - ৫

ফলিং ইন লাভ (উইথ Delhi)
===============


মন্টু সিং - মন্টুদা - ওরফে মনোজ চ্যাটার্জী।

কস্মিনকালেও সর্দারজী নয়, নেহাতই আলাভোলা বাঙালী। একসময় হোটেলে চাকরি করতেন। একটা অ্যাকসিডেন্টে পা অকেজো হয়ে যাওয়ার পর নিজের বাড়িতেই হোটেল খুলেছেন, এই আমার মতন যাযাবরদের জায়গা দেওয়ার জন্যে। বাড়িতে মন্টুদা, বউদি, প্রাক্তন মিলিটারি ডাক্তার জ্যেঠু, বউদির এক বোন (মানে মন্টুদার শালী) আর মন্টুদার পুঁচকে ছেলে - সে এক যন্তর। রাঁধুনী প্রকাশজী - এর কথাও বলবো সময় হলে।

তো এই মন্টুদার বাড়িতে ছুটির দিনে দুবেলা আর অফিসের দিনে একবেলা পেটচুক্তির খাওয়া আর ঘরের কড়ারে থাকা। খরচ প্রথমে যতদিন একলা ঘরে ছিলাম ততদিন মাস মাইনের প্রায় অর্ধেক পড়ে যেত। পরে অন্য বড় ঘরগুলোর একজন "অনসাইট" চলে যাওয়ায় সেই ঘরে ঢুকে গেলাম, খরচও কমলো। মাছের ঝোলে মাছটা খুঁজে বের করতে হত, তরকারির মধ্যে প্রায়ই ঢ্যাঁড়স - তাতে কী? বসু লজের চেয়ে একশো গুণে ভালো। আর রাজিন্দার নগরের পিছনেই পুসা রোড পেরোলে আফজল খাঁ আর গফ্ফর খাঁ মার্কেট - কখনো ইচ্ছে হলে সেদিকে চলে গেলেই গরমাগরম তাওয়া চিকেন আর রুমালি - সেই তাওয়া চিকেনের কথা ভাবতে ভাবতে এখনই জিভে জল চলে এলো। আবার নিউ রাজিন্দার নগরের দিকে হেঁটে গেলে শঙ্কর রোডের ওপর সিনধ্‌ সুইট্‌স - সেখানে মট্‌কেওয়ালে লস্যি খেলে আর ডিনারের দরকার হয় না - একটা পেল্লায় সাইজের এক কিলোর হাঁড়ির মুখটা মালাই দিয়ে ঢাকা, আর ভিতরে দুরন্ত স্বাদের লস্যি। অত বড় হাঁড়ি ওভারডোজ হয়ে যাবে? গ্লাসে খান। অবশ্য সাইজে সেও কম নয় - পেল্লায় গ্লাস, তাতে লস্যি ঢেলে তার ওপর চামচ দিয়ে ছেঁকে তোলা মালাই। আফজল খাঁ মার্কেটে ঢোকার মুখে বাংলা সুইট্‌স - বাঙালীর সঙ্গে সম্পর্ক নেই অবশ্য - ওই নামটাই যা। সেখানে রাবড়ি - মানে বাংলা ক্ষীর। সেখানেই শিখলাম যে ক্ষীর মানে পায়েস, আর দিল্লীর রাবড়ি মানে দুধে চোবানো ব্লটিং পেপার নয়, খাঁটি মাখোমাখো ক্ষীর, ভিতরে পেস্তা-বাদাম-ইলায়েচি। প্লেন দুধ চাইলে তাও পাবেন - রাস্তার ওপর কড়াইতে ঢেলে কনস্ট্যান্ট জ্বাল দিচ্ছে - চাইলেই আবার সেই পেল্লায় গ্লাসে ঢেলে দেয়, মিশিয়ে দেয় পেস্তা-বাদাম আর ওপরে এক ইঞ্চি পুরু সর - রোগাভোগা বাঙালীর জন্যে সেও প্রায় ডিনারের সামিল। শঙ্কর রোড ধরে পূবদিকপানে হেঁটে যান, আধ ঘন্টায় পৌঁছবেন গোলমার্কেট - সেখানে রয়েছে ছোটখাটো বেঙ্গল সুইট হোম - খাস বাঙালী মিষ্টির দোকান। প্রথমদিকে ক্যালকাটা টী ক্যাবিনও খুঁজেছিলাম, পাইনি। জটাধর বক্সীর সাথে দেখাও হয়নি।

ওদিকে শঙ্কর রোডের ওপর সারি সারি তন্দুরি/কাবাবের দোকান - মশলামাখানো আস্ত আস্ত মুরগী শিকে গেঁথে ঝুলিয়ে রেখেছে - সর্দারজীরা গাড়ি থেকে নামছে আর কিনছে। পার্থ সেই ছালছাড়ানো-নুনমাখানো মুর্গীর চেহারা দেখে নাম দিলো "ন্যাংটো মুর্গী"। বড় খানদানি রেস্তোরাঁ চাইলে চলে যান কনট প্লেস - সেখানে আছে স্ট্যান্ডার্ড বা গেলর্ডের মত ভারতীয় কাম কন্টিনেন্টাল খাবারের জায়গা, আবার মহারাণীর মতন খাস মোগলাই খানার জায়গা। করোলবাগের দিকে কোথাও ছিলো নিরুলাজ - তখনও পিজ্জা হাট ভারতে আসেনি - প্রথম পিজ্জা, এবং সেই স্বাদ পিজ্জা হাটের কোনো পিজ্জায় নেই - hot shoppe pizza খেলাম এই নিরুলাজ-এ। সাথে banana-split আইসক্রীম।

প্রকাশজীর রান্নায় বোর হয়ে গেলে এই সবই ছিলো আমাদের টাইমপাস্‌। তখনও পুরনো দিল্লী যাইনি। আসল মোগলাই রানার সঙ্গে পরিচয় হতে তখনো কিছুদিন বাকি।

কিন্তু তখনই দিল্লী মনের মধ্যে ঢুকতে শুরু করেছে - পেটের ভিতর দিয়ে;-)

শহর থেকে শহরে - ৪

দিল্লী। যুদ্ধ-রক্ত-প্রতিহিংসা-প্রেম-যৌনতা-বিলাস থেকে ট্র্যাজেডির শহর দিল্লী। দিল্লীর সঙ্গে আমার পরিচয় চাকরিসুত্রে, সাতানব্বইয়ের সেপ্টেম্বরে। যে দিল্লী আমার গায়ে কাঁটা দেওয়ায়, সেই দিল্লী আমি প্রথম দেখেছি অন্যের চোখ দিয়ে। নিজে যখন থেকেছি, তখন নিজের চোখে সেই দিল্লীকে খোঁজার চেষ্টা করেছি - দিল্লীর পথে ছড়িয়ে থাকা ইতিহাসের মধ্যে। তবে সেও কিছুদিন পরে।

থাকার ব্যবস্থা করতেই বেশ হয়রানি গেছিলো। বড়মামার পরিচিতিতে প্রথম গিয়ে উঠলাম অশোক রোডে সি আই টি ইউ-এর একটা আপিসে - অসংখ্য বড় বড় বাংলোর মধ্যে কোনো একটা বাংলোর আউটহাউজ সেটা। একখানা ঘর, সেখানে এক সর্দারজী এবং আরেক ভদ্রলোক থাকেন - নিজেরাই রান্না করে খান। ঘরময় ছড়ানো পোস্টার, রঙ তুলি। "আপহি উদয়ভাইয়াকে ভাঞ্জে হো" বলে সর্দারজী তো হাত বাড়িয়ে এগিয়ে এলেন - যতদিন খুশি ওখানে থাকতে পারি এই বলে। কিন্তু ওই দুই কমরেডের থাকার অবস্থা দেখে ওঁদের ওপর আরেকটা বোঝা হতে ইচ্ছে করলো না। গেলাম সেই মায়ের ছোটকাকার অমুকের তমুকের ফোন নাম্বারে ফোন করে জনকপুরীতে এক হোটেলে - তিনি ওখানে কথা বলে রেখেছেন। উরিবাবা, গিয়ে দেখি একটা ঘরে খান আষ্টেক বিছানা, সেগুলোর ওপর দিয়েই ঘরে চলাফেরা করতে হয় - কারণ খাটগুলোর পাশে খালি জায়গা বলতে আর কিছু নেই। ওখান থেকে কেটে পড়াই শ্রেয় মনে হল। খুঁজতে খুঁজতে গেলাম এমপি হোস্টেলে - সেই ট্রেনে একসাথে আসা দুই বন্ধুর একজন সেখানেই উঠেছে। সেখানে খোঁজ পাওয়া গেল বসু লজ-এর, সেটার আবার নাম আগে থেকেই শোনা, কাজেই ভরসা পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখলাম মোটামুটি থাকতে পারার মত ঘর - যদিও আরো তিনটে খাট আছে, তবুও হাঁটা চলার জায়গা রয়েছে।

সারাদিন এদিক ওদিক আস্তানা খোঁজার চেষ্টায় ঘুরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ঘুম ভাঙলো রাত্তির বারোটা নাগাদ হঠাৎ - চোখে আলো পড়ছে, কানের পাশে বকরবকর। দেখি আমার খাটের একপাশে আমি শুয়ে আছি, অন্য পাশে অন্য লোকজন বসে, পাশের খাটেও জনা তিনেক, সামনে টেবিলে বোতল খোলা - মজলিশ চলছে, আর তার সাথে পরের দিনের কাগজে টাইম্‌স অব ইন্ডিয়ার কোন খবরগুলো কপি মারা যায় সেই আলোচনা। আমাকে উঠে বসতে দেখে এক "স্টাফ-রিপোর্টার" বল্লেন - আ-আপনার অ-অশুবিধা হশ্‌শে না তো ডাডা? শালা! মাঝরাত্তিরে আমার বিছানায় বসে ক্যাচরম্যাচর করে আমার ঘুম ভাঙিয়ে আমাকেই জিগ্গেস করছে অসুবিধা হচ্ছে কিনা!!! ওদিকে সংখ্যালঘু আমি আর অসুবিধার কথা মুখ ফুটে বলি কী করে...কাঁধ ঝাঁকিয়ে ঘন্টা দুই বারান্দায় বসে মশার কামড় খেলুম আর সাংবাদিকদের চৌদ্দ গুষ্টির উদ্ধার করতে করতে সিগারেট ফুঁকলুম। তাঁরা নিজের নিজের কপি শেষ করে শোওয়ার উয্যুগ করার সময় আমিও গুটিগুটি গিয়ে শুয়ে পড়লুম, উইথ আ ডিটারমিনেশন - যে পরের দিন অন্য ব্যবস্থা করতেই হবে।

পরের দিন অফিসে জয়েন করার দিন। গোলমার্কেট থেকে যেতে হবে আইটিও। গিয়ে দেখি যাদবপুরের মাস্টার্স ক্লাসের আরো জনা চারেক হাজির। এবং তারা বেশ খুশি খুশি - মানে রাতে ভালোই ঘুমিয়েছে। জিগ্গেস করাতে বললো রাজিন্দার নগরে (তখনো জানি না সেটা কোন মুলুকে) দিব্যি ভালো জায়গায় পেয়িং গেস্ট হয়ে উঠেছে ওরা। ঝামেলা ঝঞ্ঝাট কিছুই নেই। সেদিন জয়েনিং ফর্মালিটির পর বাসে করে গুরগাঁও নিয়ে গেল - সেখানে পরের তিন মাস ট্রেনিং হবে। ট্রেনিং সেন্টারটা দেখি শিবপুর বা যাদবপুরের ল্যাবের চেয়েও ওঁচা। আর ট্রেনিং-এর নমুনার কথা নাই বা বললাম। এই গোয়ালে যারা ঢুকেছে বা নাম শুনেছে তারা ওই ট্রেনিং-এর "মূল্য" হাড়ে হাড়ে বোঝে। সে যাক - সেসব সুখদুঃখের কথা পরে আবার আসবে। সেদিন ট্রেনিং সেন্টারের ক্যান্টীনের সাথেও পরিচয় হল - মানে ঘাসের ঘ্যাঁটের মধ্যে কাঁচা পনীর ঢাললে যে পালক-পনীর হয় সেটাও শিখলাম।

ফিরলাম যাদবপুরের বন্ধুদের সাথে - সেই রাজিন্দর নগরে যে বাড়িতে ওরা উঠেছে সেখানে। একটা ঘর পাওয়া গেলো - তখনকার মত ওটাই স্বর্গ হাতে পাওয়ার সমান। তড়িঘড়ি বসু লজ থেকে শিফ্‌ট হলাম ওল্ড রাজিন্দর নগরে।

মন্টু সিং-এর বাড়ি, পরের বছর দেড়েকের ঠিকানা।



শহর থেকে শহরে - ৩

কলেজ জীবন, বিশেষ করে বি ই কলেজ জীবন নিয়ে লিখতে গেলে সেটা একটা মহাভারত ইন ইটসেল্ফ। মিশনারী বয়েজ ইস্কুলের গুডি গুডি বয় কী করে বি ই কলেজের (অনেকের মনে) "টেরর" হয়ে উঠলো, আর মেয়ে দেখলে দশ হাত দূরে দাঁড়িয়ে আকাশের চাঁদ-সুজ্জির দিকে তাকানো পাবলিক কী করে ফার্স্ট ইয়ারেই লট্‌কে গেলো। পরে কখনো লিখবো। তার আগে, কলকাতা থেকে বেরোই - প্রথমবার, একা একটা অন্য শহরে - দিল্লী।

হিন্দুস্তাঁ কা দিল্‌ হ্যায় ইয়ে দিল্লী
================

বি ই কলেজের ফোর্থ ইয়ারে চাকরি জুটে গেলো, পোস্টিং দিল্লী। আবার এদিকে যাদবপুরে মাস্টার্স করার সুযোগও জুটে গেলো। মরতে দিল্লী কেন যাবো ভেবে যাদবপুরেই ঢুকে গেলাম। গেরোর ফের - সেখানেও যে চাকরিটা জুটলো (সেই একই কোম্পানি, ওই সময়েই মোটামুটি লরি নিয়ে কলেজে এসে ছেলেপুলে নিয়ে যাওয়া শুরু) সেও সেই দিল্লী। বউ (তখনও আন-অফিসিয়ালি) চাট্টি সেন্টু দিলো - এঁকলা ফেঁলে রেঁখে দিঁল্লী যাঁচ্ছো; তাকে বোঝালুম- ওরে পাগলী, দিল্লী না গেলে বে-টা করবো কী করে?

