Saturday, June 27, 2026

কাউন্টার হেজিমনির কথা

একটা অলেখা গল্পের একটুখানি দিয়ে শুরু করি।

"কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলতো সঙ্ঘের শাখা৷ দলিতদের এলাকার সামনে একটা একলা অশ্বত্থ গাছ। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় সেই গাছের নীচে একটা কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে একটা মাদুর বিছিয়ে বসতো বছর পঁচিশের সুনীতা। সুনীতা কুমারী। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু ওকালতি করে না। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের পার্টি অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে এই গ্রামটায়। সঙ্গে কোনো পোস্টার নেই, পতাকা নেই; সুনীতার সম্বল দুই চোখ ভরা স্বপ্ন, আর কাপড়ের পার্সের ভিতরে পার্টির একটা মেম্বারশিপ কার্ড। সে এসে বসতো একটা পুরনো টিনের ট্রাঙ্ক নিয়ে — তাতে থাকত কিছু বই: ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের বই, একটা আইনের বই, একটা সংবিধানের কপি, কিছু ফর্ম, একটা খাতা আর ডটপেন। সুনীতা গ্রামের প্রান্তিক মানুষজনের কথা শুনত, তাদের সাহায্য করত — কারো ফর্ম ভরে দিয়ে, কারো পেনশন আনার জন্য প্রতিদিন বিডিওর দপ্তরে গিয়ে; গল্প বলতো — জল-জমি-জঙ্গলের অধিকারের গল্প, রুজি-রুটির লড়াইয়ের গল্প। গান শোনাতো..."হাম ভুখসে মরনেওয়ালে"। দিন কাটতো। তারপর, পাঁচ বছর পর, একদিন, পঞ্চায়েত ভোটের পরে, সেই অশ্বত্থ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, সুনীতার হাত ধরে, শপথ নিল গ্রামের প্রথম দলিত মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান..."

আমাদের কাউন্টার-হেজিমনির ভিত্তি এই গল্পটাই। গল্পটা শেষ করব পরের পর্বে, শেষ পর্বে। আজ লিখব হেজিমনি কীভাবে ভাঙা যেতে পারে তাই নিয়ে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিংটুকু। গ্রামশি আছে, সঙ্গে চার্বাকও - বকলমে পার্থ চ্যাটার্জী।

আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…

আগের দুটো পর্বে লেখার চেষ্টা করেছিলাম কীভাবে হিন্দুত্ব তার ওয়ার্ল্ডভিউকে কমন সেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে প্রায় একশো বছরের অবস্থানের যুদ্ধের মাধ্যমে - স্কুল, মিডিয়া, মন্দির, দৈনন্দিন অভ্যাসের স্পেসকে দখল করে। গ্রামশির কথা মানলে আমরা এও বুঝি যে কোনো আধিপত্যই চিরকালীন নয়। বেকারত্ব, রোজকার রুজি-রুটির লড়াই, হিন্দুত্বের ভিতরের জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক প্রতিরোধ, নানান কারণে অস্থির যুবসমাজ - অনেক ফাটল রয়েছে এই হেজিমনির মধ্যেও। তবে ফাটল রয়েছে মানেই আপনাআপনি সেই ফাটলে বিপ্লবের গাছ গজাবে, এমনটাও নয়।

গ্রামশি বলেন পাল্টা অবস্থানের যুদ্ধের কথা। চটজলদি ভোটে জেতার স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। হঠাৎ কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা আকাশ থেকে নেমে এসে মুশকিল আসান করে দেবেন - এই খোয়াব দেখেও লাভ নেই। একটা দুটো বা দশটা বিশাল মিছিলেও বিশেষ কিছু হবার নয়। বরং, অনেক ধৈর্য্য ধরে, অনেক সময় নিয়ে কিছু কাজ করে যেতে হবে, আপাতদৃষ্টিতে যেগুলো বড়ই বোরিং কাজ - যেমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে থেকেই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল তুলে আনা, সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করা, আর একদম গ্রাউন্ড-আপ একটা পাল্টা ঐতিহাসিক জোট (historic bloc) তৈরী করা…

