Thursday, April 02, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: আরব বিদ্রোহ (১৯৩৬-১৯৩৯)

(৭) আরব বিদ্রোহ (১৯৩৬-১৯৩৯)

১৫ই এপ্রিল, ১৯৩৬ এর রাত - আল কাসামের গেরিলা বাহিনী নাবলুস আর তুলকার্মের মধ্যে রাস্তায় একটা গাড়ির ওপর হামলা করে, গুলির আঘাতে মারা যায় দুজন ইহুদী ড্রাইভার। প্রতিশোধ হিসেবে, পরের দিন সন্ধ্যেবেলা, ইরগুনের বন্দুকধারীরা পেতাহ্‌ টিকভার কাছে এক কুঁড়েঘরে আক্রমণ করে দুজন আরব চাষিকে খুন করে। হিংসা ছড়াতে থাকে। ঠিক চার দিনের মাথায়, ১৯শে এপ্রিল, আরব জনতা জাফায় ইহুদী বসতির ওপর হামলা করে। ব্রিটিশ সেনা আরব নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে, আর আরব গ্রামগুলোকে সমষ্টিগতভাবে জরিমানা করে। 

এই ঘটনার এক অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ২৫শে এপ্রিল, প্যালেস্টাইনের ছ'টা রাজনৈতিক দলের প্রত্যেকেই একজোট হয়ে তৈরী করে এক যৌথ কাঠামোর - আরব হায়ার কমিটি - যার শীর্ষে ছিলেন জেরুজালেমের মুফতি, হজ আমিন আল হুসেইনি। কমিটি অনির্দিষ্টকালের জন্যে হরতালের ডাক দেয় - সমস্ত দোকানপাট, চাষের কাজ, কারখানা, যোগাযোগ ব্যবস্থা - সব বন্ধ থাকবে যতদিন না ব্রিটিশরা তিনটে দাবী মেনে নিচ্ছে - ইহুদী অভিবাসন বন্ধ, ইহুদীদের কাছে জমি বিক্রি বেআইনি করা, আর আরব স্বাধীনতা।

প্রথম পর্যায়ঃ হরতাল ও বিদ্রোহের শুরু (এপ্রিল ১৯৩৬ - জুলাই ১৯৩৭)

হরতাল শুরু হয় ৮ই মে - আর শুরু থেকেই একেবারে সর্বাত্মক। সমস্ত আরব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। ট্যাক্সি বন্ধ থাকে। ছাত্ররা স্কুল বয়কটের ডাক দেয়। অর্থনীতির চাকা সম্পূর্ণ অচল হয়ে যায়। পাশাপাশি, গ্রামাঞ্চলে, আরব গেরিলা বাহিনী, অনেকসময়েই যাদের সামনে ছিল প্রাক্তন অটোমান অফিসাররা, একসঙ্গে আক্রমণ শুরু করে প্যালেস্টাইনকে বাদবাকি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে রাখা পাইপলাইন, ব্রিজ আর রেলওয়ে লাইনের ওপর। হরতাল মেটাতে ব্রিটিশরা জোরকদমে সেনাবাহিনীকে মাঠে নামায়। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি, প্যালেস্টাইনে প্রায় ২০০০০ ব্রিটিশ সৈন্য নামানো হয় - দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝে অন্যতম বড় সেনা মোতায়েন। গ্রামকে গ্রাম জুড়ে সমবেত শাস্তি - জরিমানা, ফলের বাগান তছনছ করে দেওয়া, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া - আজকের বুলডোজার ট্রিটমেন্টের সঙ্গে কী মিল, তাই না? সন্দেহ হওয়া মাত্রই বিনা বিচারে গ্রেপ্তার, জেলের ভিতরে অত্যাচার - সবই চলতে থাকে নির্বিচারে। ব্রিটিশ সেনা আর এক অর্ধউন্মাদ ক্যাপ্টেন অর্ডে উইনগেটের নেতৃত্বে ব্রিটিশ এবং ইহুদী প্যারামিলিটারি "স্পেশ্যাল নাইট স্কোয়াড"-এর রাতবিরেতের আচমকা হামলায় চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়ে গ্রামবাসীরা।

ওই বছরের অক্টোবর মাসে, ক্লান্ত আরব হায়ার কমিটি এবং অত্যাচারে জর্জরিত প্যালেস্টাইনের অধিবাসীরা অন্যান্য আরব দেশের রাজাদের কয়েকজনের অনুরোধে (যেমন, ইরাকের রাজা গাজি, সৌদির রাজা আবদুলআজিজ - এইটা নিয়ে পরে লেখা যাবে, কীভাবে বাকি আরব দেশগুলোর শাসকেরা প্যালেস্টাইনের স্বাধীনতার দাবীকে চিরকাল কুমীরছানা হিসেবে দেখিয়ে এসেছে নিজেদের স্বার্থে) হরতাল তুলে নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের তৈরী আরও একটা তদন্ত কমিশন - পিল কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতার আশ্বাস দেয়।


পিল কমিশন এবং পার্টিশন (জুলাই ১৯৩৭)

