সঙ্ঘ পরিবারের স্ট্র্যাটেজির কথা লিখেছিলাম — কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কীভাবে হয়, ন্যারেটিভ কীভাবে তৈরী হয় — যেখান থেকে আজকের মত সাংস্কৃতিক আধিপত্য আসে। কিন্তু এই আধিপত্য তো এন্ড প্রোডাক্ট। আর, সঙ্ঘ পরিবারের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এই এন্ড প্রোডাক্টে পৌঁছবার পদ্ধতি। রান্নার রেসিপির মত করে যদি ভাবেন, তাহলে উপাদানের কথাও বলতে হয় — যেগুলোকে ব্যবহার করে এই এন্ড প্রোডাক্ট তৈরী হয়েছে। কথাটা মাথায় এল কারণ আগের পোস্টে (আধিপত্যবাদ নিয়ে) কিছু কমেন্ট এসেছিল সিমিলার প্রশ্নসহ। তাই মনে হল এটাও লিখে রাখি...
এখানেও একটা ডিসক্লেমার — এগুলো সবই এখানে ওখানে নানান বই আর আর্টিকল পড়ার পর আমার নিজের সঙ্গে কথা বলার ফসল। ফাঁকফোকর থাকাটাই স্বাভাবিক। চাইলে ভরাট করতে সাহায্য করতে পারেন।
শুরুটা এইভাবেই করি — আজকের অল-পার্ভেসিভ হিন্দুত্ব আইডিওলজি আচমকা ঘটনা নয়। সাধারণ মানুষের ডিএনএ তো দুম করে পালটে গিয়ে তার মধ্যে জম্বি জিন ঢুকে যায়নি। এই ঘটনাটা প্রায় একশো বছর ধরে চলা পরিকল্পিত প্রোজেক্টের প্ল্যানড আউটকাম — যে প্রোজেক্টের অঙ্গ হিসেবে খুব দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন ন্যাশনাল ক্রাইসিসের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ কিছু মুহূর্তকে কাজে লাগানো হয়েছে।
সেকুলার আদর্শ থেকে হিন্দু জাগরণ — এই নীতিগত পালাবদলটা হল কীভাবে?
স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের জাতীয় আইডেন্টিটি ছিল সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। এই আধুনিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের সেই রূপকল্পের অগ্রদূত ছিলেন নেহরুর মতো নেতারা।
ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটা আলাদা করে সংবিধানের প্রিঅ্যাম্বলে জোড়া হলেও সংবিধানে সেই এসেন্স সংবিধানপ্রণেতারা শুরু থেকেই রেখেছিলেন — এই কথাটা সুপ্রীম কোর্টও ঘোষণা করেছিল এই শব্দটা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা মামলা করার সময়ে। বিজেপি যে ভদ্রলোককে তাদের মহান নেতা বলে মানে, সেই অটল বিহারী বাজপায়ীও জোরের সঙ্গেই এই ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই ঘোষণা করেছিলেন। আজকে ময়ূরকুসুমের মত সাংবাদিকরা চ্যানেলে চিৎকার করে সেকুলারদের দেশছাড়া করতে চাইলেও এই ইতিহাসটা বদলানোর নয়।
হিন্দুত্ব আন্দোলন তার জন্মলগ্ন থেকেই এই ধারণাকে আমূল চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এসেছে। মূল বক্তব্য (আগে বহুবার লেখা) হল ভারত একটা হিন্দুরাষ্ট্র, এমন একটা সিভিলাইজেশনাল এন্টিটি যার আইডেন্টিটি আদিকাল থেকে একইরকমভাবে থেকে যাওয়া হিন্দু সংস্কৃতি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আইডিয়াটা এক বড় সংখ্যক মানুষের ওপরে প্রভাব ফেলেছিল — স্পেশ্যালি তাদের ওপর, যারা গণতন্ত্র, বহুত্ত্ববাদ ইত্যাদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বলে মনে করত, এবং নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও প্রান্তিক হিসেবে দেখত।
আশির দশকের একাধিক ঝড়ে মোড় ঘুরতে শুরু করে ভারতের এই সেকুলার আইডেন্টিটির। বিশেষ করে ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ — এই তিন বছরের মধ্যে। সঙ্ঘ পরিবার দুটো ইভেন্টকে সামনে রেখে মোবিলাইজ করতে শুরু করে৷ দেশ জুড়ে একটা অভাবনীয় সেন্টিমেন্টের ঢেউ তৈরী হয়।
(১) শাহ বানু মামলা (১৯৮৫): সুপ্রীম কোর্ট একজন মুসলমান মহিলার ভরণপোষণের রায় দেয়, বিরোধিতা করে মুসলমান ধর্মীয় নেতারা। রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস সরকার, ১৯৮৪ সালে নজিরবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসার পরেও, ধর্মীয় নেতাদের তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে সংসদে আইন পাশ করে সেই রায় বাতিল করে। রেট্রোসপেক্টে বলা যায় এটা একটা বড় ভুল ছিল। রাইটউইং হিন্দু রাজনৈতিক শক্তি এই ঘটনাকে লুফে নেয় "জাতীয়" (পড়ুন হিন্দু) স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সংখ্যালঘু তোষণের উদাহরণ হিসেবে।
(২) রামানন্দ সাগরের রামায়ণ (১৯৮৭-৮৮): দূরদর্শনে প্রচারিত এই সিরিয়াল মোটামুটি ন্যাশনাল ইভেন্টে পরিণত হয়েছিল; সাধারণ মানুষ স্নান করে, টিভিতে মালা পরিয়ে, আশেপাশের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে একসঙ্গে বসে দেখত এই মহাকাব্যের সিরিয়ালাইজেশন। মনোরঞ্জনের জগতে প্রথমবার কোনো হিন্দু মহাকাব্যের এরকম জাঁকজমকওয়ালা ভার্সন একই সঙ্গে কোটি কোটি ঘরে পৌঁছেছিল। তৈরী হয়েছিল এক শেয়ার্ড ইমোশন, আর একটা ধর্মীয় ন্যাশনাল আইডেন্টিটি। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সফট-পাওয়ার ক্যাম্পেন, যেখান থেকে সেই "কমন সেন্স" পিরিয়ডের শুরু।
এই আইডেন্টিটি যখন তৈরী হচ্ছে, তখন একের পর এক ক্রাইসিসের সময়ে সমাজের বিভিন্ন ফাটলের সুযোগ নিয়েছিল সঙ্ঘ পরিবার।
প্রথমেই আসবে কংগ্রেসের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কথা। স্বাধীনতার সময় থেকে এই জাতীয় কংগ্রেসকে সামনে রেখেই একটা ইনক্লুসিভ জাতীয়তাবাদী চেতনা তৈরী হয়েছিল। আশির দশকের শেষের দিকে সেই কংগ্রেস ডিসক্রেডিট হতে শুরু করে। লাগামছাড়া দুর্নীতি (বোফর্স উদাহরণ), গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, আরো নানান দুর্বলতার ফলে জাতীয় স্তরে কংগ্রেস বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় অর্জিত ভারতীয়ত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণের মরাল অথরিটি বেরিয়ে যায় কংগ্রেসের হাত থেকে। এই সময়ে পরপর কিছু ঘটনা ঘটে সঙ্ঘ পরিবারের সক্রিয়তায়। রামমন্দির আন্দোলন জোর কদমে শুরু হয়, রাজীব গান্ধী সরকার শাহ বানু মামলার পরে সংখ্যাগুরু হিন্দুকে তুষ্ট করতে বাবরি মসজিদের তালা খুলে দেয়। নব্বইয়ের শুরুতেই হয় আদবাণীর রথযাত্রা, এবং সঙ্গে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা। রামমন্দির আন্দোলনের ভায়োলেন্ট ক্লাইম্যাক্স ঘটে যায় ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে। হিন্দু জনগোষ্ঠীর জমে থাকা রাগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে ক্ষমতায় আসতে শুরু করে।
এর পাশাপাশি ১৯৯১ সালে গ্যাটের হাত ধরে লিবারেলাইজেশনের সময় আসে অর্থনৈতিক ভূমিকম্প। স্বাধীনতার পরবর্তী খানিক সোভিয়েত ধাঁচে গড়া অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ভাঙা শুরু হয়। আমরা যতই দেশীয় অগ্রগতির কথা বলি না কেন, নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের দুর্দশার শেকড় লম্বা হতে শুরু করে এই সময়েই। আর এই ক্যাওসের মধ্যে সঙ্ঘ পরিবার দেশীয় আইডেন্টিটি রক্ষা করার কথা বলতে শুরু করে দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বদেশী ধাঁচের অর্থনীতির ছবি এঁকে। আজকের বিজেপি সরকার দেশীয় ক্রনি ক্যাপিটালিস্টদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত থাকলেও নব্বইয়ের দশকে সঙ্ঘের দাবী ছিল অন্যরকম।
এবং ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা। নরেন্দ্র মোদীর তত্ত্বাবধানে ঘটে যাওয়া গণহত্যা। বলা ভাল এথনিক ক্লেনসিং। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বাজপায়ী মোদীকে রাজধর্ম পালন করার কথা বললেও মোদীর গুজরাট বিজেপি এর পর প্রকাশ্যে ইসলাম বিরোধী রাজনীতিতে ভর করে ভোটে জিতে আসে। প্রমাণ হয়ে যায় যে বর্তমান ভারতে উগ্র সাম্প্রদায়িক স্ট্যান্ড রাজনৈতিকভাবে কোনো লায়াবিলিটি তো নয়ই, বরং নির্বাচনী অ্যাসেট, এবং হিন্দুত্বের নরমন্থী মুখও (বাজপায়ী) সাম্প্রদায়িক হিংসার সামনে অচল। ২০১৪ সালে জাতীয় মঞ্চে মোদীর আবির্ভাব বুঝিয়ে দিয়েছিল যে মোদীর হিন্দুত্ব যে কোনো মূল্যে জয়ী হতে চায়।
আজকের অস্থিরতার অনেক কিছুরই শেকড় রয়েছে সেই আশির দশক থেকে নতুন শতাব্দীর শুরু অবধি। নেলি গণহত্যা; কাশ্মীর; খলিস্তান; ১৯৮৪ সালের শিখ দাঙ্গা; আসাম এনআরসি; ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব আইন বদলে জাস সোলি থেকে জাস স্যাঙ্গুইনির পথে হাঁটতে শুরু করা; লিবারেলাইজেশনের পথে একের পর এক পদক্ষেপ; জাতিগত আইডেন্টিটি পলিটিক্সের উত্থান, এবং দলিত রাজনীতির এজেন্সি কিছু বিশেষ পরিবারের কুক্ষিগত হয়ে যাওয়া...এরকম বেশ কিছু ঘটনা যার মধ্যে দিয়ে হিন্দুত্বের কমন সেন্স পাকাপোক্ত হতে শুরু করে।
২০১০ সালের আশেপাশে, ফিজিক্সের ভাষায় যাকে বলে ক্রিটিকাল মাস — সেইখানে পৌঁছে যাই আমরা। দুর্নীতি, আরো নানাবিধ অসন্তোষকে হাতিয়ার করে ইন্ডিয়া আগেইন্সট করাপশন মুভমেন্ট রাজনৈতিক ফোকাস টেনে নেয়। আবারও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ওই সময়ের দিকে ফিরে তাকিয়ে আমরা বলতে পারি যে আইএসি সঙ্ঘ পরিবারেরই চাল ছিল, দুর্নীতির বেশ কিছু কাহিনীও সম্ভবত ছিল মনগড়া। কিন্তু সেই সময়ে মানুষ "আচ্ছে দিন"-এর স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিল, কারণ দেশজুড়ে সেই কনসেন্ট তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিল বিজেপি আর সঙ্ঘ পরিবার। ২০১৪ সালের ইলেকশন মোটামুটি ফোরগন কনক্লুজন ছিল বলা যায়। হিন্দুত্বও ততদিনে প্রান্তিক আইডিয়ার জায়গা পেরিয়ে জনসংখ্যার বড় অংশের "কমন সেন্স" হয়ে উঠেছিল। সঙ্ঘ পরিবারের সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি তৈরী ছিল এই কমন সেন্সকে ব্যবহার করে ভারতকে আজকের জায়গায় নিয়ে আসার।
এর পরের ঘটনা আমরা সবাই জানি।


No comments:
Post a Comment