সাতানব্বই সালের এপ্রিলের কোনো একটা শুক্রবার যাদবপুরের মাস্টার্স ক্লাসের তিনজন বন্ধু চড়ে পড়লুম রাজধানী এক্সপ্রেসে। সঙ্গে একটা সুটকেস আর একটা ঢোল (ব্যাগ)। বাকি দুজন হিসেবী, আগে থেকে বাড়ির বন্দোবস্ত করে যাচ্ছে, এবং অন্য চাকরির ব্যবস্থাও রয়েছে - এই চাকরি যদি পছন্দ না হয়। দিল্লীতে আমার চেনা কেউ নেই, শুধু বড়মামার পরিচিতিতে অশোক রোডের কাছে কোথাও সি আই টি ইউ-এর একটি অফিসে যেতে হবে এইটুকু জানি। তারপর কী হবে, কোথায় থাকবো, কী খাবো - সেখানে গিয়ে দেখা যাবে। আর হ্যাঁ - মায়ের ছোটকাকার খুড়শ্বশুরের ভাইয়ের (মানে সেরকমই কাছের আর কী) কারো একটা বাড়ি আছে পশ্চিম দিল্লীর কোথাও, তাঁর সাথে দেখা করলে হয়তো একটা ব্যবস্থা হতেও পারে। টেনশন - আছে, সঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন জায়গায় যাওয়ার উত্তেজনাও। হোস্টেলে থাকার অভ্যাসে বাড়ি থেকে দূরে যাওয়া নিয়ে ততটা কষ্ট নেই, তবে অন্য কষ্টটা আছে - ট্রেন ছাড়ার সময়ে মেয়েটার মুখটা সেই যে পিছু নিলো, আর ছাড়তেই চায় না।

দিল্লীতে আস্তানা খুঁজে বের করা একটা আস্ত গল্প। সেও ব্যবস্থা হল। কিন্তু সেই দিন, রাতে একটা হোটেলে খেয়ে ঘরে ফেরার সময় প্রথমবার মনে হল - এত বড় শহরটাতে আমি সম্পূর্ণ একা। আমি কাউকে চিনি না। এখানে আমার খোঁজ করার কেউ নেই। অথচ, দু হাজার সালে যখন দিল্লী ছাড়ি, তখন গলার কাছে একটা দলা পাকিয়ে উঠেছিলো। মাত্র সাড়ে তিন বছরেই। হয়তো দিল্লীর প্রতিটা রাস্তায় ছড়ানো ইতিহাস, হয়তো দিল্লীর খাবারদাবার, হয়তো দিল্লীতে বসানো প্রথম সংসার, হয়তো সবকিছু মিশিয়ে তৈরী হওয়া একটা অনুভূতি। তবে সবচেয়ে বেশি যেটা মনে থেকে গেছে সেটা হল প্রতিটা বাক্যের শুরু এবং শেষে খিস্তি আওড়ানো তথাকথিত কাঠখোট্টা এবং "ঘুটনোপে অকল্‌ওয়ালা" জাঠ আর সর্দারজীদের বন্ধুত্ব। বাসে ট্রামে সবাই আপনার সাথে ওই ভাষাতেই কথা বলবে - প্রাথমিক ধাক্কা কাটিয়ে আপনাকেও ওই ভাষাতেই উত্তর দিতে হবে - আঁতেল বাঙালীর কাছে কালচারাল শক্‌বিশেষ। কিন্তু আস্তে আস্তে দেখতে পাবেন যে ওরা আপনার জন্যে জান কবুল করবে। "দোস্তি" ওদের কাছে ঈশ্বরের সমান, বা হয়তো তার চেয়েও বড়।

দিল্‌ওয়ালোঁ কা শহর হ্যায় ইয়ে দিল্লী। এর গল্পই বলবো।

শহর থেকে শহরে - ২

চিরকাল মা একটু গজগজ করতো - বাসরাস্তা থেকে এত দূরে বাড়ি বলে। অথচ আমার কখনো খারাপ লাগেনি। বাসের আওয়াজ নেই, গাড়ির প্যাঁ পোঁ হর্ন নেই, ধুলো নেই, ধোঁয়া নেই - গরমকালের দুপুরে বড়জোর কাঁধে বাক্স ঝুলিয়ে রঙিন বরফ বিক্রি করা ফেরিওয়ালার ডাক - "আ-ই-স-কি-রি-ম"। চব্বিশ বছর ওই নিশ্চুপ নিঃঝুম জায়গায় থেকে এমন অভ্যেস হয়ে গেছিলো যে একটু বেশি কসমোপলিটান জায়গায় গেলে হাঁফ ধরে যেত - আওয়াজ, আলো, ধোঁয়া থেকে কখন পালাবো ভাবতাম। অথচ আজ ওখানেই অটোর ভটভট আর লোকনাথের চিৎকারে কানে আঙুল গুঁজে থাকতে হয়। থাকি, কিন্তু অভ্যেস হয় না।

কুড়ি বছর আগে সেই দিনগুলোতে সকালে উঠে দৌড়দৌড়ি শুরু হত - আটটার মধ্যে বেরোতে হবে, ইস্কুলের বাস আসবে সাড়ে আটটায়। মঙ্গলদার রিক্সা করে রাণীকুঠি অবধি যেতুম। পথে পড়তো রাণীকুঠির পোড়ো বাড়িটা - শোনা কথা ওটা নাকি পুঁটুরাণীর বাড়ি। পুঁটুরাণী - মানে সাবর্ণ রায়চৌধুরির মেয়ে - আদিগঙ্গা-পাড়ের বিস্তীর্ণ এলাকা সেই মেয়ের বিয়েতে যৌতুক দেওয়া হয়েছিলো - তাই পুঁটুরাণী থেকে বদলাতে বদলাতে নাম হল পুঁটিয়ারী। বাড়িটা দেখে মনে হত ভুতের বাড়ি - একদিন আঁকার ইস্কুল থেকে ফেরার সময় আমি আর বাপি সাহস করে ঢুকে পড়লুম। পোড়ো বাড়ি, কিন্তু বসতিহীন নয় - কেউ কেউ ঝুপড়ি বানিয়ে রাস্তার ধারে থাকতো, কেউ ওই বাড়িতে - পোড়ো হলে কী হয়েছে, বাড়ি তো! তাদের পছন্দ হয়নি আচমকা দুটো উটকো ছোঁড়া ঢুকে পড়াতে...বেরিয়ে এসে এদিক সেদিক ঘুরে আবিষ্কার করলুম পুঁটুরাণীর পর এই বাড়িটার মালিকানা ছিলো "ইস্ট ইন্ডিয়া ফিল্ম স্টুদিও"-র - একটা শুকিয়ে যাওয়া ফোয়ারায় তাদের নাম খোদাই করা।

প্রাইমারী ইস্কুল শেষ করে সেকেন্ডারি ইস্কুলের সময় বাস ধরতে যেতে হত নেতাজীনগর - আর একটু কাছে - আর মঙ্গলদার রিক্সা নয় - এবার থেকে হেঁটে। ইস্কুল বাস মিস্‌ করলে ধ্যাদ্ধেড়ে ৪১/১ ভরসা - সোজা ইস্কুলের সামনে - আর নয়তো অন্য বাস ধরে হাজরা মোড়ে নেমে এগারো নম্বর বাস। সিক্সে পড়ি যখন, একদিন গড়িয়াহাটের কাছে ইস্কুল বাস জবাব দিলো - পকেটে পয়সা নেই, কিন্তু কয়েকজন বন্ধু মিলে টুক করে একটা এস১৫-তে চেপে বসলুম। কন্ডাক্টরও বুঝলো ইস্কুলের ছেলে - ইস্কুলের বাস তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আর ইউনিফর্মটা ছিলো ইউনিক। অন্য যাত্রীরা চাঁদা করে আমাদের ভাড়া দিয়ে দিলো। এখন কেউ দেবে? সন্দেহ আছে।

এর পর থেকেই আমাকে প্রতি মাসের শুরুতে দুটো করে টাকা দিত মা, এরকম ঘটনা ঘটলে যাতে বাসের ভাড়াটা দিয়ে দিতে পারি। সেই টাকাগুলো জমাতুম - দুর্গাপুজোর সময়ও অল্প কিছু জমাতুম, কালিপুজোর বাজি না পুড়িয়ে মা'র কাছ থেকে গোটা দশ-পনেরো টাকা নিয়ে জমাতুম - এই করে করে আস্তে আস্তে একটা ক্রিকেট ব্যাট, একটা হকি স্টিক কিনেছিলুম...

ওই সিক্সেই একদিন দুপুরবেলা সেকেন্ডারি সেকশনের প্রিফেক্ট এসে বল্লএন - ইস্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হচ্ছে, খবর এলো ইন্দিরা গান্ধীকে গুলি করা হয়েছে। রাস্তাঘাট বন্ধ, বাস চলছে না, আর বাড়িতে ফোনও নেই যে ফোন করে বলবো - আর বললেই বা কে এসে নিয়ে যাবে? অগত্যা আমি, আসিফ আর বৌদি (মানে কৌশিক) হাঁটা দিলাম। কোথাও বাস জ্বলছে, কোথাও ঝুপড়ি, কোথাও ভাঙা কাঁচ ছড়িয়ে - তারই মধ্যে অলি গলি ঘুরে প্রায় দেড় দু ঘন্টা হেঁটে বাড়ি - মা চমকে উঠলো - তখনও খবরটা শোনেওনি কেউ।

দিদি ওই সময়ে বি ই কলেজে চলে গেছে, বাড়িটা ফাঁকা, মারামারি করার কেউ নেই। সপ্তাহের শেষে বাড়ি আসতো, নানা রকম গল্প হত। একদিন দিদি কলেজ লাইব্রেরী থেকে একটা বই এনে দিলো। একটা সপ্তাহ ঘোরের মধ্যে কাটলো পাভেল করচাগিনের সঙ্গে। মাথা বিগরোনোর সেই শুরু। দিদি কলেজে নাটক করতো, গানের গ্রুপে ছিলো - আমি বাড়িতে বসে সেই গানগুলো শিখতুম - হেমাঙ্গ বিশ্বাস, সলিল চৌধুরীতে ডুবে থাকার শুরুও সেই সময়েই। সল্টলেকে দ্বাদশ পার্টি কংগ্রেসে একটা এগজিবিশন হল, বি ই কলেজ থেকে বেশ কিছু মডেল গেলো, দিদিরাও দিয়েছিলো একটা - শহরের জলের লাইন, রাস্তার প্ল্যানিং-এর ম্যাপ কম্পিউটারে ধরে রাখলে কোথায় কোথায় কী সুবিধা হতে পারে সেই নিয়ে। একদিন ডেমোর সময়ে একজন ধুতি-পাঞ্জাবী পরা, ছোটখাটো কিন্তু টকটকে চেহারার একজন ভদ্রলোক এলেন - মন দিয়ে শুনলেন, প্রচুর প্রশংসা করলেন। আমাকে ওখানে দেখে প্রশ্ন করলেন আমি কে - ওদিকে টিভিতে সেই মুখ দেখা বলে আমি তখনও হাঁ করে তাকিয়েই রয়েছি, উত্তর দেওয়ার কথা ভুলে। তবে তখনই হয়তো মাথায় ঢুকে গেছিলো কোনোভাবে - যে কম্পিউটার নিয়েই পড়তে হবে আর সেটা বি ই কলেজেই।

ক্লাস টেনে পড়ি - তখন দিদির বিয়ে হয়ে গেলো - সেই প্রথম "নিজে পছন্দ করে" বিয়ে দেখার সৌভাগ্য। ইস্কুলটা তো গোঁড়া মিশনারী, তায় শুধু বয়েজ স্কুল - কাজেই ওই সময়ে আমি নেহাতই গুডি গুডি বয়। তখনো সিনেমা হলে দেখেছি গান্‌স অব ন্যাভারোন বা চ্যাপলিনের সিনেমা - মানে "নিজে পছন্দ করা" একটা বিশাল কিছু (এবং সম্ভবতঃ সেই টার্গেটটাও সেই সময়েই স্থির হয়)। দিদিরা বন্ডেল রোডের কাছে একটা বাড়ি ভাড়া নিলো - রাস্তাটার নাম খুব সম্ভবতঃ রাইফেল রেঞ্জ রোড। একদিন দিদি ওদের বাড়িতে নেমন্তন্ন করলো - রান্না করে খাওয়াবে। সেদিন ইস্কুলে খেলা ছিলো, খেলার শেষে বালিগঞ্জ ফাঁড়ির কোয়ালিটির সামনে দাঁড়িয়ে আছি - বিমানদা এসে নিয়ে যাবে - অথচ কারো পাত্তা নেই। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আমি বন্ডেল রোড ধরে হাঁটা দিলুম - খুঁজে খুঁজে রাস্তাটা বেরও করলুম, নম্বর মিলিয়ে বাড়িটাও। আমি জানি ওরা থাকে দোতলায়, কিন্তু বাড়ির সামনেটা অন্য লোকের - দোতলায় কি করে ঢোকে সেটা ভেবে না পেয়ে, এবং আস্ত গর্দভের মত কাউকে জিজ্ঞেসও না করে ফের হাঁটতে হাঁটতে কোয়ালিটির সামনে এসে দাঁড়ালুম, কাউকে না দেখে বাসে চেপে বাড়ি। রাত্তির দশটার সময় একটা ট্যাক্সি এসে বাড়ির সামনে দাঁড়ালো - দিদি নেমেই জিজ্ঞেস করলো "মিতুল ফিরেছে"? উত্তর শুনে সেই গেটের সামনে রাস্তার ওপর বসে হাউহাউ করে কান্না - বেচারি সন্ধে থেকে রাত্তির অবধি টেনশন করেছে। রান্নাগুলো অবশ্য নষ্ট হতে দিইনি, পরেরদিন গিয়ে খেয়ে এসেছিলুম।

হায়ার সেকেন্ডারীও একই ইস্কুলে - শুধু ক্লাস শুরু হত সকাল সাতটায়, বাড়ি থেকে বেরোতুম ভোর সাড়ে পাঁচটায়। শীতকালে আকাশে চাঁদ থাকতো। পাঁচটা পঞ্চাশের ৪১/১ ধরলে সাড়ে ছটা নাগাদ ইস্কুলে পৌঁছতুম। তখন প্রায়ই আমরা হেঁটে ফিরতুম - মাঝে মাঝে সাইকেলে ইস্কুল যেতুম - তিরিশ বছরের পুরনো হারকিউলিস - চট করে অন্য কেউ চালাতে পারতো না।

বেহালা শিখতে শুরু করলাম। মিউজিয়ামের পাশের সাস্তা দিয়ে ঢুকে খুঁজে খুঁজে মার্কুইস স্ট্রীট বের করা - সেখানে ব্রাগাঞ্জার দোকান। ওদের তৈরী বেহালা, ওই দোকান থেকে কেনা ডাব্লু সি হানিম্যানের বই। টোনির বয়স তখন অনেক কম, দোকানে বেশিরভাগ সময়ে থাকতো ওর বাবা, তবে কখনো কোনো দরকারে বাজনা নিয়ে গেলে টুকটাক সারানো বা টিউনিং করতো টোনি। কিছুদিন আগে ছেলের জন্যে হাফ-সাইজ বেহালা কিনতে গিয়ে সেই টোনিকে দেখে মনে হল কত বছর পেরিয়ে গেছে। টোনি কিন্তু ওর সেই পুরনো খদ্দেরদের মনে রেখেছে।

প্রথম মিছিলে হাঁটাও এই সময়েই - সংহতি মিছিল - এসপ্ল্যানেড থেকে পার্ক সার্কাস ময়দান - এখন মনে নেই কী ব্যাপারে ছিলো, তবে অত লোকের মিছিলে হাঁটার সেই শুরু, আজও শেষ হয়নি। গলা খুলে স্লোগান দেওয়ার শুরুও সেই সময়ে, সেই মিছিলে। আজও চলছে।

তার পরের চারটে বছর সম্ভবতঃ সেরা সময় - গানে-স্লোগানে-মিছিলে হু হু করে কেটে যাওয়া...

শহর থেকে শহরে - ১

কলকাতা শহরতলি - মাঝে কয়েক বছরের জন্যে শিবপুর, দিল্লী, হেলসিঙ্কি, কলোরাডো স্প্রিঙস, সিলভার স্প্রিঙ-গেথার্সবার্গ থেকে বিলেতের নিউক্যাসল আপন টাইন হয়ে ফের এই কলকাতা শহরতলিতে এসে পুরো বৃত্ত সম্পূর্ণ। এই বৃত্তের গল্পই লিখবো - শহরগুলোর গল্প। কোনোটা ভালো, কোনোটা লাগেনি, কোথাও মনে হয়েছে কলকাতাতেই আছি। কোনোটা মনে পড়ে না, ইচ্ছেও হয় না মনে করার, কোনোটা এখনও টানে। সেই শহরগুলোর গল্প। আজ কলকাতা শহরতলির গল্প।

যখন ছোট ছিলাম, তখন সেটা কলকাতা ছিলো না, ছিলো পূর্ব পুটিয়ারী, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা। আবছা আবছা মনে পড়ে আশেপাশে নিজেদের বাড়িটা নিয়ে সাকুল্যে তিনটে বাড়ি - বাপিদের আর বুয়াইদের (এই দুজন আমার সেই বয়সের বন্ধু) - আর ধু ধু মাঠ, বাড়ির সামনে বাঁশবাহান, সন্ধে হলেই সেখানে শেয়ালের ডাক। সবচেয়ে কাছের বাসরাস্তা হেঁটে মিনিট কুড়ি। লোডশেডিং হলে একতলা বাড়িতে লন্ঠনের আলোয় বাবা, মা, ঠাকুমা, দিদি আর আমি বসে থাকতুম। প্রচুর পুকুর ছিলো, লক্ষ্মীপিসীরা একটু দূরে থাকতো, দিনের বেলাটা আমি প্রায়সই ওদের বাড়িতে থাকতুম, কারণ দাদু তখন পুরোপুরি বিছানায়, ঠাকুমা অসুস্থ, মা ঘর সামলে, দাদুকে সামলে আর আমাকে দেখে উঠতে পারতো না - লক্ষ্মীপিসী তাই আমাকে নিয়ে যেত। এই লক্ষ্মীপিসীই আমাকে সাঁতার শিখিয়েছিলো - তখন দু বছর বয়স মোটে - আমাদের ক্লাসিক গ্রাম স্টাইলে শেখা সাঁতার - মানে পুকুরের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেওয়া।

সত্তরের দশকের অনেক গল্প শুনি - আবছা মনে আছে বাঁশবাগানের ওপারে দুম দুম আওয়াজ, আর একটু পরেই রক্ত মেখে একজনের টলতে টলতে বাঁশবাগান থেকে বেরিয়ে মাটিতে পড়ে যাওয়া। একদিন পুলিশ এসেছিলো বাড়িতে, সার্চ করতে - জবরদস্তি লফ্‌ট থেকে প্যাকিংবাক্স নামিয়ে খুলে ফেলেছিলো, আর চড়াই পাখিস বাসাগুলো ভেঙে সারা ঘরে ছড়িয়ে গেছিলো...বাচ্চা চড়াইগুলোর চিঁ চিঁ, আর বড়গুলোর সারা ঘরে উR্হে বেড়ানো...পুলিশ অবিশ্যি ক্ষমা-টমা চেয়ে সেই ঘর পরিষ্কার করে দিয়ে যায়...

এখানেই চব্বিশ বছর - কুড়ি মিনিট হেঁটে বাসরাস্তায় পৌঁছে বাস ধরে ইস্কুলে যাওয়া, পরে সাইকেলে যাদবপুর...বাড়ি একতলা থেকে দোতলা হয়, আশেপাশের সব মাঠ নতুন নতুন বাড়িতে ভর্তি হয়ে যায়, নিশ্চুপ নিঃঝুম অরবিন্দ পার্ক অনেকটা নেতাজীনগরের চেহারা নিয়ে নেয়। পুকুরগুলো একটাও আর নেই, বাঁশবাগানও নেই, নতুন নতুন লোক - এখন সকলকে চিনিও না - সেই লক্ষ্মীপিসী কোথায় জানি না, বাপি রেলে কাটা পড়েছে, বুয়াইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ নেই - ব্যস্ত হাউজিং এস্টেটের মতন অবস্থা যেখানে পাশের ফ্ল্যাটের লোককেও অনেকে চেনে না। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে কলকাতা হয়ে গেছে, পিন কোড ৭০০০৯৩।

বাসরাস্তাটা শুধু সেখানেই রয়ে গেছে।

শহর থেকে শহরে - আবার

অনেকদিন আগে লিখতে শুরু করেছিলাম - শহর থেকে শহরে ঘোরার গল্প। মাঝে বন্ধ হয়ে গেছিলো - এই কিছুদিন আগে বাংলালাইভের পাতায় হঠাৎ এন্থু পেয়ে গিয়ে শেষ করলাম। সেই লেখাগুলোই এখানে তুলে দিচ্ছি।

Thursday, December 30, 2010

উপলব্ধি

চারদিন ছুটি নিয়ে বাড়িতে ছিলুম আজ আপিসে এসে উপলব্ধি হল যে আসল ছুটি আপিসেই

আপিসে রান্না করে খেতে হয় না, দস্যি মেয়ের পিছনে ভাতের থালা বা দুধের গেলাস নিয়ে একতলা-দোতলা দৌড়তে হয় না, মেকানোতে শ-খানেক ইস্ক্রুপ লাগাতে হয় না, চোদ্দবার করে চার্লি অ্যাণ্ড লোলা পড়তে হয় না, ইসে করার সময় বাথরুমের সামনে দাঁড়িয়ে উকুনে বুড়ির গপ্পো শোনাতে হয় না, ঘুম পাড়ানোর জন্যে এক ঘন্টা ধরে "ফাইভ হান্ড্রেড মাইল্স" বা "উই শ্যাল ওভারকাম" শোনাতে হয় না...

কবি শুধু নিজের "আঠারো বছর" দেখেছিলেন - অন্যের তিন-সাড়ে তিন বছর দেখলে লাইনগুলো বদলে দিতেন নির্ঘাৎ

Thursday, November 11, 2010

মেঘ, পাহাড়, ঝরনা - সিকিম

পুজোর সময় এই তল্লাটে থাকবো না সেটা আগস্টেই ঠিক করেছিলাম কিন্তু কলকাতার বাকি লোকজন একই সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে ফেলায় ট্রেনের টিকিট হল ওয়েটিং লিস্ট প্রথমে প্ল্যান ছিলো অরুণাচল যাবো - তাওয়াং, ভালুকপং ইত্যাদি ট্রেনের টিকিটও সেই হিসেবে কাটা - ১৫ই অক্টোবর কাঞ্চনজঙ্ঘায় শেয়ালদা-গৌহাটি আর ২২ তারিখ ঐ ট্রেনেই ফেরা

কিন্তু অরুণাচলের গুড়ে বালি, কারণ কোত্থাও থাকার ব্যবস্থা করা গেলো না একবার ভাবলুম ভূটান, কিন্তু সে এমন খরচের ব্যাপার যে শেষে সিকিম ঠিক হল গ্যাংটক হয়ে গুরুদংমার, ইয়ুমথাং আর ফেরার আগে পেলিং নেট ঘেঁটে ফরচুনা বলে এক ট্যুর অপারেটরের খোঁজ পাওয়া গেলো, যাদের লাচেন এবং লাচুংএ হোটেল আছে, গ্যাংটক-লাচেন-গুরুদংমার-চোপতা ভ্যালী-লাচুং-কাটাও-ইয়ুমথাং-জিরো পয়েন্ট-গ্যাংটক (২ রাত, ৩ দিন) ট্যুরের ব্যবস্থা এরা করে - থাকা/খাওয়া/পারমিট/যাতায়াত সবই এদের দায়িত্ব - গ্যাংটকে পৌঁছে এদের হাতে নিজেদের সঁপে দিলেই নিশ্চিন্ত, এবং খরচও রিজনেবল (অন্তত: কলকাতার কিছু চেনা ট্র্যাভেল এজেন্ট যা হাঁকছিলো তার তুলনায়) সাথে দময়ন্তীও জুটে গেলো - গাড়ির খরচটা ভাগাভাগি করা যাবে এদের ট্যুরটাই বুক করা হল এই করতে করতে পুজো এসে গেলো, যাওয়ার টিকিট তখনও ওয়েটিং লিস্ট

জয়দাদার (ভলভো সার্ভিস) টিকিট কাটা ছিলো, কিন্তু তাও তেরো তারিখ তৎকালের একটা চেষ্টা করলুম - কপাল ভালো - কাঞ্চনকন্যাতে পাওয়া গেলো - পনেরো তারিখেরই, রাতের ট্রেন ভাগ্যিস গেলো, নইলে দিনের বেলা কাঞ্চনজঙ্ঘায় গেলে সেই যে মেজাজ বিগড়োত তাতে পুরো ট্রিপটাই বাজে কাটতো (কেন, সে পরে আসছি)

পনেরো তারিখ - অষ্টমীর বাজার তার আগের তিন দিন ধরে আনন্দবাজার এবং স্টারানন্দে কলকাতার তুমুল জ্যামের গুচ্ছ গুচ্ছ খবর বেরোচ্ছে গুচ্ছের লোকজন নাকি প্লেন/ট্রেন মিস্ করছে রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা আটক থাকছে ভয় টয় পেয়ে বাড়ি থেকে রওনা দিলুম পাঁচটা নাগাদ - ট্রেনের সময় সাড়ে আটটা (যদিও শুরুতে আমার প্ল্যান ছিলো সাড়ে তিনটে-চারটের সময় বেরোব - ভাগ্যিস সেটা করিনি) কোথায় জ্যাম, কোথায় কি এমনি দিনে বাড়ি থেকে শেয়ালদা লাগে ঘন্টাখানেক, সেদিন মোটামুটি আধ ঘন্টা/পঁয়ত্রিশ মিনিটে শেয়ালদা পৌঁছে গেলুম ওয়েটিং রুমে তুমুল ভিড়, কারণ আরো অনেক সাবধানী লোক আছে - যাদের অনেকে সাড়ে দশটায় দার্জিলিং মেল ধরবে বলে পাঁচটায় বেরিয়ে পড়েছে মানে, ভিড়ভর্তি ওয়েটিং রুমে তিন ঘন্টা কাটানো - সাথে দুজন পায়ে চরকি লাগানো পাবলিক ধৈর্য্যের নোবেল থাকলে সেটা আমাদের পাওয়া উচিত

ট্রেনে উঠে প্রথম সাক্ষাত একটি ইঁদুরের সঙ্গে - সহযাত্রীদের আগেই সাইড বার্থের সীটে ব্যাগ রাখতেই দুদ্দুর করে সীটের তলা থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক একটু দৌড়োদৌড়ি করে ফের সীটের তলায় কোথায় ঢুকে গেলো (কদিন আগে বাবা-মা ভ্যালী অব ফ্লাওয়ার্স গেছিলো - সেই ট্রেনেও একই দৃশ্য ছিলো - তবে সেই ইঁদুরটা একটু কুঁড়ে ছিলো মনে হয়, কারণ মা চটি দিয়ে সেটাকে মেরেছিলো - বাবা-মায়ের ছবির লিস্টে সেটাও আছে) মোদ্দা ব্যাপারটা হল সীটের নীচে ব্যাগ রাখা গেলো না, পেল্লায় রুকস্যাকগুলোকে বাংকে তুলতে হল - রাতে ঘাড়ে ব্যথা হওয়ার চান্স সত্বেও

কাঞ্চনকন্যায় প্যান্ট্রি-কার নেই, তাই বাড়ি থেকে প্যাক করে আনা লুচি-আলুমরিচ খেয়ে সেই রাত্তিরে ঘুমনো, পরের দিন সকালে নিউ জলপাইগুড়ি ট্রেন আধ ঘন্টা লেট

সকালে এনজেপি পৌঁছনোর পর প্রথম যুদ্ধ ট্যাক্সির জন্যে। প্রিপেইড বুথে একখানাও ট্যাক্সি নেই - কারণ প্রিপেইডের রেট হল সতেরোশো চল্লিশ, আর সেটা ঠিক হয়েছে ২০০৫ সালে। তারপর তেলের দাম বহুবার বেড়েছে। এখন কোনো গাড়িওয়ালা প্রিপেইড বুথে গাড়ি দেয় না। তায় পুজোর ছুটির মরসুম, পীক্ ট্যুরিস্ট সীজন - আড়াইয়ের কমে কেউ কথাই বলে না। তাও একটু দরদাম করে বাইশশো করা গেলো। ট্যাক্সি বিনে গতি নাই, আর শেয়ারে যাওয়াও মুশকিল, অতএব ...

রাম্বি বাজারে উপোস ভেঙে গ্যাংটক পৌঁছতে দুপুর দুটো। সেবক রোড গত বছরেও দেখেছি দিব্যি সুন্দর - এখন মহানন্দা স্যাংচুয়ারি পেরনোর পরই পুরো নৌকোযাত্রা। ড্রাইভার বললো - "এ আর কি দেখছেন, যেখানে যাচ্ছেন সেখানে যে কি আসছে তা তো জানেন না
... "

দুপুরে গ্যাংটক পৌঁছে কিছু খেয়ে এক লোকাল ট্যাক্সিওয়ালার সঙ্গে এদিক ওদিক ঘোরা হল - একটা স্তুপ আছে কাছেই, তার পাশে টিবেটোলজি মিউজিয়াম - অবিশ্যি এটাতে ঢুকতে পারলাম না, কারণ হাতে বেশি সময় ছিলো না। সেখান থেকে গেলুম "বন ঝকরি ফলস অ্যাণ্ড এনার্জি পার্ক" - জলপ্রপাতটা মন্দ নয় (তবে সিকিমে প্রতি মোড়ে একখানা দেখতে পাওয়া যায়, আর নামীদামীগুলোর চেয়ে অনামা প্রপাতগুলো কোনো অংশে কম নয় - ইন ফ্যাক্ট "ফলস অব সিকিম" বলে অনায়াসে একখান ছবির বই বের করা যায়)। কি ভিড় এখানে - আর ৯৯% পাবলিকই বাঙালী। তারা সবাই একের পর এক লাইন দিয়ে প্রপাতের সামনে পোজ দিয়ে দাঁড়ায় আর সঙ্গীসাথীরা ছবি তোলে। অনেকের আবার একটাতে সখ মেটে না, বিভিন্ন পোজে দাঁড়িয়ে ছবি তোলায়। বাদবাকি কারো ছবি তোলার কোনো দরকার নেই কিনা
... আর সবচেয়ে জ্বলে যখন শাটার টেপার মুহুর্তে কেউ হুড়মুড়িয়ে সামনে এসে যায় ... হিসেব কষে শাটার স্পীড/এক্সপোজার সেট করার পর এরকম ঘটলে ইচ্ছে করে এদের কানে কাঠপিঁপড়ে ছেড়ে দিই।

বন ঝকরি থেকে গেলুম রঙ্কা মনাস্টেরি। রুমটেক একটু দূর, সেদিনই যাওয়ার সময় ছিলো না, তাই এই নতুন মনাস্টেরিটাই দেখতে গেছিলুম। মন্দ নয়, বেশ বড়সড়, তবে বড় হলেই কি আর রুমটেক হয় - রুমটেকের ঐতিহ্যই অন্য
... তাও নেহাত ফেলনা নয়, ভিতরের মূর্তিগুলো বেশ সুন্দর। আর ফেরার পথে রাস্তায় এক জায়গা থেকে উল্টোদিকের পাহাড়ে পুরো গ্যাংটক শহরটা দেখা যায়।

এই প্রসঙ্গে একটা কথা লিখি - সিকিমে দেখা বুদ্ধমূর্তি বা জাতকমূর্তিগুলো নিয়ে। বেশিরভাগই দেখতে বেশ হিংস্রগোছের। তার একটা কারণ আছে।
তিব্বতে বৌদ্ধধর্ম প্রচারে যে কয়েকজনের নাম সবার প্রথমে আসে তাঁরা হলেন আচার্য শান্তরক্ষিত, পদ্মসম্ভব এবং অতীশা বা অতীশ দীপঙ্কর। তিব্বতের রাজা প্রথম ডেকে নিয়ে যান শান্তরক্ষিতকে। শান্তরক্ষিত প্রথমবার কিছুদিন থাকার পর কিছু রাজকর্মচারী ওঁর নামে অপপ্রচার শুরু করে - ঝড়/মড়ক ইত্যাদি ঘটনা ওঁর জন্যে হচ্ছে বলে। শান্তরক্ষিত তখন ফিরে আসেন। কয়েক বছর পর রাজা ফের ওঁকে ডেকে নিয়ে যান। এই দ্বিতীয় ফেজে শান্তরক্ষিত কোনো কারণে তিব্বতী দেবদেবী/ভূত ইত্যাদিদের ভয় পেতে শুরু করেন, এবং রাজাকে অনুরোধ করেন আচার্য পদ্মসম্ভবকে নিয়ে যেতে। পদ্মসম্ভব উড়িষ্যার কোনো মঠের আচার্য ছিলেন, এবং তন্ত্রে (বৌদ্ধধর্মেরই) পারদর্শী ছিলেন। কথিত আছে যে পদ্মসম্ভব তিব্বতে গিয়ে তন্ত্র দিয়ে তিব্বতী দেবদেবী/ভূত ইত্যাদিদের হারিয়ে দেন আর বৌদ্ধধর্ম প্রচারে সাহায্যের আশ্বাস দিতে বাধ্য করেন। এর পরেই শান্তরক্ষিত গোটা তিব্বতে মঠ প্রতিষ্ঠা করেন, বই অনুবাদ করে, বই লেখেন। পদ্মসম্ভব তিব্বতে গুরু রিম্পোচে নামেও পরিচিত। যে কোনো তিব্বতী মঠে দেখবে এই গুরু রিম্পোচের মূর্তি রয়েছে। এবং যেহেতু তিব্বতী buddhism অনেকটাই তন্ত্রঘেঁষা, তাই ঐ দেবদেবী/ভূত/তন্ত্রমন্ত্র ইত্যাদি মিস্টিক্যাল ব্যাপারের ছাপ অনেক বেশি (সিংহলী buddhism -এর তুলনায়)। পরবর্তীকালে অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে গেছিলেন - সেই সময় বৌদ্ধধর্মের প্রভাব কিছুটা কমে আসছিলো। এবং দীপঙ্কর নিজেও তন্ত্রে আগ্রহী ছিলেন। কাজেই সেই ছাপটাও কিছুটা পড়েছিলো।

এটুকু ঘুরে সেদিনের মতন ট্যুর শেষ। হোটেলে ফিরে আসার পর ফরচুনার লোক এলো - পরের দিন সকাল দশটায় তারা আমাদের হোটেল থেকে তুলে নেবে কথা হল। সেই মতন দময়ন্তীকে জানিয়ে দিলুম।

১৭ই অক্টোবর, যুদ্ধ শুরু

এ যুদ্ধ যে কি যুদ্ধ, তার কোনো ধারণাই ছিলো না।

দশটার সময় ফরচুনা থেকে লোক আসবে বলে সাতসকালে খেয়েদেয়ে তৈরী হতে গিয়ে দেখতে পেলুম অত গোছানোর মধ্যে ঋতির কোনো জামা আসেনি! বাকি সব এসেছে - সোয়েটার, ওয়াটারপ্রুফ, কট্সউলের গেঞ্জি - বাট্ নো জামা। ভাগ্যক্রমে ফরচুনা থেকে ফোন করে জানালো যে দশটা নয়, ওরা এগারোটায় আসবে। দময়ন্তীকে সেটা জানিয়ে আমি হাঁটা লাগালুম গ্যাংটকের এমজি মার্গের দিকে - কোনো দোকান থেকে কিছু জামা কিনতে হবে। জামা কিনে ওপরে টিবেট রোডে উঠতে গিয়ে প্রায় দম বেরিয়ে যায় আর কি - হোটেলে ঢোকার মুখে দেখি দময়ন্তী এসে গেছে। এগারোটা বাজলে চেক-আউট করে লবিতে বসে আছি তো বসেই আছি। ফরচুনাকে ফোন করলে বলে - এই আসছি, পাঁচ মিনিটমে পঁওছ যায়েঙ্গে - কিন্তু কেউ আর আসে না - সাড়ে এগারোটা বাজতে চললো। তখন ফের ফোন করাতে বলে কিনা ট্যাক্সি পাচ্ছি না। হতভাগা - আমরা আগের দিন থেকে জানি যে দশমীর দিক ট্যাক্সি পাওয়া মুশকিল হবে - নেপালীদের দশেরা মানে কেউ রাস্তায় নামবে না - আর এখানকার ট্র্যাভেল অপারেটর, তারা কিনা সে খবর রাখে না? প্রায় পৌনে বারোটা নাগাদ একজন এলো একখানি অল্টো নিয়ে (নর্থ সিকিমের গাড়িগুলোকে সকাল আটটার পর গ্যাংটক শহরের ভিতরে আসতে দেয় না, লাচেন স্ট্যান্ড অবধি ট্যাক্সি নিয়ে যেতে হয়)। পাঁচজন লোক (একটা না হয় কোলে যাবে, কিন্তু তার পরেও চারজন) প্লাস লাগেজ - আর একখান অল্টো!!! ঠিক হল দুবারে যাবো। প্রথমবার কিছু লাগেজ নিয়ে আমি আর ঋক, পরের বার বাকিরা। লাগেজ তুলতে গিয়ে ট্যাক্সির জানলার ওপরের প্লাস্টিকের শেড্ ভাঙলো (ট্যাক্সি ড্রাইভার আর ফরচুনা তারপর সেটা কিভাবে অ্যাডজাস্ট করলো সে খবর আমরা জানি না), ব্যাগদুটোকে ছাতের ওপর বাঁধেনি বলে রাস্তায় একটু এগোতেই একখানা ধড়াম করে পড়লো - সেগুলোকে তুলে ভিতরে চালান করা হল। লাচেন স্ট্যান্ডে পৌঁছে বাকিদের ফোন করে শুনি নর্থ সিকিমের গাড়িটাই নাকি তখনো আসেনি। তবে পরের ট্রিপে সুমনা, ঋতি আর দময়ন্তী আসার পরেই সেই গাড়ি চলে এলো - একখান নতুন বোলেরো - তখনও টেম্পোরারি পারমিট লাগানো।

সেই গাড়িতে রওনা তো দিলুম। গ্যাংটক শহর ছাড়ার পরই বুঝলুম শিলিগুড়ির ট্যাক্সিওয়ালা কি বলতে চেয়েছিলো
... নর্থ সিকিম হাইওয়েতে রাস্তা বলতে কিছু নেই। ওটা "নেই-রাস্তা"। পাথর, বোল্ডার, কাদা - এই দেখা যায় শুধু। পিচ? কারে কয়? পাশের পাহাড় থেকে হুড়মুড়িয়ে ঝরণা নেমে আসছে রাস্তার ওপর, তলায় বোল্ডার, তার ওপরেই গাড়ি চলছে। কোথাও ষাট ডিগ্রীতে নীচে নামছে, কোথাও উঠছে। প্রতি উঁচুনীচু ভাঙা জায়গায় ড্রাইভারে মুখ পুরো চূণ। জানা গেলো সে (মানে পাসাং) শিলিগুড়ি-গ্যাংটক রুটে ট্রাক চালায়, এই পথে কখনো আসেনি, রাস্তাও চেনে না, কোথায় কি করতে হবে তাও জানে না। গাড়ির শর্টেজ ছিলো বলে ফরচুনা ওকে অন্য একটা হোটেল থেকে তুলে এনে ভিড়িয়ে দিয়েছে। সে গাড়ি চালাবে না কপাল চাপড়াবে সেটাই ঠিক করতে পারছিলো না। ফরচুনার আরেকটা জীপকে সামনে রেখে সে যাচ্ছে।

দুপুরে খাওয়ার কথা ফোডোং বলে একটা জায়গায়। ওদিকে সেভেন সিস্টার্স (ফলস) দেখার পর সামনের সেই জীপ হাওয়া। ফোডোংএ তাকে কোথাও দেখা গেলো না, পাসাং জানেও না কোথায় কি পাওয়া যাবে - ওদিকে ক্ষিদে পেতে শুরু করেছে। বেশ কিছু দূর গিয়ে একটা "ঘাট" (
সরু রাস্তা যেখানে একটা একটা করে গাড়ি পাস করে। আর এই ঘাটটা বেসিক্যালি পাঁকে ভর্তি - ফুটখানেক গভীর কাদা, একবারে গাড়িটাকে সেই কাদাভর্তি হাফ কিলোমিটারের বেশি পেরোতে হবে। দাঁড়িয়ে পড়লেই মুশকিল - চাকা আর এগোবে না) ছিলো - সেখানে দাঁড়িয়ে ঠিক করা হল এখানেই যা পাওয়া যাবে খেয়ে নেওয়া যাক - লঙ্কা আর বেগুনের তরকারি, আর চিকেনের ঝোল - খেতে খেতে সেই সবুজ জীপ এসে হাজির - তারা ফোডোং-এ কোনো এক হোটেলে দাঁড়িয়ে খেয়েছে - এমনই বেয়াক্কেলে যে নতুন ড্রাইভারকে এগুলো যে জানিয়ে দিতে হয়, সেই বুদ্ধি নেই।

তো এই রকম ভয়ানক রাস্তা দিয়ে চুংথাং পৌঁছতে পৌঁছতে অন্ধকার হয়ে গেলো। পথে পেরোলাম মঙ্গন, রঙ্গরঙ্গ বলে ছোট ছোট কয়েকটা জায়গা। অ্যাজ ইউজুয়াল অতীব সুন্দর দৃশ্য - কিন্তু পথের অবস্থা জাস্ট ভয়াবহ।

চুংথাং থেকে রাস্তা দুভাগ হয়েছে। একদিকে লাচেন চু নদীর ধার ধরে লাচেন, অন্যদিকে লাচুং চু-র ধার দিয়ে লাচুং। আমরা যাবো লাচেনের দিকে।

একদিকে অনেক নীচে লাচেন চু ঝড়ের মত ছুটছে, ফুঁসছে (গোটা সিকিমে এই নদীর গর্জনটা কমন - যেখানেই যাও না কেন - হয় তিস্তা, নয় কালী নদী, নয় রঙ্গিত, নয়তো এদিকে লাচেন চু বা লাচুং চু), অন্যদিকে পাথুরে পাহাড়, এর মাঝে অসংখ্য হেয়ারপিন বেন্ড। এরকম ভাঙা রাস্তা না হলে বলতুম "এই পথে গাড়ি চালিয়ে থ্রিল আছে" - এরকম পাহাড়ি পাকদন্ডী রাস্তাতেই গাড়ি চালাতে আমার বহুত ভালো লাগে - হাইল্যান্ড্স বা লেক ডিস্ট্রিক্ট বা ইয়র্কশায়ারে এমনটাই - কিন্তু সেখানে এরকম ভাঙা রাস্তা নয়। অনেকটা জায়গা জুড়ে "ব্যাক-কাটিং" চলছে - মানে পাহাড়ের গায়ে ব্লাস্টিং - রাস্তা চওড়া করার জন্যে - আর সেই জন্যে রাস্তার অবস্থা এরকম ভয়ানক।

চুংথাং পেরনোর পর মোটামুটি একটা কনভয় টাইপ হয়ে গেলো - প্রায় বারোখানা গাড়ি পর পর চলছে - সবাই লাচেনের দিকে। মাঝে মাঝে মিলিটারি লরি বা জীপ যাচ্ছে। দুলতে দুলতে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে লাচেন পৌঁছলুম প্রায় সাড়ে আটটা নাগাদ। সন্ধ্যে থেকেই বৃষ্টিও চলছে, সাথে ঠান্ডা হাওয়া।

হোটেলে ঢুকে আরেক ধাক্কা। ভেজা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে ঘর, টিম টিম করে আলো জ্বলছে, বাথরুমে জল নেই কো, গীজারে আলো জ্বলে কিন্তু তাতে জল গরম হয় না। আমাদের ঘরে দু পিস কম্বল, তাতে সকলের হবে না বলে আরেকখান চাইলাম। এক্সট্রা কম্বল মনে হয় ঐ এক পিস্ই ছিলো - কারণ তার পর দময়ন্তী একটা চেয়েছিলো - পায়নি। ব্লো হীটারও মনে হয় এক পিস্ই ছিলো - সেও একটা ঘরে দেওয়াতে আর কেউ পায়নি। অথচ ফরচুনার ওয়েবসাইতে বড় বড় অনেক কিছু লেখা আছে - ঘরে অমুক আছে, তমুক আছে
... আদতে কিসুই নেই। জল কখন আসবে জিগ্গেস করলে বলে "আ যায়েগা"। গরম জল চাইলে বলে "আভি দে রাহে হ্যায়"। ঐ অবধিই। পাওয়া কিছুই যায় না। দশ মিনিটে খাবার দেবে বলে প্রায় ঘন্টাখানেক লাগিয়ে দেয়। শুনলাম ওদের নাকি একটা গোটা দিন ধরে টাওয়ার (মোবাইল) ছিলো না বলে কজন আসছে কখন আসছে কোনো খবরই পায়নি। আমরা পৌঁছনোর পর রান্নাবান্নার ব্যবস্থা হয়েছে। কিন্তু তাতেও বাকি ব্যাপারগুলো - যেমন জল নেই, গীজার চলে না, কম্বল নেই ইত্যাদির কোনো এক্সকিউজ হয় না। দময়ন্তী তো ওদের ধরে পেল্লায় ধমক দিলো বেশ কিছুক্ষণ ধরে ...

ঠান্ডা যদিও সেরকম কিছু ছিলো না, তবে পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরণার জলে কাজকম্মো করা সম্ভব নয়। গায়ে তখনো ঠান্ডা লাগেনি - মানে ওরকম ঠান্ডায় আমি অভ্যস্ত (ছিলুম), আর সেই অভ্যেস ভুলিনি এখনো। আমি গেছি একখান জামার ওপর একটা সামার জ্যাকেট (হাত কাটা, অনেকগুলো পকেটওয়ালা - ক্যামেরার লেন্স ইত্যাদি রাখার পক্ষে খুব উপযোগী) পরে, সুমনাও একটা সামার জ্যাকেট গায়ে, দমুরও তাই। কুচেগুলোকে অবশ্য সোয়েটার পরানো হয়েছে। আমাদের দেখে বাকি বাঙালী গ্রুপগুলো বেশ অবাকই হয়েছিলো।

১৮ই অক্টোবর, ২০১০ - গুরুদংমারের দিকে

রাতেই ড্রাইভারসকল জানিয়ে দিয়েছিলো যে একদম ভোরে বেরোতে হবে। হিমালয়ের খুব কমন ফিচার - দুপুর বারোটার পর আবহাওয়া আনপ্রেডিক্টেবল হয়ে পড়ে, হাওয়া দেয়, বৃষ্টি পড়ে। যারা পাহাড়ে চড়ে তারা সকলেই ভোরে বেরিয়ে বারোটার আগে ক্যাম্পে ফিরে আসার চেষ্টা করে। এখানেও তাই। ইন ফ্যাক্ট, গুরুদংমারের আগে মিলিটারি চেকপয়েন্টে বেলা ন'টার পরে আর ঢুকতে দেয় না। কাজেই সাড়ে পাঁচটা নাগাদ বেরোনোর প্ল্যান হল।

সাড়ে চারটের সময় উঠে দেখলুম গীজারে জল নেই। জলের কল থেকে আধ বালতি জল বেরিয়ে বন্ধ হয়ে গেলো। আর একদম বরফগলা জল। মুখ ধুতে গিয়ে মনে হল দাঁতগুলো খুলে হাতে চলে এসেছে। গরম জল চাইলাম - সেই একই "আভি দে রাহে হ্যায়"। আধা ঘন্টারও বেশি পরে আধ বালতি গরম জল পাওয়া গেলো - চারজনে সেটাই ভাগ করে চালালুম। ব্রেকফাস্ট? রাস্তায় হবে। বেরোতে বেরোতে পৌনে ছটা।

