Saturday, June 27, 2026

একটা অশ্বত্থ গাছের গল্প

কাঁচা হাতে লেখা একটা গল্প। কিন্তু কাউন্টার হেজিমনি বোঝাতে এর চেয়ে ভাল রাস্তা আমার জানা নেই...

।।।   একটা অশ্বত্থগাছের গল্প  ।।। 

কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। দলিতদের ঝুপড়িগুলোর সামনে, একটু ফাঁকা জায়গায় একটা অশ্বত্থ গাছ। বুড়ো হয়েছে গাছটা, মাঝেমধ্যে দু একটা বাচ্চা ছেলে ছাড়া কেউ তার কাছাকাছি আসে না।

হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলে সঙ্ঘের শাখা৷ আশেপাশের তিনটে গ্রাম মিলিয়ে জনা পঞ্চাশ কমবয়সী ছেলে খাকি প্যান্ট পরে ব্যায়াম করে, ধুলো উড়িয়ে লাঠি খেলে, আর জয় শ্রীরাম বলে চিৎকার করে।

অশ্বত্থগাছটা একলাই দাঁড়িয়ে থাকে।

তারপর একদিন ওরা এল। ওরা মানে পার্টি। মিছিল নয়, গাদাখানেক লোকও নয়। একটা মেয়ে।

সুনীতা কুমারী। বছর পঁচিশের মত বয়স। জেলা সদরের কলেজ থেকে আইন পাশ করেছে, চাকরি করে না, ওকালতিও না। মেয়েটা পার্টির মেম্বার। সেই পার্টিটা যার কথা লোকে ভুলতে বসেছিল। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের আধভাঙা পার্টি অফিসে বসে জেলা সম্পাদক — বয়স হয়েছে তার, একটু খুঁড়িয়েও চলে — অনেকদিন আগে পুলিশের লাঠিতে পা ভেঙেছিল, আর সারেনি। একটা হাতলভাঙা চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে একদিন সে সুনীতাকে ডেকেছিল। পার্টি অফিসের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা লেনিন, ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের ছবির নীচে বসে সে বলেছিল — "আমাদের টাকাপয়সা নেই, লোকজনও কমে এসেছে। কিন্তু ওই গ্রামের অশ্বত্থগাছটা আমাদেরই। তুমি যাও — রোজ সন্ধ্যেবেলায় ওখানে বসে থাকবে। স্লোগান দেওয়ার দরকার নেই। শুধু বসে থাকো। অপেক্ষা করো"।

সুনীতা তর্ক করেনি। গ্রামে যাওয়া শুরু করল সে।

প্রথম দিন সন্ধেবেলা, একটা বাঁশের চাটাই, একটা কেরোসিনের লন্ঠন আর সেইদিনের খবরের কাগজটা নিয়ে সে বসে রইল...পাঁচটা থেকে সাতটা, ততক্ষণে গ্রামের বাইরে থেকে শেয়ালের ডাক শুরু হয়ে গেছে। একাই বসে রইল মেয়েটা, কেউ আসেনি তার কাছে। দ্বিতীয়দিন আবার গেল সে, আবারও একই ঘটনা। তিনদিনের দিন, কতগুলো বাচ্চা একটু দূর থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকে দেখে গেল। তার পরের দিন, এক মুসলমান চাষী এসে সুনীতার সামনে বসল হাঁটু মুড়ে। নাম ইউসুফ, আটষট্টি বছর বয়স, আট মাস ধরে সে চক্কর কাটছে বার্ধ্যক্য পেনশনের জন্যে। পায়নি। সুনীতা ইউসুফকে খবর পড়ে শোনাচ্ছিল — একটা নতুন সেচ প্রকল্পের খবর — নদীতে নতুন বাঁধ তৈরী হবে একটা। বুড়ো ইউসুফ পাত্তা দিল না। বললো — "জল নিয়া কী করব আমি? আমার পেনশন দ্যাও। বউ অসুস্থ। ওষুধ কিনতে পারি না। আট মাস ধরে ব্লক অফিসের চক্কর কাটতে আছি। ওরা টাকা চায়, টাকা কোত্থিকে দেব?"

সুনীতা বলে — "কাগজগুলো সব আছে তোমার কাছে"? "কাগজ, হুঁ:", বুড়ো হাসে। সুনীতা হাসে না। বরং পরের দিন একটা প্রো ফর্মা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে আসে সে। বুড়োর সঙ্গে বসে ফর্ম ভরে। তারপরের দিন সকালে বুড়ো ইউসুফকে নিয়ে ব্লক অফিসে যায়। বিডিও দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে — "বার বার আসো কেন বুড়ো? বলে দিয়েছি তো"! সুনীতা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, ফাইল হাতে। সেই দিনটা কেটে যায়। পরের দিন আবার যায় সুনীতা, আবার দাঁড়িয়ে থাকে অফিসারের সামনে। তারপরের দিন আবার। পাঁচ দিনের দিন অফিসার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলে সই করে দেয়। দুই হপ্তা পর ইউসুফের পেনশনের চিঠি এসে পৌঁছয় গ্রামের বাড়িতে। 

ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু এইটুকুই। বিপ্লব নয়। একটা পেনশন মাত্র।

পার্টি কৃতিত্ব চায় না। সমাবেশও করে না এই লড়াইয়ে জিতে। শুধু সুনীতাকে পাঠাতে থাকে। রোজ। দিনের পর দিন। প্রতি সন্ধ্যেবেলা, সেই অশ্বত্থ গাছটার নীচে।

একমাস পর, বুড়ো জেলা সম্পাদক একটা টিনের ট্রাঙ্ক পাঠায় সুনীতার কাছে। ট্রাঙ্কে কয়েকটা বই — ভগৎ সিংকে নিয়ে, একটা আম্বেদরকরের লেখা, কয়েকটা আইনের বই, সংবিধানের একটা কপি, নানান ধরণের ফাঁকা কিছু অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম, একটা বাঁধানো খাতা যেখানে লোকজনের কথা লিখে রাখা যাবে, আর কয়েকটা ডটপেন আর রিফিল। সুনীতা ট্রাঙ্কটা অশ্বত্থ গাছের তলাতেই রেখে দেয়। রোজ বিকেলে পাঁচটার সময় এসে সে ট্রাঙ্কের তালাটা খোলে, আবার সাতটার সময় বন্ধ করে দেয়।

তারপর, আস্তে আস্তে আরো অনেকে আসে অশ্বত্থ গাছের তলায়। দলিত পাড়ার এক বউ — তার ছেলেকে বেধড়ক মেরেছে মহাজনের লোকেরা। ছোট জাতের কমবয়সী জোয়ান ছেলে একটা — লোন চেয়েছিল, কিন্তু ফর্ম ভরতে পারেনি; পড়তেই জানে না সে। এক বিধবা — তার রেশন কার্ড হারিয়ে গেছে। এক চাষা — বড় রাস্তা তৈরীর সময় তার জমি নিয়ে নিয়েছিল সরকার, কিন্তু সে তার প্রাপ্য টাকা পায়নি। সুনীতা তাদের সকলের সঙ্গে কথা বলে। সকলকে সাহায্য করতে থাকে। কোনো গরম গরম বক্তৃতা না দিয়েই। শুধু ফর্ম ভরে, দরকার মত কোথাও ফোন করে, আর একটা পুরনো সাইকেলে চালিয়ে ফাইলভর্তি ব্যাগ কাঁধে এই অফিস, সেই অফিস ছুটোছুটি করে...

সঙ্ঘের শাখার নজর পড়ে অশ্বত্থ গাছের দিকে। একদিন সন্ধ্যেবেলা শাখার প্রচারক এসে পৌঁছয় তর্ক করে সুনীতাকে হারিয়ে দেবে বলে; হেরে গেলে মেয়েটা বিদেয় হবে। প্রচারক অনেক চেঁচায় — লাভ জিহাদ আর হিন্দু ঐক্য নিয়ে, আর...পঁচিশ বছরের একলা মেয়ে সুনীতা সন্ধ্যেবেলা দলিত আর মুসলমানদের ঘরের পাশে কী করছে তাই নিয়েও। দপ্‌ করে জ্বলে ওঠে গাছতলায় বসে থাকা গরীব ঘরের লোকগুলো। কিন্তু সুনীতা রাগে না, চিৎকারও করে না। ঠান্ডা মাথায় শুধু জিজ্ঞেস করে — "এই বউটার রেশনকার্ডের উপায় আছে তোমার কাছে"? মেয়েটার শান্ত মুখ দেখে আর চারপাশে একটু অশান্ত লোকজনের ফিসফাস শুনে প্রচারক আর দাঁড়ায় না সেখানে। "পরে আসব" বলে চলে যায়, কিন্তু আর আসে না।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা ওদের গান শোনায় সুনীতা। শহরের পার্টি অফিসের ঘরে শেখা গান। 

"আজ কমর বান্ধ তৈয়ার হোওয়ে কোটি ভাইয়োঁ, 
হম ভুখসে মরনেওয়ালে, কেয়া মওতসে ডরনেওয়ালে"

গানের সঙ্গে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে গাছতলার মানুষগুলো।

ছয় মাস কেটে যায়। শহরের অফিসে পার্টি একটা মিটিং ডাকে, রাজ্যের বড় নেতাদের নিয়ে। নেতারা জিজ্ঞেস করেন: "কী পেলাম আমরা"? বুড়ো সম্পাদক বলে — "এখনও কিছুই না। তবে ওই অশ্বত্থ গাছটার নীচে এখন অনেক মানুষ আসে তাদের নানান সমস্যা নিয়ে, তাদের নিজেদের কথা বলে তারা। এটুকুও তো আমাদের ছিল না।"

পার্টি এই ছোট্ট মুভমেন্টটাকে ভিত্তি করে আরো বড় মুভমেন্ট গড়বে ঠিক করে। সকলের কাছ থেকে দুশো টাকা করে নিয়ে ওরা একটা টিনের ছাউনি কেনে। অশ্বত্থ গাছের পাশে দলিত পাড়ার মুখে ওই পাড়ার ছেলেদেরই কেটে আনা চারটে বাঁশের খুঁটির ওপর বসে সেই ছাউনি। তারপর পার্টি কেনে আরো একটা ট্রাঙ্ক। একটা ছোট লাইব্রেরি বানায় — শ দুয়েক বই, শহরের লোকজন দান করেছিল। ফসল কাটার আগে সবাই মিলে তৈরী করে শস্যের গোলা একটা। প্রতি সপ্তাহে শহরের এক রিটায়ার্ড উকিল আসতে শুরু করে অশ্বত্থতলায় — একটা লিগাল এইড ক্লিনিক বানিয়ে ফেলে সে। তারপর একটা সহজ যোগাযোগের ব্যবস্থাও বানিয়ে ফেলে নিজেরাই: একটা মিসড কল নেটওয়ার্ক। কারো কোনো জরুরী খবর দেওয়ার থাকলে — পুলিশ রেইড, নতুন সরকারী স্কিম, বাজারে ফসলের দামের বদল — মিসড কল দেবে সে সুনীতাকে। সুনীতা তখনই পালটা ফোন করে সব জেনে নিয়ে পাঁচজন ভলান্টিয়ারকে খবর দেবে, তারা আরও পাঁচজনকে জানাবে...এক ঘন্টার মধ্যে আশেপাশের গ্রামের অন্তত: একশো পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে খবরগুলো। আর, গাছের গুঁড়িতে পেরেক দিয়ে ঠোকা একটা নোটিস বোর্ডে সময়ে সময়ে আপডেট লিখে দেবে কেউ না কেউ...

এক সন্ধ্যেবেলা, কবিতা আসে অশ্বত্থ তলায়। কবিতা, অল্পবয়সী, মাহারদের ঘরের বউ। ক্ষেতে তুলো তুলে পেট চলে তার। দুই বছর আগে শ্বশুরবাড়ির লোক তার মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল জোর করে; মেয়েটা তখনো চোদ্দ বছরের মাত্র। দু বছর না ঘুরতেই বিধবা হয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। কবিতার ছেলে শহরে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করে, মাস গেলে মায়ের ঠিকানায় কিছু টাকা পাঠায়। কবিতা বলে — "আমাকে আর আমার মেয়েটাকে পড়ালিখা শেখাবে"?

শুরু হয় নাইট স্কুল। বাঁধা সিলেবাস নেই। সার্টিফিকেটও নেই। একটা বালব, একটা ব্ল্যাকবোর্ড আর মাটিতে বসা দশটা মেয়েবউ। কেউ মাহার, কেউ মুসলমান, কিন্তু সেসব নিয়ে কেউ ভাবে না। পাশাপাশি বসে তারা অক্ষর চিনতে শেখে। নিজের নাম লিখতে শেখে। তাদের রেশন কার্ডে কী লেখা আছে, পড়ে সেসব। জমির দলিল পড়তে শেখে। ওদেরই একজন হঠাৎ নজর করে যে মহাজন গ্রামের বাসিন্দাদের দুই একর জমি নিজের নামে করে নিয়েছে, এতদিন কেউ জানতোও না।

কবিতা বলে, "চলো তহশিলদারের কাছে যাই"। যায় ওরা। মহাজন তহশিলদারের খাস দোস্ত। মহাজন হা হা করে হাসে। তহশিলদার ওদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ওরা আবার যায়। তারপর আবার। পার্টি একজন উকিলকে পাঠায় জেলা সদর থেকে — চুপচাপ একটা লোক যে খুব একটা মিটিং মিছিল বক্তৃতা করে না। সেই উকিল একটা কেস ফাইল করে মহাজনের নামে। দু বছর লেগে যায় কোর্টে। হেরে যায় ওরা। তারপর আপীল করে। শেষ অবধি জিতেও যায় একদিন। জমি ফেরানো হয় গ্রামবাসীদের কাছে।

মহাজন ওদের জলের লাইন কেটে দেয়। পরের দিন সুনীতা পাশের গ্রাম থেকে একজন পুরনো ইঞ্জিনিয়ারকে ধরে আনে — লোকটাকে এক যুগ আগে বরখাস্ত করেছিল সরকার; ডিপার্টমেন্টের উপরওয়ালার দুর্নীতির ধরে ফেলেছিল সে, আজকাল টিউবওয়েল সারিয়ে পেট চালায়। সে ওদের শেখায় বোরওয়েল কী করে বসাতে হয়। ওরা নিজেরাই করে নেয় কাজটা। মহাজন ওদের থামাতে পারে না।

সেদিন রাতে আগুন জ্বালিয়ে তার চারদিকে ঘুরে নাচে ওরা; গান গায়।

"ইতনে বাজু, ইতনে সর, গিন লে দুশমন ধ্যান সে
হারেগা উও হর বাজি, যব খেলে হম জি-জান সে।"

বুড়ো একলা অশ্বত্থ গাছটা ততদিনে আর শুধু গাছ নয়। আর একলাও নয়। তার নীচে মানুষের ঢল নামে। গ্রামের উল্টোদিকে নীমগাছের পাশে সঙ্ঘের শাখা তখন রোজই চলে। কিন্তু, এখন অশ্বত্থ গাছের তলাতেও গড়ে উঠেছে পালটা জোট। ওরা সঙ্ঘের শাখার মত উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান দেয় না, বরং ওদের জোট বিকল্প হিসেবে রোজকার জীবনের চাহিদার কথা বলে। মেটিরিয়াল রিয়েলিটি। আর কোনো পেনশন আটকে থাকে না। থানার মিথ্যা মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয় ওদের ওপর থেকে। আধিপত্যবাদের কফিনে পোঁতা হয় আরও একটা পেরেক।

আরও দু বছর কাটে। পরের পঞ্চায়েত ভোটে পার্টি চমকে দেয় সকলকে। আগে কখনও এমনটা করেনি তারা। নিজেরা প্রার্থী না দিয়ে পার্টি সমর্থন করে কবিতার মেয়েকে। মাহী। সেই মেয়ে, যাকে চোদ্দ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল কবিতার শ্বশুরবাড়ির লোক৷  মাহীর বয়স আজ কুড়ি বছর; ওই অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে লিখতে পড়তে শিখেছে সে; জমির ঘটনাটা প্রথম নজরে পড়েছিল তারই; বোরওয়েলটা বসানোর সময় নিজের মাথায় করে ইঁট বয়েছিল সে। মাহী জিতে যায় বারো ভোটের ব্যবধানে।

লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করেনি মাহী। নিজেকে কমিউনিস্টও বলেনি। কিন্তু সে খেয়াল রেখেছিল যাতে গাছতলার সেই ছাউনিটা মেরামত হয়; বোরওয়েল পরিষ্কার করা হয়; আর স্কুলের বাড়িটায় একটা নতুন টয়লেট বসে।

পার্টির বুড়ো জেলা সম্পাদক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এক সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছয় অশ্বত্থতলায়। গাছের তলায় বসে সে দেখে — আশেপাশে বেশ কয়েকজন বউ মেয়েরা লন্ঠনের আলোয় পড়ছে। বুড়ো সুনীতাকে বলে — "একেই বলে অবস্থানের যুদ্ধ। বক্তৃতা নয়। মিছিলও নয়। শুধু একটা গাছতলা, একটা 
টিনের ট্রাঙ্ক, আর সময়"।

সুনীতা হাসে। চোখ তুলে বলে, "আর, একটা পার্টি যে জানে কখন মুখ বুজে কাজ করে যেতে হয়"।

সেই অশ্বত্থ গাছটা আজও আছে। ট্রাঙ্কটাও। নাইট স্কুলটাও। আর আছে সেই পার্টিটাও। লাল ঝান্ডার পার্টি। আগের মত শুধু স্লোগান দেওয়া ভোটে লড়া পার্টি নয়। নতুনভাবে, ধৈর্য্য ধরে দিনের পর দিন মানুষকে নিয়ে জোট বাঁধার বোরিং কাজগুলো করে যাওয়া পার্টি। এমন একটা পার্টি যারা শুধু গলা তুলে আরো জোরে চেঁচিয়ে জেতার চেষ্টা করে না; এই পার্টিটা জেতে আম আদমির সমস্যার সমাধান ছিনিয়ে এনে — যে সমস্যার সমাধান শাসকশ্রেণী করতে চায় না। এই পার্টিটা জেতে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জোট বেঁধে।

এমনটাই হয় কাউন্টার-হেজিমনি...একমাত্র পথ যেটা কাজ করে।
=======================================

প্রায় মাসখানেক ধরে লিখছিলাম এই হিন্দুত্ববাদের ন্যারেটিভ বিল্ডিং নিয়ে, ভোটের আগে থেকেই। আপাতত আমার জানাবোঝা এইটুকুই। জ্ঞান দেওয়ার জন্যে লেখা উদ্দেশ্য ছিল না, বরং যে কথাগুলো নানান বই আর আর্টিকলে রয়েছে, প্রধাণত ইংরিজীতে, সেইগুলোকে কম্পাইল করে সহজবোধ্য বাংলায় একটা ডকুমেন্টেশন করতে চেয়েছিলাম। অনেকে পড়েছেন, অনেক শেয়ার হয়েছে, অনেকেই প্রশংসা করেছেন। আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। 

আরো কিছু মেটিরিয়াল পেলে এই সিরিজের মধ্যেই লিখে রাখব। আপাতত কিছুদিনের বিরতি।

কাউন্টার হেজিমনির কথা

একটা অলেখা গল্পের একটুখানি দিয়ে শুরু করি।

"কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলতো সঙ্ঘের শাখা৷ দলিতদের এলাকার সামনে একটা একলা অশ্বত্থ গাছ। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় সেই গাছের নীচে একটা কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে একটা মাদুর বিছিয়ে বসতো বছর পঁচিশের সুনীতা। সুনীতা কুমারী। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু ওকালতি করে না। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের পার্টি অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে এই গ্রামটায়। সঙ্গে কোনো পোস্টার নেই, পতাকা নেই; সুনীতার সম্বল দুই চোখ ভরা স্বপ্ন, আর কাপড়ের পার্সের ভিতরে পার্টির একটা মেম্বারশিপ কার্ড। সে এসে বসতো একটা পুরনো টিনের ট্রাঙ্ক নিয়ে — তাতে থাকত কিছু বই: ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের বই, একটা আইনের বই, একটা সংবিধানের কপি, কিছু ফর্ম, একটা খাতা আর ডটপেন। সুনীতা গ্রামের প্রান্তিক মানুষজনের কথা শুনত, তাদের সাহায্য করত — কারো ফর্ম ভরে দিয়ে, কারো পেনশন আনার জন্য প্রতিদিন বিডিওর দপ্তরে গিয়ে; গল্প বলতো — জল-জমি-জঙ্গলের অধিকারের গল্প, রুজি-রুটির লড়াইয়ের গল্প। গান শোনাতো..."হাম ভুখসে মরনেওয়ালে"। দিন কাটতো। তারপর, পাঁচ বছর পর, একদিন, পঞ্চায়েত ভোটের পরে, সেই অশ্বত্থ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, সুনীতার হাত ধরে, শপথ নিল গ্রামের প্রথম দলিত মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান..."

আমাদের কাউন্টার-হেজিমনির ভিত্তি এই গল্পটাই। গল্পটা শেষ করব পরের পর্বে, শেষ পর্বে। আজ লিখব হেজিমনি কীভাবে ভাঙা যেতে পারে তাই নিয়ে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিংটুকু। গ্রামশি আছে, সঙ্গে চার্বাকও - বকলমে পার্থ চ্যাটার্জী।

আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…

আগের দুটো পর্বে লেখার চেষ্টা করেছিলাম কীভাবে হিন্দুত্ব তার ওয়ার্ল্ডভিউকে কমন সেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে প্রায় একশো বছরের অবস্থানের যুদ্ধের মাধ্যমে - স্কুল, মিডিয়া, মন্দির, দৈনন্দিন অভ্যাসের স্পেসকে দখল করে। গ্রামশির কথা মানলে আমরা এও বুঝি যে কোনো আধিপত্যই চিরকালীন নয়। বেকারত্ব, রোজকার রুজি-রুটির লড়াই, হিন্দুত্বের ভিতরের জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক প্রতিরোধ, নানান কারণে অস্থির যুবসমাজ - অনেক ফাটল রয়েছে এই হেজিমনির মধ্যেও। তবে ফাটল রয়েছে মানেই আপনাআপনি সেই ফাটলে বিপ্লবের গাছ গজাবে, এমনটাও নয়।

গ্রামশি বলেন পাল্টা অবস্থানের যুদ্ধের কথা। চটজলদি ভোটে জেতার স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। হঠাৎ কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা আকাশ থেকে নেমে এসে মুশকিল আসান করে দেবেন - এই খোয়াব দেখেও লাভ নেই। একটা দুটো বা দশটা বিশাল মিছিলেও বিশেষ কিছু হবার নয়। বরং, অনেক ধৈর্য্য ধরে, অনেক সময় নিয়ে কিছু কাজ করে যেতে হবে, আপাতদৃষ্টিতে যেগুলো বড়ই বোরিং কাজ - যেমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে থেকেই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল তুলে আনা, সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করা, আর একদম গ্রাউন্ড-আপ একটা পাল্টা ঐতিহাসিক জোট (historic bloc) তৈরী করা…

পার্থ চ্যাটার্জীর হাত ধরে চার্বাক ফিরে এসেছেন — সেই প্রাচীন সংশয়বাদী দার্শনিক চার্বাক — যিনি এই ধারণাগুলোর একান্ত ভারতীয় রূপ তুলে ধরেন আমাদের সামনে। চার্বাকের কথা অনুযায়ী ভারত কোনো "হিন্দু রাষ্ট্র" নয়, আবার এলিট থিওরেটিকাল "বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র" বলেও ভারতকে ডিফাইন করা যায় না। ভারতের ইতিহাস, ভারতের সমাজ, সেই সমাজের মানুষজনকে দেখলে ভারত, প্রকৃত অর্থে, একটা "ফেডারেশ অফ পিপলস" — পিপলস ইন প্লুরাল, কারণ এই ভূখন্ড সত্যিই বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতি, বহু ধরণের জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। বলতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে রঙিন আর কমপ্লেক্স মেলা। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব আইডেন্টিটি; সবচেয়ে বড় কথা, নানান তফাত থাকা সত্ত্বেও এরা সকলেই একটা অভিন্ন সংবিধানের ছাতার নীচে একসাথে বসবাস করতে রাজী হয়েছে; অন্তত হয়েছিল একটা সময়। সেই সম্মতি বা সমঝোতা বাইরে থেকে ভেসে আসেনি। বেশ জটিল, অগোছালো এবং খানিক অসম্পূর্ণ আলোচনার ফসল এই সমঝোতা, যাকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বাধীনতার পর থেকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আজ তারা অনেকাংশে সফল। ফেডারেশন অফ পিপলস-এর বদলে তারা আনতে চাইছে পুরোপুরি সেন্ট্রালাইজড, মেজরিটারিয়ান, এক দেশ এক ভাষা এক আইডেন্টিটি এক পোশাক এক খাদ্যাভ্যাসের তথাকথিত হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান।

শুরুতেই এই প্রচেষ্টাকে "নো থ্যাঙ্কিউ" জানিয়ে চলুন একবার চেষ্টা করি এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধ পথ খুঁজে বের করতে। এক্ষেত্রে কাউন্টার-হেজিমনির পথ, অর্থাৎ সেই ফেডারেশন অফ পিপলস-কে আবার বাঁচিয়ে তোলার রাস্তা। শুধু "বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য"-এর এলিট স্লোগান নয়, বরং বাস্তবিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঝাঁকুনি দেওয়া ফেডারেশন যেখানে সম্পদের পুনর্বন্টন হবে, যেখানে ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্য আর স্থানীয় অঞ্চলগুলোই নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে, দিল্লীবাসী কোনো সুপ্রীম লীডার নয়।

প্রশ্ন হল – কীভাবে?

প্রথমতঃ, অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল - গ্রামশির বক্তব্য ছিল এই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে সমস্ত সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে; এমন মানুষ যাঁরা তাঁদের নিজেদের ভাষায় নিজেদের কথা বলবেন; ওপর থেকে উপদেশ দেবেন না। আরএসএস এই তত্ত্বটা ভালো বুঝেছিল। ফলে, তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই নিজেদের কথা বলার লোক তৈরী করেছিল - প্রচারক, স্কুলশিক্ষক, মন্দিরের পূজারী, আখড়ার মহন্ত, আধুনিক কালে ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার - যারা সকলেই স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় সংস্কৃতি, স্থানীয় ইমেজারি ব্যবহার করে একটা প্যান-হিন্দু আইডিয়া বেচতে পেরেছে সফলভাবে। উল্টোদিকে, সেকুলার লেফটের মধ্যে এতদিন অবধি যারা এই জায়গায় ছিল, তারা প্রায় সকলেই ইংরিজীতে শিক্ষিত, ইংরিজীতে কথা বলাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ, ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান ফিলোজফারদের উক্তি তাদের মুখে মুখে ফেরে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সংস্কৃতি তাদের কাছে ব্যাকওয়ার্ড...এক কথায় একটা "এলিট" সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষের কাছে খানিক অন্য গ্রহের বাসিন্দা টাইপ। কাউন্টার হেজিমনি এই ছকে তৈরী হবে না। যেমন ধরুন আমি, কলকাতায় জন্ম বড়-হওয়া একটা লোক যার সঙ্গে কোচবিহারের কোনো সম্পর্ক নেই, দুম করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মুখিয়া হতে গেলে কেউ মানবে না। অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে এই সমস্ত কমিউনিটি — দলিত, আদিবাসী, ওবিসি, মুসলমানদের মধ্যে থেকেই। তারা নিজেদের দাবীদাওয়া চাহিদার কথা বলবে। কথা হবে পেরিয়ারকে নিয়ে, আম্বেদকরকে নিয়ে, ভক্তি আন্দোলনের জাতপাতবিরোধী দিকগুলো নিয়ে, দ্রাবিড় মুভমেন্টের ফেডারেলিজম নিয়ে। আর এই মানুষগুলোকে উঠে দাঁড়ানোয় সাহায্য করতে থাকবে  স্কলারশিপ, নাইট স্কুল, কো-অপারেটিভ লাইব্রেরি, আইনি সহায়তা, ট্রেড ইউনিয়ন - কিছু দায়িত্ব তো আপনিও নেবেন, নাকি?

দুই নম্বরে আসে কালচার ওয়ার - সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। যেখানে সংস্কৃতি কোনো জগদ্দল পাথর বা মোনোলিথ নয়। হিন্দুত্ব এই সংস্কৃতিকে মোনোলিথ বানিয়ে ফেলতে চেয়েছে, এবং অনেকাংশে তারা সফলও। কারণ, তাদের গল্পটা সোজাসাপটা। তাদের ডেফিনেশনে ভারত আদিকাল থেকেই একটা হিন্দু রাষ্ট্র; মুসলমান আর ক্রিশ্চানরা এই দেশে বহিরাগত; দেশপ্রেমিক হওয়ার একমাত্র রাস্তা হল তাদের রাগী চেহারার সিক্স প্যাকওয়ালা রামকে কুর্ণিশ করা, আর হিন্দিতে কথা বলা। হিন্দি - হিন্দু - হিন্দুস্তান। পার্থ চ্যাটার্জীর চার্বাক এই মিথকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেন। চার্বাক আমাদের জানান যে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী প্রতীক ও আখ্যান রয়েছে – সঙ্ঘ পরিবার যাকে তাদের ইচ্ছেমতো মুছে দিতে চায়: দক্ষিণে তামিল তাই, তেলগু তাল্লি, কানাড়া তায়ি, কেরলম; ঝাড়খন্ডে সিধু কানু, বীরসা মুন্ডা; মহারাষ্ট্রে শিবাজী; মণিপুরে মেইতি ইমা; পঞ্জাবে ওয়ারিস শাহ। আলাদা আইকন হলেও কোনোটাই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনা নয়, বরং ফেডারেশন অফ পিপলস-এর মূল মন্ত্র এই আঞ্চলিক সংস্কৃতি। কাউন্টার হেজিমনির জন্যে পাল্টা-সংস্কৃতির লড়াই: ওয়েব সিরিজ, সেখানে মুসলমান নার্স ইউনিয়ন তৈরী করে সহকর্মীদের জন্য লড়াই করে; দলিত কমিউনিটির জাতপাতবিরোধী লড়াইয়ের গল্প নিয়ে গ্রাফিক নভেল; আম্বানি-আদানিদের মুনাফালুটকে ব্যঙ্গ করে লোকসঙ্গীত (হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মাউন্টব্যাটন সায়েব গানটা মনে পড়ে); সঙ্ঘের ঘরের পাশে ঈদের ইফতার পার্টি আর আম্বেদকর মেলা; পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে মেয়েদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে, পণপ্রথা বিরোধী গল্প নিয়ে যাত্রা; আঞ্চলিক ধর্মীয় সিঙ্ক্রেটিজমের ট্র্যাডিশনের গল্প - সুফি-ভক্তি হেরিটেজ, সত্যপীর বা বনবিবির কথা, বাউল, ফকির, দরগা আর ক্রিসমাস ক্যারলও। বৈদিক মন্ত্র যতটা ভারতীয়, আমাদের এই ট্র্যাডিশনগুলোও ঠিক ততটাই…চাঁদ সদাগরের মণসাপুজোর মত করে লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ দিয়ে সংস্কৃতির যুদ্ধ হয় না; সংস্কৃতি ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন নয়; কমন সেন্স তৈরী করার অস্ত্র।

তিন, রোজকার জীবনের বিকল্প প্রতিষ্ঠান - প্রতিদিনের খাওয়াপরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ার। সঙ্ঘ শাখা তৈরী করেছিল, রোজ সকাল সন্ধ্যেয় তারা একসঙ্গে কিছু একটা চর্চা করত। এখনও করে। কাউন্টার-হেজিমনিকে দাঁড় করাতে এর বিকল্প প্রয়োজন। যেমন ধরুন পাড়ার লাইব্রেরি, যেখানে ছোট স্টাডি সার্কল বসবে, সাধারণ লোককে সঙ্গে নিয়ে। এলিট নাটক প্রবন্ধের চর্চা শুধু নয়, পপুলার কালচার থেকেও মেসেজ বের করে আনা সম্ভব - যেমন ধরুন মার্ভেলের সিনেমা - জেন-জি-দের পছন্দের গল্প; জয় ভীমের মত সিনেমা যেখানে জাতের লড়াইয়ের কথা রয়েছে; ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে অনুবাদ হয়ে আসা নানান প্রদেশের মানুষের গল্প; নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বাংলা অনুবাদে টিনটিনের গল্প; বাংলা ক্লাসিক - তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের...(আরো অনেক নাম আসতে পারে এখানে, বিভিন্ন ভাষায় আলাদা নাম, হরিনারায়ণ আপটে মনে পড়ছে যেমন)। প্রতি সপ্তাহের শেষে কমন সেন্স ওয়ার্কশপ — সেখানে সবাই মিলে সপ্তাহের খবরগুলো পড়ে আলোচনা করতে পারে: খবরে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সেই ঘটনায় লাভ কার? যেমন ধরুন কোথাও একটা যুদ্ধ হলে কারা লাভবান হয়? তেলের দাম বাড়লে লাভ কার, ক্ষতি কার? একটা একটা করে এরকম ওয়ার্কশপ ছড়িয়ে পড়তে থাকলে বাড়তে থাকবে এই নতুন কাউন্টার কমন সেন্স...বক্তৃতা দিয়ে নয়, বরং শেয়ার্ড এক্সিপিরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে।

চার, নতুন ঐতিহাসিক জোট বা হিস্টোরিক ব্লক। কিন্তু সমস্ত শ্রেণীগত তফাত মুছে একেবারে ফ্ল্যাট সমতল করে দিয়ে নয়। হিন্দুত্ববাদী জোটের অংশীদার উচ্চবর্ণের পুঁজিপতি ব্যবসাদার, উচ্চমধ্যবিত্ত প্রফেশনাল - আইটি ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ডাক্তার ইত্যাদি, আর অন্য পিছিয়ে-পড়া শ্রেণীর লোকজন যাদের হিন্দু হায়ারার্কিতে ওপরে ওঠার উচ্চাশা রয়েছে। এদের সকলের মধ্যে কমন সুতোটা বাস্তবে মুসলমান বিদ্বেষ — সে নানাভাবে এসে থাকতে পারে, যেমন দেশভাগের জেনারেশনাল মেমরি, বা "মুসলমানরা সব দখল করে নিল"-মার্কা হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড, এমনকী নানান অবদমিত ইচ্ছা থেকেও। কাউন্টার-হেজিমনির নতুন হিস্টোরিক ব্লক হবে একেবারেই আলাদা। এই জোটের কমন সুতো জাতিবিদ্বেষ না হয়ে হবে অভিন্ন বস্তুগত স্বার্থ, যেমন জমির অধিকার, জল জঙ্গলের অধিকার, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির অধিকার। সম্প্রদায়ের সীমানা ছাপিয়ে ইস্যুভিত্তিক প্রচার প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছবে। জল জঙ্গল জমির অধিকার জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, উঁচুনীচু, গরীব-বড়োলোক, ধার্মিক-অধার্মিক মানে না। সমস্ত জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এই জোটে, থাকবে না আদর্শগত বিশুদ্ধতার শুচিবাই। ধার্মিক হিন্দু মানেই হিন্দুত্ববাদী নয়, বুঝতে হবে এই দুটো শব্দের মানে আলাদা। আমি নাস্তিক, কাজেই আমার এই জোটে সবাইকে নাস্তিকই হতে হবে — সে জোট জন্মানোর আগেই তার গঙ্গাপ্রাপ্তি নিশ্চিত।

পাঁচ নম্বর - যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার আন্দোলন। ক্ষমতা ফিরবে রাজ্যের হাতে। শুধু বিজেপির শাসনকালেই নয়, ভারতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই। মোদির আমলে এই টেন্ডেন্সি চরম রূপ নিয়েছে, কারণ হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্যই হল ফেডারেশ অফ পিপলস-এর আইডিয়াকে মুছে দিয়ে এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম-এর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ন্যারেটিভকে ফাইনাল রূপ দেওয়া। ৩৭০ ধারার বিলোপ, হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া নানাভাবে, ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসিকে গায়ের জোরে চাপানো, পছন্দের রাজ্য সরকার না হলেই ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন-দের লেলিয়ে দেওয়া...বর্তমানে জুডিশিয়ারিকেও — সবই একটা ইউনিটারি মেজরিটারিয়ান রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে। এর পাল্টা কৌশল হল ফেডারেলিজমের পক্ষে ক্রমাগত গলা ফাটানোঃ রাজ্যের হাতে আরও ক্ষমতা; স্থানীয় সরকার, যেমন কর্পোরেশন বা পঞ্চায়ের হাতে আরও রিসোর্স; ভাষাগত আর সাংস্কৃতিক স্বশাসনের দাবী এবং সাংবিধানিক অধিকার; কেন্দ্রীয় আদিবাসী অঞ্চলগুলোকে ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা। সংবিধানে বলা যুক্তরাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী সমস্ত আইন প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাজ্যগুলোর রয়েছে, অন্ততঃ যতদিন না এই সরকার সংবিধানকেই বদলাতে পারছে — আর সেটা হতে দেওয়া যাবে না।

সবশেষে, এই লড়াইয়ের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা। গ্রামশি বলেছিলেন – যে দল গণতন্ত্র চর্চা করে না, তারা আধিপত্যের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে না। বাস্তব বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরণের মুভমেন্ট বা দলগুলোর ভিতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে এলিট উচ্চবর্ণের পুরুষদের মধ্যে। বাকিরা সেখানে ভোটব্যাঙ্ক। হ্যাঁ, একজন বামপন্থী কর্মী হয়েও লজ্জা না পেয়েই এই কথাটা বলছি, কারণ এটা বাস্তব। অধিকারের কথা বলবেন, অথচ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি থাকবে না সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় – তা তো হয় না। দরকারে অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ থাকবে; নিয়ম করে জাতিবাদ-বিরোধী, পিতৃতন্ত্র-বিরোধী প্রশিক্ষণ থাকবে দলের মধ্যেই – বিভিন্ন অফিসে যেমন প্রতি বছর নিয়ম করে POSH এর কোর্স করতে হয়। আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্বে থাকবে স্থানীয় লোক, দিল্লী থেকে নেমে আসা এলিট নেতা নয়। ইংরিজীতে একটা প্রচলিত কথা রয়েছে — “ডু হোয়াট ইউ সে”।

শুরুতেই যেমন বলেছিলাম — এই কাজগুলোর কোনোটাই গ্ল্যামারাস নয়। যন্তরমন্তরের অবস্থানে স্লোগান দেওয়ার মত উত্তেজনাপূর্ণ নয়। বোরিং কাজ যা জনসমক্ষে আসার সম্ভাবনা কম, কারণ অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে থাকা সুনীতা কুমারীকে মিডিয়া দেখাবে না। অবস্থানের যুদ্ধ এরকমই হয়। ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত। দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য্যের পরীক্ষা।

গ্রামশির কথা ধার করেই বলি: The old world is dying – কংগ্রেস স্টাইলের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান মৃতই বলা যায়। The new world – ন্যায়পরায়ণ, বহুত্ববাদী, ফেডারেল রিপাব্লিক – is not yet born. In this interregnum, a great variety of morbid symptoms –  lynching, surveillance, hate speech – appear – as entertainment.

আমরা ওই ইন্টারেগনামে রয়েছি। নতুনের পথে এগিয়ে যেতে আমাদের সম্বল শুধু অসীম ধৈর্য্য আর পরিশ্রম। নতুনকে নিখুঁত গভীরতার সঙ্গে তৈরী করতে পারলে সেখান থেকেই উঠে আসবে নতুন কমন সেন্স। সঙ্ঘের অনুকরণে নয়, বরং আমাদের – সাধারণ মানুষের – নিজেদের প্রতিষ্ঠান, নিজেদের আখ্যান, নিজেদের আইন, নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে। এলিট ইংরিজীতে নয়; সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়।

চার্বাক তাঁর পান্ডুলিপির ইতি টানেন নতুন প্রজন্মকে ডাক দিয়ে: সংহতির কথা বলো; লেখো, গান গাও, বিতর্ক করো, সংগঠিত হও; নিজেদের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করো। নেতার অপেক্ষায় বসে থেকো না। এই দেশ, এই ভূখন্ড, এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষের — যদি প্রত্যেকে একসঙ্গে এই মাটিকে নিজের করে নেয়।

অশ্বত্থ গাছটার নীচে ফিরে যাও কমরেড। টিনের ট্রাঙ্কটা সঙ্গে রেখো। একজনকে পড়তে শেখাও।

[কাল সুনীতার গল্পটা শেষ করব। লেখাটাও।]

ন্যারেটিভ তৈরীর আধুনিক ইতিহাস

সঙ্ঘ পরিবারের স্ট্র‍্যাটেজির কথা লিখেছিলাম — কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কীভাবে হয়, ন্যারেটিভ কীভাবে তৈরী হয় — যেখান থেকে আজকের মত সাংস্কৃতিক আধিপত্য আসে। কিন্তু এই আধিপত্য তো এন্ড প্রোডাক্ট। আর, সঙ্ঘ পরিবারের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এই এন্ড প্রোডাক্টে পৌঁছবার পদ্ধতি। রান্নার রেসিপির মত করে যদি ভাবেন, তাহলে উপাদানের কথাও বলতে হয় — যেগুলোকে ব্যবহার করে এই এন্ড প্রোডাক্ট তৈরী হয়েছে। কথাটা মাথায় এল কারণ আগের পোস্টে (আধিপত্যবাদ নিয়ে) কিছু কমেন্ট এসেছিল সিমিলার প্রশ্নসহ। তাই মনে হল এটাও লিখে রাখি...

এখানেও একটা ডিসক্লেমার — এগুলো সবই এখানে ওখানে নানান বই আর আর্টিকল পড়ার পর আমার নিজের সঙ্গে কথা বলার ফসল। ফাঁকফোকর থাকাটাই স্বাভাবিক। চাইলে ভরাট করতে সাহায্য করতে পারেন।

শুরুটা এইভাবেই করি — আজকের অল-পার্ভেসিভ হিন্দুত্ব আইডিওলজি আচমকা ঘটনা নয়। সাধারণ মানুষের ডিএনএ তো দুম করে পালটে গিয়ে তার মধ্যে জম্বি জিন ঢুকে যায়নি। এই ঘটনাটা প্রায় একশো বছর ধরে চলা পরিকল্পিত প্রোজেক্টের প্ল্যানড আউটকাম — যে প্রোজেক্টের অঙ্গ হিসেবে খুব দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন ন্যাশনাল ক্রাইসিসের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ কিছু মুহূর্তকে কাজে লাগানো হয়েছে।

সেকুলার আদর্শ থেকে হিন্দু জাগরণ — এই নীতিগত পালাবদলটা হল কীভাবে?

স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের জাতীয় আইডেন্টিটি ছিল সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। এই আধুনিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের সেই রূপকল্পের অগ্রদূত ছিলেন নেহরুর মতো নেতারা।

ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটা আলাদা করে সংবিধানের প্রিঅ্যাম্বলে জোড়া হলেও সংবিধানে সেই এসেন্স সংবিধানপ্রণেতারা শুরু থেকেই রেখেছিলেন — এই কথাটা সুপ্রীম কোর্টও ঘোষণা করেছিল এই শব্দটা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা মামলা করার সময়ে। বিজেপি যে ভদ্রলোককে তাদের মহান নেতা বলে মানে, সেই অটল বিহারী বাজপায়ীও জোরের সঙ্গেই এই ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই ঘোষণা করেছিলেন। আজকে ময়ূরকুসুমের মত সাংবাদিকরা চ্যানেলে চিৎকার করে সেকুলারদের দেশছাড়া করতে চাইলেও এই ইতিহাসটা বদলানোর নয়।

হিন্দুত্ব আন্দোলন তার জন্মলগ্ন থেকেই এই ধারণাকে আমূল চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এসেছে। মূল বক্তব্য (আগে বহুবার লেখা) হল ভারত একটা হিন্দুরাষ্ট্র, এমন একটা সিভিলাইজেশনাল এন্টিটি যার আইডেন্টিটি আদিকাল থেকে একইরকমভাবে থেকে যাওয়া হিন্দু সংস্কৃতি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আইডিয়াটা এক বড় সংখ্যক মানুষের ওপরে প্রভাব ফেলেছিল — স্পেশ্যালি তাদের ওপর, যারা গণতন্ত্র, বহুত্ত্ববাদ ইত্যাদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বলে মনে করত, এবং নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও প্রান্তিক হিসেবে দেখত।

আশির দশকের একাধিক ঝড়ে মোড় ঘুরতে শুরু করে ভারতের এই সেকুলার আইডেন্টিটির। বিশেষ করে ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ — এই তিন বছরের মধ্যে। সঙ্ঘ পরিবার দুটো ইভেন্টকে সামনে রেখে মোবিলাইজ করতে শুরু করে৷ দেশ জুড়ে একটা অভাবনীয় সেন্টিমেন্টের ঢেউ তৈরী হয়।

(১) শাহ বানু মামলা (১৯৮৫): সুপ্রীম কোর্ট একজন মুসলমান মহিলার ভরণপোষণের রায় দেয়, বিরোধিতা করে মুসলমান ধর্মীয় নেতারা। রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস সরকার, ১৯৮৪ সালে নজিরবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসার পরেও, ধর্মীয় নেতাদের তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে সংসদে আইন পাশ করে সেই রায় বাতিল করে। রেট্রোসপেক্টে বলা যায় এটা একটা বড় ভুল ছিল। রাইটউইং হিন্দু রাজনৈতিক শক্তি এই ঘটনাকে লুফে নেয় "জাতীয়" (পড়ুন হিন্দু) স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সংখ্যালঘু তোষণের উদাহরণ হিসেবে।

(২) রামানন্দ সাগরের রামায়ণ (১৯৮৭-৮৮): দূরদর্শনে প্রচারিত এই সিরিয়াল মোটামুটি ন্যাশনাল ইভেন্টে পরিণত হয়েছিল; সাধারণ মানুষ স্নান করে, টিভিতে মালা পরিয়ে, আশেপাশের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে একসঙ্গে বসে দেখত এই মহাকাব্যের সিরিয়ালাইজেশন। মনোরঞ্জনের জগতে প্রথমবার কোনো হিন্দু মহাকাব্যের এরকম জাঁকজমকওয়ালা ভার্সন একই সঙ্গে কোটি কোটি ঘরে পৌঁছেছিল। তৈরী হয়েছিল এক শেয়ার্ড ইমোশন, আর একটা ধর্মীয় ন্যাশনাল আইডেন্টিটি। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সফট-পাওয়ার ক্যাম্পেন, যেখান থেকে সেই "কমন সেন্স" পিরিয়ডের শুরু।

এই আইডেন্টিটি যখন তৈরী হচ্ছে, তখন একের পর এক ক্রাইসিসের সময়ে সমাজের বিভিন্ন ফাটলের সুযোগ নিয়েছিল সঙ্ঘ পরিবার।

প্রথমেই আসবে কংগ্রেসের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কথা। স্বাধীনতার সময় থেকে এই জাতীয় কংগ্রেসকে সামনে রেখেই একটা ইনক্লুসিভ জাতীয়তাবাদী চেতনা তৈরী হয়েছিল। আশির দশকের শেষের দিকে সেই কংগ্রেস ডিসক্রেডিট হতে শুরু করে। লাগামছাড়া দুর্নীতি (বোফর্স উদাহরণ), গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, আরো নানান দুর্বলতার ফলে জাতীয় স্তরে কংগ্রেস বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় অর্জিত ভারতীয়ত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণের মরাল অথরিটি বেরিয়ে যায় কংগ্রেসের হাত থেকে। এই সময়ে পরপর কিছু ঘটনা ঘটে সঙ্ঘ পরিবারের সক্রিয়তায়। রামমন্দির আন্দোলন জোর কদমে শুরু হয়, রাজীব গান্ধী সরকার শাহ বানু মামলার পরে সংখ্যাগুরু হিন্দুকে তুষ্ট করতে বাবরি মসজিদের তালা খুলে দেয়। নব্বইয়ের শুরুতেই হয় আদবাণীর রথযাত্রা, এবং সঙ্গে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা। রামমন্দির আন্দোলনের ভায়োলেন্ট ক্লাইম্যাক্স ঘটে যায় ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে। হিন্দু জনগোষ্ঠীর জমে থাকা রাগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে ক্ষমতায় আসতে শুরু করে।

এর পাশাপাশি ১৯৯১ সালে গ্যাটের হাত ধরে লিবারেলাইজেশনের সময় আসে অর্থনৈতিক ভূমিকম্প। স্বাধীনতার পরবর্তী খানিক সোভিয়েত ধাঁচে গড়া অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ভাঙা শুরু হয়। আমরা যতই দেশীয় অগ্রগতির কথা বলি না কেন, নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের দুর্দশার শেকড় লম্বা হতে শুরু করে এই সময়েই। আর এই ক্যাওসের মধ্যে সঙ্ঘ পরিবার দেশীয় আইডেন্টিটি রক্ষা করার কথা বলতে শুরু করে দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বদেশী ধাঁচের অর্থনীতির ছবি এঁকে। আজকের বিজেপি সরকার দেশীয় ক্রনি ক্যাপিটালিস্টদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত থাকলেও নব্বইয়ের দশকে সঙ্ঘের দাবী ছিল অন্যরকম।

এবং ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা। নরেন্দ্র মোদীর তত্ত্বাবধানে ঘটে যাওয়া গণহত্যা। বলা ভাল এথনিক ক্লেনসিং। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বাজপায়ী মোদীকে রাজধর্ম পালন করার কথা বললেও মোদীর গুজরাট বিজেপি এর পর প্রকাশ্যে ইসলাম বিরোধী রাজনীতিতে ভর করে ভোটে জিতে আসে। প্রমাণ হয়ে যায় যে বর্তমান ভারতে উগ্র সাম্প্রদায়িক স্ট্যান্ড রাজনৈতিকভাবে কোনো লায়াবিলিটি তো নয়ই, বরং নির্বাচনী অ্যাসেট, এবং হিন্দুত্বের নরমন্থী মুখও (বাজপায়ী) সাম্প্রদায়িক হিংসার সামনে অচল। ২০১৪ সালে জাতীয় মঞ্চে মোদীর আবির্ভাব বুঝিয়ে দিয়েছিল যে মোদীর হিন্দুত্ব যে কোনো মূল্যে জয়ী হতে চায়।

আজকের অস্থিরতার অনেক কিছুরই শেকড় রয়েছে সেই আশির দশক থেকে নতুন শতাব্দীর শুরু অবধি। নেলি গণহত্যা; কাশ্মীর; খলিস্তান; ১৯৮৪ সালের শিখ দাঙ্গা; আসাম এনআরসি; ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব আইন বদলে জাস সোলি থেকে জাস স্যাঙ্গুইনির পথে হাঁটতে শুরু করা; লিবারেলাইজেশনের পথে একের পর এক পদক্ষেপ; জাতিগত আইডেন্টিটি পলিটিক্সের উত্থান, এবং দলিত রাজনীতির এজেন্সি কিছু বিশেষ পরিবারের কুক্ষিগত হয়ে যাওয়া...এরকম বেশ কিছু ঘটনা যার মধ্যে দিয়ে হিন্দুত্বের কমন সেন্স পাকাপোক্ত হতে শুরু করে।

২০১০ সালের আশেপাশে, ফিজিক্সের ভাষায় যাকে বলে ক্রিটিকাল মাস — সেইখানে পৌঁছে যাই আমরা। দুর্নীতি, আরো নানাবিধ অসন্তোষকে হাতিয়ার করে ইন্ডিয়া আগেইন্সট করাপশন মুভমেন্ট রাজনৈতিক ফোকাস টেনে নেয়। আবারও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ওই সময়ের দিকে ফিরে তাকিয়ে আমরা বলতে পারি যে আইএসি সঙ্ঘ পরিবারেরই চাল ছিল, দুর্নীতির বেশ কিছু কাহিনীও সম্ভবত ছিল মনগড়া। কিন্তু সেই সময়ে মানুষ "আচ্ছে দিন"-এর স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিল, কারণ দেশজুড়ে সেই কনসেন্ট তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিল বিজেপি আর সঙ্ঘ পরিবার। ২০১৪ সালের ইলেকশন মোটামুটি ফোরগন কনক্লুজন ছিল বলা যায়। হিন্দুত্বও ততদিনে প্রান্তিক আইডিয়ার জায়গা পেরিয়ে জনসংখ্যার বড় অংশের "কমন সেন্স" হয়ে উঠেছিল। সঙ্ঘ পরিবারের সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি তৈরী ছিল এই কমন সেন্সকে ব্যবহার করে ভারতকে আজকের জায়গায় নিয়ে আসার।

এর পরের ঘটনা আমরা সবাই জানি।

হিন্দুত্বের আধিপত্যবাদ...

প্রায় একশো বছর আগে, মুসোলিনীর আমলে ইটালিতে জেলে বন্দী থাকাকালীন গ্রামশি বেশ কিছু তাত্ত্বিক কথাবার্তা লিখে রেখেছিলেন। তার মধ্যে আধিপত্য বা হেজিমনি নিয়েও বেশ কিছু আলোচনা ছিল। এই ২০২৬ সালে বসে, ভাবলে অবাক লাগে কীভাবে গ্রামশির সেই তত্ত্ব মোদীর ভারত সম্পর্কে একদম খাপে খাপে বসে যায়...যেন ভদ্রলোক সেই ১৯২৬ সালে বসেই আজকের ভারতকে দেখতে পেয়েছিলেন...

হিন্দুত্ববাদ সিরিজটার কন্টিন্যুয়েশন: গ্রামশির আধিপত্যবাদের তত্ত্ব। 

এখানে একটা ডিসক্লেমার দিয়ে রাখি। আমার চেয়ে অনেক জ্ঞানীগুণী বিদ্বান লোকেরা এই নিয়ে অজস্র লেখালেখি করেছেন। আমি এই সিরিজটায় শুধুমাত্র সেগুলোকে আরো অ্যাক্সেসিবল করার চেষ্টা করছি। সহজ ভাষায়। বোর হলে স্ক্রোল করে বেরিয়ে যাবেন।

সাধারণত: আমরা বেশিরভাগ মানুষই মনে করি ক্ষমতা আসে বন্দুকের নল থেকে, বা পুলিশের উর্দি থেকে, বা আইন আদালত বিচারব্যবস্থার হাত ধরে। গ্রামশি বলেন এটা ক্ষমতার অর্ধেক মাত্র। শাসক গোষ্ঠীর হাতে এই সব শক্তি ছাড়াও থাকে সাধারণ মানুষের কনসেন্ট। একটা ছোট্ট শাসকগোষ্ঠী যখন তাদের "ওয়ার্ল্ডভিউ" বা পৃথিবী সম্পর্কে তাদের ধারণা-কে গোটা নাগরিক সমাজের "কমন সেন্স" হিসেবে খাড়া করে ফেলতে পারে, তখনই সেটা তৈরী করে পরিপূর্ণ আধিপত্য।

ভেবে দেখুন। গরীব হিন্দু নোট বাতিলের সময় ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাঙ্কে লাইন দেওয়ার পরেও কেন আম্বানি-আদানিদের চৌকিদারি করা এই সরকারটাকে সমর্থন করে? কেন দলিত আর আদিবাসীরা, লাগাতার নানারকম জাতিবিদ্বেষের মুখে পড়েও, জয় শ্রীরাম বলে বিজেপির মিছিলে যায়? কেন একজন সাধারণ দিন-আনি-দিন-খাই অটোচালকও পোশাক বা ফেজটুপির ভিত্তিকে কাউকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেয়? এদের নাকের ডগায় কেউ বন্দুক ধরেছিল? না তো! তা সত্ত্ব্বেও এই ঘটনাগুলো ঘটে। শম্ভুলাল রেগর একজন অতি সাধারণ গরীব পরিযায়ী শ্রমিককে লাভ জিহাদের নাম করে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেয়। আখলাক আহমদকে একদল একই রকমের গরীব লোক টেনে বাড়ি থেকে বের করে এনে পিটিয়ে মেরে ফেলে। খুঁজে দেখলে গত দশ বছরে লিঞ্চিং এর ঘটনা গুণে শেষ করা যাবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৩ এর মধ্যে শতাধিক লিঞ্চিং-এর ঘটনা ঘটেছে — অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিকার মুসলমান বা দলিত। এবং এই ঘটনাগুলোকে কনডেম করা তো দূরের কথা, অজস্র লোক এগুলোকে নানাভাবে সমর্থন করে এগুলোকে নর্মালাইজ করেছে।

কেন? কারণ এই সবই পাব্লিকের "কমন সেন্স" হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলের বই থেকে, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড থেকে, সারাদিন ধরে টিভিতে চলা হাই-পিচ ডিবেট থেকে, বিভিন্ন আখড়ার মহন্তদের ফরমান থেকে...

হেজিমনি মানে এমন নয় যে ক্ষমতাশালীরা আপনাকে রোজ মেরেধরে পথে এনে ফেলছে। বরং আপনার মগজের দখল ওরা ইতিমধ্যেই নিয়ে ফেলেছে। আপনার মাথার মধ্যে ওরা অলরেডি জয়ী।

গ্রামশি দুরকম যুদ্ধের কথা বলেছিলেন। এক, ওয়ার অফ ম্যানুভার, বা কৌশলের যুদ্ধ। আর দুই, ওয়ার অফ পোজিশন — অবস্থানের যুদ্ধ। প্রথমটা টিপিকালি সরাসরি লড়াই — স্ট্রাইক, লাগাতার হরতাল, ভোটের সময় কোনো একদিকে ঢলে পড়া সেন্টিমেন্টের ঢেউ। আর দ্বিতীয়টা লংটার্ম, খানিকটা ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত — ধৈর্য্যের পরীক্ষা। সময় নিয়ে আস্তে আস্তে স্কুলকলেজ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক গ্রুপ, ধর্মীয় পরিসর, বিকেলে পার্কে হাঁটতে যাওয়া "উই আর অ্যাবভ সিক্সটি" গ্রুপ বা সকালের লাফিং ক্লাব, আমার আপনার রোজকার নানান অভ্যাস — সবকিছুকে নিজেদের দখলে আনা।

সঙ্ঘ পরিবার একশো বছর ধরে এই অবস্থানের যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। শাখায় হিন্দু সংস্কৃতির গর্ব। স্কুলে বদলে যাওয়া ইতিহাস। অসংখ্য "অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল" — প্রচারক, প্রথাগতভাবে উচ্চশিক্ষিত না হলেও যারা হিন্দু সেন্টিমেন্টকে খুঁচিয়ে তুলতে পারে। মন্দির ট্রাস্টের ম্যানেজার; আখড়ার মহন্ত; শহরে গ্রামে প্রতিনিয়ত যারা হিন্দুত্বকে "কমন সেন্স" বলে চালিয়ে চলে। এর পাশাপাশি, গত দুই দশকে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এই যুদ্ধ ছড়িয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে ফেক নিউজ ভাইরাল করার ডিজিটাল সৈনিক; লাভ জিহাদ আর ঘর ওয়াপসির মত ন্যারেটিভ,  চেহারা পেশা পোশাক নিয়ে মিসোজিনি ছড়িয়ে দাঁত নখ বের করা পুরুষতন্ত্রকে জিইয়ে রাখা সমাজমাধ্যম আর মিডিয়াতে বাণী দেওয়া সমাজচিন্তক; সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার যারা অনায়াসে বলে সেকুলারিজম মানে অ্যান্টি হিন্দু; ডীপ ফেক ক্রিয়েটর; সুদর্শন নিউজ বা রিপাবলিক টিভির মত অগুণতি টিভি চ্যানেলে তারস্বরে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ ছড়ানো সাংবাদিক; এসআইআরের আগে বাংলা চ্যানেলে বসে "কোটি কোটি বাংলাদেশী রোহিঙ্গা ভারতে ঢুকে পড়েছে" বলা বুদ্ধিজীবী; সরকারকে প্রশ্ন করা ছাত্র যুবক বা অন্য সাধারণ মানুষদের আরশোলা বলে দেওয়া বিচারক; কনসেন্ট আজ তৈরী হয় সেকেন্ডের মধ্যে।

আর এই যুদ্ধের পাশাপাশি এসেছে ওয়ার অফ ম্যানুভার — কৌশলগত আক্রমণ: ভোটে জিতে বুলডোজার অ্যাকশন, এসআইআর, আর্টিকল ৩৭০ — এই ম্যানুভারের প্রত্যেকটাই জনসমর্থন পেয়েছে, কারণ এর জমি তৈরী হয়েছে এতদিনের অবস্থানের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। বিরোধীদের বিরাট বড় মিছিলে বিজেপির আর কিস্যু এসে যায় না। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষক আন্দোলন চলার পরেও বিজেপি বিধানসভা ভোটে জেতে। নোটবাতিলের সময় বা কোভিডের সময় সাধারণ মানুষের চরম হেনস্থার পরেও একই ঘটনা ঘটে...

কারণ, জমি তৈরী হয়ে গেছে। ভারতের আশি শতাংশ হিন্দু, বিশ্বাস করে নিয়েছে যে ভারতের সাংস্কৃতিক শেকড় রয়েছে এক ও একমাত্র হিন্দু চেতনার মধ্যেই।

আর আছে ক্রনি ক্যাপিটালিজম — শাসক জোটের অন্য অংশটা।

গ্রামশি ক্ষমতায় আসীন এই জোটের নাম দিয়েছেন "ঐতিহাসিক জোট" (historic bloc) — ভারতে সেটা তৈরী হয়েছে হিন্দুত্ববাদ আর ক্রনি ক্যাপিটালিজমের মধ্যে। যারা একে অপরকে শক্তি যোগায়।

আম্বানি, আদানিরা হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী নেশন-বিল্ডার। হিন্দু রাষ্ট্র আর প্রাচীন ভারতের গ্লোরি ফিরিয়ে আনার নৈতিক ছাতার নীচে তাদের মুনাফা লোটার কারিকুরি চাপা পড়ে। হিন্দুত্ববাদী শাসক গোষ্ঠী পায় ফান্ডিং: ইলেক্টোরাল বন্ড, বিজ্ঞাপন, মন্দির করিডোরের জন্যে জমি — একই সাথে যেটা রিয়েল এস্টেটও বটে। আর গরীব খেটে খাওয়া মানুষ, মুটে মজুর, পরিযায়ী শ্রমিকদের বোঝানো হয় যে গরীবের পকেট কেটে সুইস ব্যাঙ্কের লকার ভরানো পুঁজিপতি বা পাব্লিক ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে দেশ ছেড়ে পালানো বেওসাদার বা গলা অবধি দুর্নীতিতে ডুবে থেকে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা রাজনীতিকরা নয়, তাদের সমস্ত সমস্যার মূলে ওই "ওরা" — মুসলমান বা ক্রীশ্চানরা। কারণ ওরা সবাই জেহাদি, ঘুসপেটিয়া ইত্যাদি।

শ্রেণীর ক্ষোভকে চাপা দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভয় দেখিয়ে।

আম্বানি বা আদানির মত পুঁজির মালিকেরা নিজেদের 'অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল' তৈরী করে — ইকোনমিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, কর্পোরেট মিডিয়া চ্যানেল, ব্যবসাবান্ধব আইনজীবী, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় "ন্যাশনালিস্ট" ইনফ্লুয়েন্সার। যখন দেখবেন কোনো টিভি চ্যানেল সরকারের নীতিকে প্রশ্ন না করে সরকারের পোষা অর্থনীতিবিদকে টকটাইম দিচ্ছে, তখন জানবেন যে কর্পোরেট স্বার্থ আর জাতীয়তাবাদ একই সুতোয় গাঁথা। যখন দেখবেন যে অজান্তে আপনিও কখন ভাবতে শুরু করেছেন আম্বানি-আদানিদের বিকল্প নেই, ওরা তো পরিশ্রম করেই অত উঁচুতে উঠেছে, তখন বুঝবেন আপনিও এই কনসেন্ট তৈরীর ফাঁদে পড়ে গেছেন।

এই হল সফিস্টিকেশনের চরম পর্যায়ে থাকা আধিপত্যবাদ বা হেজিমনি। রাষ্ট্রক্ষমতা তো ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছেই — পুলিশ, ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন, আদালত, বুলডোজার। মাঝেমধ্যে সামনেও চলে আসে — এনকাউন্টার, প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন, ইউএপিএ, ইন্টারনেট শাটডাউন, নির্বাচনের সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা। কিন্তু আসল ম্যাজিক লুকিয়ে রয়েছে আম আদমির কনসেন্টে; লক্ষ মানুষের স্বেচ্ছায় নিজেদের সরকারের দাসানুদাস মেনে নেওয়ার মধ্যে; "সরকার মাই বাপ" মানসিকতায়। কারণ একশো বছর ধরে জমি তৈরী করা হয়েছে: দেশ মানে রাষ্ট্র, সরকার; আর দেশকে ভালোবাসা মানে সমস্ত ক্ষুধার সূচক, বাচ্চা আর মেয়েদের স্বাস্থ্যের সূচক, প্রেস ফ্রীডম ইন্ডেক্স, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির দাবী, সব ভুলে গিয়ে গায়ে মাথায় মুখে জাতীয়তাবাদের রঙ মেখে তারস্বরে বন্দে মাতরম চিৎকার। রাষ্ট্রক্ষমতা আর কনসেন্টের মিশেলে তৈরী হওয়া coercive-hegemonic hybrid...

