মধ্যপ্রাচ্য বুঝতে গেলে আপনাকে শুরু করতে হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় থেকে। হ্যাঁ, তার আগেও যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে—রাজতন্ত্রের আমলে যা হয়েই থাকে। কিন্তু আজকের এই অশান্তির শুরু ওই অঞ্চলে মাটির নীচে তেল আবিষ্কার হওয়ার পরে। এই ইতিহাসটুকু না জানলে আপনি ওই গোলগোল ঘুরেই যাবেন আর হোয়া ইউনির অধ্যাপকদের গুলবাজি শুনে ফালতু লাফাবেন।
শুরু বলা যায় সাইকস-পিকট এগ্রীমেন্ট থেকে।
১৯১৫ সালের শেষের দিক থেকে ১৯১৬ সালের শুরুর মধ্যে, স্যার মার্কস সাইকস (এক ব্রিটিশ এমপি, যিনি ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ওয়ার লর্ড কিচেনারের ঘনিষ্ঠ) আর জর্জ-পিকট (এক ফরাসী কূটনীতিক) নিজেদের মধ্যে চুপিচুপি মিটিং শিটিং করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে ফেলেছিলেন। একটা জিনিস মাথায় রাখবেন—বিশ্বযুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি, আর এর মাত্র কিছুদিন আগেই মধ্যপ্রাচ্যে তেলের খোঁজ পাওয়া যায়...
সাইকস আর পিকটের মধ্যে চুক্তি হয় যে উত্তরে Acre (বর্তমানে ইজরায়েল যেখানে) থেকে উত্তরপূর্বে পারস্যের বর্ডার অবধি একটা কাল্পনিক লাইনের এপাশ ওপাশ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নেবে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স। সিরিয়া আর লেবানন যাবে ফ্রান্সের ভাগে, আর ইংল্যান্ড পাবে মেসোপটেমিয়া, প্যালেস্টাইন আর সুয়েজ অঞ্চল। দুই পক্ষই বেশ জোর দিয়ে আমেরিকাকে (আমেরিকা তখনও জিওপলিটিক্সের হিসেবে বাচ্চা) বোঝায় যে তারা নিজেদের স্বার্থে যুদ্ধ করছে না, বরং মানুষের স্বাধীনতা আর মানবতাকে রক্ষা করাই তাদের উদ্দেশ্য।
সেই সময়ের কলোনিয়াল শক্তি, যেমন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ইত্যাদিরা তখনও যা অজুহাত দিত, আজকের নিও-কলোনিয়াল আমেরিকাও একই অজুহাত দেয়। শোনা যায়, এডওয়ার্ড হাউজ, যিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট উইলসনের বিদেশনীতির অ্যাডভাইসর, তিনি এই গোপন চুক্তির খবর পেয়ে বলেছিলেন যে ফরাসী ও ব্রিটিশরা এই মধ্যপ্রাচ্যকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের আঁতুরঘর বানিয়ে ফেলছে। এগজ্যাক্ট ইংরিজী লাইনটা এইরকম—"[They] are making [the Middle East] a breeding place for future war."
একদম খাপে খাপ তাই না? আজকের অস্থিরতার শুরু ঠিক এইখান থেকেই—প্রথমে পারস্যে মাটির নীচে বিপুল তেলের সন্ধান পাওয়া, মেসোপটেমিয়াতেও (আজকের ইরাক) একই সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া...
অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি সেই সময়েই পারস্যের সঙ্গে ষাট বছরের চুক্তি করে ফেলেছে। আর টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি, যাদের মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার ছিল অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি, মেসোপটেমিয়ায় তেলের খোঁজ করার লোভনীয় বরাত পায় সেইদিনই যেদিন ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্দ নিহত হন—১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ট্রিগার্ড হয় যে ঘটনা থেকে।
মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত দেশের তৎকালীন সরকারগুলোকে আর সাধারণ মানুষকে যাই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকুক না কেন, আসল সত্যিটা হল—কলোনিয়াল শক্তি সেই সময়েই নিজেদের মধ্যে গোপনে গোটা অঞ্চলের ভাগ বাঁটোয়ারা সেরে ফেলেছিল, ওই এলাকার ভবিষ্যত চেহারা কী হবে সেসব নিয়ে স্বপ্নটপ্নও দেখে ফেলেছিল। কলোনিয়াল শাসকের অফিসার, রাজনীতিক আর ব্যবসায়ীদের একটাই লক্ষ্য ছিল—তেলের খনি আর যে পাইপলাইন ধরে তেল পৌঁছবে বিভিন্ন বন্দরে, ট্যাঙ্কারে লোড হতে, সেই পাইপলাইন আর বন্দরের দখলদারি...
গল্পটা আজও বদলায়নি এক ফোঁটাও। শুধু নতুন একটা নাম জুড়েছে—ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা—তারা এই দৌড়ে পয়লা নম্বর হতে শুরু করে সুয়েজ ক্রাইসিসের পর, ষাটের দশকে দুষ্টু কমিউনিস্টদের ঠেকানোর দাবী তুলে...
গোটা পশ্চিমী বিশ্ব—পুরনো বনেদী সমস্ত কলোনিয়াল শক্তি, বা নব্য কলোনিয়াল শক্তি—তারা চায় মধ্যপ্রাচ্যকে বোমা ফেলে একদম সমতল বানিয়ে তাদের স্বাধীন এবং সভ্য করে তুলতে 😊
উইলিয়াম ডালরিম্পল আর অনিতা আনন্দের এম্পায়ার পডকাস্টটা দেখে ফেলতে পারেন। লিঙ্ক কমেন্টে। যদি সময় পাই, মাঝেমধ্যে এই টুকরো ইতিহাসগুলো পোস্ট করব—১৯০৮ সালে পারস্যে তেলের খোঁজ পাওয়া থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হওয়া অবধি সমস্য ঘটনাবলীর একটা ন্যারেটিভ। যেমন, সাইকস-পিকট চুক্তির অল্প কিছুদিন আগেই ইজিপ্টে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হেনরি ম্যাকমোহন আর মক্কার শরিফ হুসেইন বিন আলির মধ্যে চিঠি চালাচালি, যেখানে ম্যাকমোহন আরবদের স্বাধীন দেশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অটোমান শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পুরস্কার হিসেবে (লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া সিনেমাটা নিশ্চয় দেখেছেন), আর এর ঠিক পরের বড় ঘটনা হল বালফ্যুর ডিক্লারেশন—যাকে আজকের আরব ইজরায়েলি কনফ্লিক্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বলা যায়।


No comments:
Post a Comment