Monday, August 08, 2022

#ShadowArmiesOfHindutva - Part 6

২৯শে সেপ্টেম্বর ২০০৮ - রমজানের সময়ে, রাত্রি সাড়ে ন'টা নাগাদ মালেগাঁওয়ের অঞ্জুমান চক আর ভিকু চকের মাঝে শাকিল গুডস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির বাড়ির সামনে, জনবহুল একটা এলাকায় বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরক ডিভাইস বসানো ছিলো একটা LML Freedom স্কুটারে, রেজিস্ট্রেশন নম্বর MH-15-P-4572 - বিস্ফোরণের ফলে ছ'জন মারা যায়, আহত হয় আরো শ'খানেক লোক, সম্পত্তি নষ্টের পরিমাণ চার লক্ষ টাকার ওপর। যেহেতু সেই সময়টা ছিলো রমজানের, আর ঠিক পরের দিন, মানে ৩০শে সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার কথা ছিলো নবরাত্রি উৎসবের, বোঝাই যায়, যে বিস্ফোরণ যারা ঘটিয়েছিলো তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো আতঙ্ক ছড়ানো, আর মানুষ মেরে, সম্পত্তি ধ্বংস করে সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরী করা। ঘটনার পরেই বিশাল পুলিশবাহিনী স্পটে পৌঁছে যায়, কিন্তু প্রায় হাজার পনেরো ক্ষুব্ধ মানুষের ভিড়ে থমকে যায়। ইঁট ছোঁড়ে বিক্ষুব্ধ জনতা, বেশ কয়েকজন পুলিশ আহত হয়, কয়েকটা গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষোভ প্রশমিত হওয়ার পরেই বিস্ফোরণের তদন্তে নামে পুলিশ। এই গন্ডগোলের জন্যে আলাদা করে রায়টিং এর কেস নথিভুক্ত হয় আজাদ নগর থানায়, কেস নম্বরঃ ১৩১/২০০৮।

বোমা বিস্ফোরণ নিয়ে আজাদ নগর থানাতেই কেস রেজিস্টার হয় ৩০শে সেপ্টেম্বর ভোর তিনটেয়, কেস নম্বরঃ ১৩০/২০০৮, আইপিসি ৩০২, ৩০৭, ৩২৬, ৩২৪, ৪২৭, ১৫৩-এ, ১২০-বি, এক্সপ্লোসিভ সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্টের ৩/৪/৫ ধারায়। পুলিশ একে একে গ্রেপ্তার করে বেশ কয়েকজনকে - যাদের মধ্যে ছিলেন সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, শিবনারায়ণ গোপালসিং কালসাংরা, শ্যাম ভওয়রলাল সাহু, রমেশ শিবজী উপাধ্যায়, সমীর শারদ কুলকার্নি, অজয় ওরফে রাজা একনাথ রাহিরকর, রাকেশ দত্তাত্রেয় ধাওরে, জগদিশ চিন্তামন মাহত্রে, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শ্রীকান্ত প্রসাদ পুরোহিত ওরফে বলবন্ত রাও ওরফে শ্রেয়ক রণদিভে, সুধাকর উদয়ভান ধর দ্বিবেদী ওরফে দয়ানন্দ পান্ডে ওরফে স্বামী অমৃতানন্দ দেবতীর্থ ওরফে সারদা সর্বজ্ঞ পীঠের শঙ্করাচার্য্য আর সুধাকর ওঙ্কার চতুর্বেদী। ওয়ান্টেড লিস্টে নাম ওঠে রামজী রামচন্দ্র গোপালসিং কালসাংরা, সন্দীপ বিশ্বাস ডাঙ্গে, প্রভীন মুতালিক ইত্যাদিদের।

বিস্ফোরণের তদন্তে নেমে নাসিকের ফরেন্সিক টিম জানায় যে সেই বিস্ফোরণে আরডিএক্স আর অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ব্যবহার হয়েছিলো। বিস্ফোরণে ব্যবহৃত আরো একটি বাইক (রেজিস্ট্রেশন নম্বর GJ-05-BR-1920) রেজিস্টার্ড ছিলো প্রজ্ঞাসিং চন্দ্রপালসিং ঠাকুরের নামে। ওয়ান্টেড লিস্টে নাম থাকা তিনজন এবং আরো কিছু লোক মিলে সেই এলএমএল ফ্রীডম বাইকে বিস্ফোরক ডিভাইস বসিয়েছিলো।

খুব ছোট করে, এই হল মালেগাঁও ব্লাস্ট কেসের সামারি - যেটা আপনারা হয়তো খবরের কাগজে পড়ে থাকবেন। ঘটনাটা মনে করিয়ে দিলাম, নামধামসহ - এর পরের কথাগুলো রিলেট করতে সুবিধা হবে বলে।

এগারোজন অভিযুক্তের নাম ছিলো পুলিশ রিপোর্টে - আর খেয়াল করলে দেখা যায় যে এদের মধ্যে তিনটে ডিসটিংক্ট গ্রুপ রয়েছে - প্রথমতঃ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, দ্বিতীয়তঃ সেনাবাহিনীর বর্তমান ও প্রাক্তন সদস্য, আর তৃতীয়তঃ সংঘ পরিবারের বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মী/সদস্য। এবং, ঘটনাচক্রে, এদের অধিকাংশই মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ, বিশেষ করে চিৎপাবন - একেবারে সেই হিন্দু মহাসভার রমরমার দিনগুলোর সময় সাভারকরের শিষ্যদের মত। সেই বছরের ২৬শে জানুয়ারি হওয়া ফরিদাবাদের যে মিটিঙের কথা আগের পর্বে লিখেছিলাম, সেই মিটিঙেই এঁরা ভারতের এক নতুন সংবিধানের খসরা তৈরী করা শুরু করেন - যেখানে এই চিৎপাবন ব্রাহ্মণদের ভারতীয় এয়ারফোর্সে ঢোকানোর জন্যে আলাদা ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়…

যে তিন ধরণের মানুষের কথা লিখলাম, তাদের মধ্যে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা - সন্ন্যাসী বা মহন্ত - চিরকালই হিন্দু জাতীয়তাবাদী মুভমেন্টের সাথে জড়িয়ে ছিলেন - অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা হিসেবে বৈধতা দেওয়ার জন্যে, কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয় সদস্য হিসেবেও। এর আগেও হিন্দু মহাসভাকে সমর্থন করেছেন কবীর পীঠের শঙ্করাচার্য্যের মত ব্যক্তিত্ব, বা গোরক্ষনাথ মঠের আচার্য্য মহন্ত দিগ্বিজয়নাথ…যাঁদের উত্তরাধিকারীরা হিন্দু মহাসভা থেকে ক্রমে ভারতীয় জনতা পার্টিতে চলে এসেছেন। নব্বইয়ের দশকে, বিজেপির জনা ছয়েক সাংসদ ছিলেন গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী, যদিও এঁদের বেশিরভাগেরই সেরকম কোনো ধর্মীয় জনভিত্তি ছিলো না - হয় তাঁরা নামীদামী কোনো সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী ছিলেন না, বা একদম শূন্য থেকে নিজেদের আশ্রম তৈরী করেছিলেন। যদিও, এঁদের প্রধান সম্পদ ছিলো জোরালো বক্তব্য রাখার ক্ষমতা - প্রধাণতঃ জঙ্গি মনোভাবের - যেমন সাধ্বী ঋতম্ভরা বা উমা ভারতীর মত লোকেরা…

অমৃতানন্দ দেবতীর্থ ছিলেন এই দ্বিতীয় ক্যাটেগরির ধর্মীয় নেতা - জঙ্গি মনোভাব আর চরম মুসলমান বিদ্বেষ ছিলো যাঁর অস্ত্র। উনি নিজেকে শ্রীসারদা সর্বজ্ঞপীঠের শঙ্করাচার্য্য বলে দাবী করতেন আর সেই পীঠের ধর্মীয় আচার ফের শুরু করার চেষ্টায় ছিলেন, যদিও বাস্তবে সারদাপীঠ বর্তমানে কাশ্মীরের লাইন অফ কন্ট্রোলের ওপারে (এই সমস্ত পীঠের সংখ্যা, মাহাত্ম্য আর কে শঙ্করাচার্য্য হবেন তাই নিয়ে বর্তমান এবং হলেও-হতে-পারেন শঙ্করাচার্য্যদের মধ্যেই প্রচন্ড বিতর্ক আর রেষারেষি রয়েছে - উৎসাহী পাঠক চাইলে ধীরেন্দ্র কুমার ঝা-এর Ascetic Games পড়ে দেখতে পারেন। মালেগাঁও ব্লাস্ট নিয়ে লেখায় এর ডিটেলড আলোচনা আর করছি না)।

দ্বিতীয় যে গোষ্ঠীর কথা বললাম - সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্য - হিন্দু জাতীয়তাবাদী মুভমেন্টে এঁদেরও উপস্থিতি নেহাত কম নয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদ শুরু থেকেই এই মুভমেন্টে একটা মার্শাল বা সামরিক রূপ দিতে চেয়েছে। সাভারকরের ক্ষেত্রে যেমন "হিন্দুধর্মের সামরিকীকরণ" (militarise Hindudom) শুধুমাত্র একটা স্লোগান ছিলো না - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাভারকর সক্রিয়ভাবে কমবয়সী হিন্দু ছেলেদের আর্মিতে ঢোকানোর পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, লক্ষ্য ছিলো এই প্রশিক্ষিত হিন্দু সৈন্যরা ভবিষ্যতে মুসলমানদের সাথে অবশ্যম্ভাবী সিভিল ওয়ারে হিন্দুত্বের পরম শক্তিশালী খুঁটি হয়ে উঠবে। হিন্দু মহাসভায় তাঁর অনুগামী ডঃ বিএস মুঞ্জে যে ভোঁসলে মিলিটারি স্কুল তৈরী করেছিলেন - যার কথা এই সিরিজের একদম প্রথম পোস্টে ছিলো - সেই স্কুলের পিছনেও সাভারকরের পূর্ণ সমর্থন ছিলো। এবং, অভিনব ভারতের সঙ্গেও ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলের যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়। ২৬শে জানুয়ারির ফরিদাবাদ মিটিঙে কর্ণেল পুরোহিত জোরগলায় বলেছিলেন - "Whatever I have said today is in fact taken care of by the officers sitting there. The entire school is in my hands."

একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দিই - ইন্টারেস্টিং লাগতেও পারে।

১৯৮৯-৯১ সাল নাগাদ, মানে যে সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টি কোমর বেঁধে ইলেকশনে নামে, সেই সময়ে পার্টিতে বেশ কিছু এক্স-আর্মি লোকজনকে নেওয়া হয়, যাঁদের মধ্যে ছিলেন - দুজন রিটায়ার্ড এয়ারমার্শাল, ছ'জন রিটায়ার্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল, চারজন রিটায়ার্ড মেজর জেনারেল, চারজন রিটায়ার্ড ব্রিগেডিয়ার, চারজন রিটায়ার্ড কর্ণেল, দুজন রিটায়ার্ড মেজর, তিনজন রিটায়ার্ড ক্যাপ্টেন, দুজন রিটায়ার্ড উইং কম্যান্ডার, আর একজন করে রিটায়ার্ড এয়ার কমোডোর, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল, স্কোয়াড্রন লীডার আর ফ্লায়িং অফিসার। এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে বসানো হয় বিজেপির জাতীয় কার্য্যসমিতিতে আর পার্টির ডিফেন্স সেল-এ। এঁদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কিছুদিন আগে আরো বেশ কয়েকজন প্রাক্তন সেনা হিন্দুত্ব ফোল্ডে চলে এসেছিলেন - যাঁদের মধ্যে একজন, ক্যাপ্টেন জগৎ বীর সিং দ্রোণ ততদিনে কানপুরের আরএসএস প্রধান। শুধু আর্মি নয়, আশি আর নব্বইয়ের দশকে পুলিশের বেশ কিছু বড়কর্তাও একে একে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে।

একটা কথা মনে রাখা ভালো - স্বাধীনতার অনেক বছর পরেও একটা সময় অবধি ধর্মীয় দাঙ্গার সময়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পারফরমেন্সে কোনো কালির দাগ ছিলো না। তবে ওই নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একসাথে এতজন আর্মি অফিসারের বিজেপিতে যোগ দেওয়া স্বাভাবিকভাবে আর্মির ভিতরের "চেঞ্জিং ডায়নামিক্স" নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। ২০০৩ সালে তেহেলকার এক সার্ভেতে জানা যায় সেনাবাহিনীর জওয়ানদের মধ্যে ১৯% কোনো না কোনো সময়ে ধর্মীয় বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছেন। সার্ভেতে যাঁরা পার্টিসিপেট করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ২৪% মুসলমান।

গত শতাব্দীর শেষের দিক থেকে সেনাবাহিনীর ভিতরের ডায়নামিক্স যদি বদলেও থাকে, ২০০৮ এর আগে হিন্দু মৌলবাদী কোনো ঘটনায় কখনো আর্মি অফিসারকে জড়িত থাকতে দেখা যায়নি। অভিনব ভারত সেই ধারণার মূলে সজোরে আঘাত করে - সেই প্রথম - যখন অন্ততঃ দুজন আর্মি অফিসারের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। একদম শুরুতেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মেজর রমেশ উপাধ্যায় - প্রাক্তন ডিফেন্স সার্ভিসেস অফিসার - যিনি খুব জলদিই স্বীকার করেন যে নাসিকের ভোঁসলে মিলিটারি স্কুল কমপ্লেক্সের মধ্যেই সাধ্বী প্রজ্ঞা এবং আরো কয়েকজনের সাথে তিনি গোটা ঘটনার প্ল্যান তৈরীর মিটিঙে অংশ নিয়েছিলেন। পাব্লিক প্রসিকিউটর অজয় মিসার কোর্টে জানান - "Upadhyaya, who was posted in the artillery department while working with the Indian military, is suspected to have guided the arrested accused on how to assemble a bomb and procure RDX"  (Retd Major trained Sadhvi in bomb-making: Prosecutor, Times of India, October 30, 2008).

বেশ কিছু প্রেস রিপোর্ট অনুযায়ী রমেশ উপাধ্যায় ছিলেন অভিনব ভারতের অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট, যখন হিমানী সাভারকর ছিলেন প্রেসিডেন্ট। তবে গোটা গ্রুপের আসল কর্ণধার ছিলেন সেনাবাহিনীর আরেক সদস্য - লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শ্রীকান্ত পুরোহিত - রমেশ উপাধ্যায় নাসিকে লিয়াজঁ অফিসার হিসেবে পোস্টেড থাকাকালীন পুরোহিতই তাঁর সাথে যোগাযোগ করেন। পুরোহিত এবং উপাধ্যায় একসাথেই কমবয়সী সদস্যদের মিলিটারি ট্রেনিং দিতেন, অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবস্থাও করতেন। ২০০৪-০৫ সালে জম্মুকাশ্মীরে পোস্টেড থাকাকালীন পুরোহিত ডকুমেন্ট জাল করতে শুরু করেছিলেন - অন্যদের অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্যে। ২০০৮ সালের জুলাই নাগাদ মধ্যপ্রদেশের পাঁচমারিতে পোস্টেড হয়ে আসার পর লাগাতার বেশ কিছু ট্রেনিং ক্যাম্পের ব্যবস্থা করেন হিন্দুত্বের সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে। এর মধ্যে অধিকাংশ ক্যাম্পই হত নাসিকের ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলে - সেখানে যদিও পুরোহিতই প্রথম নয়, বরং ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল অবধি রিটায়ার্ড মেজর পিবি কুলকার্নি এই ক্যাম্পগুলো চালাতেন। মেজর কুলকার্নির সাথে আরএসএস এর সম্পর্ক সেই ১৯৩৫ সাল থেকেই। আর শুধু অভিনব ভারত নয়, তার আগে ২০০১ সালেও বজরং দল ওই একই ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলে অস্ত্রশিক্ষার ক্যাম্প করেছে - যেখানে ১০-১৫ বছরের ছেলেদের আগ্নেয়াস্ত্রের শিক্ষা দেওয়া হত।

মালেগাঁও ব্লাস্টের বিভিন্ন নথি, টেস্টিমোনিয়াল ঘেঁটে বোঝা যায় যে শুধু এই দুজন ন'ন, আরো বেশ কয়েকজন আর্মি অফিসার অভিনব ভারতের সাথে জড়িয়েছিলেন। কর্ণেল পুরোহিত মেইন ইনফ্লুয়েন্সার/রিক্রুটার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আরো বেশি বেশি করে সেনাবাহিনীর লোককে হিন্দুত্বের ছাতার তলায় টেনে আনার। শুধু সেনাবাহিনী নয়, সংঘ পরিবারের অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে থাকা চরমপন্থী লোকেদেরও টেনে আনার…

"The interrogation of Purohit establishes him as a man with forthright views on Hindu extremism. He was extremely frank in expressing his concerns about Hindus getting killed by jehadi terror groups and strongly felt that something had to be done about it. He had shared such views – that Hindus needed to retaliate – on several occasions with his colleagues in the Army. Of course, none of these colleagues realised the seriousness of his opinion or that it would lead him to plot real revenge attacks.[...] Purohit was the key man behind Abhinav Bharat, building its cadre by drawing ‘extremist’ elements from VHP [Vishwa Hindu Parishad] and RSS. An expert at liaisoning, Purohit had a unique sixth sense in identifying radical members of the right-wing outfits like VHP and then motivating them to join Abhinav Bharat." ["I masterminded Malegaon Blast: Lt. Col", The Economic Times, 7 November 2008]

হিন্দুত্বের ইতিহাস ফলো করলে দেখবেন - সাভারকর নিজেও আরএসএসের তথাকথিত নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ নাথুরাম গডসেকে টেনে এনেছিলেন নিজের হিন্দু রাষ্ট্র দলে - কারণ আরএসএস "বিশ্বাসঘাতক" গান্ধী আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে "অ্যাকশন" নিতে দেরী করছিলো। পরের ঘটনা তো সবাই জানে…

বাকি রইলো মালেগাঁও ব্লাস্টে জড়িত তৃতীয় গোষ্ঠী - মানে সংঘ পরিবারের কর্মী/সদস্য…

রমেশ উপাধ্যায় নিজেই একসময় মুম্বইয়ে বিজেপির এক্স-সার্ভিসমেন সেল এর মাথায় ছিলেন। মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্তে প্রথম গ্রেপ্তার হ'ন সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর - ইন্দোর এবং উজ্জয়িনীর অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেত্রী ছিলেন ১৯৯৭ সাল অবধি - এবিভিপির জাতীয় কর্মসমিতিতে যাওয়ার আগে অবধি। সমীর কুলকার্নি - যিনি অ্যাপারেন্টলি মধ্যপ্রদেশে অভিনব ভারত শুরু করেছিলেন (হিমানী সাভারকরের ভাষ্য অনুযায়ী) - ছিলেন আরএসএস এর সক্রিয় কর্মী। তবে সংঘ পরিবারের তথাকথিত "নিষ্ক্রিয়তা" দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে অভিনব ভারতে আসার সেরা উদাহরণ বিএল শর্মা - যিনি ১৯৪০ থেকে আরএসএস এর সাথে যুক্ত ছিলেন, আর রামজন্মভূমি আন্দোলনের সময় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের হয়ে মাঠে নামেন। ১৯৯১ আর ১৯৯৬ সালে বিজেপির টিকিটে লোকসভা ভোটে জেতার পরে ১৯৯৭ সালে সাংসদ পদ আর বিজেপি থেকে বেরিয়ে এসে পুরোদস্তুর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কাজে জড়িয়ে পড়েন রাজ্য সম্পাদক হিসেবে। "অখন্ড ভারত" নিয়ে এগোতে বিজেপির "অনীহা" দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে লালকৃষ্ণ আদবানিকে একটা কড়া চিঠি লিখেছিলেন সেই সময়ে যেটা তিনি ২৬শে জানুয়ারির ফরিদাবাদ মিটিঙে পড়ে শোনান…

"The country should be taken over by the Army. How far is it feasible? It’s been a year that I have sent some three lakh letters, distributed 20,000 maps of Akhand Bharat on 26 January, but these Brahmins and traders have never done anything and neither will they do. I do not talk of casteism. It’s just that they don’t have the potential; they don’t have the aptitude for this kind of feelings. Ultimately they do things that are feasible. One Chanakya comes up and becomes a moderate ruler. Even if people have the capability it is only when a seed is planted in the mind [that] it can make huge differences. It is not that physical power is the only way to make a difference but to awaken people mentally. I believe that you have [to] set fire in the society, at least a spark."

