Saturday, June 27, 2026

একটা অশ্বত্থ গাছের গল্প

কাঁচা হাতে লেখা একটা গল্প। কিন্তু কাউন্টার হেজিমনি বোঝাতে এর চেয়ে ভাল রাস্তা আমার জানা নেই...

।।।   একটা অশ্বত্থগাছের গল্প  ।।। 

কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। দলিতদের ঝুপড়িগুলোর সামনে, একটু ফাঁকা জায়গায় একটা অশ্বত্থ গাছ। বুড়ো হয়েছে গাছটা, মাঝেমধ্যে দু একটা বাচ্চা ছেলে ছাড়া কেউ তার কাছাকাছি আসে না।

হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলে সঙ্ঘের শাখা৷ আশেপাশের তিনটে গ্রাম মিলিয়ে জনা পঞ্চাশ কমবয়সী ছেলে খাকি প্যান্ট পরে ব্যায়াম করে, ধুলো উড়িয়ে লাঠি খেলে, আর জয় শ্রীরাম বলে চিৎকার করে।

অশ্বত্থগাছটা একলাই দাঁড়িয়ে থাকে।

তারপর একদিন ওরা এল। ওরা মানে পার্টি। মিছিল নয়, গাদাখানেক লোকও নয়। একটা মেয়ে।

সুনীতা কুমারী। বছর পঁচিশের মত বয়স। জেলা সদরের কলেজ থেকে আইন পাশ করেছে, চাকরি করে না, ওকালতিও না। মেয়েটা পার্টির মেম্বার। সেই পার্টিটা যার কথা লোকে ভুলতে বসেছিল। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের আধভাঙা পার্টি অফিসে বসে জেলা সম্পাদক — বয়স হয়েছে তার, একটু খুঁড়িয়েও চলে — অনেকদিন আগে পুলিশের লাঠিতে পা ভেঙেছিল, আর সারেনি। একটা হাতলভাঙা চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে একদিন সে সুনীতাকে ডেকেছিল। পার্টি অফিসের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা লেনিন, ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের ছবির নীচে বসে সে বলেছিল — "আমাদের টাকাপয়সা নেই, লোকজনও কমে এসেছে। কিন্তু ওই গ্রামের অশ্বত্থগাছটা আমাদেরই। তুমি যাও — রোজ সন্ধ্যেবেলায় ওখানে বসে থাকবে। স্লোগান দেওয়ার দরকার নেই। শুধু বসে থাকো। অপেক্ষা করো"।

সুনীতা তর্ক করেনি। গ্রামে যাওয়া শুরু করল সে।

প্রথম দিন সন্ধেবেলা, একটা বাঁশের চাটাই, একটা কেরোসিনের লন্ঠন আর সেইদিনের খবরের কাগজটা নিয়ে সে বসে রইল...পাঁচটা থেকে সাতটা, ততক্ষণে গ্রামের বাইরে থেকে শেয়ালের ডাক শুরু হয়ে গেছে। একাই বসে রইল মেয়েটা, কেউ আসেনি তার কাছে। দ্বিতীয়দিন আবার গেল সে, আবারও একই ঘটনা। তিনদিনের দিন, কতগুলো বাচ্চা একটু দূর থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকে দেখে গেল। তার পরের দিন, এক মুসলমান চাষী এসে সুনীতার সামনে বসল হাঁটু মুড়ে। নাম ইউসুফ, আটষট্টি বছর বয়স, আট মাস ধরে সে চক্কর কাটছে বার্ধ্যক্য পেনশনের জন্যে। পায়নি। সুনীতা ইউসুফকে খবর পড়ে শোনাচ্ছিল — একটা নতুন সেচ প্রকল্পের খবর — নদীতে নতুন বাঁধ তৈরী হবে একটা। বুড়ো ইউসুফ পাত্তা দিল না। বললো — "জল নিয়া কী করব আমি? আমার পেনশন দ্যাও। বউ অসুস্থ। ওষুধ কিনতে পারি না। আট মাস ধরে ব্লক অফিসের চক্কর কাটতে আছি। ওরা টাকা চায়, টাকা কোত্থিকে দেব?"

সুনীতা বলে — "কাগজগুলো সব আছে তোমার কাছে"? "কাগজ, হুঁ:", বুড়ো হাসে। সুনীতা হাসে না। বরং পরের দিন একটা প্রো ফর্মা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে আসে সে। বুড়োর সঙ্গে বসে ফর্ম ভরে। তারপরের দিন সকালে বুড়ো ইউসুফকে নিয়ে ব্লক অফিসে যায়। বিডিও দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে — "বার বার আসো কেন বুড়ো? বলে দিয়েছি তো"! সুনীতা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, ফাইল হাতে। সেই দিনটা কেটে যায়। পরের দিন আবার যায় সুনীতা, আবার দাঁড়িয়ে থাকে অফিসারের সামনে। তারপরের দিন আবার। পাঁচ দিনের দিন অফিসার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলে সই করে দেয়। দুই হপ্তা পর ইউসুফের পেনশনের চিঠি এসে পৌঁছয় গ্রামের বাড়িতে। 

ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু এইটুকুই। বিপ্লব নয়। একটা পেনশন মাত্র।

পার্টি কৃতিত্ব চায় না। সমাবেশও করে না এই লড়াইয়ে জিতে। শুধু সুনীতাকে পাঠাতে থাকে। রোজ। দিনের পর দিন। প্রতি সন্ধ্যেবেলা, সেই অশ্বত্থ গাছটার নীচে।

একমাস পর, বুড়ো জেলা সম্পাদক একটা টিনের ট্রাঙ্ক পাঠায় সুনীতার কাছে। ট্রাঙ্কে কয়েকটা বই — ভগৎ সিংকে নিয়ে, একটা আম্বেদরকরের লেখা, কয়েকটা আইনের বই, সংবিধানের একটা কপি, নানান ধরণের ফাঁকা কিছু অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম, একটা বাঁধানো খাতা যেখানে লোকজনের কথা লিখে রাখা যাবে, আর কয়েকটা ডটপেন আর রিফিল। সুনীতা ট্রাঙ্কটা অশ্বত্থ গাছের তলাতেই রেখে দেয়। রোজ বিকেলে পাঁচটার সময় এসে সে ট্রাঙ্কের তালাটা খোলে, আবার সাতটার সময় বন্ধ করে দেয়।

তারপর, আস্তে আস্তে আরো অনেকে আসে অশ্বত্থ গাছের তলায়। দলিত পাড়ার এক বউ — তার ছেলেকে বেধড়ক মেরেছে মহাজনের লোকেরা। ছোট জাতের কমবয়সী জোয়ান ছেলে একটা — লোন চেয়েছিল, কিন্তু ফর্ম ভরতে পারেনি; পড়তেই জানে না সে। এক বিধবা — তার রেশন কার্ড হারিয়ে গেছে। এক চাষা — বড় রাস্তা তৈরীর সময় তার জমি নিয়ে নিয়েছিল সরকার, কিন্তু সে তার প্রাপ্য টাকা পায়নি। সুনীতা তাদের সকলের সঙ্গে কথা বলে। সকলকে সাহায্য করতে থাকে। কোনো গরম গরম বক্তৃতা না দিয়েই। শুধু ফর্ম ভরে, দরকার মত কোথাও ফোন করে, আর একটা পুরনো সাইকেলে চালিয়ে ফাইলভর্তি ব্যাগ কাঁধে এই অফিস, সেই অফিস ছুটোছুটি করে...

সঙ্ঘের শাখার নজর পড়ে অশ্বত্থ গাছের দিকে। একদিন সন্ধ্যেবেলা শাখার প্রচারক এসে পৌঁছয় তর্ক করে সুনীতাকে হারিয়ে দেবে বলে; হেরে গেলে মেয়েটা বিদেয় হবে। প্রচারক অনেক চেঁচায় — লাভ জিহাদ আর হিন্দু ঐক্য নিয়ে, আর...পঁচিশ বছরের একলা মেয়ে সুনীতা সন্ধ্যেবেলা দলিত আর মুসলমানদের ঘরের পাশে কী করছে তাই নিয়েও। দপ্‌ করে জ্বলে ওঠে গাছতলায় বসে থাকা গরীব ঘরের লোকগুলো। কিন্তু সুনীতা রাগে না, চিৎকারও করে না। ঠান্ডা মাথায় শুধু জিজ্ঞেস করে — "এই বউটার রেশনকার্ডের উপায় আছে তোমার কাছে"? মেয়েটার শান্ত মুখ দেখে আর চারপাশে একটু অশান্ত লোকজনের ফিসফাস শুনে প্রচারক আর দাঁড়ায় না সেখানে। "পরে আসব" বলে চলে যায়, কিন্তু আর আসে না।

সেদিন সন্ধ্যেবেলা ওদের গান শোনায় সুনীতা। শহরের পার্টি অফিসের ঘরে শেখা গান। 

"আজ কমর বান্ধ তৈয়ার হোওয়ে কোটি ভাইয়োঁ, 
হম ভুখসে মরনেওয়ালে, কেয়া মওতসে ডরনেওয়ালে"

গানের সঙ্গে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে গাছতলার মানুষগুলো।

ছয় মাস কেটে যায়। শহরের অফিসে পার্টি একটা মিটিং ডাকে, রাজ্যের বড় নেতাদের নিয়ে। নেতারা জিজ্ঞেস করেন: "কী পেলাম আমরা"? বুড়ো সম্পাদক বলে — "এখনও কিছুই না। তবে ওই অশ্বত্থ গাছটার নীচে এখন অনেক মানুষ আসে তাদের নানান সমস্যা নিয়ে, তাদের নিজেদের কথা বলে তারা। এটুকুও তো আমাদের ছিল না।"

পার্টি এই ছোট্ট মুভমেন্টটাকে ভিত্তি করে আরো বড় মুভমেন্ট গড়বে ঠিক করে। সকলের কাছ থেকে দুশো টাকা করে নিয়ে ওরা একটা টিনের ছাউনি কেনে। অশ্বত্থ গাছের পাশে দলিত পাড়ার মুখে ওই পাড়ার ছেলেদেরই কেটে আনা চারটে বাঁশের খুঁটির ওপর বসে সেই ছাউনি। তারপর পার্টি কেনে আরো একটা ট্রাঙ্ক। একটা ছোট লাইব্রেরি বানায় — শ দুয়েক বই, শহরের লোকজন দান করেছিল। ফসল কাটার আগে সবাই মিলে তৈরী করে শস্যের গোলা একটা। প্রতি সপ্তাহে শহরের এক রিটায়ার্ড উকিল আসতে শুরু করে অশ্বত্থতলায় — একটা লিগাল এইড ক্লিনিক বানিয়ে ফেলে সে। তারপর একটা সহজ যোগাযোগের ব্যবস্থাও বানিয়ে ফেলে নিজেরাই: একটা মিসড কল নেটওয়ার্ক। কারো কোনো জরুরী খবর দেওয়ার থাকলে — পুলিশ রেইড, নতুন সরকারী স্কিম, বাজারে ফসলের দামের বদল — মিসড কল দেবে সে সুনীতাকে। সুনীতা তখনই পালটা ফোন করে সব জেনে নিয়ে পাঁচজন ভলান্টিয়ারকে খবর দেবে, তারা আরও পাঁচজনকে জানাবে...এক ঘন্টার মধ্যে আশেপাশের গ্রামের অন্তত: একশো পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে খবরগুলো। আর, গাছের গুঁড়িতে পেরেক দিয়ে ঠোকা একটা নোটিস বোর্ডে সময়ে সময়ে আপডেট লিখে দেবে কেউ না কেউ...

এক সন্ধ্যেবেলা, কবিতা আসে অশ্বত্থ তলায়। কবিতা, অল্পবয়সী, মাহারদের ঘরের বউ। ক্ষেতে তুলো তুলে পেট চলে তার। দুই বছর আগে শ্বশুরবাড়ির লোক তার মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল জোর করে; মেয়েটা তখনো চোদ্দ বছরের মাত্র। দু বছর না ঘুরতেই বিধবা হয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। কবিতার ছেলে শহরে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করে, মাস গেলে মায়ের ঠিকানায় কিছু টাকা পাঠায়। কবিতা বলে — "আমাকে আর আমার মেয়েটাকে পড়ালিখা শেখাবে"?