তবে কোনো হেজিমনিই চিরকালীন নয়, আশার কথা এইটুকুই। গ্রামশি লিখেছিলেন যে শাসক ততদিনই আধিপত্য বজায় রাখতে পারে যতদিন সে জনতার কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে। হিন্দুত্ব সেটাই করে: বিনামূল্যে রেশন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, দলিত/আদিবাসীদের লার্জার হিন্দু ফোল্ডে টেনে নেওয়ার অ্যাসপিরেশন। সঙ্গে "ওদের" ঢিট করার জন্যে বুলডোজার; মব লিঞ্চিং-এ ছাড়; অনলাইন ও অফলাইনে মিসোজিনির ঢালাও পারমিশন; হেজিমনি বজায় রাখতে সাহায্য করার ইন্সেন্টিভ।

কিন্তু ফাটল ঠিকই দেখা দেয়। বেকারির জ্বালা, জিনিসপত্রের দাম, শিক্ষা স্বাস্থ্যের সংকট, ডুবতে বসা অর্থনীতি, হিন্দুত্বের মধ্যে জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন প্রদেশে আঞ্চলিক প্রতিরোধ...

বিপ্লবের মুহূর্ত আসে যখন দেশজোড়া কনসেন্টে ফাটল ধরে; যখন মানুষ বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়। তখন রাষ্ট্রকে প্রকাশ্য শক্তির আশ্রয় নিতে হয়।

সেই সময় এখনো আসেনি। কিন্তু আসবে। সেই সময়কে তৈরী করা যায় — কাউন্টার হেজিমনির মাধ্যমে। সহজ নয়। খন্ড বিখন্ড চিন্তাভাবনা; আইডেন্টিটির লড়াই; স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মত মিডিয়ার অভাব; অর্থের অভাব। তবুও সময়কে তৈরী করা সম্ভব।

কীভাবে? লিখব।

রাখিগড়ি — বাস্তব বনাম বিজেপির গুল

শমীক ভশ্চাজ্জির একটা বক্তব্য নিয়ে অনেকেই লিখেছে দেখেছি। রাখীগড়ির ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি অমুক তমুক অনেক কিছুকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে ইত্যাদি ইউজুয়াল আগমার্ক হিন্দুত্ব হাবিজাবি। আমি একটা সহজবোধ্য প্রাইমার দেওয়ার চেষ্টা করি — কেন শমীক ভশ্চাজ্জি এই দাবীটি করতে গেল। আরো একটা উদ্দেশ্য আছে। এর আগের বার এই ভশ্চাজ্জির আরো একটা বালবাজারি নিয়ে ফেসবুকে লেখার পর জনৈক জেলখাটা "প্রিটেন্ডার" সাংবাদিক আমাকে নিয়ে আস্ত ইউটিউব এপিসোড করে ফেলেছিলেন। আশা করছি এইবারেও তিনি আরো একটা ইউটিউব এপিসোড নামাবেন। একে তো আমি সেলিব্রিটি হয়ে যাব, আর দ্বিতীয়ত: এই বালবাজারিটার ব্যাপারে যদি দুটো লোকও খোঁজ করে সত্যিটা জানতে পারে, তাতেও বড় লাভ।
 
সো, হিয়ার গোজ...
 
কী বলেছে শমীক ভশ্চাজ্জি? না, রাখীগড়ির প্রাচীন মানুষের ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি প্রমাণ করে দিয়েছে যে Aryan Invasion Theory (AIT) পুরোপুরি মিথ্যে, বামপন্থী ঐতিহাসিকরা এতদিন আমাদের সব ভুল শিখিয়েছেন।
 
শুরুতেই শমীক ভশ্চাজ্জি যে মিথ্যেটা বলেছে (মিথ্যেই বললাম, কারণ এরা যা বলে জেনেশুনেই বলে) সেটা হল এই AIT নিয়ে। সেই ১৯৫০-৬০ নাগাদই ইনভেশন থিওরিকে ক্রিটিক করেছেন ডিডি কোশাম্বি, রোমিলা থাপার বা আরএস শর্মার মত বামপন্থী ইতিহাসবিদরাই, নানান নতুন পুরাতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভাষাগত তথ্যের ভিত্তিতে। ষাটের দশক থেকেই বেশিরভাগ স্কলারদের মধ্যে যেটা চালু থিওরি সেটাকে বলা হয় Aryan Migration Theory (AMT)। সেখানে মাইগ্রেশন বা অভিবাসনের একাধিক ঢেউয়ের কথা বলা হয়। এই থিওরিটা সবার আগে একটু খোলসা করে বলা দরকার।
 
একেবারে প্রথমে আসে ইউরেশিয়ান স্তেপ অঞ্চলের (আধুনিক ইউক্রেন, দক্ষিণ পশ্চিম রাশিয়া, পশ্চিম কাজাখস্তান ইত্যাদি অঞ্চল) পশুপালক মানুষগুলোর কথা। এরাই প্রথম ঘোড়ার ওপর দখল আনে, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে, আর একদম গোড়ার প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথাবার্তা বলতে শুরু করে। তাদের অরিজিনাল বাসভূমি থেকে তারা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে — কারণ বংশবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নতুন এলাকার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, বসবাসের জন্যে, পশুপালনের জন্যে। এর মানে এই নয় যে এরা সরাসরি ভারতীয় উপমহাদেশে চলে এসেছিল। মাইগ্রেশন থিওরি বলে যে এই পশুপালকরা ধীরে ধীরে মিশতে শুরু করে  একটা অন্তর্বর্তী এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে - প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় এই স্টেজিং গ্রাউন্ডের নাম Bactria-Margiana Archaeological Complex (BMAC) - আধুনিক কালের যে এলাকাগুলোকে আমরা চিনি উত্তর আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান বলে। এবং এইটা এক দুই দিন বা কয়েক মাসে বসতির ব্যাপারও নয়। স্তেপ অঞ্চলের মানুষরা এখানে যাওয়াআসা শুরু করে, এখানকার অরিজিনাল অধিবাসীদের সঙ্গে মেশে, তাদের বংশবৃদ্ধি হয় - প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরে। এবং তারপর, এই অধিবাসীদের মধ্যে থেকে একটা ইন্দো-ইরানিয়ান শাখা আলাদা হয়ে যায়; এক দল পশ্চিমে ইরানের দিকে চলে যায়, আর অন্য দলটা দক্ষিণপূর্ব দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে ঢোকে। সময়কাল হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটা খানিক এরকমঃ

খ্রীষ্টপূর্ব [২১০০-১৮০০] সিন্তাশতা সংস্কৃতি (স্তেপ অঞ্চলে ঘোড়ায় টানা গাড়ির শুরু হয় এদের হাতে) 

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [২০০০-১৫০০] স্তেপ এলাকা ক্রমাগত শুকনো হতে শুরু করে পরিবেশগত কারণে, ঘাসজমি কমতে থাকে। ফলে আরো ভালো জমির খোঁজে এই এলাকার পশুপালকের দল ভারতীয় উপমহাদেশের কাছাকাছি এসে পৌঁছয় - ব্যাক্ট্রিয়া-মারজিয়ানা অঞ্চলে, মানে আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান ইত্যাদি এলাকায়। সিন্ধু সভ্যতা সেই সময়ে ক্রমশঃ ক্ষয়ে আসতে শুরু করেছে, সেও মূলতঃ আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পাল্টে যাওয়ার জন্যেই।

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [১৫০০-১২০০] হিন্দুকুশ পেরিয়ে ইন্দো-ইরানিয়ান অভিবাসীদের প্রথম ঢেউ এসে পৌঁছয় ভারতের উত্তরপশ্চিম অঞ্চলে, বসতি স্থাপন করে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে (আধুনিক পাঞ্জাব এবং পাকিস্তানের অনেকটা জায়গা নিয়ে)। এই সময়টাকেই বলা হয় প্রারম্ভিক-বৈদিক যুগ - যে সময়ে ঋগ্বেদের জন্ম।

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [১০০০-৬০০] লোহার তৈরী যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্র হাতে এই সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের পরের দিকের প্রজন্মের মানুষেরা জঙ্গল কেটে এগিয়ে যায় গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে। যাযাবর পশুপালক থেকে তারা ক্রমশঃ চাষবাষের দিকে সরতে শুরু করে, তৈরী হতে থাকে কৃষিভিত্তিক রাজ্য। 

খুব ছোট করে এই হল আর্য্যদের অভিবাসন তত্ত্ব, বা এরিয়ান মাইগ্রেশন থিওরি।

এই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ কোত্থেকে এলো তাই নিয়ে থিওরি, পাল্টা থিওরির লড়াই চলেছে কয়েক দশক ধরেই। ভাষাবিজ্ঞান বা লিঙ্গুইস্টিক্স, প্রত্নতত্ত্ব আর রাজনীতির তীব্র বিতর্ক। ইনভেশন তত্ত্বকে সরিয়ে মাইগ্রেশন থিওরির পত্তন হয় লিঙ্গুইস্টিক্স এবং প্রত্নতত্ত্বের ওপর নির্ভর করেই। তা সত্ত্বেও, বিতর্ক থামেনি। আর্য্যদের উৎপত্তি ভারতেই, এখান থেকেই তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, সংস্কৃতের জন্মও ভারতেই, এবং বাকি সমস্ত ভাষাই সংস্কৃতের "সন্তান" – হিন্দুত্ববাদী রাইটউইং ন্যাশনালিজমের মূল পিলার দাঁড়িয়ে রয়েছে এই আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের তত্ত্বের ওপরেই, কারণ এতে ভারতকে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকে একটা টাইমলেস এন্টিটি বলে প্রোমোট করা যায়। খেয়াল করে দেখবেন - হিন্দুত্বের শুরু কিন্তু এই জায়গা থেকেই - যে ভারতীয় সভ্যতা একদমই ইন্ডিজেনাস, অজর অমর অক্ষয়, টাইম ইমমেমোরিয়াল থেকে এই সভ্যতা একইভাবে টিঁকে রয়েছে ইত্যাদি প্রভৃতি। অন্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষের সঙ্গে মিশ্রণের ফলেই যে এই উপমহাদেশের আদি সভ্যতা এবং সংস্কৃতির জন্ম, এইটা ফাঁস হয়ে গেলে হিন্দুত্ববাদের পিলার ওই টাইমলেস এজলেস গ্লোরিয়াস ভারতীয় নেশনের মিথটা ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। ইতিহাসে, এর আগে কে নিজেদের এরকম অরিজিনাল আর্য্য বলে দাবী করে জাতিগত সংমিশ্রণকে কাঠগড়ায় তুলে মানুষে মানুষে বিভেদের সৃষ্টি করেছিল? হাইস্কুল ইতিহাসের বইয়ে ১৯২০-১৯৪৫, এই বিশ পঁচিশ বছরের বিশ্বের ইতিহাসটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন, মনে পড়ে যাবে।   

এনিওয়ে, টপিকে ফিরি। রাখীগড়ি অবধি যাওয়ার আগে এই প্রাচীন মানুষের জেনেটিক প্রোফাইল সংক্রান্ত আইডিয়াটা একটু বলে নেওয়া দরকার। 

গত কয়েক বছরে, একটা নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মাইগ্রেশন নিয়ে এই বিতর্কের অনেকটাই অবসান ঘটেছে বলে মনে করা হয়। প্রাচীন ডিএনএ অ্যানালিসিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরী এই পদ্ধতির জনক হার্ভার্ডের এক গবেষক, ডেভিড রাইখ। হাজার হাজার বছর আগের মানুষের কঙ্কাল বা হাড়গোর থেকে ডিএনএ বের করে তার সিকোয়েন্সিং করার ব্যবস্থা করেছিলেন রাইখ। এর আগে অবধি, ডিএনএ বের করা যেত শুধু জ্যান্ত মানুষের শরীর থেকেই, এবং বৈজ্ঞানিকেরা সেখান থেকে তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে একটা আন্দাজ তৈরী করার চেষ্টা করতেন। এতে বিতর্ক তো মিটতোই না, বরং বেড়ে যেত কয়েক গুণ। রাইখ এবং তাঁর দলের গবেষকেরা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে পাওয়া প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে তাদের জিনগত প্রোফাইল তৈরী করতে পেরেছিলেন। সেই জেনেটিক প্রোফাইল স্টাডি করেই তাঁরা বলেন যে আধুনিক ভারতের প্রায় সমস্ত বাসিন্দাই মূলতঃ দুটো প্রাচীন জনগোষ্ঠীর এক অনন্য জেনেটিক মিশ্রণঃ Ancestral North Indians (ANI), যাদের জেনেটিক সম্পর্ক রয়েছে ইউরোপীয়, মধ্য এশীয় আর নিকট প্রাচ্য বা নিয়ার ইস্টের মানুষদের সঙ্গে; এবং  Ancestral South Indians (ASI) - যারা এই উপমহাদেশের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে এখানকার আদি অধিবাসী হান্টার-গ্যাদারারদের (যে মানুষেরা শিকার করে বা বন্য ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে জীবনধারণ করত) নিবিড় সম্পর্ক ছিল।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এখান থেকে একটা বড় প্রশ্ন উঠে আসে - আর সেটা সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সংক্রান্ত। সিন্ধু সভ্যতা যে যথেষ্ট উন্নত ছিল তাই নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ভারতের মধ্যে লোথাল বা ধোলাভিরার প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলোতে, অথবা কপালে থাকলে পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু সভ্যতার বাকি সাইটগুলোতে গেলে চমকে যাবেন। প্রশ্নটা যেটা উঠে আসে, সেটা হল হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা এই জেনেটিক ধাঁধার মধ্যে ঠিক কোথায় ফিট করে? আর ঠিক এইটাই হল সেই "পয়েন্ট অফ কন্টেনশন" - রাজনীতি আর প্রত্নতত্ত্বের - যার কথা আগে লিখেছিলাম। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আউট-অফ-ইন্ডিয়া তত্ত্বের প্রবর্তকদের বক্তব্য হল সিন্ধু সভ্যতার মানুষরাই আদি বৈদিক আর্য্য, ঋগ্বেদ রচনা হয়েছিল এই সভ্যতার মধ্যেই, এবং এখান থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতি দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদি টাইমলাইন হিসেব করেন, তাহলে এই থিওরি অনুযায়ী ভারতীয় সংস্কৃতিকে প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০ সাল অবধি ঠেলে দেওয়া যায় (খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০-৩৩০০ সাল - এই সময়টাকে ধরা হয় প্রাক্‌-হরপ্পা যুগ হিসেবে, সিন্ধু সভ্যতার তৈরী হওয়ার সময়)। ডেভিড রাইখ তাঁর Who we are and how we got here বইয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে কীভাবে তাঁদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরী করেছিল এলাকার হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী, এমনকি আঞ্চলিক সহ-গবেষক এবং কো-অথরদের মাধ্যমেও। আগ্রহীরা চাইলে এই বইয়ের ছয় নম্বর চ্যাপ্টার (The Collision that Formed India) এর অন্তর্গত The Mixing of East and West অনুচ্ছেদটা পড়ে দেখতে পারেন। রাইখ এই অংশটা শুরু করছেন এই বলে - “The tensest twenty-four hours of my scientific career came in October 2008, when my collaborator Nick Patterson and I traveled to Hyderabad to discuss these initial results with Singh and Thangaraj” – সিং এবং থঙ্গরাজ মানে লালজী সিং, এবং কুমারস্বামী থঙ্গরাজ, দুজনেই তখন সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে কর্মরত বিজ্ঞানী। অরিজিনাল পেপারে রাইখ এবং প্যাটারসন আসলে "ওয়েস্ট ইউরেশিয়ান" শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। লালজী সিং এবং থঙ্গরাজ আপত্তি করেন কারণ ওয়েস্ট ইউরেশিয়া শব্দের ব্যবহার "পলিটিকালি এক্সপ্লোসিভ" হয়ে উঠতে পারে...এমনকি "অভিবাসন" শব্দটাই এক্ষেত্রে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কো-অথরদের আপত্তি এবং সেন্টিমেন্ট মেনে নিয়ে, পেপারটা যাতে পাবলিশ হতে পারে সেই উদ্দেশ্যে রাইখ ও তাঁর সহ-গবেষকরা খানিকটা নিউট্রাল ANI এবং ASI ব্যবহার করেন পেপারে। শব্দের ব্যাপারে খানিক কম্প্রোমাইজ করা হলেও, এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য স্পষ্টভাবেই ইউরেশীয় স্তেপ এবং পরবর্তীকালে BMAC থেকে আসা অভিবাসনের দিকেই ইঙ্গিত করে।

রাখীগড়ি এই প্রাচীন ভারতের ডিএনএ অ্যানালিসিসের লেটেস্ট চ্যাপ্টার। এই গল্পের শুরু ২০১৯ সালে, যখন বিজ্ঞানীরা হরিয়ানার হিসার জেলার অন্তর্গত রাখীগড়িতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় পাওয়া প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো একটা কঙ্কালের সফল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করেন। এই ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে দেখা যায় যে ওই মানুষটির শরীরের জিনের মধ্যে ইউরেশীয় স্তেপের জিনের কোনো মার্কার নেই, নেই কোনো মধ্য এশীয় বা ইউরোপীয় মার্কারও। অর্থাৎ, রাখীগড়ির সেই মানুষ যে জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে আন্দাজ করা যায়, তাদের সঙ্গে ইউরোপীয়, ইউরেশীয় বা পশ্চিম এশিয়ার কোনো জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ কখনো ঘটেনি। রাখীগড়ির মানুষটির জিনগত বৈশিষ্টের সঙ্গে মিল পাওয়া গিয়েছিল শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের আদি বাসিন্দা হান্টার-গ্যাদারার, এবং প্রাচীন ইরানী কৃষক-পশুপালক জনগোষ্ঠীর।

এইবার মজাটা হয় এইখানেই। শমীক ভশ্চাজ্জির মত হিন্দুত্ববাদীরা ইউরেশীয় স্তেপ জিনের অনুপস্থিতি দেখিয়ে বলেন - এইত্তো, ইউরেশীয় স্তেপ থেকে কোনো অভিবাসন কখনো হয়নি, বরং প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরাই বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটু ভাবলেই আপনি খেয়াল করতে পারবেন যে এই লজিকটা খানিক "হরপ্পায় টেলিফোনের তার পাওয়া যায়নি, কাজেই তখন ওয়্যারলেস ছিল" বলার সামিল…

কেন? কারণটা খুব সাধারণ বায়োলজির নিয়ম - যার ফলে হরপ্পায়-টেলিফোনের-তার-পাওয়া-যায়নি-কাজেই-সেখানে-ওয়্যারলেস-ছিল মার্কা বালবাজারি লজিকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সহজ বায়োলজির নিয়মে আপনার আমার মধ্যে পূর্বপুরুষের জিন থাকে, উল্টোটা নয়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরা যদি আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের মাধ্যমে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া, ইউরোপ এবং অন্যত্র ছড়িয়ে থাকত, তাহলে সেখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া কঙ্কালের ডিএনএর মধ্যে রাখীগড়ির দেহাবশেষে পাওয়া ইউনিক সাউথ এশিয়ান জিনের চিহ্ন থাকত। কিন্তু ডেভিড রাইখ ও নরসিংহন সহ অনেকের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০-১০০০ সালের মানুষের হাড়গোরের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় হান্টার-গ্যাদারার জিনের কোনো চিহ্ন নেই। উল্টে, ভারতে আরো পরের সমস্ত নমুনার মধ্যে স্তেপের জিনের উপস্থিতি স্পষ্ট। অর্থাৎ, সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে ইউরোপ বা মধ্য এশিয়ার জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ হওয়া বায়োলজিকালি অসম্ভব। এর সঙ্গে আরো বলা যায় যে মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ নাগাদ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আচমকাই স্তেপ জিন এসে হাজির হওয়ার অনেক আগেই, খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০-২৫০০ সালের সময়কার কঙ্কাল যা সাইবেরিয়া এবং ইউক্রেনের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছিল, সেগুলোর মধ্যে এই স্তেপ জিনের মার্কার পাওয়া গেছে। মানে, এই জেনেটিক ট্রাফিক বেসিকালি একটা ওয়ান-ওয়ে রাস্তা, যেটা ভারতে ঢোকে; উল্টোটা নয়।            
                    
রাখীগড়ির ফাইন্ডিংস এই কারণেই মাইগ্রেশন থিওরিকেই আরো পোক্ত করে তুলেছে, শমীক ভশ্চাজ্জির কথামত বাতিল করেনি। কারণ, এই পেপারটা থেকে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর উদ্ভবের একটা স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরাই যদি আদি সংস্কৃতজ্ঞ আর্য্য হত - হিন্দুত্ব থিওরি অনুযায়ী যাদের সংস্কৃতি বয়ে এসেছে আজকের উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে (যারা নিজেদের তথাকথিত আর্য্য জনগোষ্ঠী হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে), তাহলে এই আধুনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা স্তেপ জিনের দু চার ফোঁটা তো থাকার কথা ছিল সিন্ধু সভ্যতার গ্লোরির শিখরে থাকা মানুষদের মধ্যে? যেহেতু আধুনিক উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনুপাতে স্তেপ জিন রয়েছে, কাজেই স্বাভাবিক বায়োলজি বলে যে রাখীগড়ির সময়কালের অনেক পরেই স্তেপ মাইগ্রেশন ঘটেছিল...অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার শেষের দিকে, খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ সাল নাগাদ…

যেটা চরম ইন্টারেস্টিং, সেটা হল প্রাচীন ডিএনএ সিকোয়েন্সিং থেকে পাওয়া টাইমলাইনের সঙ্গে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকের দেওয়া যুক্তি এবং টাইমলাইন হুবহু মিলে যায়। ডেভিড অ্যান্থনির লেখা The Horse, the Wheel, and Language নামের একটা ল্যান্ডমার্ক বই থেকে আন্দাজ পাওয়া যায় কীভাবে গবেষকরা সমস্ত প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে প্রচলিত শব্দের অ্যানালিসিস থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ছড়িয়ে পড়ার একটা ছবি তৈরী করেছেন। লিঙ্গুইস্টদের অ্যানালিসিস প্রমাণ করে যে প্রথম দিকের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে (যাদের মধ্যে সংস্কৃতও পড়ে), ব্রোঞ্জ যুগে স্তেপ অঞ্চলে আবিষ্কৃত বিভিন্ন টেকনোলজি সংক্রান্ত একই ধরণের শব্দ গেঁথে রয়েছে - যেমন ঘোড়াকে পোষ মানানো, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো রথ, উন্নত মেটালওয়ার্কস সম্পর্কিত অনেক শব্দের গঠন একইরকম। পাশাপাশি, প্রত্নতাত্ত্বিকেরাও আগেই দেখিয়েছেন যে সিন্ধু সভ্যতার স্বর্ণযুগে এরকম পোষ মানানো ঘোড়া বা চাকাওয়ালা রথের অস্তিত্বের প্রমাণ নেই। রাখীগড়ির পেপার এই সবের মধ্যেকার মিসিং লিঙ্কটা সামনে এনে দিয়েছে - একটা জৈবিক প্রমাণঃ ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের পশুপালকেরা যখন খ্রীষ্টপূর্ব ১৭০০ সাল নাগাদ ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছেছিল, তাদের জিনের পাশাপাশি এসেছিল তাদের ঘোড়া, চাকাওয়ালা রথ আর একদম শুরুর দিকের ইন্দো-এরিয়ান ভাষাসমূহ - সংস্কৃতের উৎপত্তি সেই ভাষাসমূহ থেকেই, ভারতীয় সভ্যতার নকশিকাঁথা বোনার শুরুও সেই সময়েই...           

শেষ একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। শমীক ভশ্চাজ্জি এই ভুলভাল কথাটা অত স্টাইল করে বল্ল কেন? দিন কয়েক আগে লেখা হিন্দুত্ববাদীদের ইতিহাস পাল্টানোর নমুনা মনে করে দেখবেন একটু - কীভাবে জনসমক্ষে আবোলতাবোল দাবী করে উদ্ভট ইতিহাস তৈরী করার চেষ্টা করা হয়। সেই লেখাটা থেকেই অল্প একটু অংশ কোট করি।

“আরএসএসের "মার্গদর্শক' লজ্জা রাম তোমর গম্ভীরভাবে আউড়ে গেলেন - আলোর গতিবেগ নির্ণয় করা হয়েছিল ঋগ্বেদেই; ব্রিটিশরা নাগপুর দখল করার পর টানা ছ'মাস ধরে সেখানে নদীগুলোতে জলের সঙ্গে বয়ে গেছিল গলা সোনা; প্যারিসে তৈরী হয়েছে মনু-র মূর্তি এবং তার নীচে ফলকে লেখা রয়েছে "বিশ্বের প্রথম আইনপ্রণেতা'; শুধুমাত্র পবিত্র অশ্বত্থ গাছ আর তুলসীগাছই অক্সিজেন উৎপন্ন করে; নাসার বিজ্ঞানীরা সূর্যের মুখ থেকে "ওম' শব্দ শুনতে পেয়েছেন।"

লজ্জারাম তোমরের তুলনায় ব্যারিটোন ভয়েসে সুললিত গদ্য বাংলায় কথা বলা, অ্যাপারেন্টলি শক্তি চাটুজ্জে পড়া শমীক ভশ্চাজ্জি ফ্যাসিস্টদের নরম মুখ। এরকম সংস্কৃতিবান মানুষ যে কাঁচা মিথ্যে বলবেন সেটা তো আপনি ভাবতেই পারবেন না, তাই না? অথচ উনি বল্লেন, এবং কনফিডেন্টলি বল্লেন। কারণ, উনি জানেন যে এই মিথ্যেটা ধরে ফেলতে যে লজিকাল অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করার দরকার পড়বে, সেটা আপনি মোস্ট লাইকলি করবেন না। ভারতীয় সভ্যতা যে এজলেস, টাইমলেস এবং চিরকালই একইরকম গ্লোরিয়াস একটা ব্যাপার ছিল, সেটা তো ওরা অলরেডি আপনাকে বিশ্বাস করিয়েই ফেলেছে...  

একটা ছোট কথা দিয়ে শেষ করি। বিজ্ঞান তথ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে। ইতিহাসও নির্ভর করে তথ্যপ্রমাণের ওপর — এক্ষেত্রে লিঙ্গুইস্টিকস, প্রত্নতত্ত্ব, এবং আজকাল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর ওপরেও। কিন্তু, এই চর্চায় যেটা আসল সেটা হল প্রশ্ন করতে পারা, চ্যালেঞ্জ করতে পারা, কোনো কিছুকেই অ্যাবসোলিউট ট্রুথ মেনে না নেওয়া। যেমন রোমিলা থাপারেরা AIT কে খারিজ করতে পেরেছিলেন। আপনাকে কেউ বল্ল যে আর্য্যরা সিন্ধু সভ্যতারই অংশ, আপনি সব তথ্যপ্রমাণ ছেড়ে দিয়ে সেইটাকেই সত্যি বলে মেনে নিলেন..."সব সত্যি...মহিষাসুর সত্যি...হনুমান সত্যি...ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি...টারজান সত্যি...অরণ্যদেব সত্যি..."

আপনি কি এখনও রুকুবাবুই আছেন? একটুও বড় হননি?

সূত্রঃ

(১) প্রাগিতিহাস, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, গাংচিল
(২) Who we are and how we got here – Ancient DNA and the new science of the Human Past, David Reich, Pantheon
(৩) Early Indians: The Story of Our Ancestors and Where We Came From, Tony Joseph, Juggernaut
(৪) The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, David W. Anthony, Princeton University Press
(৫) An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers, Vasant Shinde et al, Cell, Volume 179, Issue 3, 17 October 2019, Pages 729-735.e10,  https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0092867419309675

Thursday, May 07, 2026

হিন্দুত্বের ইতিহাসচর্চা

হিন্দুত্ব - বিজেপি স্টাইল, বা বলা ভালো আরএসএস স্টাইল - বাস্তবে কী জিনিস তাই নিয়ে আগে লিখে ফেলেছি। সামারি আর দিলাম না, এই লেখার নীচের হ্যাশট্যাগগুলো দিয়ে পেয়ে যাবেন, চাইলে দেখে নেবেন। তবে এই হিন্দুত্ব কখনওই সম্পূর্ণ হবে না যতক্ষণ না ইতিহাসকে নতুন করে লেখা হবে। একশো কোটি হিন্দুকে টুপি পরাতে গেলে তো সেইটা লাগবে, হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে যে ইতিহাস পড়ানো হবে, প্রমোট করা হবে...তো সেইটা একটু বলা দরকার। এই সিরিজে এইটাই শেষ লেখা। যা ওয়ার্নিং দেওয়ার ছিল, দিয়ে দিয়েছি।

আরএসএসের কাছে ইতিহাস প্রমাণ বা যুক্তিনির্ভর বিষয় নয়। কোনোদিনই ছিল না। ইতিহাস ওদের অস্ত্র, আর এটা শুধু আরএসএস বলে নয়, পৃথিবীর যে কোনও স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির ক্ষেত্রেই সত্যি। অরওয়েলের ১৯৮৪ যদি পড়ে থাকেন (না পড়ে থাকলে অবশ্যই পড়বেন) সেখানে দেখবেন একটা কথা রয়েছে - "Who controls the past controls the future. Who controls the present controls the past" - স্বৈরতন্ত্রের কনটেক্সটে এই কথাটার মানে বোঝা অত্যন্ত জরুরী। ইতিহাসকে ওয়েপনাইজ করা গেলে অতীতের সেই ওয়েপনাইজড ন্যারেটিভকে ব্যবহার করে আপনি ভবিষ্যতের ন্যারেটিভ নির্মাণ করতে পারবেন, আপনার চাহিদামাফিক। আর, অতীতকে বদলে লিখতে গেলে, আপনার হাতে বর্তমানে ক্ষমতা থাকা চাই। আর ঠিক এইটাই এখন অফিশিয়ালি হচ্ছে। প্রায় একশো বছর ধরে যার পরিকল্পনা ছকা হয়েছে আরএসএসের দপ্তরে। আমরা যখন ফুটনোট আর ইতিহাসের বিভিন্ন পিরিয়ড ভাগ করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম,  সেই সময়ে সঙ্ঘ ইতিহাস তৈরী করার একটা প্যারালাল কাঠামো বানিয়ে ফেলেছিল - সরস্বতী শিশু মন্দির, বিদ্যাভারতী, আরএসএসের শাখা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মন্দিরের চৌহদ্দি পেরিয়ে এসে সেই কাঠামো এখন গিলে ফেলেছে আমার আপনার স্মার্টফোনকেও। উদ্দেশ্য - অতীতকে বোঝা নয়, বরং একটা "হিন্দু কমন সেন্স" তৈরী করা যেটা একশো কোটি হিন্দুর মাথায় এমনভাবে গেঁথে যাবে যাতে কোনও যুক্তি, দলিল, নথি বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও তাকে নড়াতে পারবে না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, এই টেকনিকটা দিব্যি কাজ করছে। প্রমাণ পাওয়া যায় সমাজমাধ্যম আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে থাকা জঞ্জালের মধ্যে...যেগুলোকে ইতিমধ্যেই "ইতিহাস" বলে নর্মালাইজ করা হয়ে গেছে।

বছরকয়েক আগে, এরকমই একটা অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলাম – পরিচিত একজন, বাস্তবে উচ্চশিক্ষিত, যথেষ্ট সিন্সিয়ার গবেষক - অথচ সাই দীপকের ইউটিউব ভিডিও "হিস্টরি, আইডেন্টিটি, ইন্ডিয়া" আর সঞ্জীব সান্যালের ইউটিউব ভিডিও "হাউ মাচ অফ ইন্ডিয়ান হিস্টরি ইজ রিয়েলি ট্রু" দেখেই সে মেনে নিয়েছে ভারতের ইতিহাস আমরা যা জানি, যা বলি, সব মিথ্যে, এই দুজনই নাকি আসল "ঐতিহাসিক"। সাই দীপক পরিচিত আরএসএস অ্যাক্টিভিস্ট, সুপ্রীম কোর্টের উকিল, যিনি শবরীমালায় মেয়েদের ঢুকতে দেওয়ার বিরুদ্ধে মামলা লড়েন। সঞ্জীব সান্যাল অর্থনীতিবিদ, ভারত সরকারের কী একটা উপদেষ্টা, তাঁর একমাত্র ক্রেডিবিলিটি এইটুকুই যে তিনি শচীন্দ্রনাথ সান্যালের বংশধর, আর শচীন্দ্রনাথ সান্যাল বিপ্লবী ছিলেন, আন্দামানে বন্দীও ছিলেন। একজন গবেষকের যে মানসিকতায় সে স্টেট অফ দি আর্টের পেপার খুঁজে পড়ে, ইতিহাসে ক্ষেত্রে কিন্তু সে সেই প্রশ্ন করার মানসিকতা ব্যবহার করেনি। রিসার্চের ভাষায় বলতে গেলে, ডীপ লার্নিং নিয়ে গুগলের ডীপ মাইন্ড বা স্ট্যানফোর্ড থেকে NeurIPS বা IJCAI-এ বের হওয়া পেপার ছেড়ে অ্যামিটি আর লাভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটির সন্দেহজনক প্রিডেটরি জার্নালে পাব্লিশ করা পেপারের ওপর ভরসা করেছে। কারণ এদের দাবীগুলোর সাথে নিজের সাবকনশাসে থাকা ধ্যানধারণা মিলে গেছে। নিজের অপূর্ণ কিছু ইচ্ছে বা না পাওয়ার হতাশার জন্যে কাউকে দায়ী করার জন্যে লোক খুঁজে পেয়ে গেছে। নিজেকে ভিক্টিম হিসেবে ভাবছে আর সেইটাই দেখানোর চেষ্টা করছে। এইটাই সঙ্ঘের ইতিহাস নিয়ে পরিকল্পনার সাফল্য।

এই ইতিহাস তৈরীর কিছু নমুনা দিলেই বুঝতে পারবেন কী বলতে চাইছি; সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঠিক কী কী ঘোরে ইতিহাসের নামে...স্কুল ও কলেজ শিক্ষকদের, এবং তাঁদের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের ঠিক কী শেখানো হয়, তারও...

সরকারের পয়সায়, দিল্লী ইউনিভার্সিটিতে কলেজ শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন কোর্সে, আরএসএসের "মার্গদর্শক" লজ্জা রাম তোমর গম্ভীরভাবে আউড়ে গেলেন [১] - আলোর গতিবেগ নির্ণয় করা হয়েছিল ঋগ্বেদেই; ব্রিটিশরা নাগপুর দখল করার পর টানা ছ'মাস ধরে সেখানে নদীগুলোতে জলের সঙ্গে বয়ে গেছিল গলা সোনা; প্যারিসে তৈরী হয়েছে মনু-র মূর্তি এবং তার নীচে ফলকে লেখা রয়েছে "বিশ্বের প্রথম আইনপ্রণেতা"; শুধুমাত্র পবিত্র অশ্বত্থ গাছ আর তুলসীগাছই অক্সিজেন উৎপন্ন করে; নাসার বিজ্ঞানীরা সূর্যের মুখ থেকে "ওম" শব্দ শুনতে পেয়েছেন।

সার্কাস নয়, স্ট্যান্ড আপ কমেডিও নয়। একদম সরকারি পয়সায় আয়োজিত রাষ্ট্রপোষিত অ্যাকাডেমিক ইভেন্ট। এক্সপেকটেশন হল হবু কলেজ শিক্ষকরা এইগুলোকেই ইতিহাসের শিক্ষা বলে আত্মস্থ করে নেবেন। বিশ্ব বিজ্ঞান সম্মেলনে গণেশের মাথাকে আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারির নমুনা হিসেবে দেখানো এই কর্মকান্ডেরই ফসল।

১৯৭৩ সালে আরএসএস-এর তৈরী অখিল ভারতীয় ইতিহাস সংকলন যোজনা (ABISY) নামের এক বিশেষ ঐতিহাসিক গবেষণা শাখার পত্রিকা "ইতিহাস দর্পণ" নিজেকে ফুটনোট, রেফারেন্স আর চকচকে ম্যাপওয়ালা সিরিয়াস স্কলারলি জার্নাল হিসেবে দেখায়। কিন্তু এর যে কোনও একটা সংখ্যা খুললেই আপনি ঢুকে যাবেন পুরাণ ও কল্পনার জগতে। প্রথম পাতায় হেডগেওয়ার আর গোলওয়ালকরের ছবি। পাশে গণেশের লোগো। প্রবন্ধগুলো প্রায় সবই এমন লোকজনের লেখা যাদের সঙ্গে কোনও বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনও যোগাযোগ নেই। এবং সম্পূর্ণ র‍্যান্ডম দাবিদাওয়া ভর্তি সব লেখা। ইংরিজীতে লেখা প্রবন্ধে নানান অ্যাকাডেমিক প্রচেষ্টা দেখানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সবই ফাঁকা বুলি। যেমন, ২০১৬ সালের এপ্রিলে, কোনও এক মহাবীর প্রসাদ জৈনের প্রবন্ধ, A Brief Survey of the Politics of Indian Historiography-তে রেফারেন্স হিসেবে লেখা রয়েছে - "a large number of articles available on various websites" - সমস্যা হল, এই সাইটেশনের কোনও মূল্যই নেই ইতিহাসের চর্চায় [২]। আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে ইতিহাস দর্পণের প্রতিটি সংখ্যায়। যেমন, জনৈক অরুণ কুমার লেখেন যে আধুনিক বিজ্ঞানের উৎস বেদ। রেফারেন্স? নেই [৩]। যেমন, জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে মনুস্মৃতি প্রতিনিয়ত বাস্তবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া উপকারী "সামাজিক বিধান"; কিন্তু সজ্ঞানে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে যে সেই মনুস্মৃতিই বেদপাঠ শুনে ফেলা শূদ্রের মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়, বা মেয়েদের চিরদাসীত্বের বিধান দেয় [৪]।

ইতিহাস নয়। কালাজ্বরের মত "গেরুয়াজ্বর"-এর ঘোরে দেখা স্বপ্ন।

সবচেয়ে বীভৎস বিকৃতিগুলো বরাদ্দ রাখা হয়েছে মুসলমানদের জন্যই। সাভারকার - সঙ্ঘের আদর্শের উৎস - লিখেছিলেন যে, মুসলমান আক্রমণকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে উগ্র এবং পৈশাচিক ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষাই বেশি ছিলঃ   "a fierce religious ambition many times more diabolic than their political one" - যদিও, ইতিহাসে এমন কোনও প্রমাণ নেই যা দিয়ে বলা যায় যে মধ্যযুগে আক্রমণকারী মুসলমানদের মধ্যে শুধুই ধর্মীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাই উপস্থিত ছিল, রাজ্য বা এলাকা দখল এবং তার ফলে রাজস্ব বাড়ানোর কোনও আকাঙ্ক্ষা ছিল না। "সিক্স গ্লোরিয়াস ইপক্‌স" বইয়ে সাভারকর খোলাখুলিভাবে মুসলমানদের মোকাবিলায় তাদের মেয়েদের অপহরণ ও ধর্ষণের নিদানও দিয়ে রেখেছেন; সাভারকরের কথা অনুযায়ী শিবাজির উচিত ছিল শিভালরি না দেখিয়ে ঠিক এই কাজটিই করা। না, এগুলো কোনও অখ্যাত বইয়ের ফুটনোট নয়; সাভারকর - যাঁকে আরএসএস "বীর সাভারকর" বলে অভিহিত করে, যাঁর মূর্তি বিভিন্ন স্কুলে শোভা পায়, যাঁর নামে সেলুলার জেলের নতুন নামকরণ করা হয় (সে তিনি খান পাঁচেকবার ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যে মুচলেকা লিখে থাকলেও), যাঁর আদর্শ আরএসএসের শাখায় শেখানো হয় - এই কথাগুলো সেই সাভারকরের নিজের লেখা। আরএসএস আজ অবধি এই কথাগুলোর একটাকেও রিফিউট করেনি।

আরএসএসের এই ইতিহাসকে নতুন করে লেখার প্রসেসটা খুবই সরল। আগে সমস্ত জটিলতা মুছে ফেলো, সূক্ষ্ম ফারাকগুলোকে এড়িয়ে যাও, আর সমস্ত অ্যানালিসিসকে বদলে দাও বিদ্বেষের মুখস্থ বুলি দিয়ে। বিদ্যাভারতীর স্কুলে বাচ্চারা ইতিহাস শেখে না; বরং ক্যুইজের ধাঁচের কিছু উত্তর মুখস্থ করে, যাকে ভারতীয় ঐতিহ্য হিসেবে চালানো হয়। যেমন, "কোন স্বৈরাচারী শাসক গুরু গোবিন্দ সিংহের দুই ছেলেকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন"? উত্তর হল, "ঔরঙ্গজেব"। এখানে মুঘল রাজনীতির প্রেক্ষাপট নেই, শিখ আর মুঘলদের সংঘাতের আলোচনা নেই, এবং বইয়ে এও লেখা নেই যে সেই নরপিশাচ ঔরঙ্গজেবই তাঁর আগের যে কোনও শাসকের তুলনায় অনেক বেশি হিন্দুকে নিজের প্রশাসনের উঁচু পর্যায়ে নিয়োগ করেছিলেন। ইতিহাস যে শুধুমাত্র সাদায় কালোয় কিছু ঘটনা নয়, বাইনারি সিস্টেম নয়, তার মধ্যে অনেক জটিলতা, অনেক নুয়ান্স লুকিয়ে থাকে, সেসব ভুলে গিয়ে আর ভুলিয়ে দিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের মাথায় গেঁথে দেওয়া হয় যে ঔরঙ্গজেব আসলে এক ভিলেন, প্রায় দানব, যাতে সেই নামটা শুনলেই বাচ্চাদের মনে কিছু জানার ইচ্ছের বদলে শুধুমাত্র একটা তীব্র ঘৃণা তৈরী হয়। বিদ্বেষের চাষ হয় এইভাবেই - একটার পর একটা বিচ্ছিন্ন কনটেক্সটবিহীন উড়ো তথ্যের মাধ্যমে।

ভারতকে সেই প্রাচীন স্বর্ণযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আরএসএস ঐতিহাসিক টাইমলাইনকে পিছিয়ে দেয়। আসলে যাঁরা আর্কিওলজিস্ট, তাঁদের পরিচিত কোনও পদ্ধতি ছাড়াই আরএসএস "প্রমাণ" করে দেয় যে হারিয়ে যাওয়া সরস্বতী নদী বাস্তবে সত্যিই ছিল, আর তাই বেদও ঐতিহাসিকভাবে একবারে সঠিক। বাস্তবে, বিভিন্ন আধুনিক উপায়ে (স্যাটেলাইট ইমেজিং ইত্যাদি) ঘগ্‌গর-হাকরা নামের এক বহুপ্রাচীন নদীখাতের সন্ধান পাওয়া গেছে - কিন্তু ঐতিহাসিক এবং আর্কিওলজিস্টদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে যে সেই নদীখাতই বেদবর্ণিত সরস্বতী কিনা। ব্রিটিশ ওরিয়েন্টালিস্টদের আনা Aryan Invasion Theory ষাটের দশক থেকেই বদলে গেছে  Aryan Migration Theory-তে, এবং এটা হয়েছে নতুন করে খুঁজে পাওয়া ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতেই। এবং খুব রিসেন্টলিই, আধুনিক পদ্ধতিতে প্রাচীন মানুষের শরীরের ডিএনএ অ্যানালিসিস প্রমাণ করেছে যে এই ডিএনএ নির্ভর অ্যানালিসিসের দেওয়া মাইগ্রেশনের সময়কাল আর আগেকার ভাষাভিত্তিক অ্যানালিসিসের ভিত্তিতে দেওয়া মাইগ্রেশনের সময়কাল প্রায় মিলে যায়, এবং সেদিক থেকে দেখলে মাইগ্রেশন (স্পেসিফিকালি, একাধিক মাইগ্রেশনের ওয়েভ) থিওরিই সঠিক [৫,৬,৭]। আরএসএস পোষিত ঐতিহাসিক এবং আর্কিওলজিস্টরা ঠিক এর উল্টোটাই প্রমাণ করতে চান - যে আর্য্যদের উৎপত্তি ভারতে, এবং ভারত থেকেই এই জনগোষ্ঠী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছিল, এবং এর জন্যে বৈজ্ঞানিক দলিলের ভুল ইন্টারপ্রিটেশন দিতেও এঁদের আটকায় না। 