যদিও এই চিঠি লেখা সত্ত্বেও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অনুরোধে ফের ২০০৯ সালে শর্মা বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন…মানে তথাকথিত "নিষ্ক্রিয়তা" নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও সংঘ পরিবারের মধ্যে থেকেই এঁরা প্রত্যেকে অভিনব ভারতের পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছিলেন বিভিন্ন ক্যাপাসিটিতে।

মালেগাঁও ব্লাস্ট সেই গোটা পরিকল্পনার একটা ছোট্ট অংশ। পুরো পরিকল্পনা কী ছিলো? লিখবো আস্তে আস্তে।

#ShadowArmiesOfHindutva

(১) Shadow Armies - Fringe Organisations and Foot Soldiers of Hindutva, Dhirendra Kr. Jha
(২) Abhinav Bharat, the Malegao Blast and Hindu Nationalism: Resisting and Emulating Islamist Terrorism, Christophe Jaffrelot, Economic & Political Weekly, Vol. 45, Issue No. 36, 04 Sep, 2010
(৩) Chargesheets and Miscellaneous Documents regarding the Malegaon Case

#ShadowArmiesOfHindutva - Part 5

শুরুটা ধীরেন্দ্র কুমার ঝা-এর ভাষাতেই করি...

১২ই অক্টোবর ২০১৫ - রাতভর বৃষ্টির পর সেদিন সকালে পুণের বৈকুণ্ঠ শ্মশানঘাটের ইলেকট্রিক চুল্লিতে হিমানী সাভারকরের দেহ যখন তোলা হয়, হিমানীর ছেলে সাত্যকি সাভারকরের সঙ্গে শ্মশানে দাঁড়িয়েছিলো অভিনব ভারতের সমস্ত সদস্য। হিমানীর দেহ ছাই হয়ে যাওয়ার পর সকলে যখন সাত্যকির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন একটাই কথা তারা প্রত্যেকে জানিয়েছিলো - হিমানীর মৃত্যুর সাথেই ছিঁড়ে গেছে তাদের সকলের "আদর্শ" দুই ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে একমাত্র জীবন্ত যোগসূত্রটা। 

কে এই হিমানী সাভারকর?

একদিকে গোপাল গডসে, অর্থাৎ নাথুরাম গডসের ভাইয়ের মেয়ে, অন্যদিকে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ভাই নারায়ণ সাভারকরের ছেলের বউ - হিমানী সাভারকর - একই সাথে সংঘ পরিবারের দুই সুপ্রীম নেতার লেগ্যাসি বহন করতেন। পেশায় ছিলেন আর্কিটেক্ট - ১৯৭৪ সালে থেকে ২০০০ সাল অবধি নিজের পেশাতেই নিযুক্ত ছিলেন মুম্বইয়ে। ২০০০ সালে আর্কিটেক্টের কাজ ছেড়ে পুণে চলে আসেন সাভারকরের সমস্ত লেখাপত্রের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে সেইসব দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে। গডসে এবং সাভারকর পরিবারের যৌথ লেগ্যাসিই তাঁকে নিয়ে আসে অভিনব ভারতের ছাতার তলায়। ২০০৮ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণে যখন অভিনব ভারতের সদস্যদের জড়িয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, হিমানী তখন প্রকাশ্যে অভিনব ভারতকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে বলেছিলেন - "বুলেটের বদলা বুলেট যদি হয়, তাহলে বিস্ফোরণের বদলা বিস্ফোরণ কেন হবে না?" [‘If we can have bullet for bullet, why not blast for blast?’, Outlook , 17 November 2008.]

অভিনব ভারতের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটা একটু ধোঁয়াশায় ঢাকা। সংগঠনের নামটা অবশ্যই ১৯০৫ সালে ফার্গুসন কলেজে পড়ার সময় সাভারকরের তৈরী গুপ্ত সংগঠনের নামে - সেই সময়ে সাভারকর এই সংগঠনের নাম রেখেছিলেন গাইসেপ্পে মাজিনির "ইয়াং ইটালি" অনুপ্রেরণায়। প্রথমবার গ্রেপ্তার হওয়ার আগে অবধি সাভারকর বাস্তবিকই সশস্ত্র বিপ্লবে আস্থা রেখেছিলেন - সেই আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই অভিনব ভারতের সদস্যদের হাতে একাধিক ব্রিটিশ অফিসার খুনও হয়েছিলেন - ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে। ব্রিটিশ শাসন এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে সাভারকরের মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে যায় গ্রেপ্তারির পর, এবং আবারও ইতিহাস সাক্ষী - যে আরএসএস বা হিন্দু মহাসভা পরবর্তীকালে ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতার রাস্তাতেই হেঁটেছে। সাভারকরের তৈরী সেই অভিনব ভারত বন্ধ হয়ে যায় ১৯৫২ সালে। 

২০০৮ সালে, মালেগাঁও বিস্ফোরণের পর আউটলুকের ওই সাক্ষাৎকারে হিমানী জানান যে ১৯৫২ সালের আরো পঞ্চাশ বছরেরও কিছু পরে নতুনভাবে অভিনব ভারত শুরু করেছিলেন সমীর কুলকার্নি, আর তিনিই হিমানীকে অনুরোধ করেছিলেন সংগঠনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিতে - হিমানী সেই সময়ে ছিলেন হিন্দু মহাসভার সভাপতি। ২০০৮ সালে পুলিশের কাছে হিমানী জানান যে ওই বছরেরই এপ্রিল মাসে ভোপালে একটা মিটিঙে তাঁকে সংগঠনের সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হিমানীর জবানবন্দী অনুযায়ী সমীর কুলকার্নি মূলতঃ মধ্যপ্রদেশেই ভিতরেই চেষ্টা করছিলেন অভিনব ভারতকে তৈরী করার। যে মিটিঙে তাঁকে সভাপতি স্থির করা হয়, সেই মিটিঙে উপস্থিত ছিলেন আরও কয়েকজন - স্বামী অমৃতানন্দ দেবতীর্থ (যাঁকে আরও অন্য কিছু নামে জানা যায় -  সুধাকর দ্বিবেদী, সুধাকর ধর, আর দয়ানন্দ পাণ্ডে যার মধ্যে অন্যতম, এবং হিমানী যাঁকে জম্মু কাশ্মীর শঙ্করাচার্য্য বলে ডাকতেন), সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, মেজর রমেশ উপাধ্যায়, সুধাকর চতুর্বেদী, এবং কর্ণেল শ্রীকান্ত প্রসাদ পুরোহিত - এই শেষের জনকে হিমানী অন্ততঃ দু বছর আগে থেকেই চিনতেন, পারিবারিক সম্পর্কের কারণে।

I know colonel Purohit personally, for over two years but our families have ties that go back a long time. But, he has never ever spoken to me about the Abhinav Bharat Trust – either that he founded it or about its work. Similarly, I do not know if he as involved with the Abhinav Bharat Sangathan in Madhya Pradesh.” [Interrogatories: 8, Malegaon Blast Documents]

তবে, মালেগাঁও বিস্ফোরণের অন্যান্য টেস্টিমোনিয়াল থেকে মনে হয়ে অভিনব ভারতের আসল সংগঠক ছিলেন শ্রীকান্ত পুরোহিত নিজেই। তিনিই ২০০৬ সালের জুন মাসে ষোলোজন লোককে নিয়ে রায়গড়ে ছত্রপতি শিবাজীর দূর্গে অভিনব ভারত ট্রাস্টের সূচনা করেছিলেন। পুলিশের জেরায় সেই ষোলোজনের একজন জানান - “We took the blessings of Shivaji Maharaj’s throne and decided to name the trust Abhinav Bharat and prayed for its success” [Interrogatories: 1, Malegaon Blast Documents]। এর পরের বৈঠক হয় ২০০৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর - যেদিন উপস্থিত সদস্যরা একসাথে বিজয়দিবস (বাংলাদেশ যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের জয়) সেলিব্রেট করেন। যদিও, ট্রাস্টের প্রথম অফিশিয়াল মিটিং হয় ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, পুণের কারভে রোডের সন্ত কৃপা অ্যাপার্টমেন্টের এক ঠিকানায় - ট্রাস্টের অফিশিয়াল ঠিকানাও ছিলো এখানেই, ট্রাস্টের সদস্য এবং ট্রেজারার অজয় রাহিরকরের বাড়িতে। 

পরের মিটিং সম্ভবত হয় ২০০৭-এর জুন মাসে, নাসিকে, যেখানে পরশুরাম সাইখেদকর থিয়েটারে ট্রাস্টের উদ্বোধন হয়। কর্ণেল পুরোহিত মুম্বই থেকে বেশ কয়েকজন লোককে নিয়ে সেখানে গেছিলেন...গেছিলেন দেওলালি ক্যাম্পেও - যেখানে অমৃতানন্দ দেবতীর্থ তাঁর শিষ্যদের "দর্শন" দিচ্ছিলেন সেই সময়েই। পুরোহিতের সঙ্গে যাঁরা গিয়েছিলেন দেওলালিতে, তাঁদের একজন ১৪ই ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে পুলিশের কাছে জানান যে এই মিটিঙেই কর্ণেল পুরোহিত দেশের অবস্থা সম্পর্কে অনেক কথা বলেন - বলেন দেশে যা হচ্ছে তার অনেক কিছুই ভুল, এবং সেই ভুলগুলো শুধরোতে হবে - তার জন্যে একতা জরুরী। শঙ্করাচার্য্য, মানে অমৃতানন্দ বলেন - হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করতে হবে, হিন্দু ধর্ম বিপদে (সেই বিখ্যাত "হিন্দু খতরে মে হ্যাঁয়") - আমাদের দায়িত্ব হিন্দুধর্মকে রক্ষা করা। সেই জন্যে দেশের সব হিন্দুকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে…শঙ্করাচার্য্যের বক্তৃতার সময়েই পুরোহিত টেবিলে নিজের ল্যাপটপ রেখে চালু করেন মিটিং রেকর্ড করার উদ্দেশ্যে। পুরোহিত নিজে জোরগলায় দাবী করেন যে মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে দরকারে বোমা বিস্ফোরণ অবধি যেতে হবে - যদিও কয়েকজন এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। একজন সদস্য পুরোহিতকে বলেন এই ধরণের মিটিঙে যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক হতে পারে, সেখানে বোমা ইত্যাদিতে উৎসাহী কাউকে না ডাকতে, এবং তিনি নিজে বোমা বিস্ফোরণ, দাঙ্গা বা অন্যান্য হিংসাত্মক পন্থার বিপক্ষে - অভিনব ভারত ট্রাস্ট সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করার জন্যে তৈরী হয়নি, ইত্যাদি... [Interrogatories: 2, Malegaon Blast Documents]। 

সেই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে দেওলালিতে আরও একটা বৈঠক বসে - আবারও মুম্বই থেকে আসা বেশ কিছু লোক, এবং কর্ণেল পুরোহিত ছিলেন সেখানে। এইবারে আরেকজন নতুন লোক ছিলেন - পূর্ব দিল্লীর সাংসদ, ভারতীয় জনতা পার্টির বিএল শর্মা। শর্মার সঙ্গে অমৃতানন্দর পরিচয় আগেই ছিলো - ২০০৪ সালে, নিজের লোকসভা কেন্দ্র ঘোরার সময়ে - সেই কেন্দ্রের কাশ্মীরি পণ্ডিত উদ্বাস্তুদের মধ্যে অমৃতানন্দ বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। ২৬শে ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে শর্মা জানান যে সেই মিটিঙে অমৃতানন্দ নিজের ল্যাপটপে ইসলামিক উগ্রপন্থীদের নানান ভয়ানক কাজের ভিডিও দেখিয়েছিলেন। ২০০৭ সালের নাসিকের বৈঠকে অমৃতানন্দই শর্মাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেদিন তিনি অখণ্ড ভারতের আইডিয়ার কথা বলেন - কীভাবে অভিনব ভারতের হাত ধরে ভারতবর্ষ হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে উঠবে... 

"There he spoke about his idea of Akhand Bharat and of making India a Hindu Rashtra and he also talked about the Abhinav Bharat organisation. He told us that Prasad Purohit was trying to achieve Akhand Bharat through his Abhinav Bharat organisation. We were told that Sudhakar Chaturvedi was working full-time for the organisation. Our meeting lasted one hour during which we discussed the rape of Hindu women in J and K, their murder, etc…. I returned to Delhi after the meeting [Interrogatories: 6, Malegaon Blast Documents].

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মালেগাঁও বিস্ফোরণের গোটা ছক এবং তার খুঁটিনাটি  তৈরী হয়েছিলো ২০০৮ সালে হওয়া চারটে মিটিঙে [Chargesheets and Miscellaneous Documents – Malegaon Case: 61]। 

২০০৮ সালের ২৫-২৭শে জানুয়ারি প্রথম মিটিঙে কর্ণেল পুরোহিত, মেজর উপাধ্যায়, সমীর কুলকার্নি, সুধাকর চতুর্বেদী এবং অমৃতানন্দ দেবতীর্থ দেখা করেন ফরিদাবাদে "সেভ আওয়ার সোল" সংস্থার এক বাড়িতে যেখানে অমৃতানন্দ সেই সময়ে থাকতেন। এই মিটিঙের একটা বড় অংশ ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলির ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় - ক্রিস্টফ জাফ্রেলোর আর্টিকলের সাথে। পুলিশ তদন্তের সময়ে অমৃতানন্দের রেকর্ড করা এই মিটিঙের পুরো ভিডিও খুঁজে পেয়েছিলো - সেই ভিডিও থেকে জানা যায় যে আরও তিনজন ব্যক্তি এই মিটিঙে উপস্থিত ছিলেন - সাংসদ বিএল শর্মা, অ্যাপোলো হাসপাতালের ডঃ আরপি সিং, আর কর্ণেল আদিত্য ধর। ফরিদাবাদের এই মিটিঙে আরপি সিং গল্পচ্ছলে বলেছিলেন যে তিনি কীভাবে মকবুল ফিদা হুসেনের নামে মামলা করেছিলেন, এমনকি জামিয়া মিলিয়ায় এক অনুষ্ঠানে যেখানে হুসেনের বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিলো, সেখানেও উনি পৌঁছে গেছিলেন ১৫ লিটার পেট্রল নিয়ে - হুসেনকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে - যদিও সুযোগ পাননি, কারণ অসুস্থতার কারণে হুসেন সেই অনুষ্ঠানে যাননি...

এপ্রিলের ১১-১২ তারিখে এঁরাই (মানে, মূল পাঁচজন - পুরোহিত, উপাধ্যায়, কুলকার্নি, চতুর্বেদী আর অমৃতানন্দ) ভোপালে দেখা করেন প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরের সঙ্গে, এবং মালেগাঁওয়ের কোনও একটা জনবহুল এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মুসলমানদের ওপর বদলা নেওয়ার কথা স্থির করেন। পুরোহিত দায়িত্ব নেন বিস্ফোরক যোগাড়ের, প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর দায়িত্ব নেন বিস্ফোরণ ঘটানোর লোক যোগান দেওয়ার...এবং এই মিটিঙে উপস্থিত প্রত্যেকে একযোগে এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। পুলিশ এও প্রমাণ করেছিলো যে বিস্ফোরণে মূল অভিযুক্তরা ছাড়া অন্য কয়েকজনও এই মিটিঙে ছিলেন - এমনকি হিমানী সাভারকরও - তাঁর নিজের জবানবন্দী অনুযায়ীই।

এরপর, ১১ই জুনের পরবর্তী মিটিঙে সাধ্বী প্রজ্ঞা তাঁর সঙ্গে আনেন আরও দুজন লোককে - রামচন্দ্র কালসাংরা, আর সন্দীপ ডাঙ্গে - বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা যারা মালেগাঁওয়ে বোমা রাখার আসল কাজটা করবে - এইভাবেই এদের পরিচয় করিয়ে দেন অমৃতানন্দের সঙ্গে [Chargesheets and Miscellaneous Documents – Malegaon Case: 65]।

৩রা আগস্ট উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের ধর্মশালায় হওয়া এক মিটিঙে কর্ণেল পুরোহিতকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কালসাংরা আর ডাঙ্গের জন্যে আরডিএক্স যোগাড় করার। পুরোহিতের নির্দেশে তাঁর সহযোগী রাকেশ ধাওরে (পুরোহিতের ভাষায় “a trained expert in committing explosions and assembling improvised explosive devices”),  আগস্টের ৯/১০ তারিখে পুণেতে কালসাংরা আর ডাঙ্গের সঙ্গে দেখা করে তাদের হাতে বিস্ফোরক তুলে দেন [Chargesheets and Miscellaneous Documents – Malegaon Case: 66]।

শুরু হয় চূড়ান্ত প্রস্তুতি - যার ফল মালেগাঁও বিস্ফোরণ, এবং সেই বিস্ফোরণের তদন্তের সময়েই প্রথম সামনে আসে স্যাফ্রন টেরর বা হিন্দু উগ্রপন্থার কথা।

এরপর বিভিন্ন চরিত্রগুলোর সাথে পরিচয় করাবো একে একে, আর দেখাবো এর আগে বার দুয়েক হাইলাইট করে দেওয়া জাতিগত পরিচয়ের রেফারেন্স কেন আর কতটা জরুরী।

#ShadowArmiesOfHindutva

(১) Shadow Armies - Fringe Organisations and Foot Soldiers of Hindutva, Dhirendra Kr. Jha
(২) Abhinav Bharat, the Malegao Blast and Hindu Nationalism: Resisting and Emulating Islamist Terrorism, Christophe Jaffrelot, Economic & Political Weekly, Vol. 45, Issue No. 36, 04 Sep, 2010
(৩) Chargesheets and Miscellaneous Documents regarding the Malegaon Case

#ShadowArmiesOfHindutva - Part 4

যে সিকোয়েন্সটা মাথায় রেখে লিখতে শুরু করেছিলাম - হিন্দুত্বের শ্যাডো আর্মি বা ছায়া সৈন্য হিসেবে তথাকথিত ফ্রিঞ্জ গোষ্ঠীগুলোর কথা - সেইটা শুরু করি এবার। মুসলমানদের "ওরা" হিসেবে দেখতে শুরু করার টাইমলাইন, মেইনস্ট্রীম হিন্দুত্বের শুরু, আর তার পিছনে নাৎসী আর ফ্যাসিস্টদের চিন্তাভাবনার অবদান, এমনকি এদের মধ্যে যোগাযোগের কথা আগেই বলেছি...

এবার একটু রিসেন্ট সময়ে ফিরি।

মালেগাঁও বিস্ফোরণ, অভিনব ভারত, আর ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলের হিন্দু জাতীয়তাবাদ...

- শুরুর কথা -

একবিংশ শতাব্দী শুরু হয়েছিলো ১১ই সেপ্টেম্বরের টুইন টাওয়ার আক্রমণ দিয়ে - ২০০১ সালে। আমি তখন ওয়াশিংটন ডিসির কাছে চাকরি করি, থাকি মেরিল্যান্ডে। কাজেই সেই দিনের ঘটনাক্রম, তার পরের দিনগুলো - যখন মানুষজনের চোখে একই সাথে আতঙ্ক আর আমার মত গায়ের চামড়ার লোকেদের দিকে সন্দেহভরা দৃষ্টি - দুইই মনে আছে।

শুরুটা আমেরিকা দিয়ে হলেও ভারতেও আঘাত কম আসেনি। ঘটনার সংখ্যা দিয়ে হিসেব করলে ভারত উগ্র ইসলামিক মৌলবাদের হাতে অন্যতম আক্রান্ত দেশ হয়ে উঠেছিলো। ২০০৮ সালের নভেম্বর অবধি প্রায়সই এখানে ওখানে বিস্ফোরণ - কখনো বড় শহরে, কখনো মাঝারি শহরে - মানুষ মরেছে কখনো হয়তো দশবারোজন, কখনো শখানেক বা আরো বেশি। ২০০১ থেকে ২০০৮ অবধি মৃত মানুষের সংখ্যা প্রায় আটশোর কাছাকাছি।

২০০৬/০৭ অবধি এরকম সমস্ত ঘটনারই দায় সরকারি তরফে চাপানো হত প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর। অফিশিয়াল ভাষ্য বা সাধারণ মানুষের ধারণায় ছিলো যে এদেশের নাগরিকদের হাতে এরকম ঘটনা ঘটে না, দোষীরা প্রধাণতঃ পাকিস্তান বা বাংলাদেশের নাগরিক। যদিও তদন্তে দেখা গেছে ভারতীয় মুসলমানদের একাংশও কখনো অযোধ্যা বা কখনো গুজরাট দাঙ্গার বদলা নিতে এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ছে - এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যাপারটা শুধু সাহায্য করা বা খবরাখবর দেওয়ার মধ্যে আটকে থাকছে না। ২০০৮ সালে জয়পুর, আহমেদাবাদ আর দিল্লীতে বিস্ফোরণের ক্ষেত্রে দেখা গেছে সেখানে সম্ভবতঃ Students Islamic Movement of India (SIMI) থেকে গজিয়ে ওঠা ইন্ডিয়ান মুজাহিদীন জড়িত।

যেটা প্রথমে কেউই বুঝতে পারেনি সেটা হল এরই পালটা হিসেবে হিন্দুত্ববাদীদের হাতে নতুন হিন্দু মিলিশিয়া তৈরী হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে তারা পুরনো প্রায়মৃত সংগঠনকে আবার অ্যাক্টিভ করে তুলেছে, আর উগ্র ইসলামিক জঙ্গীদের কাজের বদলা নিতে টার্গেট করেছে সাধারণ ভারতীয় মুসলমানদের। 

হ্যাঁ, এখানে শুরুতে "বুঝতে পারেনি" কথাটা লিখলাম ঠিকই - হয়তো সত্যিই বুঝতে পারেনি। যদিও কখনো কখনো সন্দেহ হয় যে যাদের বোঝার দরকার ছিলো তারা হয় বুঝতে চায়নি, বা তাদের বুঝতে দেওয়া হয়নি। কারণ, যারা এই কাজে জড়িত প্রায় সকলেই কোনো না কোনোভাবে সংঘ পরিবারের সঙ্গে যুক্ত, আর সংঘ পরিবারের হাতে তিরিশের দশক থেকে ঘটে চলা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর কথা আগেই লিখেছি। কাজেই, সন্দেহটা সত্যি হলে আশ্চর্য্যের কিছু থাকবে না।

২০০৮ সালে, রমজানের ঠিক পরেই সেপ্টেম্বর মাসে মালেগাঁও শহরে এক মসজিদের সামনে ঘটা বিস্ফোরণে মারা যায় ছ'জন লোক। সেই তদন্তের সময়ে হিন্দুত্ববাদীদের এই পুরো পরিকল্পনা প্রথম সামনে আসে - বিভিন্ন জায়গায় সার্চের সময় পাওয়া জিনিসপত্র আর ডকুমেন্ট থেকে জানা যায় যে মালেগাঁও বিস্ফোরণের পিছনে দায়ী অভিনব ভারত বলে একটা "নতুন" সংগঠন - যাদের লক্ষ্য ইসলামিক উগ্রপন্থার জবাব তাদেরই আদলে হিন্দু উগ্রপন্থা দিয়েই দেওয়া - টিট ফর ট্যাট, যে উগ্রপন্থাকে ধিক্কার জানানোর কথা, তারই নকল করে।

মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্তে নেমে হেমন্ত কারকারের তৈরী রিপোর্ট থেকে এই ঘটনার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়...এবং, হিন্দু জাতীয়তাবাদী মহলের ভিতরকার ডিসকোর্সের একটা আঁচ পাওয়া যায় বিভিন্ন চরিত্রের মধ্যে কথোপকথনের রেকর্ডিং (এবং ট্রানস্ক্রিপ্ট) থেকে - ২০০৭-০৮ এর মধ্যে হওয়া বিভিন্ন গোপন মিটিংএর।

এর পর কয়েকটা পর্বে বলবো মালেগাঁও বিস্ফোরণের পিছনের গোটা গল্পটা।

#ShadowArmiesOfHindutva

(১) Shadow Armies - Fringe Organisations and Foot Soldiers of Hindutva, Dhirendra Kr. Jha
(২) Abhinav Bharat, the Malegao Blast and Hindu Nationalism: Resisting and Emulating Islamist Terrorism, Christophe Jaffrelot, Economic & Political Weekly, Vol. 45, Issue No. 36, 04 Sep, 2010
(৩) Chargesheets and Miscellaneous Documents regarding the Malegaon Case

#ShadowArmiesOfHindutva - Part 3

আইআইটি বম্বের অধ্যাপক এক বন্ধুর লেখা পড়ছিলাম - কেন্দ্রীয় মন্ত্রক থেকে সরকারি চিঠি এসেছে সকলকে পরিবার, বন্ধুবান্ধব সকলকে নিয়ে একটা সিরিয়াল দেখতে বলে। চিঠিতে লেখা হয়েছে ছাত্রদেরও বলতে সিরিয়ালটা দেখতে, আর তারপর তাদের নিয়ে একটা ক্যুইজ করতে, যাতে ছাত্ররা কী "শিখেছে" জানা যায়। সিরিয়ালটা ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছরে #AzadiKaAmritMahotsav উপলক্ষ্যে, আর সেখানে পরাধীন ভারতের টাইমলাইন ধরা হয়েছে ১৫০০ সাল থেকে - মানে মোটামুটি মুঘল সাম্রাজ্যের শুরু (যদিও সেটা সঠিকভাবে দেখলে ১৫২৬ খ্রীষ্টাব্দ) থেকে৷ যদি মুসলমান শাসনকেই পরাধীন ধরা হয়, তাহলে মুঘল শাসনের আগের প্রায় তিনশো বছরকে কোন অঙ্কে বাদ রাখা হল সেটা অবশ্য বোঝা যায় না - হতে পারে তুঘলকের সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মানসিকতার মিল আছে বলেই হয়তো...

তবে একটা ব্যাপার স্পষ্ট, অধ্যাপক বন্ধুও লিখেছেন - মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে "ওরা" হিসেবে চিহ্নিত করার অফিশিয়াল প্রক্রিয়ার শুরু এখান থেকেই। এতদিন বিজেপি মুখে বলতো, তথাকথিত "ফ্রিঞ্জ" গোষ্ঠীগুলো কুপিয়ে, পুড়িয়ে, পিটিয়ে করে দেখাত। এইবার তার "ফর্মালাইজেশন" শুরু হল। যদিও, এই তত্ত্বের শুরু বহু আগে। আজকে সেইটাই একবার ফিরে দেখি - এই তত্ত্বের সাথে ফ্যাসিস্ট আর নাৎসী আদর্শের ঠিক কতটা যোগাযোগ ছিলো।

************************************************
তিরিশের দশকের শেষার্ধ - মানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার বছর দুয়েক আগের কথা…

ছাড়া পাওয়ার পরেই, ১৯৩৭ সালে হিন্দু মহাসভার প্রেসিডেন্ট হ'ন সাভারকর, আর এই পদে ছিলেন ১৯৪২ অবধি। যদিও সাধারণভাবে বলা হয় যে আরএসএস আর হিন্দু মহাসভার মধ্যে সম্পর্ক বিশেষ ভালো ছিলো না, আর সাভারকরের আমলেই এই দুই সংগঠনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় - তবে ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হয় সেটা সম্পূর্ণ গল্পকথা। এরকম ছাড়াছাড়ি তো হয়ইনি, বরং দিব্যি যোগাযোগ বহাল ছিলো। আরএসএস এর প্রতিষ্ঠাতা হেডগেওয়ার নিজেই হিন্দু মহাসভার সভাপতি ছিলেন ১৯২৬ থেকে ১৯৩১ অবধি, আর সাভারকরের জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার উৎসবে আরএসএস সদস্যদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মত ছিলো। সেই সময়ে আরএসএস আর হিন্দু মহাসভার বেশ কিছু সভায় সাভারকর বক্তৃতা দেন - যার মূল পয়েন্টগুলো ছিলো তৎকালীন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি আর ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে।

১৯৩৮ সালের পয়লা আগস্ট, পুণের এক সভায় (প্রায় ২০০০০ লোকের উপস্থিতিতে) সাভারকর জার্মানি আর ইতালিতে নাৎসী আর ফ্যাসিস্ট সরকারের সমর্থনে বক্তৃতা দেন। আক্রমণের মূল লক্ষ্য ছিলেন জওহরলাল নেহরু।

"Who are we to dictate to Germany, Japan or Russia or Italy to choose a particular form of policy of government simply because we woo it out of academical attraction? Surely Hitler knows better than Pandit Nehru does what suits Germany best. The very fact that Germany or Italy has so wonderfully recovered and grown so powerful as never before at the touch of Nazi or Fascist magical wand is enough to prove that those political “isms” were the most congenial tonics their health demanded.

India may choose or reject particular form of government, in accordance with her political requirements. But Pandit went out of his way when he took sides in the name of all Indians against Germany or Italy. Pandit Nehru might claim to express the Congress section in India at the most. But it should be made clear to the German, Italian, or Japanese public that crores of Hindu Sanghatanists in India whom neither Pandit Nehru nor the Congress represents, cherish no ill-will towards Germany or Italy or Japan or any other country in the world simply because they had chosen a form of government or constitutional policy which they though (sic) suited best and contributed most to their national solidarity and strength.

এই পুরো বক্তৃতা ছাপা হয়েছিলো হিন্দু মহাসভার অফিশিয়াল প্রেস নোটে। 

ততদিনে হিটলার অস্ট্রিয়া আর চেকোস্লোভাকিয়া আক্রমণ করে বসেছেন - অস্ট্রিয়া আর সুদেটেনল্যান্ডকে জার্মানির সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার জন্যে। হিটলারের দাবী অনুযায়ী তা ছিলো সুদেটেন জার্মানদের ইচ্ছাকে সম্মান করা। একই সভায় সাভারকর এই আগ্রাসনকেও সমর্থন করেন - 

"...as far as the Czechoslovakia question was concerned the Hindu Sanghatanists in India hold that Germany was perfectly justified in uniting the Austrian and Sudeten Germans under the German flag. Democracy itself demanded that the will of the people must prevail in choosing their own government. Germany demanded plebiscite, the Germans under the Czechs wanted to join their kith and kin in Germany. It was the Czechs who were acting against the principle of democracy in holding the Germans under a foreign sway against their will...Now that Germany is strong why should she not strike to unite all Germans and consolidate them into a Pan-German state and realise the political dream which generations of German people cherished."

হিন্দু মহাসভার এই প্রেস নোট নাৎসী আর ফ্যাস্টিস্ট শক্তির প্রতি সাভারকরের আকর্ষণকেই প্রমাণ করে - পরবর্তীকালে যেটা আন্তর্জাতিক অবস্থা সম্পর্কে হিন্দু মহাসভার নিজস্ব স্ট্যান্ড হিসেবেই পরিচিতি পাবে। খানিকটা নেহরু যেভাবে বন্ধু ও শত্রু বেছে নিয়েছিলেন - সেরকমই - শুধু দুজনের বন্ধু আর শত্রু ছিলো উলটো। সুদেটেনল্যান্ডে জার্মান সংখ্যালঘুদের সাথে তুলনা করে সেই বছরেরই অক্টোবর মাসে পুণেতে আর এক সমাবেশে সাভারকর বলেন যে ভারতে এরকম প্লেবিসাইট হলে মুসলমানরা মুসলমানদের সঙ্গে আর হিন্দুরা হিন্দুদের সঙ্গে থাকাকেই বেছে নেবে - "নেশন বিল্ডিং"-এর জন্যে কয়েক শতাব্দী ধরে একসঙ্গে থেকে আসা যথেষ্ট নয়, বরং "the common desire to form a nation was essential for the formation of a nation" - এই ছিলো সাভারকরের বক্তব্য। অবধারিতভাবে সাভারকরের এই গোটা বক্তৃতা নাৎসী মুখপত্র ভোয়েল্কলিশে বেয়োবাখটারে (Volkischer Beobachter) ছেপে বেরোয় ১৯৩৮ সালের নভেম্বর মাসে।

এই সময়টাই ক্রিটিকাল - হিন্দু আর মুসলমানদের "আমরা-ওরা" হিসেবে দেখতে শুরু করার। সাভারকর হিন্দু মহাসভার সভাপতি থাকাকালীন মুসলমানবিরোধী রেটরিক ক্রমশঃ বাড়তে থাকে, ক্রমশঃ আরো অপ্রীতিকর হতে শুরু করে। সাভারকর ক্রমাগত ইহুদীদের প্রতি নাৎসী জার্মানির মনোভাবকে, বরং বলা ভালো Hitler’s answer to the Jewish Question কে সমর্থন করতে শুরু করেন - প্রকাশ্যেই, বিভিন্ন বক্তৃতায়, আর ভারতের মুসলমানদের জন্যেও একই "দাওয়াই"-এর কথা বলে চলেন।

"A Nation is formed by a majority living therein. What did the Jews do in Germany? They being in minority were driven out from Germany." (২১শে অক্টোবর, ১৯৩৮, মালেগাঁও)

অথবা

১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর মাসে আরএসএস কর্মীদের এক সভায় -

"in Germany the movement of the Germans is the national movement but that of the Jews is a communal one"

এই দ্বিতীয় বক্তব্যটার সময়টা বোঝা বিশেষ করে জরুরী, কারণ তার ঠিক কিছুদিন আগেই, নভেম্বর মাসের ৯-১০ তারিখে ঘটে গেছে নাইট অফ দ্য ব্রোকেন গ্লাস বা কৃস্ট্যালনাখট - সারা পৃথিবী জেনে গেছে ইহুদীদের সম্পর্কে নাৎসীদের মনোভাব, ভারতে নেহরুর নেতৃত্বে কংগ্রেসও সেই কৃস্ট্যালনাখটের বিরোধিতায় মুখর হয়েছে।

১৯৩৯ সালের  শেষের দিকে, হিন্দু মহাসভার একুশতম সম্মেলনে সাভারকর সবচেয়ে স্পষ্টভাবে ভারতীয় মুসলমানদের সম্পর্কে তাঁর নিজের, এবং গোটা হিন্দু সাম্প্রদায়িক বৃত্তের মনোভাব খুলে বলেন - ২৯শে ডিসেম্বরের বম্বে ক্রনিকলে যার সামারি বেরোয়।

"...the Indian Muslims are on the whole more inclined to identify themselves and their interests with Muslims outside India than Hindus who live next door, like Jews in Germany."