পার্থ চ্যাটার্জীর হাত ধরে চার্বাক ফিরে এসেছেন — সেই প্রাচীন সংশয়বাদী দার্শনিক চার্বাক — যিনি এই ধারণাগুলোর একান্ত ভারতীয় রূপ তুলে ধরেন আমাদের সামনে। চার্বাকের কথা অনুযায়ী ভারত কোনো "হিন্দু রাষ্ট্র" নয়, আবার এলিট থিওরেটিকাল "বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র" বলেও ভারতকে ডিফাইন করা যায় না। ভারতের ইতিহাস, ভারতের সমাজ, সেই সমাজের মানুষজনকে দেখলে ভারত, প্রকৃত অর্থে, একটা "ফেডারেশ অফ পিপলস" — পিপলস ইন প্লুরাল, কারণ এই ভূখন্ড সত্যিই বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতি, বহু ধরণের জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। বলতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে রঙিন আর কমপ্লেক্স মেলা। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব আইডেন্টিটি; সবচেয়ে বড় কথা, নানান তফাত থাকা সত্ত্বেও এরা সকলেই একটা অভিন্ন সংবিধানের ছাতার নীচে একসাথে বসবাস করতে রাজী হয়েছে; অন্তত হয়েছিল একটা সময়। সেই সম্মতি বা সমঝোতা বাইরে থেকে ভেসে আসেনি। বেশ জটিল, অগোছালো এবং খানিক অসম্পূর্ণ আলোচনার ফসল এই সমঝোতা, যাকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বাধীনতার পর থেকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আজ তারা অনেকাংশে সফল। ফেডারেশন অফ পিপলস-এর বদলে তারা আনতে চাইছে পুরোপুরি সেন্ট্রালাইজড, মেজরিটারিয়ান, এক দেশ এক ভাষা এক আইডেন্টিটি এক পোশাক এক খাদ্যাভ্যাসের তথাকথিত হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান।

শুরুতেই এই প্রচেষ্টাকে "নো থ্যাঙ্কিউ" জানিয়ে চলুন একবার চেষ্টা করি এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধ পথ খুঁজে বের করতে। এক্ষেত্রে কাউন্টার-হেজিমনির পথ, অর্থাৎ সেই ফেডারেশন অফ পিপলস-কে আবার বাঁচিয়ে তোলার রাস্তা। শুধু "বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য"-এর এলিট স্লোগান নয়, বরং বাস্তবিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঝাঁকুনি দেওয়া ফেডারেশন যেখানে সম্পদের পুনর্বন্টন হবে, যেখানে ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্য আর স্থানীয় অঞ্চলগুলোই নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে, দিল্লীবাসী কোনো সুপ্রীম লীডার নয়।

প্রশ্ন হল – কীভাবে?

প্রথমতঃ, অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল - গ্রামশির বক্তব্য ছিল এই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে সমস্ত সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে; এমন মানুষ যাঁরা তাঁদের নিজেদের ভাষায় নিজেদের কথা বলবেন; ওপর থেকে উপদেশ দেবেন না। আরএসএস এই তত্ত্বটা ভালো বুঝেছিল। ফলে, তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই নিজেদের কথা বলার লোক তৈরী করেছিল - প্রচারক, স্কুলশিক্ষক, মন্দিরের পূজারী, আখড়ার মহন্ত, আধুনিক কালে ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার - যারা সকলেই স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় সংস্কৃতি, স্থানীয় ইমেজারি ব্যবহার করে একটা প্যান-হিন্দু আইডিয়া বেচতে পেরেছে সফলভাবে। উল্টোদিকে, সেকুলার লেফটের মধ্যে এতদিন অবধি যারা এই জায়গায় ছিল, তারা প্রায় সকলেই ইংরিজীতে শিক্ষিত, ইংরিজীতে কথা বলাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ, ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান ফিলোজফারদের উক্তি তাদের মুখে মুখে ফেরে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সংস্কৃতি তাদের কাছে ব্যাকওয়ার্ড...এক কথায় একটা "এলিট" সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষের কাছে খানিক অন্য গ্রহের বাসিন্দা টাইপ। কাউন্টার হেজিমনি এই ছকে তৈরী হবে না। যেমন ধরুন আমি, কলকাতায় জন্ম বড়-হওয়া একটা লোক যার সঙ্গে কোচবিহারের কোনো সম্পর্ক নেই, দুম করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মুখিয়া হতে গেলে কেউ মানবে না। অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে এই সমস্ত কমিউনিটি — দলিত, আদিবাসী, ওবিসি, মুসলমানদের মধ্যে থেকেই। তারা নিজেদের দাবীদাওয়া চাহিদার কথা বলবে। কথা হবে পেরিয়ারকে নিয়ে, আম্বেদকরকে নিয়ে, ভক্তি আন্দোলনের জাতপাতবিরোধী দিকগুলো নিয়ে, দ্রাবিড় মুভমেন্টের ফেডারেলিজম নিয়ে। আর এই মানুষগুলোকে উঠে দাঁড়ানোয় সাহায্য করতে থাকবে  স্কলারশিপ, নাইট স্কুল, কো-অপারেটিভ লাইব্রেরি, আইনি সহায়তা, ট্রেড ইউনিয়ন - কিছু দায়িত্ব তো আপনিও নেবেন, নাকি?