বিদ্রোহের কারণ খুঁজতে পিল কমিশন হাজির হয় প্যালেস্টাইনে। জুলাই মাসে তারা রিপোর্ট পেশ করে - সাড়াজাগানো সুপারিশ সহ - যেখানে বলা হয় প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, এবং এই অচলাবস্থা থেকে বেরোনোর একমাত্র উপায় প্যালেস্টাইন ভূখণ্ডের বিভাজন - একটা স্বতন্ত্র ইহুদী রাষ্ট্র, ট্রান্সজর্ডানের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মত একটা আরব রাষ্ট্র, এবং জেরুজালেম থেকে জাফা অবধি ব্রিটিশ অধীনস্থ করিডর। পিল কমিশনের প্ল্যানে প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর উপকুল অঞ্চলের জমি, জিজরিল উপত্যকা, আর গ্যালিলি - অর্থাৎ প্যালেস্টাইনের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ২০ শতাংশ দেওয়া হয় ইহুদী রাষ্ট্রকে, আর আরব রাষ্ট্রের ভাগে পড়ে মধ্য প্যালেস্টাইনের পাথুরে অনুর্বর উঁচু জমি আর নেগেভ মরুভূমি। এও বলা হয় যে ইহুদী রাষ্ট্রের ভাগে পড়া জমিতে বসবাস করা দুই লক্ষেরও বেশি আরবকে "স্থানান্তর" করা হবে, বেসিক্যালি "জবরদস্তি উচ্ছেদ"-এর ভদ্রভাষা (সুন্দর পরিকল্পনা - ব্রিটিশ নিরপেক্ষতার পরাকাষ্ঠা একেবারে)। 

অনেক তর্কাতর্কির শেষে, জায়নিস্ট কংগ্রেস ভবিষ্যতের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রের স্টেপিং স্টোন হিসেবে, এই পরিকল্পনা মেনে নেয়। আরব হায়ার কমিটি এবং বাকি সমস্ত আরব সরকার এক কথায় পিল কমিশনের রেকমেন্ডেশন প্রত্যাখ্যান করে। তাদের ভাষায় — অবিভেজ্য আরব ভূখণ্ডকে টুকরো করার অধিকার কোন বিদেশী শক্তির নেই।


দ্বিতীয় পর্যায়ঃ বিদ্রোহ, অত্যাচার এবং অন্তর্দ্বন্দ্ব

পিল কমিশনের রিপোর্টের পর বিদ্রোহের আগুন দ্বিগুণ জোরে জ্বলে ওঠে। ১৯৩৭ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর আরব বিদ্রোহীরা গ্যালিলির ব্রিটিশ ডিসট্রিক্ট কমিশনার লিউইস অ্যানড্রুজকে হত্যা করে। উত্তরে ব্রিটিশ সরকার আরব হায়ার কমিটি ভেঙে দেয়, আর আরব নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করে সেশেলসে নির্বাসন দেয়। হজ আমিন আল হুসেইনি দেশ ছেড়ে লেবাননে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকেই বিদ্রোহ পরিচালনা করতে থাকেন।

বাকি গেরিলা দলগুলো লড়াই চালিয়ে গেলেও ডিসিপ্লিনের অভাবে ক্রমশঃ ছড়িয়ে ছিটিয়ে যেতে থাকে। ব্রিটিশরা আরও শক্তি নিয়ে বিদ্রোহ দমনে ঝাঁপায়। ইহুদী বসতিগুলো থেকে লোকজন নিয়ে জিউয়িশ সেটলমেন্ট পুলিশ ফোর্স তৈরী করে ব্রিটিশরা। তারাই এদের ট্রেনিং, অস্ত্র, ইউনিফর্ম দিয়ে পুরোদস্তুর মিলিশিয়া বাহিনী গড়ে তোলে। ১৯৩৯ সাল নাগাদ, প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার ইহুদী এই অফিশিয়াল এবং লিগালাইজড হাগানাহ্‌-তে যুক্ত হয়ে যায়। আগে বলা সেই স্পেশ্যাল নাইট স্কোয়াডও আগের মতই তাদের নৃশংস দমননীতি চালিয়ে যেতে থাকে - গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করা, নির্বিচারে বিনা প্রমাণে সামান্যতম সন্দেহেই আরবদের খুন করা...

তবে, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আরব বিদ্রোহ ভিতর থেকেই ভাঙতে শুরু করে। ব্রিটিশরা তাদের চিরাচরিত ডিভাইড অ্যান্ড রুল ট্যাকটিক্স অনুযায়ী, হুসেইনি পরিবারের বিরোধী নাশাশিবী গোষ্ঠীর আরবদের মদত দিয়ে শান্তিবাহিনী তৈরী করে - এই শান্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ, বাস্তবে আরবদের মধ্যেকার গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, ভয়ঙ্কর চেহারা নেয়। দুর্নীতি, দস্যুতা ছড়িয়ে পড়ে। অন্তর্দ্বন্দ্বে মারা যায় প্রায় ১২০০ আরব, বিদ্রোহের শেষ পর্যায়ে ব্রিটিশদের হাতে নিহতের সংখ্যার চেয়ে বেশি। 