খেয়াল করে দেখবেন - এই বক্তব্যের সাথে সাভারকরের "হিন্দুত্ব" বইয়ে লেখা নেশন আর নেশনহুড নিয়ে কথাবার্তার বিশেষ তফাত নেই। এবং সাভারকরের ক্ষেত্রে এই ধারণার সূত্রপাত তিরিশের দশকের অনেক আগেই - কারণ হিন্দুত্ব বইটা লেখা হয়েছিলো এর অন্ততঃ কুড়ি বছর আগে, আন্দামানে, যেটা লুকিয়ে ভারতে নিয়ে আসা হয়, এবং আন্ডারগ্রাউন্ডেই ছাপা হয় ১৯২৩ সালে।

"their holyland is far off in Arabia or Palestine. Their mythology and godmen, ideas and heroes are not the children of this soil. Consequently their names and their outlook smack of foreign origin."

অর্থাৎ, সাভারকরের ক্ষেত্রে, মুসলমানদের "ওরা" হিসেবে চিহ্নিত করার শুরু অনেক আগেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপরই - যে সময়ে জার্মানিতেও ইহুদীদের দায়ী করা শুরু হয় বিশ্বযুদ্ধে হারের জন্যে। তিরিশের দশকে, বলা ভালো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে, সাভারকর এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বরং নিজেদের আদর্শ খুঁজে পেয়েছিলেন নাৎসী আর ফ্যাসিস্ট শক্তির মধ্যে। আর, এই মনোভাবকেই আরএসএস নিয়ে গিয়েছিলো আরও গ্রাসরুট লেভেলে - যার ছাপ পাওয়া যায় গোলওয়ালকরের "We, or Our Nationhood Defined" বইয়ে - সেই গোলওয়ালকর, যিনি আরএসএস-এর প্রধান হয়েছিলেন ১৯৩৯ সালে।

"German race pride has now become the topic of the day. To keep up the purity of the Race and its culture, Germany shocked the world by her purging the country of the Semitic Races - the Jews. Race pride at its highest has been manifested here. Germany has also shown how well-nigh impossible it is for Races and cultures, having differences going to the root, to be assimilated into one united whole, a good lesson for us in Hindusthan to learn and profit by. Then the state language is German, and the foreign races living in the Country as minorities, though they have freedom to use their respective languages among themselves, must deal in the nation's language in their public life. The factor of religion, too, is not to be ignored."

এই ধ্যানধারণার সূত্রপাত একটা আইডিয়া থেকে - যেখানে ভাবা হয় হিন্দুত্ব (সাভারকরের ভাষায়) আসলে জাতি এবং রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত, সংস্কৃতির সঙ্গে নয়। হিটলারের মেইন ক্যাম্পফ পড়লে দেখবেন খাঁটি জার্মান বা আর্য্য জার্মান সম্পর্কেও ভাবনাগুলো এরকমই। যদি আধুনিককালের সাহিত্য থেকে উদাহরণ দিলে বুঝতে সুবিধা হয়, তাহলে হ্যারি পটারের গল্পে মাডব্লাড বা মাগল, আর পিওর ব্লাডের ডেফিনেশন দেখে নিতে পারেন, সঙ্গে ভল্ডেমর্ট এবং তার সঙ্গীসাথীদের মনোভাবও।

মুসলমানদের সম্পর্কে গোলওয়ালকরের চিন্তাভাবনা ছিলো আরও উগ্র। ওই একই বইয়ে পরের অংশটাও পাওয়া যায় - 

"There are only two courses open to the foreign elements, either to merge themselves in the national race and adopt its culture, or to live at its mercy so long as the national race may allow them to do so and to quit the country at the sweet will of the national race.... From this standpoint, sanctioned by the experience of shrewd old nations, the foreign races in Hindusthan must either adopt the Hindu culture and language, must learn to respect and hold in reverence Hindu religion, must entertain no idea but those of the glorification of the Hindu race and culture, i.e., of the Hindu nation and must lose their separate existence to merge in the Hindu race, or may stay in the country, wholly subordinated to the Hindu Nation, claiming nothing, deserving no privileges, far less any preferential treatment—not even citizen’s rights. There is, at least should be, no other course for them to adopt. We are an old nation; let us deal, as old nations ought to and do deal, with the foreign races, who have chosen to live in our country."

এই অংশটা একটু অনুবাদ করে দিই যাতে পড়ে বুঝতে সুবিধা হয়। 

"এই বিদেশীদের জন্যে দুটিই রাস্তা খোলা রয়েছে। হয় তাদের রাষ্ট্রীয় জাতি হিসেবে তৈরী হতে হবে, অথবা তাদের রাষ্ট্রীয় জাতির আধিপত্য মেনে নিয়ে মাথা নীচু করে বাঁচতে হবে - যতদিন তাদের এই দেশে থাকার অনুমতি দেওয়া হবে, ততদিন পর্যন্ত। এবং যেদিন মনে করা হবে তাদের এই দেশে থাকার প্রয়োজন নেই, সেদিন তাদের দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। পৃথিবীর অতিপ্রাচীন জাতিগুলির আদর্শে তৈরী এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী হিন্দুস্তানের সমস্ত বিজাতীয় মানুষকে হিন্দু সংস্কৃতি ও ভাষাকে আপন করে নিতে হবে, হিন্দু ধর্মকে শ্রদ্ধা করতে হবে, এবং একমাত্র হিন্দু জাতি ও সংস্কৃতি - অর্থাৎ হিন্দু রাষ্ট্রকে মহিমান্বিত করা ছাড়া অন্য কোনো ধারণা বহন করা যাবে না। হয় তাদের নিজস্ব সমস্ত সত্ত্বা বিসর্জন দিয়ে হিন্দু জাতির সাথে একাত্ম হতে হবে, অথবা হিন্দু জাতির শ্রেষ্ঠতা মেনে নিয়ে তাদের বশ্যতা স্বীকার করে, কোনো সুযোগসুবিধার দাবী না করে, কোনো অগ্রাধিকারের আশা না করে, এমনকী নাগরিক সুযোগসুবিধার চাহিদাও না রেখে এই দেশে থাকতে হবে। এ ছাড়া অন্য কোনো উপায় তাদের কাছে থাকবে না। আমরা প্রাচীন জাতি; প্রাচীন জাতিরা যেভাবে বিদেশীদের দেখেছে, আমরাও আমাদের দেশে থাকা বিদেশীদের সেইভাবেই দেখবো।"

এইখানে একটা বড় পয়েন্ট মাথায় রাখা দরকার - সেই সময়ের বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে যে আইডিয়া পাওয়া যায়, সেটা হল এইরকমের ভাবনা শুধু উগ্র হিন্দুত্ববাদীদেরই ছিলো তা নয়, বরং মারাঠি উচ্চবর্ণীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে এইসবই ছিল প্রচলিত ধারণা, এবং বিভিন্ন মারাঠি খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিনে নাৎসী ও ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরদের বিভিন্ন কাজকর্মের প্রশংসা করে লেখাপত্রও ছাপা হত - যেগুলোর সঙ্গে সাভারকর বা গোলওয়ালকরের বক্তব্যের বিশেষ তফাত ছিলো না। ১৯৩৯ সালে, দ্য মারহাট্টা পত্রিকায় ইতালি ও জার্মানির প্রশংসা করে একটা সিরিজ ছাপা হয়, কেশরী-তে ছাপা হয় গণতন্ত্রের পতন ও ফ্যাসিবাদের উত্থান নিয়ে লেখা - যেখানে ফ্যাসিবাদকে গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নত ব্যবস্থা বলে দাবী করা হয়। 

হয়তো এবার আন্দাজ করতে পারবেন - আগের একটা লেখায় মাধব কাশীনাথ দামলের পরিচয় দেওয়ার সময় কেন তার চিৎপাবন ব্রাহ্মণ পরিচয়টাকে আলাদা করে হাইলাইট করেছিলাম। সেই সময়ের মারাঠি উচ্চবর্ণ হিন্দু মনোবৃত্তিতে যা ছিলো, ক্রমশঃ সেই আইডিয়াগুলোই আরও পোক্ত হয়ে ওঠে হিন্দু মহাসভা আর আরএসএসের ছত্রছায়ায়। এবং আরএসএস এর ছত্রছায়ায় যে তথাকথিত "ফ্রিঞ্জ" সংগঠগুলো বেড়ে উঠেছিলো - যেমন সনাতন সংস্থা, হিন্দু ঐক্য বেদী, অভিনব ভারত বা ভোঁসলে মিলিটারি স্কুল - সেখানেও এই একই ধ্যানধারণা দেখতে পাওয়া যায়। বিজেপি যতই এই গোষ্ঠীগুলোকে "ফ্রিঞ্জ" বলে অস্বীকার করুক, গ্রাসরুট লেভেলে আরএসএস-এর সাথে এরাই সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং করে এসেছে এত বছর ধরে, যার ফল আমরা আজ দেখছি, আর একদম শুরুতেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের যে চিঠির কথা বলেছিলাম - সেখানেও সেই একই আইডিয়ার ফর্মালাইজেশন দেখতে পাচ্ছি। 

এই ছায়া সৈন্য বা শ্যাডো আর্মি - মানে, সনাতন সংস্থা, হিন্দু ঐক্য বেদী, অভিনব ভারত বা ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলের আল্টিমেট গোল কী, আর তার জন্যে কী কী ঘটেছে, সেই গল্পেও আসবো আস্তে আস্তে।

#ShadowArmiesOfHindutva

সূত্রঃ 

(১) Hindutva’s Foreign Tie-up in the 1930s - Archival Evidence, Marzia Casolari, Economic & Political Weekly, Vol. 35, Issue 4, 22 Jan 2000
(২) Nehru Memorial Museum and Library, Savarkar papers, microfilm, rn 23, part 2, Miscellaneous Correspondence January 1938-May 1939
(৩) Hindutva: Who is a Hindu?, VD Savarkar, 4th ed, Bharat Mudranalaya, Pune, 1949, p 94
(৪) We, or Our Nationhood Defined, MS Golwalkar, Bharat Publications, Nagpur, 1939

#ShadowArmiesOfHindutva - Part 2

একটা ছোট্ট খবর (সেই তিরিশের দশকের) দিয়ে যাই - আজকের লাস্ট ডোজ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে, ভারতে ইতালিয়ান কনসুলেটের মাধ্যমে মহারাষ্ট্র আর বাংলায় র‍্যাডিকাল মুভমেন্টগুলোর সাথে যোগাযোগ তৈরী করা শুরু হয়। আইডিয়াটা নতুন নয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানিও একই জিনিস করেছিলো - উদ্দেশ্য শত্রুপক্ষকে চারদিক থেকে বিব্রত করা।

১৯৩৮ সালের জুন মাস থেকে বম্বের ইতালিয়ান কনসুলেট বেশি বেশি করে ভারতীয় ছাত্র ভর্তি করতে থাকে ইতালিয়ান ভাষার কোর্সগুলোতে - উদ্দেশ্য ছিলো ফ্যাসিস্ট প্রোপাগান্ডা ছড়ানো। এই কাজের দায়িত্ব ছিলো মারিও কারেল্লি বলে একজনের ওপর, যিনি ছিলেন ইনস্টিটিউট ফর মিডল অ্যান্ড ফার ইস্ট (ISMEO) বলে ১৯৩৩ সালে রোমে ফ্যাসিস্ট সরকারি মদতে তৈরী হওয়া একটি সংস্থার সেক্রেটারি ও লাইব্রেরিয়ান।

সেই সময়ে এই ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে ভর্তি হওয়া অনেক ছাত্রের মধ্যে একজন বিশেষ ছাত্রের নাম ছিলো মাধব কাশীনাথ দামলে। কারেল্লির কথায়, দামলে মুসোলিনীর ডক্ট্রিন অফ ফ্যাসিজমের মারাঠি অনুবাদও করে ১৯৩৯ সালে - যেটা একটা সিরিজ হিসেবে লোখান্ডি মোর্চা (ইংরিজীতে Iron Front) নামে দামলেরই চালু করা একটা ম্যাগাজিনে ছেপে বেরোয়। শুধু এইটা নয়, আন্তোনিও পাগলিয়ারো বলে একজনের লেখা Fascism against Communism এর মারাঠি অনুবাদও ছেপে বেরোয় এই ম্যাগাজিনে। ১৯৩৯ সালের সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসে একটা বেশ উগ্র লেখা ছেপে পুলিশের নজরে আসে লোখান্ডি মোর্চা - ম্যাগাজিনটা বন্ধ করতে হয়, জরিমানাও দিতে হয় দামলেকে। সেই সময়ের পুলিশ রিপোর্টে লেখা হয় যে দামলে প্রকাশ্যে ফ্যাসিস্ট আর নাৎসী আদর্শের সমর্থক।

ইতালির সরকারকে দেওয়া ইতালিয়ান কনসালের দেওয়া রিপোর্টে লেখা হয়ঃ

"Di idee fasciste, ha fondato un'organizzazione da lui chiamata 'Iron Guards' prendendo a modello le nostre, ma adattandole alle peculiari condizioni dell'India. Egli e i suoi amici vestivano la camicia nera: le prime camicie nere dell'India. Lo sviluppo di questa organizzazionee stato compromesso dallo scoppio della guerra"

যার ইংরিজী অনুবাদ করলে দাঁড়ায় -

"Holding fascist ideas, he founded an organisation called Iron Guards, modelled on ours, but adapted to Indian peculiar conditions. He and his friends wore the black shirt: India's first black shirts. The development of this organisation was compromised by the outbreak of the war."

ইতালির ফ্যাসিস্ট ব্ল্যাকশার্টদের আদলে ভারতের প্রথম ও একমাত্র ব্ল্যাকশার্ট গোষ্ঠী তৈরীর কৃতিত্ব পুণের চিতপাবন ব্রাহ্মণ, বম্বেনিবাসী এই মাধব কাশীনাথ দামলের।

(নামের আগে জাতিগত পরিচয়টাও কিন্তু এক্ষেত্রে জরুরী। কেন, সেটা এই সিরিজের বিভিন্ন লেখায় বারবার আসবে।)

#ShadowArmiesOfHindutva

সূত্রঃ 
(১) Hindutva's Foreign Tie-up in the 1930s: Archival Evidence, Marzia Casolari, Economic & Political Weekly, Vol. 35, Issue 4, 22 Jan 2000
(২) Central State Archives (ACS), Minculpop (Ministry of Popular Culture), 17 bis, cit, report n 2298/St 3, from Italian Consulate, Bombay, October 4, 1939, to the Ministry of Popular Culture.

#ShadowArmiesOfHindutva - Part 1

১৯৩০ এর দশকে আরএসএস এর এক নামকরা খুঁটি ছিলেন ডঃ বিএস মুঞ্জে - যিনি হেডগেওয়ারের মেন্টর হিসেবেও পরিচিত। তিরিশের দশকের শুরুতে ব্রিটিশ সরকারের সাথে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে তিন রাউন্ড গোল টেবিল বৈঠক হয়েছিলো, সেখানে হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধি হিসেবে আমন্ত্রিত ছিলেন মুঞ্জেও। ১৯৩১ সালের ১৫-২৪শে মার্চ মুঞ্জে রোম গেছিলেন মুসোলিনীর সাথে দেখা করতে। মুঞ্জের ডায়েরিতে প্রায় পনেরো পাতা জুড়ে ১৯শে মার্চ তারিখের সেই সাক্ষাতের বর্ণনা রয়েছে, আর রয়েছে ফ্যাসিস্ট সংগঠনগুলো সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা। বিশেষ করে Balilla আর Avanguardisti - যে দুটো ফ্যাসিস্ট সিস্টেমের কর্নারস্টোন ছিলো - কমবয়সীদের "তৈরী" করার জন্যে - সেই দুটো নিয়ে প্রায় দুপাতা জোড়া প্রশংসা।

ভারতে ফেরার পর, ১২ই এপ্রিল, দ্য মারহাট্টা পত্রিকায় মুঞ্জের একটা সাক্ষাৎকার বেরোয় - যেখানে ভারতের হিন্দু সম্প্রদায়কে মিলিটারাইজ করার কথা বলেন মুঞ্জে - ফ্যাসিস্ট ইতালি আর নাজি জার্মানির ধাঁচে।

"In fact, leaders should imitate the youth movement of Germany and the Balilla and Fascist organisations of Italy. I think they are eminently suited for introduction in India, adapting them to suit the special conditions. I have been very much impressed by these movements and I have seen their activities with my own eyes in all details."

১৯৩৪ সালের ৩১শে মার্চ, মুঞ্জে, হেডগেওয়ার আর লালু গোখেলের মধ্যে এক বৈঠক হয় জার্মানি আর ইতালির ধাঁচে হিন্দুদের মিলিটারি অর্গানাইজেশন নিয়ে। নীচের ছবিটা মুঞ্জের ডায়েরি থেকে এই বৈঠকের বিবরণ...হাইলাইট করা অংশগুলো একটু খুঁটিয়ে দেখবেন...সনাতন ধর্ম আর ডিক্টেটর নিয়ে বক্তব্যটা ইন্টারেস্টিং লাগবে।

এই বিএস মুঞ্জের হাতেই নাসিকে প্রথম তৈরী হয়েছিলো ভোঁসলে মিলিটারি স্কুল ১৯৩৭ সালে। তার আগে অবশ্য ১৯৩৪ এই তৈরী হয় সেন্ট্রাল হিন্দু মিলিটারি এডুকেশন সোসাইটি, যার লক্ষ্য (ফের মুঞ্জেরই ভাষায়) ছিলো - 

"to bring about military regeneration of the Hindus and to fit Hindu youths for undertaking the entire responsibility for the defence of their motherland, to educate them in the Sanatan Dharma, and to train them in the science and art of personal and national defence..."

অর্থাৎ, দেশটেশের চেয়ে এখানে অনেক বড় হল হিন্দু সম্প্রদায়টুকু। ১৯৩৭ সালে নাসিকে স্কুল তৈরীর অনেক পরে, ১৯৯৬ সালে নাগপুরে একটা শাখা তৈরী হয় এই ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলের। নাসিকে ১৬০ একর আর নাগপুরে ৩০ একর জমির ওপর তৈরী এই দুটো স্কুল সেই শুরু থেকে হিন্দুত্বের "সৈন্য" তৈরী করার কাজ করে এসেছে সরকারের নাকের ডগায় বসে। সেনাবাহিনীর অনেক প্রাক্তনের মধ্যে হিন্দুত্বের যে রমরমা দেখতে পান বিভিন্ন চ্যানেলে আর মিডিয়ায়, তার পিছনে এই ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলের অবদান খুব কম নয়। আর এই স্কুলেরই কৃতি ছাত্র এবং পরে শিক্ষক লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শ্রীকান্ত পুরোহিত - মালেগাঁও ব্লাস্টের অন্যতম কর্ণধার।

ভোঁসলে মিলিটারি স্কুল, সাভারকরের তৈরী অভিনব ভারত, সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, অসীমানন্দ ইত্যাদিদের গল্পে পরে আসবো...

#ShadowArmiesOfHindutva

সূত্রঃ
(১) Shadow Armies: Fringe Organizations and Foot Soldiers of Hindutva, Dhirendra Kr. Jha
(২) Hindutva's Foreign Tie-up in the 1930s: Archival Evidence, Marzia Casolari, Economic & Political Weekly, Vol. 35, Issue 4, 22 Jan 2000
(৩) Nehru Memorial Museum and Library, Moonje Papers, microfilm, diary 1932-36

Shadow Armies: Fringe Organizations and Foot Soldiers of Hindutva

"The term Hindutva – explained by Savarkar as ‘Hindu-ness’ and not ‘Hinduism’ – is almost always used to refer to the core idea at the heart of the members of the Sangh Parivar. But on the ground, it is easy to get misled if one does not reverse the meaning of this term. It is Hinduism that is invoked to ensure the mobilization of masses and the polarization of voters. Hindutva as an ideological construct simply vanishes the moment one leaves the national headquarters of the BJP and the RSS.

The irony is that the young men from backward or lower castes who constitute a significant portion of the foot soldiers of these shadow armies are rarely able to recognize that the Hindutva to which they have dedicated their energies is nothing but brahminism. And that it is the same brahminical Hinduism that has kept them oppressed for centuries and against which they have their own legacies of resistance. They are so blinded by their growing Hindu religiosity and hatred for the ‘threatening other’ that they simply cannot see how the Hindutva they are working for ultimately seeks to revive the historical hegemony of brahmins and other upper castes.

Occasionally, the truth becomes visible. For instance, when caste hierarchies affect the distribution of power even at the local level. Sometimes this leads to the revolt of backward caste leaders and cadres (as in the case of the Sri Ram Sene), but the rebels hardly ever look for an ideological alternative.
 
The triumph of Hindutva, following the BJP’s striking victory in the 2014 Lok Sabha elections and in many of the state polls thereafter, has resulted in brahminism trying to recolonize the spaces it had been forced to vacate due to social reform movements and anti-brahminical ideological struggles. In the chapters that follow I only offer vignettes illustrating how the shadow world of Hindutva, with its reliance on violence, hate speech and even terror, has contributed to these electoral triumphs as well as to the brahminical agenda underpinning the overall Hindu nationalist project."

- The Shadow Armies: Fringe Organisations and Foot Soldiers of Hindutva

Dhirendra K. Jha travels around UP and Bihar and narrates the story behind the so-called fringe organisations - Sanatan Sanstha, Hindu Yuva Bahini, Bajrang Dal, Sri Ram Sene, Hindu Aikya Vedi, Abhinav Bharat, Bhonsala Military School and Rashtriya Sikh Sangat.

Sanatan Sanstha filed a defamation lawsuit against the publishers of this book, but lost. Worth a read.

Friday, January 03, 2020

TheNewOrder, Part 2 – Lebensraum (Living Space)

#TheNewOrder, Part 2 – #Lebensraum (Living Space)

নিউ অর্ডারের উৎস বুঝতে চাইলে একটা কনসেপ্ট আগে বুঝে নিতে হবে - লিভিং স্পেস, বা বাসস্থানের কনসেপ্ট - জার্মান ভাষায় শব্দটা হল লেবেনস্রাউম। নাৎসিদের জাতিগত ধ্যানধারণা বা বিশ্বযুদ্ধের সময়ে দেশদখল - পুরোটাই দাঁড়িয়েছিল এই লেবেনস্রাউমের ওপর। তাই, এই ধারণাটা সম্পর্কে কিছুটা লেখা দরকার।

শব্দটা প্রথম আনেন এক জার্মান ভৌগোলিক, নাম ফ্রেডরিখ র‍্যাটজেল - ১৯০১ সালে। সেই সময়ে তিনি এবং আরও অনেকে মনে করতেন যে একটা দেশকে সুরক্ষিত থাকতে হলে তাকে সমস্ত রকম রিসোর্স এবং বাসস্থানের দিক থেকে স্বনির্ভর হতে হবে। র‍্যাটজেলের মত বাকিরাও ডারউইনের "ন্যাচারাল সিলেকশন"-এর তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন, কিন্তু কোনও কারণে (ইচ্ছাকৃত নাকি অনিচ্ছাকৃত ভুল, তা আজ আর জানা যায় না) ডারউইনের প্রাণিজগতের তত্ত্ব এঁরা চাপিয়ে দিয়েছিলেন দেশের বা রাষ্ট্রের ওপরে। বলেছিলেন, প্রাণীরা যেমন প্রাকৃতিক সম্পদের জন্যে প্রতিযোগিতায় নামে, এবং যে জেতে সেই বেঁচে থাকে - যা ইভোলিউশনের জগতে "সারভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্ট" বলে বিখ্যাত, সেরকমভাবেই সমস্ত রাষ্ট্রও প্রাকৃতিক সম্পদের জন্যে প্রতিযোগিতায় নামে - জয়ী রাষ্ট্রই টিঁকে থাকে। ব্রিটিশ এবং ফরাসী কলোনিগুলো দেখিয়ে র‍্যাটজেল বলতেন যে জার্মানিকেও একইভাবে জায়গা দখল করতে হবে জার্মানির ক্রমবর্ধমান নাগরিকদের বসবাস করানোর জন্য…এবং সবচেয়ে লজিক্যাল জার্মান এক্সটেনশন হল জার্মানির পূর্বদিকের অঞ্চল - অর্থাৎ পূর্ব ইউরোপ থেকে রাশিয়া…

নাৎসি উত্থানের আগে থেকেই, মোটামুটি মধ্যযুগ থেকেই জার্মানরা পূর্ব ইউরোপে মাইগ্রেট করতে শুরু করেছিলো - মূলত অর্থনৈতিক কারণে - স্লাভিক এবং বল্টিক অঞ্চলগুলোতে বড় সংখ্যায় জার্মানরা বসবাস করতো। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জার্মান স্কলার এবং আমজনতার মধ্যে একটা ধারণা বাড়তে শুরু করে - যে এই সব অঞ্চলে জাতিগতভাবে নিচুস্তরের লোকজনের জন্যে রিসোর্সের সদ্ব্যবহার ঠিকভাবে হয়ে উঠছে না। জাতিগতভাবে নিচুস্তর বলতে স্লাভিক আর ইহুদী সম্প্রদায়ের লোকজন। ইউরোপের বাকি অংশে জার্মান অধিকারের ভুল ঐতিহাসিক দর্শনের সাথে এই নতুন জৈবিক দর্শন মিশে গিয়ে জন্ম নেয় বিংশ শতকের লেবেনস্রাউমের আইডিয়া - পরবর্তীকালে জার্মানির ভবিষ্যৎ লেখা হয় যার ওপরে…

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি এই লিভিং স্পেস প্রায় বানিয়েই ফেলেছিল - পূর্বদিকে প্রায় মিনস্ক অবধি মিলিটারি একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করে - যে একনায়কতন্ত্রের লক্ষ্য ছিলো এই গোটা অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ নিজের দখলে আনা, এবং দরকারমত ভূপ্রাকৃতিক ব্যবস্থার অদলবদল করা। ১৯১৮ সালের ১লা নভেম্বর, কম্পেইনের একটা রেল কামরায় জার্মানি আত্মসমর্পণ করে। ১৯১৯ সালের ২৮শে জুন সই হয় ভার্সাই চুক্তি - যার ফলে পূর্ব ইউরোপে দখলীকৃত সমস্ত অঞ্চল (৬৫০০০ বর্গকিলোমিটার জায়গা এবং ৭০ লক্ষ মানুষ) ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় জার্মানি - ইউরোপের ম্যাপ থেকে অবলুপ্ত পোল্যান্ড ফিরে আসে, জন্ম হয় চেকোস্লোভাকিয়ার, স্বাধীন অঞ্চল হিসেবে থেকে যায় ড্যানজিগ…

যুদ্ধে হারের ক্ষত, আর সাথে অত জায়গা এবং প্রাকৃতিক সম্পদ হারানো - ভার্সাই চুক্তি কঠিন দাগ রেখে যায় গোটা জার্মান জাতির মধ্যে, সাথে রেখে যায় বিশ্বাস - যে জার্মানিকে জিততে হলে পূবদিকে এগোতেই হবে। এই অবস্থারই সুযোগ নেন হিটলার - জার্মানির ধ্বংসাবশেষের মধ্যে ন্যাশনাল সোশ্যালিজম বা নাৎসি ধারণার বীজ পুঁতে।

রাজনৈতিক স্লোগান Volk ohne Raum (ভূমিহীন জাতি) তৈরী হয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানিকে নিয়ে। একই সময় জার্মান ইউজেনিসিস্টরা স্লোগান তোলেন Volk ohne Jugend (তারুণ্যহীন জাতি) - পপুলেশন ডেমোগ্রাফিকে সম্পুর্ণ অস্বীকার করে যেখানে দাবী করা হয় যে জার্মান পপুলেশন ক্রমহ্রাসমান, সবাই প্রায় বয়স্ক - কাজেই জার্মানিকে বাঁচাতে হলে জার্মান পপুলেশনের বৃদ্ধি এবং জার্মান অঞ্চলের বৃদ্ধি - দুইয়েরই প্রয়োজন। ১৯২০এর দশকে এই দাবী মান্যতা পেয়ে যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ জার্মানের কাছে। ১৯২৫ সালে লেখা Mein Kampf বইয়ে হিটলার একটা বড় অংশ রক্ষিত রাখেন লেবেনস্রাউমের জন্যে। হোহেনজোলেম সাম্রাজ্যের পলিসির সমালোচনা করে লেখেন - "ভৌগলিক সীমার সমস্যার সমাধান ক্যামেরুনে নয়, ইউরোপের মূল ভূখণ্ডেই রয়েছে। প্রকৃতি ইউরোপের মাটি কোনও বিশেষ দেশ বা জাতির জন্য সংরক্ষণ করে রাখেনি, বরং এই মাটি রয়েছে যার দখল করার ক্ষমতা আছে তার জন্য।" [Mein Kampf, page 138-139]

জার্মানির একটা বড় অংশের ইন্টেলেকচুয়ালরা চাইতেন জার্মানিকে ১৯১৪ সালের (মানে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের) আগের বর্ডার ফিরিয়ে দেওয়া হোক। হিটলার মনে করতেন সেটা বালখিল্যতা - এই ইন্টেলেকচুয়ালরা জিওপলিটিক্সের বোঝেটা কী? বরং, উনি পিছিয়ে গেলেন ছ'শো বছর - যখন জার্মানির দখলে ছিলো গোটা স্লাভিক এবং বল্টিক অঞ্চল।

"And so we National Socialists … take up where we broke off six hundred years ago. We stop the endless German movement to the south and west, and turn our gaze toward the land in the East...If we speak of soil in Europe today, we can primarily have in mind only Russia and her vassal border states" [Mein Kampf, page 654]

অর্থাৎ, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, হাঙ্গেরি, পোল্যান্ড, বল্টিক দেশগুলো - যেমন রুমানিয়া, লিথুয়ানিয়া, যুগোস্লাভিয়া, এবং সবশেষে রাশিয়া। নিউ অর্ডারের কনসেপ্ট অনুযায়ী এই স্লাভিক/বল্টিক/রাশিয়ান/ইহুদী পপুলেশন - কয়েক কোটি মানুষ - এরা সকলেই অনার্য্য, দূষিত রক্তের নীচুশ্রেণীর মানুষ...এদের জন্ম জার্মান জাতের দাসত্ব করার জন্য। অথবা, পাকাপাকিভাবে শেষ হয়ে যাওয়ার জন্য। "এক্সটারমিনেশন" শব্দটা বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে - Mein Kampf এ, বা সেনাবাহিনীকে দেওয়া হিটলারের বিভিন্ন লিখিত আদেশে। লেবেনস্রাউমের সরাসরি ফসল জার্মান জাতিগত পলিসি, আর সেখান থেকেই তৈরী "নিউ অর্ডার।"

যদি কষ্ট করে এতদূর পড়ে থাকেন, তাহলে আরেকটু কষ্ট করে বর্তমান হিন্দুত্ববাদীদের তত্ত্ব বা কাজকর্মের সাথে একটু মিলিয়ে দেখতে পারেন - অখন্ড ভারতের সাথে লেবেনস্রাউমের মিল পান কিনা, বা "হিন্দু খতরেঁ মে হ্যায়" এর সাথে Volk ohne Raum আর Volk ohne Jugend স্লোগানের মিল, বা এমনকী পদ্ধতিরও মিল পান কিনা...

এই পর্ব শেষ করি হলোকাস্ট এনসাইক্লোপিডিয়ার একটা লাইন দিয়ে -

"লেবেনস্রাউমের ধারণা একা হলোকাস্টের জন্য দায়ী নয়, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী, জাতীয়তাবাদী এবং জাতিগত বিদ্বেষমূলক ভাবধারার সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত - শেষ অবধি যে সমস্ত ধারণার ফলে ইউরোপের ইহুদীদের মরতে হয়েছিলো।"

সুত্রঃ

(১) Mein Kampf - Adolf Hitler
(২) Rise and Fall of the Third Reich - William Shirer
(৩) Coming of the Third Reich - Richard J Evans
(৪) Lebensraum - The Holocaust Encylopedia

TheNewOrder, Part 1

#TheNewOrder, Part 1

ন্যাশনাল সোশ্যালিজম, বা নাৎসি আইডিওলজির দুটো দিক আছে - একটা সোশ্যাল সিস্টেমের দিক, আরেকটা জাতীয়তাবাদী ওয়ার ইকোনমির দিক - যেখানে গ্রেট ডিপ্রেশনের পরেও জাতীয়তাবাদী স্লোগানের জোরে জার্মান ইকোনমি ওয়াইমার রিপাবলিকের সময়ে পৌঁছে যাওয়া তলানি থেকে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছিলো। দ্বিতীয়টা নিয়ে অর্থনীতিবিদরা আলোচনা করবেন। এই সিরিজটাকে আপাতত শুধু প্রথমটার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখছি - কারণ এই সোশ্যাল সিস্টেম, যাকে বলা হয়েছিলো The New Order, তাকেই প্রায় হুবহু নকল করার চেষ্টা করে আজকের #NewIndia...

তাই শিরারের "দ্য রাইজ অ্যান্ড ফল অফ দ্য থার্ড রাইখ" এর পাশাপাশি রিচার্ড ইভান্সের রাইখ ট্রিলজি এবং নিউরেমবার্গ ট্রায়ালের নথিপত্র ঘেঁটে যা পাওয়া যাচ্ছে তাই নিয়ে এই সিরিজটা চালু করলাম...কৃতিত্বটা মূলতঃ শিরারেরই, কারণ ওনার দেখানো রেফারেন্স ধরেই এগোচ্ছি, এবং লেখার অনেকটাই শিরারের বইয়ের বিভিন্ন অংশের কম্পাইলেশন।

The New Order, Part 1

অক্টোবর ৪, ১৯৪৩ - অধিকৃত পোল্যান্ডের Poznan (তখন Posen) শহরের টাউনহলে এসএস বাহিনীর প্রধান হাইনরিখ হিমলার বাহিনীর অফিসারদের সামনে বক্তৃতা দিতে উঠে বলেন -

"একজন রাশিয়ান বা চেকোস্লোভাকিয়ানের শেষ অবধি কী হল আমার তাতে কোনও আগ্রহ নেই। এই দেশগুলো থেকে আমাদের জার্মানদের মত শুদ্ধ রক্তের যা পাওয়া যায় তা আমরা নেবো, প্রয়োজনে ওদের বাচ্চাদের অপহরণ করে আমাদের সমাজে বড় করে। এসব দেশের মানুষ ভালোভাবে বাঁচলো, নাকি গরুবাছুরের মত উপোষে মরলো - তাতে আমার আগ্রহ নেই, যতক্ষণ তাদের আমরা জার্মানরা ক্রীতদাসের মত ব্যবহার করতে পারছি। দশ হাজার রুশী মহিলা ট্যাঙ্করোধী পরিখা খুঁড়তে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়ে মরে গেলো কিনা, তাতেও আমার আগ্রহ নেই, যতক্ষণ পরিখার কাজ শেষ হচ্ছে।" [1]

হিমলারের এই বক্তৃতার প্রায় তিন বছর আগে, ১৯৪০ সালেই, অ্যাডলফ হিটলার তৎকালীন চেকোস্লোভাকিয়ার অধিবাসী, অর্থাৎ নাৎসি সাম্রাজ্যের প্রথম স্লাভিক প্রজাদের কী পরিণাম হবে তার মোটামুটি একটা আউটলাইন দিয়ে রেখেছিলেন তাঁর জেনারেলদের কাছে - তাদের অর্ধেককে খাস জার্মান জাতির দাসত্ব করতে হবে, বাকি অর্ধেক, বিশেষ করে ইন্টেলেকচুয়ালদের খতম করা হবে [2]। সেই সময়ের আরেকটি দলিলে, চেকদের পরের স্লাভিক জাতি, যাদের জার্মানি কলোনাইজ করবে, অর্থাৎ পোলিশদের ভাগ্যে কী আছে তাও পাওয়া যায়। হিটলারের নিজস্ব চিন্তাভাবনা নথিভুক্ত করে রেখেছিলেন তাঁরই বিশ্বস্ত সেক্রেটারি মার্টিন বরম্যান। এক ঝলকে সেটা মোটামুটি এই রকম -

“পোলিশ নাগরিকদের জন্মই নীচুতলার কাজকর্মের জন্য। ওদের কোনোরকম উন্নতির প্রয়োজন নেই। পোলিশদের জীবনযাত্রার মান তলানিতেই রাখতে হবে, আর দেখতে হবে কোনোভাবেই যেন তার কোনও উন্নতি না হয়। পোলিশরা অলস, এবং তাদের কাজ করতে বাধ্য করতে হবে। পোল্যান্ডের সরকারকে ব্যবহার করা হবে কায়িক শ্রমের যোগানদার হিসেবে।" [3]

এই কথাগুলোর কোনটাই নতুন নয়। বিয়ার হল বিদ্রোহের পরে জেলে বন্দী অবস্থায় লেখা Mein Kampf এ হিটলার এরকমই চিন্তাভাবনার কথা লিখে গেছেন (আর এই বইয়ের ভাবনারই প্রায় ফটোকপি দেখা যায় আরএসএস প্রতিষ্ঠাতা গোলওয়ালকরের We or Our Nationhood Defined বইয়ে) - ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি, মানে নাৎসি পার্টির মূল তত্ত্বই ছিলো এর ওপর দাঁড়িয়ে - খাস জার্মান জাতিই খাঁটি আর্য্য, বাকি স্লাভিক প্রজাতির লোকজন জন্মেছে জার্মানদের দাসত্ব করার উদ্দেশ্যে। জার্মানরা জাতিগত এবং জৈবিক দিক থেকে স্লাভিক প্রজাতির মানুষের চেয়ে হাজারগুণ দামী...