আরএসএস মহাভারত, শঙ্করাচার্য্য, এমনকী বুদ্ধের সময়কালকেও এমন একটা অসম্ভব অতীতে ঠেলে দিয়েছে যেটা যে কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের সময়েরও অনেক আগের। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে এরা আনতে চায় "কলিযুগাব্দ" বা কলিযুগ-ভিত্তিক ক্যালেন্ডার - পুরাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক কাল্পনিক ক্যালেন্ডার। ভারতের ইতিহাস নিয়ে আরএসএসের যে বহুখন্ডের বইয়ের কাজ চলছে, সেখানে পুরাণে বর্ণিত বংশতালিকাকেই প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ধরে নিয়েছে। মুছে দিয়েছে পৌরাণিক উপকথা আর আসল ইতিহাসের মধ্যের সীমারেখা। এমনভাবে, সজ্ঞানে, যাতে এই ইতিহাস যারা পড়বে তাদের কাছে উপকথা আর ইতিহাসের তফাত থাকবে না, মধ্যযুগের যে কোনও অহিন্দু তার কাছে হয়ে উঠবে পৌরাণিক কাহিনীর দানব, রাম-রাবণের যুদ্ধকে সে দেখবে মধ্যযুগের কোনও সুলতানের আক্রমণ হিসেবে।

বৌদ্ধধর্মও ছাড় পায়নি সঙ্ঘের সর্বগ্রাসী ঘৃণার হাত থেকে। সাভারকরের বয়ানে, বৌদ্ধরা কোনও মহৎ ঐতিহ্যের ধারক নয়, বরং তারা ছিল হিন্দু ধর্মের মধ্যে এক "পঞ্চম বাহিনী" - হিন্দু জাতিকে দুর্বল এবং নপুংসক করে দেওয়ার দায় তাদেরই। সম্রাট অশোকের ধর্মান্তর সাভারকরের ভাষায় হিন্দুদের জন্যে মহাবিপর্যয়; বরং বৌদ্ধদের ওপর চরম অত্যাচার চালানো পুষ্যমিত্র শুঙ্গ সাভারকরের প্রশংসার পাত্র, কারণ সেই অত্যাচার সাভারকরের মতে ছিল "গুরুতর রাষ্ট্রদ্রোহের উপযুক্ত শাস্তি"। আর এই চলমান ঘৃণার নিদর্শন পাওয়া যায় আধুনিক যুগেও, ২০১৭ সালে বিজেপির তৎকালীন মন্ত্রী অনন্তকুমার হেগড়ের টুইটেঃ "If not for Buddhism, we would have had an Akhand Bharat" [৮]। সঙ্ঘের ডিকশনারিতে শান্তি মানে দুর্বলতা, করুণা মানে রাষ্ট্রদ্রোহ। একমাত্র মনে রাখার মত ইতিহাস হল যুদ্ধের ইতিহাস, যেখানে হিন্দুরাজার যুদ্ধে জেতার কথা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আরএসএস শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকেই থেমে নেই। ক্রমশঃ ইতিহাসের গবেষণার একদম সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানেও ঢুকে গেছে এই ভয়ানক ভাইরাস। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চকে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে আরএসএসের কর্মকর্তাদের দিয়ে। ২০১৪ সালেই চেয়ারপার্সন করা হয় ABISY প্রধান সুদর্শন রাওকে, তারপর থেকে আরএসএস ঘনিষ্ঠদেরই বসানো হয়েছে এই পদে। এখন সরকারি এজেন্ডা হল ইতিহাসের "ভারতীয়করণ" - ইতিহাসে শুধু থাকবে হিন্দু অতীতকে মহিমান্বিত করা ঘটনাসমূহ, বাকি সব মুছে ফেলা হবে। দরকারে, আবিষ্কৃত হবে নতুন নতুন "হিন্দু শেকড়"। দিল্লী থেকে দূরে, হিমাচল বা উত্তরাখণ্ডের আদিবাসী এলাকার গ্রামে,  ABISY-এর লোকজন স্থানীয় লোককথা খুঁজে বের করে সেগুলোকে কো-অপ্ট করে হিন্দুত্বের মধ্যে। হিমাচল প্রদেশের কুলু-তে, আরএসএস সমর্থক এবং এককালের রাজাসাহেব দেবেন্দ্র সিং আদিবাসীদের উপকথা লিপিবদ্ধ করেন। ABISY সেই সমস্ত "ঐশ্বরিক গল্পগুলোকে" ব্রাহ্মণ্যবাদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ হিসেবে হাজির করে, যেমন গণেশ পুরাণের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয় আঠারোটা সাপ নিয়ে এক আদিবাসী কাহিনীকে। যেমন, উত্তরাখণ্ডের আঞ্চলিক দেবী নন্দাকে কো-অপ্ট করে দেখানো হয়েছে দুর্গার রূপ হিসেবে। হিন্দুত্বের নামে ক্রমশঃ একের পর এক লৌকিক দেবদেবীকে কো-অপ্ট করে তাদের ভক্তদের হিন্দুত্বের ছাতার তলায় আনার জন্যে। উদ্দেশ্য সেই একই - হিন্দুধর্মের বিভিন্ন ডাইভার্স সুতোকে মুছে দিয়ে সবাইকে এক মনোলিথিক ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের নীচে এনে ফেলা...

ইন্টেলেকচুয়াল কলোনিয়ালিজম বলতে পারি একে? আদিবাসী কনশাসনেস মুছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে?

এবারে একটু গালি দেবো আমাদের শিক্ষিত সেকুলার ঐতিহাসিকদেরও। তাঁরা কী করেছেন? অ্যাকাডেমিক ইংরিজীতে লেখা উজ্জ্বল, সূক্ষ্ম এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণাকর্ম উপহার দিয়েছেন। জার্নালে ছাপা হয়েছে, বই হিসেবে বেরিয়েছে। কিন্তু পড়েছে বা বুঝেছে খুব ছোট একটা এলিট গোষ্ঠী। উল্টোদিকে, আরএসএস তার বই থেকে শুরু করে গানের ক্যাসেট - যা কিছু বের করেছে, সবই হিন্দিতে বা স্থানীয় ভাষায়। সেই বই, প্যামফ্লেট, ক্যাসেট ছড়িয়ে গেছে শাখায়, মন্দিরে, স্কুলে। আর, প্রায় হাজার পঞ্চাশেক স্কুলে পড়তে থাকা চল্লিশ লক্ষের কাছাকাছি বাচ্চার বাড়িতে। সেকুলার অ্যাকাডেমিকরা যখন ইতিহাসের পিরিয়ডাইজেশন নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, আরএসএস এমন একটা ন্যারেটিভ বানিয়েছে যেটা পাঁচ বছরের বাচ্চাও বুঝতে পারে, বা একজন আশি বছরের বুড়ী ঠাকুমাও অবলীলায় মন থেকে বলে যেতে পারেন। সেই পলিটিকাল রাইট-লেফট আর সোশ্যাল রাইটের গল্প, যেটা দিন কয়েক আগে লিখেছিলাম...আমাদেরই অবহেলার ফসল আমরা ঘরে তুলেছি।

তবে এটাও ঠিক, যে সঙ্ঘের এই সমস্ত গালগল্পকে যুক্তি আর তথ্য দিয়ে কাউন্টার করতে গেলেই সঙ্ঘের ইতিহাসবিদরা এক বাক্যে কলোনিয়াল চক্রান্ত, ডীপস্টেট, জর্জ সোরোস ইত্যাদি আউড়ে সব গুলিয়ে একটা ভজকট ব্যাপার সৃষ্টি করে কেটে পড়েন। সেই যার কথা শুরুতে বলছিলাম, সে র‍্যাপিড ফায়ারের মত আমাকে একগুচ্ছ প্রশ্ন করেছিল:

"আমাদের ইতিহাস কেন শুধু হেরে যাওয়ার ইতিহাস? রেজিস্টেন্সের ইতিহাস কই? গজনীর মামুদের শেষ আক্রমণের পর ফের আক্রমণ করতে কেন ১২০ বছর লাগলো? সুহেলদেবের কথা ইতিহাসে লেখে না কেন? উত্তরপূর্ব ভারতের রাজাদের কথা কেন লেখে না? ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের কেন বিশ্বাস করবো যখন তারা আসার আগেও ভারত বলে একটা বিরাট ব্যাপার ছিলো? স্ক্রিপচার আর শিলালিপিকে কেন প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে না? ভারতের সবচেয়ে বড় ইতিহাসের দলিল - নালন্দাকে যদি ইচ্ছে করে ধ্বংস করা হয়ে থাকে, তাহলে অন্য দলিল কেন মেনে নেবো? অন্য দেশ, যেমন চীন বা আমেরিকা তাদের অতীতকে গ্লোরিফাই করে। আমরা কেন করবো না? বিদেশীদের বলা ইতিহাস কেন মানবো?"

এসবের এক কথায় উত্তর হয় না, আর সিউডো-ইতিহাসের লক্ষ্যই এইগুলো ছড়ানো। যেমন ধরুন, সুহেলদেব - একটা লেজেন্ড ছাড়া যার সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক দলিল নেই [৯]। পৃথ্বীরাজ চৌহান সিনেমাটা নিয়েও যে বিতর্কটা হয়েছে তাও মোটামুটি এই লাইনেই - যে পৃথ্বীরাজ রসো কোনো প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল নয়। আর এই তথাকথিত ঐতিহাসিকরা, মানে সাই দীপক, বিক্রম সম্পত বা সঞ্জীব সান্যাল - এদের স্টাইলটাই হল বিনা রেফারেন্সে কিছু দাবীদাওয়া বাজারে ছেড়ে অ্যাকাডেমিক হিস্টোরিয়ানদের কোনোভাবে ডিসক্রেডিট করা - যে আদতে ভারতের গৌরবময় ইতিহাসকে বামপন্থী, কমিউনিস্ট আর নেহরুভিয়ান ঐতিহাসিকরা চেপে দিয়েছে। হিট অ্যান্ড হাইড স্টাইল বলে একে, অ্যালিগেশন ছুঁড়ে পালিয়ে যাওয়া [১০]।

পরের বার, সঙ্ঘের কেউ যখন "আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত" নিয়ে ভাষণ দেবেন, পারলে একবার জিজ্ঞেস করবেন তো - কার অতীত? সঙ্ঘের ইতিহাসে প্রত্যেকটা মুসলমান তো আক্রমণকারী শয়তান। মুসলমান জোলা বা তাঁতির কথা আছে তাদের ইতিহাসে? যে তাঁতিরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের বস্ত্রশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন? তাদের ইতিহাসে কি সেই দলিত কবির ঠাঁই হয়েছে, যিনি পেতের খিদে আর জাতের নামে বজ্জাতির কথা লিখে গেছেন তাঁর কবিতায়? মেয়েদের শিক্ষার লড়াই, অধিকারের লড়াইয়ের কথা আছে তাদের ইতিহাসে? সাবিত্রীবাঈ ফুলে বা রোকেয়া বেগম জায়গা পান সঙ্ঘের ইতিহাসে? না, বরং সঙ্ঘের ইতিহাস একটা ফ্ল্যাট বোরিং গেরুয়া মরুভূমি, যার ওপারে রয়েছে একটা কাল্পনিক সোনালী যুগ। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মাথা ভরিয়ে দিচ্ছি সেই ইউজলেস বালি দিয়ে, একটার পর একটা ভিত্তিহীন আজগুবি দাবীর খপ্পরে পড়ে। এর বিকল্প বহুত্ববাদী তথ্যনির্ভর এবং সহজবোধ্য ইতিহাস না লেখা হলে, এখনই না লেখা হলে, অন্তত শুরুটুকুও না হলে, শেষ অবধি ওই ফ্ল্যাট বোরিং মরুভূমিই পড়ে থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে...

শুরু করেছিলাম অরওয়েলের একটা কথা দিয়ে। শেষও করব অরওয়েলেরই আরেকটা কথা দিয়ে, ১৯৮৪ থেকেই - 

"The past was erased, the erasure was forgotten, the lie became truth."

সূত্রঃ 

[১] India: RSS Schools and the Hindu Nationalist Education Project by Akshay Bakaya, 21 April 2009, https://www.sacw.net/article852.html
[২] Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
[৩] Param Shiv ka Shrishti: Vigyan Aur Ved, Itihas Darpan, October 2013
[৪] Itihas Darpan, October 2016
[৫] Who We Are and How We Got Here: Ancient DNA and the New Science of Human Past, David Reich, Pantheon, USA
[৬] EARLY INDIANS : The Story of Our Ancestors and Where We Came From, Tony Joseph,  Juggernaut, India
[৭] The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, David W. Anthony, Princeton University Press, USA
[৮] Newly sworn Minister Anantkumar Hegde’s Twitter account gives a peek into his mindset, Pratik Sinha, https://www.altnews.in/newly-sworn-minister-anantkumar-hegdes-twitter-account-gives-peek-mindset/
[৯] How Amit Shah and the BJP have twisted the story of Salar Masud and Raja Suheldev, Ajaz Ashraf, 2017, https://scroll.in/article/841590/how-amit-shah-and-the-bjp-have-twisted-the-story-of-salar-masud-and-raja-suheldev
[১০] The Risks of Looking at India’s History Through the Eyes of Pseudo-Historians, Rohan D'Souza, 2021, https://m.thewire.in/article/history/india-history-pseudo-historians-risks

হিন্দুধর্ম ভার্সেস হিন্দুত্ব

শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন হিন্দুত্বের জয়। আপনারাও সোল্লাসে চিৎকার করেছেন। বেশ ভালো কথা। একটা ছোট্ট প্রশ্ন। হিন্দুত্ব ব্যাপারটা বুঝে করেছেন তো? সেটা করে থাকলে একদিক থেকে ভালো, আমার কাজ কমে গেল। আর যদি হিন্দুত্বকে হিন্দুধর্মের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে থাকেন, তবে এই লেখাটা আপনার জন্যে। আগেও বলেছি আমরা বহুবার। মিটিঙে, সোশ্যাল মিডিয়ায়। আপনি এড়িয়ে গেছেন। আর এড়ানোর স্কোপ নেই। আপনি চান বা না চান, এই হিন্দুত্ব আপনার ঘাড়ে চেপেই গেছে।

একটা জিনিস সবার আগে মাথায় বসিয়ে নিন। দরকার হলে হাতুড়ি পিটিয়ে।

হিন্দুত্ব আর হিন্দুধর্ম এক নয়।

এই কথাটা সবার প্রথমেই আসে। হিন্দুধর্ম একটা প্রাচীন এবং বহুত্ত্ববাদী বিশ্বাস, একটা বড় নদীর মত যেখানে বহু ধারা এসে মিশে যায়। নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী থেকে নীল চামড়ার রাখালকে পুজো করা লোক; শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, অদ্বৈতবাদী, নিরীশ্বরবাদী, ভক্তিবাদী, মিস্টিক সাধক। আবার, এই একই ধর্মে অসংখ্য মানুষকে অচ্ছুৎ করে রাখা হয় জাতপাতের নামে। আক্ষরিকার্থেই একটা কমপ্লেক্স স্ট্রাকচার।

উল্টোদিকে, হিন্দুত্ব তৈরী হয়েছে আধুনিক যুগে, ১৯২৩ সালে, সাভারকরের হাতে। সাভারকরের নিজের লেখাতেই রয়েছে — "Hindutva is different from Hinduism" — প্রার্থনা বা দর্শন নয়, হিন্দুত্বের জন্ম ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে। কল্পিত, এক ছাঁচে তৈরী, মনোলিথিক, উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্য সকলকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। বিশ্বাসের মন্দির নয়, ঘৃণার সুতো দিয়ে সেলাই করা গেরুয়া পতাকা।

ফারাকটা স্পষ্ট দেখতে চাইলে ফিরে তাকান কাদের বাদ রাখা হল সেইদিকে। হিন্দুধর্ম কখনো বলেনি যে আপনার জন্মভূমিকে "পুণ্যভূমি" বা দেবতা হিসেবে পুজো করতে হবে। সাভারকরের হিন্দুত্ব, শুভেন্দুর বলা হিন্দুত্বের ডেফিনেশন কিন্তু সেটাই — ভারত যাদের জন্মভূমি, কর্মভূমি এবং পুণ্যভূমি, তারাই একমাত্র হিন্দু। এবং তারাই এই দেশের আসল নাগরিক, বাকি সবাইকে তাদের প্রভূত্ব মেনেই, তাদের আজ্ঞাবহ দাসানুদাস হয়ে থাকতে হবে। মুসলমান, ক্রিশ্চান — যাদের ভগবান এ দেশীয় নয়, তারা এ দেশে বাস করলেও হিন্দুদের সমান অধিকারের দাবী করতে পারে না, কারণ তারা আসল নাগরিক নয়।

প্রসঙ্গত:, ভারতের সংবিধান রচনার সময়ে যে জাস সোলি-র কথা বলা হয়েছিল — বর্ণ, ধর্ম, বাপমায়ের জন্মভূমি নির্বিশেষে ভারতীয় ভূখন্ডে যারা জন্মেছে, সকলেই ভারতীয় নাগরিক, সিটিজেন বাই বার্থ — সেই জাস সোলির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন  সর্দার প্যাটেল। হ্যাঁ, সেই বল্লভভাই প্যাটেল, যাঁকে লৌহমানব বলে বিজেপি পুজো করে, তিন হাজার কোটি টাকা দিয়ে মূর্তি তৈরী করে পুজো করে, তিনিই।

সাভারকরের হিন্দুত্ব এই জাস সোলি-কে মানেনি কোনওদিনও। এই হিন্দুত্ব বলেছে অহিন্দুদের নাগরিকত্ব কন্ডিশনাল। সঙ্ঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকরের নিজের ভাষায়, এই অহিন্দুরা "may stay in the country wholly subordinated to the Hindu nation, claiming nothing, deserving no privileges, not even citizen's rights", অর্থাৎ, এদের সকলকে হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে, কোনো দাবি করতে পারবে না, কোনো সুযোগ‑সুবিধা নয়, নাগরিক অধিকার তো দূরের ব্যপার।"

আরএসএস আজ অবধি এই তত্ত্বকে অস্বীকার করেনি। তাদের জাতিবিদ্বেষের ব্লুপ্রিন্ট এটাই।

আজ কয়েক দশক ধরে প্রমাণিত — আরএসএস আর তার শাখা সংগঠন — বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, দুর্গা বাহিনী — এদের হিন্দুত্বের বিপদটা জাস্ট থিওরি নয়। আমরা নিরন্তর দেখে আসছি; গরু পাচার, লাভ জিহাদ, বাড়িতে মাংস রাখার অভিযোগে মুসলমানদের পিটিয়ে মারার ঘটনা; মসজিদ ভাঙা; ঐতিহাসিক শহরের নাম বদলানো; স্কুলছাত্রদের শেখানো যে মধ্যযুগের ইতিহাসে মুসলমান শাসক মানেই দানব, আর নায়করা সকলেই হিন্দু; মেয়েদের শারীরিক শিক্ষা দেওয়ার নামে শেখানো যে তার আসল শত্রু বিধর্মী মুসলমান, গার্হস্থ্য হিংসা তো নর্মাল ঘটনা।

এসব আপনার মাথায় ঢুকে গেছে কিনা বুঝবেন কী করে? খুব সহজ। যেদিন দেখবেন আপনার নাদুসনুদুস গণেশ বা আলাভোলা শিবঠাকুরের বদলে মাস্কেলওয়ালা সিক্সপ্যাক ঠাকুর এসে গেছে, বা "ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি, রামলক্ষ্মণ বুকে আছে ভয়টা আমার কী" বলার বদলে আপনি "অ্যাংরি রাম" আর "অ্যাংরি হনুমান"-দের পছন্দ করছেন, কপালে হাত ঠেকিয়ে রামরাম বাবুজীর উত্তরে জয় সিয়ারাম আর জয় রামজীকি-এর বদলে গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে জয় শ্রীরাম বলছেন, দুর্গাপুজোর সময় নিরামিষ খাচ্ছেন নিয়ম করে, সকাল সন্ধ্যে ভাবছেন কী করে ওই মোল্লা আর নীচু জাতের ছোটলোকগুলোকে টাইট দেওয়া যায়, সেদিন বুঝবেন আপনি হিন্দু থেকে হিন্দুত্ববাদীতে উন্নীত হয়েছেন।

একে নিজের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে ভালোবাসা বলে কিনা সেটা আপনিই ঠিক করবেন। আপনার সহনাগরিককে বাবর কি আওলাদ বলে শয়তান হিসেবে দাগিয়ে দেবেন কিনা; রোহিত ভেমুলার মত দলিতদের প্রতিদিন সমাজে তাদের আসল জায়গা দেখিয়ে দেবেন কিনা; মেয়েদের কোন চোখে দেখবেন; আর গণতন্ত্রকে পাশ্চাত্য বিষ বলবেন কিনা।

হ্যাঁ, আপনি ভাবতেই পারেন যে এই সব তত্ত্বকথা মাথায় থাকুক, বিজেপি সব চোরদের জেলে ভরবে। এখানে একটাই ছোট পয়েন্ট — শুভেন্দুকে কে জেলে ভরবে সেটাও ভেবে দেখবেন।

আর হ্যাঁ, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে কী হয় তাই নিয়ে আমাকে বলতে আসার আগে নীচের কথাগুলো পড়ে বোঝার চেষ্টা করবেন।

"If a larger country oppresses a smaller country, I’ll stand with the smaller country. If the smaller country has majoritarian religion that oppresses minority religions, I’ll stand with minority religions. If the minority religion has caste and one caste oppresses another caste, I’ll stand with the caste being oppressed. In the oppressed caste, if an employer oppresses his employee, I’ll stand with the employee. If the employee goes home and oppresses his wife, I’ll stand with that woman. Overall, oppression is my enemy."