১৯৩৯ সালের হোয়াইট পেপার এবং বিদ্রোহের শেষ

এরই মধ্যে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বাজনা বেজে ওঠে। সেই অবস্থায় ব্রিটিশরা আরব দুনিয়াকে শান্ত করার চেষ্টায় ১৯৩৯ সালের মে মাসে একটা নতুন নীতি ঘোষণা করে - ইতিহাসে যেটা ম্যাকডোনাল্ড হোয়াইট পেপার নামে পরিচিত। এই হোয়াইট পেপারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে - (১) ব্রিটিশ সরকার দশ বছরের মধ্যে স্বাধীন প্যালেস্টাইন প্রতিষ্ঠা করবে, (২) পরবর্তী পাঁচ বছরে ইহুদী অভিবাসনের সংখ্যা ৭৫ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হবে, এবং তারপর অভিবাসন নির্ভর করবে আরব সম্মতির ওপরে, আর, (৩) ইহুদীদের কাছে জমি বিক্রির ওপর কঠোর বিধিনিষেধ চাপানো হবে।

ম্যাকডোনাল্ড হোয়াইট পেপার আর ব্যালফোর ডিক্লারেশনের মধ্যে প্রায় ১৮০ ডিগ্রীর তফাত - সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী যাকে বলা যায়। জায়নিস্টরা স্বাভাবিকভাবেই প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়, আর একে ব্রিটিশদের বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করে। উল্টোদিকে, আরবরা পুরোপুরি খুশী না হলেও (আরব দাবী ছিল অবিলম্বে স্বাধীনতা আর ইহুদী অভিবাসন সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা), মোটের ওপর এই প্ল্যান মেনে নেয়। ১৯৩৯ সালের মাঝামাঝি সময়ে শান্ত হয়ে আসে আরব বিদ্রোহ।


বিদ্রোহের জমাখরচের হিসেব

আরব বিদ্রোহে হিউম্যান ক্যাজুয়ালটির হিসেবটা চমকপ্রদ। আরবদের মধ্যে মারা যায় প্রায় হাজার পাঁচেক মানুষ (যার মধ্যে ব্রিটিশ এবং ইহুদী মিলিশিয়া বাহিনীর হাতে মারা গেছিল ৩৮৩২ জন, আর গোষ্ঠী সংঘর্ষে প্রায় ১২০০ জন), আহত অন্তত পনেরো হাজার, গ্রেপ্তার বারো হাজারের ওপর যার মধ্যে ১০৮ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। ইহুদীদের মধ্যে কয়েকশো লোক মারা যায়, মূলতঃ আরবদের সঙ্গে লড়াইয়ে। ব্রিটিশদের মধ্যে নিহদের সংখ্যা ২৬২।

সংখ্যাতত্ত্ব ছেড়ে দিলেও, আরব বিদ্রোহের ফলে আমূল বদলে গিয়েছিল প্যালেস্টাইনের সমাজ। আরবদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রায় সকলেই হয় নির্বাসিত হয়েছিলেন, নয়তো বন্দী হয়েছিলেন জেলে। অর্থনীতি ধ্বসে গিয়েছিল। গ্রামীণ জনগোষ্ঠী প্রচণ্ড অত্যাচারে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে, প্যালেস্টাইনের আরবরা জায়নিস্ট কলোনাইজেশনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ তৈরী করার মত অবস্থায় ছিল না। 

বরং, জায়নিস্টদের কাছে, এই আরব বিদ্রোহের সময়টা ট্রেনিং এর সময় হয়ে দাঁড়ায়। হাগানাহ্‌ এই সময়েই পোক্ত হয়ে উঠেছিল - ব্রিটিশদের কাছ থেকে ট্রেনিং আর অস্ত্রশস্ত্রের সরবরাহ পেয়ে। প্যালেস্টাইনে বসবাস করা ইহুদীরা - যাদের বলা হয় য়িশুভ – তাদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়েছিল যে শক্তির মাধ্যমেই প্যালেস্টাইনের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে। ১৯৪৫ সালে যখন বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়, তখন চূড়ান্ত সংঘাতের স্টেজ তৈরী কার্যত শেষ।

ব্রিটিশরা এই বিদ্রোহের সময় বুঝে যায় যে প্যালেস্টাইন শাসন করা তাদের পক্ষে অসম্ভব। বিশের দশকের প্যালেস্টিনীয় ম্যান্ডেট তাদের কাছে একটা ফাঁদ হয়ে উঠেছিল। এই বিদ্রোহের কয়েক বছরের মধ্যেই ব্রিটিশরা এই দায় ঝেড়ে ফেলবে। যে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার দায়িত্ব তারা নিয়েছিল, সেই দুই পক্ষই যুদ্ধে পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়াবে - ম্যান্ডেটের অনিবার্য পরিণতি - “After 'the war to end war' they seem to have been pretty much successful in Paris at making a 'Peace to end Peace'” - আর্চিবল্ড ওয়াভেল যে কথাটা বলেছিলেন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর।


No comments: