(৮) শেষ অধ্যায় - দেশভাগ ও নকবা
প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট তখন তার শেষ অবস্থায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর, কলোনিয়াল শক্তি হিসেবে একদা পৃথিবী শাসন করা ব্রিটেন প্রায় বিধ্বস্ত - যুদ্ধে জয়ী হয়ে থাকলেও। সেই সময়ে প্যালেস্টাইনের অশান্ত ভূখণ্ড শাসন করার মত প্রয়োজনীয় সম্পদ বা সদিচ্ছা - কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। আরব বিদ্রোহ চোখে আঙুল দিয়ে ম্যান্ডেটের বাস্তবতা ধরিয়ে দিয়েছিল, পাশাপাশি নাৎসি আমলের "হলোকাস্ট" গোটা বিশ্ব জুড়ে ইহুদীদের পুনর্বাসনের জন্যে প্রবল চাপ তৈরী হয়েছিল ইউরোপের দেশগুলোর ওপরে। ১৯৪৭ সালে, যুদ্ধবিধ্বস্ত ক্লান্ত শ্রান্ত ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইনের দায়িত্ব তুলে দেয় নবনির্মিত জাতিসংঘের হাতে। প্রায় ধ্বসে পড়া ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের কাছে প্যালেস্টাইন তখন এক অসহনীয় বোঝা।
১৯৪৭ সালের মে মাসে জাতিসংঘ একটি বিশেষ কমিটি তৈরী করে - United Nations Special Committee on Palestine (UNSCOP)। এগারোটা তথাকথিত নিরপেক্ষ দেশের প্রতিনিধিরা প্যালেস্টাইন সফরে আসেন, এবং নানান মানুষের সঙ্গে কথা বলে, তাদের সাক্ষ্য নিয়ে এই কমিটি দুটো প্রস্তাব জমা দেয় ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সংখ্যাগরিষ্ঠ প্ল্যানে বলা হয়েছিল প্যালেস্টাইনকে ভাগ করে আলাদা আরব আর ইহুদী রাষ্ট্র তৈরী করা, এবং জেরুজালেমকে আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের অধীনে রাখার কথা। সংখ্যালঘিষ্ঠ প্ল্যানে বলা হয়েছিল একই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আরব এবং ইহুদীদের স্বশাসিত অঞ্চলের কথা। জিউয়িশ এজেন্সি সংখ্যাগরিষ্ঠ প্ল্যান মেনে নেয়। উল্টোদিকে, আরব হায়ার কমিটি এবং সমস্ত আরব দেশগুলোর সরকার দুটো প্ল্যানই বাতিল করে দেয়। খুব সহজ সরল এবং অকাট্য যুক্তি ছিল তাদের - একটা আরব ভূখণ্ডকে বিভক্ত করার অধিকার কোন বিদেশী শক্তির নেই।
জায়নিস্টরা ঘোরতর লবিয়িং শুরু করে। ১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর, নিউ ইয়র্কের ফ্লাশিং মেডোজে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন বসে। শেষ মুহূর্ত অবধি অনিশ্চয়তা থাকলেও, তার আগের কয়েকটা মাসের অবিরাম চাপ আর লবিয়িং জয়ী হয়। প্যালেস্টাইনের বিভাজন সংক্রান্ত জাতিসংঘের ১৮১(২) নম্বর প্রস্তাব পাশ হয় পক্ষে ৩৩ ও বিপক্ষে ১৩টি ভোট নিয়ে। ভোটদানে বিরত থাকেন ১০টি দেশের প্রতিনিধিরা। আরব প্রতিনিধিরা প্রতিবাদে সভা থেকে বেরিয়ে আসেন।