শুরু হয় নাইট স্কুল। বাঁধা সিলেবাস নেই। সার্টিফিকেটও নেই। একটা বালব, একটা ব্ল্যাকবোর্ড আর মাটিতে বসা দশটা মেয়েবউ। কেউ মাহার, কেউ মুসলমান, কিন্তু সেসব নিয়ে কেউ ভাবে না। পাশাপাশি বসে তারা অক্ষর চিনতে শেখে। নিজের নাম লিখতে শেখে। তাদের রেশন কার্ডে কী লেখা আছে, পড়ে সেসব। জমির দলিল পড়তে শেখে। ওদেরই একজন হঠাৎ নজর করে যে মহাজন গ্রামের বাসিন্দাদের দুই একর জমি নিজের নামে করে নিয়েছে, এতদিন কেউ জানতোও না।

কবিতা বলে, "চলো তহশিলদারের কাছে যাই"। যায় ওরা। মহাজন তহশিলদারের খাস দোস্ত। মহাজন হা হা করে হাসে। তহশিলদার ওদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ওরা আবার যায়। তারপর আবার। পার্টি একজন উকিলকে পাঠায় জেলা সদর থেকে — চুপচাপ একটা লোক যে খুব একটা মিটিং মিছিল বক্তৃতা করে না। সেই উকিল একটা কেস ফাইল করে মহাজনের নামে। দু বছর লেগে যায় কোর্টে। হেরে যায় ওরা। তারপর আপীল করে। শেষ অবধি জিতেও যায় একদিন। জমি ফেরানো হয় গ্রামবাসীদের কাছে।

মহাজন ওদের জলের লাইন কেটে দেয়। পরের দিন সুনীতা পাশের গ্রাম থেকে একজন পুরনো ইঞ্জিনিয়ারকে ধরে আনে — লোকটাকে এক যুগ আগে বরখাস্ত করেছিল সরকার; ডিপার্টমেন্টের উপরওয়ালার দুর্নীতির ধরে ফেলেছিল সে, আজকাল টিউবওয়েল সারিয়ে পেট চালায়। সে ওদের শেখায় বোরওয়েল কী করে বসাতে হয়। ওরা নিজেরাই করে নেয় কাজটা। মহাজন ওদের থামাতে পারে না।

সেদিন রাতে আগুন জ্বালিয়ে তার চারদিকে ঘুরে নাচে ওরা; গান গায়।

"ইতনে বাজু, ইতনে সর, গিন লে দুশমন ধ্যান সে
হারেগা উও হর বাজি, যব খেলে হম জি-জান সে।"

বুড়ো একলা অশ্বত্থ গাছটা ততদিনে আর শুধু গাছ নয়। আর একলাও নয়। তার নীচে মানুষের ঢল নামে। গ্রামের উল্টোদিকে নীমগাছের পাশে সঙ্ঘের শাখা তখন রোজই চলে। কিন্তু, এখন অশ্বত্থ গাছের তলাতেও গড়ে উঠেছে পালটা জোট। ওরা সঙ্ঘের শাখার মত উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান দেয় না, বরং ওদের জোট বিকল্প হিসেবে রোজকার জীবনের চাহিদার কথা বলে। মেটিরিয়াল রিয়েলিটি। আর কোনো পেনশন আটকে থাকে না। থানার মিথ্যা মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয় ওদের ওপর থেকে। আধিপত্যবাদের কফিনে পোঁতা হয় আরও একটা পেরেক।

আরও দু বছর কাটে। পরের পঞ্চায়েত ভোটে পার্টি চমকে দেয় সকলকে। আগে কখনও এমনটা করেনি তারা। নিজেরা প্রার্থী না দিয়ে পার্টি সমর্থন করে কবিতার মেয়েকে। মাহী। সেই মেয়ে, যাকে চোদ্দ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল কবিতার শ্বশুরবাড়ির লোক৷  মাহীর বয়স আজ কুড়ি বছর; ওই অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে লিখতে পড়তে শিখেছে সে; জমির ঘটনাটা প্রথম নজরে পড়েছিল তারই; বোরওয়েলটা বসানোর সময় নিজের মাথায় করে ইঁট বয়েছিল সে। মাহী জিতে যায় বারো ভোটের ব্যবধানে।

লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করেনি মাহী। নিজেকে কমিউনিস্টও বলেনি। কিন্তু সে খেয়াল রেখেছিল যাতে গাছতলার সেই ছাউনিটা মেরামত হয়; বোরওয়েল পরিষ্কার করা হয়; আর স্কুলের বাড়িটায় একটা নতুন টয়লেট বসে।

পার্টির বুড়ো জেলা সম্পাদক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এক সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছয় অশ্বত্থতলায়। গাছের তলায় বসে সে দেখে — আশেপাশে বেশ কয়েকজন বউ মেয়েরা লন্ঠনের আলোয় পড়ছে। বুড়ো সুনীতাকে বলে — "একেই বলে অবস্থানের যুদ্ধ। বক্তৃতা নয়। মিছিলও নয়। শুধু একটা গাছতলা, একটা 
টিনের ট্রাঙ্ক, আর সময়"।

সুনীতা হাসে। চোখ তুলে বলে, "আর, একটা পার্টি যে জানে কখন মুখ বুজে কাজ করে যেতে হয়"।

সেই অশ্বত্থ গাছটা আজও আছে। ট্রাঙ্কটাও। নাইট স্কুলটাও। আর আছে সেই পার্টিটাও। লাল ঝান্ডার পার্টি। আগের মত শুধু স্লোগান দেওয়া ভোটে লড়া পার্টি নয়। নতুনভাবে, ধৈর্য্য ধরে দিনের পর দিন মানুষকে নিয়ে জোট বাঁধার বোরিং কাজগুলো করে যাওয়া পার্টি। এমন একটা পার্টি যারা শুধু গলা তুলে আরো জোরে চেঁচিয়ে জেতার চেষ্টা করে না; এই পার্টিটা জেতে আম আদমির সমস্যার সমাধান ছিনিয়ে এনে — যে সমস্যার সমাধান শাসকশ্রেণী করতে চায় না। এই পার্টিটা জেতে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জোট বেঁধে।

এমনটাই হয় কাউন্টার-হেজিমনি...একমাত্র পথ যেটা কাজ করে।
=======================================

প্রায় মাসখানেক ধরে লিখছিলাম এই হিন্দুত্ববাদের ন্যারেটিভ বিল্ডিং নিয়ে, ভোটের আগে থেকেই। আপাতত আমার জানাবোঝা এইটুকুই। জ্ঞান দেওয়ার জন্যে লেখা উদ্দেশ্য ছিল না, বরং যে কথাগুলো নানান বই আর আর্টিকলে রয়েছে, প্রধাণত ইংরিজীতে, সেইগুলোকে কম্পাইল করে সহজবোধ্য বাংলায় একটা ডকুমেন্টেশন করতে চেয়েছিলাম। অনেকে পড়েছেন, অনেক শেয়ার হয়েছে, অনেকেই প্রশংসা করেছেন। আমি সকলের কাছে কৃতজ্ঞ। 

আরো কিছু মেটিরিয়াল পেলে এই সিরিজের মধ্যেই লিখে রাখব। আপাতত কিছুদিনের বিরতি।

কাউন্টার হেজিমনির কথা

একটা অলেখা গল্পের একটুখানি দিয়ে শুরু করি।

"কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলতো সঙ্ঘের শাখা৷ দলিতদের এলাকার সামনে একটা একলা অশ্বত্থ গাছ। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় সেই গাছের নীচে একটা কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে একটা মাদুর বিছিয়ে বসতো বছর পঁচিশের সুনীতা। সুনীতা কুমারী। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু ওকালতি করে না। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের পার্টি অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে এই গ্রামটায়। সঙ্গে কোনো পোস্টার নেই, পতাকা নেই; সুনীতার সম্বল দুই চোখ ভরা স্বপ্ন, আর কাপড়ের পার্সের ভিতরে পার্টির একটা মেম্বারশিপ কার্ড। সে এসে বসতো একটা পুরনো টিনের ট্রাঙ্ক নিয়ে — তাতে থাকত কিছু বই: ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের বই, একটা আইনের বই, একটা সংবিধানের কপি, কিছু ফর্ম, একটা খাতা আর ডটপেন। সুনীতা গ্রামের প্রান্তিক মানুষজনের কথা শুনত, তাদের সাহায্য করত — কারো ফর্ম ভরে দিয়ে, কারো পেনশন আনার জন্য প্রতিদিন বিডিওর দপ্তরে গিয়ে; গল্প বলতো — জল-জমি-জঙ্গলের অধিকারের গল্প, রুজি-রুটির লড়াইয়ের গল্প। গান শোনাতো..."হাম ভুখসে মরনেওয়ালে"। দিন কাটতো। তারপর, পাঁচ বছর পর, একদিন, পঞ্চায়েত ভোটের পরে, সেই অশ্বত্থ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, সুনীতার হাত ধরে, শপথ নিল গ্রামের প্রথম দলিত মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান..."

আমাদের কাউন্টার-হেজিমনির ভিত্তি এই গল্পটাই। গল্পটা শেষ করব পরের পর্বে, শেষ পর্বে। আজ লিখব হেজিমনি কীভাবে ভাঙা যেতে পারে তাই নিয়ে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিংটুকু। গ্রামশি আছে, সঙ্গে চার্বাকও - বকলমে পার্থ চ্যাটার্জী।

আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…

আগের দুটো পর্বে লেখার চেষ্টা করেছিলাম কীভাবে হিন্দুত্ব তার ওয়ার্ল্ডভিউকে কমন সেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে প্রায় একশো বছরের অবস্থানের যুদ্ধের মাধ্যমে - স্কুল, মিডিয়া, মন্দির, দৈনন্দিন অভ্যাসের স্পেসকে দখল করে। গ্রামশির কথা মানলে আমরা এও বুঝি যে কোনো আধিপত্যই চিরকালীন নয়। বেকারত্ব, রোজকার রুজি-রুটির লড়াই, হিন্দুত্বের ভিতরের জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক প্রতিরোধ, নানান কারণে অস্থির যুবসমাজ - অনেক ফাটল রয়েছে এই হেজিমনির মধ্যেও। তবে ফাটল রয়েছে মানেই আপনাআপনি সেই ফাটলে বিপ্লবের গাছ গজাবে, এমনটাও নয়।

গ্রামশি বলেন পাল্টা অবস্থানের যুদ্ধের কথা। চটজলদি ভোটে জেতার স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। হঠাৎ কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা আকাশ থেকে নেমে এসে মুশকিল আসান করে দেবেন - এই খোয়াব দেখেও লাভ নেই। একটা দুটো বা দশটা বিশাল মিছিলেও বিশেষ কিছু হবার নয়। বরং, অনেক ধৈর্য্য ধরে, অনেক সময় নিয়ে কিছু কাজ করে যেতে হবে, আপাতদৃষ্টিতে যেগুলো বড়ই বোরিং কাজ - যেমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে থেকেই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল তুলে আনা, সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করা, আর একদম গ্রাউন্ড-আপ একটা পাল্টা ঐতিহাসিক জোট (historic bloc) তৈরী করা…

পার্থ চ্যাটার্জীর হাত ধরে চার্বাক ফিরে এসেছেন — সেই প্রাচীন সংশয়বাদী দার্শনিক চার্বাক — যিনি এই ধারণাগুলোর একান্ত ভারতীয় রূপ তুলে ধরেন আমাদের সামনে। চার্বাকের কথা অনুযায়ী ভারত কোনো "হিন্দু রাষ্ট্র" নয়, আবার এলিট থিওরেটিকাল "বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র" বলেও ভারতকে ডিফাইন করা যায় না। ভারতের ইতিহাস, ভারতের সমাজ, সেই সমাজের মানুষজনকে দেখলে ভারত, প্রকৃত অর্থে, একটা "ফেডারেশ অফ পিপলস" — পিপলস ইন প্লুরাল, কারণ এই ভূখন্ড সত্যিই বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতি, বহু ধরণের জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। বলতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে রঙিন আর কমপ্লেক্স মেলা। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব আইডেন্টিটি; সবচেয়ে বড় কথা, নানান তফাত থাকা সত্ত্বেও এরা সকলেই একটা অভিন্ন সংবিধানের ছাতার নীচে একসাথে বসবাস করতে রাজী হয়েছে; অন্তত হয়েছিল একটা সময়। সেই সম্মতি বা সমঝোতা বাইরে থেকে ভেসে আসেনি। বেশ জটিল, অগোছালো এবং খানিক অসম্পূর্ণ আলোচনার ফসল এই সমঝোতা, যাকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বাধীনতার পর থেকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আজ তারা অনেকাংশে সফল। ফেডারেশন অফ পিপলস-এর বদলে তারা আনতে চাইছে পুরোপুরি সেন্ট্রালাইজড, মেজরিটারিয়ান, এক দেশ এক ভাষা এক আইডেন্টিটি এক পোশাক এক খাদ্যাভ্যাসের তথাকথিত হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান।

শুরুতেই এই প্রচেষ্টাকে "নো থ্যাঙ্কিউ" জানিয়ে চলুন একবার চেষ্টা করি এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধ পথ খুঁজে বের করতে। এক্ষেত্রে কাউন্টার-হেজিমনির পথ, অর্থাৎ সেই ফেডারেশন অফ পিপলস-কে আবার বাঁচিয়ে তোলার রাস্তা। শুধু "বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য"-এর এলিট স্লোগান নয়, বরং বাস্তবিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঝাঁকুনি দেওয়া ফেডারেশন যেখানে সম্পদের পুনর্বন্টন হবে, যেখানে ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্য আর স্থানীয় অঞ্চলগুলোই নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে, দিল্লীবাসী কোনো সুপ্রীম লীডার নয়।

প্রশ্ন হল – কীভাবে?