দুই নম্বরে আসে কালচার ওয়ার - সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। যেখানে সংস্কৃতি কোনো জগদ্দল পাথর বা মোনোলিথ নয়। হিন্দুত্ব এই সংস্কৃতিকে মোনোলিথ বানিয়ে ফেলতে চেয়েছে, এবং অনেকাংশে তারা সফলও। কারণ, তাদের গল্পটা সোজাসাপটা। তাদের ডেফিনেশনে ভারত আদিকাল থেকেই একটা হিন্দু রাষ্ট্র; মুসলমান আর ক্রিশ্চানরা এই দেশে বহিরাগত; দেশপ্রেমিক হওয়ার একমাত্র রাস্তা হল তাদের রাগী চেহারার সিক্স প্যাকওয়ালা রামকে কুর্ণিশ করা, আর হিন্দিতে কথা বলা। হিন্দি - হিন্দু - হিন্দুস্তান। পার্থ চ্যাটার্জীর চার্বাক এই মিথকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেন। চার্বাক আমাদের জানান যে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী প্রতীক ও আখ্যান রয়েছে – সঙ্ঘ পরিবার যাকে তাদের ইচ্ছেমতো মুছে দিতে চায়: দক্ষিণে তামিল তাই, তেলগু তাল্লি, কানাড়া তায়ি, কেরলম; ঝাড়খন্ডে সিধু কানু, বীরসা মুন্ডা; মহারাষ্ট্রে শিবাজী; মণিপুরে মেইতি ইমা; পঞ্জাবে ওয়ারিস শাহ। আলাদা আইকন হলেও কোনোটাই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনা নয়, বরং ফেডারেশন অফ পিপলস-এর মূল মন্ত্র এই আঞ্চলিক সংস্কৃতি। কাউন্টার হেজিমনির জন্যে পাল্টা-সংস্কৃতির লড়াই: ওয়েব সিরিজ, সেখানে মুসলমান নার্স ইউনিয়ন তৈরী করে সহকর্মীদের জন্য লড়াই করে; দলিত কমিউনিটির জাতপাতবিরোধী লড়াইয়ের গল্প নিয়ে গ্রাফিক নভেল; আম্বানি-আদানিদের মুনাফালুটকে ব্যঙ্গ করে লোকসঙ্গীত (হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মাউন্টব্যাটন সায়েব গানটা মনে পড়ে); সঙ্ঘের ঘরের পাশে ঈদের ইফতার পার্টি আর আম্বেদকর মেলা; পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে মেয়েদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে, পণপ্রথা বিরোধী গল্প নিয়ে যাত্রা; আঞ্চলিক ধর্মীয় সিঙ্ক্রেটিজমের ট্র্যাডিশনের গল্প - সুফি-ভক্তি হেরিটেজ, সত্যপীর বা বনবিবির কথা, বাউল, ফকির, দরগা আর ক্রিসমাস ক্যারলও। বৈদিক মন্ত্র যতটা ভারতীয়, আমাদের এই ট্র্যাডিশনগুলোও ঠিক ততটাই…চাঁদ সদাগরের মণসাপুজোর মত করে লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ দিয়ে সংস্কৃতির যুদ্ধ হয় না; সংস্কৃতি ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন নয়; কমন সেন্স তৈরী করার অস্ত্র।

তিন, রোজকার জীবনের বিকল্প প্রতিষ্ঠান - প্রতিদিনের খাওয়াপরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ার। সঙ্ঘ শাখা তৈরী করেছিল, রোজ সকাল সন্ধ্যেয় তারা একসঙ্গে কিছু একটা চর্চা করত। এখনও করে। কাউন্টার-হেজিমনিকে দাঁড় করাতে এর বিকল্প প্রয়োজন। যেমন ধরুন পাড়ার লাইব্রেরি, যেখানে ছোট স্টাডি সার্কল বসবে, সাধারণ লোককে সঙ্গে নিয়ে। এলিট নাটক প্রবন্ধের চর্চা শুধু নয়, পপুলার কালচার থেকেও মেসেজ বের করে আনা সম্ভব - যেমন ধরুন মার্ভেলের সিনেমা - জেন-জি-দের পছন্দের গল্প; জয় ভীমের মত সিনেমা যেখানে জাতের লড়াইয়ের কথা রয়েছে; ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে অনুবাদ হয়ে আসা নানান প্রদেশের মানুষের গল্প; নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বাংলা অনুবাদে টিনটিনের গল্প; বাংলা ক্লাসিক - তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের...(আরো অনেক নাম আসতে পারে এখানে, বিভিন্ন ভাষায় আলাদা নাম, হরিনারায়ণ আপটে মনে পড়ছে যেমন)। প্রতি সপ্তাহের শেষে কমন সেন্স ওয়ার্কশপ — সেখানে সবাই মিলে সপ্তাহের খবরগুলো পড়ে আলোচনা করতে পারে: খবরে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সেই ঘটনায় লাভ কার? যেমন ধরুন কোথাও একটা যুদ্ধ হলে কারা লাভবান হয়? তেলের দাম বাড়লে লাভ কার, ক্ষতি কার? একটা একটা করে এরকম ওয়ার্কশপ ছড়িয়ে পড়তে থাকলে বাড়তে থাকবে এই নতুন কাউন্টার কমন সেন্স...বক্তৃতা দিয়ে নয়, বরং শেয়ার্ড এক্সিপিরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে।

চার, নতুন ঐতিহাসিক জোট বা হিস্টোরিক ব্লক। কিন্তু সমস্ত শ্রেণীগত তফাত মুছে একেবারে ফ্ল্যাট সমতল করে দিয়ে নয়। হিন্দুত্ববাদী জোটের অংশীদার উচ্চবর্ণের পুঁজিপতি ব্যবসাদার, উচ্চমধ্যবিত্ত প্রফেশনাল - আইটি ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ডাক্তার ইত্যাদি, আর অন্য পিছিয়ে-পড়া শ্রেণীর লোকজন যাদের হিন্দু হায়ারার্কিতে ওপরে ওঠার উচ্চাশা রয়েছে। এদের সকলের মধ্যে কমন সুতোটা বাস্তবে মুসলমান বিদ্বেষ — সে নানাভাবে এসে থাকতে পারে, যেমন দেশভাগের জেনারেশনাল মেমরি, বা "মুসলমানরা সব দখল করে নিল"-মার্কা হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড, এমনকী নানান অবদমিত ইচ্ছা থেকেও। কাউন্টার-হেজিমনির নতুন হিস্টোরিক ব্লক হবে একেবারেই আলাদা। এই জোটের কমন সুতো জাতিবিদ্বেষ না হয়ে হবে অভিন্ন বস্তুগত স্বার্থ, যেমন জমির অধিকার, জল জঙ্গলের অধিকার, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির অধিকার। সম্প্রদায়ের সীমানা ছাপিয়ে ইস্যুভিত্তিক প্রচার প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছবে। জল জঙ্গল জমির অধিকার জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, উঁচুনীচু, গরীব-বড়োলোক, ধার্মিক-অধার্মিক মানে না। সমস্ত জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এই জোটে, থাকবে না আদর্শগত বিশুদ্ধতার শুচিবাই। ধার্মিক হিন্দু মানেই হিন্দুত্ববাদী নয়, বুঝতে হবে এই দুটো শব্দের মানে আলাদা। আমি নাস্তিক, কাজেই আমার এই জোটে সবাইকে নাস্তিকই হতে হবে — সে জোট জন্মানোর আগেই তার গঙ্গাপ্রাপ্তি নিশ্চিত।

