Thursday, May 07, 2026

হিন্দুত্বের ইতিহাসচর্চা

হিন্দুত্ব - বিজেপি স্টাইল, বা বলা ভালো আরএসএস স্টাইল - বাস্তবে কী জিনিস তাই নিয়ে আগে লিখে ফেলেছি। সামারি আর দিলাম না, এই লেখার নীচের হ্যাশট্যাগগুলো দিয়ে পেয়ে যাবেন, চাইলে দেখে নেবেন। তবে এই হিন্দুত্ব কখনওই সম্পূর্ণ হবে না যতক্ষণ না ইতিহাসকে নতুন করে লেখা হবে। একশো কোটি হিন্দুকে টুপি পরাতে গেলে তো সেইটা লাগবে, হোয়াটসঅ্যাপ ইউনিভার্সিটিতে যে ইতিহাস পড়ানো হবে, প্রমোট করা হবে...তো সেইটা একটু বলা দরকার। এই সিরিজে এইটাই শেষ লেখা। যা ওয়ার্নিং দেওয়ার ছিল, দিয়ে দিয়েছি।

আরএসএসের কাছে ইতিহাস প্রমাণ বা যুক্তিনির্ভর বিষয় নয়। কোনোদিনই ছিল না। ইতিহাস ওদের অস্ত্র, আর এটা শুধু আরএসএস বলে নয়, পৃথিবীর যে কোনও স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির ক্ষেত্রেই সত্যি। অরওয়েলের ১৯৮৪ যদি পড়ে থাকেন (না পড়ে থাকলে অবশ্যই পড়বেন) সেখানে দেখবেন একটা কথা রয়েছে - "Who controls the past controls the future. Who controls the present controls the past" - স্বৈরতন্ত্রের কনটেক্সটে এই কথাটার মানে বোঝা অত্যন্ত জরুরী। ইতিহাসকে ওয়েপনাইজ করা গেলে অতীতের সেই ওয়েপনাইজড ন্যারেটিভকে ব্যবহার করে আপনি ভবিষ্যতের ন্যারেটিভ নির্মাণ করতে পারবেন, আপনার চাহিদামাফিক। আর, অতীতকে বদলে লিখতে গেলে, আপনার হাতে বর্তমানে ক্ষমতা থাকা চাই। আর ঠিক এইটাই এখন অফিশিয়ালি হচ্ছে। প্রায় একশো বছর ধরে যার পরিকল্পনা ছকা হয়েছে আরএসএসের দপ্তরে। আমরা যখন ফুটনোট আর ইতিহাসের বিভিন্ন পিরিয়ড ভাগ করা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম,  সেই সময়ে সঙ্ঘ ইতিহাস তৈরী করার একটা প্যারালাল কাঠামো বানিয়ে ফেলেছিল - সরস্বতী শিশু মন্দির, বিদ্যাভারতী, আরএসএসের শাখা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মন্দিরের চৌহদ্দি পেরিয়ে এসে সেই কাঠামো এখন গিলে ফেলেছে আমার আপনার স্মার্টফোনকেও। উদ্দেশ্য - অতীতকে বোঝা নয়, বরং একটা "হিন্দু কমন সেন্স" তৈরী করা যেটা একশো কোটি হিন্দুর মাথায় এমনভাবে গেঁথে যাবে যাতে কোনও যুক্তি, দলিল, নথি বা প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণও তাকে নড়াতে পারবে না। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যাপার হল, এই টেকনিকটা দিব্যি কাজ করছে। প্রমাণ পাওয়া যায় সমাজমাধ্যম আর হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ছড়িয়ে থাকা জঞ্জালের মধ্যে...যেগুলোকে ইতিমধ্যেই "ইতিহাস" বলে নর্মালাইজ করা হয়ে গেছে।

বছরকয়েক আগে, এরকমই একটা অভিজ্ঞতার কথা লিখেছিলাম – পরিচিত একজন, বাস্তবে উচ্চশিক্ষিত, যথেষ্ট সিন্সিয়ার গবেষক - অথচ সাই দীপকের ইউটিউব ভিডিও "হিস্টরি, আইডেন্টিটি, ইন্ডিয়া" আর সঞ্জীব সান্যালের ইউটিউব ভিডিও "হাউ মাচ অফ ইন্ডিয়ান হিস্টরি ইজ রিয়েলি ট্রু" দেখেই সে মেনে নিয়েছে ভারতের ইতিহাস আমরা যা জানি, যা বলি, সব মিথ্যে, এই দুজনই নাকি আসল "ঐতিহাসিক"। সাই দীপক পরিচিত আরএসএস অ্যাক্টিভিস্ট, সুপ্রীম কোর্টের উকিল, যিনি শবরীমালায় মেয়েদের ঢুকতে দেওয়ার বিরুদ্ধে মামলা লড়েন। সঞ্জীব সান্যাল অর্থনীতিবিদ, ভারত সরকারের কী একটা উপদেষ্টা, তাঁর একমাত্র ক্রেডিবিলিটি এইটুকুই যে তিনি শচীন্দ্রনাথ সান্যালের বংশধর, আর শচীন্দ্রনাথ সান্যাল বিপ্লবী ছিলেন, আন্দামানে বন্দীও ছিলেন। একজন গবেষকের যে মানসিকতায় সে স্টেট অফ দি আর্টের পেপার খুঁজে পড়ে, ইতিহাসে ক্ষেত্রে কিন্তু সে সেই প্রশ্ন করার মানসিকতা ব্যবহার করেনি। রিসার্চের ভাষায় বলতে গেলে, ডীপ লার্নিং নিয়ে গুগলের ডীপ মাইন্ড বা স্ট্যানফোর্ড থেকে NeurIPS বা IJCAI-এ বের হওয়া পেপার ছেড়ে অ্যামিটি আর লাভলি প্রফেশনাল ইউনিভার্সিটির সন্দেহজনক প্রিডেটরি জার্নালে পাব্লিশ করা পেপারের ওপর ভরসা করেছে। কারণ এদের দাবীগুলোর সাথে নিজের সাবকনশাসে থাকা ধ্যানধারণা মিলে গেছে। নিজের অপূর্ণ কিছু ইচ্ছে বা না পাওয়ার হতাশার জন্যে কাউকে দায়ী করার জন্যে লোক খুঁজে পেয়ে গেছে। নিজেকে ভিক্টিম হিসেবে ভাবছে আর সেইটাই দেখানোর চেষ্টা করছে। এইটাই সঙ্ঘের ইতিহাস নিয়ে পরিকল্পনার সাফল্য।

এই ইতিহাস তৈরীর কিছু নমুনা দিলেই বুঝতে পারবেন কী বলতে চাইছি; সোশ্যাল মিডিয়া, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঠিক কী কী ঘোরে ইতিহাসের নামে...স্কুল ও কলেজ শিক্ষকদের, এবং তাঁদের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীদের ঠিক কী শেখানো হয়, তারও...

সরকারের পয়সায়, দিল্লী ইউনিভার্সিটিতে কলেজ শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন কোর্সে, আরএসএসের "মার্গদর্শক" লজ্জা রাম তোমর গম্ভীরভাবে আউড়ে গেলেন [১] - আলোর গতিবেগ নির্ণয় করা হয়েছিল ঋগ্বেদেই; ব্রিটিশরা নাগপুর দখল করার পর টানা ছ'মাস ধরে সেখানে নদীগুলোতে জলের সঙ্গে বয়ে গেছিল গলা সোনা; প্যারিসে তৈরী হয়েছে মনু-র মূর্তি এবং তার নীচে ফলকে লেখা রয়েছে "বিশ্বের প্রথম আইনপ্রণেতা"; শুধুমাত্র পবিত্র অশ্বত্থ গাছ আর তুলসীগাছই অক্সিজেন উৎপন্ন করে; নাসার বিজ্ঞানীরা সূর্যের মুখ থেকে "ওম" শব্দ শুনতে পেয়েছেন।

সার্কাস নয়, স্ট্যান্ড আপ কমেডিও নয়। একদম সরকারি পয়সায় আয়োজিত রাষ্ট্রপোষিত অ্যাকাডেমিক ইভেন্ট। এক্সপেকটেশন হল হবু কলেজ শিক্ষকরা এইগুলোকেই ইতিহাসের শিক্ষা বলে আত্মস্থ করে নেবেন। বিশ্ব বিজ্ঞান সম্মেলনে গণেশের মাথাকে আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারির নমুনা হিসেবে দেখানো এই কর্মকান্ডেরই ফসল।

১৯৭৩ সালে আরএসএস-এর তৈরী অখিল ভারতীয় ইতিহাস সংকলন যোজনা (ABISY) নামের এক বিশেষ ঐতিহাসিক গবেষণা শাখার পত্রিকা "ইতিহাস দর্পণ" নিজেকে ফুটনোট, রেফারেন্স আর চকচকে ম্যাপওয়ালা সিরিয়াস স্কলারলি জার্নাল হিসেবে দেখায়। কিন্তু এর যে কোনও একটা সংখ্যা খুললেই আপনি ঢুকে যাবেন পুরাণ ও কল্পনার জগতে। প্রথম পাতায় হেডগেওয়ার আর গোলওয়ালকরের ছবি। পাশে গণেশের লোগো। প্রবন্ধগুলো প্রায় সবই এমন লোকজনের লেখা যাদের সঙ্গে কোনও বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনও যোগাযোগ নেই। এবং সম্পূর্ণ র‍্যান্ডম দাবিদাওয়া ভর্তি সব লেখা। ইংরিজীতে লেখা প্রবন্ধে নানান অ্যাকাডেমিক প্রচেষ্টা দেখানোর চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সবই ফাঁকা বুলি। যেমন, ২০১৬ সালের এপ্রিলে, কোনও এক মহাবীর প্রসাদ জৈনের প্রবন্ধ, A Brief Survey of the Politics of Indian Historiography-তে রেফারেন্স হিসেবে লেখা রয়েছে - "a large number of articles available on various websites" - সমস্যা হল, এই সাইটেশনের কোনও মূল্যই নেই ইতিহাসের চর্চায় [২]। আরও অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে ইতিহাস দর্পণের প্রতিটি সংখ্যায়। যেমন, জনৈক অরুণ কুমার লেখেন যে আধুনিক বিজ্ঞানের উৎস বেদ। রেফারেন্স? নেই [৩]। যেমন, জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে মনুস্মৃতি প্রতিনিয়ত বাস্তবের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া উপকারী "সামাজিক বিধান"; কিন্তু সজ্ঞানে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে যে সেই মনুস্মৃতিই বেদপাঠ শুনে ফেলা শূদ্রের মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়, বা মেয়েদের চিরদাসীত্বের বিধান দেয় [৪]।

ইতিহাস নয়। কালাজ্বরের মত "গেরুয়াজ্বর"-এর ঘোরে দেখা স্বপ্ন।

সবচেয়ে বীভৎস বিকৃতিগুলো বরাদ্দ রাখা হয়েছে মুসলমানদের জন্যই। সাভারকার - সঙ্ঘের আদর্শের উৎস - লিখেছিলেন যে, মুসলমান আক্রমণকারীদের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার চেয়ে উগ্র এবং পৈশাচিক ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষাই বেশি ছিলঃ   "a fierce religious ambition many times more diabolic than their political one" - যদিও, ইতিহাসে এমন কোনও প্রমাণ নেই যা দিয়ে বলা যায় যে মধ্যযুগে আক্রমণকারী মুসলমানদের মধ্যে শুধুই ধর্মীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষাই উপস্থিত ছিল, রাজ্য বা এলাকা দখল এবং তার ফলে রাজস্ব বাড়ানোর কোনও আকাঙ্ক্ষা ছিল না। "সিক্স গ্লোরিয়াস ইপক্‌স" বইয়ে সাভারকর খোলাখুলিভাবে মুসলমানদের মোকাবিলায় তাদের মেয়েদের অপহরণ ও ধর্ষণের নিদানও দিয়ে রেখেছেন; সাভারকরের কথা অনুযায়ী শিবাজির উচিত ছিল শিভালরি না দেখিয়ে ঠিক এই কাজটিই করা। না, এগুলো কোনও অখ্যাত বইয়ের ফুটনোট নয়; সাভারকর - যাঁকে আরএসএস "বীর সাভারকর" বলে অভিহিত করে, যাঁর মূর্তি বিভিন্ন স্কুলে শোভা পায়, যাঁর নামে সেলুলার জেলের নতুন নামকরণ করা হয় (সে তিনি খান পাঁচেকবার ব্রিটিশদের উদ্দেশ্যে মুচলেকা লিখে থাকলেও), যাঁর আদর্শ আরএসএসের শাখায় শেখানো হয় - এই কথাগুলো সেই সাভারকরের নিজের লেখা। আরএসএস আজ অবধি এই কথাগুলোর একটাকেও রিফিউট করেনি।

আরএসএসের এই ইতিহাসকে নতুন করে লেখার প্রসেসটা খুবই সরল। আগে সমস্ত জটিলতা মুছে ফেলো, সূক্ষ্ম ফারাকগুলোকে এড়িয়ে যাও, আর সমস্ত অ্যানালিসিসকে বদলে দাও বিদ্বেষের মুখস্থ বুলি দিয়ে। বিদ্যাভারতীর স্কুলে বাচ্চারা ইতিহাস শেখে না; বরং ক্যুইজের ধাঁচের কিছু উত্তর মুখস্থ করে, যাকে ভারতীয় ঐতিহ্য হিসেবে চালানো হয়। যেমন, "কোন স্বৈরাচারী শাসক গুরু গোবিন্দ সিংহের দুই ছেলেকে জীবন্ত কবর দিয়েছিলেন"? উত্তর হল, "ঔরঙ্গজেব"। এখানে মুঘল রাজনীতির প্রেক্ষাপট নেই, শিখ আর মুঘলদের সংঘাতের আলোচনা নেই, এবং বইয়ে এও লেখা নেই যে সেই নরপিশাচ ঔরঙ্গজেবই তাঁর আগের যে কোনও শাসকের তুলনায় অনেক বেশি হিন্দুকে নিজের প্রশাসনের উঁচু পর্যায়ে নিয়োগ করেছিলেন। ইতিহাস যে শুধুমাত্র সাদায় কালোয় কিছু ঘটনা নয়, বাইনারি সিস্টেম নয়, তার মধ্যে অনেক জটিলতা, অনেক নুয়ান্স লুকিয়ে থাকে, সেসব ভুলে গিয়ে আর ভুলিয়ে দিয়ে স্কুলের বাচ্চাদের মাথায় গেঁথে দেওয়া হয় যে ঔরঙ্গজেব আসলে এক ভিলেন, প্রায় দানব, যাতে সেই নামটা শুনলেই বাচ্চাদের মনে কিছু জানার ইচ্ছের বদলে শুধুমাত্র একটা তীব্র ঘৃণা তৈরী হয়। বিদ্বেষের চাষ হয় এইভাবেই - একটার পর একটা বিচ্ছিন্ন কনটেক্সটবিহীন উড়ো তথ্যের মাধ্যমে।

ভারতকে সেই প্রাচীন স্বর্ণযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে আরএসএস ঐতিহাসিক টাইমলাইনকে পিছিয়ে দেয়। আসলে যাঁরা আর্কিওলজিস্ট, তাঁদের পরিচিত কোনও পদ্ধতি ছাড়াই আরএসএস "প্রমাণ" করে দেয় যে হারিয়ে যাওয়া সরস্বতী নদী বাস্তবে সত্যিই ছিল, আর তাই বেদও ঐতিহাসিকভাবে একবারে সঠিক। বাস্তবে, বিভিন্ন আধুনিক উপায়ে (স্যাটেলাইট ইমেজিং ইত্যাদি) ঘগ্‌গর-হাকরা নামের এক বহুপ্রাচীন নদীখাতের সন্ধান পাওয়া গেছে - কিন্তু ঐতিহাসিক এবং আর্কিওলজিস্টদের মধ্যে এখনও বিতর্ক রয়েছে যে সেই নদীখাতই বেদবর্ণিত সরস্বতী কিনা। ব্রিটিশ ওরিয়েন্টালিস্টদের আনা Aryan Invasion Theory ষাটের দশক থেকেই বদলে গেছে  Aryan Migration Theory-তে, এবং এটা হয়েছে নতুন করে খুঁজে পাওয়া ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতেই। এবং খুব রিসেন্টলিই, আধুনিক পদ্ধতিতে প্রাচীন মানুষের শরীরের ডিএনএ অ্যানালিসিস প্রমাণ করেছে যে এই ডিএনএ নির্ভর অ্যানালিসিসের দেওয়া মাইগ্রেশনের সময়কাল আর আগেকার ভাষাভিত্তিক অ্যানালিসিসের ভিত্তিতে দেওয়া মাইগ্রেশনের সময়কাল প্রায় মিলে যায়, এবং সেদিক থেকে দেখলে মাইগ্রেশন (স্পেসিফিকালি, একাধিক মাইগ্রেশনের ওয়েভ) থিওরিই সঠিক [৫,৬,৭]। আরএসএস পোষিত ঐতিহাসিক এবং আর্কিওলজিস্টরা ঠিক এর উল্টোটাই প্রমাণ করতে চান - যে আর্য্যদের উৎপত্তি ভারতে, এবং ভারত থেকেই এই জনগোষ্ঠী সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছিল, এবং এর জন্যে বৈজ্ঞানিক দলিলের ভুল ইন্টারপ্রিটেশন দিতেও এঁদের আটকায় না। 

আরএসএস মহাভারত, শঙ্করাচার্য্য, এমনকী বুদ্ধের সময়কালকেও এমন একটা অসম্ভব অতীতে ঠেলে দিয়েছে যেটা যে কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের সময়েরও অনেক আগের। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের বদলে এরা আনতে চায় "কলিযুগাব্দ" বা কলিযুগ-ভিত্তিক ক্যালেন্ডার - পুরাণের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এক কাল্পনিক ক্যালেন্ডার। ভারতের ইতিহাস নিয়ে আরএসএসের যে বহুখন্ডের বইয়ের কাজ চলছে, সেখানে পুরাণে বর্ণিত বংশতালিকাকেই প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ধরে নিয়েছে। মুছে দিয়েছে পৌরাণিক উপকথা আর আসল ইতিহাসের মধ্যের সীমারেখা। এমনভাবে, সজ্ঞানে, যাতে এই ইতিহাস যারা পড়বে তাদের কাছে উপকথা আর ইতিহাসের তফাত থাকবে না, মধ্যযুগের যে কোনও অহিন্দু তার কাছে হয়ে উঠবে পৌরাণিক কাহিনীর দানব, রাম-রাবণের যুদ্ধকে সে দেখবে মধ্যযুগের কোনও সুলতানের আক্রমণ হিসেবে।

বৌদ্ধধর্মও ছাড় পায়নি সঙ্ঘের সর্বগ্রাসী ঘৃণার হাত থেকে। সাভারকরের বয়ানে, বৌদ্ধরা কোনও মহৎ ঐতিহ্যের ধারক নয়, বরং তারা ছিল হিন্দু ধর্মের মধ্যে এক "পঞ্চম বাহিনী" - হিন্দু জাতিকে দুর্বল এবং নপুংসক করে দেওয়ার দায় তাদেরই। সম্রাট অশোকের ধর্মান্তর সাভারকরের ভাষায় হিন্দুদের জন্যে মহাবিপর্যয়; বরং বৌদ্ধদের ওপর চরম অত্যাচার চালানো পুষ্যমিত্র শুঙ্গ সাভারকরের প্রশংসার পাত্র, কারণ সেই অত্যাচার সাভারকরের মতে ছিল "গুরুতর রাষ্ট্রদ্রোহের উপযুক্ত শাস্তি"। আর এই চলমান ঘৃণার নিদর্শন পাওয়া যায় আধুনিক যুগেও, ২০১৭ সালে বিজেপির তৎকালীন মন্ত্রী অনন্তকুমার হেগড়ের টুইটেঃ "If not for Buddhism, we would have had an Akhand Bharat" [৮]। সঙ্ঘের ডিকশনারিতে শান্তি মানে দুর্বলতা, করুণা মানে রাষ্ট্রদ্রোহ। একমাত্র মনে রাখার মত ইতিহাস হল যুদ্ধের ইতিহাস, যেখানে হিন্দুরাজার যুদ্ধে জেতার কথা রয়েছে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হল আরএসএস শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকেই থেমে নেই। ক্রমশঃ ইতিহাসের গবেষণার একদম সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানেও ঢুকে গেছে এই ভয়ানক ভাইরাস। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ হিস্টোরিকাল রিসার্চকে ভরিয়ে ফেলা হয়েছে আরএসএসের কর্মকর্তাদের দিয়ে। ২০১৪ সালেই চেয়ারপার্সন করা হয় ABISY প্রধান সুদর্শন রাওকে, তারপর থেকে আরএসএস ঘনিষ্ঠদেরই বসানো হয়েছে এই পদে। এখন সরকারি এজেন্ডা হল ইতিহাসের "ভারতীয়করণ" - ইতিহাসে শুধু থাকবে হিন্দু অতীতকে মহিমান্বিত করা ঘটনাসমূহ, বাকি সব মুছে ফেলা হবে। দরকারে, আবিষ্কৃত হবে নতুন নতুন "হিন্দু শেকড়"। দিল্লী থেকে দূরে, হিমাচল বা উত্তরাখণ্ডের আদিবাসী এলাকার গ্রামে,  ABISY-এর লোকজন স্থানীয় লোককথা খুঁজে বের করে সেগুলোকে কো-অপ্ট করে হিন্দুত্বের মধ্যে। হিমাচল প্রদেশের কুলু-তে, আরএসএস সমর্থক এবং এককালের রাজাসাহেব দেবেন্দ্র সিং আদিবাসীদের উপকথা লিপিবদ্ধ করেন। ABISY সেই সমস্ত "ঐশ্বরিক গল্পগুলোকে" ব্রাহ্মণ্যবাদের ধারাবাহিকতার প্রমাণ হিসেবে হাজির করে, যেমন গণেশ পুরাণের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া হয় আঠারোটা সাপ নিয়ে এক আদিবাসী কাহিনীকে। যেমন, উত্তরাখণ্ডের আঞ্চলিক দেবী নন্দাকে কো-অপ্ট করে দেখানো হয়েছে দুর্গার রূপ হিসেবে। হিন্দুত্বের নামে ক্রমশঃ একের পর এক লৌকিক দেবদেবীকে কো-অপ্ট করে তাদের ভক্তদের হিন্দুত্বের ছাতার তলায় আনার জন্যে। উদ্দেশ্য সেই একই - হিন্দুধর্মের বিভিন্ন ডাইভার্স সুতোকে মুছে দিয়ে সবাইকে এক মনোলিথিক ব্রাহ্মণ্যবাদী ধর্মের নীচে এনে ফেলা...