প্রস্তাব অনুযায়ী, প্যালেস্টাইনের ৫৫ শতাংশ জমি দেওয়া হয় ইহুদী রাষ্ট্রকে - ঊর্বর উপকূলীয় সমভূমি, জেজরিল উপত্যকা আর নেগেভের কিছু অংশ ছিল এর মধ্যে। আরবদের হাতে যায় প্যালেস্টাইনের ৪৫ শতাংশ জমি - মূলতঃ মাঝখানের রুক্ষ পাথুরে পাহাড়ি এলাকা, গাজা উপকুল এবং নেগেভের বাকি অংশ। আর, বলা হয় জেরুজালেম থাকবে আন্তর্জাতিক প্রশাসনের অধীনে কর্পাস সেপারেটাম বা স্বতন্ত্র সত্ত্বা হিসেবে। বিভাজনের এই শতাংশের হিসেবের সময় একটা জিনিস মাথায় রাখবেন - ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের শেষ দিন অবধি, প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার এক তৃতীয়াংশ, এবং তাদের হাতে জমি ছিল গোটা ভূখণ্ডের সাত শতাংশেরও কম। অথচ, বিভাজনের পর, ৩৩ শতাংশ মানুষ পেয়ে যায় মোট জমির ৫৫ শতাংশ, এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের হাতে পড়ে থাকে রুক্ষ পাথুরে জমি, এবং শতাংশের হিসেবেও সেটা অনেকটাই কম। বিভাজনের অঙ্কের এই অবিচার একেবারে স্পষ্ট এবং অনস্বীকার্য্য।
গৃহযুদ্ধ (নভেম্বর ১৯৪৭ - মে ১৯৪৮)
জাতিসংঘের ভোটের পরের দিন থেকেই হিংসা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ক্ষিপ্ত আরব জনতা ইহুদী বসতিগুলোর ওপর আক্রমণ চালায়। ইহুদী মিলিশিয়ারা পালটা আরব অধিবাসীদের ওপর হামলা করে। ব্রিটিশরা সেই সময়ে প্যালেস্টাইন ছাড়তে ব্যস্ত - তারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৮ সালের মধ্যেই শুরু হয়ে যায় পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ।
একদিকে ফৌজি আল-কাউকজির নেতৃত্বে আরব লিবারেশন আর্মি সিরিয়ার দিক থেকে প্যালেস্টাইনে ঢোকে। স্থানীয় প্যালেস্তিনীয় অধিবাসীদের নিয়ে তৈরী অনিয়মিত বাহিনী গ্রাম থেকে গ্রামে লড়াই চালিয়ে যায়। কিন্তু সবই ছিল অনিয়ন্ত্রিত, কোন সেন্ট্রাল কম্যান্ড, বা অস্ত্রাগার, বা প্রশিক্ষিত সংরক্ষিত বাহিনী ছাড়াই।
অন্যদিকে, জায়নিস্টরা তখন পুরোদস্তুর প্রস্তুত। হাগানাহ্ বেশ কিছুদিন ধরেই এই মুহূর্তের জন্যে নিজেদের তৈরী করছিল। ব্রিটিশদের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে, চোরাচালানের মাধ্যমে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র যোগাড় করে, এবং ১৯৩৬-৩৯ সালের আরব বিদ্রোহের অভিজ্ঞতার নিরিখে হাগানাহ্ তখন সুশৃঙ্খল আধুনিক যুদ্ধশক্তি। পালমাচ (স্ট্রাইক ফোর্স)-এর হাতে তখন মোবাইল ওয়ারফেয়ার বা চলমান যুদ্ধের জন্যে প্রশিক্ষিত অভিজাত বাহিনীও ছিল। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে, হাগানাহ্ হাই কম্যান্ড কৌশলগতভাবে সড়ক, পাহাড়ের চূড়া, আর মিশ্র শহরগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্লুপ্রিন্ট প্ল্যান ডালে (প্ল্যান ডি) চূড়ান্ত করে ফেলে। পরবর্তীকালে প্রকাশিত বিভিন্ন দলিল থেকে জানা যায় যে প্ল্যান ডি বাস্তবে ছিল ইহুদীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সমস্ত এলাকা থেকে আরব জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বিতারণের নকশা।
এর পরেই ঘটে যায় ডের ইয়াসিনের ঘটনা।
১৯৪৮ সালের ৯ই এপ্রিল - ইরগুন আর লেহী জঙ্গিরা জেরুজালেমের অদূরে অবস্থিত ছোট্ট একটা গ্রাম - ডের ইয়াসিনে হামলা করে। অন্তত ১০৭ জন আরব অধিবাসীকে খুন করা হয় - বাদ যায় না নারী ও শিশুরাও। অনেক ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী সংখ্যাটা আড়াইশোও হতে পারে। জাতিসংঘের এক রিপোর্টে এই ঘটনা সম্পর্কে লেখা হয় “massacre of a particularly atrocious nature...”
