(৩) আরব বিদ্রোহ (১৯১৬-১৯১৮)
দশই জুন, ১৯১৬ - মক্কার বাতাস চিরে ভেসে আসে একটা মাত্র গুলির আওয়াজ। অটোমান সৈন্যদের গ্যারিসনে সেই গুলিটা চালিয়েছিলেন মুসলমানদের পবিত্রতম তীর্থের রক্ষক, শরিফ হুসেইন বিন আলি। এর পাঁচদিন আগেই মদিনার অটোমান গ্যারিসনের ওপর আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে আরব বিদ্রোহী সৈন্যদল। শরিফ হুসেইনের চালানো গুলি আরব বিদ্রোহের পাব্লিক ডিক্লারেশন আর আরব অঞ্চলে অটোমান শাসনের অবসানের সংকেত।
এই আরব বিদ্রোহ আচমকা আকাশ থেকে এসে পড়েনি। বরং বেশ কয়েকটা ঘটনার ওপর নির্ভর করে এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল অনেক পরিকল্পনা করেই। এই বিদ্রোহের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে বলা যায় তুর্কী জাতীয়তাবাদের কথা - ১৯০৮ সালে তরুণ তুর্কী মুভমেন্টের শুরু থেকেই যে চেতনা ক্রমশঃ অটোমান সাম্রাজ্যের বাদবাকি আরব অধিবাসীদের ক্রমশঃ বিচ্ছিন্ন করে দিতে শুরু করে। বলা যায় আরব জাতীয়তাবাদী চেতনার কথাও - সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার বুদ্ধিজীবী এবং কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে ক্রমশঃ উদ্ভূত হতে থাকা স্বতন্ত্র আরব পরিচিতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্খা। এবং অবশ্যই ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতি - শরিফ হুসেইন এবং ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্সের মধ্যে থেকে তৈরী হওয়া ধারণা যে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করলে আরব অধিবাসীদের স্বাধীনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবী ব্রিটিশ সরকার স্বীকার করে নেবে।
শরিফ হুসেইনের নিজস্ব উচ্চাশাও ছিল - যুদ্ধের বাজারে নিজেকে অটোমান শাসন থেকে বের করে এনে স্বাধীন স্বতন্ত্র আরবভূমিতে হাশেমাইট বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করা…
বিদ্রোহের শুরুর দিকে ফোকাস ছিল আরবের পবিত্র শহরগুলোকে দখল করা। ১০ই জুন ১৯১৬ - হুসেইনের দুই ছেলে, আলি আর ফয়জলের নেতৃত্বে আরব বাহিনী মক্কা দখল করে ফেলে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর দৌলতে জেড্ডার বন্দরও আরব বাহিনীর হাতে আসে অল্প সময়ের মধ্যেই। তবে আরব বাহিনীর যাত্রা পুরোপুরি নিষ্কন্টক ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রায় পুরো সময়টা জুড়েই মদিনার অটোমান গ্যারিসন ঘেরাও হয়ে থাকলেও শহর হাতছাড়া হতে দেয়নি। আর, এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য কখনোই অনেক এলাকা দখল করে ফেলা ছিল না, বরং গেরিলা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অটোমান সৈন্যবাহিনীকে এনগেজ করে রাখা আর তাদের সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