পাঁচ নম্বর - যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার আন্দোলন। ক্ষমতা ফিরবে রাজ্যের হাতে। শুধু বিজেপির শাসনকালেই নয়, ভারতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই। মোদির আমলে এই টেন্ডেন্সি চরম রূপ নিয়েছে, কারণ হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্যই হল ফেডারেশ অফ পিপলস-এর আইডিয়াকে মুছে দিয়ে এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম-এর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ন্যারেটিভকে ফাইনাল রূপ দেওয়া। ৩৭০ ধারার বিলোপ, হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া নানাভাবে, ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসিকে গায়ের জোরে চাপানো, পছন্দের রাজ্য সরকার না হলেই ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন-দের লেলিয়ে দেওয়া...বর্তমানে জুডিশিয়ারিকেও — সবই একটা ইউনিটারি মেজরিটারিয়ান রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে। এর পাল্টা কৌশল হল ফেডারেলিজমের পক্ষে ক্রমাগত গলা ফাটানোঃ রাজ্যের হাতে আরও ক্ষমতা; স্থানীয় সরকার, যেমন কর্পোরেশন বা পঞ্চায়ের হাতে আরও রিসোর্স; ভাষাগত আর সাংস্কৃতিক স্বশাসনের দাবী এবং সাংবিধানিক অধিকার; কেন্দ্রীয় আদিবাসী অঞ্চলগুলোকে ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা। সংবিধানে বলা যুক্তরাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী সমস্ত আইন প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাজ্যগুলোর রয়েছে, অন্ততঃ যতদিন না এই সরকার সংবিধানকেই বদলাতে পারছে — আর সেটা হতে দেওয়া যাবে না।

সবশেষে, এই লড়াইয়ের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা। গ্রামশি বলেছিলেন – যে দল গণতন্ত্র চর্চা করে না, তারা আধিপত্যের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে না। বাস্তব বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরণের মুভমেন্ট বা দলগুলোর ভিতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে এলিট উচ্চবর্ণের পুরুষদের মধ্যে। বাকিরা সেখানে ভোটব্যাঙ্ক। হ্যাঁ, একজন বামপন্থী কর্মী হয়েও লজ্জা না পেয়েই এই কথাটা বলছি, কারণ এটা বাস্তব। অধিকারের কথা বলবেন, অথচ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি থাকবে না সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় – তা তো হয় না। দরকারে অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ থাকবে; নিয়ম করে জাতিবাদ-বিরোধী, পিতৃতন্ত্র-বিরোধী প্রশিক্ষণ থাকবে দলের মধ্যেই – বিভিন্ন অফিসে যেমন প্রতি বছর নিয়ম করে POSH এর কোর্স করতে হয়। আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্বে থাকবে স্থানীয় লোক, দিল্লী থেকে নেমে আসা এলিট নেতা নয়। ইংরিজীতে একটা প্রচলিত কথা রয়েছে — “ডু হোয়াট ইউ সে”।

শুরুতেই যেমন বলেছিলাম — এই কাজগুলোর কোনোটাই গ্ল্যামারাস নয়। যন্তরমন্তরের অবস্থানে স্লোগান দেওয়ার মত উত্তেজনাপূর্ণ নয়। বোরিং কাজ যা জনসমক্ষে আসার সম্ভাবনা কম, কারণ অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে থাকা সুনীতা কুমারীকে মিডিয়া দেখাবে না। অবস্থানের যুদ্ধ এরকমই হয়। ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত। দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য্যের পরীক্ষা।

গ্রামশির কথা ধার করেই বলি: The old world is dying – কংগ্রেস স্টাইলের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান মৃতই বলা যায়। The new world – ন্যায়পরায়ণ, বহুত্ববাদী, ফেডারেল রিপাব্লিক – is not yet born. In this interregnum, a great variety of morbid symptoms –  lynching, surveillance, hate speech – appear – as entertainment.

আমরা ওই ইন্টারেগনামে রয়েছি। নতুনের পথে এগিয়ে যেতে আমাদের সম্বল শুধু অসীম ধৈর্য্য আর পরিশ্রম। নতুনকে নিখুঁত গভীরতার সঙ্গে তৈরী করতে পারলে সেখান থেকেই উঠে আসবে নতুন কমন সেন্স। সঙ্ঘের অনুকরণে নয়, বরং আমাদের – সাধারণ মানুষের – নিজেদের প্রতিষ্ঠান, নিজেদের আখ্যান, নিজেদের আইন, নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে। এলিট ইংরিজীতে নয়; সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়।

চার্বাক তাঁর পান্ডুলিপির ইতি টানেন নতুন প্রজন্মকে ডাক দিয়ে: সংহতির কথা বলো; লেখো, গান গাও, বিতর্ক করো, সংগঠিত হও; নিজেদের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করো। নেতার অপেক্ষায় বসে থেকো না। এই দেশ, এই ভূখন্ড, এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষের — যদি প্রত্যেকে একসঙ্গে এই মাটিকে নিজের করে নেয়।

অশ্বত্থ গাছটার নীচে ফিরে যাও কমরেড। টিনের ট্রাঙ্কটা সঙ্গে রেখো। একজনকে পড়তে শেখাও।

[কাল সুনীতার গল্পটা শেষ করব। লেখাটাও।]

No comments: