শুভেন্দু অধিকারী বলেছেন হিন্দুত্বের জয়। আপনারাও সোল্লাসে চিৎকার করেছেন। বেশ ভালো কথা। একটা ছোট্ট প্রশ্ন। হিন্দুত্ব ব্যাপারটা বুঝে করেছেন তো? সেটা করে থাকলে একদিক থেকে ভালো, আমার কাজ কমে গেল। আর যদি হিন্দুত্বকে হিন্দুধর্মের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে থাকেন, তবে এই লেখাটা আপনার জন্যে। আগেও বলেছি আমরা বহুবার। মিটিঙে, সোশ্যাল মিডিয়ায়। আপনি এড়িয়ে গেছেন। আর এড়ানোর স্কোপ নেই। আপনি চান বা না চান, এই হিন্দুত্ব আপনার ঘাড়ে চেপেই গেছে।
একটা জিনিস সবার আগে মাথায় বসিয়ে নিন। দরকার হলে হাতুড়ি পিটিয়ে।
হিন্দুত্ব আর হিন্দুধর্ম এক নয়।
এই কথাটা সবার প্রথমেই আসে। হিন্দুধর্ম একটা প্রাচীন এবং বহুত্ত্ববাদী বিশ্বাস, একটা বড় নদীর মত যেখানে বহু ধারা এসে মিশে যায়। নিরাকার ঈশ্বরে বিশ্বাসী থেকে নীল চামড়ার রাখালকে পুজো করা লোক; শাক্ত, বৈষ্ণব, শৈব, অদ্বৈতবাদী, নিরীশ্বরবাদী, ভক্তিবাদী, মিস্টিক সাধক। আবার, এই একই ধর্মে অসংখ্য মানুষকে অচ্ছুৎ করে রাখা হয় জাতপাতের নামে। আক্ষরিকার্থেই একটা কমপ্লেক্স স্ট্রাকচার।
উল্টোদিকে, হিন্দুত্ব তৈরী হয়েছে আধুনিক যুগে, ১৯২৩ সালে, সাভারকরের হাতে। সাভারকরের নিজের লেখাতেই রয়েছে — "Hindutva is different from Hinduism" — প্রার্থনা বা দর্শন নয়, হিন্দুত্বের জন্ম ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে। কল্পিত, এক ছাঁচে তৈরী, মনোলিথিক, উচ্চবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্য সকলকে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। বিশ্বাসের মন্দির নয়, ঘৃণার সুতো দিয়ে সেলাই করা গেরুয়া পতাকা।
ফারাকটা স্পষ্ট দেখতে চাইলে ফিরে তাকান কাদের বাদ রাখা হল সেইদিকে। হিন্দুধর্ম কখনো বলেনি যে আপনার জন্মভূমিকে "পুণ্যভূমি" বা দেবতা হিসেবে পুজো করতে হবে। সাভারকরের হিন্দুত্ব, শুভেন্দুর বলা হিন্দুত্বের ডেফিনেশন কিন্তু সেটাই — ভারত যাদের জন্মভূমি, কর্মভূমি এবং পুণ্যভূমি, তারাই একমাত্র হিন্দু। এবং তারাই এই দেশের আসল নাগরিক, বাকি সবাইকে তাদের প্রভূত্ব মেনেই, তাদের আজ্ঞাবহ দাসানুদাস হয়ে থাকতে হবে। মুসলমান, ক্রিশ্চান — যাদের ভগবান এ দেশীয় নয়, তারা এ দেশে বাস করলেও হিন্দুদের সমান অধিকারের দাবী করতে পারে না, কারণ তারা আসল নাগরিক নয়।
প্রসঙ্গত:, ভারতের সংবিধান রচনার সময়ে যে জাস সোলি-র কথা বলা হয়েছিল — বর্ণ, ধর্ম, বাপমায়ের জন্মভূমি নির্বিশেষে ভারতীয় ভূখন্ডে যারা জন্মেছে, সকলেই ভারতীয় নাগরিক, সিটিজেন বাই বার্থ — সেই জাস সোলির সবচেয়ে বড় সমর্থক ছিলেন সর্দার প্যাটেল। হ্যাঁ, সেই বল্লভভাই প্যাটেল, যাঁকে লৌহমানব বলে বিজেপি পুজো করে, তিন হাজার কোটি টাকা দিয়ে মূর্তি তৈরী করে পুজো করে, তিনিই।
সাভারকরের হিন্দুত্ব এই জাস সোলি-কে মানেনি কোনওদিনও। এই হিন্দুত্ব বলেছে অহিন্দুদের নাগরিকত্ব কন্ডিশনাল। সঙ্ঘের দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকরের নিজের ভাষায়, এই অহিন্দুরা "may stay in the country wholly subordinated to the Hindu nation, claiming nothing, deserving no privileges, not even citizen's rights", অর্থাৎ, এদের সকলকে হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে থাকতে হবে, কোনো দাবি করতে পারবে না, কোনো সুযোগ‑সুবিধা নয়, নাগরিক অধিকার তো দূরের ব্যপার।"