জায়নিস্ট জঙ্গিরা মৃতদের দেহ নিয়ে জেরুজালেমের রাজপথ প্রদক্ষিণ করে। ডের ইয়াসিনের ঘটনার খবর দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে গোটা প্যালেস্টাইনে। প্রায় প্রতিটা গ্রামে চরম আতঙ্কের পরিবেশ তৈরী হয়। হাজারো মানুষ প্রাণের ভয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করেন। এই পুরো সময়টা জুড়েই প্রায় বিশৃঙ্খলার মধ্যে থাকা আরব নেতৃত্ব এই এক্সোডাস ঠেকাতে ব্যর্থ হন। যারা প্রাণে বেঁচে যায়, তাদের কাছে ডের ইয়াসিন হয়ে ওঠে আসন্ন “নাকবা” বা মহাবিপর্যয়ের প্রতীক।
আজকের ইজরায়েল ডের ইয়াসিনকে ধামাচাপা দিতে প্রায় সফল হয়ে গিয়ে থাকলেও এই ঘটনা সেই সময়ের বিশ্ববাসীর নজর এড়ায়নি। এমনকী, ইহুদীদেরও নয়। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর, নিউ ইয়র্ক টাইমসে একটা চিঠি ছাপা হয় যেটা সারা পৃথিবীতে, বিশেষ করে জায়নিস্টদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন তৈরী করেছিল। চিঠিতে সই করেছিলেন আঠাশজন বিশিষ্ট ইহুদী বুদ্ধিজীবী, যাঁদের মধ্যে ছিলেন স্বয়ং অ্যালবার্ট আইনস্টাইন, এবং দার্শনিক হানা আরেন্ডট। সদ্য তৈরী ইজরায়েল রাষ্ট্রের উগ্র জাতীয়তাবাদী হেরুট (যে কথাটার মানে স্বাধীনতা) দলের নেতা মেনাখেম বেগিন সেই সময়ে যুক্ত্ররাষ্ট্র সফরে এসেছিলেন তাঁর দলের জন্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন আদায় করতে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের চিঠি ছিল সেই বেগিনের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ। স্পষ্ট ভাষায় লেখা হয়েছিল যে হেরুট আসলে ইরগুনের রাজনৈতিক উত্তরসূরী, আর ডের ইয়াসিনের হত্যাকাণ্ডের পিছনে ছিল এই ইরগুনই; এবং বেগিনের দল তাদের সংগঠন, রাজনৈতিক দর্শন আর সামাজিক আবেদনের দিক থেকে একেবারেই নাৎসিদের মিরর ইমেজ যারা উগ্র জাতীয়তাবাদ আর জাতিগত শ্রেষ্ঠত্বের প্রচার করে। কিন্তু সেই ১৯৪৮ এর জানুয়ারি মাসেই, ইজরায়েল রাষ্ট্রের জন্যে ফান্ড রেইজিং-এর উদ্দেশ্য নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরে এসেছিলেন বেন গুরিয়নের মেইনস্ট্রিম জায়নিস্ট লেবার পার্টির গোল্ডা মেয়ার। এবং নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত চিঠি বেন গুরিয়নের জায়নিস্ট সরকারের চালিয়ে আসা এথনিক ক্লেনসিং সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব ছিল, কারণ স্বাক্ষরকারীদের অধিকাংশই ছিলেন বেন গুরিয়নপন্থী মেইনস্ট্রীম জায়নিস্ট। ইতিহাস বলে, বেন গুরিয়ন বিভিন্ন সময়ে তাঁর ডায়েরিতে এথনিক ক্লেনসিং-এর স্বপক্ষে নানান কথা লিখেছেন, যেমন ১৯৩৭ সালের লেখা পাওয়া যায় - “We must expel Arabs and take their places... and if we have to use force”, বা জাতিসংঘের পার্টিশন প্ল্যানের সময়ে লেখা - “The borders will be determined by force”, অথবা লিদ্দা আর রামলা দখলের আগে - “We must do everything to insure they never do return”...গুরিয়নের জ্ঞাতসারে ১৯৩০ সাল থেকেই তৈরী করা হচ্ছিল “ভিলেজ ফাইলস” - প্যালেস্টাইনের প্রতিটি গ্রামের পুঙ্খানুপুঙ্খ নকশা, সেখানকার মানুষজনের সমস্ত খবরাখবর - এথনিক ক্লেনসিং-এর সময়ে যার ব্যবহার করেছিল ইজরায়েলি সেনারা। গোল্ডা মেয়ার, যিনি সেই সফরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছিলেন যুদ্ধের খরচ মেটানোর জন্যে, ছিলেন বেন গুরিয়নের একেবারে কাছের বৃত্তের একজন সিনিয়র সদস্য যিনি পরবর্তীকালে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন, ১৯৬৯ সালের এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন - “There was no such thing as Palestinians... They did not exist”...