ইন্টেলেকচুয়াল কলোনিয়ালিজম বলতে পারি একে? আদিবাসী কনশাসনেস মুছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে?

এবারে একটু গালি দেবো আমাদের শিক্ষিত সেকুলার ঐতিহাসিকদেরও। তাঁরা কী করেছেন? অ্যাকাডেমিক ইংরিজীতে লেখা উজ্জ্বল, সূক্ষ্ম এবং তথ্য-প্রমাণভিত্তিক পাণ্ডিত্যপূর্ণ গবেষণাকর্ম উপহার দিয়েছেন। জার্নালে ছাপা হয়েছে, বই হিসেবে বেরিয়েছে। কিন্তু পড়েছে বা বুঝেছে খুব ছোট একটা এলিট গোষ্ঠী। উল্টোদিকে, আরএসএস তার বই থেকে শুরু করে গানের ক্যাসেট - যা কিছু বের করেছে, সবই হিন্দিতে বা স্থানীয় ভাষায়। সেই বই, প্যামফ্লেট, ক্যাসেট ছড়িয়ে গেছে শাখায়, মন্দিরে, স্কুলে। আর, প্রায় হাজার পঞ্চাশেক স্কুলে পড়তে থাকা চল্লিশ লক্ষের কাছাকাছি বাচ্চার বাড়িতে। সেকুলার অ্যাকাডেমিকরা যখন ইতিহাসের পিরিয়ডাইজেশন নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন, আরএসএস এমন একটা ন্যারেটিভ বানিয়েছে যেটা পাঁচ বছরের বাচ্চাও বুঝতে পারে, বা একজন আশি বছরের বুড়ী ঠাকুমাও অবলীলায় মন থেকে বলে যেতে পারেন। সেই পলিটিকাল রাইট-লেফট আর সোশ্যাল রাইটের গল্প, যেটা দিন কয়েক আগে লিখেছিলাম...আমাদেরই অবহেলার ফসল আমরা ঘরে তুলেছি।

তবে এটাও ঠিক, যে সঙ্ঘের এই সমস্ত গালগল্পকে যুক্তি আর তথ্য দিয়ে কাউন্টার করতে গেলেই সঙ্ঘের ইতিহাসবিদরা এক বাক্যে কলোনিয়াল চক্রান্ত, ডীপস্টেট, জর্জ সোরোস ইত্যাদি আউড়ে সব গুলিয়ে একটা ভজকট ব্যাপার সৃষ্টি করে কেটে পড়েন। সেই যার কথা শুরুতে বলছিলাম, সে র‍্যাপিড ফায়ারের মত আমাকে একগুচ্ছ প্রশ্ন করেছিল:

"আমাদের ইতিহাস কেন শুধু হেরে যাওয়ার ইতিহাস? রেজিস্টেন্সের ইতিহাস কই? গজনীর মামুদের শেষ আক্রমণের পর ফের আক্রমণ করতে কেন ১২০ বছর লাগলো? সুহেলদেবের কথা ইতিহাসে লেখে না কেন? উত্তরপূর্ব ভারতের রাজাদের কথা কেন লেখে না? ব্রিটিশ ঐতিহাসিকদের কেন বিশ্বাস করবো যখন তারা আসার আগেও ভারত বলে একটা বিরাট ব্যাপার ছিলো? স্ক্রিপচার আর শিলালিপিকে কেন প্রমাণ হিসেবে ধরা হবে না? ভারতের সবচেয়ে বড় ইতিহাসের দলিল - নালন্দাকে যদি ইচ্ছে করে ধ্বংস করা হয়ে থাকে, তাহলে অন্য দলিল কেন মেনে নেবো? অন্য দেশ, যেমন চীন বা আমেরিকা তাদের অতীতকে গ্লোরিফাই করে। আমরা কেন করবো না? বিদেশীদের বলা ইতিহাস কেন মানবো?"

এসবের এক কথায় উত্তর হয় না, আর সিউডো-ইতিহাসের লক্ষ্যই এইগুলো ছড়ানো। যেমন ধরুন, সুহেলদেব - একটা লেজেন্ড ছাড়া যার সম্পর্কে কোনো ঐতিহাসিক দলিল নেই [৯]। পৃথ্বীরাজ চৌহান সিনেমাটা নিয়েও যে বিতর্কটা হয়েছে তাও মোটামুটি এই লাইনেই - যে পৃথ্বীরাজ রসো কোনো প্রামাণ্য ঐতিহাসিক দলিল নয়। আর এই তথাকথিত ঐতিহাসিকরা, মানে সাই দীপক, বিক্রম সম্পত বা সঞ্জীব সান্যাল - এদের স্টাইলটাই হল বিনা রেফারেন্সে কিছু দাবীদাওয়া বাজারে ছেড়ে অ্যাকাডেমিক হিস্টোরিয়ানদের কোনোভাবে ডিসক্রেডিট করা - যে আদতে ভারতের গৌরবময় ইতিহাসকে বামপন্থী, কমিউনিস্ট আর নেহরুভিয়ান ঐতিহাসিকরা চেপে দিয়েছে। হিট অ্যান্ড হাইড স্টাইল বলে একে, অ্যালিগেশন ছুঁড়ে পালিয়ে যাওয়া [১০]।

পরের বার, সঙ্ঘের কেউ যখন "আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত" নিয়ে ভাষণ দেবেন, পারলে একবার জিজ্ঞেস করবেন তো - কার অতীত? সঙ্ঘের ইতিহাসে প্রত্যেকটা মুসলমান তো আক্রমণকারী শয়তান। মুসলমান জোলা বা তাঁতির কথা আছে তাদের ইতিহাসে? যে তাঁতিরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভারতের বস্ত্রশিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন? তাদের ইতিহাসে কি সেই দলিত কবির ঠাঁই হয়েছে, যিনি পেতের খিদে আর জাতের নামে বজ্জাতির কথা লিখে গেছেন তাঁর কবিতায়? মেয়েদের শিক্ষার লড়াই, অধিকারের লড়াইয়ের কথা আছে তাদের ইতিহাসে? সাবিত্রীবাঈ ফুলে বা রোকেয়া বেগম জায়গা পান সঙ্ঘের ইতিহাসে? না, বরং সঙ্ঘের ইতিহাস একটা ফ্ল্যাট বোরিং গেরুয়া মরুভূমি, যার ওপারে রয়েছে একটা কাল্পনিক সোনালী যুগ। আমরা আমাদের ছেলেমেয়েদের মাথা ভরিয়ে দিচ্ছি সেই ইউজলেস বালি দিয়ে, একটার পর একটা ভিত্তিহীন আজগুবি দাবীর খপ্পরে পড়ে। এর বিকল্প বহুত্ববাদী তথ্যনির্ভর এবং সহজবোধ্য ইতিহাস না লেখা হলে, এখনই না লেখা হলে, অন্তত শুরুটুকুও না হলে, শেষ অবধি ওই ফ্ল্যাট বোরিং মরুভূমিই পড়ে থাকবে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে...

শুরু করেছিলাম অরওয়েলের একটা কথা দিয়ে। শেষও করব অরওয়েলেরই আরেকটা কথা দিয়ে, ১৯৮৪ থেকেই - 

"The past was erased, the erasure was forgotten, the lie became truth."

সূত্রঃ 

[১] India: RSS Schools and the Hindu Nationalist Education Project by Akshay Bakaya, 21 April 2009, https://www.sacw.net/article852.html
[২] Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
[৩] Param Shiv ka Shrishti: Vigyan Aur Ved, Itihas Darpan, October 2013
[৪] Itihas Darpan, October 2016
[৫] Who We Are and How We Got Here: Ancient DNA and the New Science of Human Past, David Reich, Pantheon, USA
[৬] EARLY INDIANS : The Story of Our Ancestors and Where We Came From, Tony Joseph,  Juggernaut, India
[৭] The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, David W. Anthony, Princeton University Press, USA
[৮] Newly sworn Minister Anantkumar Hegde’s Twitter account gives a peek into his mindset, Pratik Sinha, https://www.altnews.in/newly-sworn-minister-anantkumar-hegdes-twitter-account-gives-peek-mindset/
[৯] How Amit Shah and the BJP have twisted the story of Salar Masud and Raja Suheldev, Ajaz Ashraf, 2017, https://scroll.in/article/841590/how-amit-shah-and-the-bjp-have-twisted-the-story-of-salar-masud-and-raja-suheldev
[১০] The Risks of Looking at India’s History Through the Eyes of Pseudo-Historians, Rohan D'Souza, 2021, https://m.thewire.in/article/history/india-history-pseudo-historians-risks

হিন্দুধর্ম ভার্সেস হিন্দুত্ব

শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন হিন্দুত্বের জয়। আপনারাও সোল্লাসে চিৎকার করেছেন। বেশ ভালো কথা। একটা ছোট্ট প্রশ্ন। হিন্দুত্ব ব্যাপারটা বুঝে করেছেন তো? সেটা করে থাকলে একদিক থেকে ভালো, আমার কাজ কমে গেল। আর যদি হিন্দুত্বকে হিন্দুধর্মের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে থাকেন, তবে এই লেখাটা আপনার জন্যে। আগেও বলেছি আমরা বহুবার। মিটিঙে, সোশ্যাল মিডিয়ায়। আপনি এড়িয়ে গেছেন। আর এড়ানোর স্কোপ নেই। আপনি চান বা না চান, এই হিন্দুত্ব আপনার ঘাড়ে চেপেই গেছে।

একটা জিনিস সবার আগে মাথায় বসিয়ে নিন। দরকার হলে হাতুড়ি পিটিয়ে।

হিন্দুত্ব আর হিন্দুধর্ম এক নয়।

এই কথাটা সবার প্রথমেই আসে। হিন্দুধর্ম একটা প্রাচীন এবং বহুত্ত্ববাদী বিশ্বাস, একটা বড় নদীর মত যেখানে বহু ধারা এসে মিশে যায়। নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী থেকে নীল চামড়ার রাখালকে পুজো করা লোক; শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, অদ্বৈতবাদী, নিরীশ্বরবাদী, ভক্তিবাদী, মিস্টিক সাধক। আবার, এই একই ধর্মে অসংখ্য মানুষকে অচ্ছুৎ করে রাখা হয় জাতপাতের নামে। আক্ষরিকার্থেই একটা কমপ্লেক্স স্ট্রাকচার।

উল্টোদিকে, হিন্দুত্ব তৈরী হয়েছে আধুনিক যুগে, ১৯২৩ সালে, সাভারকরের হাতে। সাভারকরের নিজের লেখাতেই রয়েছে — "Hindutva is different from Hinduism" — প্রার্থনা বা দর্শন নয়, হিন্দুত্বের জন্ম ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে। কল্পিত, এক ছাঁচে তৈরী, মনোলিথিক, উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্য সকলকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। বিশ্বাসের মন্দির নয়, ঘৃণার সুতো দিয়ে সেলাই করা গেরুয়া পতাকা।

ফারাকটা স্পষ্ট দেখতে চাইলে ফিরে তাকান কাদের বাদ রাখা হল সেইদিকে। হিন্দুধর্ম কখনো বলেনি যে আপনার জন্মভূমিকে "পুণ্যভূমি" বা দেবতা হিসেবে পুজো করতে হবে। সাভারকরের হিন্দুত্ব, শুভেন্দুর বলা হিন্দুত্বের ডেফিনেশন কিন্তু সেটাই — ভারত যাদের জন্মভূমি, কর্মভূমি এবং পুণ্যভূমি, তারাই একমাত্র হিন্দু। এবং তারাই এই দেশের আসল নাগরিক, বাকি সবাইকে তাদের প্রভূত্ব মেনেই, তাদের আজ্ঞাবহ দাসানুদাস হয়ে থাকতে হবে। মুসলমান, ক্রিশ্চান — যাদের ভগবান এ দেশীয় নয়, তারা এ দেশে বাস করলেও হিন্দুদের সমান অধিকারের দাবী করতে পারে না, কারণ তারা আসল নাগরিক নয়।

প্রসঙ্গত:, ভারতের সংবিধান রচনার সময়ে যে জাস সোলি-র কথা বলা হয়েছিল — বর্ণ, ধর্ম, বাপমায়ের জন্মভূমি নির্বিশেষে ভারতীয় ভূখন্ডে যারা জন্মেছে, সকলেই ভারতীয় নাগরিক, সিটিজেন বাই বার্থ — সেই জাস সোলির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন  সর্দার প্যাটেল। হ্যাঁ, সেই বল্লভভাই প্যাটেল, যাঁকে লৌহমানব বলে বিজেপি পুজো করে, তিন হাজার কোটি টাকা দিয়ে মূর্তি তৈরী করে পুজো করে, তিনিই।

সাভারকরের হিন্দুত্ব এই জাস সোলি-কে মানেনি কোনওদিনও। এই হিন্দুত্ব বলেছে অহিন্দুদের নাগরিকত্ব কন্ডিশনাল। সঙ্ঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকরের নিজের ভাষায়, এই অহিন্দুরা "may stay in the country wholly subordinated to the Hindu nation, claiming nothing, deserving no privileges, not even citizen's rights", অর্থাৎ, এদের সকলকে হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে, কোনো দাবি করতে পারবে না, কোনো সুযোগ‑সুবিধা নয়, নাগরিক অধিকার তো দূরের ব্যপার।"

আরএসএস আজ অবধি এই তত্ত্বকে অস্বীকার করেনি। তাদের জাতিবিদ্বেষের ব্লুপ্রিন্ট এটাই।

আজ কয়েক দশক ধরে প্রমাণিত — আরএসএস আর তার শাখা সংগঠন — বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, দুর্গা বাহিনী — এদের হিন্দুত্বের বিপদটা জাস্ট থিওরি নয়। আমরা নিরন্তর দেখে আসছি; গরু পাচার, লাভ জিহাদ, বাড়িতে মাংস রাখার অভিযোগে মুসলমানদের পিটিয়ে মারার ঘটনা; মসজিদ ভাঙা; ঐতিহাসিক শহরের নাম বদলানো; স্কুলছাত্রদের শেখানো যে মধ্যযুগের ইতিহাসে মুসলমান শাসক মানেই দানব, আর নায়করা সকলেই হিন্দু; মেয়েদের শারীরিক শিক্ষা দেওয়ার নামে শেখানো যে তার আসল শত্রু বিধর্মী মুসলমান, গার্হস্থ্য হিংসা তো নর্মাল ঘটনা।

এসব আপনার মাথায় ঢুকে গেছে কিনা বুঝবেন কী করে? খুব সহজ। যেদিন দেখবেন আপনার নাদুসনুদুস গণেশ বা আলাভোলা শিবঠাকুরের বদলে মাস্কেলওয়ালা সিক্সপ্যাক ঠাকুর এসে গেছে, বা "ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি, রামলক্ষ্মণ বুকে আছে ভয়টা আমার কী" বলার বদলে আপনি "অ্যাংরি রাম" আর "অ্যাংরি হনুমান"-দের পছন্দ করছেন, কপালে হাত ঠেকিয়ে রামরাম বাবুজীর উত্তরে জয় সিয়ারাম আর জয় রামজীকি-এর বদলে গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে জয় শ্রীরাম বলছেন, দুর্গাপুজোর সময় নিরামিষ খাচ্ছেন নিয়ম করে, সকাল সন্ধ্যে ভাবছেন কী করে ওই মোল্লা আর নীচু জাতের ছোটলোকগুলোকে টাইট দেওয়া যায়, সেদিন বুঝবেন আপনি হিন্দু থেকে হিন্দুত্ববাদীতে উন্নীত হয়েছেন।

একে নিজের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে ভালোবাসা বলে কিনা সেটা আপনিই ঠিক করবেন। আপনার সহনাগরিককে বাবর কি আওলাদ বলে শয়তান হিসেবে দাগিয়ে দেবেন কিনা; রোহিত ভেমুলার মত দলিতদের প্রতিদিন সমাজে তাদের আসল জায়গা দেখিয়ে দেবেন কিনা; মেয়েদের কোন চোখে দেখবেন; আর গণতন্ত্রকে পাশ্চাত্য বিষ বলবেন কিনা।

হ্যাঁ, আপনি ভাবতেই পারেন যে এই সব তত্ত্বকথা মাথায় থাকুক, বিজেপি সব চোরদের জেলে ভরবে। এখানে একটাই ছোট পয়েন্ট — শুভেন্দুকে কে জেলে ভরবে সেটাও ভেবে দেখবেন।

আর হ্যাঁ, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে কী হয় তাই নিয়ে আমাকে বলতে আসার আগে নীচের কথাগুলো পড়ে বোঝার চেষ্টা করবেন।

"If a larger country oppresses a smaller country, I’ll stand with the smaller country. If the smaller country has majoritarian religion that oppresses minority religions, I’ll stand with minority religions. If the minority religion has caste and one caste oppresses another caste, I’ll stand with the caste being oppressed. In the oppressed caste, if an employer oppresses his employee, I’ll stand with the employee. If the employee goes home and oppresses his wife, I’ll stand with that woman. Overall, oppression is my enemy."

– Thanthai Periyar E. V. Ramasamy

Sunday, May 03, 2026

সঙ্ঘ পরিবারের নারীপ্রতিমার কিস্‌সা

কাল ভোটের ফল বেরোবে। কী হবে, আমরা কেউ জানি না, এগজিট পোল যাই বলুক না কেন। তবে যে কথাটা কালও বলেছিলাম — ফাইনাল লড়াইয়ের সময় এসে গেছে। সেখানে আপনাকে জানতে হবে আপনার শত্রু কে।

আরএসএসের মতাদর্শ নিয়ে কথা বলব, অথচ মেয়েদের সম্পর্কে মনুবাদী সঙ্ঘ পরিবারের ধ্যানধারণার কথা বলব না তা তো হয় না। বিশেষ করে রেপিস্টদের ফুল মালা দিয়ে বরণ করার পরে যখন বিজেপি অভয়ার বিচার নিয়ে গলা তোলে, তখন বাস্তবটা সামনে আনতেই হয়। তো তাই, হিন্দুত্ব ন্যারেটিভ বিল্ডিং সিরিজে এবারে রইলো —

সঙ্ঘ পরিবারের নারীপ্রতিমার কিস্‌সা

খুব বেশিদিন আগের ঘটনা নয়, কাজেই আপনাদের মনে থাকবে — ভারতের সেরা মহিলা কুস্তিগীরদের কথা, কেউ অলিম্পিকে পদকজয়ী, কেউ বা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন — তারা দিল্লীর রাজপথে ধর্ণায় বসেছিল বিচার চেয়ে। সকলেরই অভিযোগ ছিল ভারতের কুস্তি ফেডারেশনের কর্তা, বিজেপির বাহুবলী সাংসদ ব্রিজভূষণ শরণ সিং এর নামে। যৌন হেনস্থার অভিযোগ। দেশ উত্তাল হয়েছিল। কিন্তু মেয়েগুলো কী পেয়েছিল? তাদেরই ফেডারেশন তাদের দাগিয়ে দিয়েছিল মিথ্যেবাদী বলে। এক মন্ত্রী তাদের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছিল রাজনৈতিক যাত্রাপালা বলে। সঙ্ঘ পরিবারের ট্রোল বাহিনী আর পোষা মিডিয়া তাদের বিদেশী এজেন্ট, দেশদ্রোহী, পাকিস্তানের পুতুল ইত্যাদি কিছুই বলতে বাকি রাখেনি। এক কুস্তিগীরকে বলা হয়েছিল "খারাপ মা"। আরেকজনকে বলা হয়েছিল যে সে নাকি পৃথিবীর সামনে দেশের নাম ধুলোয় মিশিয়ে দিচ্ছে। এই মেয়েগুলোর জিতে আনা মেডেল, তাদের চোখের জল, তাদের পরিশ্রম আর সাহস — কিছুরই দাম দেয়নি  তাদেরই দেশের একটা বড় অংশের মানুষ। কারণ, এই মানুষগুলোর কাছে, এদের হিন্দুত্বের আদর্শের সামনে, যে মেয়েটা তার অধিকারের কথা বলে গলা তুলে, সে ভিক্টিম নয়। সে একটা জলজ্যান্ত সমস্যা, যাকে চুপ করানো দরকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা মেয়েকে অধিকারের কথা বলতে দেখলে, কনসেন্টের কথা বলতে দেখলে, এমনকি চুলে রঙ বা হাতে ট্যাটু করা ছবি পোস্ট করতে দেখলেও এই একই লোকগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে - মেয়েটাকে চুপ করাতে। তার চেহারা, গায়ের রঙ, চুলের স্টাইল, পোশাক, তার পরিবার, ব্যাকগ্রাউন্ড — কিছুই বাদ যায় না এদের কুৎসিত আক্রমণ থেকে...সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অভিজ্ঞতা কমবেশী প্রায় প্রতিটা মেয়েরই আছে।

একে শুধুমাত্র মিসোজিনি বলা ভুল হবে। কারণ, এর কোনো কিছুই র‍্যান্ডম নয়। পুরোটাই একটা সিস্টেমের অংশ। যে সিস্টেমের ম্যানুয়াল লেখা হয়েছে অনেক বছর আগে। যে সিস্টেম শেখায় মনুবাদী পিতৃতন্ত্র আর বর্ণব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে কথা বলবে, তাকে চুপ করাতে হবে।

কাজেই, সেই সঙ্ঘ পরিবার যখন নারী সুরক্ষার কথা বলে, উন্নাও-হাথরস-কাঠুয়া-মণিপুর-বিলকিস বানুর ধর্ষকদের মুখে অভয়ার বিচারে দাবী শুনে যখন আপনি বিশ্বাসও করে ফেলেন, তখন এই সিস্টেমের শেকড়ের দিকে একবার ফিরে তাকানো জরুরী হয়ে ওঠে। "হিন্দুত্ব ন্যারেটিভ" তৈরীর ইতিহাসের এই দিকটায় আজকে তাকাবো একবার। 

এই লেখাটা মূলত: তনিকা সরকারের লেখা "Hindu Nationalism in India" বইটার তৃতীয় চ্যাপ্টার "Pragmatics of the Hindu Right: The Politics of Women’s Organisations" আর ঊর্বশী বুতালিয়া এবং তনিকা সরকার সম্পাদিত "Women and the Hindu Right" নামের প্রবন্ধ কালেকশনের বিভিন্ন রচনার ওপর ভিত্তি করে তৈরী।

আদর্শগত শেকড়: সাভারকর ও ধর্ষণের লেজিটিমাইজেশন
======================================

হিন্দুত্বের এই দর্শনের ভিত খুঁজে পাওয়া যায় সাভারকরের লেখায়। পুরুষোত্তম আগরওয়াল লিখছেন যে "দ্য সিক্স গ্লোরিয়াস ইপকস অফ ইন্ডিয়ান হিস্টরি" বইয়ে সাভারকর শিবাজীর কড়া সমালোচনা করেছিলেন এই বলে যে "he had a perverse notion of virtue in respecting the chastity of even the Muslim women", এবং সাভারকরের মত অনুযায়ী শিবাজীর উচিত ছিল বন্দিনী মুসলমান মহিলাদের ধর্ষণ করে হাজার বছরের মুসলমানী অত্যাচারের প্রতিশোধ নেওয়া: "The souls of those millions of aggrieved [Hindu] women," Savarkar imagined, would have pleaded with Shivaji: "Do not forget the unutterable atrocities and outrage committed on us... Let the future Muslim conquerors never dare to think of such molestation of Hindu women." 