প্রথমতঃ, অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল - গ্রামশির বক্তব্য ছিল এই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে সমস্ত সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে; এমন মানুষ যাঁরা তাঁদের নিজেদের ভাষায় নিজেদের কথা বলবেন; ওপর থেকে উপদেশ দেবেন না। আরএসএস এই তত্ত্বটা ভালো বুঝেছিল। ফলে, তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই নিজেদের কথা বলার লোক তৈরী করেছিল - প্রচারক, স্কুলশিক্ষক, মন্দিরের পূজারী, আখড়ার মহন্ত, আধুনিক কালে ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার - যারা সকলেই স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় সংস্কৃতি, স্থানীয় ইমেজারি ব্যবহার করে একটা প্যান-হিন্দু আইডিয়া বেচতে পেরেছে সফলভাবে। উল্টোদিকে, সেকুলার লেফটের মধ্যে এতদিন অবধি যারা এই জায়গায় ছিল, তারা প্রায় সকলেই ইংরিজীতে শিক্ষিত, ইংরিজীতে কথা বলাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ, ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান ফিলোজফারদের উক্তি তাদের মুখে মুখে ফেরে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সংস্কৃতি তাদের কাছে ব্যাকওয়ার্ড...এক কথায় একটা "এলিট" সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষের কাছে খানিক অন্য গ্রহের বাসিন্দা টাইপ। কাউন্টার হেজিমনি এই ছকে তৈরী হবে না। যেমন ধরুন আমি, কলকাতায় জন্ম বড়-হওয়া একটা লোক যার সঙ্গে কোচবিহারের কোনো সম্পর্ক নেই, দুম করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মুখিয়া হতে গেলে কেউ মানবে না। অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে এই সমস্ত কমিউনিটি — দলিত, আদিবাসী, ওবিসি, মুসলমানদের মধ্যে থেকেই। তারা নিজেদের দাবীদাওয়া চাহিদার কথা বলবে। কথা হবে পেরিয়ারকে নিয়ে, আম্বেদকরকে নিয়ে, ভক্তি আন্দোলনের জাতপাতবিরোধী দিকগুলো নিয়ে, দ্রাবিড় মুভমেন্টের ফেডারেলিজম নিয়ে। আর এই মানুষগুলোকে উঠে দাঁড়ানোয় সাহায্য করতে থাকবে  স্কলারশিপ, নাইট স্কুল, কো-অপারেটিভ লাইব্রেরি, আইনি সহায়তা, ট্রেড ইউনিয়ন - কিছু দায়িত্ব তো আপনিও নেবেন, নাকি?

দুই নম্বরে আসে কালচার ওয়ার - সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। যেখানে সংস্কৃতি কোনো জগদ্দল পাথর বা মোনোলিথ নয়। হিন্দুত্ব এই সংস্কৃতিকে মোনোলিথ বানিয়ে ফেলতে চেয়েছে, এবং অনেকাংশে তারা সফলও। কারণ, তাদের গল্পটা সোজাসাপটা। তাদের ডেফিনেশনে ভারত আদিকাল থেকেই একটা হিন্দু রাষ্ট্র; মুসলমান আর ক্রিশ্চানরা এই দেশে বহিরাগত; দেশপ্রেমিক হওয়ার একমাত্র রাস্তা হল তাদের রাগী চেহারার সিক্স প্যাকওয়ালা রামকে কুর্ণিশ করা, আর হিন্দিতে কথা বলা। হিন্দি - হিন্দু - হিন্দুস্তান। পার্থ চ্যাটার্জীর চার্বাক এই মিথকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেন। চার্বাক আমাদের জানান যে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী প্রতীক ও আখ্যান রয়েছে – সঙ্ঘ পরিবার যাকে তাদের ইচ্ছেমতো মুছে দিতে চায়: দক্ষিণে তামিল তাই, তেলগু তাল্লি, কানাড়া তায়ি, কেরলম; ঝাড়খন্ডে সিধু কানু, বীরসা মুন্ডা; মহারাষ্ট্রে শিবাজী; মণিপুরে মেইতি ইমা; পঞ্জাবে ওয়ারিস শাহ। আলাদা আইকন হলেও কোনোটাই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনা নয়, বরং ফেডারেশন অফ পিপলস-এর মূল মন্ত্র এই আঞ্চলিক সংস্কৃতি। কাউন্টার হেজিমনির জন্যে পাল্টা-সংস্কৃতির লড়াই: ওয়েব সিরিজ, সেখানে মুসলমান নার্স ইউনিয়ন তৈরী করে সহকর্মীদের জন্য লড়াই করে; দলিত কমিউনিটির জাতপাতবিরোধী লড়াইয়ের গল্প নিয়ে গ্রাফিক নভেল; আম্বানি-আদানিদের মুনাফালুটকে ব্যঙ্গ করে লোকসঙ্গীত (হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মাউন্টব্যাটন সায়েব গানটা মনে পড়ে); সঙ্ঘের ঘরের পাশে ঈদের ইফতার পার্টি আর আম্বেদকর মেলা; পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে মেয়েদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে, পণপ্রথা বিরোধী গল্প নিয়ে যাত্রা; আঞ্চলিক ধর্মীয় সিঙ্ক্রেটিজমের ট্র্যাডিশনের গল্প - সুফি-ভক্তি হেরিটেজ, সত্যপীর বা বনবিবির কথা, বাউল, ফকির, দরগা আর ক্রিসমাস ক্যারলও। বৈদিক মন্ত্র যতটা ভারতীয়, আমাদের এই ট্র্যাডিশনগুলোও ঠিক ততটাই…চাঁদ সদাগরের মণসাপুজোর মত করে লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ দিয়ে সংস্কৃতির যুদ্ধ হয় না; সংস্কৃতি ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন নয়; কমন সেন্স তৈরী করার অস্ত্র।

তিন, রোজকার জীবনের বিকল্প প্রতিষ্ঠান - প্রতিদিনের খাওয়াপরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ার। সঙ্ঘ শাখা তৈরী করেছিল, রোজ সকাল সন্ধ্যেয় তারা একসঙ্গে কিছু একটা চর্চা করত। এখনও করে। কাউন্টার-হেজিমনিকে দাঁড় করাতে এর বিকল্প প্রয়োজন। যেমন ধরুন পাড়ার লাইব্রেরি, যেখানে ছোট স্টাডি সার্কল বসবে, সাধারণ লোককে সঙ্গে নিয়ে। এলিট নাটক প্রবন্ধের চর্চা শুধু নয়, পপুলার কালচার থেকেও মেসেজ বের করে আনা সম্ভব - যেমন ধরুন মার্ভেলের সিনেমা - জেন-জি-দের পছন্দের গল্প; জয় ভীমের মত সিনেমা যেখানে জাতের লড়াইয়ের কথা রয়েছে; ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে অনুবাদ হয়ে আসা নানান প্রদেশের মানুষের গল্প; নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বাংলা অনুবাদে টিনটিনের গল্প; বাংলা ক্লাসিক - তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের...(আরো অনেক নাম আসতে পারে এখানে, বিভিন্ন ভাষায় আলাদা নাম, হরিনারায়ণ আপটে মনে পড়ছে যেমন)। প্রতি সপ্তাহের শেষে কমন সেন্স ওয়ার্কশপ — সেখানে সবাই মিলে সপ্তাহের খবরগুলো পড়ে আলোচনা করতে পারে: খবরে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সেই ঘটনায় লাভ কার? যেমন ধরুন কোথাও একটা যুদ্ধ হলে কারা লাভবান হয়? তেলের দাম বাড়লে লাভ কার, ক্ষতি কার? একটা একটা করে এরকম ওয়ার্কশপ ছড়িয়ে পড়তে থাকলে বাড়তে থাকবে এই নতুন কাউন্টার কমন সেন্স...বক্তৃতা দিয়ে নয়, বরং শেয়ার্ড এক্সিপিরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে।

চার, নতুন ঐতিহাসিক জোট বা হিস্টোরিক ব্লক। কিন্তু সমস্ত শ্রেণীগত তফাত মুছে একেবারে ফ্ল্যাট সমতল করে দিয়ে নয়। হিন্দুত্ববাদী জোটের অংশীদার উচ্চবর্ণের পুঁজিপতি ব্যবসাদার, উচ্চমধ্যবিত্ত প্রফেশনাল - আইটি ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ডাক্তার ইত্যাদি, আর অন্য পিছিয়ে-পড়া শ্রেণীর লোকজন যাদের হিন্দু হায়ারার্কিতে ওপরে ওঠার উচ্চাশা রয়েছে। এদের সকলের মধ্যে কমন সুতোটা বাস্তবে মুসলমান বিদ্বেষ — সে নানাভাবে এসে থাকতে পারে, যেমন দেশভাগের জেনারেশনাল মেমরি, বা "মুসলমানরা সব দখল করে নিল"-মার্কা হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড, এমনকী নানান অবদমিত ইচ্ছা থেকেও। কাউন্টার-হেজিমনির নতুন হিস্টোরিক ব্লক হবে একেবারেই আলাদা। এই জোটের কমন সুতো জাতিবিদ্বেষ না হয়ে হবে অভিন্ন বস্তুগত স্বার্থ, যেমন জমির অধিকার, জল জঙ্গলের অধিকার, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির অধিকার। সম্প্রদায়ের সীমানা ছাপিয়ে ইস্যুভিত্তিক প্রচার প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছবে। জল জঙ্গল জমির অধিকার জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, উঁচুনীচু, গরীব-বড়োলোক, ধার্মিক-অধার্মিক মানে না। সমস্ত জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এই জোটে, থাকবে না আদর্শগত বিশুদ্ধতার শুচিবাই। ধার্মিক হিন্দু মানেই হিন্দুত্ববাদী নয়, বুঝতে হবে এই দুটো শব্দের মানে আলাদা। আমি নাস্তিক, কাজেই আমার এই জোটে সবাইকে নাস্তিকই হতে হবে — সে জোট জন্মানোর আগেই তার গঙ্গাপ্রাপ্তি নিশ্চিত।

পাঁচ নম্বর - যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার আন্দোলন। ক্ষমতা ফিরবে রাজ্যের হাতে। শুধু বিজেপির শাসনকালেই নয়, ভারতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই। মোদির আমলে এই টেন্ডেন্সি চরম রূপ নিয়েছে, কারণ হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্যই হল ফেডারেশ অফ পিপলস-এর আইডিয়াকে মুছে দিয়ে এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম-এর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ন্যারেটিভকে ফাইনাল রূপ দেওয়া। ৩৭০ ধারার বিলোপ, হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া নানাভাবে, ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসিকে গায়ের জোরে চাপানো, পছন্দের রাজ্য সরকার না হলেই ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন-দের লেলিয়ে দেওয়া...বর্তমানে জুডিশিয়ারিকেও — সবই একটা ইউনিটারি মেজরিটারিয়ান রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে। এর পাল্টা কৌশল হল ফেডারেলিজমের পক্ষে ক্রমাগত গলা ফাটানোঃ রাজ্যের হাতে আরও ক্ষমতা; স্থানীয় সরকার, যেমন কর্পোরেশন বা পঞ্চায়ের হাতে আরও রিসোর্স; ভাষাগত আর সাংস্কৃতিক স্বশাসনের দাবী এবং সাংবিধানিক অধিকার; কেন্দ্রীয় আদিবাসী অঞ্চলগুলোকে ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা। সংবিধানে বলা যুক্তরাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী সমস্ত আইন প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাজ্যগুলোর রয়েছে, অন্ততঃ যতদিন না এই সরকার সংবিধানকেই বদলাতে পারছে — আর সেটা হতে দেওয়া যাবে না।

সবশেষে, এই লড়াইয়ের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা। গ্রামশি বলেছিলেন – যে দল গণতন্ত্র চর্চা করে না, তারা আধিপত্যের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে না। বাস্তব বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরণের মুভমেন্ট বা দলগুলোর ভিতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে এলিট উচ্চবর্ণের পুরুষদের মধ্যে। বাকিরা সেখানে ভোটব্যাঙ্ক। হ্যাঁ, একজন বামপন্থী কর্মী হয়েও লজ্জা না পেয়েই এই কথাটা বলছি, কারণ এটা বাস্তব। অধিকারের কথা বলবেন, অথচ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি থাকবে না সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় – তা তো হয় না। দরকারে অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ থাকবে; নিয়ম করে জাতিবাদ-বিরোধী, পিতৃতন্ত্র-বিরোধী প্রশিক্ষণ থাকবে দলের মধ্যেই – বিভিন্ন অফিসে যেমন প্রতি বছর নিয়ম করে POSH এর কোর্স করতে হয়। আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্বে থাকবে স্থানীয় লোক, দিল্লী থেকে নেমে আসা এলিট নেতা নয়। ইংরিজীতে একটা প্রচলিত কথা রয়েছে — “ডু হোয়াট ইউ সে”।

শুরুতেই যেমন বলেছিলাম — এই কাজগুলোর কোনোটাই গ্ল্যামারাস নয়। যন্তরমন্তরের অবস্থানে স্লোগান দেওয়ার মত উত্তেজনাপূর্ণ নয়। বোরিং কাজ যা জনসমক্ষে আসার সম্ভাবনা কম, কারণ অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে থাকা সুনীতা কুমারীকে মিডিয়া দেখাবে না। অবস্থানের যুদ্ধ এরকমই হয়। ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত। দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য্যের পরীক্ষা।

গ্রামশির কথা ধার করেই বলি: The old world is dying – কংগ্রেস স্টাইলের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান মৃতই বলা যায়। The new world – ন্যায়পরায়ণ, বহুত্ববাদী, ফেডারেল রিপাব্লিক – is not yet born. In this interregnum, a great variety of morbid symptoms –  lynching, surveillance, hate speech – appear – as entertainment.

আমরা ওই ইন্টারেগনামে রয়েছি। নতুনের পথে এগিয়ে যেতে আমাদের সম্বল শুধু অসীম ধৈর্য্য আর পরিশ্রম। নতুনকে নিখুঁত গভীরতার সঙ্গে তৈরী করতে পারলে সেখান থেকেই উঠে আসবে নতুন কমন সেন্স। সঙ্ঘের অনুকরণে নয়, বরং আমাদের – সাধারণ মানুষের – নিজেদের প্রতিষ্ঠান, নিজেদের আখ্যান, নিজেদের আইন, নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে। এলিট ইংরিজীতে নয়; সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়।

চার্বাক তাঁর পান্ডুলিপির ইতি টানেন নতুন প্রজন্মকে ডাক দিয়ে: সংহতির কথা বলো; লেখো, গান গাও, বিতর্ক করো, সংগঠিত হও; নিজেদের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করো। নেতার অপেক্ষায় বসে থেকো না। এই দেশ, এই ভূখন্ড, এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষের — যদি প্রত্যেকে একসঙ্গে এই মাটিকে নিজের করে নেয়।

অশ্বত্থ গাছটার নীচে ফিরে যাও কমরেড। টিনের ট্রাঙ্কটা সঙ্গে রেখো। একজনকে পড়তে শেখাও।

[কাল সুনীতার গল্পটা শেষ করব। লেখাটাও।]

ন্যারেটিভ তৈরীর আধুনিক ইতিহাস

সঙ্ঘ পরিবারের স্ট্র‍্যাটেজির কথা লিখেছিলাম — কনসেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং কীভাবে হয়, ন্যারেটিভ কীভাবে তৈরী হয় — যেখান থেকে আজকের মত সাংস্কৃতিক আধিপত্য আসে। কিন্তু এই আধিপত্য তো এন্ড প্রোডাক্ট। আর, সঙ্ঘ পরিবারের সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এই এন্ড প্রোডাক্টে পৌঁছবার পদ্ধতি। রান্নার রেসিপির মত করে যদি ভাবেন, তাহলে উপাদানের কথাও বলতে হয় — যেগুলোকে ব্যবহার করে এই এন্ড প্রোডাক্ট তৈরী হয়েছে। কথাটা মাথায় এল কারণ আগের পোস্টে (আধিপত্যবাদ নিয়ে) কিছু কমেন্ট এসেছিল সিমিলার প্রশ্নসহ। তাই মনে হল এটাও লিখে রাখি...

এখানেও একটা ডিসক্লেমার — এগুলো সবই এখানে ওখানে নানান বই আর আর্টিকল পড়ার পর আমার নিজের সঙ্গে কথা বলার ফসল। ফাঁকফোকর থাকাটাই স্বাভাবিক। চাইলে ভরাট করতে সাহায্য করতে পারেন।

শুরুটা এইভাবেই করি — আজকের অল-পার্ভেসিভ হিন্দুত্ব আইডিওলজি আচমকা ঘটনা নয়। সাধারণ মানুষের ডিএনএ তো দুম করে পালটে গিয়ে তার মধ্যে জম্বি জিন ঢুকে যায়নি। এই ঘটনাটা প্রায় একশো বছর ধরে চলা পরিকল্পিত প্রোজেক্টের প্ল্যানড আউটকাম — যে প্রোজেক্টের অঙ্গ হিসেবে খুব দক্ষতার সঙ্গে বিভিন্ন ন্যাশনাল ক্রাইসিসের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ কিছু মুহূর্তকে কাজে লাগানো হয়েছে।

সেকুলার আদর্শ থেকে হিন্দু জাগরণ — এই নীতিগত পালাবদলটা হল কীভাবে?

স্বাধীনতার পর থেকেই আমাদের জাতীয় আইডেন্টিটি ছিল সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে। এই আধুনিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের সেই রূপকল্পের অগ্রদূত ছিলেন নেহরুর মতো নেতারা।

ধর্মনিরপেক্ষ শব্দটা আলাদা করে সংবিধানের প্রিঅ্যাম্বলে জোড়া হলেও সংবিধানে সেই এসেন্স সংবিধানপ্রণেতারা শুরু থেকেই রেখেছিলেন — এই কথাটা সুপ্রীম কোর্টও ঘোষণা করেছিল এই শব্দটা নিয়ে হিন্দুত্ববাদীরা মামলা করার সময়ে। বিজেপি যে ভদ্রলোককে তাদের মহান নেতা বলে মানে, সেই অটল বিহারী বাজপায়ীও জোরের সঙ্গেই এই ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই ঘোষণা করেছিলেন। আজকে ময়ূরকুসুমের মত সাংবাদিকরা চ্যানেলে চিৎকার করে সেকুলারদের দেশছাড়া করতে চাইলেও এই ইতিহাসটা বদলানোর নয়।

হিন্দুত্ব আন্দোলন তার জন্মলগ্ন থেকেই এই ধারণাকে আমূল চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এসেছে। মূল বক্তব্য (আগে বহুবার লেখা) হল ভারত একটা হিন্দুরাষ্ট্র, এমন একটা সিভিলাইজেশনাল এন্টিটি যার আইডেন্টিটি আদিকাল থেকে একইরকমভাবে থেকে যাওয়া হিন্দু সংস্কৃতি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এই আইডিয়াটা এক বড় সংখ্যক মানুষের ওপরে প্রভাব ফেলেছিল — স্পেশ্যালি তাদের ওপর, যারা গণতন্ত্র, বহুত্ত্ববাদ ইত্যাদিকে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি বলে মনে করত, এবং নিজেদের বিচ্ছিন্ন ও প্রান্তিক হিসেবে দেখত।

আশির দশকের একাধিক ঝড়ে মোড় ঘুরতে শুরু করে ভারতের এই সেকুলার আইডেন্টিটির। বিশেষ করে ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৮ — এই তিন বছরের মধ্যে। সঙ্ঘ পরিবার দুটো ইভেন্টকে সামনে রেখে মোবিলাইজ করতে শুরু করে৷ দেশ জুড়ে একটা অভাবনীয় সেন্টিমেন্টের ঢেউ তৈরী হয়।

(১) শাহ বানু মামলা (১৯৮৫): সুপ্রীম কোর্ট একজন মুসলমান মহিলার ভরণপোষণের রায় দেয়, বিরোধিতা করে মুসলমান ধর্মীয় নেতারা। রাজীব গান্ধীর কংগ্রেস সরকার, ১৯৮৪ সালে নজিরবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে ক্ষমতায় আসার পরেও, ধর্মীয় নেতাদের তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে সংসদে আইন পাশ করে সেই রায় বাতিল করে। রেট্রোসপেক্টে বলা যায় এটা একটা বড় ভুল ছিল। রাইটউইং হিন্দু রাজনৈতিক শক্তি এই ঘটনাকে লুফে নেয় "জাতীয়" (পড়ুন হিন্দু) স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সংখ্যালঘু তোষণের উদাহরণ হিসেবে।

(২) রামানন্দ সাগরের রামায়ণ (১৯৮৭-৮৮): দূরদর্শনে প্রচারিত এই সিরিয়াল মোটামুটি ন্যাশনাল ইভেন্টে পরিণত হয়েছিল; সাধারণ মানুষ স্নান করে, টিভিতে মালা পরিয়ে, আশেপাশের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে একসঙ্গে বসে দেখত এই মহাকাব্যের সিরিয়ালাইজেশন। মনোরঞ্জনের জগতে প্রথমবার কোনো হিন্দু মহাকাব্যের এরকম জাঁকজমকওয়ালা ভার্সন একই সঙ্গে কোটি কোটি ঘরে পৌঁছেছিল। তৈরী হয়েছিল এক শেয়ার্ড ইমোশন, আর একটা ধর্মীয় ন্যাশনাল আইডেন্টিটি। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সফট-পাওয়ার ক্যাম্পেন, যেখান থেকে সেই "কমন সেন্স" পিরিয়ডের শুরু।

এই আইডেন্টিটি যখন তৈরী হচ্ছে, তখন একের পর এক ক্রাইসিসের সময়ে সমাজের বিভিন্ন ফাটলের সুযোগ নিয়েছিল সঙ্ঘ পরিবার।

প্রথমেই আসবে কংগ্রেসের রাজনৈতিক ব্যর্থতার কথা। স্বাধীনতার সময় থেকে এই জাতীয় কংগ্রেসকে সামনে রেখেই একটা ইনক্লুসিভ জাতীয়তাবাদী চেতনা তৈরী হয়েছিল। আশির দশকের শেষের দিকে সেই কংগ্রেস ডিসক্রেডিট হতে শুরু করে। লাগামছাড়া দুর্নীতি (বোফর্স উদাহরণ), গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, আরো নানান দুর্বলতার ফলে জাতীয় স্তরে কংগ্রেস বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় অর্জিত ভারতীয়ত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণের মরাল অথরিটি বেরিয়ে যায় কংগ্রেসের হাত থেকে। এই সময়ে পরপর কিছু ঘটনা ঘটে সঙ্ঘ পরিবারের সক্রিয়তায়। রামমন্দির আন্দোলন জোর কদমে শুরু হয়, রাজীব গান্ধী সরকার শাহ বানু মামলার পরে সংখ্যাগুরু হিন্দুকে তুষ্ট করতে বাবরি মসজিদের তালা খুলে দেয়। নব্বইয়ের শুরুতেই হয় আদবাণীর রথযাত্রা, এবং সঙ্গে ঘটে যাওয়া দাঙ্গা। রামমন্দির আন্দোলনের ভায়োলেন্ট ক্লাইম্যাক্স ঘটে যায় ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের মধ্যে দিয়ে। হিন্দু জনগোষ্ঠীর জমে থাকা রাগকে কাজে লাগিয়ে বিজেপি উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে ক্ষমতায় আসতে শুরু করে।

এর পাশাপাশি ১৯৯১ সালে গ্যাটের হাত ধরে লিবারেলাইজেশনের সময় আসে অর্থনৈতিক ভূমিকম্প। স্বাধীনতার পরবর্তী খানিক সোভিয়েত ধাঁচে গড়া অর্থনৈতিক পরিকাঠামো ভাঙা শুরু হয়। আমরা যতই দেশীয় অগ্রগতির কথা বলি না কেন, নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তের দুর্দশার শেকড় লম্বা হতে শুরু করে এই সময়েই। আর এই ক্যাওসের মধ্যে সঙ্ঘ পরিবার দেশীয় আইডেন্টিটি রক্ষা করার কথা বলতে শুরু করে দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্বদেশী ধাঁচের অর্থনীতির ছবি এঁকে। আজকের বিজেপি সরকার দেশীয় ক্রনি ক্যাপিটালিস্টদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত থাকলেও নব্বইয়ের দশকে সঙ্ঘের দাবী ছিল অন্যরকম।

এবং ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা। নরেন্দ্র মোদীর তত্ত্বাবধানে ঘটে যাওয়া গণহত্যা। বলা ভাল এথনিক ক্লেনসিং। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বাজপায়ী মোদীকে রাজধর্ম পালন করার কথা বললেও মোদীর গুজরাট বিজেপি এর পর প্রকাশ্যে ইসলাম বিরোধী রাজনীতিতে ভর করে ভোটে জিতে আসে। প্রমাণ হয়ে যায় যে বর্তমান ভারতে উগ্র সাম্প্রদায়িক স্ট্যান্ড রাজনৈতিকভাবে কোনো লায়াবিলিটি তো নয়ই, বরং নির্বাচনী অ্যাসেট, এবং হিন্দুত্বের নরমন্থী মুখও (বাজপায়ী) সাম্প্রদায়িক হিংসার সামনে অচল। ২০১৪ সালে জাতীয় মঞ্চে মোদীর আবির্ভাব বুঝিয়ে দিয়েছিল যে মোদীর হিন্দুত্ব যে কোনো মূল্যে জয়ী হতে চায়।

আজকের অস্থিরতার অনেক কিছুরই শেকড় রয়েছে সেই আশির দশক থেকে নতুন শতাব্দীর শুরু অবধি। নেলি গণহত্যা; কাশ্মীর; খলিস্তান; ১৯৮৪ সালের শিখ দাঙ্গা; আসাম এনআরসি; ২০০৩ সালে নাগরিকত্ব আইন বদলে জাস সোলি থেকে জাস স্যাঙ্গুইনির পথে হাঁটতে শুরু করা; লিবারেলাইজেশনের পথে একের পর এক পদক্ষেপ; জাতিগত আইডেন্টিটি পলিটিক্সের উত্থান, এবং দলিত রাজনীতির এজেন্সি কিছু বিশেষ পরিবারের কুক্ষিগত হয়ে যাওয়া...এরকম বেশ কিছু ঘটনা যার মধ্যে দিয়ে হিন্দুত্বের কমন সেন্স পাকাপোক্ত হতে শুরু করে।

২০১০ সালের আশেপাশে, ফিজিক্সের ভাষায় যাকে বলে ক্রিটিকাল মাস — সেইখানে পৌঁছে যাই আমরা। দুর্নীতি, আরো নানাবিধ অসন্তোষকে হাতিয়ার করে ইন্ডিয়া আগেইন্সট করাপশন মুভমেন্ট রাজনৈতিক ফোকাস টেনে নেয়। আবারও আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ওই সময়ের দিকে ফিরে তাকিয়ে আমরা বলতে পারি যে আইএসি সঙ্ঘ পরিবারেরই চাল ছিল, দুর্নীতির বেশ কিছু কাহিনীও সম্ভবত ছিল মনগড়া। কিন্তু সেই সময়ে মানুষ "আচ্ছে দিন"-এর স্বপ্নে বিশ্বাস করেছিল, কারণ দেশজুড়ে সেই কনসেন্ট তৈরী করতে সক্ষম হয়েছিল বিজেপি আর সঙ্ঘ পরিবার। ২০১৪ সালের ইলেকশন মোটামুটি ফোরগন কনক্লুজন ছিল বলা যায়। হিন্দুত্বও ততদিনে প্রান্তিক আইডিয়ার জায়গা পেরিয়ে জনসংখ্যার বড় অংশের "কমন সেন্স" হয়ে উঠেছিল। সঙ্ঘ পরিবারের সাংগঠনিক কাঠামো পুরোপুরি তৈরী ছিল এই কমন সেন্সকে ব্যবহার করে ভারতকে আজকের জায়গায় নিয়ে আসার।

এর পরের ঘটনা আমরা সবাই জানি।

হিন্দুত্বের আধিপত্যবাদ...

প্রায় একশো বছর আগে, মুসোলিনীর আমলে ইটালিতে জেলে বন্দী থাকাকালীন গ্রামশি বেশ কিছু তাত্ত্বিক কথাবার্তা লিখে রেখেছিলেন। তার মধ্যে আধিপত্য বা হেজিমনি নিয়েও বেশ কিছু আলোচনা ছিল। এই ২০২৬ সালে বসে, ভাবলে অবাক লাগে কীভাবে গ্রামশির সেই তত্ত্ব মোদীর ভারত সম্পর্কে একদম খাপে খাপে বসে যায়...যেন ভদ্রলোক সেই ১৯২৬ সালে বসেই আজকের ভারতকে দেখতে পেয়েছিলেন...

হিন্দুত্ববাদ সিরিজটার কন্টিন্যুয়েশন: গ্রামশির আধিপত্যবাদের তত্ত্ব। 

এখানে একটা ডিসক্লেমার দিয়ে রাখি। আমার চেয়ে অনেক জ্ঞানীগুণী বিদ্বান লোকেরা এই নিয়ে অজস্র লেখালেখি করেছেন। আমি এই সিরিজটায় শুধুমাত্র সেগুলোকে আরো অ্যাক্সেসিবল করার চেষ্টা করছি। সহজ ভাষায়। বোর হলে স্ক্রোল করে বেরিয়ে যাবেন।

সাধারণত: আমরা বেশিরভাগ মানুষই মনে করি ক্ষমতা আসে বন্দুকের নল থেকে, বা পুলিশের উর্দি থেকে, বা আইন আদালত বিচারব্যবস্থার হাত ধরে। গ্রামশি বলেন এটা ক্ষমতার অর্ধেক মাত্র। শাসক গোষ্ঠীর হাতে এই সব শক্তি ছাড়াও থাকে সাধারণ মানুষের কনসেন্ট। একটা ছোট্ট শাসকগোষ্ঠী যখন তাদের "ওয়ার্ল্ডভিউ" বা পৃথিবী সম্পর্কে তাদের ধারণা-কে গোটা নাগরিক সমাজের "কমন সেন্স" হিসেবে খাড়া করে ফেলতে পারে, তখনই সেটা তৈরী করে পরিপূর্ণ আধিপত্য।

ভেবে দেখুন। গরীব হিন্দু নোট বাতিলের সময় ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যাঙ্কে লাইন দেওয়ার পরেও কেন আম্বানি-আদানিদের চৌকিদারি করা এই সরকারটাকে সমর্থন করে? কেন দলিত আর আদিবাসীরা, লাগাতার নানারকম জাতিবিদ্বেষের মুখে পড়েও, জয় শ্রীরাম বলে বিজেপির মিছিলে যায়? কেন একজন সাধারণ দিন-আনি-দিন-খাই অটোচালকও পোশাক বা ফেজটুপির ভিত্তিকে কাউকে দেশদ্রোহী বলে দাগিয়ে দেয়? এদের নাকের ডগায় কেউ বন্দুক ধরেছিল? না তো! তা সত্ত্ব্বেও এই ঘটনাগুলো ঘটে। শম্ভুলাল রেগর একজন অতি সাধারণ গরীব পরিযায়ী শ্রমিককে লাভ জিহাদের নাম করে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেয়। আখলাক আহমদকে একদল একই রকমের গরীব লোক টেনে বাড়ি থেকে বের করে এনে পিটিয়ে মেরে ফেলে। খুঁজে দেখলে গত দশ বছরে লিঞ্চিং এর ঘটনা গুণে শেষ করা যাবে না। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৫ থেকে ২০২৩ এর মধ্যে শতাধিক লিঞ্চিং-এর ঘটনা ঘটেছে — অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিকার মুসলমান বা দলিত। এবং এই ঘটনাগুলোকে কনডেম করা তো দূরের কথা, অজস্র লোক এগুলোকে নানাভাবে সমর্থন করে এগুলোকে নর্মালাইজ করেছে।

কেন? কারণ এই সবই পাব্লিকের "কমন সেন্স" হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্কুলের বই থেকে, হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড থেকে, সারাদিন ধরে টিভিতে চলা হাই-পিচ ডিবেট থেকে, বিভিন্ন আখড়ার মহন্তদের ফরমান থেকে...

হেজিমনি মানে এমন নয় যে ক্ষমতাশালীরা আপনাকে রোজ মেরেধরে পথে এনে ফেলছে। বরং আপনার মগজের দখল ওরা ইতিমধ্যেই নিয়ে ফেলেছে। আপনার মাথার মধ্যে ওরা অলরেডি জয়ী।

গ্রামশি দুরকম যুদ্ধের কথা বলেছিলেন। এক, ওয়ার অফ ম্যানুভার, বা কৌশলের যুদ্ধ। আর দুই, ওয়ার অফ পোজিশন — অবস্থানের যুদ্ধ। প্রথমটা টিপিকালি সরাসরি লড়াই — স্ট্রাইক, লাগাতার হরতাল, ভোটের সময় কোনো একদিকে ঢলে পড়া সেন্টিমেন্টের ঢেউ। আর দ্বিতীয়টা লংটার্ম, খানিকটা ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত — ধৈর্য্যের পরীক্ষা। সময় নিয়ে আস্তে আস্তে স্কুলকলেজ, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক গ্রুপ, ধর্মীয় পরিসর, বিকেলে পার্কে হাঁটতে যাওয়া "উই আর অ্যাবভ সিক্সটি" গ্রুপ বা সকালের লাফিং ক্লাব, আমার আপনার রোজকার নানান অভ্যাস — সবকিছুকে নিজেদের দখলে আনা।

সঙ্ঘ পরিবার একশো বছর ধরে এই অবস্থানের যুদ্ধ চালিয়ে গেছে। শাখায় হিন্দু সংস্কৃতির গর্ব। স্কুলে বদলে যাওয়া ইতিহাস। অসংখ্য "অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল" — প্রচারক, প্রথাগতভাবে উচ্চশিক্ষিত না হলেও যারা হিন্দু সেন্টিমেন্টকে খুঁচিয়ে তুলতে পারে। মন্দির ট্রাস্টের ম্যানেজার; আখড়ার মহন্ত; শহরে গ্রামে প্রতিনিয়ত যারা হিন্দুত্বকে "কমন সেন্স" বলে চালিয়ে চলে। এর পাশাপাশি, গত দুই দশকে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও এই যুদ্ধ ছড়িয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপে ফেক নিউজ ভাইরাল করার ডিজিটাল সৈনিক; লাভ জিহাদ আর ঘর ওয়াপসির মত ন্যারেটিভ,  চেহারা পেশা পোশাক নিয়ে মিসোজিনি ছড়িয়ে দাঁত নখ বের করা পুরুষতন্ত্রকে জিইয়ে রাখা সমাজমাধ্যম আর মিডিয়াতে বাণী দেওয়া সমাজচিন্তক; সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার যারা অনায়াসে বলে সেকুলারিজম মানে অ্যান্টি হিন্দু; ডীপ ফেক ক্রিয়েটর; সুদর্শন নিউজ বা রিপাবলিক টিভির মত অগুণতি টিভি চ্যানেলে তারস্বরে "হিন্দু খতরে মে হ্যায়" ন্যারেটিভ ছড়ানো সাংবাদিক; এসআইআরের আগে বাংলা চ্যানেলে বসে "কোটি কোটি বাংলাদেশী রোহিঙ্গা ভারতে ঢুকে পড়েছে" বলা বুদ্ধিজীবী; সরকারকে প্রশ্ন করা ছাত্র যুবক বা অন্য সাধারণ মানুষদের আরশোলা বলে দেওয়া বিচারক; কনসেন্ট আজ তৈরী হয় সেকেন্ডের মধ্যে।

আর এই যুদ্ধের পাশাপাশি এসেছে ওয়ার অফ ম্যানুভার — কৌশলগত আক্রমণ: ভোটে জিতে বুলডোজার অ্যাকশন, এসআইআর, আর্টিকল ৩৭০ — এই ম্যানুভারের প্রত্যেকটাই জনসমর্থন পেয়েছে, কারণ এর জমি তৈরী হয়েছে এতদিনের অবস্থানের যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। বিরোধীদের বিরাট বড় মিছিলে বিজেপির আর কিস্যু এসে যায় না। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে কৃষক আন্দোলন চলার পরেও বিজেপি বিধানসভা ভোটে জেতে। নোটবাতিলের সময় বা কোভিডের সময় সাধারণ মানুষের চরম হেনস্থার পরেও একই ঘটনা ঘটে...

কারণ, জমি তৈরী হয়ে গেছে। ভারতের আশি শতাংশ হিন্দু, বিশ্বাস করে নিয়েছে যে ভারতের সাংস্কৃতিক শেকড় রয়েছে এক ও একমাত্র হিন্দু চেতনার মধ্যেই।

আর আছে ক্রনি ক্যাপিটালিজম — শাসক জোটের অন্য অংশটা।

গ্রামশি ক্ষমতায় আসীন এই জোটের নাম দিয়েছেন "ঐতিহাসিক জোট" (historic bloc) — ভারতে সেটা তৈরী হয়েছে হিন্দুত্ববাদ আর ক্রনি ক্যাপিটালিজমের মধ্যে। যারা একে অপরকে শক্তি যোগায়।

আম্বানি, আদানিরা হয়ে ওঠে জাতীয়তাবাদী নেশন-বিল্ডার। হিন্দু রাষ্ট্র আর প্রাচীন ভারতের গ্লোরি ফিরিয়ে আনার নৈতিক ছাতার নীচে তাদের মুনাফা লোটার কারিকুরি চাপা পড়ে। হিন্দুত্ববাদী শাসক গোষ্ঠী পায় ফান্ডিং: ইলেক্টোরাল বন্ড, বিজ্ঞাপন, মন্দির করিডোরের জন্যে জমি — একই সাথে যেটা রিয়েল এস্টেটও বটে। আর গরীব খেটে খাওয়া মানুষ, মুটে মজুর, পরিযায়ী শ্রমিকদের বোঝানো হয় যে গরীবের পকেট কেটে সুইস ব্যাঙ্কের লকার ভরানো পুঁজিপতি বা পাব্লিক ব্যাঙ্কের লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা চুরি করে দেশ ছেড়ে পালানো বেওসাদার বা গলা অবধি দুর্নীতিতে ডুবে থেকে ধর্ম নিয়ে ব্যবসা করা রাজনীতিকরা নয়, তাদের সমস্ত সমস্যার মূলে ওই "ওরা" — মুসলমান বা ক্রীশ্চানরা। কারণ ওরা সবাই জেহাদি, ঘুসপেটিয়া ইত্যাদি।

শ্রেণীর ক্ষোভকে চাপা দেওয়া হয় সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভয় দেখিয়ে।

আম্বানি বা আদানির মত পুঁজির মালিকেরা নিজেদের 'অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল' তৈরী করে — ইকোনমিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক, কর্পোরেট মিডিয়া চ্যানেল, ব্যবসাবান্ধব আইনজীবী, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় "ন্যাশনালিস্ট" ইনফ্লুয়েন্সার। যখন দেখবেন কোনো টিভি চ্যানেল সরকারের নীতিকে প্রশ্ন না করে সরকারের পোষা অর্থনীতিবিদকে টকটাইম দিচ্ছে, তখন জানবেন যে কর্পোরেট স্বার্থ আর জাতীয়তাবাদ একই সুতোয় গাঁথা। যখন দেখবেন যে অজান্তে আপনিও কখন ভাবতে শুরু করেছেন আম্বানি-আদানিদের বিকল্প নেই, ওরা তো পরিশ্রম করেই অত উঁচুতে উঠেছে, তখন বুঝবেন আপনিও এই কনসেন্ট তৈরীর ফাঁদে পড়ে গেছেন।

এই হল সফিস্টিকেশনের চরম পর্যায়ে থাকা আধিপত্যবাদ বা হেজিমনি। রাষ্ট্রক্ষমতা তো ব্যাকগ্রাউন্ডে রয়েছেই — পুলিশ, ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন, আদালত, বুলডোজার। মাঝেমধ্যে সামনেও চলে আসে — এনকাউন্টার, প্রিভেন্টিভ ডিটেনশন, ইউএপিএ, ইন্টারনেট শাটডাউন, নির্বাচনের সময়ে কেন্দ্রীয় বাহিনী দিয়ে ঘিরে ফেলা। কিন্তু আসল ম্যাজিক লুকিয়ে রয়েছে আম আদমির কনসেন্টে; লক্ষ মানুষের স্বেচ্ছায় নিজেদের সরকারের দাসানুদাস মেনে নেওয়ার মধ্যে; "সরকার মাই বাপ" মানসিকতায়। কারণ একশো বছর ধরে জমি তৈরী করা হয়েছে: দেশ মানে রাষ্ট্র, সরকার; আর দেশকে ভালোবাসা মানে সমস্ত ক্ষুধার সূচক, বাচ্চা আর মেয়েদের স্বাস্থ্যের সূচক, প্রেস ফ্রীডম ইন্ডেক্স, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির দাবী, সব ভুলে গিয়ে গায়ে মাথায় মুখে জাতীয়তাবাদের রঙ মেখে তারস্বরে বন্দে মাতরম চিৎকার। রাষ্ট্রক্ষমতা আর কনসেন্টের মিশেলে তৈরী হওয়া coercive-hegemonic hybrid...

তবে কোনো হেজিমনিই চিরকালীন নয়, আশার কথা এইটুকুই। গ্রামশি লিখেছিলেন যে শাসক ততদিনই আধিপত্য বজায় রাখতে পারে যতদিন সে জনতার কিছু চাহিদা পূরণ করতে পারে। হিন্দুত্ব সেটাই করে: বিনামূল্যে রেশন, প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা, দলিত/আদিবাসীদের লার্জার হিন্দু ফোল্ডে টেনে নেওয়ার অ্যাসপিরেশন। সঙ্গে "ওদের" ঢিট করার জন্যে বুলডোজার; মব লিঞ্চিং-এ ছাড়; অনলাইন ও অফলাইনে মিসোজিনির ঢালাও পারমিশন; হেজিমনি বজায় রাখতে সাহায্য করার ইন্সেন্টিভ।

কিন্তু ফাটল ঠিকই দেখা দেয়। বেকারির জ্বালা, জিনিসপত্রের দাম, শিক্ষা স্বাস্থ্যের সংকট, ডুবতে বসা অর্থনীতি, হিন্দুত্বের মধ্যে জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন প্রদেশে আঞ্চলিক প্রতিরোধ...

বিপ্লবের মুহূর্ত আসে যখন দেশজোড়া কনসেন্টে ফাটল ধরে; যখন মানুষ বিশ্বাস করা বন্ধ করে দেয়। তখন রাষ্ট্রকে প্রকাশ্য শক্তির আশ্রয় নিতে হয়।

সেই সময় এখনো আসেনি। কিন্তু আসবে। সেই সময়কে তৈরী করা যায় — কাউন্টার হেজিমনির মাধ্যমে। সহজ নয়। খন্ড বিখন্ড চিন্তাভাবনা; আইডেন্টিটির লড়াই; স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর মত মিডিয়ার অভাব; অর্থের অভাব। তবুও সময়কে তৈরী করা সম্ভব।

কীভাবে? লিখব।

রাখিগড়ি — বাস্তব বনাম বিজেপির গুল

শমীক ভশ্চাজ্জির একটা বক্তব্য নিয়ে অনেকেই লিখেছে দেখেছি। রাখীগড়ির ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি অমুক তমুক অনেক কিছুকে মিথ্যে প্রমাণ করে দিয়েছে ইত্যাদি ইউজুয়াল আগমার্ক হিন্দুত্ব হাবিজাবি। আমি একটা সহজবোধ্য প্রাইমার দেওয়ার চেষ্টা করি — কেন শমীক ভশ্চাজ্জি এই দাবীটি করতে গেল। আরো একটা উদ্দেশ্য আছে। এর আগের বার এই ভশ্চাজ্জির আরো একটা বালবাজারি নিয়ে ফেসবুকে লেখার পর জনৈক জেলখাটা "প্রিটেন্ডার" সাংবাদিক আমাকে নিয়ে আস্ত ইউটিউব এপিসোড করে ফেলেছিলেন। আশা করছি এইবারেও তিনি আরো একটা ইউটিউব এপিসোড নামাবেন। একে তো আমি সেলিব্রিটি হয়ে যাব, আর দ্বিতীয়ত: এই বালবাজারিটার ব্যাপারে যদি দুটো লোকও খোঁজ করে সত্যিটা জানতে পারে, তাতেও বড় লাভ।
 
সো, হিয়ার গোজ...
 
কী বলেছে শমীক ভশ্চাজ্জি? না, রাখীগড়ির প্রাচীন মানুষের ডিএনএ অ্যানালিসিস নাকি প্রমাণ করে দিয়েছে যে Aryan Invasion Theory (AIT) পুরোপুরি মিথ্যে, বামপন্থী ঐতিহাসিকরা এতদিন আমাদের সব ভুল শিখিয়েছেন।
 
শুরুতেই শমীক ভশ্চাজ্জি যে মিথ্যেটা বলেছে (মিথ্যেই বললাম, কারণ এরা যা বলে জেনেশুনেই বলে) সেটা হল এই AIT নিয়ে। সেই ১৯৫০-৬০ নাগাদই ইনভেশন থিওরিকে ক্রিটিক করেছেন ডিডি কোশাম্বি, রোমিলা থাপার বা আরএস শর্মার মত বামপন্থী ইতিহাসবিদরাই, নানান নতুন পুরাতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভাষাগত তথ্যের ভিত্তিতে। ষাটের দশক থেকেই বেশিরভাগ স্কলারদের মধ্যে যেটা চালু থিওরি সেটাকে বলা হয় Aryan Migration Theory (AMT)। সেখানে মাইগ্রেশন বা অভিবাসনের একাধিক ঢেউয়ের কথা বলা হয়। এই থিওরিটা সবার আগে একটু খোলসা করে বলা দরকার।
 
একেবারে প্রথমে আসে ইউরেশিয়ান স্তেপ অঞ্চলের (আধুনিক ইউক্রেন, দক্ষিণ পশ্চিম রাশিয়া, পশ্চিম কাজাখস্তান ইত্যাদি অঞ্চল) পশুপালক মানুষগুলোর কথা। এরাই প্রথম ঘোড়ার ওপর দখল আনে, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করতে শুরু করে, আর একদম গোড়ার প্রোটো-ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায় কথাবার্তা বলতে শুরু করে। তাদের অরিজিনাল বাসভূমি থেকে তারা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে — কারণ বংশবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই তাদের নতুন এলাকার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, বসবাসের জন্যে, পশুপালনের জন্যে। এর মানে এই নয় যে এরা সরাসরি ভারতীয় উপমহাদেশে চলে এসেছিল। মাইগ্রেশন থিওরি বলে যে এই পশুপালকরা ধীরে ধীরে মিশতে শুরু করে  একটা অন্তর্বর্তী এলাকার অধিবাসীদের সঙ্গে - প্রত্নতাত্ত্বিক ভাষায় এই স্টেজিং গ্রাউন্ডের নাম Bactria-Margiana Archaeological Complex (BMAC) - আধুনিক কালের যে এলাকাগুলোকে আমরা চিনি উত্তর আফগানিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান বলে। এবং এইটা এক দুই দিন বা কয়েক মাসে বসতির ব্যাপারও নয়। স্তেপ অঞ্চলের মানুষরা এখানে যাওয়াআসা শুরু করে, এখানকার অরিজিনাল অধিবাসীদের সঙ্গে মেশে, তাদের বংশবৃদ্ধি হয় - প্রায় কয়েক শতাব্দী ধরে। এবং তারপর, এই অধিবাসীদের মধ্যে থেকে একটা ইন্দো-ইরানিয়ান শাখা আলাদা হয়ে যায়; এক দল পশ্চিমে ইরানের দিকে চলে যায়, আর অন্য দলটা দক্ষিণপূর্ব দিকে ভারতীয় উপমহাদেশে এসে ঢোকে। সময়কাল হিসেবে দেখলে পুরো ঘটনাটা খানিক এরকমঃ

খ্রীষ্টপূর্ব [২১০০-১৮০০] সিন্তাশতা সংস্কৃতি (স্তেপ অঞ্চলে ঘোড়ায় টানা গাড়ির শুরু হয় এদের হাতে) 

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [২০০০-১৫০০] স্তেপ এলাকা ক্রমাগত শুকনো হতে শুরু করে পরিবেশগত কারণে, ঘাসজমি কমতে থাকে। ফলে আরো ভালো জমির খোঁজে এই এলাকার পশুপালকের দল ভারতীয় উপমহাদেশের কাছাকাছি এসে পৌঁছয় - ব্যাক্ট্রিয়া-মারজিয়ানা অঞ্চলে, মানে আফগানিস্তান, তুর্কিস্তান ইত্যাদি এলাকায়। সিন্ধু সভ্যতা সেই সময়ে ক্রমশঃ ক্ষয়ে আসতে শুরু করেছে, সেও মূলতঃ আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি পাল্টে যাওয়ার জন্যেই।

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [১৫০০-১২০০] হিন্দুকুশ পেরিয়ে ইন্দো-ইরানিয়ান অভিবাসীদের প্রথম ঢেউ এসে পৌঁছয় ভারতের উত্তরপশ্চিম অঞ্চলে, বসতি স্থাপন করে সপ্তসিন্ধু অঞ্চলে (আধুনিক পাঞ্জাব এবং পাকিস্তানের অনেকটা জায়গা নিয়ে)। এই সময়টাকেই বলা হয় প্রারম্ভিক-বৈদিক যুগ - যে সময়ে ঋগ্বেদের জন্ম।

⬇️

খ্রীষ্টপূর্ব [১০০০-৬০০] লোহার তৈরী যন্ত্রপাতি আর অস্ত্রশস্ত্র হাতে এই সপ্তসিন্ধু অঞ্চলের পরের দিকের প্রজন্মের মানুষেরা জঙ্গল কেটে এগিয়ে যায় গাঙ্গেয় সমভূমির দিকে। যাযাবর পশুপালক থেকে তারা ক্রমশঃ চাষবাষের দিকে সরতে শুরু করে, তৈরী হতে থাকে কৃষিভিত্তিক রাজ্য। 

খুব ছোট করে এই হল আর্য্যদের অভিবাসন তত্ত্ব, বা এরিয়ান মাইগ্রেশন থিওরি।

এই ভারতীয় উপমহাদেশের মানুষ কোত্থেকে এলো তাই নিয়ে থিওরি, পাল্টা থিওরির লড়াই চলেছে কয়েক দশক ধরেই। ভাষাবিজ্ঞান বা লিঙ্গুইস্টিক্স, প্রত্নতত্ত্ব আর রাজনীতির তীব্র বিতর্ক। ইনভেশন তত্ত্বকে সরিয়ে মাইগ্রেশন থিওরির পত্তন হয় লিঙ্গুইস্টিক্স এবং প্রত্নতত্ত্বের ওপর নির্ভর করেই। তা সত্ত্বেও, বিতর্ক থামেনি। আর্য্যদের উৎপত্তি ভারতেই, এখান থেকেই তারা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছিল, সংস্কৃতের জন্মও ভারতেই, এবং বাকি সমস্ত ভাষাই সংস্কৃতের "সন্তান" – হিন্দুত্ববাদী রাইটউইং ন্যাশনালিজমের মূল পিলার দাঁড়িয়ে রয়েছে এই আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের তত্ত্বের ওপরেই, কারণ এতে ভারতকে এবং ভারতীয় সংস্কৃতিকে একটা টাইমলেস এন্টিটি বলে প্রোমোট করা যায়। খেয়াল করে দেখবেন - হিন্দুত্বের শুরু কিন্তু এই জায়গা থেকেই - যে ভারতীয় সভ্যতা একদমই ইন্ডিজেনাস, অজর অমর অক্ষয়, টাইম ইমমেমোরিয়াল থেকে এই সভ্যতা একইভাবে টিঁকে রয়েছে ইত্যাদি প্রভৃতি। অন্য অঞ্চল থেকে আসা মানুষের সঙ্গে মিশ্রণের ফলেই যে এই উপমহাদেশের আদি সভ্যতা এবং সংস্কৃতির জন্ম, এইটা ফাঁস হয়ে গেলে হিন্দুত্ববাদের পিলার ওই টাইমলেস এজলেস গ্লোরিয়াস ভারতীয় নেশনের মিথটা ভেঙে চৌচির হয়ে যায়। ইতিহাসে, এর আগে কে নিজেদের এরকম অরিজিনাল আর্য্য বলে দাবী করে জাতিগত সংমিশ্রণকে কাঠগড়ায় তুলে মানুষে মানুষে বিভেদের সৃষ্টি করেছিল? হাইস্কুল ইতিহাসের বইয়ে ১৯২০-১৯৪৫, এই বিশ পঁচিশ বছরের বিশ্বের ইতিহাসটায় একবার চোখ বুলিয়ে নেবেন, মনে পড়ে যাবে।   

এনিওয়ে, টপিকে ফিরি। রাখীগড়ি অবধি যাওয়ার আগে এই প্রাচীন মানুষের জেনেটিক প্রোফাইল সংক্রান্ত আইডিয়াটা একটু বলে নেওয়া দরকার। 

গত কয়েক বছরে, একটা নতুন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে মাইগ্রেশন নিয়ে এই বিতর্কের অনেকটাই অবসান ঘটেছে বলে মনে করা হয়। প্রাচীন ডিএনএ অ্যানালিসিসের ওপর ভিত্তি করে তৈরী এই পদ্ধতির জনক হার্ভার্ডের এক গবেষক, ডেভিড রাইখ। হাজার হাজার বছর আগের মানুষের কঙ্কাল বা হাড়গোর থেকে ডিএনএ বের করে তার সিকোয়েন্সিং করার ব্যবস্থা করেছিলেন রাইখ। এর আগে অবধি, ডিএনএ বের করা যেত শুধু জ্যান্ত মানুষের শরীর থেকেই, এবং বৈজ্ঞানিকেরা সেখান থেকে তার পূর্বপুরুষদের সম্পর্কে একটা আন্দাজ তৈরী করার চেষ্টা করতেন। এতে বিতর্ক তো মিটতোই না, বরং বেড়ে যেত কয়েক গুণ। রাইখ এবং তাঁর দলের গবেষকেরা সারা পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে পাওয়া প্রাচীন মানুষের দেহাবশেষ থেকে ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে তাদের জিনগত প্রোফাইল তৈরী করতে পেরেছিলেন। সেই জেনেটিক প্রোফাইল স্টাডি করেই তাঁরা বলেন যে আধুনিক ভারতের প্রায় সমস্ত বাসিন্দাই মূলতঃ দুটো প্রাচীন জনগোষ্ঠীর এক অনন্য জেনেটিক মিশ্রণঃ Ancestral North Indians (ANI), যাদের জেনেটিক সম্পর্ক রয়েছে ইউরোপীয়, মধ্য এশীয় আর নিকট প্রাচ্য বা নিয়ার ইস্টের মানুষদের সঙ্গে; এবং  Ancestral South Indians (ASI) - যারা এই উপমহাদেশের স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে এখানকার আদি অধিবাসী হান্টার-গ্যাদারারদের (যে মানুষেরা শিকার করে বা বন্য ফল ইত্যাদি সংগ্রহ করে জীবনধারণ করত) নিবিড় সম্পর্ক ছিল।

খুব স্বাভাবিকভাবেই এখান থেকে একটা বড় প্রশ্ন উঠে আসে - আর সেটা সিন্ধু সভ্যতা বা হরপ্পা মহেঞ্জোদারো সংক্রান্ত। সিন্ধু সভ্যতা যে যথেষ্ট উন্নত ছিল তাই নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। ভারতের মধ্যে লোথাল বা ধোলাভিরার প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটগুলোতে, অথবা কপালে থাকলে পাকিস্তানের অন্তর্গত সিন্ধু সভ্যতার বাকি সাইটগুলোতে গেলে চমকে যাবেন। প্রশ্নটা যেটা উঠে আসে, সেটা হল হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর অধিবাসীরা এই জেনেটিক ধাঁধার মধ্যে ঠিক কোথায় ফিট করে? আর ঠিক এইটাই হল সেই "পয়েন্ট অফ কন্টেনশন" - রাজনীতি আর প্রত্নতত্ত্বের - যার কথা আগে লিখেছিলাম। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আউট-অফ-ইন্ডিয়া তত্ত্বের প্রবর্তকদের বক্তব্য হল সিন্ধু সভ্যতার মানুষরাই আদি বৈদিক আর্য্য, ঋগ্বেদ রচনা হয়েছিল এই সভ্যতার মধ্যেই, এবং এখান থেকেই ভারতীয় সংস্কৃতি দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল। যদি টাইমলাইন হিসেব করেন, তাহলে এই থিওরি অনুযায়ী ভারতীয় সংস্কৃতিকে প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০ সাল অবধি ঠেলে দেওয়া যায় (খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০০-৩৩০০ সাল - এই সময়টাকে ধরা হয় প্রাক্‌-হরপ্পা যুগ হিসেবে, সিন্ধু সভ্যতার তৈরী হওয়ার সময়)। ডেভিড রাইখ তাঁর Who we are and how we got here বইয়ে স্পষ্টভাবে লিখেছিলেন যে কীভাবে তাঁদের ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরী করেছিল এলাকার হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী, এমনকি আঞ্চলিক সহ-গবেষক এবং কো-অথরদের মাধ্যমেও। আগ্রহীরা চাইলে এই বইয়ের ছয় নম্বর চ্যাপ্টার (The Collision that Formed India) এর অন্তর্গত The Mixing of East and West অনুচ্ছেদটা পড়ে দেখতে পারেন। রাইখ এই অংশটা শুরু করছেন এই বলে - “The tensest twenty-four hours of my scientific career came in October 2008, when my collaborator Nick Patterson and I traveled to Hyderabad to discuss these initial results with Singh and Thangaraj” – সিং এবং থঙ্গরাজ মানে লালজী সিং, এবং কুমারস্বামী থঙ্গরাজ, দুজনেই তখন সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজিতে কর্মরত বিজ্ঞানী। অরিজিনাল পেপারে রাইখ এবং প্যাটারসন আসলে "ওয়েস্ট ইউরেশিয়ান" শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন। লালজী সিং এবং থঙ্গরাজ আপত্তি করেন কারণ ওয়েস্ট ইউরেশিয়া শব্দের ব্যবহার "পলিটিকালি এক্সপ্লোসিভ" হয়ে উঠতে পারে...এমনকি "অভিবাসন" শব্দটাই এক্ষেত্রে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। কো-অথরদের আপত্তি এবং সেন্টিমেন্ট মেনে নিয়ে, পেপারটা যাতে পাবলিশ হতে পারে সেই উদ্দেশ্যে রাইখ ও তাঁর সহ-গবেষকরা খানিকটা নিউট্রাল ANI এবং ASI ব্যবহার করেন পেপারে। শব্দের ব্যাপারে খানিক কম্প্রোমাইজ করা হলেও, এই গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য স্পষ্টভাবেই ইউরেশীয় স্তেপ এবং পরবর্তীকালে BMAC থেকে আসা অভিবাসনের দিকেই ইঙ্গিত করে।

রাখীগড়ি এই প্রাচীন ভারতের ডিএনএ অ্যানালিসিসের লেটেস্ট চ্যাপ্টার। এই গল্পের শুরু ২০১৯ সালে, যখন বিজ্ঞানীরা হরিয়ানার হিসার জেলার অন্তর্গত রাখীগড়িতে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় পাওয়া প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো একটা কঙ্কালের সফল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করেন। এই ডিএনএ সিকোয়েন্সিং করে দেখা যায় যে ওই মানুষটির শরীরের জিনের মধ্যে ইউরেশীয় স্তেপের জিনের কোনো মার্কার নেই, নেই কোনো মধ্য এশীয় বা ইউরোপীয় মার্কারও। অর্থাৎ, রাখীগড়ির সেই মানুষ যে জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে আন্দাজ করা যায়, তাদের সঙ্গে ইউরোপীয়, ইউরেশীয় বা পশ্চিম এশিয়ার কোনো জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ কখনো ঘটেনি। রাখীগড়ির মানুষটির জিনগত বৈশিষ্টের সঙ্গে মিল পাওয়া গিয়েছিল শুধু ভারতীয় উপমহাদেশের আদি বাসিন্দা হান্টার-গ্যাদারার, এবং প্রাচীন ইরানী কৃষক-পশুপালক জনগোষ্ঠীর।

এইবার মজাটা হয় এইখানেই। শমীক ভশ্চাজ্জির মত হিন্দুত্ববাদীরা ইউরেশীয় স্তেপ জিনের অনুপস্থিতি দেখিয়ে বলেন - এইত্তো, ইউরেশীয় স্তেপ থেকে কোনো অভিবাসন কখনো হয়নি, বরং প্রাচীন ভারতের সিন্ধু সভ্যতার মানুষেরাই বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। একটু ভাবলেই আপনি খেয়াল করতে পারবেন যে এই লজিকটা খানিক "হরপ্পায় টেলিফোনের তার পাওয়া যায়নি, কাজেই তখন ওয়্যারলেস ছিল" বলার সামিল…

কেন? কারণটা খুব সাধারণ বায়োলজির নিয়ম - যার ফলে হরপ্পায়-টেলিফোনের-তার-পাওয়া-যায়নি-কাজেই-সেখানে-ওয়্যারলেস-ছিল মার্কা বালবাজারি লজিকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সহজ বায়োলজির নিয়মে আপনার আমার মধ্যে পূর্বপুরুষের জিন থাকে, উল্টোটা নয়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরা যদি আউট-অফ-ইন্ডিয়া মাইগ্রেশনের মাধ্যমে পশ্চিম ও মধ্য এশিয়া, ইউরোপ এবং অন্যত্র ছড়িয়ে থাকত, তাহলে সেখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া কঙ্কালের ডিএনএর মধ্যে রাখীগড়ির দেহাবশেষে পাওয়া ইউনিক সাউথ এশিয়ান জিনের চিহ্ন থাকত। কিন্তু ডেভিড রাইখ ও নরসিংহন সহ অনেকের গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০-১০০০ সালের মানুষের হাড়গোরের মধ্যে দক্ষিণ এশীয় হান্টার-গ্যাদারার জিনের কোনো চিহ্ন নেই। উল্টে, ভারতে আরো পরের সমস্ত নমুনার মধ্যে স্তেপের জিনের উপস্থিতি স্পষ্ট। অর্থাৎ, সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর মানুষের পক্ষে ইউরোপ বা মধ্য এশিয়ার জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ হওয়া বায়োলজিকালি অসম্ভব। এর সঙ্গে আরো বলা যায় যে মোটামুটি খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ নাগাদ ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে আচমকাই স্তেপ জিন এসে হাজির হওয়ার অনেক আগেই, খ্রীষ্টপূর্ব ৩০০০-২৫০০ সালের সময়কার কঙ্কাল যা সাইবেরিয়া এবং ইউক্রেনের বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া গেছিল, সেগুলোর মধ্যে এই স্তেপ জিনের মার্কার পাওয়া গেছে। মানে, এই জেনেটিক ট্রাফিক বেসিকালি একটা ওয়ান-ওয়ে রাস্তা, যেটা ভারতে ঢোকে; উল্টোটা নয়।            
                    
রাখীগড়ির ফাইন্ডিংস এই কারণেই মাইগ্রেশন থিওরিকেই আরো পোক্ত করে তুলেছে, শমীক ভশ্চাজ্জির কথামত বাতিল করেনি। কারণ, এই পেপারটা থেকে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর উদ্ভবের একটা স্পষ্ট ছবি পাওয়া যায়। সিন্ধু সভ্যতার জনগোষ্ঠীর লোকেরাই যদি আদি সংস্কৃতজ্ঞ আর্য্য হত - হিন্দুত্ব থিওরি অনুযায়ী যাদের সংস্কৃতি বয়ে এসেছে আজকের উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে (যারা নিজেদের তথাকথিত আর্য্য জনগোষ্ঠী হিসেবে ভাবতে ভালোবাসে), তাহলে এই আধুনিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে থাকা স্তেপ জিনের দু চার ফোঁটা তো থাকার কথা ছিল সিন্ধু সভ্যতার গ্লোরির শিখরে থাকা মানুষদের মধ্যে? যেহেতু আধুনিক উত্তর ভারতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অনুপাতে স্তেপ জিন রয়েছে, কাজেই স্বাভাবিক বায়োলজি বলে যে রাখীগড়ির সময়কালের অনেক পরেই স্তেপ মাইগ্রেশন ঘটেছিল...অর্থাৎ সিন্ধু সভ্যতার শেষের দিকে, খ্রীষ্টপূর্ব ২০০০ থেকে ১৫০০ সাল নাগাদ…

যেটা চরম ইন্টারেস্টিং, সেটা হল প্রাচীন ডিএনএ সিকোয়েন্সিং থেকে পাওয়া টাইমলাইনের সঙ্গে গত কয়েক দশক ধরে চলে আসা ভাষাবিজ্ঞানী ও প্রত্নতাত্ত্বিকের দেওয়া যুক্তি এবং টাইমলাইন হুবহু মিলে যায়। ডেভিড অ্যান্থনির লেখা The Horse, the Wheel, and Language নামের একটা ল্যান্ডমার্ক বই থেকে আন্দাজ পাওয়া যায় কীভাবে গবেষকরা সমস্ত প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে প্রচলিত শব্দের অ্যানালিসিস থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার ছড়িয়ে পড়ার একটা ছবি তৈরী করেছেন। লিঙ্গুইস্টদের অ্যানালিসিস প্রমাণ করে যে প্রথম দিকের ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলোর মধ্যে (যাদের মধ্যে সংস্কৃতও পড়ে), ব্রোঞ্জ যুগে স্তেপ অঞ্চলে আবিষ্কৃত বিভিন্ন টেকনোলজি সংক্রান্ত একই ধরণের শব্দ গেঁথে রয়েছে - যেমন ঘোড়াকে পোষ মানানো, স্পোকওয়ালা চাকা লাগানো রথ, উন্নত মেটালওয়ার্কস সম্পর্কিত অনেক শব্দের গঠন একইরকম। পাশাপাশি, প্রত্নতাত্ত্বিকেরাও আগেই দেখিয়েছেন যে সিন্ধু সভ্যতার স্বর্ণযুগে এরকম পোষ মানানো ঘোড়া বা চাকাওয়ালা রথের অস্তিত্বের প্রমাণ নেই। রাখীগড়ির পেপার এই সবের মধ্যেকার মিসিং লিঙ্কটা সামনে এনে দিয়েছে - একটা জৈবিক প্রমাণঃ ইউরেশীয় স্তেপ অঞ্চলের পশুপালকেরা যখন খ্রীষ্টপূর্ব ১৭০০ সাল নাগাদ ভারতীয় উপমহাদেশে এসে পৌঁছেছিল, তাদের জিনের পাশাপাশি এসেছিল তাদের ঘোড়া, চাকাওয়ালা রথ আর একদম শুরুর দিকের ইন্দো-এরিয়ান ভাষাসমূহ - সংস্কৃতের উৎপত্তি সেই ভাষাসমূহ থেকেই, ভারতীয় সভ্যতার নকশিকাঁথা বোনার শুরুও সেই সময়েই...           

শেষ একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। শমীক ভশ্চাজ্জি এই ভুলভাল কথাটা অত স্টাইল করে বল্ল কেন? দিন কয়েক আগে লেখা হিন্দুত্ববাদীদের ইতিহাস পাল্টানোর নমুনা মনে করে দেখবেন একটু - কীভাবে জনসমক্ষে আবোলতাবোল দাবী করে উদ্ভট ইতিহাস তৈরী করার চেষ্টা করা হয়। সেই লেখাটা থেকেই অল্প একটু অংশ কোট করি।

“আরএসএসের "মার্গদর্শক' লজ্জা রাম তোমর গম্ভীরভাবে আউড়ে গেলেন - আলোর গতিবেগ নির্ণয় করা হয়েছিল ঋগ্বেদেই; ব্রিটিশরা নাগপুর দখল করার পর টানা ছ'মাস ধরে সেখানে নদীগুলোতে জলের সঙ্গে বয়ে গেছিল গলা সোনা; প্যারিসে তৈরী হয়েছে মনু-র মূর্তি এবং তার নীচে ফলকে লেখা রয়েছে "বিশ্বের প্রথম আইনপ্রণেতা'; শুধুমাত্র পবিত্র অশ্বত্থ গাছ আর তুলসীগাছই অক্সিজেন উৎপন্ন করে; নাসার বিজ্ঞানীরা সূর্যের মুখ থেকে "ওম' শব্দ শুনতে পেয়েছেন।"

লজ্জারাম তোমরের তুলনায় ব্যারিটোন ভয়েসে সুললিত গদ্য বাংলায় কথা বলা, অ্যাপারেন্টলি শক্তি চাটুজ্জে পড়া শমীক ভশ্চাজ্জি ফ্যাসিস্টদের নরম মুখ। এরকম সংস্কৃতিবান মানুষ যে কাঁচা মিথ্যে বলবেন সেটা তো আপনি ভাবতেই পারবেন না, তাই না? অথচ উনি বল্লেন, এবং কনফিডেন্টলি বল্লেন। কারণ, উনি জানেন যে এই মিথ্যেটা ধরে ফেলতে যে লজিকাল অ্যাপ্রোচ ব্যবহার করার দরকার পড়বে, সেটা আপনি মোস্ট লাইকলি করবেন না। ভারতীয় সভ্যতা যে এজলেস, টাইমলেস এবং চিরকালই একইরকম গ্লোরিয়াস একটা ব্যাপার ছিল, সেটা তো ওরা অলরেডি আপনাকে বিশ্বাস করিয়েই ফেলেছে...  

একটা ছোট কথা দিয়ে শেষ করি। বিজ্ঞান তথ্যপ্রমাণের ওপর নির্ভর করে। ইতিহাসও নির্ভর করে তথ্যপ্রমাণের ওপর — এক্ষেত্রে লিঙ্গুইস্টিকস, প্রত্নতত্ত্ব, এবং আজকাল ডিএনএ সিকোয়েন্সিং এর ওপরেও। কিন্তু, এই চর্চায় যেটা আসল সেটা হল প্রশ্ন করতে পারা, চ্যালেঞ্জ করতে পারা, কোনো কিছুকেই অ্যাবসোলিউট ট্রুথ মেনে না নেওয়া। যেমন রোমিলা থাপারেরা AIT কে খারিজ করতে পেরেছিলেন। আপনাকে কেউ বল্ল যে আর্য্যরা সিন্ধু সভ্যতারই অংশ, আপনি সব তথ্যপ্রমাণ ছেড়ে দিয়ে সেইটাকেই সত্যি বলে মেনে নিলেন..."সব সত্যি...মহিষাসুর সত্যি...হনুমান সত্যি...ক্যাপ্টেন স্পার্ক সত্যি...টারজান সত্যি...অরণ্যদেব সত্যি..."

আপনি কি এখনও রুকুবাবুই আছেন? একটুও বড় হননি?

সূত্রঃ

(১) প্রাগিতিহাস, মধুশ্রী বন্দ্যোপাধ্যায়, গাংচিল
(২) Who we are and how we got here – Ancient DNA and the new science of the Human Past, David Reich, Pantheon
(৩) Early Indians: The Story of Our Ancestors and Where We Came From, Tony Joseph, Juggernaut
(৪) The Horse, the Wheel, and Language: How Bronze-Age Riders from the Eurasian Steppes Shaped the Modern World, David W. Anthony, Princeton University Press
(৫) An Ancient Harappan Genome Lacks Ancestry from Steppe Pastoralists or Iranian Farmers, Vasant Shinde et al, Cell, Volume 179, Issue 3, 17 October 2019, Pages 729-735.e10,  https://www.sciencedirect.com/science/article/pii/S0092867419309675