– Thanthai Periyar E. V. Ramasamy

Sunday, May 03, 2026

সঙ্ঘ পরিবারের নারীপ্রতিমার কিস্‌সা

কাল ভোটের ফল বেরোবে। কী হবে, আমরা কেউ জানি না, এগজিট পোল যাই বলুক না কেন। তবে যে কথাটা কালও বলেছিলাম — ফাইনাল লড়াইয়ের সময় এসে গেছে। সেখানে আপনাকে জানতে হবে আপনার শত্রু কে।

আরএসএসের মতাদর্শ নিয়ে কথা বলব, অথচ মেয়েদের সম্পর্কে মনুবাদী সঙ্ঘ পরিবারের ধ্যানধারণার কথা বলব না তা তো হয় না। বিশেষ করে রেপিস্টদের ফুল মালা দিয়ে বরণ করার পরে যখন বিজেপি অভয়ার বিচার নিয়ে গলা তোলে, তখন বাস্তবটা সামনে আনতেই হয়। তো তাই, হিন্দুত্ব ন্যারেটিভ বিল্ডিং সিরিজে এবারে রইলো —

সঙ্ঘ পরিবারের নারীপ্রতিমার কিস্‌সা

খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়, কাজেই আপনাদের মনে থাকবে — ভারতের সেরা মহিলা কুস্তিগীরদের কথা, কেউ অলিম্পিকে পদকজয়ী, কেউ বা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন — তারা দিল্লীর রাজপথে ধর্ণায় বসেছিল বিচার চেয়ে। সকলেরই অভিযোগ ছিল ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের কর্তা, বিজেপির বাহুবলী সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিং এর নামে। যৌন হেনস্থার অভিযোগ। দেশ উত্তাল হয়েছিল। কিন্তু মেয়েগুলো কী পেয়েছিল? তাদেরই ফেডারেশন তাদের দাগিয়ে দিয়েছিল মিথ্যেবাদী বলে। এক মন্ত্রী তাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিল রাজনৈতিক যাত্রাপালা বলে। সঙ্ঘ পরিবারের ট্রোল বাহিনী আর পোষা মিডিয়া তাদের বিদেশী এজেন্ট, দেশদ্রোহী, পাকিস্তানের পুতুল ইত্যাদি কিছুই বলতে বাকি রাখেনি। এক কুস্তিগীরকে বলা হয়েছিল "খারাপ মা"। আরেকজনকে বলা হয়েছিল যে সে নাকি পৃথিবীর সামনে দেশের নাম ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। এই মেয়েগুলোর জিতে আনা মেডেল, তাদের চোখের জল, তাদের পরিশ্রম আর সাহস — কিছুরই দাম দেয়নি  তাদেরই দেশের একটা বড় অংশের মানুষ। কারণ, এই মানুষগুলোর কাছে, এদের হিন্দুত্বের আদর্শের সামনে, যে মেয়েটা তার অধিকারের কথা বলে গলা তুলে, সে ভিক্টিম নয়। সে একটা জলজ্যান্ত সমস্যা, যাকে চুপ করানো দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা মেয়েকে অধিকারের কথা বলতে দেখলে, কনসেন্টের কথা বলতে দেখলে, এমনকি চুলে রঙ বা হাতে ট্যাটু করা ছবি পোস্ট করতে দেখলেও এই একই লোকগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে - মেয়েটাকে চুপ করাতে। তার চেহারা, গায়ের রঙ, চুলের স্টাইল, পোশাক, তার পরিবার, ব্যাকগ্রাউন্ড — কিছুই বাদ যায় না এদের কুৎসিত আক্রমণ থেকে...সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অভিজ্ঞতা কমবেশী প্রায় প্রতিটা মেয়েরই আছে।

একে শুধুমাত্র মিসোজিনি বলা ভুল হবে। কারণ, এর কোনো কিছুই র‍্যান্ডম নয়। পুরোটাই একটা সিস্টেমের অংশ। যে সিস্টেমের ম্যানুয়াল লেখা হয়েছে অনেক বছর আগে। যে সিস্টেম শেখায় মনুবাদী পিতৃতন্ত্র আর বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে কথা বলবে, তাকে চুপ করাতে হবে।

কাজেই, সেই সঙ্ঘ পরিবার যখন নারী সুরক্ষার কথা বলে, উন্নাও-হাথরস-কাঠুয়া-মণিপুর-বিলকিস বানুর ধর্ষকদের মুখে অভয়ার বিচারে দাবী শুনে যখন আপনি বিশ্বাসও করে ফেলেন, তখন এই সিস্টেমের শেকড়ের দিকে একবার ফিরে তাকানো জরুরী হয়ে ওঠে। "হিন্দুত্ব ন্যারেটিভ" তৈরীর ইতিহাসের এই দিকটায় আজকে তাকাবো একবার। 

এই লেখাটা মূলত: তনিকা সরকারের লেখা "Hindu Nationalism in India" বইটার তৃতীয় চ্যাপ্টার "Pragmatics of the Hindu Right: The Politics of Women’s Organisations" আর ঊর্বশী বুতালিয়া এবং তনিকা সরকার সম্পাদিত "Women and the Hindu Right" নামের প্রবন্ধ কালেকশনের বিভিন্ন রচনার ওপর ভিত্তি করে তৈরী।

আদর্শগত শেকড়: সাভারকর ও ধর্ষণের লেজিটিমাইজেশন
======================================

হিন্দুত্বের এই দর্শনের ভিত খুঁজে পাওয়া যায় সাভারকরের লেখায়। পুরুষোত্তম আগরওয়াল লিখছেন যে "দ্য সিক্স গ্লোরিয়াস ইপকস অফ ইন্ডিয়ান হিস্টরি" বইয়ে সাভারকর শিবাজীর কড়া সমালোচনা করেছিলেন এই বলে যে "he had a perverse notion of virtue in respecting the chastity of even the Muslim women", এবং সাভারকরের মত অনুযায়ী শিবাজীর উচিত ছিল বন্দিনী মুসলমান মহিলাদের ধর্ষণ করে হাজার বছরের মুসলমানী অত্যাচারের প্রতিশোধ নেওয়া: "The souls of those millions of aggrieved [Hindu] women," Savarkar imagined, would have pleaded with Shivaji: "Do not forget the unutterable atrocities and outrage committed on us... Let the future Muslim conquerors never dare to think of such molestation of Hindu women." 

সাভারকর এই প্রসঙ্গ শেষ করছেন এই বলে যে মেয়েদের প্রতি হিন্দুদের আত্মঘাতী "শৌর্য্যবীর্য্যের ধারণা"-ই মুসলমান মেয়েদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল। নইলে, সাভারকরের মতে ধর্ষণ অপরাধ নয়, বরং মুসলমানদের বিরুদ্ধে হাজার বছরব্যাপী যুদ্ধে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অস্ত্র।

[ইনসিডেন্টালি, এই আইডিয়াটা যে শুধু হিন্দুত্বের একচেটিয়া, এমনটা নয়। সংখ্যাগুরু তার ক্ষমতার আস্ফালনের জন্যে মেয়েদের শরীরকেই বেছে নিয়েছে এমন নিদর্শন ইতিহাসে অগুণতি। সে ধর্মের জন্যেই হোক বা জাতিগত হিংসার কারণেই হোক। পার্টিশনের ওরাল হিস্টরি যদি পড়েন — ঊর্বশী বুতালিয়ার "দি আদার সাইড অফ সাইলেন্স" বা রীতু মেনন এবং কমলা ভাসিনের "বর্ডারস অ্যান্ড বাউন্ডারিজ", বা অন্যান্য জাতিগত হিংসার ইতিহাস, প্যালেস্টাইন বলুন নাৎসিদের ইতিহাস — বেসিক থিওরিটা সেই একই থেকে গেছে। মেয়েদের শরীরই সংখ্যাগুরুর ক্ষমতার আস্ফালন আর বদলার ক্ষেত্র। ভারতে সঙ্ঘ, পাকিস্তান বা বাংলাদেশে জামাত, আফগানিস্তানে তালিবান।]

যা লিখলাম ওপরে, তার কোনোটাই প্রাচীন ইতিহাস নয়। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে এই আদর্শের প্র‍্যাক্টিকাল পরীক্ষা হয়েছিল সুরাটের রাস্তায় — ফ্লাডলাইটের আলোয় মুসলমান মেয়েদের গণধর্ষণের মাধ্যমে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মহিলা নেত্রী কৃষ্ণা শর্মার ভাষায় — "হিন্দুদের এমন অবস্থা তৈরী করতে হবে যাতে বাকিরা ভয় পেতে শুরু করে। আমাদের নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিতে হবে। ওরা যদি আমাদের দশ বা পনেরোজনকে ধর্ষণ করে, আমাদেরও ওদের মহিলাদের ওপর একই কাজ করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে আমরাও কম যাই না"। কৃষ্ণা শর্মা এই কথাগুলো বলেছিলেন কলেজের কিছু ছাত্রীর সামনেই...

সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগাটের মত যে কুস্তিগিররা পথে নেমেছিলেন, তাঁরা কেউ সেদিন সাম্প্রদায়িক হিংসার কথা বলেননি, তাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁদেরই জগতের এক প্রভাবশালী কর্তার বিরুদ্ধে — যিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদী একটা দলের প্রতিনিধি। আর, সেদিন আমাদের সিস্টেম ঠিক একইভাবে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল — ঘটনা অস্বীকার করে, প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে, আর মেয়েগুলোকে মিথ্যাবাদী, নাটুকে বা "খারাপ মা" বলে দাগিয়ে দিয়ে...ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সকলেই ছিল এতে, কারণ সাভারকরের ওই কথাগুলো হিন্দুত্ব সিস্টেমের সমস্ত স্তরে ছড়িয়ে আছে, এমনকী মেয়েদের সংগঠন রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির মধ্যেও...

ঘৃণার জন্যে ক্ষমতায়ন, ঘরে নির্বাক দাসত্ব
===========================

তনিকা সরকার একটা সময়ে বড়সড় ফিল্ড ওয়ার্ক করেছিলেন আরএসএসের মহিলা সংগঠন রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির ওপরে। ১৯৯৯ সালে, আরএসএসের এক মহিলা নেত্রী এই ফিল্ড ওয়ার্কের সময়েই এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন — "আমরা মেয়েদের শেখাই আত্মত্যাগ করতে, যাতে পরিবার এক সুতোয় বাঁধা থাকে। অধিকারের কথা থিওরি হিসেবেই শুনতে ঠিক লাগে; অধিকারের দাবীতে লড়াই ভুল।"

পদ্ধতিটা খেয়াল করবেন একবার। সমিতি মেয়েদের ফিজিকাল ট্রেনিং দেয় - মার্শাল আর্ট, যোগাসন, তরোয়াল চালানো, জুডো, এমনকি বন্দুক চালানোতেও। সমিতির প্রকাশনায় লেখা আছে — "স্বসংরক্ষণক্ষম নারী কি সমাজমে অধিক প্রতিষ্ঠা হোতি হ্যায়", মানে "আত্মরক্ষায় সক্ষম নারীর সামাজিক প্রতিষ্ঠা বেশি"। কিন্তু আত্মরক্ষা কার থেকে? পণের দাবী করা লোভী বউপেটানো স্বামীর হাত থেকে নয়। নিজের সম্প্রদায়ের ধর্ষকের হাত থেকেও নয়। এই প্রশিক্ষণের এক ও একমাত্র লক্ষ্য হল মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই। যুদ্ধ। দিল্লীর রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির সংগঠক আশা শর্মার নিজের মুখেই স্বীকার করেন যে যুদ্ধ বলতে তাঁরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের কথাই বলতে চান।

সমিতির উৎপত্তির গল্পটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। অফিশিয়াল ভার্সনে বলা হয় যে সমিতি তৈরী করা হয়েছিল হিন্দুত্বের আদর্শকে জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে। কথিত ইতিহাস — সমিতির প্রচারিকাদের মুখে যেটা শোনা যায়, সেটা সামান্য আলাদা। তাঁরা বলেন যে সমিতির প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মীবাঈ কেলকার, এক অল্পবয়সী মেয়েকে তার নির্বিকার হিন্দু স্বামীর সামনেই হিন্দু গুন্ডাদের হাতে ধর্ষিতা হতে দেখে ঠিক করেছিলেন যে হিন্দু পুরুষরা যেহেতু তাদের পরিবারের মেয়েদের রক্ষার দায়িত্ব নিতে অক্ষম, তাই মেয়েদেরই আত্মরক্ষার ভার নিতে হবে। লক্ষ্মীবাঈ কেলকারের হাতে সমিতির শুরু এর পরেই। কিন্তু, হিন্দু পুরুষদের হিংস্রতার এই অকপট স্বীকারোক্তি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়। সমিতি প্রকাশ্যে কখনোই হিন্দু পুরুষের সমালোচনা করে না। সমস্ত রাগ এবং আক্রোশের লক্ষ্য শুধুই মুসলমান সম্প্রদায়।

আজও আমরা ঠিক একই ঘটনা দেখি। টার্গেট বদলে দেওয়া। সাক্ষী বা ভিনেশরা যখন এক বাহুবলী হিন্দু পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, তখন হিন্দুত্বের নেতানেত্রীরা বা ট্রোল বাহিনী পুরুষতন্ত্রকে খালাস দিয়ে অভিযোগকারিনীদেরই রাষ্ট্রবিরোধী পাকিস্তানপ্রেমী বানিয়ে দেয়। হিন্দুত্বের সংজ্ঞায় শত্রু কখনোই পরিবারের ভিতরে থাকে না; সে সর্বদাই বাইরের শক্তি; আর সে থাকে মুসলমানের বেশে।

গেরুয়া শাড়ির আড়ালে নখদাঁত বের করা পিতৃতন্ত্র
=================================

এবার বলি সঙ্ঘের এই "এমপাওয়ার্ড" মহিলারা অ্যাকচুয়ালি কীসে বিশ্বাস করেন। তনিকা সরকারের ফিল্ডওয়ার্কের সময় বিজেপি মহিলা মোর্চা নেত্রীরা আর রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির প্রচারিকারা যা বলেছিলেন, তার জিস্ট:

▪️সতী সম্পর্কে: আশা শর্মার বক্তব্য ছিল — সতী আসলে নিজের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে মেয়েদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ইচ্ছা। রূপ কানোয়ারের ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন যে সেটা স্বেচ্ছায় সতী হওয়ার ঘটনা ছিল না, এবং এই জন্যেই সঙ্ঘ মেয়েদের শারীরিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেয়। ঘুরিয়ে বললে এর মানে দাঁড়ায় যে খাঁটি হিন্দু মহিলা অন্য কারো কথায় নয়, বরং স্বেচ্ছায় সতী হওয়াকে গর্বের মনে করেন।
▪️বধূ নির্যাতন সম্পর্কে: মেয়েদের উদ্দেশ্যে ভিএইচপির নেত্রী কৃষ্ণা শর্মার উপদেশ ছিল যে তাদের শিখতে হবে কীভাবে নিজের গলার আওয়াজকে, নিজের চিৎকারকে নিজের গলার মধ্যেই চেপে রাখতে হয়, যাতে ব্যাপারটা ঘরের চৌহদ্দির মধ্যেই থেকে যায়। মারধোর চলতেই থাকলে সেই মেয়েটির উচিত নিজের "বিরাদরি", মানে সম্প্রদায়ের গুরুজনদের সঙ্গে কথা বলা। আইনী ব্যবস্থা একদম শেষ পন্থা। ডিভোর্স হিন্দু মহিলার কাছে বাস্তবোচিত নয় কারণ একজন নারী একা থাকতে পারে না, আর স্বামীও বদল করতে পারে না।
▪️মেয়েদের শিক্ষা বনাম ছেলেদের শিক্ষা সম্পর্কে: কৃষ্ণা শর্মাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে পরিবার যদি মাত্র একজনেরই শিক্ষার খরচ বইতে সমর্থ হয়, তাহলে কাকে স্কুলে পাঠানো উচিত, ছেলেকে না মেয়েকে? কৃষ্ণা শর্মা উত্তরে বলেন যে চাকরি করে পরিবার চালানো পুরুষেরই দায়িত্ব, কাজেই এক্ষেত্রে ছেলের শিক্ষাই বেশি জরুরী।
▪️ম্যারিটাল রেপ প্রসঙ্গে: কৃষ্ণা শর্মা এই আইডিয়াটাকেই পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছিলেন "এলিয়েন কালচার" বলে। আরো বলেছিলেন যে মেয়েটি যদি শারীরিক এবং মানসিকভাবে শক্ত হয়, তাহলে তার নিজের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার কথা। বেসিকালি, গেরুয়ার ছদ্মবেশে ভিক্টিম ব্লেমিং।
▪️ভিন্ন সম্প্রদায়ে প্রেম বা বিয়ে প্রসঙ্গে: সঙ্ঘের যে নেতারা মুসলমান মেয়েদের মুক্ত করার স্বার্থে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের নামে মুখে রক্ত তোলেন, তাঁরাই আবার বলেন হিন্দু মেয়েদের বাপমায়ের কথাই শোনা উচিত, তাঁরাই ভালো বোঝেন, এবং তাঁদের কথার প্রতিবাদ করা মানে অশান্তি ডেকে আনা।

একে নারীর ক্ষমতায়ন বলবেন? নাকি গেরুয়া পতাকায় সাজানো খাঁচায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড বলবেন?

এই কনট্রাডিকশনের আরো উদাহরণ পাওয়া যায় সঙ্ঘের মহিলা নেত্রীদের কথাবার্তায়। অমৃতা বসু, তাঁর "ফেমিনিজম ইনভার্টেড" লেখায় এইধরণের কনট্রাডিকশনের বেশ কয়েকটা চোখধাঁধানো উদাহরণ দিয়েছেন। সঙ্ঘের সবচেয়ে খ্যাতনামা মহিলা নেত্রীরা — উমা ভারতী, সাধ্বী ঋতম্ভরা, বিজয়রাজে সিন্ধিয়া — প্রত্যেকেই সঙ্ঘের ভাষায় ব্রহ্মচারিণী। ঋতম্ভরা আর উমা ভারতী দুজনেই সন্ন্যাসিনী (সাধ্বী আর সন্ন্যাসিনীর মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও এখানে একার্থে ব্যবহার করলে বিশেষ তারতম্য হবে না), আর বিজয়রাজে সিন্ধিয়া বিধবা। এঁদের এই ত্যাগের জীবন বা রিনান্সিয়েশন থেকে এঁদের মধ্যে একধরণের মরাল অথরিটি আসে, যার ফলে এঁরা নিজেদের কথার মধ্যে তীব্র আক্রোশ বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেন স্বচ্ছন্দে। আবার যে ভাষায় এঁরা কথা বলেন, সেই একই ভাষা ব্যবহার করলে একজন সাধারণ মেয়েকে অনায়াসেই "মন্দ মেয়ে" বলা হত।

কিন্তু এই ক'জনা এক্সেপশন। ব্যতিক্রম। এঁদের উগ্র, আক্রমণাত্মক এমনকি অশালীন ভাষা ব্যবহার করারও ছাড় রয়েছে। কারণ? তথাকথিত ত্যাগের সূত্রে পাওয়া ওই মরাল অথরিটি। কিন্তু সাধারণ হিন্দু মেয়ের কাছে সঙ্ঘের এক্সপেক্টেশন আবার আলাদা। বিশেষ করে সেই মেয়েরা যদি কোনো ঘরের বউ হয় বা ছেলেমেয়ের মা হয়। সেক্ষেত্রে সঙ্ঘ তাকে শেখায় মানিয়ে চলতে, আপোষ করতে, নিজেদের চিৎকারকে বুকের ভিতরে চেপে রাখতে। নেতৃত্বে যাঁরা থাকেন তাঁরা ব্রহ্মচারী; সাধারণ কর্মীরা একান্ত অনুগত সৈনিক। এই সিস্টেমটাকে সফলভাবে চালাতে অল্প কয়েকজনই আগ্রাসী নারীমূর্তির দরকার পড়ে — যাঁরা দরকারে জনতাকে উত্তেজিত করে তুলতে পারবেন; বাকি বিশাল সংখ্যক সাধারণ মেয়েরা থাকবে শান্তশিষ্ট অনুগত গোবেচারা গৃহপালিত প্রাণীর মত...