সাভারকর এই প্রসঙ্গ শেষ করছেন এই বলে যে মেয়েদের প্রতি হিন্দুদের আত্মঘাতী "শৌর্য্যবীর্য্যের ধারণা"-ই মুসলমান মেয়েদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল। নইলে, সাভারকরের মতে ধর্ষণ অপরাধ নয়, বরং মুসলমানদের বিরুদ্ধে হাজার বছরব্যাপী যুদ্ধে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক অস্ত্র।

[ইনসিডেন্টালি, এই আইডিয়াটা যে শুধু হিন্দুত্বের একচেটিয়া, এমনটা নয়। সংখ্যাগুরু তার ক্ষমতার আস্ফালনের জন্যে মেয়েদের শরীরকেই বেছে নিয়েছে এমন নিদর্শন ইতিহাসে অগুণতি। সে ধর্মের জন্যেই হোক বা জাতিগত হিংসার কারণেই হোক। পার্টিশনের ওরাল হিস্টরি যদি পড়েন — ঊর্বশী বুতালিয়ার "দি আদার সাইড অফ সাইলেন্স" বা রীতু মেনন এবং কমলা ভাসিনের "বর্ডারস অ্যান্ড বাউন্ডারিজ", বা অন্যান্য জাতিগত হিংসার ইতিহাস, প্যালেস্টাইন বলুন নাৎসিদের ইতিহাস — বেসিক থিওরিটা সেই একই থেকে গেছে। মেয়েদের শরীরই সংখ্যাগুরুর ক্ষমতার আস্ফালন আর বদলার ক্ষেত্র। ভারতে সঙ্ঘ, পাকিস্তান বা বাংলাদেশে জামাত, আফগানিস্তানে তালিবান।]

যা লিখলাম ওপরে, তার কোনোটাই প্রাচীন ইতিহাস নয়। ১৯৯২ সালের ডিসেম্বর মাসে এই আদর্শের প্র‍্যাক্টিকাল পরীক্ষা হয়েছিল সুরাটের রাস্তায় — ফ্লাডলাইটের আলোয় মুসলমান মেয়েদের গণধর্ষণের মাধ্যমে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মহিলা নেত্রী কৃষ্ণা শর্মার ভাষায় — "হিন্দুদের এমন অবস্থা তৈরী করতে হবে যাতে বাকিরা ভয় পেতে শুরু করে। আমাদের নিজেদের শক্তির প্রমাণ দিতে হবে। ওরা যদি আমাদের দশ বা পনেরোজনকে ধর্ষণ করে, আমাদেরও ওদের মহিলাদের ওপর একই কাজ করে বুঝিয়ে দিতে হবে যে আমরাও কম যাই না"। কৃষ্ণা শর্মা এই কথাগুলো বলেছিলেন কলেজের কিছু ছাত্রীর সামনেই...

সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগাটের মত যে কুস্তিগিররা পথে নেমেছিলেন, তাঁরা কেউ সেদিন সাম্প্রদায়িক হিংসার কথা বলেননি, তাঁরা প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁদেরই জগতের এক প্রভাবশালী কর্তার বিরুদ্ধে — যিনি হিন্দু জাতীয়তাবাদী একটা দলের প্রতিনিধি। আর, সেদিন আমাদের সিস্টেম ঠিক একইভাবে প্রতিক্রিয়া দিয়েছিল — ঘটনা অস্বীকার করে, প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে, আর মেয়েগুলোকে মিথ্যাবাদী, নাটুকে বা "খারাপ মা" বলে দাগিয়ে দিয়ে...ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে সকলেই ছিল এতে, কারণ সাভারকরের ওই কথাগুলো হিন্দুত্ব সিস্টেমের সমস্ত স্তরে ছড়িয়ে আছে, এমনকী মেয়েদের সংগঠন রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির মধ্যেও...

ঘৃণার জন্যে ক্ষমতায়ন, ঘরে নির্বাক দাসত্ব
===========================

তনিকা সরকার একটা সময়ে বড়সড় ফিল্ড ওয়ার্ক করেছিলেন আরএসএসের মহিলা সংগঠন রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির ওপরে। ১৯৯৯ সালে, আরএসএসের এক মহিলা নেত্রী এই ফিল্ড ওয়ার্কের সময়েই এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন — "আমরা মেয়েদের শেখাই আত্মত্যাগ করতে, যাতে পরিবার এক সুতোয় বাঁধা থাকে। অধিকারের কথা থিওরি হিসেবেই শুনতে ঠিক লাগে; অধিকারের দাবীতে লড়াই ভুল।"

পদ্ধতিটা খেয়াল করবেন একবার। সমিতি মেয়েদের ফিজিকাল ট্রেনিং দেয় - মার্শাল আর্ট, যোগাসন, তরোয়াল চালানো, জুডো, এমনকি বন্দুক চালানোতেও। সমিতির প্রকাশনায় লেখা আছে — "স্বসংরক্ষণক্ষম নারী কি সমাজমে অধিক প্রতিষ্ঠা হোতি হ্যায়", মানে "আত্মরক্ষায় সক্ষম নারীর সামাজিক প্রতিষ্ঠা বেশি"। কিন্তু আত্মরক্ষা কার থেকে? পণের দাবী করা লোভী বউপেটানো স্বামীর হাত থেকে নয়। নিজের সম্প্রদায়ের ধর্ষকের হাত থেকেও নয়। এই প্রশিক্ষণের এক ও একমাত্র লক্ষ্য হল মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই। যুদ্ধ। দিল্লীর রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির সংগঠক আশা শর্মার নিজের মুখেই স্বীকার করেন যে যুদ্ধ বলতে তাঁরা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধের কথাই বলতে চান।

সমিতির উৎপত্তির গল্পটা বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। অফিশিয়াল ভার্সনে বলা হয় যে সমিতি তৈরী করা হয়েছিল হিন্দুত্বের আদর্শকে জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে। কথিত ইতিহাস — সমিতির প্রচারিকাদের মুখে যেটা শোনা যায়, সেটা সামান্য আলাদা। তাঁরা বলেন যে সমিতির প্রতিষ্ঠাতা লক্ষ্মীবাঈ কেলকার, এক অল্পবয়সী মেয়েকে তার নির্বিকার হিন্দু স্বামীর সামনেই হিন্দু গুন্ডাদের হাতে ধর্ষিতা হতে দেখে ঠিক করেছিলেন যে হিন্দু পুরুষরা যেহেতু তাদের পরিবারের মেয়েদের রক্ষার দায়িত্ব নিতে অক্ষম, তাই মেয়েদেরই আত্মরক্ষার ভার নিতে হবে। লক্ষ্মীবাঈ কেলকারের হাতে সমিতির শুরু এর পরেই। কিন্তু, হিন্দু পুরুষদের হিংস্রতার এই অকপট স্বীকারোক্তি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়। সমিতি প্রকাশ্যে কখনোই হিন্দু পুরুষের সমালোচনা করে না। সমস্ত রাগ এবং আক্রোশের লক্ষ্য শুধুই মুসলমান সম্প্রদায়।

আজও আমরা ঠিক একই ঘটনা দেখি। টার্গেট বদলে দেওয়া। সাক্ষী বা ভিনেশরা যখন এক বাহুবলী হিন্দু পুরুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে, তখন হিন্দুত্বের নেতানেত্রীরা বা ট্রোল বাহিনী পুরুষতন্ত্রকে খালাস দিয়ে অভিযোগকারিনীদেরই রাষ্ট্রবিরোধী পাকিস্তানপ্রেমী বানিয়ে দেয়। হিন্দুত্বের সংজ্ঞায় শত্রু কখনোই পরিবারের ভিতরে থাকে না; সে সর্বদাই বাইরের শক্তি; আর সে থাকে মুসলমানের বেশে।

গেরুয়া শাড়ির আড়ালে নখদাঁত বের করা পিতৃতন্ত্র
=================================

এবার বলি সঙ্ঘের এই "এমপাওয়ার্ড" মহিলারা অ্যাকচুয়ালি কীসে বিশ্বাস করেন। তনিকা সরকারের ফিল্ডওয়ার্কের সময় বিজেপি মহিলা মোর্চা নেত্রীরা আর রাষ্ট্রসেবিকা সমিতির প্রচারিকারা যা বলেছিলেন, তার জিস্ট:

▪️সতী সম্পর্কে: আশা শর্মার বক্তব্য ছিল — সতী আসলে নিজের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশ্যে মেয়েদের সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের ইচ্ছা। রূপ কানোয়ারের ঘটনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন যে সেটা স্বেচ্ছায় সতী হওয়ার ঘটনা ছিল না, এবং এই জন্যেই সঙ্ঘ মেয়েদের শারীরিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেয়। ঘুরিয়ে বললে এর মানে দাঁড়ায় যে খাঁটি হিন্দু মহিলা অন্য কারো কথায় নয়, বরং স্বেচ্ছায় সতী হওয়াকে গর্বের মনে করেন।
▪️বধূ নির্যাতন সম্পর্কে: মেয়েদের উদ্দেশ্যে ভিএইচপির নেত্রী কৃষ্ণা শর্মার উপদেশ ছিল যে তাদের শিখতে হবে কীভাবে নিজের গলার আওয়াজকে, নিজের চিৎকারকে নিজের গলার মধ্যেই চেপে রাখতে হয়, যাতে ব্যাপারটা ঘরের চৌহদ্দির মধ্যেই থেকে যায়। মারধোর চলতেই থাকলে সেই মেয়েটির উচিত নিজের "বিরাদরি", মানে সম্প্রদায়ের গুরুজনদের সঙ্গে কথা বলা। আইনী ব্যবস্থা একদম শেষ পন্থা। ডিভোর্স হিন্দু মহিলার কাছে বাস্তবোচিত নয় কারণ একজন নারী একা থাকতে পারে না, আর স্বামীও বদল করতে পারে না।
▪️মেয়েদের শিক্ষা বনাম ছেলেদের শিক্ষা সম্পর্কে: কৃষ্ণা শর্মাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল যে পরিবার যদি মাত্র একজনেরই শিক্ষার খরচ বইতে সমর্থ হয়, তাহলে কাকে স্কুলে পাঠানো উচিত, ছেলেকে না মেয়েকে? কৃষ্ণা শর্মা উত্তরে বলেন যে চাকরি করে পরিবার চালানো পুরুষেরই দায়িত্ব, কাজেই এক্ষেত্রে ছেলের শিক্ষাই বেশি জরুরী।
▪️ম্যারিটাল রেপ প্রসঙ্গে: কৃষ্ণা শর্মা এই আইডিয়াটাকেই পুরোপুরি বাতিল করে দিয়েছিলেন "এলিয়েন কালচার" বলে। আরো বলেছিলেন যে মেয়েটি যদি শারীরিক এবং মানসিকভাবে শক্ত হয়, তাহলে তার নিজের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরার কথা। বেসিকালি, গেরুয়ার ছদ্মবেশে ভিক্টিম ব্লেমিং।
▪️ভিন্ন সম্প্রদায়ে প্রেম বা বিয়ে প্রসঙ্গে: সঙ্ঘের যে নেতারা মুসলমান মেয়েদের মুক্ত করার স্বার্থে ইউনিফর্ম সিভিল কোডের নামে মুখে রক্ত তোলেন, তাঁরাই আবার বলেন হিন্দু মেয়েদের বাপমায়ের কথাই শোনা উচিত, তাঁরাই ভালো বোঝেন, এবং তাঁদের কথার প্রতিবাদ করা মানে অশান্তি ডেকে আনা।

একে নারীর ক্ষমতায়ন বলবেন? নাকি গেরুয়া পতাকায় সাজানো খাঁচায় যাবজ্জীবন কারাদন্ড বলবেন?

এই কনট্রাডিকশনের আরো উদাহরণ পাওয়া যায় সঙ্ঘের মহিলা নেত্রীদের কথাবার্তায়। অমৃতা বসু, তাঁর "ফেমিনিজম ইনভার্টেড" লেখায় এইধরণের কনট্রাডিকশনের বেশ কয়েকটা চোখধাঁধানো উদাহরণ দিয়েছেন। সঙ্ঘের সবচেয়ে খ্যাতনামা মহিলা নেত্রীরা — উমা ভারতী, সাধ্বী ঋতম্ভরা, বিজয়রাজে সিন্ধিয়া — প্রত্যেকেই সঙ্ঘের ভাষায় ব্রহ্মচারিণী। ঋতম্ভরা আর উমা ভারতী দুজনেই সন্ন্যাসিনী (সাধ্বী আর সন্ন্যাসিনীর মধ্যে সামান্য পার্থক্য থাকলেও এখানে একার্থে ব্যবহার করলে বিশেষ তারতম্য হবে না), আর বিজয়রাজে সিন্ধিয়া বিধবা। এঁদের এই ত্যাগের জীবন বা রিনান্সিয়েশন থেকে এঁদের মধ্যে একধরণের মরাল অথরিটি আসে, যার ফলে এঁরা নিজেদের কথার মধ্যে তীব্র আক্রোশ বা ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেন স্বচ্ছন্দে। আবার যে ভাষায় এঁরা কথা বলেন, সেই একই ভাষা ব্যবহার করলে একজন সাধারণ মেয়েকে অনায়াসেই "মন্দ মেয়ে" বলা হত।

কিন্তু এই ক'জনা এক্সেপশন। ব্যতিক্রম। এঁদের উগ্র, আক্রমণাত্মক এমনকি অশালীন ভাষা ব্যবহার করারও ছাড় রয়েছে। কারণ? তথাকথিত ত্যাগের সূত্রে পাওয়া ওই মরাল অথরিটি। কিন্তু সাধারণ হিন্দু মেয়ের কাছে সঙ্ঘের এক্সপেক্টেশন আবার আলাদা। বিশেষ করে সেই মেয়েরা যদি কোনো ঘরের বউ হয় বা ছেলেমেয়ের মা হয়। সেক্ষেত্রে সঙ্ঘ তাকে শেখায় মানিয়ে চলতে, আপোষ করতে, নিজেদের চিৎকারকে বুকের ভিতরে চেপে রাখতে। নেতৃত্বে যাঁরা থাকেন তাঁরা ব্রহ্মচারী; সাধারণ কর্মীরা একান্ত অনুগত সৈনিক। এই সিস্টেমটাকে সফলভাবে চালাতে অল্প কয়েকজনই আগ্রাসী নারীমূর্তির দরকার পড়ে — যাঁরা দরকারে জনতাকে উত্তেজিত করে তুলতে পারবেন; বাকি বিশাল সংখ্যক সাধারণ মেয়েরা থাকবে শান্তশিষ্ট অনুগত গোবেচারা গৃহপালিত প্রাণীর মত...

এই ডুয়ালিজম বা হিপোক্রিসিটা খেয়াল করবেন...একদিকে বিজেপি মেয়েদের ভোটে দাঁড় করায়। লকেট চ্যাটার্জী, পাপিয়া অধিকারী, অগ্নিমিত্রা পল, বিহারে মৈথিলী ঠাকুর ইত্যাদি। কিন্তু মেয়েদের নিত্যদিনের সমস্যা নিয়ে এদের গলা তুলতে দেখবেন না কখনো। সমকাজে সমবেতন, কনসেন্ট, গার্হ্যস্থ হিংসা, ম্যারিটাল রেপ, প্রজননের চয়েজ — এই নিয়ে তাঁরা উচ্চবাচ্য করেন না। গ্রাসরুট মহিলা সংগঠনকে ঠেলে দেওয়া হয় ঘরোয়া আচার অনুষ্ঠানের গন্ডির মধ্যে। কড়ওয়া চওথ, গোপালের পরিচর্যা, শিবরাত্রি, আরো হাজারো ব্রত...স্বামী, সন্তান, পরিবারের মঙ্গলকামনার নানান উপাচার।

মঞ্চে থাকেন নারী নেত্রীরা। মঞ্চের আড়ালে নিয়ন্ত্রিত হয় নারী শরীর।

নারীর অধিকার আর নারীসুরক্ষার ফাঁকা স্লোগান
=================================

একদিকে আমরা দেখি বিজেপি অভয়ার বিচার চেয়ে চিৎকার করে গলা ফাটায়। আবার অন্যদিকে দেখি উন্নাও-কাঠুয়া-হাথরসের ঘটনা। দেখি বিলকিস বানুর ধর্ষকদের ছেড়ে দিতে চায় বিজেপির সরকার। দেখি ধর্ষণে অভিযুক্তকে মালা পরিয়ে স্টেজে সম্বর্ধনা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দেখি বাস্তবে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের মতামত ব্যক্ত করা মেয়েদের ওপর অকথ্য ভাষায় আক্রমণ। দেখি মহিলা মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে জঘন্য একটা মীম।

তখন সিরিয়াসলি আপনাদের একবারও মনে হয় না যে এই দক্ষিণপন্থী নেতানেত্রীরা যখন মেয়েদের সুরক্ষার দাবীতে বা ক্ষমতায়নের দাবীতে স্লোগান দেয়, তখন পাল্টা প্রশ্ন করি — যে ক্ষমতায়ন কোন কাজটা করার জন্য?

আরএসএসের নিজস্ব প্লেবুক অনুযায়ী, 
▪️মেয়েরা আত্মরক্ষার টেকনিক শিখতে পারে — তবে শুধু মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করার জন্যে, নিজের ঘরে তার ওপর হওয়া অত্যাচার ঠেকাতে নয়।
▪️মেয়েরা চাকরি করতে পারে — তবে শুধুমাত্র পরিবারের যদি একান্তই দরকার পড়ে, তবেই; নইলে সেটা বিলাসিতা।
▪️একটা মেয়ে পাব্লিকলি গলা তুলে কথা বলতেই পারে — তবে সেটা বিদ্বেষ ছড়িয়ে লোককে উত্তেজিত করতে, ইক্যুয়াল মাইনে বা রিপ্রোডাক্টিভ চয়েজের অধিকার চেয়ে নয়। সেগুলো অবাধ্যতা। ভারতীয় সংস্কৃতি নয়।
▪️ধর্ষণ আলোচিত হতেই পারে — তবে কেবল পশ্চিমী সংস্কৃতি আর অশ্লীল গণমাধ্যমকে দোষারোপ করার জন্য, আর নয়তো "ওদের" বিরুদ্ধে বিষোদগার করতে, প্রতিশোধে উস্কানি দিতে। হিন্দু পরিবারের অন্দরে চলে আসা পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার চুলচেরা বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্যে কখনোই নয়।

লাভ জিহাদ আর মুসলমান ধর্ষকদের নিয়ে গলা ফাটান যে নেতানেত্রীরা, তাঁরাই আবার নিজের দলের সাংসদের বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ আনা মেয়েদের মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করেন। হিন্দু মেয়েদের সুরক্ষার দাবী করে যে অনলাইন ট্রোলরা, তারাই আবার নিজস্ব মতামত প্রকাশের দায়ে মহিলা কুস্তিগির, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের ওপর চড়াও হয়।

ফ্লাভিয়া অ্যাগ্নেস — একজন আইনজীবী এবং ফেমিনিস্ট অ্যাক্টিভিস্ট, তাঁর একটা লেখায় লিখেছেন যে "হাম ভারত কি নারী হ্যায়, ফুল নহি চিঙ্গারি হ্যায়" বলে নারী আন্দোলনের যে স্লোগান আমরা শুনে অভ্যস্ত, সেই স্লোগানকে আত্মসাৎ করে শিবসেনা আর বিজেপির মহিলা শাখাগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে রণহুঙ্কারে বদলে নিয়েছে। পণপ্রথা, যৌতুক, বৈবাহিক হিংসা বা বৈবাহিক ধর্ষণের বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে ভারতের নারী আন্দোলন সংগঠনগুলো দশকের পর দশক ধরে যে চেষ্টা চালিয়েছিল — চিঙ্গারি হ্যায়ের মত স্লোগান সেই নারী আন্দোলনেরই প্রতীক। নারী আন্দোলনের স্লোগানগুলোকে চুরি করে নিয়ে তাদের ভিতরের আসল নারীবাদী অংশ মুছে ফেলে হিন্দুত্ববাদীরা সেগুলোকে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের অস্ত্রে পরিণত করেছে।

উপসংহার
=======

তনিকা সরকারের লেখা শেষ হচ্ছে একটা ওয়ার্নিং দিয়ে। সেটা ভার্বাটিম তুলে দিই। 

"The point is not that these women are being conned into belief, for the same applies to men. The point is to assess the nature of the issues they assent to."

একটা কথা মাথায় রাখা দরকার — হিন্দু দক্ষিণপন্থার ভেতরের মেয়েদের সিম্পলি "false consciousness" বলে খারিজ করে দেওয়া যায় না। এই মেয়েরা ওই রিগ্রেসিভ পরিবেশের মধ্যেও একটা সীমিত ক্ষমতায়ন খুঁজে পেয়েছে — শারীরিক শিক্ষা, জনপরিসরে ভূমিকা - সে মাউথপীস হিসেবে হলেও — এগুলো এদের কাছে দামী। এদের সঙ্ঘের রিগ্রেসিভ আদর্শ থেকে বের করে আনতে গেলে আরো শক্তিশালী আদর্শের প্রয়োজন। শুধু আইনি অধিকার নয়, বরং ইক্যুইটি এবং ইক্যুয়ালিটি — যাতে একটা অল্প বয়সী মেয়ে গর্বের সঙ্গে তার জবরদস্তি-করা স্বামীর চাহিদা খারিজ করে দিতে পারে একটা মাত্র শব্দে; এমন একটা সিস্টেম যেখানে ধর্মনিরপেক্ষতা শুধু সংবিধানে লেখা একটা শব্দ হয়ে থাকবে না, বরং প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সঙ্গী হয়ে উঠবে — স্কুলে, কলেজে, কলে, কারখানায়, অফিসে, বাড়িতে, মহল্লায়...

তবে এই হিন্দুত্ববাদী মতাদর্শকে তার পাওনাগন্ডা বুঝিয়ে দিতেই হবে। সাভারকরের রেপ-অ্যাপোলজিয়া জাস্ট একটা কথার কথা নয়; যে লোকগুলো নিজেদের হিন্দু মেয়েদের একমাত্র রক্ষক বলে দাবী করে, তাদের ফিলোজফি এইটা।

সাক্ষী মালিক, ভিনেশ ফোগাটদের মত কুস্তিগীর, বা অন্য যারা গলা তুলেছে — অভিনেত্রী, রাজনৈতিক বা সামাজিক কর্মী, সাংবাদিক, আমার আপনার পরিচিত অনেক মেয়ে যারা সমাজ মাধ্যমে নিজের কথা বলার চেষ্টা করেছে — এদের প্রত্যেককে যে বিজেপি নেতারা নানান কুকথায় চাপা দেওয়ার চেষ্টা করে, যে ট্রোলেরা অকথ্য ভাষায় আক্রমণ করে, তারা সকলেই হিন্দুত্বের এই ট্র‍্যাডিশনেরই ফলোয়ার যার শেকড়ের শুরু আগের শতকে। নাগপুরে লেখা ম্যানুয়াল মেনে একই ঘটনা ঘটে চলেছে বছরের পর বছর। 

যারা পালটা জবাব দেয়, এই সিস্টেম দাঁতনখ বের করে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এমন উদাহরণ ক'টা দেখতে চান?

সূত্র (আগেও বলেছি, তাও):

(১) Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
(২) Women and the Hindu Right - a Collection of Essays, eds Tanika Sarkar, Urvashi Butalia, Zubaan, New Delhi

Friday, May 01, 2026

Saffron Temples of Hate

ভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, একটা বিষয় স্পষ্ট —  একটা ক্রিটিকাল সময় আসতে চলেছে। বিজেপি যেভাবে রাষ্ট্রশক্তিকে কাজে লাগিয়ে বাংলা দখলে নেমেছিল তাতে এটা স্পষ্ট যে ফাইনাল লড়াইয়ের সময় আগতপ্রায়। এই লড়াইটা আমাদেরই লড়তে হবে, আর এখানে লড়তে গেলে, কার বিপক্ষে, কীসের বিপক্ষে লড়ছি সেটাও তো জানা দরকার। কাজেই, আবার একটু ইতিহাসের জ্ঞান...যদিও এগুলো কোনোটাই বিশেষ অজানা কথা নয়। একটু চোখকান খোলা রাখলে, একটু বইপত্র পড়লে এগুলো জানা এবং বোঝার কথা। তাও ডকুমেন্ট করে রাখছি, শুধুমাত্র স্কেলটা বোঝানোর জন্যে।

বিষয়: আরএসএস-এর স্কুল — যাকে ওরা শিক্ষার মন্দির বলে, সেগুলো কেন আসলে ঘৃণার মন্দির। Saffron Temples of Hate.

সরস্বতী শিশু মন্দিরের দিকে একবার তাকালে দেখতে পাবেন বাচ্চারা প্রার্থনা করছে, গুরুজনদের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছে, বন্দে মাতরম গাইছে। কী মনে হয়? একদম নিষ্পাপ শাশ্বত ভারতীয় সংস্কৃতি, তাই না? আজ্ঞে না। বাস্তবে এই সরস্বতী শিশু মন্দির হিন্দুরাষ্ট্রের কারখানা; একটা প্রোজেক্ট যেটা বহু বছর ধরে নি:শব্দে চলে এসেছে। ১৯২৫ সালের বিজয়া দশমীর দিন (দশমীর সিগনিফিকেন্সটা মাথায় রাখবেন — রামের হাতে রাবণের মৃত্যু) এক মারাঠি ব্রাহ্মণ, কেশব বলিরাম হেডগেওয়ার, ওরফে ডক্টরজী, প্রতিষ্ঠা করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের। ঘোর কলোনিয়াল শাসনের সময় হলেও হেডগেওয়ারের লক্ষ্য ছিল ভারতের মুসলমান সম্প্রদায় আর তাঁর চোখে সবচেয়ে বড় সামাজিক ব্যাধি — হিন্দু-মুসলমান ঐক্য। হেডগেওয়ারের উত্তরাধিকারী, মাধব সদাশিবরাও গোলওয়ালকর, আরেক মারাঠি ব্রাহ্মণ, একাধিকবার হিটলারের জার্মানির প্রশংসাও করেছিলেন — বিশেষ করে জার্মানি যেভাবে সেমিটিক (এক্ষেত্রে ইহুদী) সম্প্রদায়ের মানুষদের দেশ থেকে তাড়িয়েছিল, তার। গোলওয়ালকরের লেখায় (We or Our Nationhood Defined) এমনও ঘোষণা পাওয়া যায় যেখানে তিনি বলছেন অহিন্দুরা ভারতে থাকতে চাইলে তাদের হিন্দুদের বশ্যতা স্বীকার করে নিতে হবে, এবং তাদের নাগরিক অধিকার বলে কিছু থাকবে না। আরএসএস আজ অবধি হেডগেওয়ার এবং গোলওয়ালকরের কথাকে অস্বীকার করেনি। পঞ্চাশের দশক থেকে তৈরী হয়ে আসা সঙ্ঘের কয়েক হাজার স্কুলে এই মুহূর্তে পড়াশোনা করা চল্লিশ লক্ষের কাছাকাছি ছাত্রছাত্রীর মধ্যে এই ধারণাই বয়ে চলেছে। আজও।

আরএসএস স্কুল বলে না। বলে মন্দির। এখানে উদ্দেশ্য স্বাক্ষরতা বা শিক্ষা নয়। উদ্দেশ্য হিন্দু রাষ্ট্রের পুজো করতে শেখানো — এমন রাষ্ট্র যেখানে মুসলমান, ক্রিশ্চান আর দলিতরা হয় শত্রু, নয় ভৃত্য। স্কুলের মধ্যে বা পাশেই মন্দির একটা থাকবেই। স্কুলের ভিতরে দেওয়ালে ঝুলবে রাম, রাণা প্রতাপ, শিবাজীর ছবি — বিদেশী, বিশেষ করে মুসলমানদের খতম করা বীর যোদ্ধা হিসেবে। থাকবে হেডগেওয়ার আর গোলওয়ালকরের ছবিও। ভারতের ম্যাপের বদলে ঝুলবে অখন্ড ভারতের ম্যাপ, আফগানিস্তান থেকে মায়ানমার অবধি বিস্তৃত ভূখন্ডের ছবি যেখানে বিরাজ করেন ভারতমাতা। স্কুলে আলাদা করে অযোধ্যার রামজন্মভূমি নিয়ে বক্তৃতা হবে; কোনো স্কুলের প্রধানশিক্ষিকা গর্ব করে বলবেন কীভাবে সেই বক্তৃতা শুনে ক্লাস ফাইভের ছেলেমেয়েরা রাগে, প্রতিশোধের স্পৃহায় হাত মুঠো করে ফেলেছিল। আরেক প্রধানশিক্ষক বলবেন কীভাবে তাঁর স্কুলের ছাত্ররা ১৯৯০ সালে করসেবায় যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গী হয়েছিল। সরকারি আইনরক্ষকদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের কথা স্মরণ করা হবে স্কুল অ্যাসেম্বলিতে।

ইতিহাস শেখানো হবে না। ইতিহাসকে ওয়েপনাইজ করা হবে। বাধ্যতামূলকভাবে পড়ানো হবে "ভারতীয় সংস্কৃতি" বলে একটা আলাদা বিষয়। সেখানে বাচ্চারা শিখবে মুসলমান মানে আক্রমণকারী, ধর্ষক, যারা মন্দির ভাঙে, যারা হিন্দুদের ওপর অত্যাচার করে এসেছে চিরকাল। হিন্দুরা চিরকেলে নির্যাতিত, কাজেই তার বদলা নিতে হিংসার আশ্রয় নেওয়া জায়েজ। আজকের সাধারণ মুসলমান নাগরিক আর মধ্যযুগের মুসলমান শাসক একই। মহাকাব্য, মাইথোলজি আর ইতিহাসের বাউন্ডারি আবছা করে দেওয়া হবে এমনভাবে যাতে নায়কের রোলে মানুষ আর দেবতার মধ্যে বিশেষ ফারাক না থাকে, আর খলনায়কের চরিত্রে অসুর, কলোনিয়াল শাসক আর মুসলমানকেও একই খোপে ফেলে দেওয়া যায়। নায়করা সকলকে অবশ্যই হিন্দু এবং অবশ্যই উচ্চবর্ণের হতে হবে। মেয়েদের দেখানো হবে "সতী" হিসেবে — যারা সম্ভ্রম বাঁচাতে আগুনে পুড়ে মরতেও পিছপা হয় না। ক্লাস ফোরের টেক্সটবইয়ে থাকবে ১৯৯০ সালের অক্টোবর-নভেম্বরে বাবরি মসজিদ ভাঙতে গিয়ে "শহীদ" হওয়া করসেবকদের ছবি। শেখানো হবে সমস্ত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের আসল উৎস সুমহান ভারতের প্রাচীন হিন্দু স্ক্রিপচারেই। বাচ্চাদের ক্যুইজের প্রশ্ন করা হবে: "কোন অত্যাচারী শাসক গুরু গোবিন্দ সিংহের ছেলেদের জীবন্ত কবর দিয়েছিল"? তারা উত্তর মুখস্থ করবে: "ঔরঙ্গজেব"। প্রেক্ষাপটহীন জ্ঞানের মোড়কে বিক্রি হবে ঘৃণা।

শুধু শরীর তৈরী হবে। মানবিকতা নয়। যোগাসন বাধ্যতামূলক হবে বাচ্চাদের হিন্দুরাষ্ট্রের যোগ্য সৈনিক হিসেবে গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে। লাঠি, তরোয়াল, বর্শার ব্যবহার শেখানো হবে — আধুনিক যুদ্ধে লড়বার জন্যে নয়, বরং নিরস্ত্র গরীব মুসলমান সহনাগরিকদের পিটিয়ে খুঁচিয়ে মারার জন্যে। বাচ্চাদের জন্মদিন পালন হবে পবিত্র প্রদীপ জ্বালিয়ে, সংস্কৃত মন্ত্রের উচ্চারণে আর ক্যাসেটে ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদী গান বাজিয়ে; কেক কেটে নয়, কারণ সেটা পশ্চিমী সংস্কৃতি, যতই জনপ্রিয় হোক না কেন। বাচ্চাটাকে মালা পরানো হবে, সাজানো হবে দেবতার সাজে। ব্যক্তিগত আনন্দের জায়গা নেবে সমষ্টিগত আচার। আরএসএসের নিজস্ব ম্যানুয়ালে লেখে — "Without a suitable technique no ideal can be realized. We have evolved a technique, an emblem, a mantra, a code of discipline" — সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার সর্বগ্রাসী মনোভাব; ময়ূরকে আফিম খাইয়ে পোষ মানানোর মতন, যেখানে দশ-বারো-চোদ্দ বছরের বাচ্চারাও এই হিন্দুরাষ্ট্রকে দেশ ভেবে দেশপ্রেমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকবে।

নজরদারি চলবে পরিবারের ভিতরেও। স্কুলের শিক্ষকরা নিয়মিত পৌঁছে যাবেন ছাত্রছাত্রীদের বাড়িতেও; সম্পর্ক গড়ে তুলবেন বাবা-মা, পাড়া প্রতিবেশীর সঙ্গে। আরএসএসের বর্ধিত শাখার অংশ হয়ে উঠবে স্কুল। পরিবার সঙ্ঘের আদর্শে আপত্তি করলে ছাত্র বা ছাত্রীকে বলা হবে অপেক্ষা করতে; আস্তে আস্তে ভিতর থেকে পরিবারকে বদলাতে; এই কাজে সাহায্য করবেন শিক্ষকেরা। পেরেন্ট-টিচার মিটিং বাচ্চার পড়াশোনার অগ্রগতি নিয়ে হবে না; হবে সংস্কার নিয়ে — কীভাবে বাচ্চার মধ্যে হিন্দু সংস্কার গড়ে তুলতে হবে — বশ্যতা, আনুগত্য, শ্রদ্ধা আর "ওদের" প্রতি ঘৃণা। "ওরা" মানে মুসলমান বা ক্রিশ্চান বা দলিত নীচু জাতের মানুষ। সঙ্ঘের মহিলা শাখা — রাষ্ট্রসেবিকা সমিতি — মেয়েদের মার্শাল আর্টের প্রশিক্ষণ দেয়, কিন্তু শেখায়: "হাম ঘর তোড়নেওয়ালে নেহি হ্যায়"। স্কুলের মেয়েরা বড় হলে, বিয়ের পর পারিবারিক অত্যাচারের মুখে পড়লে, আইনি সহায়তা থাকে না, পণপ্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকে না, বিচ্ছেদের সুযোগ থাকে না। থাকে শুধু একটা গেরুয়া খাঁচা।

বিপদটা শুধু সাম্প্রদায়িকই নয়, ভয়ানকভাবে গণতন্ত্রবিরোধীও। সরকারি স্কুলগুলোর পরেই, ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্কুল চেইন চালায় বিদ্যা ভারতী, গোটা দেশে প্রায় পঞ্চাশ হাজার; লক্ষ্য ভারতের প্রতিটি ব্লকে অন্তত: একটা করে স্কুল তৈরী। সেখানে বাচ্চারা গণতন্ত্র শেখে না। "গুরুজী" গোলওয়ালকর তো কবেই গণতন্ত্রকে বিষ বলে দিয়েছেন। সঙ্ঘের আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা হল উচ্চবর্ণের শিক্ষকদের নিয়ে তৈরী গুরুসভা — যাদের প্রত্যেকের হাতে থাকবে ৩০টা ভোট, যারা ছাপিয়ে যাবে লোকসভার ক্ষমতাকেও। এখানে জাতিভেদের সমালোচনা হবে না, "জাতিবাদসে আজাদী" স্লোগানকে বলা হবে দেশবিরোধী। হিন্দুধর্মের এই জাতিভেদপ্রথার কট্টর সমালোচক হিসেবে আম্বেদকরের ভূমিকা ভুলিয়ে দেওয়া হবে। দলিতদের বলা হবে "অজ্ঞ শিশু" — যাদের অধিকার নয়, বরং এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়েই ভুলিয়ে দেওয়া যাবে। মেয়েরা বাচ্চাবয়স থেকেই শিখবে যে অধিকারের ধারণা আসলে একটা করাপ্ট পাশ্চাত্য ধারণা; তারা জানবে যে তাদের ভবিতব্য, তাদের লক্ষ্য, শুধুমাত্র একজন "আদর্শ মা" হয়ে ওঠা, যিনি কখনো অভিযোগ করেন না, অধিকারের দাবী করেন না, তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন না; পরিবারের মঙ্গলই তাঁর একমাত্র আশা আকাঙ্খা কর্তব্য।

একে কি শিক্ষা বলব? নাকি ফ্যাসিবাদী ভবিষ্যতের মতাদর্শের দীক্ষা বলা উচিত? আরএসএসের স্কুলে পড়া বাচ্চাদের সরাসরি মিথ্যা শেখানো হচ্ছে না, বরং দেশপ্রেমের মোড়কে অর্ধসত্য শেখানো হচ্ছে — যা আরো ভয়ঙ্কর। তারা বড় হচ্ছে এই বিশ্বাস নিয়ে যে গরীব নিরস্ত্র মুসলমান সহনাগরিককে পিটিয়ে মারা বা বাস্তুচ্যুত করা আসলে আত্মরক্ষা; শিখছে যে গণতন্ত্র আসলে দুর্বল এবং করাপ্ট পশ্চিমী ধারণা; শিখছে নারীর অধিকার আসলে সনাতনী পরিবারকে ধ্বংস করে; আর জানছে যে তাদের সাবর্ণ হওয়ার সমস্ত সুযোগ সুবিধা আসলেই ডিভাইন রাইট। ঈশ্বরপ্রদত্ত। আরএসএসের পরিকল্পনা ছিল যে এরাই একদিন বড় হবে। নাগরিক হিসেবে ভোট দেবে। আইনরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। আদালতে বিচার করবে। আইনসভায় আইন পাশ করবে।

আর, ঠিক এইটাই হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তর ভারতে সঙ্ঘের স্কুলে এই শিক্ষা পেয়ে বড় হওয়া ছেলেমেয়েরা আজকে কেউ পুলিশ, কেউ বিচারক, কেউ উকিল...তাদের নিজস্ব ক্ষেত্রে এই শিক্ষার ছাপ তারা ক্রমাগত রেখে চলেছে। বিশ্বাস না হলে আপনার কাছাকাছি সরস্বতী শিশু মন্দির বা বিদ্যাভারতী স্কুলে গিয়ে ক্লাস ফাইভের সংস্কৃতি বইটা চেয়ে হাতে নিয়ে দেখে নিতে পারেন, বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করুন তারা ইতিহাস বলে কী শিখছে। আর তারপর একবার টিভি চালিয়ে দেখে নিন গণতন্ত্রের প্রথম তিনটে পিলারের মানুষজন কোন ভাষায় কথা বলছে আর চতুর্থ পিলার মিডিয়াই বা কোন সুরে গাইছে...

তারপর সিদ্ধান্ত নিন...

This is the army standing against us. This is a battle we have to win. Whatever it takes...

সূত্র:
▪️Hindu Nationalism in India, Tanika Sarkar, Hurst & Company, London
▪️Khaki Shorts & Saffron Flags - a Critique of the Hindu Right, Tapan Basu et al, Orient Blackswan

হিন্দু খতরে মে হ্যায় - পর্ব দুই

"হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ কীভাবে তৈরী হয় সেইটা নিয়ে গতকাল লিখেছিলাম। সঙ্ঘপরিবারের নেতৃত্ব ও কর্মী - যারা প্রায় সকলেই উচ্চবর্ণের - গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে খুবই ছোট একটা অংশ হওয়ার জন্যে তাদের নিজেদের ডেমোগ্রাফিক অ্যাংজাইটি এবং বাদবাকি নীচু জাত আর দলিতদের কাছে ক্ষমতা হারানোর ভয় থেকে আসে এই রাজনৈতিক কৌশল, যেখানে অন্য কাউকে (যেমন ধরুন সেকুলার, কমিউনিস্ট, মুসলমান) ভিলেন খাড়া করে বাকি হিন্দু সম্প্রদায়ের টার্গেট বদলে দেওয়া হয়...

স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে যে এইটা তো উচ্চবর্ণের অ্যাক্টিভিস্টদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। সঙ্ঘপরিবারের ফুট সোলজার যারা, বা ভোটার যারা - তাদের ডেমোগ্রাফিক কম্পোজিশন তো অনেক ডাইভার্স - সেখানে নীচু জাত আছে, ওবিসি আছে, দলিত আছে, আদিবাসী সম্প্রদায় আছে। তাদের ক্ষেত্রে এই "লিভড এক্সপিরিয়েন্স" তত্ত্ব খাটছে কী করে? বরং তারা তো সেই উচ্চবর্ণের হাতেই নানাভাবে এক্সপ্লয়েটেড। বা, অবহেলিত। সঙ্ঘপরিবারের বিভিন্ন নেতা পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য রাজ্যে গিয়ে ঘটা করে কোনও দলিত বা আদিবাসী পরিবারের দাওয়ায় বসে পাত পেড়ে খেয়ে ফটোসেশন করেন, তারপর ভুলে যান। সেই পরিবারকে তাদের প্রতিদিনের সমস্যাগুলো মেনে নিয়েই চলতে হয় একদিন অমিত শাহ বা মোহন ভাগবত  বা শমীক ভট্টাচার্য্যের "সেবা" করার মত গুরুদায়িত্ব পেয়েও...এসবের পরেও তারা সঙ্ঘের আদর্শকে সাপোর্ট করে কেন, বা বিজেপিকে ভোট দেয় কেন?

খুবই ভ্যালিড প্রশ্ন। এবং এর উত্তরও আছে। আজকে সেইটা লিখব।

ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাস্তবে চারটে ফ্যাক্টরের ওপর কাজ করে, আর এগুলোর কোনটার জন্যেই আগে লেখা উচ্চবর্ণের উদ্বেগ বা শঙ্কাকে অনুভব করার দরকার পড়ে না।

(১) সঙ্ঘ খুব সফলভাবে সমস্ত ভার্টিকাল কনফ্লিক্ট - যেমন দলিতদের ওপর উঁচু জাতের অত্যাচার - মুছে দিয়ে একটা হরাইজন্টাল কনফ্লিক্টের গল্প ছড়িয়ে দিতে পেরেছে। একজন দলিতের নিজের জীবনে হয়ত গ্রামের ঠাকুর তার ওপর অত্যাচার করে, তাকে বিনা মজুরিতে খাটায়, গ্রামের কুয়ো থেকে তার জল তোলা মানা। হিন্দু রাইট উইং তাকে বোঝায় - "তোমার ঘরে জলের অভাব কারণ মুসলমানের সংখ্যা বেড়েই চলেছে, আর ওরা তোমার ভাগে থাবা বসাচ্ছে। তোমার অপমানের আসল কারণ হল হাজার বছর ধরে চলা ইসলামী আগ্রাসন - তোমার আত্মসম্মানবোধ ভেঙে চূর্ণ করে দিয়েছে মুসলমান শাসকেরা। তোমাকে আগে তোমার হিন্দুত্বের গর্ব ফিরিয়ে আনতে হবে"। দলিত লোকটার কাছে এটা একটা সাইকোলজিক্যাল প্রশ্ন। সে ভারতের জাতপাতের কাঠামোর একেবারে নীচের তলায় পড়ে আছে। অথচ একজন হিন্দু হিসেবে সে নিজেকে এক গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার অঙ্গ হিসেবে দেখতে পারে। এই সাময়িক আপলিফটমেন্ট খানিকটা মরফিনের মত তাকে বর্ণাশ্রমের দাসত্বের যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেয়।

(২) আজকের দিনে, ভোট ব্যাপারটা পুরোপুরিই ট্রাঞ্জ্যাকশনাল - পাওনাগণ্ডা বুঝে নেওয়া। অনেক ভোটারের কাছে এই গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতা বা জাতপাতের টেনশন ইত্যাদি নিয়ে ভাবার প্রয়োজন নেই, সময়ও নেই। কাজেই এখানে একটা অলিখিত চুক্তি কাজ করে - "আমি আপনাকে ভোট দেব - এই কারণে নয় যে আমি মনে করি মুসলমানেরা আমাদের দেশ দখল করে ফেলবে বা আমি হিন্দু ধর্মের বীর যোদ্ধা ইত্যাদি। আমি ভোট দেব যদি আপনি আমাকে একটা বেশি গ্যাসের কানেকশন করিয়ে দেন। আপনার মন্দিরের রাজনীতি আমি মেনে নেব যদি আপনি আমার জন্যে বিশুদ্ধ জল বা শৌচাগারের ব্যবস্থা করে দেন"। এই হিসেবটা সবচেয়ে সহজ কারণ এখানে আদর্শ, উদ্বেগ ইত্যাদি কঠিন কথাবার্তার কোনও জায়গাই নেই। শুনতে খারাপ লাগলেও এই বাস্তবটাকে এড়ানো কঠিন।

(৩) রাষ্ট্রের করা  Sanskritization - অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণী (ওবিসি) এবং দলিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর সবচেয়ে সংগঠিত অংশের জন্য হিন্দু রাইট উইং প্রচলিত বর্ণপ্রথার স্টিগমা এড়ানোর একটা রাস্তা দেখায়, আর সেটা হল ইকোনমিক ন্যাশনালিজম আর ইউনিফর্মিটি। অনেক ওবিসি বা দলিত ভাবে - "পুরনো কংগ্রেস/দলিত দলগুলো চায় আমি ভিক্টিম হয়ে থাকি, সংরক্ষণের মাধ্যমে যেটুকু পাওয়া যায় তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি"। হিন্দুত্ববাদীরা বোঝায় – "তুমি আসলে দেশপ্রেমিক হিন্দু। তুমিও বড় ব্যবসায়ী হতে পারো, মালিক হতে পারো, তোমাকে আমাদের সঙ্গে আসতে হবে"। ফলাফল - সামাজিকভাবে আপওয়ার্ডলি মোবাইল হওয়ার চক্করে উচ্চবর্ণের কাস্টম, ট্র্যাডিশনকে আপন করে নেওয়া - উগ্র ধার্মিকতা, নিরামিষাশী হয়ে যাওয়া, মুসলমানবিরোধী হয়ে যাওয়া...মাথায় একটা সিগন্যাল পৌঁছয় – "আমি আর শুধু একটা বর্ণ নই, আমিও সেই গৌরবোজ্বল হিন্দু সভ্যতার অঙ্গ, হিন্দু জাতি (নেশন)"।

(৪) এর বাইরে একটা বাস্তব সমস্যা থেকে যায়। কাস্ট-সংক্রান্ত বিশ্বাসযোগ্য বিকল্পের অভাব। ভোটার তার রাজ্যের বিকল্পগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখে সেগুলো প্রায়ই কোনও একটা প্রভাবশালী যাদব বা কুর্মি পরিবারের মৌরসিপাট্টা - অধিকাংশ সুযোগ সুবিধা সেই সম্প্রদায়ের মধ্যেই কুক্ষিগত হয়ে থাকে। সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা জনজাতি বা দলিতরা উপেক্ষিতই থেকে যায়। আর এইসব দেখে শেষ অবধি সে ভাবতে শুরু করে যে এই উঁচুজাতের দলটা তো অন্তত আমাকে হিন্দু মনে করছে...ওই ওবিসিদের দলটা তো আমার দিকে ফিরেই তাকায় না...

আজকের এই হিন্দুত্ববাদী ডিসকোর্স গোটা আলোচনার পরিসরকেই গিলে ফেলে গরীব প্রান্তিক মানুষের সামনে দুটো পথ খোলা রাখে—

হয় হিন্দু ঐক্যের আবহে নিজেদের অস্তিত্বহীন করে তোলো, আর নয়তো জাতি-ভিত্তিক রাজনীতির গোলকধাঁধায় ঘুরতে ঘুরতে খণ্ড খণ্ড ও ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ো। 

সাধারণ ভোটারের কাছে প্রথমটাই কম ঝুঁকির; উচ্চবর্ণের শর্তাধীনে হলেও সে কোনোভাবে ক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছনোর স্বপ্ন দেখতে পারে।

হিন্দু খতরে মে হ্যায় - পর্ব এক

"হিন্দু খতরে মে হ্যায়" - এই কথাটা তো কয়েক লক্ষ বার শুনে ফেলেছেন। অথচ, ২০১১ সালের সেন্সাস অনুযায়ী (দুঃখিত, ২০১১ সালই ধরতে হবে, কারণ মোদী সরকার তার পরের সেন্সাস করেই উঠতে পারেনি) ভারতে হিন্দুদের সংখ্যা জনসংখ্যার ৭৯.৮%, মুসলমানের সংখ্যা ১৪.২%, ক্রিশ্চান ২.৩%, শিখ ১.৭%, বৌদ্ধ ০.৭%, জৈন ০.৪% আর অন্যান্য ০.৯% মতন। অর্থাৎ, এদের দাবী অনুযায়ী বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও হিন্দু বিপদে। শুধু আজ নয়, আরএসএসের জন্মলগ্ন থেকেই। 

তো, আপনার কখনও মনে হয়নি যে এই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ আধিপত্যশালী জনগোষ্ঠী এমন নিপীড়িত সংখ্যালঘুদের মত বায়নাক্কা করে কেন?

ক্রিস্টোফ জ্যাফ্রেলটের লেখায় একটা স্টিগমাটাইজেশন/এমুলেশন ফ্রেমওয়ার্কের কথা পেয়েছিলাম এবং লিখেওছিলাম - আগে যারা 'অপর', তাদের আচার আচরণের তুমুল নিন্দা করে সেগুলোকে স্টিগমাটাইজ করতে হবে, সেই লোকগুলোকে শয়তানের অবতার বলে দাগিয়ে দিতে হবে, আর তারপর তাদের কাউন্টার করতে সেই একই পদ্ধতিগুলোকে আপন করে নিতে হবে। কিন্তু এই ব্যাপারটা আসে আগে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ এসট্যাবলিশ হওয়ার পরে। সেটার কারণ খুঁজতে গিয়ে তনিকা সরকারের লেখায় কিছু পয়েন্টার পেলাম। 

(ডিঃ আমি তনিকা ম্যাডামের পাক্কা ফ্যান হয়ে গেছি, শুরুর দিকে কষ্ট করে বুঝতে হলেও, এরকম ক্ল্যারিটি খুব কম লোকের লেখায় পাই) 

এই পার্সিকিউটেড মানসিকতাটা কোনও ম্যাজিক ট্রিক নয়। বরং, রাইট উইং হিন্দুত্বের নেতৃস্থানীয় লোকজনের জেনুইন সাইকোলজিক্যাল ও পলিটিকাল রিয়েলিটি...

প্রথম ধাপ — আরএসএস এবং বিজেপি-বজরঙ্গ দল-বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেতৃত্ব আর ফুট সোলজারদের আলাদা করে দেখতে হবে। এই ফুট সোলজার আর ভোটারদের পপুলেশনটা যথেষ্ট ডাইভার্স। এদের মধ্যে তথাকথিত নীচু জাতের লোকজন, দলিত, এবং গরীব মানুষও রয়েছে। এই গোষ্ঠীটা কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু। এবার দেখুন সঙ্ঘ পরিবারের অ্যাক্টিভিস্টদের (প্রচারক বা নেতৃত্বকে) - মূলতঃ উঁচু জাতের লোক, মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত। এই ছোট অথচ শক্তিশালী গোষ্ঠীটাই সঙ্ঘের মতাদর্শের পরিচালক। কাজেই, বাস্তব হল, সঙ্ঘ পরিবারের মাথায় বসে থাকা লোকগুলো গোটা হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই একটা ছোট্ট অংশ, সংখ্যার বিচারে ১৫ থেকে ২০ শতাংশের বেশি নয়। এরা যখন সেন্সাসের ডেটার দিকে তাকায়, তখন এদের চোখে ৮০ শতাংশ হিন্দু ধরা পড়ে না, বরং এরা ভাবে যে তাদের নির্দিষ্ট সম্প্রদায়টা খুবই ছোট, আর তাই, তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বড়ই নড়বড়ে...

এরপর দ্বিতীয় ধাপ। শক্তি আর দুর্বলতার চরম স্ববিরোধী পার্সেপশন - যেটা হিন্দুত্ববাদীদের থিওরির মূল পিলার। এরা একদিকে ভাবে - "আমরা রাষ্ট্রশক্তি, অর্থনীতি, এবং পাবলিক ডিসকোর্স নিয়ন্ত্রণ করি। সংখ্যায় আমরা নগণ্য"। আবার এরাই আরেকদিকে ভাবে - "আমরাই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করি, আমাদের অন্যরা (নীচু জাত, দলিত, মুসলমান) ঘিরে ফেলছে"। ইয়ার্কি নয়, ইল্যুশন নয়, এইটাই একটা সংখ্যায় নগণ্য আধিপত্যবাদী গোষ্ঠীর বাস্তব অভিজ্ঞতা - এমন একটা গোষ্ঠী যাদের হাতে সমস্ত ধরণের মেটিরিয়াল পাওয়ার (সম্পদ, শিক্ষা, মিডিয়া) থাকলেও তারা একটা ডেমোগ্রাফিক অ্যাংজাইটিতে ভোগে - পাছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ (গরীব, নীচু জাত, দলিত) তাদের গিলে খেয়ে ফেলে...

তৃতীয় ধাপে ঘটে সবকিছুকে মনোলিথিক স্ট্রাকচার দিয়ে বাকি সমস্ত ন্যারেটিভকে উধাও করে দেওয়ার খেলা - রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে এইটাই আসল ধাপ। হিন্দুত্ববাদীরা মনে করে যে সমস্ত হিন্দুই একটা অখণ্ড গোষ্ঠী এবং তারাই এই গোষ্ঠীর প্রতিনিধি, কাজেই এই জায়গা থেকেই আসে রাম, হনুমান, হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান, এক ভাষা-এক ধর্ম-এক খাদ্যাভ্যাস-এক পোশাক ইত্যাদির ইউনিফর্মিটির দাবিদাওয়া। খুব সুনির্দিষ্টভাবে সমস্ত বৈচিত্রকে মুছে ফেলার প্রক্রিয়া। কারা এই রাজনৈতিক ন্যারেটিভ থেকে উধাও হয়ে যায়? গরীব মানুষ, কারণ রুটিরুজির সমস্যার জায়গা নেয় সাংস্কৃতিক ইস্যুগুলো; নীচু জাত আর দলিত জনগোষ্ঠী, কারণ উঁচুজাতের সমস্ত অত্যাচারের কাহিনী মুছে ফেলা হয়; এলজিবিটি বা ক্যুইয়ার মানুষ, কারণ এই চিন্তাভাবনাটাই "বহিরাগত", পাশ্চাত্য থেকে আমদানি করা; আদিবাসী আর বাস্তুচ্যুত মানুষ, কারণ তাদের ভূমির অধিকার চাপা পড়ে যায় জাতীয় উন্নতির ন্যারেটিভের নীচে। আর, এত রকমের মানুষকে মুছে দিয়ে তাদের জায়গা নেয় "নিপীড়িত হিন্দু" - দলিতদের ওপর উঁচুজাতের অত্যাচারের ন্যারেটিভ বদলে গিয়ে তৈরী হয় "মুসলমানদের চারটে বিয়ে আর দশটা বাচ্চা, ওরা হিন্দুদের ঘিরে ফেলছে; আর, পাশ্চাত্য সংস্কৃতির হাতে হিন্দুরা আক্রান্ত"...

এই ন্যারেটিভ হিন্দুত্ববাদী দলের কর্মীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে চার নম্বর ধাপে। কর্মী বা অ্যাক্টিভিস্টরা বেশিরভাগই উচ্চবর্ণের। তাদের কাছে ওপরের এই ন্যারেটিভটা বলা যায় "লিভড এক্সপিরিয়েন্স" বা বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা। এরা ভাবে - "আমি শিক্ষিত ব্রাহ্মণ, কিন্তু ভারতের জনসংখ্যার মোটে ৪ শতাংশের মধ্যে পড়ি। নীচু জাত আর দলিতেরা যদি মুসলমানদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ফেলে, আমি আমার সর্বস্ব হারাব"। হিন্দুত্ববাদী দলের নেতৃত্ব তাকে বলে - "তুমি মোটেও প্রিভিলেজড শোষক নও, বরং তুমি একজন বীর হিন্দু যোদ্ধা, তোমার হাতেই হিন্দু সভ্যতার রক্ষার ভার রয়েছে"। শ্রেণী বা জাতিগত প্রিভিলেজ হয়ে ওঠে জাতীয় বা ধর্মীয় কর্তব্য।

একদম সহজ ভাষায় উদাহরণ দিয়ে বলি। মনে করুন কোনও এক শহরে, কয়েকটা অত্যন্ত ধনী উচ্চবর্ণের প্রভাবশালী পরিবার থাকে। শহরটা মূলতঃ হিন্দু অধ্যুষিত, ধরা যাক ৮০ শতাংশ মানুষই হিন্দু। আর ওই উচ্চবর্ণের অভিজাত পরিবারগুলো সেই জনসংখ্যার মোটে ১৫ শতাংশ। শহরের সমস্ত ব্যবসাবাণিজ্য, খবরের কাগজ ইত্যাদির মালিকানা রয়েছে এই কয়েকটা পরিবারের হাতেই, তারাই চালায় শহরের মিউনিসিপাল কাউন্সিল। অর্থাৎ, তাদের হাতেই রয়েছে সমস্ত ক্ষমতা। কিন্তু, তারা এও জানে, যে শহরবাসীরা যদি নিজেদের মধ্যে ঝগড়া না করে একজোট হয়ে যায়, আর বুঝে ফেলে যে ওরা সংখ্যায় এই ক্ষমতা ধরে রাখা লোকগুলোর চেয়ে প্রায় নয় গুণ বেশি, তাহলে অচিরেই তাদের হাত থেকে ক্ষমতা সরে যাবে, তাদের নিজেদের অস্তিত্বই টিঁকিয়ে রাখা মুশকিল হবে। সুতরাং, তাদের অবভিয়াস রাজনৈতিক চাল হল "বহিরাগত তত্ত্ব" আমদানি করা - যেমন, পাশের গ্রামের লোকগুলো আমাদের জল চুরি করে নিতে  চাইছে, বা বাইরের শহর থেকে লোকজন এসে আমাদের চাকরি খেয়ে নিচ্ছে...শহরের সংখ্যাগরিষ্ঠ সাধারণ মানুষের নজর এইদিকে আটকে রেখে তাদের ভুলিয়ে দেওয়া যে শহরের আসল ক্ষমতা রয়েছে মুষ্টিমেয় কয়েকটা লোকের হাতেই। আর মজার ব্যাপার হল, এই মুষ্টিমেয় ক্ষমতাবান সত্যিই বিশ্বাস করে যে তারা দুর্বল ও বিপন্ন।

ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের সময় হার্মান গোয়েরিং একটা কথা বলেছিলেন - "Voice or no voice, the people can always be brought to the bidding of the leaders. That is easy. All you have to do is tell them they are being attacked, and denounce the pacifists for lack of patriotism and exposing the country to danger. It works the same in any country."

হিন্দুত্ববাদী চালচলন সবই নাৎসিদের সঙ্গে অক্ষরে অক্ষরে মিলে যায় - শুধু বর্ণ (caste) বদলে যায় জাতিতে (race)। এক্ষেত্রেও কোনও অন্যথা হয়নি...

▪️এইদিকে সমস্ত ক্ষমতা আর ডিসকোর্স নিয়ন্ত্রণ করা অভিজাত উচ্চবর্ণ; ওইদিকে অসন্তুষ্ট পেটি-বুর্জোয়া এবং "ভোল্কিশ' বুদ্ধিজীবী।

▪️এইদিকে ভারতীয় সভ্যতার বিশালত্ব এবং হিন্দু খতরে মে হ্যায়; ওইদিকে জার্মানি হল "হেরেনভোক' (মাস্টার রেস), একই সঙ্গে জার্মানি "উমভোক্ট' (স্লাভিক বা ইহুদীদের দ্বারা দূষিত)।

▪️এইদিকে হিন্দু ঐক্য আর অখণ্ড ভারতের আড়ালে শ্রেণী ও বর্ণসংঘাত চাপা দেওয়া; ওইদিকে "ভোক্‌সগেমাইনশাফট' (জাতিগত সম্প্রদায়)-এর আড়ালে শ্রেণী সংঘাত (শ্রমিক বনাম পুঁজিপতি) চাপা দেওয়া।

▪️এইদিকে দুর্বলতার উৎস হল আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা (সেকুলারিজম, নাস্তিকতা, কমিউনিজম), আর তার সঙ্গে বাইরের আক্রমণ (ইসলাম); ওইদিকেও আভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা (জুডিও-বলশেভিজম) আর বাইরের আক্রমণ (ইংল্যান্ড, ফ্রান্স)।

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটে হিন্দুত্ববাদীদের বক্তব্যগুলো শুনে নিন - দেখবেন খাপে খাপ মিলে যাবে। শুধু, এরা এতটাই অশিক্ষিত যে একইসঙ্গে বলে ফেলে যে পশ্চিমবঙ্গ বাংলাদেশ হয়ে যাবে, আর পশ্চিমবঙ্গের ভাষা হয়ে যাবে ঊর্দু...এদের বাবা, স্বয়ং অ্যাডলফবাবু অবধি, এসব বলদমার্কা কথা শুনলে মিলিটারি বুট ছুঁড়ে মারতেন।

Thursday, April 16, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: দেশভাগ ও নকবা

(৮) শেষ অধ্যায় - দেশভাগ ও নকবা

প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট তখন তার শেষ অবস্থায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, কলোনিয়াল শক্তি হিসেবে একদা পৃথিবী শাসন করা ব্রিটেন প্রায় বিধ্বস্ত - যুদ্ধে জয়ী হয়ে থাকলেও। সেই সময়ে প্যালেস্টাইনের অশান্ত ভূখণ্ড শাসন করার মত প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সদিচ্ছা - কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। আরব বিদ্রোহ চোখে আঙুল দিয়ে ম্যান্ডেটের বাস্তবতা ধরিয়ে দিয়েছিল, পাশাপাশি নাৎসি আমলের "হলোকাস্ট" গোটা বিশ্ব জুড়ে ইহুদীদের পুনর্বাসনের জন্যে প্রবল চাপ তৈরী হয়েছিল ইউরোপের দেশগুলোর ওপরে। ১৯৪৭ সালে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্লান্ত শ্রান্ত ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইনের দায়িত্ব তুলে দেয় নবনির্মিত জাতিসংঘের হাতে। প্রায় ধ্বসে পড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে প্যালেস্টাইন তখন এক অসহনীয় বোঝা।

১৯৪৭ সালের মে মাসে জাতিসংঘ একটি বিশেষ কমিটি তৈরী করে - United Nations Special Committee on Palestine (UNSCOP)। এগারোটা তথাকথিত নিরপেক্ষ দেশের প্রতিনিধিরা প্যালেস্টাইন সফরে আসেন, এবং নানান মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তাদের সাক্ষ্য নিয়ে এই কমিটি দুটো প্রস্তাব জমা দেয় ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্ল্যানে বলা হয়েছিল প্যালেস্টাইনকে ভাগ করে আলাদা আরব আর ইহুদী রাষ্ট্র তৈরী করা, এবং জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখার কথা। সংখ্যালঘিষ্ঠ প্ল্যানে বলা হয়েছিল একই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরব এবং ইহুদীদের স্বশাসিত অঞ্চলের কথা। জিউয়িশ এজেন্সি সংখ্যাগরিষ্ঠ প্ল্যান মেনে নেয়। উল্টোদিকে, আরব হায়ার কমিটি এবং সমস্ত আরব দেশগুলোর সরকার দুটো প্ল্যানই বাতিল করে দেয়। খুব সহজ সরল এবং অকাট্য যুক্তি ছিল তাদের - একটা আরব ভূখণ্ডকে বিভক্ত করার অধিকার কোন বিদেশী শক্তির নেই।

জায়নিস্টরা ঘোরতর লবিয়িং শুরু করে। ১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর, নিউ ইয়র্কের ফ্লাশিং মেডোজে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বসে। শেষ মুহূর্ত অবধি অনিশ্চয়তা থাকলেও, তার আগের কয়েকটা মাসের অবিরাম চাপ আর লবিয়িং জয়ী হয়। প্যালেস্টাইনের বিভাজন সংক্রান্ত জাতিসংঘের ১৮১(২) নম্বর প্রস্তাব পাশ হয় পক্ষে ৩৩ ও বিপক্ষে ১৩টি ভোট নিয়ে। ভোটদানে বিরত থাকেন ১০টি দেশের প্রতিনিধিরা। আরব প্রতিনিধিরা প্রতিবাদে সভা থেকে বেরিয়ে আসেন।

প্রস্তাব অনুযায়ী, প্যালেস্টাইনের ৫৫ শতাংশ জমি দেওয়া হয় ইহুদী রাষ্ট্রকে - ঊর্বর উপকূলীয় সমভূমি, জেজরিল উপত্যকা আর নেগেভের কিছু অংশ ছিল এর মধ্যে। আরবদের হাতে যায় প্যালেস্টাইনের ৪৫ শতাংশ জমি - মূলতঃ মাঝখানের রুক্ষ পাথুরে পাহাড়ি এলাকা, গাজা উপকুল এবং নেগেভের বাকি অংশ। আর, বলা হয় জেরুজালেম থাকবে আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীনে কর্পাস সেপারেটাম বা স্বতন্ত্র সত্ত্বা হিসেবে। বিভাজনের এই শতাংশের হিসেবের সময় একটা জিনিস মাথায় রাখবেন - ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের শেষ দিন অবধি, প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ, এবং তাদের হাতে জমি ছিল গোটা ভূখণ্ডের সাত শতাংশেরও কম। অথচ, বিভাজনের পর, ৩৩ শতাংশ মানুষ পেয়ে যায় মোট জমির ৫৫ শতাংশ, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতে পড়ে থাকে রুক্ষ পাথুরে জমি, এবং শতাংশের হিসেবেও সেটা অনেকটাই কম। বিভাজনের অঙ্কের এই অবিচার একেবারে স্পষ্ট এবং অনস্বীকার্য্য।

গৃহযুদ্ধ (নভেম্বর ১৯৪৭ - মে ১৯৪৮)

জাতিসংঘের ভোটের পরের দিন থেকেই হিংসা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ক্ষিপ্ত আরব জনতা ইহুদী বসতিগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়। ইহুদী মিলিশিয়ারা পালটা আরব অধিবাসীদের ওপর হামলা করে। ব্রিটিশরা সেই সময়ে প্যালেস্টাইন ছাড়তে ব্যস্ত - তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৮ সালের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ।

একদিকে ফৌজি আল-কাউকজির নেতৃত্বে আরব লিবারেশন আর্মি সিরিয়ার দিক থেকে প্যালেস্টাইনে ঢোকে। স্থানীয় প্যালেস্তিনীয় অধিবাসীদের নিয়ে তৈরী অনিয়মিত বাহিনী গ্রাম থেকে গ্রামে লড়াই চালিয়ে যায়। কিন্তু সবই ছিল অনিয়ন্ত্রিত, কোন সেন্ট্রাল কম্যান্ড, বা অস্ত্রাগার, বা প্রশিক্ষিত সংরক্ষিত বাহিনী ছাড়াই।

অন্যদিকে, জায়নিস্টরা তখন পুরোদস্তুর প্রস্তুত। হাগানাহ্‌ বেশ কিছুদিন ধরেই এই মুহূর্তের জন্যে নিজেদের তৈরী করছিল। ব্রিটিশদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে, চোরাচালানের মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র যোগাড় করে, এবং ১৯৩৬-৩৯ সালের আরব বিদ্রোহের অভিজ্ঞতার নিরিখে হাগানাহ্‌ তখন সুশৃঙ্খল আধুনিক যুদ্ধশক্তি। পালমাচ (স্ট্রাইক ফোর্স)-এর হাতে তখন মোবাইল ওয়ারফেয়ার বা চলমান যুদ্ধের জন্যে প্রশিক্ষিত অভিজাত বাহিনীও ছিল। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে, হাগানাহ্‌ হাই কম্যান্ড কৌশলগতভাবে সড়ক, পাহাড়ের চূড়া, আর মিশ্র শহরগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্লুপ্রিন্ট প্ল্যান ডালে (প্ল্যান ডি) চূড়ান্ত করে ফেলে। পরবর্তীকালে প্রকাশিত বিভিন্ন দলিল থেকে জানা যায় যে প্ল্যান ডি বাস্তবে ছিল ইহুদীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত এলাকা থেকে আরব জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বিতারণের নকশা।

এর পরেই ঘটে যায় ডের ইয়াসিনের ঘটনা।

১৯৪৮ সালের ৯ই এপ্রিল - ইরগুন আর লেহী জঙ্গিরা জেরুজালেমের অদূরে অবস্থিত ছোট্ট একটা গ্রাম - ডের ইয়াসিনে হামলা করে। অন্তত ১০৭ জন আরব অধিবাসীকে খুন করা হয় - বাদ যায় না নারী ও শিশুরাও। অনেক ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী সংখ্যাটা আড়াইশোও হতে পারে। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে এই ঘটনা সম্পর্কে লেখা হয় “massacre of a particularly atrocious nature...”

জায়নিস্ট জঙ্গিরা মৃতদের দেহ নিয়ে জেরুজালেমের রাজপথ প্রদক্ষিণ করে। ডের ইয়াসিনের ঘটনার খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে গোটা প্যালেস্টাইনে। প্রায় প্রতিটা গ্রামে চরম আতঙ্কের পরিবেশ তৈরী হয়। হাজারো মানুষ প্রাণের ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। এই পুরো সময়টা জুড়েই প্রায় বিশৃঙ্খলার মধ্যে থাকা আরব নেতৃত্ব এই এক্সোডাস ঠেকাতে ব্যর্থ হন। যারা প্রাণে বেঁচে যায়, তাদের কাছে ডের ইয়াসিন হয়ে ওঠে আসন্ন “নাকবা” বা মহাবিপর্যয়ের প্রতীক।

আজকের ইজরায়েল ডের ইয়াসিনকে ধামাচাপা দিতে প্রায় সফল হয়ে গিয়ে থাকলেও এই ঘটনা সেই সময়ের বিশ্ববাসীর নজর এড়ায়নি। এমনকী, ইহুদীদেরও নয়। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর, নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটা চিঠি ছাপা হয় যেটা সারা পৃথিবীতে, বিশেষ করে জায়নিস্টদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন তৈরী করেছিল। চিঠিতে সই করেছিলেন আঠাশজন বিশিষ্ট ইহুদী বুদ্ধিজীবী, যাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বয়ং অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, এবং দার্শনিক হানা আরেন্ডট। সদ্য তৈরী ইজরায়েল রাষ্ট্রের উগ্র জাতীয়তাবাদী হেরুট (যে কথাটার মানে স্বাধীনতা) দলের নেতা মেনাখেম বেগিন সেই সময়ে যুক্ত্ররাষ্ট্র সফরে এসেছিলেন তাঁর দলের জন্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন আদায় করতে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের চিঠি ছিল সেই বেগিনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ। স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয়েছিল যে হেরুট আসলে ইরগুনের রাজনৈতিক উত্তরসূরী, আর ডের ইয়াসিনের হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল এই ইরগুনই; এবং বেগিনের দল তাদের সংগঠন, রাজনৈতিক দর্শন আর সামাজিক আবেদনের দিক থেকে একেবারেই নাৎসিদের মিরর ইমেজ যারা উগ্র জাতীয়তাবাদ আর জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার করে। কিন্তু সেই ১৯৪৮ এর জানুয়ারি মাসেই, ইজরায়েল রাষ্ট্রের জন্যে ফান্ড রেইজিং-এর উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসেছিলেন বেন গুরিয়নের মেইনস্ট্রিম জায়নিস্ট লেবার পার্টির গোল্ডা মেয়ার। এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত চিঠি বেন গুরিয়নের জায়নিস্ট সরকারের চালিয়ে আসা এথনিক ক্লেনসিং সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব ছিল, কারণ স্বাক্ষরকারীদের অধিকাংশই ছিলেন বেন গুরিয়নপন্থী মেইনস্ট্রীম জায়নিস্ট। ইতিহাস বলে, বেন গুরিয়ন বিভিন্ন সময়ে তাঁর ডায়েরিতে এথনিক ক্লেনসিং-এর স্বপক্ষে নানান কথা লিখেছেন, যেমন ১৯৩৭ সালের লেখা পাওয়া যায় - “We must expel Arabs and take their places... and if we have to use force”, বা জাতিসংঘের পার্টিশন প্ল্যানের সময়ে লেখা - “The borders will be determined by force”, অথবা লিদ্দা আর রামলা দখলের আগে - “We must do everything to insure they never do return”...গুরিয়নের জ্ঞাতসারে ১৯৩০ সাল থেকেই তৈরী করা হচ্ছিল “ভিলেজ ফাইলস” - প্যালেস্টাইনের প্রতিটি গ্রামের পুঙ্খানুপুঙ্খ নকশা, সেখানকার মানুষজনের সমস্ত খবরাখবর - এথনিক ক্লেনসিং-এর সময়ে যার ব্যবহার করেছিল ইজরায়েলি সেনারা। গোল্ডা মেয়ার, যিনি সেই সফরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছিলেন যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্যে, ছিলেন বেন গুরিয়নের একেবারে কাছের বৃত্তের একজন সিনিয়র সদস্য যিনি পরবর্তীকালে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন, ১৯৬৯ সালের এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন - “There was no such thing as Palestinians... They did not exist”...বেগিন এবং বেন গুরিয়নের মধ্যে তফাত ছিল শুধুমাত্র প্রেজেন্টেশনে; বাস্তবে উভয়েরই চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এমন একটা ইহুদি রাষ্ট্র, যেখানে আরবদের উপস্থিতি থাকবে যথাসম্ভব নগণ্য। বেগিন ছিলেন প্রকাশ্যেই সহিংস; অন্যদিকে বেন গুরিয়ন ও মেয়ার ছিলেন “ডিপ্লোম্যাটিক”, নিজেদের এথনিক ক্লেনসিং-এর পরিকল্পনাকে “আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ” হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনেক বেশি দক্ষ। আইনস্টাইন ও হানা আরেন্ডট-স্বাক্ষরিত চিঠিটা, তার সমস্ত নৈতিক আবেগ ও উদ্দীপনায়, বেগিনের ফ্যাসিবাদী রীতির তীব্র নিন্দা জানালেও, মূলধারার বেন গুরিয়ন সরকারের এথনিক ক্লেনসিং সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব থেকে গেছিল। ন্যাশনাল সিকিউরিটির রিয়েলপলিটিকের তলায় চাপা পড়ে গেছিল বিতাড়িত প্যালেস্তিনীয়দের দীর্ঘশ্বাস।

ব্রিটিশ উইথড্রয়াল এবং ইজরায়েলি ডিক্লারেশন (১৪-১৫ই মে, ১৯৪৮)

১৯৪৮ সালের ১৪ই মে, শেষ ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার অ্যালান কানিংহাম জেরুজালেম ছেড়ে ফিরে যান। হাইফায় নামিয়ে ফেলা হয় “ইউনিয়ন জ্যাক”। শেষ হয় ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের শাসন। সেইদিনই বিকেলে, তেল আভিভ মিউজিয়ামে ডেভিড বেন-গুরিয়ন “জিউয়িশ পিপলস কাউন্সিল”-এর সামনে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। জন্ম নেয় ইজরায়েল রাষ্ট্র। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এই রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। পরদিন সকালে, অর্থাৎ ১৫ই মে, পাঁচটি আরব দেশের সেনাবাহিনী - মিশর, ট্রান্সজর্ডান, সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাক - প্যালেস্টাইনের সীমান্ত অতিক্রম করে। সৌদি আরবও মিশরীয় কমান্ডের অধীনে সেনা পাঠায়। আরব লীগ এই পদক্ষেপকে প্যালেস্তিনীয় আরবদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে। শুরু হয় ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ।

যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতি (মে ১৯৪৮ - জুলাই ১৯৪৯)

কাগজে কলমে আরব বাহিনী ছিল বিশাল। ইজিপ্ট পাঠিয়েছিল দশ হাজার সৈন্য, ইরাক পনেরো হাজার, সিরিয়া সাত হাজার, লেবানন দুই হাজার, আর ট্রান্সজর্ডানের আট হাজার সৈন্যের আরব লিজিয়ন এর মধ্যে ছিল সবচেয়ে প্রশিক্ষিত বাহিনী। হাগানাহ্‌, যার নাম এই সময়ে বদলে হয়েছে ইজরায়েলই ডিফেন্স ফোর্সেস বা আইডিএফ, তাদের হাতে শুরুতে ছিল পঁয়ত্রিশ হাজার সৈন্য, বছর শেষে যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক লক্ষে।

কিন্তু আরবদের পারস্পরিক সমন্বয় ছিল শোচনীয়। ট্রান্সজর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ্‌ সেই সময়েই জিউয়িশ এজেন্সির সঙ্গে গোপনে আলোচনা চালাচ্ছিলেন যাতে কোনোভাবে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক তাঁর হাতে এসে যায়। ইজিপ্ট সৈন্য পাঠালেও আবদুল্লাহর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছা তাদের ছিল না। ইরাক আর সিরিয়ার নিজেদেরও আলাদা উদ্দেশ্য ছিল। আরবদের মধ্যে সেন্ট্রাল কম্যান্ড বলে কিছু ছিল না তখনও। এবং পরেও, বলা ভালো চিরকালই, আরব রাষ্ট্রের শাসকেরা - বিভিন্ন রাজপরিবারের সদস্যরা - প্যালেস্টাইনকে শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থেই কুমীরছানার মত ব্যবহার করে এসেছে। সেদিনও যা ছিল, আজও তাই... 

যুদ্ধের কথায় ফিরি। যুদ্ধটা হয় কয়েকটা ধাপে। শুরুতে আরব সেনাবাহিনী খানিক এগিয়ে যায় - দখল করে পূর্ব জেরুজালেম, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক আর নেগেভের খানিকটা। জুন মাসে, মাসখানেকের যুদ্ধবিরতির পর, আইডিএফ প্রত্যাঘাত করে। জুলাই মাসে অপারেশন দানি-তে দখল হয় লিদ্দা আর রামলা। বিতাড়িত হয় সেখানকার আরব অধিবাসীরা। অক্টোবরে অপারেশন ইয়োভে আইডিএফ ইজিপ্টের ডিফেন্স লাইন ভেঙে দখল করে নেগেভ। ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি নাগাদ পূর্বতন ম্যান্ডেট এলাকার বেশিরভাগ অংশই চলে আসে ইজরায়েলের হাতে। 

১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মাঝের সময়ে বিভিন্ন পক্ষের পক্ষে পারস্পরিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়ে যায়। ইজরায়েল ততদিনে ব্রিটিশ শাসিত ম্যান্ডেটরি প্যালস্টাইনের ৭৮ শতাংশ এলাকা দখলে এনে ফেলেছে - জাতিসংঘের পার্টিশন প্ল্যানের চেয়ে অনেকটাই বেশি। ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক আর পূর্ব জেরুজালেম জর্ডানের সাথে যুক্ত করে নেওয়া হয়। গাজা ভূখণ্ড চলে যায় ইজিপ্টের সামরিক প্রশাসনের হাতে। প্যালেস্তিনীয়দের ভাগে থাকে শূন্য।

নকবা (মহাবিপর্যয়)

চরম মূল্য চোকাতে হয় প্যালেস্তিনীয়দের। প্রায় সাত বা সাড়ে সাত লক্ষ প্যালেস্তিনীয় আরব - তৎকালীন ম্যান্ডেটরি প্যালেস্টাইনের আরব জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, বা নিজের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়। ভরে ওঠে গাজা, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, জর্ডন, লেবানন আর সিরিয়ার রিফিউজি ক্যাম্পগুলো। আজও, সেই পরিবারের উত্তরসূরীরা রয়ে গেছেন এই রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতেই...তাদের নিজস্ব মাটিতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি আজও। লক্ষাধিক প্যালেস্তিনীয় গ্রামবাসীকে দেশের মধ্যেই রিফিউজি হতে হয়েছিল, যাঁরা কোনওদিন নিজেদের গ্রামে আর ফিরতে পারেননি।

ইজয়ায়েলের হাতে ধ্বংস হয়েছিল প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ প্যালেস্তিনীয় গ্রাম। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সমস্ত ঘরবাড়ি। বাইরে থেকে এনে বসানো হয়েছিল ইহুদী অভিবাসীদের। মানচিত্রে মুছে দেওয়া হয়েছিল আরবী নামগুলো। বদলে এসেছিল হিব্রু নাম...ভূখণ্ড থেকে তার পূর্বতন অধিবাসীদের সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে। পুরো ঘটনার মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিণতি ছিল মর্মান্তিক, আজও তার বদল হয়নি। নকবা - যার মানে “মহাবিপর্যয়” বা “catastrophe” - ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে, যখন যুদ্ধ চলছে, সেই সময়েই প্রথমবার শব্দটাকে ব্যবহার করেছিলেন সিরিয়ার ঐতিহাসিক কনস্ট্যান্টাইন জুরেইক - আজকের দিনে শুধুমাত্র ভিটেমাটি হারানোকে বোঝায় না। নকবার মানে আজ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে একটা সমাজের ধ্বংসের সঙ্গে, স্বাধীনতার স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে, এবং আজও অমীমাংসিত এক শরণার্থী সমস্যার সঙ্গে।

ইজরায়েলিদের কাছে ১৯৪৮ সাল ছিল “স্বাধীনতা যুদ্ধ” - প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে ছিনিয়ে আনা এক অলৌকিক বিজয়। অন্য দিকে, প্যালেস্তিনীয়দের কাছে ১৯৪৮ মানে “নকবা” - এক গভীর মানসিক ক্ষত বা ট্রমা, যে ক্ষত আজও তাদের পরিচয়, তাদের রাজনীতি আর তাদের স্মৃতির সংজ্ঞা। দুই জাতি - একটাই ভূখণ্ড - কিন্তু দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত ইতিহাস।

ম্যান্ডেটের লাভক্ষতির খতিয়ান

১৯২২ সালে, প্যালেস্টাইনে ম্যান্ডেট ব্যবস্থা যখন শুরু হয়, প্যালেস্তিনীয় জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি ছিল আরব - আর, তারা শুধু মুসলমান ধর্মাবলম্বীই ছিল না। ম্যান্ডেট ব্যবস্থা যখন শেষ হয়, ১৯৪৮ সালে, দেশ হারানোর পর তাদের হাতে তাদের ছিল শূন্য। ব্রিটিশরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এক “সেক্রেড ট্রাস্ট”-এর, অধিবাসীদের স্বশাসনের জন্যে প্রস্তুত করে তোলার উদ্দেশ্যে। বাস্তবে তাদের তত্ত্বাবধানেই, তিরিশ বছর ধরে ক্রমাগত চলেছিল জমি আর বাস্তুভিটে হারানো, ডেমোগ্রাফির বদল, আর শেষ অবধি এথনিক ক্লেনসিং-এর প্রক্রিয়া...

তিনটে প্রতিশ্রুতির কথা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম - হুসেইন-ম্যাকমাহন চুক্তি, ব্রিটিশ ও ফরাসীদের মধ্যে সাইকস-পিকট চুক্তি, আর ব্যালফোর ডিক্লারেশন। ম্যান্ডেটের শেষ পর্বে এই তিন চুক্তি এক জায়গায় এসে পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা মারল। আরবরা পরাজিত হল। ফরাসী ও ব্রিটিশরা বিদায় নিলো। জায়নিস্টরা তাদের অভীষ্ট রাষ্ট্র পেল। আর প্যালেস্তিনীয়রা পরিণত হল এক দেশহীন জাতিতে।

আর্চিবল্ড ওয়াভেলের যে কথাগুলো এর আগে একবার লিখেছিলাম - “After 'the war to end war' they seem to have been pretty much successful in Paris at making a 'Peace to end Peace” - খুঁজে পেল তিক্ত পরিণতি। প্যারিস আর সান রেমোর শান্তিচুক্তি, লন্ডন আর আরব মরুভূমির মাটিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, এবং যে ম্যান্ডেটের কথা ছিল সভ্যতাকে পথ দেখিয়ে আনার - সবাই, একত্রে, মধ্যপ্রাচ্যের মাটিকে ঠেলে দিয়েছিল ১৯৪৮ সালের এই বিপর্যয়ের পথে।

আজও যে ক্ষত দগদগে ঘা হিসেবেই থেকে গেছে...

==================================== 

শেষ হল মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন। ১৯০৮ সালের তেল আবিষ্কার থেকে ১৯৪৮ সালের নকবা অবধি আরব-ইজরায়েল সংঘর্ষের উৎসের সন্ধানে এই লেখা। এর পরের কথা - ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ, ইজরায়েলি অকুপেশন, অসলো চুক্তি, ইন্তিফাদা, গাজার যুদ্ধ - অন্য কোন সময়ে লিখব, যদি পারি।

যে সমস্ত সূত্রের সাহায্য নিয়েছি, তাদের একটা তালিকা দিলাম।

(১)  Palestine and the Arab Israeli Conflict, Charles D. Smith
(২) The Hundred Year’s War on Palestine, Rashid Khalidi
(৩) The Ethnic Cleansing of Palestine, Ilan Pappe
(৪) One Palestine, Complete, Tom Segev

Thursday, April 02, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: আরব বিদ্রোহ (১৯৩৬-১৯৩৯)

(৭) আরব বিদ্রোহ (১৯৩৬-১৯৩৯)

১৫ই এপ্রিল, ১৯৩৬ এর রাত - আল কাসামের গেরিলা বাহিনী নাবলুস আর তুলকার্মের মধ্যে রাস্তায় একটা গাড়ির ওপর হামলা করে, গুলির আঘাতে মারা যায় দুজন ইহুদী ড্রাইভার। প্রতিশোধ হিসেবে, পরের দিন সন্ধ্যেবেলা, ইরগুনের বন্দুকধারীরা পেতাহ্‌ টিকভার কাছে এক কুঁড়েঘরে আক্রমণ করে দুজন আরব চাষিকে খুন করে। হিংসা ছড়াতে থাকে। ঠিক চার দিনের মাথায়, ১৯শে এপ্রিল, আরব জনতা জাফায় ইহুদী বসতির ওপর হামলা করে। ব্রিটিশ সেনা আরব নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে, আর আরব গ্রামগুলোকে সমষ্টিগতভাবে জরিমানা করে। 

এই ঘটনার এক অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ২৫শে এপ্রিল, প্যালেস্টাইনের ছ'টা রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকেই একজোট হয়ে তৈরী করে এক যৌথ কাঠামোর - আরব হায়ার কমিটি - যার শীর্ষে ছিলেন জেরুজালেমের মুফতি, হজ আমিন আল হুসেইনি। কমিটি অনির্দিষ্টকালের জন্যে হরতালের ডাক দেয় - সমস্ত দোকানপাট, চাষের কাজ, কারখানা, যোগাযোগ ব্যবস্থা - সব বন্ধ থাকবে যতদিন না ব্রিটিশরা তিনটে দাবী মেনে নিচ্ছে - ইহুদী অভিবাসন বন্ধ, ইহুদীদের কাছে জমি বিক্রি বেআইনি করা, আর আরব স্বাধীনতা।

প্রথম পর্যায়ঃ হরতাল ও বিদ্রোহের শুরু (এপ্রিল ১৯৩৬ - জুলাই ১৯৩৭)

হরতাল শুরু হয় ৮ই মে - আর শুরু থেকেই একেবারে সর্বাত্মক। সমস্ত আরব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ট্যাক্সি বন্ধ থাকে। ছাত্ররা স্কুল বয়কটের ডাক দেয়। অর্থনীতির চাকা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। পাশাপাশি, গ্রামাঞ্চলে, আরব গেরিলা বাহিনী, অনেকসময়েই যাদের সামনে ছিল প্রাক্তন অটোমান অফিসাররা, একসঙ্গে আক্রমণ শুরু করে প্যালেস্টাইনকে বাদবাকি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে রাখা পাইপলাইন, ব্রিজ আর রেলওয়ে লাইনের ওপর। হরতাল মেটাতে ব্রিটিশরা জোরকদমে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায়। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি, প্যালেস্টাইনে প্রায় ২০০০০ ব্রিটিশ সৈন্য নামানো হয় - দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝে অন্যতম বড় সেনা মোতায়েন। গ্রামকে গ্রাম জুড়ে সমবেত শাস্তি - জরিমানা, ফলের বাগান তছনছ করে দেওয়া, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া - আজকের বুলডোজার ট্রিটমেন্টের সঙ্গে কী মিল, তাই না? সন্দেহ হওয়া মাত্রই বিনা বিচারে গ্রেপ্তার, জেলের ভিতরে অত্যাচার - সবই চলতে থাকে নির্বিচারে। ব্রিটিশ সেনা আর এক অর্ধউন্মাদ ক্যাপ্টেন অর্ডে উইনগেটের নেতৃত্বে ব্রিটিশ এবং ইহুদী প্যারামিলিটারি "স্পেশ্যাল নাইট স্কোয়াড"-এর রাতবিরেতের আচমকা হামলায় চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে গ্রামবাসীরা।

ওই বছরের অক্টোবর মাসে, ক্লান্ত আরব হায়ার কমিটি এবং অত্যাচারে জর্জরিত প্যালেস্টাইনের অধিবাসীরা অন্যান্য আরব দেশের রাজাদের কয়েকজনের অনুরোধে (যেমন, ইরাকের রাজা গাজি, সৌদির রাজা আবদুলআজিজ - এইটা নিয়ে পরে লেখা যাবে, কীভাবে বাকি আরব দেশগুলোর শাসকেরা প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার দাবীকে চিরকাল কুমীরছানা হিসেবে দেখিয়ে এসেছে নিজেদের স্বার্থে) হরতাল তুলে নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের তৈরী আরও একটা তদন্ত কমিশন - পিল কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়।


পিল কমিশন এবং পার্টিশন (জুলাই ১৯৩৭)

বিদ্রোহের কারণ খুঁজতে পিল কমিশন হাজির হয় প্যালেস্টাইনে। জুলাই মাসে তারা রিপোর্ট পেশ করে - সাড়াজাগানো সুপারিশ সহ - যেখানে বলা হয় প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, এবং এই অচলাবস্থা থেকে বেরোনোর একমাত্র উপায় প্যালেস্টাইন ভূখণ্ডের বিভাজন - একটা স্বতন্ত্র ইহুদী রাষ্ট্র, ট্রান্সজর্ডানের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মত একটা আরব রাষ্ট্র, এবং জেরুজালেম থেকে জাফা অবধি ব্রিটিশ অধীনস্থ করিডর। পিল কমিশনের প্ল্যানে প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর উপকুল অঞ্চলের জমি, জিজরিল উপত্যকা, আর গ্যালিলি - অর্থাৎ প্যালেস্টাইনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ২০ শতাংশ দেওয়া হয় ইহুদী রাষ্ট্রকে, আর আরব রাষ্ট্রের ভাগে পড়ে মধ্য প্যালেস্টাইনের পাথুরে অনুর্বর উঁচু জমি আর নেগেভ মরুভূমি। এও বলা হয় যে ইহুদী রাষ্ট্রের ভাগে পড়া জমিতে বসবাস করা দুই লক্ষেরও বেশি আরবকে "স্থানান্তর" করা হবে, বেসিক্যালি "জবরদস্তি উচ্ছেদ"-এর ভদ্রভাষা (সুন্দর পরিকল্পনা - ব্রিটিশ নিরপেক্ষতার পরাকাষ্ঠা একেবারে)। 

অনেক তর্কাতর্কির শেষে, জায়নিস্ট কংগ্রেস ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের স্টেপিং স্টোন হিসেবে, এই পরিকল্পনা মেনে নেয়। আরব হায়ার কমিটি এবং বাকি সমস্ত আরব সরকার এক কথায় পিল কমিশনের রেকমেন্ডেশন প্রত্যাখ্যান করে। তাদের ভাষায় — অবিভেজ্য আরব ভূখণ্ডকে টুকরো করার অধিকার কোন বিদেশী শক্তির নেই।


দ্বিতীয় পর্যায়ঃ বিদ্রোহ, অত্যাচার এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব

পিল কমিশনের রিপোর্টের পর বিদ্রোহের আগুন দ্বিগুণ জোরে জ্বলে ওঠে। ১৯৩৭ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর আরব বিদ্রোহীরা গ্যালিলির ব্রিটিশ ডিসট্রিক্ট কমিশনার লিউইস অ্যানড্রুজকে হত্যা করে। উত্তরে ব্রিটিশ সরকার আরব হায়ার কমিটি ভেঙে দেয়, আর আরব নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে সেশেলসে নির্বাসন দেয়। হজ আমিন আল হুসেইনি দেশ ছেড়ে লেবাননে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকেই বিদ্রোহ পরিচালনা করতে থাকেন।

বাকি গেরিলা দলগুলো লড়াই চালিয়ে গেলেও ডিসিপ্লিনের অভাবে ক্রমশঃ ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে থাকে। ব্রিটিশরা আরও শক্তি নিয়ে বিদ্রোহ দমনে ঝাঁপায়। ইহুদী বসতিগুলো থেকে লোকজন নিয়ে জিউয়িশ সেটলমেন্ট পুলিশ ফোর্স তৈরী করে ব্রিটিশরা। তারাই এদের ট্রেনিং, অস্ত্র, ইউনিফর্ম দিয়ে পুরোদস্তুর মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলে। ১৯৩৯ সাল নাগাদ, প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার ইহুদী এই অফিশিয়াল এবং লিগালাইজড হাগানাহ্‌-তে যুক্ত হয়ে যায়। আগে বলা সেই স্পেশ্যাল নাইট স্কোয়াডও আগের মতই তাদের নৃশংস দমননীতি চালিয়ে যেতে থাকে - গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করা, নির্বিচারে বিনা প্রমাণে সামান্যতম সন্দেহেই আরবদের খুন করা...

তবে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরব বিদ্রোহ ভিতর থেকেই ভাঙতে শুরু করে। ব্রিটিশরা তাদের চিরাচরিত ডিভাইড অ্যান্ড রুল ট্যাকটিক্স অনুযায়ী, হুসেইনি পরিবারের বিরোধী নাশাশিবী গোষ্ঠীর আরবদের মদত দিয়ে শান্তিবাহিনী তৈরী করে - এই শান্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ, বাস্তবে আরবদের মধ্যেকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, ভয়ঙ্কর চেহারা নেয়। দুর্নীতি, দস্যুতা ছড়িয়ে পড়ে। অন্তর্দ্বন্দ্বে মারা যায় প্রায় ১২০০ আরব, বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে ব্রিটিশদের হাতে নিহতের সংখ্যার চেয়ে বেশি। 


১৯৩৯ সালের হোয়াইট পেপার এবং বিদ্রোহের শেষ

এরই মধ্যে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজনা বেজে ওঠে। সেই অবস্থায় ব্রিটিশরা আরব দুনিয়াকে শান্ত করার চেষ্টায় ১৯৩৯ সালের মে মাসে একটা নতুন নীতি ঘোষণা করে - ইতিহাসে যেটা ম্যাকডোনাল্ড হোয়াইট পেপার নামে পরিচিত। এই হোয়াইট পেপারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে - (১) ব্রিটিশ সরকার দশ বছরের মধ্যে স্বাধীন প্যালেস্টাইন প্রতিষ্ঠা করবে, (২) পরবর্তী পাঁচ বছরে ইহুদী অভিবাসনের সংখ্যা ৭৫ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে, এবং তারপর অভিবাসন নির্ভর করবে আরব সম্মতির ওপরে, আর, (৩) ইহুদীদের কাছে জমি বিক্রির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ চাপানো হবে।

ম্যাকডোনাল্ড হোয়াইট পেপার আর ব্যালফোর ডিক্লারেশনের মধ্যে প্রায় ১৮০ ডিগ্রীর তফাত - সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী যাকে বলা যায়। জায়নিস্টরা স্বাভাবিকভাবেই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়, আর একে ব্রিটিশদের বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করে। উল্টোদিকে, আরবরা পুরোপুরি খুশী না হলেও (আরব দাবী ছিল অবিলম্বে স্বাধীনতা আর ইহুদী অভিবাসন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা), মোটের ওপর এই প্ল্যান মেনে নেয়। ১৯৩৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে শান্ত হয়ে আসে আরব বিদ্রোহ।


বিদ্রোহের জমাখরচের হিসেব

আরব বিদ্রোহে হিউম্যান ক্যাজুয়ালটির হিসেবটা চমকপ্রদ। আরবদের মধ্যে মারা যায় প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ (যার মধ্যে ব্রিটিশ এবং ইহুদী মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে মারা গেছিল ৩৮৩২ জন, আর গোষ্ঠী সংঘর্ষে প্রায় ১২০০ জন), আহত অন্তত পনেরো হাজার, গ্রেপ্তার বারো হাজারের ওপর যার মধ্যে ১০৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ইহুদীদের মধ্যে কয়েকশো লোক মারা যায়, মূলতঃ আরবদের সঙ্গে লড়াইয়ে। ব্রিটিশদের মধ্যে নিহদের সংখ্যা ২৬২।

সংখ্যাতত্ত্ব ছেড়ে দিলেও, আরব বিদ্রোহের ফলে আমূল বদলে গিয়েছিল প্যালেস্টাইনের সমাজ। আরবদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রায় সকলেই হয় নির্বাসিত হয়েছিলেন, নয়তো বন্দী হয়েছিলেন জেলে। অর্থনীতি ধ্বসে গিয়েছিল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রচণ্ড অত্যাচারে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে, প্যালেস্টাইনের আরবরা জায়নিস্ট কলোনাইজেশনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরী করার মত অবস্থায় ছিল না। 

বরং, জায়নিস্টদের কাছে, এই আরব বিদ্রোহের সময়টা ট্রেনিং এর সময় হয়ে দাঁড়ায়। হাগানাহ্‌ এই সময়েই পোক্ত হয়ে উঠেছিল - ব্রিটিশদের কাছ থেকে ট্রেনিং আর অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ পেয়ে। প্যালেস্টাইনে বসবাস করা ইহুদীরা - যাদের বলা হয় য়িশুভ – তাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়েছিল যে শক্তির মাধ্যমেই প্যালেস্টাইনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ১৯৪৫ সালে যখন বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়, তখন চূড়ান্ত সংঘাতের স্টেজ তৈরী কার্যত শেষ।

ব্রিটিশরা এই বিদ্রোহের সময় বুঝে যায় যে প্যালেস্টাইন শাসন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। বিশের দশকের প্যালেস্টিনীয় ম্যান্ডেট তাদের কাছে একটা ফাঁদ হয়ে উঠেছিল। এই বিদ্রোহের কয়েক বছরের মধ্যেই ব্রিটিশরা এই দায় ঝেড়ে ফেলবে। যে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার দায়িত্ব তারা নিয়েছিল, সেই দুই পক্ষই যুদ্ধে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়াবে - ম্যান্ডেটের অনিবার্য পরিণতি - “After 'the war to end war' they seem to have been pretty much successful in Paris at making a 'Peace to end Peace'” - আর্চিবল্ড ওয়াভেল যে কথাটা বলেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর।


Wednesday, March 25, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: রক্তক্ষয়ের শুরু

এই পর্ব শুরু করার আগে একটা কথা স্পষ্ট করে বলে নেওয়া ভালো। প্যালেস্টাইনে আরব এবং ইহুদীদের সম্পর্ক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর আগে অবধিও এত জটিল ছিল না। বরং বিংশ শতকের গোড়া অবধি আরব মুসলমান এবং প্যালেস্তিনীয় ইহুদীরা পাশাপাশিই ঘর বেঁধে থেকেছে, তাদের মধ্যে ধর্মীয় আদানপ্রদানও চালু প্র্যাকটিস ছিল। যে নবী মুসা উৎসবের কথা বলে এই রক্তক্ষয়ের পর্ব শুরু করব, সেই নবী মুসা উৎসব বিশ্বযুদ্ধের আগে অবধি সকলে একসঙ্গেই পালন করেছে, বস্তুতঃ ক্রিশ্চান ইস্টার উৎসবের সঙ্গে মিশে গিয়ে। ইহুদী এলাকায় ইহুদীদের পুরিম উৎসব একসঙ্গে পালন করত ক্রিশ্চান আর মুসলমান তরুণরাও - অটোমান নাগরিক হিসেবে। গোটা ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় চলতি প্র্যাকটিস এরকমই সিঙ্ক্রেটাইজেশনের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছিল। সব বদলাতে শুরু করে জায়নিস্ট ধ্যানধারণার প্রচলনের সময় থেকে। ইউরোপীয় নেশন স্টেটের ধাঁচে কোন এক বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক সময়কে সামনে রেখে জায়নিস্টরা প্যালেস্টাইনেই নিজেদের নেশন স্টেট তৈরীর দাবী তোলে, এবং বিভিন্ন কলোনিয়াল শক্তির প্রশ্রয়ে জায়নিস্টদের কাজকর্মের (সংগঠিত অভিবাসন, ঢালাও জমি কিনে আরবদের বাস্তুচ্যুত করা, রাজনৈতিক উত্থান এবং আরবদের প্রতিস্থাপিত করে ইহুদী নেশন স্টেট তৈরীর প্রকাশ্য ঘোষণা) ফলে আগের সহাবস্থান বদলে যায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম চাপা উত্তেজনায়। তারপরের ঘটনা লিখব এবারে...

[সোনালি অতীতকে সামনে রেখে সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় চিন্তাধারার ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদের উত্থানের গল্পটা ভারতেও খানিকটা একই ধাঁচের। আশা করি এই সিমিলারিটিগুলো সকলে খেয়াল করতে পারছেন।] 

(৬) রক্তক্ষয়ের শুরুর দিনগুলোঃ ১৯২০ – ১৯৩৫

ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের এক বছরও হয়নি তখনো - প্যালেস্টাইনে প্রথমবার রক্ত ঝরতে শুরু করে ১৯২০ সালের এপ্রিলে, জেরুজালেমে নবী মুসা উৎসবের দিন। আরবদের জমায়েতে স্বাধীন প্যালেস্টাইনের স্লোগান ওঠে, ভিড়ের সঙ্গে আচমকাই ইহুদী পথচারীদের হাতাহাতি শুরু হয়। ছোটখাটো একটা ব্রিটিশ গ্যারিসন - লোকের অভাবে বা সাহসের অভাবে - বেকুবের মত দাঁড়িয়ে থাকে। গণ্ডগোলের শেষে দেখা যায় পাঁচজন ইহুদীর মৃত্যু হয়েছে, দুশোর ওপর লোক আহত। আকস্মিক এই হিংসার ঘটনায় স্তম্ভিত দুই সম্প্রদায়ই বুঝতে পারে ম্যান্ডেটের মধ্যে দিয়ে শান্তি ও স্বাধীনতা আসবে, এমন আশা দুরাশা মাত্র।

জায়নিস্ট নেতৃত্বের কাছে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে যায় - আরবরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের জমির ওপর জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম তৈরীর সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। তারা নিজেদের পালটা জঙ্গি সংগঠন আর সামরিক প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা তৈরী করতে শুরু করে। সেই বছরই, জুন মাসে, তৈরী হয় হাগানাহ্‌, জিউয়িশ আন্ডারগ্রাউন্ড ডিফেন্স ফোর্স - যারা গোপনে সামরিক মহড়া আর চোরাই অস্ত্র যোগাড় করে পরের সংঘাতের জন্যে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে।

আরবদের কাছে জেরুজালেমের ঘটনা একটা ওয়ার্নিং হয়ে দাঁড়ায়। আরব স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার হাজারে হাজারে ইহুদী অভিবাসীকে প্যালেস্টাইনে এসে আরব জমিতে বসতি বানাতে দেওয়া, এবং যে কোনও প্রতিবাদের শাস্তি হিসেবে আরবদের জেল বা সমষ্টিগতভাবে জরিমানার সম্মুখীন হতে হওয়ার ফলে নড়বড়ে বিশ্বাসের ভিতে আরও চওড়া ফাটল দেখা দেয়।

এর পরের ঘটনা ঘটে বছরখানেক পরে, ১৯২১ সালের মে মাসে, জাফায়। জায়নিস্ট সোশ্যালিস্টদের এক প্যারেড থেকে রাস্তায় হাতাহাতি শুরু হয়, সেখান থেকে পুরোদমে দাঙ্গা। ক্ষিপ্ত আরব জনতা ইহুদীদের বাড়িঘর আর দোকানের ওপর হামলা করে, ইহুদী প্যারামিলিটারি বাহিনী পালটা হামলা চালায়। ব্রিটিশ বাহিনী যতক্ষণে মাঠে নামে, ততক্ষণে প্রাণ গেছে সাতচল্লিশজন ইহুদীর আর প্রায় সমসংখ্যক আরবের, আহত কয়েকশো মানুষ। আর এই গণ্ডগোল ক্রমশঃ ছড়িয়ে যায় আরও দূরে, পেতাহ্‌ টিকভা, রিহোভেত, এমনকি জেরুজালেমের আশেপাশেও।

১৯২১ সালের এই দাঙ্গার পর ব্রিটিশরা প্রথমবার একটা অফিশিয়াল অনুসন্ধান কমিটি তৈরী করে প্যালেস্টাইনের চিফ জাস্টিস স্যার থমাস হেক্রাফটের নেতৃত্বে। কমিশনের রিপোর্টে ইহুদী অভিবাসন এবং জমি কেনাবেচা নিয়ে আরবদের ভয়ভীতির কথা তুলে ধরা হয়, বলা হয় বিধিনিষেধ আরোপ করার কথাও। ব্রিটিশ সরকার কমিশনের রিপোর্ট ধামাচাপা দিয়ে একটা হোয়াইট পেপার প্রকাশ করে ব্যালফার ডিক্লারেশনের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতার কথা আবার একবার ঘোষণা করে। তার সঙ্গে বলে যে ইহুদী অভিবাসনের সংখ্যা নির্ভর করবে সেই দেশের অভিবাসীদের গ্রহণ করার অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর। ইহুদী আর আরব - দুই পক্ষই এতে অখুশী থেকে যায়।

বিপর্যয় আসে ১৯২৯ সালে।

ওই বছর, আগস্ট মাসে, একটা আপাততুচ্ছ বিষয় নিয়ে এত দিনের চাপা উত্তেজনা ফেটে বেরোয় - জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়াল বা পশ্চিম প্রাচীরের অধিকার নিয়ে। আরব মুসলমানদের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল যে ওই প্রাচীর আসলে পবিত্র হারাম-আল-শরিফ চত্বরের অংশবিশেষ। ইহুদীদের দাবী দেওয়ালটা তাদের পবিত্রতম প্রার্থনাস্থল। জায়নিস্টরা দেওয়ালের সামনে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে জড়ো হয়ে তাদের পতাকা তুলে ইহুদী জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিতে থাকে। মুসলিম ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ সেটাকে উস্কানি হিসেবে দেখে। অথচ বিশ্বযুদ্ধের আগে অবধিও ওই প্রাচীরের পাশে উভয় সম্প্রদায়ই বিনা ঝঞ্ঝাটে উপাসনা করত...

২৩শে আগস্ট ব্যাপক গণ্ডগোল শুরু হয়। প্রথমে গুজব ছড়ায় যে জায়নিস্টরা আল আক্‌সা মসজিদ আক্রমণ করেছে। লাঠি আর ছুরি হাতে আরব গ্রামবাসীরা দলে দলে বেরিয়ে পড়ে রওনা দেয় জেরুজালেমের পথে। পরের গোটা সপ্তাহ জুড়ে চরম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। হেব্রনে দাঙ্গায় মারা যায় ৬৭ জন ইহুদী - পুরুষ, নারী, শিশু। বেঁচে যায় তারা যাদের আরব প্রতিবেশীরা নিজদের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিল। সাফেদে আরেক সংগঠিত হত্যাকাণ্ডে মারা যায় আরও জনা কুড়ি ইহুদী। সব মিলিয়ে, ওই এক সপ্তাহে ইহুদীদের মধ্যে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৩, আহত শতাধিক। উল্টোদিকে, ব্রিটিশ সুরক্ষা বাহিনী আর ইহুদী মিলিশিয়ার হাতে মারা যায় ১১৬ জন আরব, আহত হয় শতাধিক বা আরও বেশি। সাধারণভাবে, ব্রিটিশ সুরক্ষা বাহিনী পরিস্থিতির সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যায়। আর কোথাও কোথাও বেবাক দাঁড়িয়ে তাদের চোখের সামনেই নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চলতে দেয়।

স্যার ওয়াল্টার শ-য়ের নেতৃত্বে শ কমিশন আসে ঘটনার তদন্ত করতে। এবং এই কমিশনের দেওয়া রিপোর্টকে বলা যায় এই সময়ের একটা ল্যান্ডমার্ক রিপোর্ট। রিপোর্টে লেখা হয় যে পশ্চিম দেওয়াল নিয়ে বিতর্ক আদৌ এই পুরো ঘটনার মূল কারণ নয়। বরং ম্যান্ডেট শুরু হওয়ার দিন থেকে আরবদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে, সেই সম্পর্কে তাদের মনোভাবকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। রিপোর্টে এও লেখা হয় যে ব্রিটিশ সরকারের উচিত পাবলিক স্টেটমেন্ট দিয়ে ম্যান্ডেটের রক্ষক হিসেবে দুই সম্প্রদায়ের প্রতিই তাদের দায়বদ্ধতা আবার করে ব্যক্ত করা, এবং পাশাপাশি নির্বিচারে ইহুদী অভিবাসন এবং জমি কেনার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা। এই রিপোর্টের এক বছরের মধ্যেই, ১৯৩০ সালের হোপ সিম্পসন রিপোর্ট জানায় যে আরব অধিবাসীদের উচ্ছেদ না করে ইহুদী বসতি তৈরীর মত সারপ্লাস জমি প্যালেস্টাইনে নেই।

এক মুহূর্তের জন্যে প্যালেস্তিনীয়রা ভেবেছিল যে ব্রিটিশ সরকার হয়ত তাদের মনোভাব বদলাচ্ছে। ১৯৩০ সালের পাসফিল্ড হোয়াইট পেপার, শ কমিশন আর হোপ কমিশনের রেকমেন্ডেশনগুলোকে অনুমোদন জানিয়ে অভিবাসনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের প্রস্তাব করে। এবং প্রত্যাশিতভাবেই জায়নিস্টদের দিক থেকে জোরালো রিয়্যাকশন উঠে আসে। জিউয়িশ এজেন্সির নেতা, ওয়াইৎজম্যান, ব্রিটেনের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছেদ করার হুমকি দেন। চরম চাপের মুখে, ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড একটা চিঠি লেখেন, যাতে পাসফিল্ড হোয়াইট পেপারকে বাতিল করা হয়, এবং বলা হয় ইহুদী অভিবাসন এবং জমি কেনা অব্যাহত থাকবে, ব্রিটিশদের তরফে কোনোরকম বাধা দেওয়া হবে না। "কালো চিঠি" বা "ব্ল্যাক লেটার" বলে এই চিঠি প্যালেস্তিনীয়দের মধ্যে কুখ্যাত হয়ে রয়েছে - ব্রিটিশ সরকার যে প্রতিবারই জায়নিস্ট চাপের মুখে নতিস্বীকার করবে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে।

এরকম সময়েই উঠে আসেন ইযয আদ-দিন আল কাসাম। ১৯২৯ সালের পর থেকেই প্যালেস্টাইনে শুরু হয়েছিল সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ। তার মধ্যেই, জন্মসূত্রে সিরিয়ার মানুষ, এক ধর্মগুরু, হাইফা বাসিন্দা শেইখ আল কাসাম, শহুরে প্যালেস্তিনীয় সিভিল সোসাইটি আর আরব রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ভরসা না করে, গরীব বঞ্চিত আরব, বিশেষ করে যারা ইহুদীদের হাতে জমি বা রুজিরুটি হারিয়েছে বা বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তাদের নিয়ে গোপনে ছোট ছোট সংগঠন তৈরী করছিলেন। কাসামের বার্তা ছিল উপনিবেশ বিরোধিতা আর ইসলামের এক মিশেল, যার মাধ্যমে তিনি প্যালেস্টাইনকে দখলমুক্ত করার জন্যে সশস্ত্র জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালের মাঝামাঝি কাসাম একটা ছোট গেরিলা সংগঠন তৈরী করে ইহুদী বসতি আর ব্রিটিশ ছাউনির ওপর ক্রমাগত অতর্কিত আক্রমণ শুরু করেন। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স শত চেষ্টা করেও বহুদিন আল-কাফ আল-আসওয়াদ (বা "ব্ল্যাক হ্যান্ড") নামের এই বাহিনীর নাগাল পায়নি। শেষ অবধি, ১৯৩০ সালের ২০শে নভেম্বর, জেনিনের অদূরে গুহায় লুকিয়ে থাকা কাসাম ও তাঁর বাহিনীকে ঘিরে ফেলে ব্রিটিশ পুলিশ। গুলির লড়াইয়ে কাসাম নিহত হ'ন। হাইফায় কাসামের শেষকৃত্যের মিছিলে জড়ো হয়েছিল হাজারে হাজারে মানুষ - নিমেষেই শহীদের মর্যাদা পেয়ে যান কাসাম। কাসামের বিদ্রোহ আর শাহাদাত নিয়ে লেখা হয় গান - সেই গান ছড়িয়ে পড়ে গোটা প্যালেস্টাইনে। চলতে থাকা জমি দখলে ক্ষুব্ধ সেই সময়ের তরুণ প্রজন্ম, যারা ক্রমশঃ পুরনো নেতৃত্বের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিল, তাদের সামনে কাসাম হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের আদর্শ।

এই সময়টা জুড়ে, র‍্যাডিকালাইজেশনের দিক থেকে ইহুদীরাও কোনো অংশে পিছিয়ে ছিল না। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে হাগানাহ্‌ ক্রমশঃ কলেবরে বেড়ে উঠেছিল। গোপনে অস্ত্র আমদানি চলেছিল পুরো দমে। যেমন, আল কাসামের মৃত্যুর মাসখানেক আগেই জাফা বন্দরে হাগানাহ্‌র জন্যে চালানে আসা জাহাজভর্তি অস্ত্র আবিষ্কারের পর আরব জনমত আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। হাগানাহ্‌র পাশাপাশি তৈরী হয়েছিল আরও বেশ কয়েকটা জঙ্গি সংগঠন। ১৯৩১ সালে হাগানাহ্‌ থেকে একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে তৈরী করে ইরগুন (পুরো নাম Irgun Tzvai Leumi অথবা National Military Organization) – যারা হাগানাহ্‌র প্রতিরোধের নীতির বদলে সরাসরি প্রতিআক্রমণের কথা বলতে শুরু করে। "শক্তির মাধ্যমেই শত্রুকে ইহুদী জাতীয় ভূমি থেকে বিতারণ করা সম্ভব" – এই হয়ে ওঠে তাদের স্লোগান। ইরগুন তাদের নিজস্ব জঙ্গি কাজকর্ম চালাতে থাকে - রাস্তাঘাটে, বাসে, দোকানবাজারে আরব জনতার ভিড়ের মধ্যে বোমা ছোঁড়া থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকদের টার্গেট করে হত্যা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া - সবই চলতে থাকে নির্বিচারে। আক্রমণ, প্রতিরোধ, পালটা আক্রমণ - রক্তের সাইক্ল চলতেই থাকে, এবং পুরো সময়টা জুড়েই লোকের অভাবে ভোগা ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বিশেষ কিছুই করে উঠতে পারেনি।

১৯৩৫ সাল নাগাদ, আরব এবং ইহুদী, দুই সম্প্রদায়ই পুরোদস্তুর সশস্ত্র অবস্থায় সহিংস জঙ্গি কার্যকলাপে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্যে তৈরী ব্রিটিশ ম্যান্ডেটই হয়ে ওঠে যুদ্ধের ময়দান।

আর, এর কয়েক মাসের মধ্যেই ছোট্ট একটা স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে ১৯৩৬ সালের আরব মহাবিদ্রোহ...

ছবিতে: (উপরে) আরব প্রতিবাদের ওপর ব্রিটিশ পুলিশের আক্রমণ, (নীচে) জেরুজালেমের পশ্চিম প্রাচীরে নিশ্চিন্তে প্রার্থনারত প্যালেস্তিনীয় ইহুদী বাসিন্দাদের ভিড়

Monday, March 23, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইন

(৫) প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটঃ কলোনিয়ালিজমের মুখোশ আর জমির অঙ্ক

১৯২২ সালের জুলাই মাসে লীগ অফ নেশন্স প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটকে মান্যতা দেয়। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটরি শক্তির হাত ধরেই "নেটিভরা" একদিন নিজেরাই নিজেদের শাসন করতে শিখবে - বাকি পৃথিবীর সামনে এই বলে ম্যান্ডেটকে সভ্যতার পবিত্র আমানত হিসেবে দেখানো হলেও, প্যালেস্টিনীয়দের কাছে এটা ছিল তার ঠিক উলটো। একদম উলটো।

ম্যান্ডেটটা ঠিক কাদের জন্যে ছিল এইটা বুঝতে চাইলে ম্যান্ডেটের শর্তগুলো একবার দেখে নিতে হবে। অনুচ্ছেদ দুইয়ে বলা হয় যে ব্রিটেনের হাতেই দায়িত্ব থাকবে ইহুদীদের জন্যে ন্যাশনাল হোম তৈরীর (“ securing the establishment of the Jewish national home") আর চার নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয় যে একটা ইহুদী সংস্থাকে (এজেন্সি) পাবলিক বডি হিসেবে তৈরী করে বিশেষ স্বীকৃতি দিয়ে তাদের হাতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হবে। জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম আর জিউয়িশ এজেন্সি নিয়ে এত কিছু বলা হলেও নেটিভ আরবদের কোনও এজেন্সি সম্পর্কে ম্যান্ডেট ছিল নীরব। নেটিভদের পরামর্শ আবার শোনার কী আছে - এই হয়তো ছিল মনোভাব। ফাইনালি, ছয় নম্বর অনুচ্ছেদে ব্রিটিশদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয় যাতে তারা উপযুক্ত শর্ত অনুযায়ী ইহুদী অভিবাসন সুনিশ্চিত করে আর প্যালেস্টাইনের জমিতে ইহুদী বসতি স্থাপনে উৎসাহ দেয়।

আরবদের অভিবাসন বা বসতি নিয়ে ম্যান্ডেটে একটা শব্দও ছিল না। আরব স্বকীয়তাকে স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে একটা অনুচ্ছেদও লেখা হয়নি ম্যান্ডেটে। সবদিক থেকেই এই ম্যান্ডেটের মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে ব্যালফার ডিক্লারেশনকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারকে। ১৯১৭ সালের চিঠিটা বদলে গেছিল আন্তর্জাতিক আইনে।

প্যালেস্টাইনে বসবাসকারী প্রায় ৯০ শতাংশ আরব জনজাতির মানুষ (কলোনিয়ালিজমের ভাষায় নেটিভ) ম্যান্ডেটকে আমানত হিসেবে দেখে উঠতে পারেনি। তাদের কাছে এই ম্যান্ডেট ছিল একটা শাস্তি। প্যালেস্টিনীয়দের ক্রমশঃ কমতে থাকা অধিকার এই ম্যান্ডেটের মধ্যে দিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক আর আইনী রূপ নিতে শুরু করেছিল। কার্টেসি, ব্রিটেন। এবং, কার্টেসি ঠুঁটো জগন্নাথ লীগ অফ নেশন্স।

কীভাবে?

প্রথমতঃ, ১৯২১ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে জমির রেজিস্ট্রেশনের বদল। অটোমান আমলে, বেশিরভাগ জমির মালিকানা ছিল হয় রাষ্ট্রের হাতে (মিরি), অথবা ব্যক্তির হাতে (মুল্ক) আর নয়তো ধর্মীয় অনুদানের ওপর (ওয়াকফ)। ব্রিটিশরা একটা নতুন রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি আনে যেখানে জমির মালিকানার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে ওঠার পাশাপাশি জমির হাতবদলও খুব সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আরব অধিবাসীদের বেশিরভাগই সেই সময়ে তৃতীয় বিশ্বের বাকি দেশগুলোর মতই নিরক্ষর - কাজেই না আইনকানুন না বুঝেই সেই সময়ে অনেকেই জমির রেজিস্ট্রেশন করেনি। এছাড়া, খরচ আর অবিশ্বাসও বড় কারণ ছিল। এই আইনে আনরেজিস্টার্ড জমি রাষ্ট্রের হাতে চলে যেত, এবং রাষ্ট্র সেই জমি বিক্রি করে দিত। রাষ্ট্র তখন ব্রিটিশের, তাদের ওপর জিউয়িশ হোমল্যান্ড তৈরীর বড় দায়িত্ব, কাজেই বুঝতেই পারছেন এই জমিগুলো কাদের হাতে চলে যেত...

দ্বিতীয়তঃ, ১৯২৫ সালের নাগরিকত্ব আইন। এই আইন অনুযায়ী, প্যালেস্টাইনে বসবাসকারী আরবদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও, সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। ইহুদী অভিবাসীদের জন্যে নাগরিকত্ব লাভের প্রক্রিয়া ছিল অনেক সহজ—মাত্র দুই বছর বসবাস করলেই তারা নাগরিক হতে পারত। অথচ, যেসব আরব অটোমান আমলে প্যালেস্টাইন ছেড়ে প্রতিবেশী দেশে গিয়েছিলেন, তারা ফিরে এসেও সহজে নাগরিকত্ব পেতেন না, কারণ যুদ্ধের বাজারে অটোমান আমলের দলিলপত্র দেখানো সকলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে, রাজনৈতিক অধিকারের মাঠটা প্রথম থেকেই ছিল অসম। এই ব্যাপারটা আপনাদের বেশ চেনা ঠেকলেও ঠেকতে পারে, এনআরসি আর এসআইআরের বাজারে...

তৃতীয়তঃ, জিউয়িশ এজেন্সির বিশেষ মর্যাদা বা প্রিভিলেজড স্টেটাস। ম্যান্ডেট অনুযায়ী এই জিউয়িশ এজেন্সি তাদের বিশেষ প্রিভিলেজড অবস্থান অনুযায়ী দেশের প্রশাসনে অংশগ্রহণ করার ক্ষমতা পেয়ে গেছিল। আরবদের এরকম কোনও এজেন্সিও ছিল না, কোনও ক্ষমতাও ছিল না। কাগজে কলমে ক্ষমতা ব্রিটিশদের হাতে থাকলেও, এই জিউয়িশ এজেন্সি নির্বিচারে ভূমি অধিগ্রহণ, অভিবাসনের সার্টিফিকেট দেওয়া, বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকল্পের মত ব্যাপারগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারত ম্যান্ডেট অনুযায়ী। সরকারের মধ্যে আরেকটা সরকার বলা যায়; বলা যায় ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি পর্ব।

এই পুরো সময়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল জমির অধিকার। জায়নিস্টদের কাছে জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম তৈরীর প্রথম ধাপ ছিল জমির দখল নেওয়া। আর প্যালেস্তিনীয়দের কাছে, এক একটা জমি বিক্রি বা বেদখল হওয়া মানে ছিল পৈতৃক ভিটে হারানো, বা বাস্তুচ্যুত হওয়া - ফলত: তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সংকোচন। ১৯২০ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের হাতে থাকা জমির পরিমাণ ২-৩% থেকে বেড়ে হয়ে দাঁড়ায় ৬-৭%, আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল (যেটা পরিসংখ্যানের নীচে প্রায়শই চাপা পড়ে যায়) - জমির দখল নেওয়ার সময় ইহুদীদের চোখ ছিল প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর এবং চাষযোগ্য জমিগুলোকে তাদের আওতায় আনা - যেমন উপকুলের সমতল এলাকা, জেজরিল উপত্যকা, বা উত্তর গ্যালিলি - যে জমিগুলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আরব বর্গাদারেরা চাষ করে এসেছিল...

এর মধ্যেও, বিশের দশকে, বেইরুটে বসবাসকারী গ্রীক অর্থোডক্স জমিদার Sursock পরিবারের জমি হস্তান্তরের গল্পটা সবচেয়ে প্যাথেটিক। এই পরিবার জেজরিল উপত্যকা অঞ্চলের প্রায় ৮০০০০ একর জমি বিক্রি করে দেন জিউয়িশ ন্যাশনাল ফান্ডকে, প্রায় সারে সাত লক্ষ পাউন্ডের বিনিময়ে। এই জমিতে বছরের পর বছর ধরে কাজ করে আসা হাজারো বর্গাদারকে নিমেষের মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়। এবং, ম্যান্ডেট অনুযায়ী জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম তৈরীর কাজে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার প্র্যাক্টিকালি কোনোরকমের সুরক্ষার ব্যবস্থা করেনি...এক ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারীর ভাষায়ঃ “The evicted tenants, who had cultivated the land for generations, were turned out without compensation. Many of them became homeless, and the villages they had built up were demolished.” 

উচ্ছেদ হওয়া চাষিরা দলে দলে ভিড় জমায় হাইফা আর জাফায়, চাষ ছেড়ে দিনমজুরির কাজে, কলেবরে বেরে ওঠে ওই অঞ্চলের বস্তিগুলোর চেহারা, এবং সেখানকার মানুষের মনে জমতে থাকা রাগ...১৯৩৬ সালে যার বিস্ফোরণ ঘটে।

১৯৩৬-৩৯ সালের বিদ্রোহ দমন করার পর, ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৯ সালের মে মাসে হোয়াইট পেপার প্রকাশ করে, যেখানে ইহুদী অভিবাসন ও জমি বিক্রির ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়। তারপর, ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা হয় ল্যান্ড ট্রান্সফার রেগুলেশনস। এই রেগুলেশন অনুযায়ী প্যালেস্টাইনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ঃ জোন এ - যেখানে ইহুদীদের কোনও জমি বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়, জোন বি - নিয়ন্ত্রণাধীন জমি বিক্রি, এবং জোন সি - যেখানে বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই। জোন এ ছিল মূলতঃ প্যালেস্টাইনের পার্বত্য হার্টল্যান্ড, যেখানে আরব জনগোষ্ঠীর ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। জোন সি অর্থাৎ জেজরিল উপত্যকা, বা উপকুলের সমভূমি অঞ্চল আর গ্যালিলি - সেখানে ইহুদী বসতি ততদিনে তৈরী হয়ে গেছে। আরব বিদ্রোহে খানিক ধাক্কা খেয়ে ব্রিটিশ সরকার এই সময়ে চেষ্টা করে ইহুদী আধিপত্য থাকা অঞ্চলের মধ্যেই আরও সম্প্রসারণের। জায়নিস্টরা প্রবলভাবে এই বিধির বিরোধিতা শুরু করে (খানিক ভায়োলেন্ট বিরোধিতাও ছিল এর মধ্যে)। আরবরা এই বিধি মেনে নিলেও তারা জানত যে ততদিনে অনেকটাই দেরী হয়ে গেছে, প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর মূল্যবান জমি ততদিনে ইহুদীদের হাতেই চলে গেছে...

১৯২২ সালের প্রথম সেন্সাস অনুযায়ী প্যালেস্টাইনে ইহুদী বসবাসকারীর সংখ্যা ছিল ৮৩,৭৯০ (১১%)। সেই সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়তে বাড়তে ১৯৩১ সালে হয় ১,৭৪,৬১০ (১৭%), ১৯৩৬ সালে প্রায় চার লক্ষ (৩৩%), এবং ১৯৪৭ সালে ছয় লক্ষেরও বেশি (৩৩%)। শতাংশের হিসেবে ৩৩% সংখ্যাটা স্থির থাকলেও, বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ইহুদী জনসংখ্যা বেড়েছিল আড়াই লাখের বেশি, অর্থাৎ, প্রায় ৬০ শতাংশ। আরব জনসংখ্যাও বেড়েছিল প্রায় সাড়ে চার লাখ - স্বাভাবিক জন্মহার আর প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অভিবাসনের ফলে। ফলে, শতাংশের হিসেবে ইহুদীরা এক-তৃতীয়াংশেই থেকে গেলেও, নিরঙ্কুশ সংখ্যায় তাদের উপস্থিতি ছিল আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন, আর তাদের বসতি ছিল প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর ভূমিতে।

১৯৩১ থেকে ১৯৩৬ এর মধ্যে ইউরোপে নাৎসী আমলে ইহুদীর ওপর চরম অত্যাচার শুরু হওয়ার ফলে ইহুদী অভিবাসন বেড়ে ওঠে। আরবরা এই আচমকা জনস্রোতে আতঙ্কিত হয়ে দেখে যে তাদেরই চাষআবাদের জমির ওপর গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতি। শহরাঞ্চলে কলেকারখানার দিনমজুরির ক্ষেত্রে আরবদের কম্পিটিশনে নামতে হয় নতুন অভিবাসী ইহুদীদের সঙ্গে। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন নিয়ে অধিবাসীদের একই মনোভাব থাকলেও, প্যালেস্তিনীয় আরবদের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল সেটা হল এই অভিবাসনের ফলে প্যালেস্টাইনের ডেমোগ্রাফির আমূল বদলে যাওয়া। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আরবরা বুঝতে পারে যে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা - ভবিষ্যতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের একমাত্র নিশ্চয়তা - ক্রমশঃ কমে আসছে।

এই পুরো সময় জুড়ে ব্রিটিশদের নীতির গতিবিধি থেকেছে খানিক পেন্ডুলামের মত। আরবদের দিক থেকে চাপ এলে তারা অভিবাসনের দরজা বন্ধ করেছে। আবার জায়নিস্টদের দিক থেকে চাপ এলে তারা আরও আরও অভিবাসনের অনুমতি দিয়েছে। তিরিশের দশকের শেষের দিকে এসে দেখা যায় এই পেন্ডুলামের নীতি কাউকেই খুশী করতে পারেনি। বরং বিবদমান দুই পক্ষই আরও বেশি র‍্যাডিক্যাল হয়ে উঠেছে...