Thursday, March 15, 2007

নন্দীগ্রাম


The news of deaths by police firing in Nandigram has filled me with a sense of cold horror. .... the point uppermost in my mind is not "who started it", "who provoked it" or whether there were agent-provocateurs behind it...The thought in my mind – and of all sensitive people now is – “Was this spilling of human blood not avoidable? What is the public purpose served by the use of force that we have witnessed today?” – Gopalkrishna Gandhi
___________________________________________________

কাল সারাটা দিন হাসপাতালে নানান ঝুট-ঝামেলায় কেটেছে৷ যেমন আর পাঁচটা কাজের দিন যায়, তার থেকে একটু বেশীই৷ সাঁঝের ঝোঁকে সোফাতে একটু গা এলালেই নয় যখন, ডক্টর'স রুমে ঢুকতেই কলকল করে বন্ধু ও সহকর্মীরা জানাল -আবার বাংলা বন্ধ৷ শুক্রবার৷
কে ডাকল?
কে আবার, দিদি ছাড়া?
কেন হে?
নাকি নন্দীগ্রামে কিসব ঝামেলা-ঝঞ্ঝাট হয়েছে৷
আ-ব্বার বন্ধ, শুক্কুরবারদিন যে আমার চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি! কিছু বাছা বাছা খিস্তি ঠোঁটে আসছে, এক-আধটা বলেওছি, সুরঞ্জনাদি বলল-নারে, অনেক লোক মারা গেছে৷
তখনো ভাবছি-নিশ্চয়ই কৃষিজমি বাঁচাও কমিটির সঙ্গে সিপিএম ক্যাডারদের খুচরো ক্যালাকেলি৷ তো, ধরো অনিকেশদাকে৷ অনিকেশদা (নাম পাল্টে দেওয়া হল) আমাদের কনসালট্যান্ট কার্ডিওলজিস্ট ও মেদিনীপুরের ভূমিপুত্র; মাই ডিয়ার লোক৷

অনিকেশদা জানাল, না, সিপিএম নয়, ক্যাডার নয়, বিশাল পুলিশবাহিনী ঠান্ডা মাথায় গুলি চালিয়ে মানুষ মেরেছে৷ মেয়েরাও মারা গেছে৷ বুদ্ধবাবু (উত্তেজিত গলায়) মেদিনীপুরকে শেষ না করে থামবে না৷ হতাশ ও ক্রুদ্ধ; অভিমানী৷ এই অনিকেশদাই নন্দীগ্রামের প্রথম ঘটনার পরে বলেছিল- এর নাম মেদনিপুর(না, মেদিনীপুর বলে নি, এবং গলায় ভূমিপুত্রসুলভ অ্যাক্সেন্ট ছিল), ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার আগে ওখানটা স্বাধীন হয়েছে৷

তারপর তো বেশীরাতে বাড়ি ফিরে এসে দেখলাম টিভিতে৷ বন্যার মত টেলিভিশন ফুটেজ আছড়ে পড়তে লাগল চোখে ও মাথায়৷ অপটিক নার্ভ, কায়াজমা, অপটিক ট্র্যাক্ট হয়ে মাথার পেছনদিককার অক্সিপিটাল কর্টেক্সে রক্ত এসে লাগতে থাকল, লিটার লিটার রক্ত, মানুষের রক্ত-মেয়েমানুষের রক্ত, পুরুষমানুষের রক্ত, বাচ্চা-বুড়ো-পাগল-মুনিষ-মাইন্দর-নকশাল-তৃনমূল-সিপিএম-পুলিশের রক্ত৷ যতটা রক্ত বেরোলে পরে মানুষ অনিবার্য হাইপোভোলেমিক শকে চলে যায়, ফেরে না আর কিছুতেই, হদৃযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায়, অবসন্ন৷
যতটা রক্ত বেরোলে পরে মাথার ভেতরে নিও-কর্টিক্যাল এরিয়াতে সিগন্যালেরা সব ঘুলিয়ে যায় পথহারা, বুদ্ধিশুদ্ধি ঠিক তেমনি হাড়গোড়ভাঙা দ হয়ে যায়, যেমন হয়ে রয়েছে পুলিশে খোবলানো নন্দীগ্রামের মানুষেরা, তাদের ভাঙা কলার বোন, হাত-পা ও পাঁজর নিয়ে৷