আরএসএস আজ অবধি এই তত্ত্বকে অস্বীকার করেনি। তাদের জাতিবিদ্বেষের ব্লুপ্রিন্ট এটাই।
আজ কয়েক দশক ধরে প্রমাণিত — আরএসএস আর তার শাখা সংগঠন — বিজেপি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল, দুর্গা বাহিনী — এদের হিন্দুত্বের বিপদটা জাস্ট থিওরি নয়। আমরা নিরন্তর দেখে আসছি; গরু পাচার, লাভ জিহাদ, বাড়িতে মাংস রাখার অভিযোগে মুসলমানদের পিটিয়ে মারার ঘটনা; মসজিদ ভাঙা; ঐতিহাসিক শহরের নাম বদলানো; স্কুলছাত্রদের শেখানো যে মধ্যযুগের ইতিহাসে মুসলমান শাসক মানেই দানব, আর নায়করা সকলেই হিন্দু; মেয়েদের শারীরিক শিক্ষা দেওয়ার নামে শেখানো যে তার আসল শত্রু বিধর্মী মুসলমান, গার্হস্থ্য হিংসা তো নর্মাল ঘটনা।
এসব আপনার মাথায় ঢুকে গেছে কিনা বুঝবেন কী করে? খুব সহজ। যেদিন দেখবেন আপনার নাদুসনুদুস গণেশ বা আলাভোলা শিবঠাকুরের বদলে মাস্কেলওয়ালা সিক্সপ্যাক ঠাকুর এসে গেছে, বা "ভূত আমার পুত, পেত্নী আমার ঝি, রামলক্ষ্মণ বুকে আছে ভয়টা আমার কী" বলার বদলে আপনি "অ্যাংরি রাম" আর "অ্যাংরি হনুমান"-দের পছন্দ করছেন, কপালে হাত ঠেকিয়ে রামরাম বাবুজীর উত্তরে জয় সিয়ারাম আর জয় রামজীকি-এর বদলে গলার শিরা ফুলিয়ে চিৎকার করে জয় শ্রীরাম বলছেন, দুর্গাপুজোর সময় নিরামিষ খাচ্ছেন নিয়ম করে, সকাল সন্ধ্যে ভাবছেন কী করে ওই মোল্লা আর নীচু জাতের ছোটলোকগুলোকে টাইট দেওয়া যায়, সেদিন বুঝবেন আপনি হিন্দু থেকে হিন্দুত্ববাদীতে উন্নীত হয়েছেন।
একে নিজের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতিকে ভালোবাসা বলে কিনা সেটা আপনিই ঠিক করবেন। আপনার সহনাগরিককে বাবর কি আওলাদ বলে শয়তান হিসেবে দাগিয়ে দেবেন কিনা; রোহিত ভেমুলার মত দলিতদের প্রতিদিন সমাজে তাদের আসল জায়গা দেখিয়ে দেবেন কিনা; মেয়েদের কোন চোখে দেখবেন; আর গণতন্ত্রকে পাশ্চাত্য বিষ বলবেন কিনা।
হ্যাঁ, আপনি ভাবতেই পারেন যে এই সব তত্ত্বকথা মাথায় থাকুক, বিজেপি সব চোরদের জেলে ভরবে। এখানে একটাই ছোট পয়েন্ট — শুভেন্দুকে কে জেলে ভরবে সেটাও ভেবে দেখবেন।
আর হ্যাঁ, বাংলাদেশ আর পাকিস্তানে কী হয় তাই নিয়ে আমাকে বলতে আসার আগে নীচের কথাগুলো পড়ে বোঝার চেষ্টা করবেন।
"If a larger country oppresses a smaller country, I’ll stand with the smaller country. If the smaller country has majoritarian religion that oppresses minority religions, I’ll stand with minority religions. If the minority religion has caste and one caste oppresses another caste, I’ll stand with the caste being oppressed. In the oppressed caste, if an employer oppresses his employee, I’ll stand with the employee. If the employee goes home and oppresses his wife, I’ll stand with that woman. Overall, oppression is my enemy."


No comments:
Post a Comment