পিটার ও'টুল অভিনীত ডেভিড লীনের ১৯৬২ সালের সিনেমা লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া দেখেননি বা নামও শোনেননি এমন মানুষ বিরল, অন্তত আমাদের জেনারেশন অবধি তো বটেই। সেই সিনেমাটা পুরো আকাশ থেকে পড়া কাল্পনিক কাহিনী নয়, বরং এক ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার, আর্কিওলজিস্ট এবং ডিপ্লোম্যাট থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সের জীবনের ঘটনার ওপর তৈরী। এই লরেন্সই সিনেমার লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া, পাকেচক্রে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এই আরব বিদ্রোহের এক মুখ্য চরিত্র। তাঁকে প্রথমে পাঠানো হয়েছিল হেজাজে - পর্য্যবেক্ষক হিসেবে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই লরেন্স শরিফ হুসেইনের দুই ছেলে, আলি আর ফয়জলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে হয়ে ওঠেন আরব বাহিনীর অন্যতম প্রধান উপদেষ্টাও। লরেন্স একদম সঠিকভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে আরব বাহিনী খোলা মাঠে অটোমার সৈন্যদের মুখোমুখি হয়ে কিছু করে উঠতে পারবে না, বরং আচমকা গেরিলা হানাই তাদের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। আরব নেতৃত্বকে বুঝিয়েসুঝিয়ে লরেন্স আক্রমণের মূল কেন্দ্র করেন আরব এলাকার উত্তরাঞ্চলকে, বিশেষ করে আক্রমণ শানানো হয় হেজাজের রেলওয়ে লাইনের ওপর। এই রেললাইনই ছিল অটোমান সৈন্যবাহিনীর প্রধান সাপ্লাই লাইন - মদিনা এবং সিরিয়ার বাকি অঞ্চলের গ্যারিসনে রসদ পৌঁছত এই লাইনের মাধ্যমেই। আরব গেরিলা বাহিনী, যাদের পরিচয় ইতিহাসে লেখা রয়েছে নর্দার্ন আর্মি বলে - মূলতঃ প্রাক্তন অটোমান অফিসার এবং আদিবাসী বেদুইনদের নিয়ে তৈরী, মরুভূমির ওই এলাকা ছিল যাদের হাতের নখের মত পরিচিত - উটে সওয়ার হয়ে আক্রমণ চালায় যায় এই রেললাইনের ওপর। একের পর এক ব্রিজ উড়ে যায়, ধ্বংস হয় রেলওয়ে ট্র্যাক। হাজারো অটোমান ফৌজ ক্রমাগত ব্যস্ত থেকে যায় এই রেললাইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।
১৯১৭-১৮ সাল নাগাদ আরব রিভোল্ট তার শিখরে পৌঁছয়। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে নর্দার্ন আর্মি দখল করে আকাবা বন্দর - ফলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পক্ষে রসদ পৌঁছে দেওয়ার কাজ সহজ হয়ে পড়ে। এবং প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ জেনারেল এডমন্ড অ্যালেনবির অভিযানের সময় তাঁর ডান হাত হিসেবে কাজ করেছিল এই নর্দার্ন আর্মিই। ক্রমাগত অটোমান সাপ্লাই লাইনে হানা, অটোমান এলাকার মধ্যে থেকে ইন্টেলিজেন্স সরবরাহের কাজ – আরব বাহিনীর এই সাফল্য যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে অটোমান আর্মিকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল, ফলে এই ইস্টার্ন ফ্রন্টে অটোমান সৈন্যরা সেরকম কার্যকরী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই পারেনি। আরব অভিযানের চূড়ান্ত সাফল্য ছিল ১৯১৮ সালের অক্টোবরের শুরুতে দামাস্কাসের দখল নেওয়া - যার কিছুদিন পরেই অটোমান শক্তি মিত্রপক্ষের সামনে আত্মসমর্পণ করে। আমির ফয়জল বিজয়ীর বেশে দামাস্কাসে প্রবেশ করেন, তৈরী হয় স্বাধীন আরব সরকার - অল্প কিছুদিনের জন্যে হলেও যে ঘটনা একটা ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন আরব রাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।
তবে কলোনিয়াল আমল তো। গোটা কলোনিয়াল আমলই বেসিকালি নানান বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনায় ভর্তি। এখানেও আলাদা কিছু হয়নি।
আরব বিদ্রোহ তার ইমিডিয়েট মিলিটারি লক্ষ্য — অটোমান সাম্রাজ্যের হার — নিশ্চিত করতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হয়ে যায় যুদ্ধের পরে আলোচনার টেবিলে।
আরবরা শরিফ হুসেইন আর ম্যাকমোহনের মধ্যে আলোচনা (যার কথা আগের পর্বে লিখেছি) আর স্বাধীন আরব রাজ্যের ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা যে ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের সঙ্গে গোটা আরব এলাকার ভাগাভাগি করে নিয়েছে সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে, সেটা প্রকাশ পায় এই সময়েই। ব্রিটেন আর ফ্রান্সের এই দ্বিচারিতা ফাঁস করে দেয় নভেম্বর বিপ্লব পরবর্তী রাশিয়ার বলশেভিক সরকার। প্রকাশ্যে আসে ১৯১৭ সালের ব্যালফার ডিক্লারেশনের কথাও — যেখানে ব্রিটিশরা জায়নিস্টদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিল যে প্যালেস্টাইনেই তারা ইহুদী হোমল্যান্ড বানাতে সাহায্য করবে, সেই প্যালেস্টাইন যাকে আরবরা নিজেদের জমি হিসেবেই দেখত (হুসেইন-ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স অনুযায়ী আরবদের বিশ্বাস ছিল এরকমটাই)।
বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে উইৎজম্যানের (যিনি পরে ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট হবেন) সঙ্গে চুক্তিতে ফয়জল প্যালেস্টাইনে ইহুদী সেটলমেন্ট তৈরীর কথা মেনে নেন, শুধুমাত্র যদি আরব স্বাধীনতার গ্যারান্টি থাকে তবেই। সেই বছরেই, প্যারিসে শুরু হয় শান্তি সম্মেলন। সেখানে হুসেইনের প্রতিনিধি হিসেবে আমীর ফয়জল আরবদের দাবী পেশ করেন। অবভিয়াসলি, কেউ সে কথা কানে তোলেনি। ফয়জল ও উইৎজম্যানের চুক্তিও নাল অ্যান্ড ভয়েড হয়ে যায় তখনই। লীগ অফ নেশনস ১৯২০ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে একটা ম্যান্ডেট তৈরী করে, যেখানে সিরিয়া আর লেবাননকে তুলে দেওয়া হয় ফরাসীদের হাতে; ইরাক, প্যালেস্টাইন আর ট্রান্সজর্ডনকে দেওয়া হয় ব্রিটিশদের। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ফয়জলকে সিরিয়াস রাজা হিসেবে বেছে নেয় সিরিয়ার জাতীয় কংগ্রেস। ওই বছরের ২৪শে জুলাই তারিখেই মায়সালানের যুদ্ধের পর ফরাসীরা তাঁকে তাড়িয়ে দেয়। ব্রিটিশরা, তাদের গুডউইলের নিদর্শন হিসেবে ফয়জলকে ইরাকের গদিতে বসায়, আর ফয়জলের ভাই আবদুল্লাহকে বসায় ট্রান্সজর্ডনে।
শেষ হয় আরব বিদ্রোহের এই পরিচ্ছেদ, দিনের শেষে সামরিক সফলতা হলেও যেটা হয়ে দাঁড়ায় চূড়ান্ত রাজনৈতিক ব্যর্থতা। এই বিদ্রোহের সময়ে আরব জাতীয়তাবাদী চেতনা আর সামরিক শক্তির উত্থান হলেও সেসব ধুলোয় মিশে যায় কলোনিয়াল পাওয়ার পলিটিক্সের বাস্তব দুনিয়ার সামনে। আরবরা স্বাধীনতা পাওয়ার উদ্দেশ্যে লড়লেও শেষ অবধি অটোমান শাসকের বদলে মাথার ওপরে পায় নতুন ইউরোপীয় শাসককে। আর এই অভিজ্ঞতা আর বিট্রেয়ালের অনুভূতিই লংটার্মে আরব রাজনৈতিক চেতনা আর গোটা এলাকার অস্থিরতার অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে থেকে গেছে...
এই জটের অন্যতম প্রধান গ্রন্থি হল ব্যালফার ডিক্লারেশন, যাকে আজকের রাজনীতিকরা ধামাচাপা দিয়ে রাখেন, অথচ সাইকস-পিকট চুক্তি, হুসেইন-ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স আর ব্যালফার ডিক্লারেশন — এই তিনের জটের পরিণতিই আজকের মধ্যপ্রাচ্য। পরের পর্বে, ব্যালফার ডিক্লারেশন।


No comments:
Post a Comment