লাচেন নদীর ধার দিয়ে গাড়ি চললো - দুলকি চালে। এই ওঠে, এই নামে, এই দোলে, গাড্ডায় পড়ে
... তখন অল্প অল্প আলো ফুটছে, আর দূরে প্রথম বরফঢাকা চূড়াগুলো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। আগের রাতে বৃষ্টির পর আকাশ ঝকঝকে নীল, মাঝে সাদা মেঘ, আর সামনের সবুজ পাহাড়গুলোর পিছনেই বরফঢাকা চূড়া। মোড় ঘুরলেই ঝরণা বয়ে যাচ্ছে, রাস্তার ওপর দিয়েই। বোল্ডারের ওপর দিয়ে গাড়িগুলো এক এক করে পার হয়। আর দেখলাম "ইন্ডিয়ান ফল কালার্স'"- এক একটা জায়গায় পাহাড়ের গায়ে গাছগুলো লাল-হলুদ হয়ে রয়েছে। ছবি তুলতে গেলে একটু সময় দিয়ে তুলতে হত - সেই সময় ছিলো না, আর গাড়ির ঝাঁকুনিতে চলন্ত গাড়ি থেকে তোলাও সম্ভব ছিলো না। আস্তে আস্তে ওপরে উঠছি - গাছ কমতে কমতে শুধু পাথুরে পাহাড়ী এলাকা - স্নো লাইন ক্রমশ: কাছে আসছে, বরফঢাকা চূড়াগুলোও। মাঝে মাঝে দু একটা মিলিটারি ক্যাম্প, আর আমাদের কয়েকটা গাড়ি ছাড়া রাস্তায় শুধু মিলিটারি লরি। চোদ্দ হাজার ফুটে একটা ক্যাম্পে পাস দেখাতে হল, সেটা পেরনোর পরেই থাংগু বলে একটা ছোট গ্রাম - সাড়ে চোদ্দ হাজার ফুট। গ্রামে ঢোকার মুখেই একটা ছোট ব্রীজ, নীচ দিয়ে লাচেন চু বয়ে যাচ্ছে ঝড়ের মতন। থাংগুতে চা খেলুম, সঙ্গে পপকর্ন - ঐ উচ্চতায় কম অক্সিজেন লেভেলে পপকর্ন নাকি উপকারী। ব্রেকফাস্টের জন্যে দোকানী মেয়েটি একটা পাত্রে কিছু মোমো প্যাক করে দিলো - বললো ফেরার পথে পাত্রটা দিয়ে যেতে, "নেহি তো পাপা মারেগি"। একটা ছোট বোতল ব্র্যান্ডিও কিনে নিলুম - যদি দরকার পড়ে।

থাংগুর পর পুরোপুরি স্নো-লাইনের ওপর। রাস্তার ধারে আর গাছ নেই, কিছু কিছু জায়গায় অনেকটা হেদারের (
heather) মতন লাল লাল ফুল টাইপের হয়ে রয়েছে। বাকি শুধু পাথর, বোল্ডার আর ব্যারেন ল্যান্ড, এদিক ওদিক বরফ। আস্তে আস্তে আরো ওপরে ওঠার সাথে সাথে বরফের পরিমাণ বাড়তে শুরু করলো। তারই মধ্যে একটার পর একটা মিলিটারি ব্যারাক। একটা আর্টিলারি ইউনিট রয়েছে, আশেপাশে প্রচুর বাঙ্কার, কোথাও বোর্ডে লেখা "এক গোলি, এক দুশমন", কোথাও বা "রেসপেক্ট অল, সাসপেক্ট অল"। এই সব পেরোতে পেরোতে পৌঁছলুম ষোল হাজার ফুটের কাছাকাছি। আরেকটা মিলিটারি ক্যাম্প আর আবার পাস দেখানো। পাসাং গেলো পাস দেখাতে, আমরা গাড়িতে বসে রইলুম। সামনে যতদূর চোখ যায়, শুধু একটা বরফের মরুভূমি শুয়ে রয়েছে।

জানলায় টকটক শুনে দেখি এক আপাদমস্তক গরম কাপড়ে ঢাকা চোখে ঢাউস গগল্স পরা এক মিলিটারি "আফ্সার" আমায় ডাকছেন। জানলা খুলতে ঋতিকে দেখিয়ে জিগ্গেস করলেন "এই বাচ্চাটার বয়স কত?" - আমি বল্লুম তিন। তখন তিনি বল্লেন - "আপনাদের একটা রিকোয়েস্ট করছি - এটা মেডিক্যাল অ্যাডভাইস। আপনারা এই বাচ্চাটাকে নিয়ে ওপরে যাবেন না। এখান থেকে গুরুদংমার আরো ষোল কিলোমিটার, আর প্রায় আরো দু হাজার ফুট উঁচু। সেখানে অক্সিজেন লেভেল ভীষণই কম। প্রায় সমস্ত বাচ্চাদের সমস্যা হয়। আমরা পাঁচ বছরের কম বয়সী বাচ্চা আর বয়স্কদের যেতে বারণ করি।"

আমি বল্লুম যে এই মেয়ে তো জুংফ্রাউয়ে বারো হাজার ফুট অবধি ঘুরে এসেছে, এখানেও এতদূর এসেছে, কোনো সমস্যা হয়নি তো। তো তিনি বল্লেন - "আপনারা যেতেই পারেন, তবে আপনাদের রিস্কে। যদি কিছু হয়, আমাদের এখানে কোনো মেডিক্যাল ফেসিলিটি নেই যে দরকারে আপনাদের সাহায্য করবো। আমাদের এক্সট্রা গাড়িও নেই যে আপনাদের তাতে করে হাসপাতাল পাঠাবো। বাকি ট্যুরিস্ট গাড়িগুলোকেই বড়জোর অনুরোধ করতে পারি, আর এই রাস্তায় পাঁচ-দশ কিলোমিটার স্পীডে কখন হাসপাতালে পৌঁছবেন সেটা তো বুঝতেই পারছেন।"

সেদিনই নাকি আরেকটি বাচ্চার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছিলো, এবং কিচ্ছু করতে না পেরে তার বাপ-মা ওখানে কেঁদে ভাসিয়েছে। ঋতি তখনও অবধি ঘুমোচ্ছিলো - অনেক ভোরে উঠেছে, আর ওর এখনও পাহাড়/বরফ দেখে আনন্দ পাবার বয়স হয়নি। আমরা একটু ঘাবড়ে গিয়ে ওকে ডাকলুম - জিগ্গেস করা হল যে শরীর খারাপ লাগছে কি না। ঋতি প্রথম কথাই বললো যে মাথায় ব্যথা করছে। হাতে-পায়ে-গলায়-কানে নয়, সোজা মাথায় ব্যথা - যেটা হল কম অক্সিজেন লেভেলের প্রথম সিম্টম। ঋকও বললো মাথায় ব্যথা করছে। ওদিকে আমাদের বাকি কারোরই কোনো প্রবলেম হচ্ছে না।

তখন একবার ভাবলুম যে ফরচুনার তো তিনটে গাড়ি এসেছে, আর অন্য দুটো গাড়িতেই ছোট বাচ্চা আছে। তাহলে একটা গাড়িতে বাচ্চাগুলো আর একজন করে বড়দের যদি নীচে নামিয়ে দেওয়া হয় (ঐ ক্যাম্পেও বসে থাকা যাবে না বলেছিলো মিলিটারি), তাহলে বাকি দুটো গাড়িতে বড়রা যারা যেতে পারবে তারা গুরুদংমার অবধি গিয়ে আবার নেমে আসবে। আরেকটা গ্রুপের সাথে সেই মত কথাও হল, কিন্তু শেষমেষ প্ল্যানটা লাগলো না (কেন, সেটা বুঝেছিলুম আরো পরে) - আর ঐ ষোল হাজার ফুট থেকেই গুরুদংমারকে টা-টা করে নীচে নেমে আসতে হল।

দু:খ রয়ে গেলো - অতদূর গিয়েও খালি হাতে ফিরতে হল বলে। আর একটা বোকামি করলুম - ঐ ক্যাম্পে ছবি তোলা বারণ, কিন্তু ওখান থেকে আর কিলোমিটারখানেক গেলেই ঐ বরফের মরুভূমির ছবিগুলো অন্তত তুলে আনা যেত
...

ফেরার পথে দু এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছবি তুল্লুম। চোপতা ভ্যালীর দিকে এক চক্কর দিয়ে আসা হল। চোপতা ভ্যালী আসলে পাহাড়ের নীচে প্রায় মার্শল্যান্ড বলা যায় - একটা জোলো জায়গা, তার মাঝে মাঝে কয়েকটা বাড়ি নিয়ে একটা গ্রাম। ওপরদিকে একটা স্নো-পিক বেশ কাছেই, ঋক তার নাম দিলো "ভ্যানিলা অ্যাণ্ড চকোলেট আইসক্রীম"।

লাচেনের অল্প আগে ফরচুনার একটি গাড়ি বিগড়ে গেল। তাকে ঠিক করার জন্যে বাকি সমস্ত গাড়ির ড্রাইভারেরা লেগে পড়লো। এদের এই ইউনিটিটা দেখার মতন। একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়লে সকলে তাকে সাহায্য করার চেষ্টা করে। অবিশ্যি এতে স্বার্থও রয়েছে, কারণ একটা গাড়ি খারাপ হয়ে রাস্তা আটকে রাখলে সকলেরই অসুবিধা। সেই গাড়ি ঠিক হওয়া অবধি আমরা দাঁড়িয়ে রইলুম। শেষে লাচেন অবধি পৌঁছতে পৌঁছতে প্রায় বেলা দুটো। জলের ক্রাইসিস তখনো রয়েছে - অন্য বাড়ি থেকে জল এনে দিচ্ছে বালতি করে। এরকম কিছু জল যোগাড় করে কাজকম্মো সারা হল। চান তো তার আগের দিন থেকেই বন্ধ
...

দুপুরে খাওয়া মিটিয়ে আবার সেখান থেকে রওনা দিলুম লাচুংএর দিকে। প্রথমে লাচেন চু-র ধার দিয়ে দিয়ে চুংথাম অবধি, আর সেখানে বাঁদিকে বেঁকে লাচুং চু-র ধার দিয়ে দিয়ে লাচুং অবধি। এই রাস্তাটা তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো। চুংথাম থেকে লাচুংএর দূরত্ব ২১ কিলোমিটার, আর রাস্তা ভালো বলে পৌঁছতে বেশি সময় লাগে না।

পথে পড়লো "ভীম নালা' বলে একটা জলপ্রপাত, সেখানে কিছু ছবি তুলে বিকেল পাঁচটা নাগাদ আমরা হাজির হলাম লাচুংএ। ফরচুনা লাচেনের হালত দেখে ধরে নিয়েছিলুম যে লাচুংএও অমনই কিছু একটা হবে, কিন্তু না - ফরচুনা লাচুং লাচেনের থেকে ঢের ভালো। গ্যাংটকের সোনম-ডে-লেক না হতে পারে, কিন্তু ঐ চত্বরে যা দেখেছি তার চেয়ে ঢের ভালো। গীজার চলে, তাতে গরম জল পাওয়া যায়, এবং ঘরে আলো-টালো জলে, দরজায় চাবিও আছে (লাচেনে আবার চাবি ছিলো না)। সন্ধ্যেয় একটু চা টা খেয়ে ল্যাদ খেতে শুয়ে পড়লুম সকলে। পরের দিন ফের ভোরে উঠে কাটাও-ইয়ুমথাং-জিরো পয়েন্ট ঘোরা।

সিকিমের রাস্তার ধারের গ্রামগুলো মোটামুটি টিপিক্যাল। দুটো কমন জিনিস লিখছি।

এক নম্বর - গ্রামের আশেপাশে প্রচুর পতাকা টাঙানো দেখা যায়, হয় সারি সারি সাদা পতাকা, নয়তো পর পর লাল-নীল-হলুদ-সবুজ কিছু পতাকা। সবগুলোতেই মন্ত্র লেখা (ঐ "ওঁ মণিপদ্মে হুম" জাতীয়)। এই দুই ধরণের পতাকার আলাদা মানে আছে। সাদা পতাকা হল যারা মারা গেছে তাদের আত্মার শান্তির উদ্দেশ্যে টাঙানো, বা ভূত তাড়ানোর জন্যে টাঙানো। আর রঙীন পতাকাগুলো গ্রামের শান্তিকল্যানের জন্য - যাতে ফসল ভালো হয়, পাহাড়ে ধ্বস না নামে ইত্যাদি। পতাকাগুলোর আরেকটা উপকারিতা আছে - দূর থেকে দেখলে কাছাকাছি জনবসতির খোঁজ পাওয়া যায়।

দুই নম্বর - প্রায় সমস্ত গ্রামেই একটা জলচালিত ধর্মচক্র দেখা যায়। ধর্মচক্র অর্থাৎ জপযন্ত্র, কিন্তু পেল্লায় সাইজের। রাহুল সাংকৃত্যায়ন "তিব্বতে সওয়া বছর" বইতে তিব্বতের গ্রামগুলোর যা বর্ণনা দিয়েছেন, একেবারে সেই জিনিস। ঐ বইতে এগুলোকে বলা হয়েছে "মাণী", সিকিমে বলে "ধর্মচক্র"। এর ভিতরেই সেই কাগজে লেখা "ওঁ মণিপদ্মে হুম" মন্ত্রটি থাকে, এবং জলের শক্তিতে এটা ঘুরতেই থাকে, ঘুরতেই থাকে - কখনও না থেমে। প্রতিবার ঘোরায় এক একটা পাপ ধুয়ে যায়। গ্রামের সকলের নিখরচায় পূণ্য অর্জন হয় এই ধর্মচক্র ঘোরার ফলে। কোথাও এর সাথে একটা ঘন্টাও লাগানো থাকে, প্রতিবার ঘোরার সময় টুং করে একটা আওয়াজ হয়।

১৯শে অক্টোবর: কাটাও, ইয়ুমথাং, জিরো পয়েন্ট হয়ে গ্যাংটক

ফরচুনা আরো যে দু নম্বরিটা করেছিলো সেটা হল নিষ্পাপ মুখে প্যাকেজে কাটাও রাখা। হোটেলের লোক এবং ড্রাইভারেরা সকলেই এক বাক্যে বললো যে কাটাও তো যেতে দেয় না - মিলিটারি আটকে দেয়। তাও যেহেতু প্যাকেজে আছে, তাই চেষ্টা করা হবে। সকালে বেরিয়ে আগে কাটাও। ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট খেয়ে ইয়ুমথাং/জিরো পয়েন্ট। জিরো পয়েন্ট প্যাকেজে নেই, তাই ওর বাড়তি পয়সাটা ড্রাইভারকে দিয়ে দিলেই হবে। পাসাং ছেলেটা বেশ ভালো - মুখ থেকে হাসি যায় না, আর কোনো কিছুতে অরাজী হয় না। তার ওপর ঋক আর ঋতির সাথে জবরদস্ত দোস্তি হয়ে গেছে।

ভোর পাঁচটা থেকে আমরা সবাই রেডি, কিন্তু পাসাংএর পাত্তা নেই। শেষে যখন এলো তখন সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। তড়িঘড়ি কাটাওয়ের দিকে রওনা দিলাম। কাটাও যেতে হয় লাচুং থেকে অল্প কিছুটা নেমে এসে নদী পেরিয়ে অন্য একটা রাস্তা দিয়ে। তুলনামূলকভাবে ভালো রাস্তা (লাচেন-এর চেয়ে অনেকগুণে ভালো), কিন্তু বেজায় প্যাঁচালো আর চড়াই - এবং সরু। ভাগ্য ভালো ঐ রাস্তায় গাড়ি প্রায় নেই বল্লেই চলে - তাই কোথাঐ আটকায়নি - ঘুরতে ঘুরতে উঠতে উঠতে অনেক উঁচুতে উঠে যাচ্ছিলাম। নীচের দিকে তাকালে অবাক লাগে - যে ঐ রাস্তা দিয়ে আমরা উঠে এসেছি।