এই ডুয়ালিজম বা হিপোক্রিসিটা খেয়াল করবেন...একদিকে বিজেপি মেয়েদের ভোটে দাঁড় করায়। লকেট চ্যাটার্জী, পাপিয়া অধিকারী, অগ্নিমিত্রা পল, বিহারে মৈথিলী ঠাকুর ইত্যাদি। কিন্তু মেয়েদের নিত্যদিনের সমস্যা নিয়ে এদের গলা তুলতে দেখবেন না কখনো। সমকাজে সমবেতন, কনসেন্ট, গার্হ্যস্থ হিংসা, ম্যারিটাল রেপ, প্রজননের চয়েজ — এই নিয়ে তাঁরা উচ্চবাচ্য করেন না। গ্রাসরুট মহিলা সংগঠনকে ঠেলে দেওয়া হয় ঘরোয়া আচার অনুষ্ঠানের গন্ডির মধ্যে। কড়ওয়া চওথ, গোপালের পরিচর্যা, শিবরাত্রি, আরো হাজারো ব্রত...স্বামী, সন্তান, পরিবারের মঙ্গলকামনার নানান উপাচার।

মঞ্চে থাকেন নারী নেত্রীরা। মঞ্চের আড়ালে নিয়ন্ত্রিত হয় নারী শরীর।

নারীর অধিকার আর নারীসুরক্ষার ফাঁকা স্লোগান
=================================

একদিকে আমরা দেখি বিজেপি অভয়ার বিচার চেয়ে চিৎকার করে গলা ফাটায়। আবার অন্যদিকে দেখি উন্নাও-কাঠুয়া-হাথরসের ঘটনা। দেখি বিলকিস বানুর ধর্ষকদের ছেড়ে দিতে চায় বিজেপির সরকার। দেখি ধর্ষণে অভিযুক্তকে মালা পরিয়ে স্টেজে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেখি বাস্তবে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা মেয়েদের ওপর অকথ্য ভাষায় আক্রমণ। দেখি মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে জঘন্য একটা মীম।

তখন সিরিয়াসলি আপনাদের একবারও মনে হয় না যে এই দক্ষিণপন্থী নেতানেত্রীরা যখন মেয়েদের সুরক্ষার দাবীতে বা ক্ষমতায়নের দাবীতে স্লোগান দেয়, তখন পাল্টা প্রশ্ন করি — যে ক্ষমতায়ন কোন কাজটা করার জন্য?

আরএসএসের নিজস্ব প্লেবুক অনুযায়ী, 
▪️মেয়েরা আত্মরক্ষার টেকনিক শিখতে পারে — তবে শুধু মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করার জন্যে, নিজের ঘরে তার ওপর হওয়া অত্যাচার ঠেকাতে নয়।
▪️মেয়েরা চাকরি করতে পারে — তবে শুধুমাত্র পরিবারের যদি একান্তই দরকার পড়ে, তবেই; নইলে সেটা বিলাসিতা।
▪️একটা মেয়ে পাব্লিকলি গলা তুলে কথা বলতেই পারে — তবে সেটা বিদ্বেষ ছড়িয়ে লোককে উত্তেজিত করতে, ইক্যুয়াল মাইনে বা রিপ্রোডাক্টিভ চয়েজের অধিকার চেয়ে নয়। সেগুলো অবাধ্যতা। ভারতীয় সংস্কৃতি নয়।
▪️ধর্ষণ আলোচিত হতেই পারে — তবে কেবল পশ্চিমী সংস্কৃতি আর অশ্লীল গণমাধ্যমকে দোষারোপ করার জন্য, আর নয়তো "ওদের" বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে, প্রতিশোধে উস্কানি দিতে। হিন্দু পরিবারের অন্দরে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্যে কখনোই নয়।

লাভ জিহাদ আর মুসলমান ধর্ষকদের নিয়ে গলা ফাটান যে নেতানেত্রীরা, তাঁরাই আবার নিজের দলের সাংসদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনা মেয়েদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। হিন্দু মেয়েদের সুরক্ষার দাবী করে যে অনলাইন ট্রোলরা, তারাই আবার নিজস্ব মতামত প্রকাশের দায়ে মহিলা কুস্তিগির, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের ওপর চড়াও হয়।

ফ্লাভিয়া অ্যাগ্নেস — একজন আইনজীবী এবং ফেমিনিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট, তাঁর একটা লেখায় লিখেছেন যে "হাম ভারত কি নারী হ্যায়, ফুল নহি চিঙ্গারি হ্যায়" বলে নারী আন্দোলনের যে স্লোগান আমরা শুনে অভ্যস্ত, সেই স্লোগানকে আত্মসাৎ করে শিবসেনা আর বিজেপির মহিলা শাখাগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে রণহুঙ্কারে বদলে নিয়েছে। পণপ্রথা, যৌতুক, বৈবাহিক হিংসা বা বৈবাহিক ধর্ষণের বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ভারতের নারী আন্দোলন সংগঠনগুলো দশকের পর দশক ধরে যে চেষ্টা চালিয়েছিল — চিঙ্গারি হ্যায়ের মত স্লোগান সেই নারী আন্দোলনেরই প্রতীক। নারী আন্দোলনের স্লোগানগুলোকে চুরি করে নিয়ে তাদের ভিতরের আসল নারীবাদী অংশ মুছে ফেলে হিন্দুত্ববাদীরা সেগুলোকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অস্ত্রে পরিণত করেছে।

উপসংহার
=======

তনিকা সরকারের লেখা শেষ হচ্ছে একটা ওয়ার্নিং দিয়ে। সেটা ভার্বাটিম তুলে দিই। 

"The point is not that these women are being conned into belief, for the same applies to men. The point is to assess the nature of the issues they assent to."

একটা কথা মাথায় রাখা দরকার — হিন্দু দক্ষিণপন্থার ভেতরের মেয়েদের সিম্পলি "false consciousness" বলে খারিজ করে দেওয়া যায় না। এই মেয়েরা ওই রিগ্রেসিভ পরিবেশের মধ্যেও একটা সীমিত ক্ষমতায়ন খুঁজে পেয়েছে — শারীরিক শিক্ষা, জনপরিসরে ভূমিকা - সে মাউথপীস হিসেবে হলেও — এগুলো এদের কাছে দামী। এদের সঙ্ঘের রিগ্রেসিভ আদর্শ থেকে বের করে আনতে গেলে আরো শক্তিশালী আদর্শের প্রয়োজন। শুধু আইনি অধিকার নয়, বরং ইক্যুইটি এবং ইক্যুয়ালিটি — যাতে একটা অল্প বয়সী মেয়ে গর্বের সঙ্গে তার জবরদস্তি-করা স্বামীর চাহিদা খারিজ করে দিতে পারে একটা মাত্র শব্দে; এমন একটা সিস্টেম যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সংবিধানে লেখা একটা শব্দ হয়ে থাকবে না, বরং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সঙ্গী হয়ে উঠবে — স্কুলে, কলেজে, কলে, কারখানায়, অফিসে, বাড়িতে, মহল্লায়...

তবে এই হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে তার পাওনাগন্ডা বুঝিয়ে দিতেই হবে। সাভারকরের রেপ-অ্যাপোলজিয়া জাস্ট একটা কথার কথা নয়; যে লোকগুলো নিজেদের হিন্দু মেয়েদের একমাত্র রক্ষক বলে দাবী করে, তাদের ফিলোজফি এইটা।

সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগাটদের মত কুস্তিগীর, বা অন্য যারা গলা তুলেছে — অভিনেত্রী, রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মী, সাংবাদিক, আমার আপনার পরিচিত অনেক মেয়ে যারা সমাজ মাধ্যমে নিজের কথা বলার চেষ্টা করেছে — এদের প্রত্যেককে যে বিজেপি নেতারা নানান কুকথায় চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, যে ট্রোলেরা অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করে, তারা সকলেই হিন্দুত্বের এই ট্র‍্যাডিশনেরই ফলোয়ার যার শেকড়ের শুরু আগের শতকে। নাগপুরে লেখা ম্যানুয়াল মেনে একই ঘটনা ঘটে চলেছে বছরের পর বছর। 

যারা পালটা জবাব দেয়, এই সিস্টেম দাঁতনখ বের করে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমন উদাহরণ ক'টা দেখতে চান?

সূত্র (আগেও বলেছি, তাও):

(১) Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
(২) Women and the Hindu Right - a Collection of Essays, eds Tanika Sarkar, Urvashi Butalia, Zubaan, New Delhi

Friday, May 01, 2026

Saffron Temples of Hate

ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, একটা বিষয় স্পষ্ট —  একটা ক্রিটিকাল সময় আসতে চলেছে। বিজেপি যেভাবে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলা দখলে নেমেছিল তাতে এটা স্পষ্ট যে ফাইনাল লড়াইয়ের সময় আগতপ্রায়। এই লড়াইটা আমাদেরই লড়তে হবে, আর এখানে লড়তে গেলে, কার বিপক্ষে, কীসের বিপক্ষে লড়ছি সেটাও তো জানা দরকার। কাজেই, আবার একটু ইতিহাসের জ্ঞান...যদিও এগুলো কোনোটাই বিশেষ অজানা কথা নয়। একটু চোখকান খোলা রাখলে, একটু বইপত্র পড়লে এগুলো জানা এবং বোঝার কথা। তাও ডকুমেন্ট করে রাখছি, শুধুমাত্র স্কেলটা বোঝানোর জন্যে।

বিষয়: আরএসএস-এর স্কুল — যাকে ওরা শিক্ষার মন্দির বলে, সেগুলো কেন আসলে ঘৃণার মন্দির। Saffron Temples of Hate.

সরস্বতী শিশু মন্দিরের দিকে একবার তাকালে দেখতে পাবেন বাচ্চারা প্রার্থনা করছে, গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, বন্দে মাতরম গাইছে। কী মনে হয়? একদম নিষ্পাপ শাশ্বত ভারতীয় সংস্কৃতি, তাই না? আজ্ঞে না। বাস্তবে এই সরস্বতী শিশু মন্দির হিন্দুরাষ্ট্রের কারখানা; একটা প্রোজেক্ট যেটা বহু বছর ধরে নি:শব্দে চলে এসেছে। ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিন (দশমীর সিগনিফিকেন্সটা মাথায় রাখবেন — রামের হাতে রাবণের মৃত্যু) এক মারাঠি ব্রাহ্মণ, কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার, ওরফে ডক্টরজী, প্রতিষ্ঠা করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের। ঘোর কলোনিয়াল শাসনের সময় হলেও হেডগেওয়ারের লক্ষ্য ছিল ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় আর তাঁর চোখে সবচেয়ে বড় সামাজিক ব্যাধি — হিন্দু-মুসলমান ঐক্য। হেডগেওয়ারের উত্তরাধিকারী, মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর, আরেক মারাঠি ব্রাহ্মণ, একাধিকবার হিটলারের জার্মানির প্রশংসাও করেছিলেন — বিশেষ করে জার্মানি যেভাবে সেমিটিক (এক্ষেত্রে ইহুদী) সম্প্রদায়ের মানুষদের দেশ থেকে তাড়িয়েছিল, তার। গোলওয়ালকরের লেখায় (We or Our Nationhood Defined) এমনও ঘোষণা পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলছেন অহিন্দুরা ভারতে থাকতে চাইলে তাদের হিন্দুদের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে হবে, এবং তাদের নাগরিক অধিকার বলে কিছু থাকবে না। আরএসএস আজ অবধি হেডগেওয়ার এবং গোলওয়ালকরের কথাকে অস্বীকার করেনি। পঞ্চাশের দশক থেকে তৈরী হয়ে আসা সঙ্ঘের কয়েক হাজার স্কুলে এই মুহূর্তে পড়াশোনা করা চল্লিশ লক্ষের কাছাকাছি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এই ধারণাই বয়ে চলেছে। আজও।

আরএসএস স্কুল বলে না। বলে মন্দির। এখানে উদ্দেশ্য স্বাক্ষরতা বা শিক্ষা নয়। উদ্দেশ্য হিন্দু রাষ্ট্রের পুজো করতে শেখানো — এমন রাষ্ট্র যেখানে মুসলমান, ক্রিশ্চান আর দলিতরা হয় শত্রু, নয় ভৃত্য। স্কুলের মধ্যে বা পাশেই মন্দির একটা থাকবেই। স্কুলের ভিতরে দেওয়ালে ঝুলবে রাম, রাণা প্রতাপ, শিবাজীর ছবি — বিদেশী, বিশেষ করে মুসলমানদের খতম করা বীর যোদ্ধা হিসেবে। থাকবে হেডগেওয়ার আর গোলওয়ালকরের ছবিও। ভারতের ম্যাপের বদলে ঝুলবে অখন্ড ভারতের ম্যাপ, আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার অবধি বিস্তৃত ভূখন্ডের ছবি যেখানে বিরাজ করেন ভারতমাতা। স্কুলে আলাদা করে অযোধ্যার রামজন্মভূমি নিয়ে বক্তৃতা হবে; কোনো স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা গর্ব করে বলবেন কীভাবে সেই বক্তৃতা শুনে ক্লাস ফাইভের ছেলেমেয়েরা রাগে, প্রতিশোধের স্পৃহায় হাত মুঠো করে ফেলেছিল। আরেক প্রধানশিক্ষক বলবেন কীভাবে তাঁর স্কুলের ছাত্ররা ১৯৯০ সালে করসেবায় যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গী হয়েছিল। সরকারি আইনরক্ষকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের কথা স্মরণ করা হবে স্কুল অ্যাসেম্বলিতে।

ইতিহাস শেখানো হবে না। ইতিহাসকে ওয়েপনাইজ করা হবে। বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হবে "ভারতীয় সংস্কৃতি" বলে একটা আলাদা বিষয়। সেখানে বাচ্চারা শিখবে মুসলমান মানে আক্রমণকারী, ধর্ষক, যারা মন্দির ভাঙে, যারা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে এসেছে চিরকাল। হিন্দুরা চিরকেলে নির্যাতিত, কাজেই তার বদলা নিতে হিংসার আশ্রয় নেওয়া জায়েজ। আজকের সাধারণ মুসলমান নাগরিক আর মধ্যযুগের মুসলমান শাসক একই। মহাকাব্য, মাইথোলজি আর ইতিহাসের বাউন্ডারি আবছা করে দেওয়া হবে এমনভাবে যাতে নায়কের রোলে মানুষ আর দেবতার মধ্যে বিশেষ ফারাক না থাকে, আর খলনায়কের চরিত্রে অসুর, কলোনিয়াল শাসক আর মুসলমানকেও একই খোপে ফেলে দেওয়া যায়। নায়করা সকলকে অবশ্যই হিন্দু এবং অবশ্যই উচ্চবর্ণের হতে হবে। মেয়েদের দেখানো হবে "সতী" হিসেবে — যারা সম্ভ্রম বাঁচাতে আগুনে পুড়ে মরতেও পিছপা হয় না। ক্লাস ফোরের টেক্সটবইয়ে থাকবে ১৯৯০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙতে গিয়ে "শহীদ" হওয়া করসেবকদের ছবি। শেখানো হবে সমস্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আসল উৎস সুমহান ভারতের প্রাচীন হিন্দু স্ক্রিপচারেই। বাচ্চাদের ক্যুইজের প্রশ্ন করা হবে: "কোন অত্যাচারী শাসক গুরু গোবিন্দ সিংহের ছেলেদের জীবন্ত কবর দিয়েছিল"? তারা উত্তর মুখস্থ করবে: "ঔরঙ্গজেব"। প্রেক্ষাপটহীন জ্ঞানের মোড়কে বিক্রি হবে ঘৃণা।

শুধু শরীর তৈরী হবে। মানবিকতা নয়। যোগাসন বাধ্যতামূলক হবে বাচ্চাদের হিন্দুরাষ্ট্রের যোগ্য সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। লাঠি, তরোয়াল, বর্শার ব্যবহার শেখানো হবে — আধুনিক যুদ্ধে লড়বার জন্যে নয়, বরং নিরস্ত্র গরীব মুসলমান সহনাগরিকদের পিটিয়ে খুঁচিয়ে মারার জন্যে। বাচ্চাদের জন্মদিন পালন হবে পবিত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে, সংস্কৃত মন্ত্রের উচ্চারণে আর ক্যাসেটে ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী গান বাজিয়ে; কেক কেটে নয়, কারণ সেটা পশ্চিমী সংস্কৃতি, যতই জনপ্রিয় হোক না কেন। বাচ্চাটাকে মালা পরানো হবে, সাজানো হবে দেবতার সাজে। ব্যক্তিগত আনন্দের জায়গা নেবে সমষ্টিগত আচার। আরএসএসের নিজস্ব ম্যানুয়ালে লেখে — "Without a suitable technique no ideal can be realized. We have evolved a technique, an emblem, a mantra, a code of discipline" — সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার সর্বগ্রাসী মনোভাব; ময়ূরকে আফিম খাইয়ে পোষ মানানোর মতন, যেখানে দশ-বারো-চোদ্দ বছরের বাচ্চারাও এই হিন্দুরাষ্ট্রকে দেশ ভেবে দেশপ্রেমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে।

নজরদারি চলবে পরিবারের ভিতরেও। স্কুলের শিক্ষকরা নিয়মিত পৌঁছে যাবেন ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতেও; সম্পর্ক গড়ে তুলবেন বাবা-মা, পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে। আরএসএসের বর্ধিত শাখার অংশ হয়ে উঠবে স্কুল। পরিবার সঙ্ঘের আদর্শে আপত্তি করলে ছাত্র বা ছাত্রীকে বলা হবে অপেক্ষা করতে; আস্তে আস্তে ভিতর থেকে পরিবারকে বদলাতে; এই কাজে সাহায্য করবেন শিক্ষকেরা। পেরেন্ট-টিচার মিটিং বাচ্চার পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়ে হবে না; হবে সংস্কার নিয়ে — কীভাবে বাচ্চার মধ্যে হিন্দু সংস্কার গড়ে তুলতে হবে — বশ্যতা, আনুগত্য, শ্রদ্ধা আর "ওদের" প্রতি ঘৃণা। "ওরা" মানে মুসলমান বা ক্রিশ্চান বা দলিত নীচু জাতের মানুষ। সঙ্ঘের মহিলা শাখা — রাষ্ট্রসেবিকা সমিতি — মেয়েদের মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেয়, কিন্তু শেখায়: "হাম ঘর তোড়নেওয়ালে নেহি হ্যায়"। স্কুলের মেয়েরা বড় হলে, বিয়ের পর পারিবারিক অত্যাচারের মুখে পড়লে, আইনি সহায়তা থাকে না, পণপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকে না, বিচ্ছেদের সুযোগ থাকে না। থাকে শুধু একটা গেরুয়া খাঁচা।

বিপদটা শুধু সাম্প্রদায়িকই নয়, ভয়ানকভাবে গণতন্ত্রবিরোধীও। সরকারি স্কুলগুলোর পরেই, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্কুল চেইন চালায় বিদ্যা ভারতী, গোটা দেশে প্রায় পঞ্চাশ হাজার; লক্ষ্য ভারতের প্রতিটি ব্লকে অন্তত: একটা করে স্কুল তৈরী। সেখানে বাচ্চারা গণতন্ত্র শেখে না। "গুরুজী" গোলওয়ালকর তো কবেই গণতন্ত্রকে বিষ বলে দিয়েছেন। সঙ্ঘের আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা হল উচ্চবর্ণের শিক্ষকদের নিয়ে তৈরী গুরুসভা — যাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে ৩০টা ভোট, যারা ছাপিয়ে যাবে লোকসভার ক্ষমতাকেও। এখানে জাতিভেদের সমালোচনা হবে না, "জাতিবাদসে আজাদী" স্লোগানকে বলা হবে দেশবিরোধী। হিন্দুধর্মের এই জাতিভেদপ্রথার কট্টর সমালোচক হিসেবে আম্বেদকরের ভূমিকা ভুলিয়ে দেওয়া হবে। দলিতদের বলা হবে "অজ্ঞ শিশু" — যাদের অধিকার নয়, বরং এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়েই ভুলিয়ে দেওয়া যাবে। মেয়েরা বাচ্চাবয়স থেকেই শিখবে যে অধিকারের ধারণা আসলে একটা করাপ্ট পাশ্চাত্য ধারণা; তারা জানবে যে তাদের ভবিতব্য, তাদের লক্ষ্য, শুধুমাত্র একজন "আদর্শ মা" হয়ে ওঠা, যিনি কখনো অভিযোগ করেন না, অধিকারের দাবী করেন না, তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না; পরিবারের মঙ্গলই তাঁর একমাত্র আশা আকাঙ্খা কর্তব্য।

একে কি শিক্ষা বলব? নাকি ফ্যাসিবাদী ভবিষ্যতের মতাদর্শের দীক্ষা বলা উচিত? আরএসএসের স্কুলে পড়া বাচ্চাদের সরাসরি মিথ্যা শেখানো হচ্ছে না, বরং দেশপ্রেমের মোড়কে অর্ধসত্য শেখানো হচ্ছে — যা আরো ভয়ঙ্কর। তারা বড় হচ্ছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে গরীব নিরস্ত্র মুসলমান সহনাগরিককে পিটিয়ে মারা বা বাস্তুচ্যুত করা আসলে আত্মরক্ষা; শিখছে যে গণতন্ত্র আসলে দুর্বল এবং করাপ্ট পশ্চিমী ধারণা; শিখছে নারীর অধিকার আসলে সনাতনী পরিবারকে ধ্বংস করে; আর জানছে যে তাদের সাবর্ণ হওয়ার সমস্ত সুযোগ সুবিধা আসলেই ডিভাইন রাইট। ঈশ্বরপ্রদত্ত। আরএসএসের পরিকল্পনা ছিল যে এরাই একদিন বড় হবে। নাগরিক হিসেবে ভোট দেবে। আইনরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। আদালতে বিচার করবে। আইনসভায় আইন পাশ করবে।

আর, ঠিক এইটাই হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সঙ্ঘের স্কুলে এই শিক্ষা পেয়ে বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা আজকে কেউ পুলিশ, কেউ বিচারক, কেউ উকিল...তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রে এই শিক্ষার ছাপ তারা ক্রমাগত রেখে চলেছে। বিশ্বাস না হলে আপনার কাছাকাছি সরস্বতী শিশু মন্দির বা বিদ্যাভারতী স্কুলে গিয়ে ক্লাস ফাইভের সংস্কৃতি বইটা চেয়ে হাতে নিয়ে দেখে নিতে পারেন, বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করুন তারা ইতিহাস বলে কী শিখছে। আর তারপর একবার টিভি চালিয়ে দেখে নিন গণতন্ত্রের প্রথম তিনটে পিলারের মানুষজন কোন ভাষায় কথা বলছে আর চতুর্থ পিলার মিডিয়াই বা কোন সুরে গাইছে...

তারপর সিদ্ধান্ত নিন...

This is the army standing against us. This is a battle we have to win. Whatever it takes...

সূত্র:
▪️Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
▪️Khaki Shorts & Saffron Flags - a Critique of the Hindu Right, Tapan Basu et al, Orient Blackswan