বেগিন এবং বেন গুরিয়নের মধ্যে তফাত ছিল শুধুমাত্র প্রেজেন্টেশনে; বাস্তবে উভয়েরই চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল এমন একটা ইহুদি রাষ্ট্র, যেখানে আরবদের উপস্থিতি থাকবে যথাসম্ভব নগণ্য। বেগিন ছিলেন প্রকাশ্যেই সহিংস; অন্যদিকে বেন গুরিয়ন ও মেয়ার ছিলেন “ডিপ্লোম্যাটিক”, নিজেদের এথনিক ক্লেনসিং-এর পরিকল্পনাকে “আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ” হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে অনেক বেশি দক্ষ। আইনস্টাইন ও হানা আরেন্ডট-স্বাক্ষরিত চিঠিটা, তার সমস্ত নৈতিক আবেগ ও উদ্দীপনায়, বেগিনের ফ্যাসিবাদী রীতির তীব্র নিন্দা জানালেও, মূলধারার বেন গুরিয়ন সরকারের এথনিক ক্লেনসিং সম্পর্কে সম্পূর্ণ নীরব থেকে গেছিল। ন্যাশনাল সিকিউরিটির রিয়েলপলিটিকের তলায় চাপা পড়ে গেছিল বিতাড়িত প্যালেস্তিনীয়দের দীর্ঘশ্বাস।
ব্রিটিশ উইথড্রয়াল এবং ইজরায়েলি ডিক্লারেশন (১৪-১৫ই মে, ১৯৪৮)
১৯৪৮ সালের ১৪ই মে, শেষ ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার অ্যালান কানিংহাম জেরুজালেম ছেড়ে ফিরে যান। হাইফায় নামিয়ে ফেলা হয় “ইউনিয়ন জ্যাক”। শেষ হয় ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের শাসন। সেইদিনই বিকেলে, তেল আভিভ মিউজিয়ামে ডেভিড বেন-গুরিয়ন “জিউয়িশ পিপলস কাউন্সিল”-এর সামনে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। জন্ম নেয় ইজরায়েল রাষ্ট্র। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন এই রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। পরদিন সকালে, অর্থাৎ ১৫ই মে, পাঁচটি আরব দেশের সেনাবাহিনী - মিশর, ট্রান্সজর্ডান, সিরিয়া, লেবানন এবং ইরাক - প্যালেস্টাইনের সীমান্ত অতিক্রম করে। সৌদি আরবও মিশরীয় কমান্ডের অধীনে সেনা পাঠায়। আরব লীগ এই পদক্ষেপকে প্যালেস্তিনীয় আরবদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করে। শুরু হয় ১৯৪৮ সালের আরব-ইজরায়েল যুদ্ধ।
যুদ্ধ এবং যুদ্ধবিরতি (মে ১৯৪৮ - জুলাই ১৯৪৯)
কাগজে কলমে আরব বাহিনী ছিল বিশাল। ইজিপ্ট পাঠিয়েছিল দশ হাজার সৈন্য, ইরাক পনেরো হাজার, সিরিয়া সাত হাজার, লেবানন দুই হাজার, আর ট্রান্সজর্ডানের আট হাজার সৈন্যের আরব লিজিয়ন এর মধ্যে ছিল সবচেয়ে প্রশিক্ষিত বাহিনী। হাগানাহ্, যার নাম এই সময়ে বদলে হয়েছে ইজরায়েলই ডিফেন্স ফোর্সেস বা আইডিএফ, তাদের হাতে শুরুতে ছিল পঁয়ত্রিশ হাজার সৈন্য, বছর শেষে যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় এক লক্ষে।
কিন্তু আরবদের পারস্পরিক সমন্বয় ছিল শোচনীয়। ট্রান্সজর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ্ সেই সময়েই জিউয়িশ এজেন্সির সঙ্গে গোপনে আলোচনা চালাচ্ছিলেন যাতে কোনোভাবে ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক তাঁর হাতে এসে যায়। ইজিপ্ট সৈন্য পাঠালেও আবদুল্লাহর ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করার কোন ইচ্ছা তাদের ছিল না। ইরাক আর সিরিয়ার নিজেদেরও আলাদা উদ্দেশ্য ছিল। আরবদের মধ্যে সেন্ট্রাল কম্যান্ড বলে কিছু ছিল না তখনও। এবং পরেও, বলা ভালো চিরকালই, আরব রাষ্ট্রের শাসকেরা - বিভিন্ন রাজপরিবারের সদস্যরা - প্যালেস্টাইনকে শুধুমাত্র নিজেদের স্বার্থেই কুমীরছানার মত ব্যবহার করে এসেছে। সেদিনও যা ছিল, আজও তাই...
যুদ্ধের কথায় ফিরি। যুদ্ধটা হয় কয়েকটা ধাপে। শুরুতে আরব সেনাবাহিনী খানিক এগিয়ে যায় - দখল করে পূর্ব জেরুজালেম, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক আর নেগেভের খানিকটা। জুন মাসে, মাসখানেকের যুদ্ধবিরতির পর, আইডিএফ প্রত্যাঘাত করে। জুলাই মাসে অপারেশন দানি-তে দখল হয় লিদ্দা আর রামলা। বিতাড়িত হয় সেখানকার আরব অধিবাসীরা। অক্টোবরে অপারেশন ইয়োভে আইডিএফ ইজিপ্টের ডিফেন্স লাইন ভেঙে দখল করে নেগেভ। ১৯৪৯ সালের জানুয়ারি নাগাদ পূর্বতন ম্যান্ডেট এলাকার বেশিরভাগ অংশই চলে আসে ইজরায়েলের হাতে।
১৯৪৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাসের মাঝের সময়ে বিভিন্ন পক্ষের পক্ষে পারস্পরিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়ে যায়। ইজরায়েল ততদিনে ব্রিটিশ শাসিত ম্যান্ডেটরি প্যালস্টাইনের ৭৮ শতাংশ এলাকা দখলে এনে ফেলেছে - জাতিসংঘের পার্টিশন প্ল্যানের চেয়ে অনেকটাই বেশি। ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক আর পূর্ব জেরুজালেম জর্ডানের সাথে যুক্ত করে নেওয়া হয়। গাজা ভূখণ্ড চলে যায় ইজিপ্টের সামরিক প্রশাসনের হাতে। প্যালেস্তিনীয়দের ভাগে থাকে শূন্য।
নকবা (মহাবিপর্যয়)
চরম মূল্য চোকাতে হয় প্যালেস্তিনীয়দের। প্রায় সাত বা সাড়ে সাত লক্ষ প্যালেস্তিনীয় আরব - তৎকালীন ম্যান্ডেটরি প্যালেস্টাইনের আরব জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক তাদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়, বা নিজের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়। ভরে ওঠে গাজা, ওয়েস্ট ব্যাঙ্ক, জর্ডন, লেবানন আর সিরিয়ার রিফিউজি ক্যাম্পগুলো। আজও, সেই পরিবারের উত্তরসূরীরা রয়ে গেছেন এই রিফিউজি ক্যাম্পগুলোতেই...তাদের নিজস্ব মাটিতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি আজও। লক্ষাধিক প্যালেস্তিনীয় গ্রামবাসীকে দেশের মধ্যেই রিফিউজি হতে হয়েছিল, যাঁরা কোনওদিন নিজেদের গ্রামে আর ফিরতে পারেননি।
ইজয়ায়েলের হাতে ধ্বংস হয়েছিল প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ প্যালেস্তিনীয় গ্রাম। গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল সমস্ত ঘরবাড়ি। বাইরে থেকে এনে বসানো হয়েছিল ইহুদী অভিবাসীদের। মানচিত্রে মুছে দেওয়া হয়েছিল আরবী নামগুলো। বদলে এসেছিল হিব্রু নাম...ভূখণ্ড থেকে তার পূর্বতন অধিবাসীদের সমস্ত চিহ্ন মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে। পুরো ঘটনার মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরিণতি ছিল মর্মান্তিক, আজও তার বদল হয়নি। নকবা - যার মানে “মহাবিপর্যয়” বা “catastrophe” - ১৯৪৮ সালের আগস্ট মাসে, যখন যুদ্ধ চলছে, সেই সময়েই প্রথমবার শব্দটাকে ব্যবহার করেছিলেন সিরিয়ার ঐতিহাসিক কনস্ট্যান্টাইন জুরেইক - আজকের দিনে শুধুমাত্র ভিটেমাটি হারানোকে বোঝায় না। নকবার মানে আজ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে একটা সমাজের ধ্বংসের সঙ্গে, স্বাধীনতার স্বপ্ন ভেঙে গুঁড়িয়ে যাওয়ার সঙ্গে, এবং আজও অমীমাংসিত এক শরণার্থী সমস্যার সঙ্গে।