নর্থ সিকিমের গোটা সময়টাতে সকালের দিকে আমরা অবিশ্বাস্য ভালো আবহাওয়া পেয়েছি। পুরো ঝকঝকে নীল আকাশ, সাদা মেঘ, আর দূরে বরফে ঢাকা চূড়া - একদম ক্যালেন্ডারের ফটো। হিমালয়ে এসে এত ভালো আকাশ না পেলে মন খুঁতখুঁত করে, ছবিগুলোতে আকাশ কেমন ঘোলাটে থাকে (লাভা/লোলেগাঁওতে যা পেয়েছিলুম) - ভাল্লাগে না। এইবার, লাচেন থেকে গুরুদংমার যাওয়ার সময় এবং লাচুংএও, আবহাওয়ার কারণে ছবিগুলো ব্যাপক উঠেছে। তবে এই সময়েই যে পশ্চিম হিমালয়ে আবহাওয়া ঘোঁট পাকাচ্ছে সে খবর জানা ছিলো না। নর্থ সিকিমে বিএসএনএল ছাড়া আর কারও সিগন্যাল পাওয়া যায় না বলে বাইরের সাথে যোগাযোগ ছিলো না যে এসব খবর পাবো।

ঘন্টাখানেক ঘুরে ঘুরে পাহাড়ে ওঠার পর একটা মিলিটারি ক্যাম্প - এবং সেখানে আটকে গেলাম। গত এক বছরের কিছু বেশি সময় ধরে নাকি কাটাও যেতে দেওয়া হচ্ছে না। এবারে আরে মেডিক্যাল অ্যাডভাইস নয়, পরিষ্কার "অর্ডার নেহি হ্যায়"। তবে এখানে ছবি নিতে আটকালো না - ক্যাম্পের ছবি না তুললেই হল। ক্যাম্পের ছবি তোলার কোনো দরকারও ছিলো না - কারণ উল্টোদিকে সোজা তাকালে ঝকঝকে আকাশে বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। আমি আগে কখনো কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখিনি - লোলেগাঁও আর রিশপে মেঘের জন্যে দেখা যায়নি - কাজেই ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। দূরে কাঁচনজঙ্ঘা, তার অল্প আগে বরফে ঢাকা আরেকটা চূড়া - মিলিটারির ভদ্রলোক নামটা বলতে পারলেন না। ছবি তুলতে তুলতে কাঞ্চনজঙ্ঘা মেঘে ঢাকতে শুরু করলো - আজনবি মুসাফিরকে মুখ দেখিয়েই সম্রাজ্ঞী মুখ ঢাকলেন। কিছুক্ষণ মিলিটারীর ঐ দুজনের সাথে গেঁজিয়ে, গরম জল খেয়ে (চা-ও খাওয়াতে চাইছিলেন, মনে হল লোকের মুখ দেখতে পেলে এঁরা ভারী খুশী হন) আবার ঘুরতে ঘুরতে নামা।

লাচুংএ ফিরে শুনলাম বাকি সবকটা গাড়ি অনেকক্ষণ রওনা দিয়েছে ইয়ুমথাংএর দিকে। কেউই আর কাটাও যায়নি। আমরাও আর না দাঁড়িয়ে ব্রেকফাস্টের প্যাকেট সঙ্গে নিয়ে ইয়ুমথাংএর দিকে রওনা দিলাম।

লাচুং থেকে ইয়ুমথাং খুব দূর নয়, এবং প্রথমদিকটা রাস্তাও মন্দ নয়। দু একটা গ্রাম, মিলিটারি ক্যাম্প পার হয়ে যেতে হয়। এবং অল্প দূর যাওয়ার পরেই দুদিকে ক্যালেন্ডারের ছবির মতন দৃশ্য শুরু হয়ে যায় - নীল আকাশ, সাদা মেঘ, মাঝে বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া। ইয়ুমথাংএর কয়েক কিলোমিটার আগে একটা রডোডেনড্রনের বন পার হতে হয়। রাস্তার দুপাশে যতদূর চোখ যায় নানা রকম রডোডেনড্রন গাছ। মাঝে মাঝে বোর্ড লাগানো - গাছের হিসেব দিয়ে। কিন্তু অক্টোবর মাস - আধখানা ফুলও কোথাও ফুটে নেই। তবে গাছের সংখ্যা দেখে আন্দাজ করা যায় মার্চ-এপ্রিলে জায়গাটার কি চেহারা দাঁড়াতে পারে।

রডোডেনড্রন উপত্যকা পার হওয়ার পরেই ইয়ুমথাং। যদিও এই উপত্যকা পার হতে হতে কোমর ভাঙার বড়সড় সম্ভাবনা রয়েছে। পাহাড় থেকে একটা ঝরনা নেমেছে, সাথে অসংখ্য বোল্ডার। রাস্তাটা ঘুরে ঘুরে বার বার ঐ ঝরনার ওপর দিয়ে চলেছে, নৌকোর মতন দুলতে দুলতে - পাথরের নদী নয়, উহাই পথ। রডোডেনড্রন উপত্যকার মধ্যে দিয়ে হাঁটা পথও রয়েছে - আর আমার ধারণা মার্চ-এপ্রিলে হাঁটা পথটাই ভালো। ফুলও দেখা যাবে একদম সামনে থেকে, আর কোমরও আস্ত থাকবে।

ইয়ুমথাংএ ঢোকার মুখে সারি দিয়ে দোকান, এবং প্রচুর লোকের ভিড়। এখানে দাঁড়াবেন না, আরেকটু এগিয়ে যান। সামনে পড়বে একটা বিরাট উপত্যকা, দুপাশে সারি দিয়ে উঁচু পাহাড়, আর দূরে, যেখানে দুদিকের পাহাড় মাঝখানে এসে মিলছে, সেখানে একটা মেঘে ঢাকা পাহাড়চূড়া। মেঘ এসে তার চূড়াটাকে এমনভাবে দেখেছে যে দেখলে মনে হয় একটা আগ্নেয়গিরি দাঁড়িয়ে রয়েছে - যার মাথা থেকে সাদা ধোঁয়া বেরোচ্ছে। উপত্যকার এক পাশ দিয়ে লাচুং চু বয়ে চলেছে, তার ওধারে ঘন পাইনের জঙ্গল। রাস্তা থেকে নেমে এগিয়ে যান নদীর দিকে - হাঁটাপথের দুধারে দেখবেন গাদা গাদা ইয়াক্ ঘুরছে। সবুজ ঘাস থেকে একটু নেমে যান পাথরের ওপর, জল ছুঁতে পারেন। বা একটু বসে থাকতে পারেন পাথরের ওপর, মিঠে রোদ্দুরকে পিঠে নিয়ে। বসে বসে দূরে ঐ আগ্নেয়গিরির মতন চূড়াটাকে দেখুন
... চারিদিকে বাকি পাহাড়গুলোর মাথার ওপর মেঘ পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে, কিন্তু দূরের ঐ পাহাড়টা ঠিক তেমনি ভাবেই মাথার ওপর সাদা ধোঁয়ার মতন মেঘ নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ইয়ুমথাংএ কিছুক্ষণ কাটিয়ে এগোলাম জিরো পয়েন্টের দিকে - ইয়ুমথাং থেকে ঘন্টাখানেক দূরত্বে। এবার ক্রমশ: ওপরে উঠতে থাকা, সরু আর প্যাঁচালো রাস্তা। লাচুং নদী আস্তে আস্তে নীচের দিকে নামতে থাকলো। রাস্তার দুপাশে গাছের সংখ্যাও কমতে শুরু করলো। এর মাঝে এক একটা জায়গায় দেখলাম পাথরের গায়ে লালচে রঙের শেওলা। লাচুং চু-এর ধারে পাথরে এমনভাবে শেওলা ধরে রয়েছে যে রিভারবেডটা অবধি লালচে দেখায়।

রাস্তার দুপাশে গাছ কমতে কমতে শূণ্যতে এসে ঠেকলো, শুরু হল দুপাশে যতদূর চোখ যায় ততদূর অবধি পাথুরে বন্ধ্যা জমি। এই পথে একটা মিলিটারী ক্যাম্প চোখে পড়ে, কিন্তু তারপর আর কিছু নেই। দু এক জায়গায় আশেপাশে দেখে মনে হল কিছু বাঙ্কার রয়েছে, কিন্তু ক্যাম্প বা কোনো লোকজন (ট্যুরিস্ট ছাড়া) চোখে পড়লো না। তাও এক সময়ে এমন অবস্থা যে যতদূর চোখ যায়, ঐ পথে যাচ্ছে এমন একটা গাড়িও চোখে পড়ে না। ফিরছে অনেক গাড়ি, কিন্তু কেউই যাচ্ছে না। আমরা ভাবছিলুম দেরী হয়ে গেলো কি? কেউ তো আর যাচ্ছে না, সবাই ফিরছে। শেষে বেশ খানিকক্ষণ পর পিছনে আর একটা গাড়ি দেখে নিশ্চিন্ত হওয়া গেলো - যে না, লোকে এখনও যাচ্ছে। চলতে চলতে এক জায়গায় রাস্তা শেষ। তারপর আর কিছুই নেই - পাথুরে জমি, আর দূরে কিছু বরফে ঢাকা পাহাড় ছাড়া। এই হল জিরো পয়েন্ট।

এবং এখানেও প্রচুর গাড়ি আর লোকের ভিড়। অল্প কিছু দোকান যেখানে তুমুল শস্তায় রাম/হুইস্কির বোতল বিক্রি হচ্ছে। অনেকে লাইন দিয়ে কিনছে। অ্যাজ ইউজুয়াল হুল্লোড়ও চলছে - একটা গ্রুপ থেকে তারস্বরে "হিপ হিপ হুররে"-ও শুনলাম। বুঝি না, লোকে এসব জায়গায় কি করতে যায়
... আমার তো এখানে চুপ করে বসে থাকতে ইচ্ছে করে, অনেকক্ষণ। ঐ পাহাড়গুলোকে দেখলে নিজেকে কেমন যেন পিঁপড়ের মতন মনে হয়। সেখানে "হিপ হিপ হুররে" কেমন বেমানান লাগে।

এই সময়ে হঠাৎ দু এক পশলা হালকা বৃষ্টি নামলো - ঠাণ্ডায় বৃষ্টির জল জমে ছোট ছোট দু চারটে স্নো-ফ্লেক হয়ে পড়তেই আবার একচোট হুল্লোড়। ছাপোষা বাঙালী ট্যুরিস্টদের "তুষারপাত" দেখার শখও মিটে গেল (হুল্লোড় শুনে যা বুঝলুম)। পোলারাইজার লাগিয়ে ছবি তুলছিলুম, সেটা লেন্স থেকে খোলার সময় একজনের কনুইয়ের গুঁতোয় সেটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে কাঁচ চটে গেলো
...

জিরো পয়েন্ট থেকে ফেরার পথে আর কোথাও দাঁড়ানো নয় - সেই আঁকাবাঁকা পথে নামতে নামতে, ঝরনার বয়ে আনা পাথরে ওপর দুলতে দুলতে বেলা দুটো নাগাদ লাচুং।

গাড়ি থেকে নেমে দেখি হোটেলের সামনে বেশ ভিড় - কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। এগিয়ে গিয়ে শুনি সেই যে গ্রুপটার গাড়ি বারকয়েক খারাপ হচ্ছিলো, সেটা ইয়ুমথাং যাওয়া-আসার পথে নয় নয় করে বার দশেক বিগড়েছে। শেষে ঐ গ্রুপটা প্রায় দশ কিলোমিটার হেঁটে লাচুং পৌঁছেছে। সে গাড়ি আর যাবে না, আর ওখানে গাড়ি সারানো বা অন্য গাড়ির ব্যবস্থা করাও সম্ভব নয়। মানে ঐ গাড়িতে যে কজন লোক ছিলো তাদের আর তাদের মালপত্র অন্য দুটো গাড়িতে ভাগাভাগি করে গ্যাংটক অবধি নিয়ে যেতে হবে। উপায় নেই, এসব সিচুয়েশনে কাউকে ঐ অবস্থায় ফেলে আসা সম্ভব নয় - কাজেই ঠিক হল অন্য গাড়িটাতে ওঁদের গ্রুপের দুজন আর বাচ্চাটা যাবে, আর আমাদের গাড়িতে বাকি তিনজন। অন্য গাড়িটার মাথায় কেরিয়ার নেই, কাজেই মালপত্র যা যাবে সব আমাদের গাড়ির মাথায় তুলতে হবে - ইনক্লুডিং আমাদের মালপত্র।

পরে মনে হয়েছে ভাগ্যিস আমাদের কপালে ঐ গাড়িটা পড়েনি - পড়লে কি করতুম জানি না। অন্য গাড়িটার ড্রাইভার খুবই যুক্তিসঙ্গতভাবে কেরিয়ার নেই বলে মালপত্র নিতে রাজী হল না বলে ঐ গ্রুপের একজনের মুখে "হাতি কাদায় পড়লে ব্যাঙেও লাথি মারে" শুনে মনে হয়েছিলো আমরা বিপদে পড়লে ওঁদের কাছ থেকে সাহায্য পেতাম কি?

খুব তাড়াতাড়ি করে দুপুরের খাওয়া সেরে সমস্ত মালপত্র গাড়ির মাথায় তুলে প্লাস্টিকের চাদর দিয়ে বেঁধে রওনা দিতে দিতে আড়াইটে বেজে গেলো। লাচুং থেকে চুংথাং আসতে বেশি সময় লাগলো না। চুংথাংএর পর থেকে সেই ভয়ংকর ব্যাককাটিংওয়ালা রাস্তা শুরু। একটা জায়গায় ওপরে পাহাড় রাস্তার ওপরে এসে পড়েছে, নীচে খানাখন্দ, আর তারও নীচে, মানে রাস্তার তলায় মরচে ধরা লোহার বিম দিয়ে আটকানো। রাস্তাটা দেখে আমার একটাই কমেন্ট ছিলো - "এখান দিয়ে আমরা গেছি?" যাওয়ার সময় অন্ধকার ছিলো বলে বোঝা যায়নি, কিন্তু দিনের বেলা ঐ অংশটা পার হতে যে কোনো লোকের হার্ট প্যালপিটেশন হবে। ওটা পেরনোর কিছুক্ষণ পর গাড়িটা উল্টোদিকের পাহাড়ে চলে গেলো - তখন দূর থেকে ঐ অংশটা দেখা যাচ্ছিলো - আর আমরা এই কথাগুলোই বলাবলি করছিলুম।

চুংথাং ছাড়িয়ে গ্যাংটকের দিকে অল্প কিছুদূর গিয়েই আটকে গেলুম। লাইন দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে। শোনা গেল একখানি লরি নাকি উল্টে গেছিলো, সেখানাকে তোলার চেষ্টা চলছে। হাঁটতে হাঁটতে দেখতে গেলুম - প্রায় দেড় কিলোমিটার ধরে হাঁটছি তো হাঁটছিই - গাড়ির লাইন আর শেষ হয় না - শেষে এক জায়গায় গিয়ে দেখলুম মূর্তিমান লরিটি মাথা উঁচু করে খাদে গড়িয়েছেন, তখন নাকটা রাস্তা থেকে দেখা যাচ্ছে, আর একটি টো-ট্রাক তাকে তোলার চেষ্টা করছে। গাড়ির কাছে ফিরে এলুম। উল্টোদিকে মেঘের আড়ালে একখানা বরফঢাকা চূড়া মুখ দেখাচ্ছে - তার ছবি তুল্লুম - সময় কাটাতে হবে তো। শুনছি আর আধ ঘন্টা লাগবে, তারপর শুনলাম আরো আধ ঘন্টা লাগবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হল। রাস্তার ধারের ঝোপে ঝাড়ে ঝিঁঝিঁ ডাকতে শুরু করলো। রাস্তায় দাঁড়ানো গাড়িগুলো কয়েকটা অল্প আলো জ্বালিয়েছে, তাছাড়া আর কোনো আলো নেই। গাড়িতে জলের আকাল। খাবারের আকাল। সঙ্গী অন্য তিনজনের কাছ থেকে বাচ্চাদুটোর জন্যে একটু জল পাওয়া গেলো। সাড়ে চারটে থেকে আস্তে আস্তে সাড়ে ছটা, শোনা গেলো লরিবাবাজী উঠেছেন, এক্ষুনি গাড়ি ছাড়তে শুরু করবে। সাতটা নাগাদ গাড়ি নড়লো - কিন্তু কিছুদূর এগিয়েই আবার আটক। সামনে একটা গাড়ি রাস্তার বাঁদিকের নালায় চাকা আটকে ফেলেছে। ততক্ষণে উল্টোদিকের গাড়িও এসে গেছে - পাশ কাটানোর জায়গা নেই - অতএব ফের বসে থাকো। বৃষ্টি নেমেছে, নীচে নামার উপায় নেই, জায়গাও নেই। এরই মধ্যে সিকিমের কিছু পুলিশ দৌড়োদৌড়ি করে কিছু গাড়িকে একটা চওড়া জায়গায় ঢোকানোর ব্যবস্থা করলো যাতে নালায় পড়া গাড়িটাকে পাশ কাটানোর জায়গা হয়। সে গাড়ি পার হওয়ার পরেও জ্যাম আর কাটে না - এবার সামনে একটি মারুতি অমনি ট্যাক্সি, যার ব্রেক কাজ করে না
... এই সব নানা ঝক্কি কাটিয়ে গাড়ি যখন ফাইনালি চলতে শুরু করলো তখন সাড়ে সাতটা। পাক্কা তিন ঘন্টা পরে।

এর মধ্যে মোবাইলে সিগন্যাল এসেছে। ওয়ান পিস আছি সেই খবরটা বাড়িতে দিয়ে হোটেলে ফোন করলাম যাতে রাতের জন্যে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করে রাখে - কারণ ডিনার টাইমের ঢের পরে গ্যাংটক পৌঁছবো। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে জল আর বিস্কুট কিনে দে দৌড় - ঐ রাস্তায় যতটা তাড়াতাড়ি যাওয়া যায়। পথে সেই পাঁকে ভর্তি অংশটুকু - বৃষ্টি হয়ে অবস্থা আরো খারাপ - একটা একটা করে গাড়ি এগোচ্ছে। আমাদের দুটো গাড়ি আগে একটা গাড়ি অর্ধেক উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো - আর টানতে পারছে না। একবার নয়, বার তিনেক। শেষে নেমে এসে কয়েকজন লোক নামিয়ে ওজন কমিয়ে সে পাঁক পার হল - লোকগুলো ঐ পাঁক হেঁটে পেরিয়ে ফের গাড়িতে উঠলো।

গ্যাংটকে ঢুকলাম তখন দশটা বেজে গেছে। আমাদের হোটেলে নামিয়ে গাড়ি বাকিদের নামাতে চলে গেলো। সেই সতেরো তারিখে শেষ চান করেছি - ভেবেছিলাম গ্যাংটক পৌঁছে চান করবো। কিন্তু এন্থু শেষ। কোনোরকমে ঘুমন্ত ছেলেমেয়েদুটোকে খাইয়ে নিজেরা খেয়ে সোজা বিছানায়।

২০শে অক্টোবর, গ্যাংটক থেকে পেলিং

গায়ে গতরে ব্যথা নিয়ে ঘুম ভাঙলো। তখন সবে দিনের আলো ফুটছে। বাকি সবাই তখনো গভীর ঘুমে। জানলার পর্দা সরাতেই দূরে একটা বরফে ঢাকা পাহাড় চোখে পড়লো। নামধাম জানি না - গোটা ট্রিপে আরো অনেক পাহাড়ের মতই। এই আরেকটা জিনিস বাইরের কোনো দেশে হলে করে ফেলতো - কাটাও বা জিরো পয়েন্টে একখানা বোর্ড লাগাতো, তাতে কোনটে কোন
peak সেই ইনফরমেশনটা লেখা থাকতো ছবিসহ। এরকম ছবি কিনতে পাওয়া যায়, কিন্তু ভিউপয়েন্টে এই ইনফরমেশনটা খুব হেল্পফুল।

যাওয়ার সময় গ্যাংটকে ছিলাম সোনম-ডেলেক বলে একটা হোটেলে। নর্থ সিকিম থেকে ফিরে উঠেছিলাম মিন্টোক্লিং গেস্ট হাউজে। দুটোই স্বচ্ছন্দে সকলকে রেকমেন্ড করবো। সোনম-ডেলেক হল এমজি মার্গ থেকে ওপরদিকে উঠে বাঁদিকে ঘুরে টিবেট রোডের মাথার কাছে। এমজি মার্গের হইহট্টগোল নেই, অথচ রাস্তাটা খুবই কাছে। হোটেলটাও পরিষ্কার। হোটেল পরিষ্কার কিনা সেটা এক ঝলকে বুঝবেন জানলায় ঝোলানো পর্দা দেখে। বাজেট হোটেলের মধ্যে খুব কমই পাবেন যেখানে ঝকঝকে সাদা পর্দা ঝোলে। মিন্টোক্লিং আরো একটু ওপরে, সেক্রেটারিয়াট রোডে, খুব চুপচাপ একটা জায়গায় - ফ্যামিলি-রান গেস্টহাউজ। খাবার খুব ভালো, এবং ব্যবহারও। এবং এই হোটেলটাও খুব পরিচ্ছন্ন। কেউ গ্যাংটক গেলে এই দুটো হোটেলের নাম মাথায় রাখতে পারেন।

দশটা-এগারোটা নাগাদ পেলিংএর দিকে রওনা দেবার ইচ্ছে ছিলো। হোটেলে ট্যাক্সির খোঁজ করতে গিয়ে প্রথমে বেশ বড়সড় রেট শুনলাম। তারপর দময়ন্তী শুনলাম তার প্রায় অর্ধেক রেটে ট্যাক্সি পেয়েছে - ওয়াগন-আর। ওকে বল্লাম তাহলে ওটাতেই মাথায় জিনিসপত্র তুলে একসাথে পেলিং চলে যাই। সেই মতন কথাও হল। কিন্তু কিছুক্ষণ পর দময়ন্তী ফোন করে জানালো ওয়াগন-আর নয়, একখান অল্টো পাঠিয়েছে, যার মাথায় কেরিয়ারও নেই। কাজেই আগের প্ল্যান বাতিল করে এমজি রোডের দিকে হাঁটা দিলুম ট্যাক্সির খোঁজে। হোটেল থেকে ট্যাক্সির যা রেট বলেছিলো তার চেয়ে অনেক কমে, ইনফ্যাক্ট দময়ন্তীকে যা রেট দিয়েছিলো তার চেয়েও কমে একটা ট্যাক্সি পেয়ে গেলুম - অল্টোই, তবে চারজন + মালপত্র অনায়াসে চলে যাবে। ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে এসে জিনিসপত্র তুলে বেরোতে বেরোতে পৌনে বারোটা। পেলিং গ্যাংটক থেকে প্রায় পাঁচ ঘন্টার রাস্তা। অনেকটা নেমে সিংথাম হয়ে সাউথ সিকিমের রাবংলা পেরিয়ে পেলিং (ওয়েস্ট সিকিম) যেতে হয়।

হোটেলে বেশ ভারি ব্রেকফাস্ট করা ছিলো। তাও ছেলেমেয়ের দুপুর একটা বাজলেই ক্ষিদে পায় - কাজেই সিংথামে দাঁড়িয়ে দুপুরের খাওয়া মেটানো হল। সিংথাম থেকে গাড়ি গ্যাংটক-শিলিগুড়ির রাস্তা ছেড়ে একটা অন্য রাস্তা ধরে সাউথ সিকিমে ঢোকার জন্যে। এবং নর্থ সিকিমের তুলনায় এই রাস্তাটা ঢের ভালো। এদিকটা একটু বেশি সবুজ। আশেপাশে প্রচুর ছোট ছোট গ্রাম পড়ে। রাবংলা ছাড়িয়ে আরো খানিকটা গিয়ে রঙ্গিতের ওপর একটা ব্রীজ পেরিয়ে ওয়েস্ট সিকিম শুরু হয়। নতুন করে বর্ণনা দেবো না - সেই উঁচু পাহাড়, ঢালু খাদ, তলায় রঙ্গিত ফুঁসছে, ছোট ছোট গ্রাম, গ্রামের সামনে জল-চালিত ধর্মচক্র, আর লাল-নীল-হলুদ-সবুজ পতাকার সারি ... এসবের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে প্রথমে পড়ে গেজিং। গেজিং ছাড়িয়ে আরো একটু এগিয়ে পাহাড়ের মাথায় ছোট্ট শহর পেলিং।

ছোট্ট, কিন্তু ঘিঞ্জি। শুনলাম কয়েক বছর আগেও লোকে পেলিং বেড়াতে যেত না খুব একটা। তখন অল্প কিছু বাড়ি ছিলো - আর বাড়ির মালিকেরা একটা দুটো ঘর ভাড়া দিত। থাকার ব্যবস্থা শুধু ঐটুকুই ছিলো। এখন পেলিংএ লাইন দিয়ে হোটেল। আপার পেলিং, মিড্ল পেলিং, লোয়ার পেলিং - যেখানেই যান, রাস্তার দুপাশে সারি দিয়ে শুধু হোটেল আর হোটেল। আর থিকথিক করছে লোক। ৯৯
. ৯৯% বাঙালী। একজনও অবাঙালী ট্যুরিস্ট দেখেছি বলে মনে পড়ছে না।

আমাদের হোটেলটা ছিলো লোয়ার পেলিংএ। উল্টোদিকেই
Aryan Regency আর Newa Regency - যে দুটো হোটেলের নাম ট্র্যাভেলগুরু বা মেকমাইট্রিপে সবার আগে আসে। আমরা উঠলাম এদের সামনে হিমালয়ান হাইডঅ্যাওয়ে-তে। ছোট হোটেল, কিন্তু পরিষ্কার। সবচেয়ে বড় অ্যাট্রাকশন হল ঘরে বড় বড় জানলা, এবং ঐদিকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। পেলিংএর চেয়ে ভালোভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা নাকি আর কোথাও দেখা যায় না। উল্টোদিকের Aryan আর Newa Regency-তে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে গেলে বাইরে করিডরে এসে দাঁড়াতে হবে। আমরা বিছানায় শুয়ে শুয়েই দেখতে পাবো। মানে পরদিন সকালে। তখন বিকেল হয়ে এসেছে, আকাশেও মেঘ। তখন কিছু দেখা যাচ্ছে না। আমরা কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে হাঁটতে বেরোলাম - গ্যাংটকে সময়াভাবে "শপিং" হয়নি, সঙ্গের বিগ-শপারের মনে ভারি দুষ্কু - তাই পেলিংএর রাস্তায় দেখতে বেরোলুম কি পাওয়া যায়। লোকজনের জন্যে কিছু নিয়ে যেতে হবে, আর আমার একটা জপযন্ত্রের ভারী শখ - সেখানা দেখতে হবে। আর যদি থাংকা আর তিব্বতী মুখোশ পাওয়া যায় ...

সিকিমযাত্রীদের জন্যে টিপস -যা কিছু মেমেন্টো কেনার, গ্যাংটকে কিনে রাখুন। পেলিংএ মাত্র দুটো কি তিনটে দোকান আছে - এবং তার সামনে রেশন দোকানের লাইনের মতন ভিড় হয়। জপযন্ত্র পাওয়া যায়, ছোট সাইজের মুখোশ (যেগুলোকে ওয়াল হ্যাঙ্গিং হিসেবে ব্যবহার করা যায়) পাবেন, তবে থাংকা মোটেও ভালো পাওয়া যায় না। আর পাওয়া যায় রাশান ডলের মতন কনসেপ্টের ফ্যামিলি পার্স: মানে একটা পার্স, তার মধ্যে আরেকটা পার্স, পার্সের মধ্যে পার্স - পাঁচটা মনে হয় থাকে সব মিলিয়ে।

হোটেলের রিসেপশনে বললো পেলিং ঘোরার দুটো স্কীম আছে - হাফ ডে আর ফুল ডে। হাফ-ডে-তে আপনাকে সকালবেলা নিয়ে যাবে রিম্বি ফলস, খেচিপেড়ি (khecheopalri) লেক, রিম্বি পাওয়ার প্রজেক্ট অ্যাণ্ড রক গার্ডেন, কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলস। দুপুরে ফিরে খেয়ে দেয়ে আবার বেরোতে পারেন - ফুল-ডে ট্রিপ থাকলে - তখন যাবেন ছাগে ফলস, শিংশোর ব্রীজ আর পেমিয়াংচি মনাস্টেরি। হাফ-ডে হলে ষোলশ, ফুল ডে হলে আড়াই হাজার (রিজার্ভ গাড়ি)। বুক করবো কিনা ভাবছি, এমন সময় জিংমি (যার গাড়িতে গ্যাংটক থেকে এসেছি) ফোন করে বললো ও তখন আর গ্যাংটক ফিরতে পারবে না (সন্ধ্যে হয়ে গেছে, অন্ধকারে ফেরা রিস্কি) আর কোথাও থাকার জায়গা পাচ্ছে না। আমরা যদি ওর গাড়িতে পরের দিন পেলিং ঘুরি তাহলে ও কোনোভাবে থেকে যাবে, আর ঐ আমাদের এনজেপি-ও পৌঁছে দেবে। অল্পবয়সী ছেলে - এমন করে বললো যে আমি রাজী হয়ে গেলাম। হোটেলের বলা রেটের চেয়ে বেশি পড়েনি, হয়তো বাইরের রেটের চেয়ে একটু বেশি পড়লেও পড়ে থাকতে পারে। কিন্তু ছেলেটাকে ভালো লেগেছিলো বলে আর কোথাও খুঁজতে যাইনি।

২১শে অক্টোবর, পেলিংএর আশেপাশে

রাতে বৃষ্টি হচ্ছিলো। তখনও বাইরের খবর খুব একটা রাখছিলাম না বলে জানতাম না পশ্চিম হিমালয়ে আবহাওয়া কি খেলা দেখানো শুরু করেছে। ভোর চারটে থেকে জেগে শুয়ে - সূর্যের প্রথম আলো কখন কাঞ্চনজঙ্ঘায় পড়ে সোনালী রং দেখাবে। ভোর থেকে সকাল হল - কিন্তু আকাশ পরিষ্কার হল না। সেই ঘোলাটে মেঘলাই থেকে গেলো। কাঞ্চনজঙ্ঘার টিকি অবধি দেখা গেলো না।

অগত্যা সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরোনর জন্যে তৈরী হতে লাগলুম। পেলিংএ বেশ লোডশেডিং হয়। আমি চান করে বেরোতে বেরোতেই লোডশেডিং - কাজেই গীজার বন্ধ - কাজেই আর কারো চান হল না। ঠিক হল দুপুরে ফিরে এসে সেসব সারা হবে'খন। জিংমি এলো সওয়া আটটা নাগাদ - সাড়ে আটটার সময় আমরা বেরিয়ে পরলুম।