উত্তর ভারতীয় বর্ণহিন্দুরাই খাঁটি আর্য্য এবং আসল শাসক, বাকি দক্ষিণ/পূর্ব ভারতীয়, দলিত/শুদ্র/তফশিলী জাতি/উপজাতির লোকেরা ভৃত্যশ্রেণীর - হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীদের এই কথাটা এইবার চেনা ঠেকছে কি? মুসলমানদের এখনো আনলাম না, কারণ সেটা তুলনীয় আরেক সম্প্রদায়ের মানুষের সাথে। সেই তুলনা ক্রমশঃ আসবে।

(1) Nuremberg Trial Document,  Extracts from speeches concerning the SS and the conduct of the war, Speech [of] the Reichsfuehrer-SS at the meeting of SS Major-Generals at Posen, 04 October 1943, Heinrich Himmler (Reichsfuehrer-SS and Chief of Police; Minister of Interior), PS-1919

(2) Nuremberg Trial Document,  Report of Gen. Gotthard Heinrici, Deputy General of the Wehrmacht in the Protectorate, PS-862

(3) Bormann’s memorandum, quoted in Trial of Major War Criminals before the International Military Tribunal (TMWC), Volume VII, pp. 224–26 (N.D. USSR-172)

Thursday, December 06, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (শেষ পর্ব)

ভোর চারটেতে অ্যালার্ম দিয়ে উঠে তৈরী হয়ে নিলাম। পাঁচটায় গাড়ি আসবে, তার আগে যতটা সম্ভব কাজ এগিয়ে রাখলে সাফারি থেকে ফিরে ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে পড়া যাবে। সেদিন অনেক দূর যাওয়া - সেই মালদা অবধি। গোছগাছ সব সারা। গাড়ি (মাথাখোলা জিপসি) এসে গেলো ঠিক পাঁচটায়। সওয়া পাঁচটার মধ্যে আটজন জঙ্গলপিপাসুকে নিয়ে গাড়ি রওনা দিলো চিলাপাতা ফরেস্ট অফিসের দিকে - পারমিট নিতে হবে। মেন্ডাবাড়ি থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই কিছুদূর গিয়ে একবার বড় রাস্তায় উঠতে হয় - সেখান দিয়ে অল্প দূরে গিয়েই ফরেস্ট অফিস। ফরেস্ট অফিসের আশেপাশে সব বাড়িই একটু উঁচুতে - থামের ওপরে তোলা। দুটো কারণে - (এক) বর্ষায় জল তলা দিয়ে বেরিয়ে যায়, আর (দুই) ছোটখাটো জন্তুজানোয়ার এলে বাড়িতে ধাক্কা মারতে পারে না।

পারমিট নিতে মিনিট দশেক, তারপর আবার জঙ্গলের রাস্তা। রাস্তার কথা আগেই বলেছি - শুধু চোখ বন্ধ করে একবার ভেবে নিন - ভারতের দ্বিতীয় ঘন জঙ্গল, সুন্দরবনের পরেই - তার চেহারা কেমন হতে পারে। সূর্য্য তখনো পুরো ওঠেনি, অল্প আলো ফুটেছে। পাশের জঙ্গলে তখনো আলোআঁধারির খেলা। রাস্তাটা চলে গেছে দূরে কোন গভীরের দিকে জানি না। শুধু দূরে দেখা যায় আবছা আলোয় টানেলের মত গাছের আড়ালে ঘুরে গেছে রাস্তাটা...অল্প কুয়াশা নেমেছে সেখানে...বাঁকের পরে কোন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কে বলতে পারে। চাপড়ামারির মত গাড়ির ভিড় নেই, সেই মুহুর্তে শুধু একটাই গাড়ি শুকনো পাতার ওপর অল্প আওয়াজ করে এগিয়ে চলেছে। পাশের জঙ্গলে খড়মড় করে অল্প আওয়াজ, তাকিয়ে দেখবেন দুটো হরিণ অবাক চোখে তাকিয়ে রয়েছে - গাড়িটা দেখেই উল্টোদিকে ঘুরে দৌড়। ফিসফিসিয়ে কথা বলুন, আশেপাশে পাখি রয়েছে অনেক - কান খাড়া করে রাখলে তাদের কথা বলা শুনতে পাবেন। গাছের মাথা থেকে হুউউউউট হুউউউট করে আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখুন - পেঁচা বসে রয়েছে একটা। গাছের ডালে খড়খড় ঝাপটা - তাকিয়ে দেখুন কয়েকটা বাঁদর ডাল বদলে বসলো...




আস্তে আস্তে গাড়ি চলছে, সূর্য্য উঠলো বুঝতে পারছি - গাছের ফাঁকে ফাঁকে আলো দেখা যাচ্ছে। অক্টোবরের ভোরে অল্প ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে...হাওয়ায় ঝিরঝির করে সাড়া দিচ্ছে চিলাপাতা...আমাদের নজর দুদিকের জঙ্গলে...। মিনিট কয়েকের মধ্যে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়লো। সামনে দেখলাম আরো দুটো জিপসি রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ফিসফিস করে বললেন - হাতি। ডানপাশের জঙ্গলে, হার্ডলি তিরিশ ফুট দূরে তিনটে হাতির একটা পরিবার পাতা খেতে ব্যস্ত। ক্যামেরা তুলে তাক করে দাঁড়িয়ে রইলাম, যদি সুযোগ পাই একটা। কিন্তু সামনের দিকে না এসে একটা হাতি আরেকটু দূরে গিয়ে রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের জঙ্গলে ঢুকে গেলো...একটা মাঝারি সাইজের দাঁতাল। তার বউটা তখনো বাচ্চাটাকে নিয়ে ডানদিকের জঙ্গলেই রয়েছে। আমরাও দাঁড়িয়ে রয়েছি। এর মধ্যে আমাদের গাড়িটা রিভার্স করে আরো ফুট দশেক জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে পড়লো, আরো কাছে - খুব বেশি হলে কুড়ি ফুট দূরে, একটা বড় ঝোপের আড়ালে দেখতে পাচ্ছি মা হাতিটার শরীরের ওপরের দিকটা, আর তার সামনেই বাচ্চাটাও রয়েছে, একদম পাহারা দিয়ে রেখেছে যেন। একদম চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি আমরা কজন, নিঃশ্বাসও ফেলছি না প্রায়...ওদিকে হাতি দুটোও তাই। কতক্ষণ হবে? মিনিট দশেক প্রায়? তারপর খস খস করে আওয়াজ পেলাম, ক্রমশ সেটা দূরে মিলিয়ে গেলো। বুঝলাম মা হাতিটা বাচ্চাটাকে নিয়ে আরো গভীরে ঢুকে গেছে। ভেবেছিলাম আরো কিছুক্ষণ দাঁড়াই, কিন্তু গাইড যিনি, তিনি বললেন যে দাঁতালটা রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকে গেছে, সেটা পরিচিত হাতি, আর তার খানিক ইতিহাসও আছে ফিরে আসার, আর সেটা সুখকর নয়, না দাঁড়ানোই ভালো।

[গল্প (বা ঘটনাটা) পরে শুনেছিলাম দেবাশিসের কাছে। ঠিক গোধূলির মুখে, জঙ্গলের মধ্যে রাস্তায় হাতি প্রায় ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে মিশে যায়, ভালো বোঝা যায় না। এই কিছুদিন আগেই - মাস দুয়েক হবে হয়তো - দুটি ছেলে চিলাপাতার গেটের কাছেই পিচরাস্তায় বাইক নিয়ে যাচ্ছিলো একটু জোরেই। এই দাঁতালটাই একটা বাঁকের মুখে বসে ছিলো। ছেলেদুটো বাঁক ঘুরেই হাতিটাকে ধাক্কা মারে। বাইক ছিটকে পড়ে যায়, ছেলে দুটোও উল্টে গিয়ে পড়ে - একজন বাইকের পাশেই, আরেকজন বাইক থেকে অল্প দূরে জঙ্গলের পাশে। হাতিটা প্রথমে বাইকের পাশের ছেলেটাকে আছড়ে আছড়ে মারে, তারপর বাইকটাকে পা দিয়ে থ্যাঁতলায়। তারপর উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটা দেয়। এর মধ্যে অন্য ছেলেটা এইসব দেখে হামাগুড়ি দিয়ে সরে যাচ্ছিলো - এর মধ্যে তার মোবাইলটা বেজে ওঠে। হাতিটা ফিরে যেতে গিয়েও ঘুরে আসে, ছেলেটাকে শুঁড়ে তুলে আছড়ে ফেলে পা দিয়ে থেঁতলে মাংসপিন্ড বানিয়ে তারপর আবার জঙ্গলে ঢুকে যায়।]

গাইডের বারণ শুনে আর দাঁড়াইনি। ছবি পেলাম না ঠিকই, কিন্তু ওই দশটা মিনিট প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষার মুহুর্তগুলো সেই যে সিন্দুকটা থাকে যেখানে বিশেষ বিশেষ কিছু ছবি/কথা জমানো থাকে, সেখানে ঢুকে গেছে।

চিলাপাতার ক্লাইম্যাক্স এইটাই। এর পরেও জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়ালাম প্রায় সাড়ে সাতটা অবধি। টুকটাক পাখি, খরগোশ, হরিণ চোখে পড়লেও আর সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। মাঝে একটা গড় চোখে পড়লো - পুরনো কেল্লার ধ্বংসাবশেষ - বলে নলরাজা গড়, গুপ্ত যুগের সময়কার নল রাজাদের কেল্লা। তার সামনের গেটটা এখনো দেখা যায় মাটির ওপর কিছুটা জেগে রয়েছে। আগে ভিতরে ঘুরে বেড়ানো যেত, কিন্তু এখন জঙ্গল এতটাই ঘন যে আর ওদিকে যেতে দেয় না।

আরো এদিক সেদিক কিছুক্ষণ ঘুরে একটা ওয়াচটাওয়ারের পাশ দিয়ে প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ ফিরে এলাম ফের মেন্ডাবাড়িতে। সাফারি শেষ। আমাদের বেড়ানোও। এবার ফেরার পালা।

ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে সব জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে রওনা দিলাম। দেবাশিস আগে কালজানি বলে একটা নদীর ধারে ঘোরাতে নিয়ে গেল - এমনিই বেশ সুন্দর জায়গা। তারপর টিপিক্যাল হাইওয়েতে না উঠে ফালাকাটা-ধূপগুড়ি-ময়নাগুড়ির রাস্তা ধরলাম - কারণ চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে এই রাস্তাটা অসম্ভব সুন্দর, এবং তাড়াতাড়ি ফুলবাড়ি বাইপাস হয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েতে ওঠা যাবে। এতে এবারের মত মালবাজারে বাপীদার হোটেলে বোরোলি বা অন্যান্য মাছ খাওয়া হল না বটে, কিন্তু সন্ধ্যের মধ্যে মালদা পৌঁছনোর প্ল্যানটা ঠিকই রইলো। বাপিদার হোটেলে খাওয়া শুরু হয় বারোটার পর - ততক্ষণ অপেক্ষা করতে গেলে দেরি হয়ে যেত।

এরপর আর সেরকম ঘটনা নেই। ফুলবাড়ি বাইপাস ধরে এনএইচ ১২ এ উঠলাম, হাইওয়ের ধারে একটা রেস্তোরাঁয় ছেলেমেয়ের শখ মিটিয়ে চীনে খাবার প্যাক করানো হল। আমার খেতে সময় লাগে না বলে আমি পার্কিংএই দাঁড়িয়ে পটাপট খেয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলুম, বাকিরা গাড়িতে খেতে খেতে চললো।

ইসলামপুর ছাড়িয়ে ফের বোতলবাড়ি-রসখোয়া রোড। দুপাশে গ্রামের পর গ্রাম ফেলে রেখে রায়গঞ্জ হয়ে মালদা। মালদা টাউনে ঢোকার আগে গোল্ডেন পার্ক বলে একটা হোটেল/রিসর্ট আছে - যেখানে আগে থেকেছিলাম মালদায় বেড়াতে আসার সময়ে - সেখানেই উঠলাম সেদিন রাতের মত।

পরের দিন সকালে টোস্ট-অমলেটের ব্রেকফাস্ট সেরে মালদা পেরিয়ে ফারাক্কা হয়ে বহরমপুরের একটু আগে মোরগ্রামে এনএইচ ১২/৩৪ ছেড়ে ধরলাম স্টেট হাইওয়ে ৭ - যেটা মুর্শিদাবাদের মধ্যে দিয়ে আসে বর্ধমান অবধি। এনএইচ ৩৪ এর ট্রাফিক যদি এড়াতে চান তাহলে এই রাস্তাটাই নেওয়া ভালো - মুশকিলের মধ্যে খাবার জায়গা পাবেন না বিশেষ - ছোটখাটো ভাতের হোটেলের বাইরে বিশেষ কিছুই নেই। সেদিন বেকারি বন্ধ বলে কোথাও পাঁউরুটিও পাওয়া যায়নি। শেষে খড়গ্রামের কাছে একটা ভাতের হোটেলেই বিরিয়ানি পাওয়া গেল - মোটের ওপর মন্দ নয়, শুধু মিষ্টতাটা বেশি। বিকেল নাগাদ বর্ধমান - সেখানে একটা মিষ্টির দোকান থেকে সীতাভোগ/মিহিদানা কিনে সোওওজা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে। শক্তিগড়ে দাঁড়িয়ে ল্যাংচামহলের ল্যাংচা, আর পাশের চায়ের দোকানে চা খেয়ে ফের রওনা। অবশেষে রাত আটটা নাগাদ গাড়ি পার্ক করলাম বাড়িতে। ট্রিপমিটার তখন দেখাচ্ছে ১৮৩১.৯ কিমি।


বেড়ানো শেষ আবার বছর দেড়েকের জন্যে। ২০২০তে ঋকের উচ্চমাধ্যমিক - তাই এর মধ্যে আর সবাই মিলে বড়্সড় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হবে না। শুরুতেই লিখেছিলাম - স্কুলের ছুটির চেয়ে বড় টিউশন থেকে ফাঁক পাওয়া - সেটা ওই পুজোর কয়েকটা দিন ছাড়া সম্ভব নয়। যদি পারি, পরের বছর পুজোর ছোটো করে একটা রোডট্রিপ সেরে নেবো, আর নয়তো একটা গ্র্যান্ড প্ল্যান রয়েছে ২০২০ সালের জন্যে। ফের একটা ট্র্যাভেলগ নিয়ে আসবো তখন।

এই ট্রিপে দুটো পার্সোনাল রেকর্ড হল -

(১) একটানা ১৮ ঘন্টা গাড়ি চালানো, একদিনে
(২) স্কটিশ হাইল্যান্ডস বা লেক ডিস্ট্রিক্ট ছাড়া, এখানকার পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো

দেখা যাক, পরের প্ল্যানটা নামাতে পারি কিনা।

আমার কথাটি ফুরলো
নটেগাছটি মুড়লো।

(আগের কথা)

Wednesday, December 05, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (১০ম পর্ব)

শেষ হয়ে আসছে বেড়ানোর দিন। পানঝরা থেকে আমরা যাবো মেন্ডাবাড়ি - সেখান থেকে আবার ফেরা শুরু। বহুদিন পরের বেড়ানোটা এখনো অবধি দিব্যি হয়েছে। আমাদের প্রথমবার ডুয়ার্স আসা - এখনো অবধি সেভাবে বোর হতে হয়নি কোথাও।

আলিপুরদুয়ার থেকে মোটামুটি কুড়ি কিলোমিটার দূরে, জলদাপাড়ার পাশেই চিলাপাতা ফরেস্ট, হাসিমারা থেকে খুবই কাছে। এর মধ্যেই কোদাল বস্তির পাশে হল মেন্ডাবাড়ি জাঙ্গল ক্যাম্প - ডুয়ার্সের মধ্যে আরো একটা ইকো টুরিস্ট রিসর্ট। সময়মত গেলে আর কপালে থাকলে ক্যাম্পে বসেই আশেপাশে বুনো জন্তুজানোয়ার দেখতে পাওয়া যায় - কারণ চিলাপাতা রেঞ্জটা জলদাপাড়া আর বক্সা টাইগার রিজার্ভের মধ্যে একটা ন্যাচারাল করিডরের কাজ করে। এখানে যেতে হলে আপনাকে চাপড়ামারি ছাড়িয়ে নাগরাকাটা, বানরহাট, বীরপাড়া পেরিয়ে যেতে হবে হাসিমারা। হাসিমারা গুরদোয়ারা পেরিয়ে আরেকটু এগোলেই চিলাপাতার শুরু। যাওয়ার পথটা জলদাপাড়ার পাশ দিয়ে চলে গেছে সোজা গৌহাটির দিকে, দুধারে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য চা-বাগান। মাঝে কথা হয়েছিলো এই রাস্তাটাকে ৪-লেন হাইওয়ে বানানোর - তাতে চা-বাগান তো নষ্ট হতই, আরো অনেক গাছ কাটা পড়তো - এমনকি জলদাপাড়ার গায়েও হাত পড়তো। কাজও শুরু হয়ে গেছিলো - নানা জায়গায় সেই কাজের চিহ্ন দেখতে পাবেন। কিন্তু পরিবেশের চাপে ভাগ্যক্রমে এই প্ল্যান বাতিল করে অন্য একটা রাস্তাকে চওড়া করার কাজ শুরু হয়েছে। বেঁচে গেছে অনেকটা জঙ্গল। জানা নেই যদিও কতদিনের জন্যে - সভ্যতা ক্রমশ ডুয়ার্সের দিকে হাত বাড়ানো শুরু করেছে বেশ কিছুদিন হল...


চাপড়ামারি থেকে হাসিমারা লাগলো ঘন্টাখানেক। দূরত্ব বেশি নয়, কিন্তু ৪০ কিলোমিটারের স্পীড লিমিট বাঁধা রয়েছে গোটা পথেই। হাসিমারা এয়ারবেস এর কাছেই রাস্তার ধারে দেবাশিসরা দাঁড়িয়েছিলো। ওরাও যাবে আমাদের সাথে মেন্ডাবাড়ি। বাকি পথটা দেবাশিসই চিনিয়ে নিয়ে গেলো আমাদের আগে আগে গিয়ে।

পিচমোড়া রাস্তা থেকে হঠাৎই একটা কাঁচা রাস্তা ঢুকে পড়েছে বাঁদিকে জঙ্গলের মধ্যে - সেই রাস্তা ধরতেই চোখের সামনে দৃশ্য পুরো বদলে যায়। চিলাপাতায় ঢুকলে চাপড়ামারিকে মনে হবে ঝোপঝাড়ের চেয়ে অল্প বড় কিছু। একইভাবে গাড়ি চলে চলে দুটো সমান্তরাল দাগ হয়ে রয়েছে - সেটাই রাস্তা। দুধারে ঘন জঙ্গল, গাড়ির গায়ে ছোঁয়া দিয়ে যায়। চাকার দাগদুটোর মধ্যেকার ঝোপঝাড় আরো অনেক ঘন। রাস্তার পাশেই খানায়েক ময়ূর খেলে বেড়াচ্ছে - গাড়িদুটোর দিকে একবার তাকিয়ে ফের খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। চলতে চলতে এসে পড়লাম কোদাল বস্তির সামনে। একটা ছোটো খাল পেরোতে হয় এখানে - আগে জলের মধ্যে দিয়েই পার হতে হত, কিছুদিন হল একটা কাঠের সাঁকো বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গলের মধ্যে একটা খোলা জায়গায় দুটো বাড়ি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর একটা কাঠের গোল বাড়ি - সেটা খাওয়ার জায়গা। দুটো দোলনা রয়েছে খেলার জন্যে। আর ওই চত্ত্বরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে আরো কয়েকটা ময়ূর। চারপাশে তারের উঁচু বেড়া দিয়ে ঘেরা, পাশেই ছোটো গ্রামটা, আর বড় বড় গাছে ঘেরা চারদিক...অসংখ্য পাখি, বিশেষ করে টিয়ার মেলা...বাইরে গ্রামের দিকটায় একটা কুনকী হাতি দাঁড়িয়ে কান নাড়িয়ে চলেছে, বড় নয়, বাচ্চা একটা। গ্রামে দুর্গাপুজো হচ্ছে - তার ঢাকের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। হাতিটা যেন সেইটা শুনেই মাঝে মাঝে দুলে উঠছে, যেন নাচছে।

 (https://media-cdn.tripadvisor.com/media/photo-s/09/1e/4e/4b/chilapata-
jungle-camp.jpg -
বাড়িটার ছবি তুলতে ভুলে গেছি, তাই ট্রিপ অ্যাডভাইসর থেকে একটা ছবি দিলাম)

বাড়িটার দোতলায় (নাকি একতলাই বলা উচিৎ) দুটো বড় ঘর আছে - ডর্মিটরি টাইপের। এক একটা ঘরে পাঁচ ছয়্জন থাকতে পারে। ঘরগুলো বিশেষ মেন্টেইন হয় না - কারণ মেন্ডাবাড়ির গ্ল্যামার কোশেন্ট কমই বলা চলে। ঠিক luxurious জায়গা তো নয়। বাথরুমের অবস্থাও খুব ভালো নয় - একটু ভাঙা ভাঙা। কিন্তু চলে যায়। ইন ফ্যাক্ট, এরকম জঙ্গলের মধ্যে ঝাঁ চকচকে ঘরদোর বেমানানই লাগতো হয়তো।

[আর একটা বাড়ি আছে এখানে - সেটা আরেকটু উন্নত বলা যায়, কারণ এসি মেশিন বসানো রয়েছে - বছর দুয়েক আগে রাণিমা পদধূলি দিয়েছিলেন বলে বসানো হয়েছিলো। ভোল্টেজ এতই কম যে সে মেশিন বিশেষ চলেই না।]

(https://northbengaltourism.com/images/govt-resorts/mendabari_jungle_ca
mp_1_1024.jpg  -
এই ছবিটা নর্থ বেঙ্গল টুরিজমের সাইট থেকে দিলাম)

দুপুরের খাওয়া অ্যাজ ইউজুয়াল - ভাত, আলুভাজা, ডাল, তরকারি আর ডিমের ঝোল। সেদিন আমরা আটজন, পরিমাণও সেই অনুপাতে। রাঁধুনী আর কেয়ারটেকার দেবাশিসের পরিচিত - সেই কারণে, নাকি দেবাশিসের বক্তব্য অনুযায়ী গাঁজার ধুমকিতে - কে জানে - আট জনের জন্যে দুই ডজন ডিম! ডিমখোড়ের মধ্যে পড়ি আমি, সুমনা আর দেবাশিস...তাতেও একটা/দুটো এক্সট্রা হলে কথা ছিল - আটটা ডিম বেশি - ভাত খাওয়ার পর কোনোমতেই শেষ করা সম্ভব নয়।

খাওয়াদাওয়া শেষে বেলা পড়ে আসার আগে দুটো গাড়িতে রওনা দিলাম জয়ন্তী নদীর দিকে। হাইওয়ে ধরে কিছুদূর গিয়ে বক্সা টাইগার রিজার্ভের সীমানা। তার মধ্যে দিয়েই চলে গেছে হাইওয়েটা সোজা ভুটান সীমান্তের দিকে। শুধু গেট পার হওয়ার আগে টিকিট কাটতে হয় - টোলও বলা যায়। কালো চকচকে পিচঢালা রাস্তা, দুপাশে বেশ ঘন জঙ্গল। কিন্তু যদি জন্তুজানোয়ার দেখার ইচ্ছে থাকে, এই পথে সেই ইচ্ছে পুরো সফল হবে না, কারণ শ'য়ে শ'য়ে মোটরগাড়ি আর মোটরসাইকেল যাচ্ছে এই রাস্তায়। এমনকি বাসও। পাখির ডাক শুনতে পাবেন - যদি না জঙ্গল কাঁপিয়ে কোনো বাইক চলে যায়। কিছু পাখি দেখতেও হয়তো পাবেন। দু একটা ছোটখাটো জন্তুও হয়তো - যেমন হরিণ (আমরা পেলাম একটা বার্কিং ডিয়ার)। তার বেশি কিছু চাইলে এখানকার সাফারি ছাড়া উপায় নেই।


এই পথটা জঙ্গলের মধ্যে দুভাগ হয়ে একটা ভাগ চলে যায় জয়ন্তী নদীর দিকে। সেখানে বিকেলের দিকে যেন মেলা বসে যায়। নদী পেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে একটা ওয়াচটাওয়ার আছে - কিন্তু সেখানে যেতে চাইলে জিপসি জাতীয় গাড়ি নেওয়াই ভালো। আমরা হয়তো পেরিয়ে যেতে পারতাম বিআরভি নিয়ে, কিন্তু দেবাশিসদের ছোট গাড়ি, এগজস্টে জল ঢুকে গেলে চিত্তির। তাই নদী না পেরিয়ে নদীর ধারেই কিছুটা সময় কাটানো হল।

নদীর খাতটা বেশ চওড়া - হয়তো বর্ষার সময় পুরো ভরে যায়। পুজোর সময় জল শুধু মাঝে অল্প কিছুটা, বড়জোর তিরিশ ফুট। নুড়িপাথরে মোড়া খাত, জুতো খুলে নদীর জলে নামলে টের পাবেন যে সেটা পাহাড় থেকে নেমেছে। উল্টোদিকে আবছা নীলচে ভুটান পাহাড় দেখা যায়। ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে সময় কাটানোর পক্ষে বেশ ভালো জায়গা, শুধু একমাত্র আপদ গাদা গাদা মোটরসাইকেল, আর তাদের স্টান্টবাজি। নুড়িপাথরের মধ্যে চাকার গ্রিপ ভালো ধরে না, তাই হাতের কাছে অফরোডিং এর সাইট হল এইটা...বাইক নিয়ে গোঁ গোঁ করে জলে নামছে, নদীর মধ্যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার গোঁ গোঁ করছে, তারপর আবার উল্টোদিকে ফিরে যাচ্ছে - এইটাই ওদের স্টান্ট। এর মধ্যে আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়িয়ে, নদীর পাথর কুড়িয়ে ব্যাংবাজি করে ঘন্টাখানেক সময় কাটিয়ে ফেললাম। তারপর সন্ধ্যে নামতে আবার বক্সার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মেন্ডাবাড়ি অবধি। মাঝে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে উত্তরবঙ্গের রসগোল্লা...




মেন্ডাবাড়িতে সেদিন আমাদের প্রথম আর শেষ রাত্রি। ডুয়ার্সেও শেষ রাত্রি। শুধু বাকি রয়েছে পরের দিন ভোরবেলার সাফারি। চাপড়ামারির মত চিলাপাতায় কিন্তু অত বেশি সংখ্যক গাড়ি আসে না। ভোর পাঁচটায় আর বিকেল তিনটের সময় মেন্ডাবাড়ি থেকে দুটো, চিলাপাতা বাংলো থেকে চারটে - এই ছ'টা গাড়িই একসময় জঙ্গলে ঢুকতে পারে। সেরকমই একটা জিপসি আমরা বুক করে রাখলাম পরের দিন সকালের জন্যে।

রাতে খাওয়ার (ঠিক ধরেছেন, রুটি আর চিকেন) পর বারান্দায় গল্প করছি। হঠাৎ নিস্তব্ধ জঙ্গল খানখান হয়ে গেল টিন পেটানোর আওয়াজে। সাথে তুমুল জোরে ঢাকের আওয়াজ, আর লোকজনের চেঁচামেচি। পাশের কোদাল বস্তি পুরো জেগে গেছে। কারণ বাংলোর ঠিক পাশের জঙ্গলে হাতি এসেছে। যদিও টর্চ ফেলেও আমরা কিছু দেখতে পাইনি। বাংলোয় সার্চলাইট থাকলে হয়তো দেখা যেত, হয়তো যেত না। শুনলাম হাতি চাইলে প্রায় নিঃশব্দেই যাওয়াআসা করতে পারে - কেউ টেরটিও পাবে না। আধ ঘন্টা টিন পেটানো, ঢাক, চিৎকারের পর সব শান্ত হল। আমরা ঘুমোতে চলে গেলাম। ভোর পাঁচটায় গাড়ি এসে যাবে।

(চলবে)

(আগের কথা)

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৯ম পর্ব)

দ্বিতীয়দিন থেকে একটু বোর লাগা শুরু হল - একেবারেই কিছু করার না থাকলে যা হয়। আকাশটা একটু ভালো থাকলে পিছনের পাহাড়টায় ঘুরে আসা যেত, কিন্তু সেও গুড়ে বালি। অগত্যা বই আর ঘুম, ঘুম আর বই। মাঝে সকালে পুরী-সবজি, দুপুরে ডিমের ঝোল, ডাল আলুভাজা আর ভাত, রাতে রুটি আর দেশি মুরগীর ঝোল। এর মধ্যে দোতলায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা চলে গেলেন। ফোর্সের একটা ভাড়ার গাড়ি এসে নিয়ে গেলো। তখনই শুনলাম - নিজের গাড়ি নিয়ে ওপরে আমরাই প্রথম যাত্রী।

সেদিন বিকেল থেকে ঋতিরও মুখ একটু ভার। কী ব্যাপার? না পরের দিন ওই রাস্তায় নামতে হবে, তাই একটু...ওই আর কী...পেট গুড়গুড় করছে। আরে তুই তো নর্থ সিকিমও ঘুরে এলি - তখন তো বলিসনি। জানলাম তখনও নাকি ভয় ভয়ই করেছিলো। তা আমি যে পরের বার গাড়ি নিয়ে অরুণাচল যাবো - তুই যাবি না? সোজা উত্তর - না।

পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ব্যাগপত্র গুছিয়ে গাড়িতে তুলতে তুলতে ন'টা বেজে গেলো। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছিলো - তাই দেরী না করে নামতে শুরু করলাম, আবার ওই পাথর মোড়া রাস্তায়। নামার সময় আর অত চিন্তা নেই - একবার উঠেছি যখন, রাস্তা জানা হয়ে গেছে, অজানা কোথাও যাচ্ছি না আর। তবে সাবধানতাটা বেশি, কারণ নিউটনসায়েবের থিওরি, আর প্রাকৃতিক নিয়ম। নামার আগে বলেছিলাম একটু ভিডিও করে রাখতে - সেও করা হল, অপেক্ষকৃত কম দুলুনি যেখানে সেখানে। দুলতে দুলতে, লাফাতে লাফাতে অবশেষে ফের ফাড়ি বস্তি...মোমোর দোকান ইত্যাদি।

(ফাড়ি বস্তিতে নেমে ঋতিকে বল্লাম - এই তো দ্যাখ, কেমন সুন্দর নেমে এলাম। এবার অরুণাচল যাবি তো? ঋতি উত্তর দিলো - আগে আমাকে "আনস্ক্র্যাচড" অবস্থায় বাড়ি পৌঁছে দাও, তারপর ভাববো। অথচ, এর আগে চিলিকা, পুরী, সাতকোশিয়ার সময় এত ভাবনা ছিলো না। অবিশ্যি সেও বছর পাঁচেক আগের কথা।)

গাড়ি দাঁড় করিয়ে একটু নীচের দিকের রাস্তা ধরে হেঁটে রিভার ক্যাম্পও ঘুরে এলাম। আসল রিভার ক্যাম্প, যেটা মূর্তির ধারেই ছিলো, সেটা বন্ধ হয়ে পাহাড়ের গায়ে একটা নতুন রিসর্ট হয়েছে। নদীর ধারটা এখন পিকনিক স্পট। ডুয়ার্সে বেড়াতে আসা লোকজন সান্তালেখোলা অবধি নিজেদের গাড়িতে এসে ফাড়ি বস্তি থেকে লোকাল ভাড়ার গাড়ি নিয়ে পিকনিক করতে যান।




সান্তালেখোলার পর্ব শেষ। এখান থেকে আমরা যাবো পানঝরা - চাপড়ামারি রিজার্ভের ভিতরে। যে রাস্তায় এসেছিলাম, সেই পথেই ফিরলাম - এক দুবার একটু রাস্তা জিগ্গেস করতে হল বটে, কিন্তু মোটামুটি ঠিকভাবেই সেই সামসিং চাবাগানের মধ্যে এসে পড়লাম। এর পরেই মূর্তি ব্রীজ, আর তারপর নয়াবস্তি পেরিয়ে আরেকটু গিয়েই চাপড়ামারির গেট। গেটে সমস্ত কাগজ দেখাতে হল, নামধাম এন্ট্রি করতে হল, তারপর ঢুকলাম জঙ্গলের মধ্যে। জঙ্গলের বাইরের রাস্তা আর জঙ্গলের ভিতরের পরিবেশের মধ্যে আকাশপাতাল তফাত। নিঝুম জঙ্গলে শুধু পাখির ডাক আর ঝিঁঝিপোকা - গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে অল্প আলো এসে পড়ছে - ভেজা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে মাটি। রাস্তাটা একটা গাড়ি যাওয়ার মতন, কোথাও কোথাও পাশের ঝোপঝাড় গাড়িতে ঠেকে যায়। নীচে গাড়ির চাকা গিয়ে গিয়ে দুটো সমান্তরাল মাটির লাইন হয়ে রয়েছে, তার মাঝখানে ঝোপঝাড় যে কে সেই - গাড়ির নীচে নানারকম বাজনা বাজায় - খসখস - খুট - টুংটাং...

কিলোমিটার খানেক গিয়ে ফরেস্ট বাংলো - সরকারি এলাকা, তার মধ্যে একটা ওয়াচটাওয়ার (যেখানে আমরা বিকেলে আসবো)। বাংলোটার সামনে দিয়ে বাঁদিক ঘুরে আরো ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আরো আড়াই তিন কিলোমিটার গিয়ে চাপড়ামারির ঠিক বাইরে একটা খালি জমিতে পানঝরা রিসর্ট। কাঠের তৈরী চারটে না পাঁচটা কেবিন, সামনে একটু লন - সেখানে বাচ্চারা দৌড়োদৌড়ি করতে পারে, তার পরেই বেড়া, আর একপাশে ইলেক্ট্রিক ফেন্স - হাতি আটকানোর জন্যে। সামনে দিয়ে মূর্তি নদী চলে গেছে, কোনের দিকটায় মূর্তির ওপর রেলব্রীজ আর গাড়ি চলার ব্রীজ।





মোটের ওপর জায়গাটা বেশ সুন্দর। একেবারে জঙ্গলের মধ্যে নয় বটে, কিন্তু জঙ্গলের গায়েই। ইলেক্ট্রিক ফেন্স মানে হাতি বা অন্য জন্তু চলে আসার ইতিহাস রয়েছে। টুরিস্ট বলতে সেই মুহুর্তে শুধুই আমরা। কটেজগুলোর মাঝে একটা কমন বারান্দাওয়ালা রান্নাঘর কাম খাবার জায়গা কাম রিসেপশন। সেখানে কাগজপত্র দেখাতে আমাদের দুটো কটেজ খুলে দিলো। সান্তালেখোলায় ঠান্ডা আর ল্যাদ কাটিয়ে কেউই চানটান আর মাথায় আনেনি। এখানে গরমজল পেয়ে আগে চান, তারপর আবার গরম গরম ভাত-ডাল-আলুভাজা আর বড়সড় মাছ। খাবার দেওয়ার সময়েই বলে দিলো সাড়ে তিনটে নাগাদ ওয়াচটাওয়ারে চলে যেতে, তারপর সাড়ে পাঁচটায় ট্রাইবাল ডান্স হবে রিসর্টে, সাথে চা আর পকোড়ার স্ন্যাক্স।


চাপড়ামারি কিন্তু বেশ পুরনো। ব্রিটিশ আমলে একে ন্যাশনাল রিজার্ভ ফরেস্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চাপড়ামারি ওয়াইল্ডলাইফ রিজার্ভ নামটা চালু হয় ১৯৪০ নাগাদ, আর ১৯৯৮ সালে একে ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আর চাপড়ামারি নামটা এসেছে "চাপড়া" - এক ধরণের ছোট মাছ, যেটা কিনা এই এলাকায় অজস্র ("মারি") পাওয়া যায়। কী পাওয়া যায়? প্রধাণতঃ হাতি। চাপড়ামারি বিখ্যাত হাতির জন্যে। তাছাড়া ভারতীয় বাইসন (বা গৌড়), লেপার্ড, হরিণ, শুওর ইত্যাদি পাবেন কপালে থাকলে, আর অনেক পাখি - অনেক রকমফের তাদের। যেমন ধরুন - ড্রঙ্গো, বা ফিঙে - সে কলকাতায় বাড়ির সামনে ইলেক্ট্রিক তারের ওপরেই বসে থাকতে দেখেছি (ইদানিং অবশ্য কমে গেছে)। কিন্তু র‌্যাকেট-টেইলড ড্রঙ্গো - তাদের ন্যাজে দুটো আলাদা লম্বা পালক - এসব শুধু এদিকেই পাবেন।

এসব খবর পেলাম ফোন ঘেঁটে। সাড়ে তিনটের সময় গাড়ি নিয়ে গুটি গুটি গিয়ে হাজির হলাম ওয়াচটাওয়ারের কাছে। সেখানে একটা বড় বোর্ডে বড় বড় করে লেখা রয়েছে কী কী ধরণের গাছ আর জন্তুজানোয়ার চাপড়ামারির অধিবাসী। ওয়াচটাওয়ারের সামনে একটু ফাঁকা জায়গা, তারপর তারের বেড়া (সম্ভবতঃ ইলেক্ট্রিক ফেন্স), তারপর একটা জলাজমি, তারপর একটা সল্ট লিক্‌ আর ওয়াটার হোল। টাওয়ার থেকে ওয়াটার হোলটা দুশো মিটার মতন হবে হয়তো। টাওয়ারটা তিনতলা - মানে মাটির ওপরে একটা লেভেল, তার ওপর আরেকটা। আমরা সোজা ওপরে চলে গেলাম...কেউ কোত্থাও নেই...দূরে জলাটার ওপাড়ে খান কয়েক বাইসন (গৌড়) কাদার মধ্যে ঝিমোচ্ছে, সেগুলোর কয়েকটার পিঠের ওপর খান কয়েক বক বসে (সম্ভবতঃ পোকা খাচ্ছে)।

জঙ্গলের সমস্যা হল এইসব জন্তু জানোয়ারগুলো ওই দূরে দূরেই থাকে। ঠিকঠাক ইকুইপমেন্ট না থাকলে ওই দূর থেকে দেখেই ক্ষান্ত থাকতে হবে। আর যদি ভালো কোয়ালিটির ছবিটবি তুলতে চান, তাইলে পেল্লায় লেন্স ঘাড়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। মুশকিল হল এই ধরনের লেন্স শুধু এই নেচার ফটোগ্রাফিতেই কাজে আসে, আর আমার সেদিকে খুব একটা আগ্রহ কখনোই ছিলো না বলে এসব লেন্সও আমার নেই। তবে ওয়াচটাওয়ারে উঠে মনে হল না এনে বোকামো হয়েছে। আমার ২৪-৭০মিমি লেন্স দিয়ে কিস্যু হবে না। অন্ততঃ ক্লাবের কারো কাছ থেকে একটা ৮০-৪০০ বা নিদেনপক্ষে ৭০-২০০ ধার নিয়ে আসা উচিত ছিলো। তা এখন আর আপশোস করে কীই বা হবে এই ভেবে ওই ২৪-৭০ দিয়েই অল্প সল্প চেষ্টা করলাম। বিশেষ কিসুই হল না। বিশেষ করে খান কয়েক ধণেশ (হর্নবিল) খালি এদিক ওদিক করছিলো - ওগুলোর ছবি তুলতে পারলে কাজের কাজ হত...


দিব্যি বসেছিলুম ওয়াচটাওয়ারে একখান মাদুর পেতে। হঠাৎ গোঁ গোঁ করে বেশ কয়েকটাই জিপসি ধেয়ে এলো বাইরের দিক থেকে। আর সেগুলো থেকে পিল পিল করে লোক। জিপসিপিছু ছজন মতন - কাজেই শ-খানেক বা আরো বেশি লোক তো হবেই। তারা এসেই খুব হন্তদন্ত হয়ে টাওয়ারের সামনে ফাঁকা জমিটাতে নেমে পড়লো - খুব হইচই - মোবাইলে ছবি, সেল্ফি স্টিকে মোবাইল লাগিয়ে দুশো মিটার দূর থেকে ভিডিও তোলার প্রচেষ্টা, সেটা হয় না বলে আরো খানিক হইচই, অবশেষে দুদ্দাড় করে টাওয়ারে ওঠা, টাওয়ারে খানিক ভূমিকম্পের এফেক্ট...আমরা না, মোটামুটি হাঁ হয়ে বসে আছি তখন...মানে ব্যাপারটা কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে। ওয়াচটাওয়ারটা ফরেস্ট বাংলোর পাশেই, আর সেই সময়ে বাংলোর সামনে কিছু কাজ হচ্ছিলো - তার কিছু খুটখাট আওয়াজও ছিলো - যদিও সেই আওয়াজটা জঙ্গলের অ্যাম্বিয়েন্সে বেখাপ্পা ঠেকছিলো না। হঠাৎ, টাওয়ারের তলা থেকে বাজখাঁই গলায় কেউ চেঁচিয়ে উঠলেন - "আমরা মাল দিয়ে দেখতে এসেছি, তোরা এরকম আওয়াজ করলে আর জানোয়ার আসবে?"

দুশো মিটার দূরে ওয়াটার হোলটায় চারটে বাইসন ছিলো, দুটো উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটা দিলো।


আরো অনেক কিছুই হচ্ছিলো। টাওয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে নীচে কারো উদ্দেশ্যে (তারস্বরে) বলা - এই আমার একটা ছবি তুলে দে তো, বা এর উল্টোটাও। স্টর্ক জাতীয় পাখি দু একটা হেঁটে বেড়াচ্ছিলো জলায় - সেগুলো দেখিয়ে "ওই দ্যাখ বাবু, ওই দ্যাখ - হর্নবিল"। একটা ময়ূরী জলার পাশে আসার চেষ্টা করছিলো - তার পেখম না থাকায় এমনই সমবেত দুঃখ হল, এ ময়ূরীটা লজ্জা পেয়ে আর এলোই না।

সবুজ পোশাক পরা কয়েকজনকে দেখে বুঝলাম এরা ফরেস্ট গার্ড। তাদের কাছে জানলাম - এইসব গাড়িগুলো ডেইলি টুরিস্টদের গাড়ি। এঁরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ডুয়ার্স বেড়াতে এসে চালসা/মালবাজারের হোটেলে থাকেন, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট সকালে দু ঘন্টা আর বিকেলে দু ঘন্টার সাফারি চালায়, সেই টিকিট কেটে এঁরা জঙ্গলে ঘোরেন। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব হওয়া উচিৎ ছিলো জঙ্গলে কী কী করা যায় আর কী কী করা যায় না সেগুলো বুঝিয়ে দেওয়া - সেটা হয় বলে মনে হল না। কারণ যা যা করার কথা নয় - উজ্জ্বল রঙের জামাকাপড় পরা থেকে শুরু করে চেঁচামেচি, হইচই, সেল্ফি স্টিক - সমস্তই হচ্ছিলো, এবং অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে। আর একটা কাজ তো অবশ্যই করা উচিৎ - গাড়ির সংখ্যার ওপর একটা লিমিট রাখা। কারণ বিরক্ত হয়ে যখন নেমে এলাম, তখন অন্ততঃ খান পঁচিশেক জিপসি ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।

নেমে আসাটা অবশ্য বোকামো হয়েছিলো - কারণ সেই যে ট্রাইবাল নাচের কথা বলেছিলাম - সেটা এই ডেইলি টুরিস্টদের প্যাকেজেরই অংশ। অত গাড়ির মিছিল সব গিয়ে পৌঁছলো পানঝরাতেই। আমরা পৌঁছে দেখি তখনই সামনের লনটা পুরো ভর্তি। টাওয়ারে থেকে গেলে সেখানটা খালিই পেতাম, হয়তো কিছুক্ষণ দাঁড়ালে হাতির দেখা পেলেও পেতে পারতাম...

যাই হোক - ভিড়ের মধ্যে আর নাচ দেখতে যাইনি, বরং বাংলোর সামনে রকে বসে চা আর পকোড়া খেয়ে গল্পসল্প করলুম। যখন বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে (এবং সব টুরিস্ট ফিরে গেছে), আমি একটু বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম - তখন হঠাৎ কসম্‌সে বলছি - টায়ার ফাটার মত একটা আওয়াজ এলো উল্টোদিকে নদী পেরিয়ে জঙ্গলের দিক থেকে, আর তার পরেই "আঃ" করে একটা চিৎকার - বাজি ফেলে বলতে পারি সেটা মানুষের গলার, আর আওয়াজটা বন্দুক জাতীয় কিছুর। তারপরেই বড় বড় টর্চের আলো ওদিক থেকে দেখা যেতে লাগলো। পানঝরার কেয়ারটেকার দুজন বল্ল হাতি এসেছে সম্ভবতঃ, যদিও ওদের টর্চের আলো (সাথে আমার সাথে আনা বড় ক্যাম্প লাইটের আলো) দিয়েও কিছু দেখা গেল না। ওদিকের আলোগুলো কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে আবার নিভে গেলো। কী হয়েছিলো বুঝলাম না, তবে পরের দিন দেবাশিসের সাথে কথা বলে মনে হল চোরাশিকারের ঘটনা হলেও হতে পারে - ওদিকে বেশ কয়েকটা জঙ্গলের সিকিউরিটির দায়িত্ব এখন এসএসবির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, কারণ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ছড়াচ্ছে - এবং এসএসবির মুখের আগে গুলি চলে। ঠিক কী হয়েছিলো সেদিন, তা হয়তো কখনোই জানতে পারবো না - পরের দিন কাগজ বা লোকাল লোকের মুখেও কিছু শুনিনি, তবে যতবার ব্যাপারটা মনে পড়ে, ততবারই চোরাশিকারের ধারণাটাই আরো গেঁথে বসে।

যাই হোক, পানঝরায় আমাদের এক রাতেরই থাকা ছিলো। জিনিসপত্র রাতেই গুছিয়ে রাখলাম। পরের দিন ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে যাবো - গৌহাটি যাওয়ার রাস্তা ধরে জলদাপাড়া পেরিয়ে মেন্ডাবাড়ি/চিলাপাতা।

(চলবে)

(আগের কথা)

Tuesday, November 27, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৮ম পর্ব)

সম্পূর্ণ নির্জনতা চান? টোটাল সলিটিউড? যেখানে অন্য ট্যুরিস্ট এসে লাফালাফি করবে না...শুধু আপনি, আপনার অল্প কয়েকজন সঙ্গী, ক্যামেরা, বই? মৌচুকী ক্যাম্প একেবারেই তাই। যে একদিন বা দুদিন এখানে থাকবেন, আপনার সঙ্গী বলতে (সঙ্গে যারা আছে তারা বাদ দিয়ে) চারপাশের জঙ্গল, বেশ কিছু পাখি, ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, সন্ধ্যেবেলা আলো দেখে ধেয়ে আসা দলে দলে পোকা, দুটো হৃষ্টপুষ্ট কুকুর, আর বুদ্ধ - মানে মৌচুকীর কেয়ারটেকার। টুরিস্টের ভিড় নেই, মেমোরেবিলিয়ার দোকান নেই, গাড়ির আওয়াজ নেই...নিশ্ছিদ্র নিশ্চুপ নির্জনতা।

পাখির সীজনে গেলে - মানে আরেকটু শীত পড়লে - আপনি হেঁটে হেঁটে পিছনের পাহাড়টায় উঠতে পারেন - পাখির ছবিশিকারীদের স্বর্গ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে পূবদিকে ভুটান পাহাড় স্পষ্ট দেখা যায়। আর যদি আরেকটু অ্যাডভেঞ্চারের ইচ্ছে থাকে, তাহলে যে পাথরবসানো রাস্তায় উঠেছেন, সেই পথ বেয়েই নেমে যেতে পারেন পনেরো কিলোমিটার মতন দূরে মূর্তি নদীর ওপর একটা ছোট ঝরনার ধারে - জায়গাটার নাম ওরা দিয়েছে "রকি আইল্যান্ড", বা পিকনিক করে আসতে পারেন রিভার ক্যাম্পের কাছে মূর্তির ধারে। আর যেতে পারেন যুগলে, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা nth মধুচন্দ্রিমার জন্যে - ঠকবেন না গ্রান্টী।

আমরা গেছিলাম ল্যাদ খাবো বলে। আর আমার সুপ্ত ইচ্ছে ছিলো একটু pampered হওয়ার। ঋতিকে বললাম - রোজ তো আমি তোদের সবাইকে ঘুম থেকে তুলে স্কুল যাবার জন্যে তৈরী করি, এই কদিন না হয় তোরা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবি, ব্রেকফাস্ট খাওয়াবি, ঘুরতে নিয়ে যাবি...ঋতি শুনে এক কথায় উত্তর দিলো - "আহ্লাদী":-)

সেদিন মৌচুকী পৌঁছে দেখলাম দোতলা কাঠের বাড়িটায় নীচের তলায় দুটো ঘর খালি, দোতলায় একটা ফ্যামিলি রয়েছে - তারা পরের দিন ফিরে যাবে। নীচের দুটো ঘরের মাঝখানে খাবার জায়গা। তিনবেলা খাবার পাবেন - সকালে ব্রেকফাস্ট, দুপুরের লাঞ্চ, রাতের ডিনার। এর মাঝে চা পেয়ে যাবেন চাইলে। নীচের ঘরে জিনিসপত্র রেখে একটু আশপাশটা দেখতে দেখতেই দুপুরের খাবার ডাক পড়লো। সাধারণ খাওয়া - ডাল, ভাত, তরকারি আর ডিমের ঝোল, কিন্তু পরিমাণ দেখে চক্ষু চড়কগাছ। বুদ্ধ মনে হয় খোদ আবদুর রহমানের হাতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। একটা পেল্লায় ক্যাসারোলে ভাত, প্রায় সেরকমই বড় পাত্রে ডাল/তরকারি...ডিমের ঝোলে ডিমের সংখ্যা অবশ্য মাথাপিছু দুটো করে। খাবার দেখিয়ে বুদ্ধ বললো - কম পড়লে বলবেন, আরো দিয়ে যাচ্ছি। খাওয়া শেষে দেখলাম ভাতের ক্যাসারোলের ওপরের ১/৩ কমেছে মাত্র, ডাল প্রায় যেমনকার তেমনি রয়ে গেছে, তরকারি - মানে তেলতেলে আলুভাজাটাই পুরো শেষ, আর ডিমের ঝোলটা। বুদ্ধকে জানিয়ে দিতে হল যে ভাত/ডালের পরিমাণটা একটু কম হলেই ভালো...

দুপুরে বাংলো খালি হয়ে যায় - বুদ্ধ আর ওকে সাহায্য করে বাচ্চামতন একটা ছেলে - ওরা নীচে ওদের গ্রামে যায়। একা থাকার অভ্যেস না থাকলে সেই সময়টা মনে হবে ভূতের বাড়িতে বসে আছেন। আলো পড়ে আসে তাড়াতাড়িই, পাহাড়ের গা বেয়ে মেঘ নামে - আস্তে আস্তে অল্প অল্প দেখতে পাওয়া ভুটান পাহাড় পুরো মেঘে ঢেকে যায়। নীচে কয়েক কিলোমিটার দূরে গ্রামটার ছোট ছোট বাড়িগুলোও চলে যায় মেঘের আড়ালে। কিছুক্ষণ পর বাড়িগুলোতে আলো জ্বলে উঠলে মেঘের মধ্যে দিয়ে আবছা আলোটা দেখা যায়। আর দেখা যায় উল্টোদিকের পাহাড়ের গায়ের বাড়িগুলোর আলো।

বারান্দায় বসে বই পড়ছিলাম, উঠে আলোটা জ্বালাতে হল। আর তার কিছুক্ষণ পরেই দলে দলে পোকা ধেয়ে এলো। প্রথমদিকে কত রকমের পোকা সেটা গোণার একটা ক্ষীণ চেষ্টা করেছিলাম - অল্প সময়ের মধ্যেই হাল ছাড়তে হল - কারণ পোকার সংখ্যা আর তার রকমের সংখ্যা হাতের বাইরে ততক্ষনে। বুদ্ধ এসে চা দিলো, তারপর আবার বই পড়া বা বকবক করা - কাজ বলতে এই। ছেলেমেয়ে কিছুক্ষণ বই পড়লো, কিছুক্ষণ মোবাইলে গেম খেললো। ওপরের পরিবারের লোকজনের সাথে দুটো চারটে কথা হল চা খাওয়ার সময়...

রাতের খাবারের সময় সেই একই হাল - দুপুরের মত। রুটি কটা লাগবে তা আর বলা হয়নি - অতএব খান পঁচিশেক রুটি এসে হাজির। সাথে আবার তেলতেলে আলুভাজা, ডাল আর চিকেন। অল্প ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া, সাথে গরম রুটি, ডাল ইত্যাদি - রোজকার দুটো রুটির লিমিট পেরিয়ে সেদিন মনে হয় খান আষ্টেক খেয়ে ফেলেছিলাম। রান্নাও এখানে ভালোই করে, আর মুরগীটাও পোলট্রির পানসে মুরগী নয়...

ন'টা বাজতেই পাহাড়ে মাঝরাত হয়ে যায়। নিঝুম অন্ধকারে চারপাশে ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ও হ্যাঁ, দোতলায় পায়ে চলার জন্যে কাঠের মেঝের ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ ছাড়া।



(চলবে)



(আগের কথা)