ভাঙা বুকের পাঁজর দিয়া নয়া বাংলা গড়বো? না:, বুদ্ধবাবু, এই গান আর উঠে আসেনা, এ গান একদা আপনিও গুণগুণিয়ে গাইতেন কিনা সে প্রশ্নও উঠে আসেনা আর ৷

শুধু ক্রোধ, পাশবিক; শুধু ঘৃণা, তাল তাল ও জমাট- বাঁধা- কালো, যতটা কালো হতে পারে জমাট বাঁধা রক্ত, মানুষের রক্ত৷ নকশালী রক্ত? তৃণমূলী রক্ত? আপনি ভাল জানবেন, হে সংস্কৃতিবান পুলিশমন্ত্রী; আরো ভাল জানবেন আপনার প্রিয় বয়স্য, সখা, কৃষকসভা নেতা বিনয় কোঙার, যিনি বলেছেন- পুলিশ কি ফুলের পাপড়ি ছুঁড়বে?

প্রমোদ দাশগুপ্ত একদা বলেছিলেন-পুলিশের বুলেটে কি নিরোধ লাগানো আছে, নকশালরা মরে না কেন? হরেকৃষ্ঞ কোঙার নির্দোষ প্রশ্ন করেছিলেন-পুলিশ কি তবে রসগোল্লা ছুঁড়বে? আর কারা যেন একদা কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় শ্লোগানে শ্লোগানে ভরিয়ে দিয়েছিল-পুলিশ, তুমি যতই মারো/মাইনে তোমার একশ' বারো৷

হা:, রঙ্গপ্রিয় ইতিহাস!

খবরে প্রকাশ , মৃত অন্তত: চোদ্দ, আহতের সংখ্যা পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই৷ হতাহতদের প্রাথমিকভাবে নন্দীগ্রাম প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়েছে৷ আমি নিশ্চিত্ জানি, যাঁরা বেঁচে ছিলেন, তাঁদের যথাযোগ্য চিকিত্সা ঐ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অবশ্যই হয়েছিল, কেননা পশ্চিমবঙ্গের যে কোনো স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মতই নন্দীগ্রামেও কি আর যথেষ্ট পরিমাণ হজমের ওষুধ, কৃমি ও আমাশার বড়ি এবং গর্ভনিরোধক পিল (তেমন তেমন হলে চাই কি এক-আধখানা স্টেথোস্কোপ-ও !) ছিল না !

বিভাস চক্রবর্তী বললেন- বুদ্ধবাবুর সাদা পাঞ্জাবীতে কিন্তু রক্তের ছিটে লেগেছে, এবং লেডী ম্যাকবেথের মত ("আমি নাটকের ভাষাই ব্যবহার করছি'-উনি বললেন) উনিও ওঁর হাতে লেগে থাকা রক্তের দাগ তুলবার চেষ্টায় প্রাণান্ত হয়ে যাবেন, কিন্তু পারবেন না৷

লেডী ম্যাকবেথ? বুদ্ধবাবু? কল্পনা করবার চেষ্টা করলাম বুদ্ধবাবুর রংও রুজ মাখানো গাল , স্বর্ণাভ উইগ ও মানানসই অ্যাটায়ার-রক্তাক্ত হাত নিয়ে তীব্র বেগুনী আঁধারে তীক্ষ্ণ চীত্কার করে প্রাসাদ অলিন্দ দিয়ে ছুটে যাচ্ছেন৷ হাসি পেয়ে গেল৷ কেননা আমরা তো নাটক দেখিনা সে আজ বহুকাল৷ বাচ্চাটা হওয়ার পর ওকে নিয়ে নাটক দেখতে যাওয়া যায় না, তাছাড়াও ওর পেছনে সময় দেওয়া, আমার হাসপাতাল, আরো পড়াশুনো, সঙ্গীতার অফিস৷ কফি উইদ অর উইদাউট করণ৷ সিটি সেন্টার, কাফিলা;তার ডেকর পেশওয়ারী, তার দেয়ালে ঝোলানো সাজানো বন্দুক, হায় কি অসহায় নির্বিষ !

হাসি ছাড়া তাই কিছু আর নেই আমাদের৷ চিনিহীন কালো কফির মত তেতো হাসি, ঈষত্ বাঁকা, মুখটেপা ও কাষ্ঠ-কিন্তু কোনমতেই হা হা নয়-এমন হাসি৷ এই হাসি মেখে আমরা ট্রামে-বাসে চড়ি , সিট নিয়ে মানুষের সঙ্গে ঝগড়া করি, বিকেলে বিষণ্ন হই,সকালে কোষ্ঠসাফ ও রাতে সঙ্গম করি, শিশুকে আদর করি, বসকে হ্যা-হ্যা বলি ৷ আর গর্তে ঢুকি৷ মেট্রোরেলের, রাজারহাটের,ওপেল অ্যাস্ট্রার .....

প্রসঙ্গত:, বিভাসবাবু সহ আরো বেশ কয়েকজন নাট্যব্যক্তিত্ব-কৌশিক সেন, সুমন মুখোপাধ্যায়, ব্রাত্য বসু এবং সম্ভবত: মনোজ মিত্র ও অশোক মুখোপাধ্যায়ও -নাট্য একাডেমির পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন৷ বিভাসবাবু আরো বললেন- শঙ্খদার(কবি শঙ্খ ঘোষ) সঙ্গে একদিন দেখা হল, উনি বললেন- বুদ্ধবাবু যে বলেছিলেন, এইসব নিয়ে একদিন কথা বলবেন, কই , বললেন না তো !

বুদ্ধবাবু হাজারো কাজের মানুষ, সবার সঙ্গে কথা বলার সময় না-ও থাকতে পারে৷ ভুলে যেতেই পারেন নন্দীগ্রামের মানুষজনের সঙ্গে কথা বলার কথা, SEZ -এর আওতায় তাঁদের গ্রামটিকেও ঢোকানো নিয়ে নোটিশ পড়বার আগে৷ ভুলে যেতে পারেন নন্দীগ্রামে পুলিশ ঢোকানোর আগে এলাকার সিপিআই বিধায়ককে অবহিত করবার কথা৷ আর, এমনই বা কে মাথার দিব্যি দিয়েছে যে ভুলে যাওয়া যাবেনা- বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নামের একজন মানুষ একদা একটি দল করতেন , যার নাম মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টি , ট্রামভাড়া ন্যূনতম বাড়লে যারা কলকাতা অচল করে দিয়েছিল, খাদ্য আন্দোলন আর শিক্ষক আন্দোলনের সামনে তারাই ছিল, হ্যা হ্যা, সেইসব মানুষেরা যারা পুলিশকে ইঁট-পাটকেল ছুঁড়তে পিছপা হয় নি, দরকারে বোমা ও পাইপগান৷ এবং আমি বিশ্বাস করি, তারা ভুল কিছু করেনি৷ বুদ্ধবাবু, আপনি?

তবে , ভুলে যাওয়া কিছু বুদ্ধদেবের একচেটিয়া নয়৷ পৃথিবী জুড়ে অ্যামনেশিয়া-ডিমেনশিয়ার বাড়বাড়ন্ত, মানুষ-সব মানুষ সব কিছুই ভুলে যায়, সালভাদর আলেন্দে ও পিনোশে, গুলাগ ও হিরোশিমা, লুমুম্বা ও গেভারা, তেভাগা-তেলেঙ্গানা ও মরিচঝাঁপি৷ করন্দার কথা তো লোকে কব্বে ভুলে বসে আছে৷ নন্দীগ্রাম? মাসখানেক সময় দেবেন তো মশায়! তাছাড়া সামনে যখন ইলেকশন নেই ও ব্রান্ড বুদ্ধ যখন সেলিং লাইক হট কচুরিজ, হ্যা, এখনো, এই আতান্তরেও,জাতীয় নিউজ চ্যানেলের sms পোলে৷

তাছাড়া , আমরা ই কি চাইনি, গোপনে ও প্রকাশ্যে কত মজলিশে-এদেশের বুকে আর্মি আসুক নেমে !

আজ সকালটাও শুরু হয়েছিল বড় অদ্ভুতভাবে৷ বিধাননগর স্টেশনে নেমে দেখি ভিড় ঠেলে ওভারব্রীজে ওঠা যাচ্ছে না, এত লোক ! সার বেঁধে দাঁড়িয়ে কি যেন দেখছে৷ নিশ্চয়ই কোনো অ্যাক্সিডেন্ট ৷ আমি তো ওসব দেখব না, ও বড় অশ্লীল, ভয়ুরিস্টিক, তাই মানুষ ঠেলে সটান এগিয়ে যাই৷ কিন্তু কোন বিড়ালই বা কবে বেঁচেছে কৌতুহলের কাছে ! তাই একটিবার তাকাই এবং দেখতে পাই একটি মুন্ডহীন ধড়, আদ্যন্ত পরিষ্কার , তাতে রক্তের ছিটেফোঁটা লেগে নেই, শুধু হাত-পা- ক"টি শরীরের সঙ্গে অদ্ভুত কোণ রচনা করে মুচড়ে রয়েছে, যেন পিকাসোর বাউন্ডুলে কোনো ছবি৷ হনহনিয়ে এগিয়ে যাই,একেই যথেষ্ট দেরী হয়ে গেছে ... তাছাড়া ও তো মরেই গেছে, আমার মাঝখান থেকে গন্তব্যে পৌঁছতে দেরী হয়ে যাবে৷
রাতে টিভি দেখে মনে হল, নন্দীগ্রামের প্রতিবাদও ঐভাবেই মুখ মুচড়ে পড়ে রয়েছে, একদা সোনালী ডানার চিল ছিল হয়তো বা, যখন আমরা, আমাদের বাপ-দাদারা স্বপ্নে দেখত যৌথ খামার৷ অবিকল পিকাসোর বাউন্ডুলে কোনো ছবি৷ লেননের ফার-ফেচেড ইমাজিনেশন৷

কিন্তু সে আজিকে হল কত কাল৷ ওসব এক্কেবারে মরে গেছে, অত্যাধুনিক ইনস্যাস রাইফেলের ঠেলায় কি আর কেউ টেকে ! এতেও না শানালে সেনা ছিল, এ কে ৪৭/৫৬ ছিল .. থাগগে৷ কেমিক্যাল হাবের সঙ্গে সঙ্গে হোটেলটোটেলও হলে পর, সালেম গ্রুপ যখন, একবার বরং ঘুরে আসা যাবে উইকএন্ডে,ছোট পরিবার, সুখী পরিবার৷

বারংবার হটে হটে হঠাৎ হটেনটট যোদ্ধা যেন ছুটে যায় সিংহের দিকে/ এরকমই স্বপ্নে ঘুমে বুকের ভেতরে যেন গুরগুর ... তুষার রায় একদা লিখেছিলেন৷ কিন্তু তুষার রায় তো এখন মৃত৷ আর মৃতেরা এ পৃথিবীতে ফেরে না কখনো৷ তাদের কবরের ওপর আর কেউ নয়, কিছু নয় শুধুই তুষার, শুধু ধূ ধূ প্রান্তরে বনে কেবলই তুষার ঝরে, শুধুই তুষার৷

আর, যারা ফেরে, তারা তো প্রেত৷ তুষার ঠেলে ঠেলে ছাই রং মুন্ডহীন কবন্ধ, শুকনো মামড়ি-ওঠা ঠোঁট, কাটা হাত তুষারযোনি অশরীরী৷
দেশ যাদের কোনো মাতৃভাষা দেয় নি কখনো৷৷

- ইন্দ্রনীল ঘোষদস্তিদার

3 comments:

ভন্ড said...

অভিনন্দন, এমন একটা লেখার জন্য, ইন্দ্রনীল।

INDRANI said...

মনে পড়ছে বেশ ছোটোবেলায় আর্কাদি গাইদারের লেখা একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। বাংলা অনুবাদটির নাম ছিল “ইশকুল”। সেখানে পড়া একটি কথা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। লেখক যা বলেছিলেন তার মূল বক্তব্য ছিল যে -- সেই মানুষগুলো ছিলেন সাধারণ, আমার আপনার মতোই| কিন্তু সেই সময়টাই ছিল অ-সাধারণ| তাই সাধারণ মানুষগুলো আর সাধারণ থাকেননি|
বহু বছরের প্রতিবাদহীনতা, অন্যায়কে মেনে নেওয়ার নিদারুন মূর্খতাকে আমরা শান্তি বলে ভুর করেছি| আজ দরিদ্র, অসহায়, তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষকে দেখলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে রুখে দাঁড়াতে -- নিজের প্রতি লজ্জা হল| আমার চোখের সামনে পাড়ার পুকুরগুলো একটা একটা করে পার্টি আশ্রিত প্রোমোটারদের হাতে চলে যায়নি? পাড়ায় নতুন থাকতে আসা দম্পতির কাছ থেকে পার্টি আশ্রিত দাদাদের প্রণামি নিতে দেখে কিছু বলেছি? এলাকার অত্যাচারিত মেয়েদের পাশে না দাঁড়িয়ে পরের বাড়ির কেচ্ছা নিয়ে মুখরোচক আলোচনাচক্র মহিলা সমিতির নামে চলতে দেখিনি? মুখ খুলতে পেরেছি কোনোদিন? অন্যান্য দক্ষিণপন্হী দলগুলি আজ যে কুমিরের কান্না কাঁদছে, তারা বরানগর-বেলঘড়িয়া-কাশীপুর-গুজরাটে যা করেছে সেটাও কিন্তু এই মনে দগদগে হয়ে বসে আছে। আজ মানুষ স্তম্ভিত হচ্ছে কারণ মিডিয়ার ভূমিকা এক্ষেত্রে মহাভারতের সঞ্জয়ের মতো ছিল, আমরা সব জানতে পেরেছি, এর আগে বানতলা-ধানতলা-কেশপুর-ছোটো আঙারিয়ার সময় আমরা প্রতিবাদ করিনি, যা বোঝানো হয়েছে তাই বুঝেছি। কিন্তু চোখ খুলছে| অনেকের কষ্ট হচ্ছে মানুষ হিসাবে, একজন মার্কসবাদী হিসাবে আমার কষ্টের সাথে মিশেছে ঘেন্না| তারপরও অবাক হয়ে দেখি কী নির্দ্বিধায় নির্লজ্জতায় বিমান-বুদ্ধ-বিনয় নিজেদের কম্যুনিস্ট বলে দাবি করেন ও ঔদ্ধত্বের প্রাসাদের চূড়ায় বসে থাকেন|

Indrani said...

মনে পড়ছে বেশ ছোটোবেলায় আর্কাদি গাইদারের লেখা একটা উপন্যাস পড়েছিলাম। বাংলা অনুবাদটির নাম ছিল “ইশকুল”। সেখানে পড়া একটি কথা আমার সারা জীবন মনে থাকবে। লেখক যা বলেছিলেন তার মূল বক্তব্য ছিল যে -- সেই মানুষগুলো ছিলেন সাধারণ, আমার আপনার মতোই| কিন্তু সেই সময়টাই ছিল অ-সাধারণ| তাই সাধারণ মানুষগুলো আর সাধারণ থাকেননি|
বহু বছরের প্রতিবাদহীনতা, অন্যায়কে মেনে নেওয়ার নিদারুন মূর্খতাকে আমরা শান্তি বলে ভুর করেছি| আজ দরিদ্র, অসহায়, তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষকে দেখলাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে রুখে দাঁড়াতে -- নিজের প্রতি লজ্জা হল| আমার চোখের সামনে পাড়ার পুকুরগুলো একটা একটা করে পার্টি আশ্রিত প্রোমোটারদের হাতে চলে যায়নি? পাড়ায় নতুন থাকতে আসা দম্পতির কাছ থেকে পার্টি আশ্রিত দাদাদের প্রণামি নিতে দেখে কিছু বলেছি? এলাকার অত্যাচারিত মেয়েদের পাশে না দাঁড়িয়ে পরের বাড়ির কেচ্ছা নিয়ে মুখরোচক আলোচনাচক্র মহিলা সমিতির নামে চলতে দেখিনি? মুখ খুলতে পেরেছি কোনোদিন? অন্যান্য দক্ষিণপন্হী দলগুলি আজ যে কুমিরের কান্না কাঁদছে, তারা বরানগর-বেলঘড়িয়া-কাশীপুর-গুজরাটে যা করেছে সেটাও কিন্তু এই মনে দগদগে হয়ে বসে আছে। আজ মানুষ স্তম্ভিত হচ্ছে কারণ মিডিয়ার ভূমিকা এক্ষেত্রে মহাভারতের সঞ্জয়ের মতো ছিল, আমরা সব জানতে পেরেছি, এর আগে বানতলা-ধানতলা-কেশপুর-ছোটো আঙারিয়ার সময় আমরা প্রতিবাদ করিনি, যা বোঝানো হয়েছে তাই বুঝেছি। কিন্তু চোখ খুলছে| অনেকের কষ্ট হচ্ছে মানুষ হিসাবে, একজন মার্কসবাদী হিসাবে আমার কষ্টের সাথে মিশেছে ঘেন্না| তারপরও অবাক হয়ে দেখি কী নির্দ্বিধায় নির্লজ্জতায় বিমান-বুদ্ধ-বিনয় নিজেদের কম্যুনিস্ট বলে দাবি করেন ও ঔদ্ধত্বের প্রাসাদের চূড়ায় বসে থাকেন|