ইজরায়েলিদের কাছে ১৯৪৮ সাল ছিল “স্বাধীনতা যুদ্ধ” - প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে ছিনিয়ে আনা এক অলৌকিক বিজয়। অন্য দিকে, প্যালেস্তিনীয়দের কাছে ১৯৪৮ মানে “নকবা” - এক গভীর মানসিক ক্ষত বা ট্রমা, যে ক্ষত আজও তাদের পরিচয়, তাদের রাজনীতি আর তাদের স্মৃতির সংজ্ঞা। দুই জাতি - একটাই ভূখণ্ড - কিন্তু দুটো সম্পূর্ণ বিপরীত ইতিহাস।
ম্যান্ডেটের লাভক্ষতির খতিয়ান
১৯২২ সালে, প্যালেস্টাইনে ম্যান্ডেট ব্যবস্থা যখন শুরু হয়, প্যালেস্তিনীয় জনসংখ্যার ৯০ শতাংশের বেশি ছিল আরব - আর, তারা শুধু মুসলমান ধর্মাবলম্বীই ছিল না। ম্যান্ডেট ব্যবস্থা যখন শেষ হয়, ১৯৪৮ সালে, দেশ হারানোর পর তাদের হাতে তাদের ছিল শূন্য। ব্রিটিশরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এক “সেক্রেড ট্রাস্ট”-এর, অধিবাসীদের স্বশাসনের জন্যে প্রস্তুত করে তোলার উদ্দেশ্যে। বাস্তবে তাদের তত্ত্বাবধানেই, তিরিশ বছর ধরে ক্রমাগত চলেছিল জমি আর বাস্তুভিটে হারানো, ডেমোগ্রাফির বদল, আর শেষ অবধি এথনিক ক্লেনসিং-এর প্রক্রিয়া...
তিনটে প্রতিশ্রুতির কথা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম - হুসেইন-ম্যাকমাহন চুক্তি, ব্রিটিশ ও ফরাসীদের মধ্যে সাইকস-পিকট চুক্তি, আর ব্যালফোর ডিক্লারেশন। ম্যান্ডেটের শেষ পর্বে এই তিন চুক্তি এক জায়গায় এসে পরস্পরের সঙ্গে ধাক্কা মারল। আরবরা পরাজিত হল। ফরাসী ও ব্রিটিশরা বিদায় নিলো। জায়নিস্টরা তাদের অভীষ্ট রাষ্ট্র পেল। আর প্যালেস্তিনীয়রা পরিণত হল এক দেশহীন জাতিতে।
আর্চিবল্ড ওয়াভেলের যে কথাগুলো এর আগে একবার লিখেছিলাম - “After 'the war to end war' they seem to have been pretty much successful in Paris at making a 'Peace to end Peace” - খুঁজে পেল তিক্ত পরিণতি। প্যারিস আর সান রেমোর শান্তিচুক্তি, লন্ডন আর আরব মরুভূমির মাটিতে দেওয়া প্রতিশ্রুতি, এবং যে ম্যান্ডেটের কথা ছিল সভ্যতাকে পথ দেখিয়ে আনার - সবাই, একত্রে, মধ্যপ্রাচ্যের মাটিকে ঠেলে দিয়েছিল ১৯৪৮ সালের এই বিপর্যয়ের পথে।
আজও যে ক্ষত দগদগে ঘা হিসেবেই থেকে গেছে...
====================================
শেষ হল মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন। ১৯০৮ সালের তেল আবিষ্কার থেকে ১৯৪৮ সালের নকবা অবধি আরব-ইজরায়েল সংঘর্ষের উৎসের সন্ধানে এই লেখা। এর পরের কথা - ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ, ইজরায়েলি অকুপেশন, অসলো চুক্তি, ইন্তিফাদা, গাজার যুদ্ধ - অন্য কোন সময়ে লিখব, যদি পারি।
যে সমস্ত সূত্রের সাহায্য নিয়েছি, তাদের একটা তালিকা দিলাম।
(১) Palestine and the Arab Israeli Conflict, Charles D. Smith
(২) The Hundred Year’s War on Palestine, Rashid Khalidi
(৩) The Ethnic Cleansing of Palestine, Ilan Pappe
(৪) One Palestine, Complete, Tom Segev


No comments:
Post a Comment