লোয়ার পেলিং থেকেই নীচের দিকে নামতে নামতে প্রথমে রিম্বি ফলস। এই প্রপাতটা ভারি সুন্দর। প্রচন্ড তোড়ে জল নামে না বটে, কিন্তু পাহাড়ের গা বেয়ে ঝিরঝির করে এমনভাবে নামে যে দাঁড়িয়ে দেখার মতন।

রিম্বি ফল্স ছাড়িয়ে আরো এগিয়ে রঙ্গিতের ধারে রিম্বি পাওয়ার প্রজেক্ট আর রক্ গার্ডেন। দশ টাকার টিকিট কেটে ঢুকতে হয়, কিন্তু রক্ গার্ডেনটা অতিশয় ফালতু। কিছুই নেই - একটা পার্কের মতন, পাশ দিয়ে রঙ্গিত বইছে। কোটি কোটি লোকের ভিড়। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেখান থেকে বেরিয়ে আসার সময় দেখি দময়ন্তী নামছে। ও সিকিম ট্যুরিজমের একটা ট্রিপ বুক করেছিলো। সাবধান করে দিলুম - যে - যেও না, কিছুই নাই শুধু কোটি কোটি লোক ছাড়া। আমরা ওখান থেকে বেরিয়ে এগোলাম খেচিপেড়ি লেকের দিকে।

সেও এক অ্যান্টিক্লাইম্যাক্স। লেক বলতে আমার চোখে ভাসে লেক ডিস্ট্রিক্টের উইন্ডারমেয়ার বা গ্রাসমেয়ার, আর নয়তো লক্ নেস। খেচিপেড়ি লেক আদতে একটা কাদাগোলা ডোবার চেয়ে বেশি কিছু নয়। গেটের বাইরে গাড়ি রেখে মিনিট পাঁচেক একটা ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে গিয়ে প্রথমে ভাবলাম এটা মনে হয় রাস্তার পাশে একটা পুকুর। তারপর ওটাই লেক শুনে আর কাছে গিয়ে দেখার ইচ্ছে ছিলো না। তাও ছেলেমেয়েকে নিয়ে যেতে হবে বলে গেলাম। কিছুই না, শুধু কাদাগোলা জল, তারমধ্যে প্রচুর মাছ ঘুরছে। এটা নাকি পবিত্র লেক, তাই লোকে দেখতে আসে। আদৌ দর্শনীয় কিছু নয়। লেকের ধারে কিছু ফুলটুল ফুটে রয়েছে, কিছু অর্কিড দেখা যায়, আর অসংখ্য পতাকা - পতাকা টাঙিয়ে লোকে "উইশ" করে। পতাকার আড়ালে লেকটা প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে।

খেচিপেড়ি থেকে বেরিয়ে বেশ খানিকদূর গিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলস। এখানে দুটো প্রপাত আছে - একটা খেচিপেড়ি লেকের জল এসে পড়ছে, আরেকটা মেইন ফলস - যেটা বেশ তোড়ের সঙ্গে নামছে। আমার ঐ তোড়ের সাথে নামা বড় প্রপাতটার চেয়ে পাশে ঝিরঝিরিয়ে নামা খেচিপেড়ির জলের ধারাটাই অনেক বেশি ভালো লাগলো। আশেপাশে বাজার বসে গেছে - সেখানে সেই ছোটবেলার সিলিন্ডারের মতন পাঁপড় টাইপের জিনিস, কচুভাজার প্যাকেট, পেয়ারা ইত্যাদি বিক্রি হচ্ছে। ঋক ঐ পাঁপড়টা খেতে চাইলো, আমি অনেকদিন কচুভাজা খাইনি বলে একখান প্যাকেট কিনলাম, আর কিছু পেয়ারা কেনা হল। সেসব খেতে খেতে প্রচুর রাস্তা পরিয়ে পেলিংএ ফিরলাম বেলা দুটো নাগাদ। দুপুরে খেয়ে বেরোব শিংশোর ব্রীজ আর পেমিয়াংচি দেখতে।

দুপুরে থুক্পা আর মোমো খেয়ে বেরোলুম শিংশোর ব্রীজ আর পেমিয়াংচির উদ্দেশ্যে। শিংশোর ব্রীজ পেলিং থেকে বেশ কিছুটা দূর - ঘন্টাখানেক তো হবেই। একটা cable-stayed ব্রীজ, এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম ব্রীজ। সেই ঘুরতে ঘুরতে, উঠতে নামতে বহুদূর গিয়ে ব্রীজটা চোখে পড়ে। ব্রীজের ওপর দাঁড়ালে দুলুনি টের পাওয়া যায়।

এখানে ব্রীজের আগে একটা ছোট পার্ক মতন আছে। তার পিছনে একটা ফল্স। সেটা দেখবো বলে যখন ঢুকছি তখন জীন্স পরা এক ছোকরা ঢুকলো - পকেটে হাত দিয়ে - জীন্সের তলাটা প্রায় ছয় ইঞ্চি ফোল্ড করা। হাবভাবটা বেশ হাইফাই। ঢুকে পার্কের মধ্যখানে দাঁড়িয়ে ব্রীজের ওপর (প্রায় পঞ্চাশ ফুট দূরে) দাঁড়ানো তার বাবাকে তারস্বরে ইনস্ট্রাকশন দিতে লাগলো (তার ছবিটা তোলার জন্যে) - "পুরো জুম করে তোলো"। মানে ব্যাপারটা বেশ হাস্যকর লাগলো বলে লিখলুম এখানে।

ফেরার পথে সন্ধ্যে হয়ে এসেছিলো। পেমিয়াংচি (পেলিং থেকে অল্প দূরেই) পৌঁছে দেখি বন্ধ হয়ে গেছে। কাজেই পেলিং ফিরে এলুম। হোটেলে ফিরে আর কিছু করার নেই বসে থাকা আর টিভি দেখা ছাড়া।

২২শে অক্টোবর, পেলিং থেকে শিলিগুড়ি

সকালে উঠে রেডি হয়ে বেরোলাম। মেঘলা আকাশ বলে এদিনও কাঞ্চনজঙ্ঘা কিছুই দেখা গেলো না। মাঝে কয়েক মিনিটের জন্যে ইঞ্চিখানেক একটা টিকি দেখা গেছিলো - তবে সেটা পাশের একটা সামিট, কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিটটা নয়।

কপাল খারাপ। কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়া পেলিং বলতে গেলে আর কিছুই নেই, আর সেটাও দেখা হল না। কাজেই আর কিছু করার নেই, পেমিয়াংচি ঘুরে সোজা শিলিগুড়ি চলে যাবো। পেমিয়াংচি পৌঁছলাম যখন তখনও বেশ কুয়াশা। কুয়াশার মধ্যে হলুদ পতাকার সারিটা ব্যাপক লাগছিলো - পুরো যেন কলাবন। অতি প্রাচীন গোমফা, ভিতরে সুন্দর ছবি আর মূর্তির কালেকশন রয়েছে। কিন্তু মনাস্টেরির ভিতরে ছবি তুলতে দেয় না - নইলে তিনতলায় একটা বিরাট প্যাগোডার মতন স্ট্রাকচার আমার ভয়ানক পছন্দ হয়েছিলো। তিব্বতী/চীনা ট্র্যাডিশনে সম্ভবত: গরুড় জাতীয় কোনো জন্তু (আধা পাখি, আধা জন্তু, মুখে সাপ) আছে - প্যাগোডাটার পাশে এরকম একটা মূর্তি দেখে মনে হল।

পেমিয়াংচি দেখা শেষ মানে আমাদের সিকিম ঘোরা শেষ। ওখান থেকে সোজা নামতে শুরু করলাম শিলিগুড়ির দিকে। ততক্ষণে ঐ চত্ত্বরেও ভালো বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। রাস্তাও পিছল। তার মধ্যেই নামতে নামতে রিনচেমপং পেরোলাম - পেলিংএর আগে এখানেই যাবো ভেবেছিলাম, কিন্তু জায়গা পাইনি বলে পেলিং। তারপর রংপো হয়ে শিলিগুড়ি।

সকালের কাঞ্চনজঙ্ঘা ধরার ছিলো বলে শিলিগুড়ি টাউনে না থেকে ভাবলাম এনজেপিতে থাকবো। সে কি হোটেল রে ভাই। সমস্ত সন্ধ্যে বিছানায় উঠে বসে রইলাম - যত কম মাটিতে নামতে হয় আর কি। চান-টানও হল না, সেদিন তো নয়ই, পরের দিন সকালেও নয় - কারণ যা বাথরুমের ছিরি তাতে চান করতে ইচ্ছে করলো না।

পরের দিন কাঞ্চনজঙ্ঘা এক্সপ্রেস আরেক যন্ত্রণা। এনজেপি এলো নির্ধারিত সময়ের দশ মিনিট আগে। মালদা টাউন পৌঁছলো ঠিক সময়ে। তারপরেই ট্রেনের ইঞ্জিন বদলে মনে হয় কয়েকটা গরু লাগিয়ে দিয়েছিলো। ঢিকির ঢিকির করে ট্রেন চললো, ছোটখাটো স্টেশন, হল্ট স্টেশনে তো বটেই, মাঠেঘাটেও দাঁড়িয়ে পড়ছিলো। বর্ধমানে ভাবলুম নেমে গিয়ে লোকাল ধরি, কিন্তু আবার সব জিনিস নিয়ে নেমে লোকালে উঠতে হবে ভেবে থেকে গেলুম। বর্ধমানের পর চন্দনপুর বলে একটা স্টেশনে ঢোকার মুখে পাক্কা চল্লিশ মিনিট দাঁড়িয়ে রইলো - পাশ দিয়ে দুখানা ডাউন লোকাল চলে গেলো, কিন্তু নামার জন্যে প্ল্যাটফর্ম ছিলো না বলে কিছু করা গেলো না। শেয়ালদা ঢোকার মুখে ফের মিনিট কুড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে। আসলে সন্ধ্যের সময় শেয়ালদা স্টেশনটা ওভারলোডেড হয়ে থাকে। উত্তরবঙ্গেরই তো প্রায় চারখানা ট্রেন ছাড়ে আধ ঘন্টা পর পর। তার ওপর লোকাল। এই ম্যানেজমেন্টটা যদ্দিন না ঠিক হবে তদ্দিন এরকম দুর্ভোগ পোয়াতেই হবে - আর লজিক্যালি এটা হ্যান্ডল করার ধক কারো নেই। ট্রেন শেয়ালদা ঢুকলো রাত্তির এগারোটা - সাড়ে সাতটার জায়গায়। তারপর ট্যাক্সি ধরা - ভাগ্যক্রমে একজন রাজী হয়ে গেলো, এবং বেশি না হেঁকেই। বাড়ি ফিরলুম রাত্তির বারোটার সময়।

সিকিম ভ্রমণেচ্ছুক সকলের জন্যে কিছু টিপস:

(১) নর্থ সিকিম গেলে উইলটা অন্তত: করে যাবেন।
(২) ছোট বাচ্চা নিয়ে গুরুদংমারের দিকে যাবেন না, মিলিটারি আটকে দেবে।
(৩) ফরচুনা নামক ট্যুর অপারেটরের থেকে দূরে থাকবেন।
(৪) পেলিং না যাওয়ারই চেষ্টা করুন। কিছুই নাই, কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়া। নেহাত যদি যেতেই হয়, আগে থেকে ওয়েদারের খবর নিয়ে এক রাতের জন্যে যান। কপালে থাকলে সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখবেন, তারপর ডে ট্রিপটা কাস্টমাইজ করে নিন - রিম্বি ফলস, কাঞ্চনজঙ্ঘা ফলস, পেমিয়াংচি ছাড়া আর কিসুই দেখার নেই।
(৫) দিনের ট্রেনে কক্ষণো এনজেপি থেকে ফিরবেন না। কাঁদিয়ে দেবে।
(৬) ভুলেও এনজেপিতে থাকার কথা ভাববেন না। শিলিগুড়ি টাউনে থাকবেন।


তবে একটা কথা বলি - রাস্তার ছবি দেখে আর বর্ণনা শুনে ঘাবড়ে গিয়ে যদি না যান, সারা জীবন আফশোস করবেন। প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিক থেকে সুইস আল্পস বা স্কটিশ হাইল্যান্ডসের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। শুধু আমাদের সাথে বাইরের তফাত হল সুইজারল্যান্ড বা স্কটল্যান্ডে প্রতিটা রাস্তা মসৃণ - দুর্গম হলেও। আর সুইজারল্যান্ড হলে এই লাচুং থেকে কাটাও অবধি হয়তো একখানা কেবল কার বানিয়ে দিত। তবে ঐ উচ্চতায় (গুরুদংমার ১৭৮০০ ফুট, কাটাও এবং জিরো পয়েন্ট পনেরো-ষোল হাজার মতন) মোটরেবল রোড - সে যতই ভাঙা হোক না কেন - সম্ভবত: পৃথিবীর আর কোথাও নেই। আমি রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কে গেছি - গাড়ি নিয়েই - সর্বোচ্চ পয়েন্ট ছিলো ১১ হাজার ফুট মতন - অ্যাপারেন্টলি হাইয়েস্ট মোটরেবল রোড ইন দ্য ইউএস।

একটু দুর্গম, অফবীট রাস্তায় যেতেই আমার আনন্দ। আগেরবার চেরাপুঞ্জি যাওয়ার আগে ট্র্যাভেল এজেন্ট প্রচুর অ্যান্টিপুরকি দিয়েছিলো - কি করবেন, ওখানে কিছু নেই, বরং শিলঙে থেকে একটা ডে-ট্রিপ মেরে আসুন। ওর কথা শুনে চললে ঠকতাম। আজ অবধি ঘোরা সেরা জায়গার লিস্ট বানাতে বসলে হাইল্যান্ডস, সুইজারল্যান্ড, নর্থ সিকিম আর চেরাপুঞ্জি তাতে ওপরের চারটে নাম হবে।


নর্থ সিকিমকে আমার নিজের অনেকটা হাইল্যান্ডসের মত লেগেছে। সুইজারল্যান্ড সুন্দর। রাদার, অসম্ভব সুন্দর। কিন্তু আমার একটু বেশি ছবি-ছবি মনে হয়। বড় সাজানো। হাইল্যান্ডস অনেক বেশি ডাউন টু আর্থ। ন্যাচারাল। এক এক সময়ে হাইল্যান্ডস এক এক রূপ দেখিয়েছে।

শীতের সময়ে গেছি - ইনভারনেস ছাড়িয়ে আলাপুলের দিকে চারদিক সাদা, বরফে ঢাকা, কুয়াশা
...

শীত শেষের ঠিক পরে গেছি - বরফ গলে যাওয়ার পর ম্যাড়ম্যাড়ে জমি, সবে ঘাস গজাতে শুরু করেছে।

একটু গরমে গেছি - চারদিক উজ্জ্বল সবুজ, ব্লু-বেলসে ছেয়ে গেছে সমস্ত জমি। আর বৃষ্টির পর সেই সবুজ কয়েকগুণ চোখ ধাঁধানো হয়ে এসেছে।

বছরে একবার অন্তত: হাইল্যান্ডস না গেলে মন কেমন করতো। কেয়ার্নগর্মের পাশে লক্ লাগানের ধারে পাহাড়ের গায়ে একখান ট্র্যাডিশনাল স্কটিশ পাথরে তৈরী বাড়ি দেখে বউকে বলেছিলুম - পারলে এই বাড়িটাতে থেকে যেতুম। লক্ লাগানের ধারে বালির ওপর ঘোড়ায় চড়তুম, আর ঐ বাড়িতে থেকে ওয়ার্ক-ফ্রম-হোম (মানে ইজিচেয়ারে শুয়ে বই পড়া আর কি)
...

নর্থ সিকিম অনেকটাই এই রকম। মনে হয় এও বার বার টানবে।