Monday, March 23, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইন

(৫) প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটঃ কলোনিয়ালিজমের মুখোশ আর জমির অঙ্ক

১৯২২ সালের জুলাই মাসে লীগ অফ নেশন্স প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটকে মান্যতা দেয়। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটরি শক্তির হাত ধরেই "নেটিভরা" একদিন নিজেরাই নিজেদের শাসন করতে শিখবে - বাকি পৃথিবীর সামনে এই বলে ম্যান্ডেটকে সভ্যতার পবিত্র আমানত হিসেবে দেখানো হলেও, প্যালেস্টিনীয়দের কাছে এটা ছিল তার ঠিক উলটো। একদম উলটো।

ম্যান্ডেটটা ঠিক কাদের জন্যে ছিল এইটা বুঝতে চাইলে ম্যান্ডেটের শর্তগুলো একবার দেখে নিতে হবে। অনুচ্ছেদ দুইয়ে বলা হয় যে ব্রিটেনের হাতেই দায়িত্ব থাকবে ইহুদীদের জন্যে ন্যাশনাল হোম তৈরীর (“ securing the establishment of the Jewish national home") আর চার নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয় যে একটা ইহুদী সংস্থাকে (এজেন্সি) পাবলিক বডি হিসেবে তৈরী করে বিশেষ স্বীকৃতি দিয়ে তাদের হাতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হবে। জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম আর জিউয়িশ এজেন্সি নিয়ে এত কিছু বলা হলেও নেটিভ আরবদের কোনও এজেন্সি সম্পর্কে ম্যান্ডেট ছিল নীরব। নেটিভদের পরামর্শ আবার শোনার কী আছে - এই হয়তো ছিল মনোভাব। ফাইনালি, ছয় নম্বর অনুচ্ছেদে ব্রিটিশদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয় যাতে তারা উপযুক্ত শর্ত অনুযায়ী ইহুদী অভিবাসন সুনিশ্চিত করে আর প্যালেস্টাইনের জমিতে ইহুদী বসতি স্থাপনে উৎসাহ দেয়।

আরবদের অভিবাসন বা বসতি নিয়ে ম্যান্ডেটে একটা শব্দও ছিল না। আরব স্বকীয়তাকে স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে একটা অনুচ্ছেদও লেখা হয়নি ম্যান্ডেটে। সবদিক থেকেই এই ম্যান্ডেটের মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে ব্যালফার ডিক্লারেশনকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারকে। ১৯১৭ সালের চিঠিটা বদলে গেছিল আন্তর্জাতিক আইনে।

প্যালেস্টাইনে বসবাসকারী প্রায় ৯০ শতাংশ আরব জনজাতির মানুষ (কলোনিয়ালিজমের ভাষায় নেটিভ) ম্যান্ডেটকে আমানত হিসেবে দেখে উঠতে পারেনি। তাদের কাছে এই ম্যান্ডেট ছিল একটা শাস্তি। প্যালেস্টিনীয়দের ক্রমশঃ কমতে থাকা অধিকার এই ম্যান্ডেটের মধ্যে দিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক আর আইনী রূপ নিতে শুরু করেছিল। কার্টেসি, ব্রিটেন। এবং, কার্টেসি ঠুঁটো জগন্নাথ লীগ অফ নেশন্স।

কীভাবে?

প্রথমতঃ, ১৯২১ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে জমির রেজিস্ট্রেশনের বদল। অটোমান আমলে, বেশিরভাগ জমির মালিকানা ছিল হয় রাষ্ট্রের হাতে (মিরি), অথবা ব্যক্তির হাতে (মুল্ক) আর নয়তো ধর্মীয় অনুদানের ওপর (ওয়াকফ)। ব্রিটিশরা একটা নতুন রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি আনে যেখানে জমির মালিকানার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে ওঠার পাশাপাশি জমির হাতবদলও খুব সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আরব অধিবাসীদের বেশিরভাগই সেই সময়ে তৃতীয় বিশ্বের বাকি দেশগুলোর মতই নিরক্ষর - কাজেই না আইনকানুন না বুঝেই সেই সময়ে অনেকেই জমির রেজিস্ট্রেশন করেনি। এছাড়া, খরচ আর অবিশ্বাসও বড় কারণ ছিল। এই আইনে আনরেজিস্টার্ড জমি রাষ্ট্রের হাতে চলে যেত, এবং রাষ্ট্র সেই জমি বিক্রি করে দিত। রাষ্ট্র তখন ব্রিটিশের, তাদের ওপর জিউয়িশ হোমল্যান্ড তৈরীর বড় দায়িত্ব, কাজেই বুঝতেই পারছেন এই জমিগুলো কাদের হাতে চলে যেত...

দ্বিতীয়তঃ, ১৯২৫ সালের নাগরিকত্ব আইন। এই আইন অনুযায়ী, প্যালেস্টাইনে বসবাসকারী আরবদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও, সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। ইহুদী অভিবাসীদের জন্যে নাগরিকত্ব লাভের প্রক্রিয়া ছিল অনেক সহজ—মাত্র দুই বছর বসবাস করলেই তারা নাগরিক হতে পারত। অথচ, যেসব আরব অটোমান আমলে প্যালেস্টাইন ছেড়ে প্রতিবেশী দেশে গিয়েছিলেন, তারা ফিরে এসেও সহজে নাগরিকত্ব পেতেন না, কারণ যুদ্ধের বাজারে অটোমান আমলের দলিলপত্র দেখানো সকলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে, রাজনৈতিক অধিকারের মাঠটা প্রথম থেকেই ছিল অসম। এই ব্যাপারটা আপনাদের বেশ চেনা ঠেকলেও ঠেকতে পারে, এনআরসি আর এসআইআরের বাজারে...

তৃতীয়তঃ, জিউয়িশ এজেন্সির বিশেষ মর্যাদা বা প্রিভিলেজড স্টেটাস। ম্যান্ডেট অনুযায়ী এই জিউয়িশ এজেন্সি তাদের বিশেষ প্রিভিলেজড অবস্থান অনুযায়ী দেশের প্রশাসনে অংশগ্রহণ করার ক্ষমতা পেয়ে গেছিল। আরবদের এরকম কোনও এজেন্সিও ছিল না, কোনও ক্ষমতাও ছিল না। কাগজে কলমে ক্ষমতা ব্রিটিশদের হাতে থাকলেও, এই জিউয়িশ এজেন্সি নির্বিচারে ভূমি অধিগ্রহণ, অভিবাসনের সার্টিফিকেট দেওয়া, বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকল্পের মত ব্যাপারগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারত ম্যান্ডেট অনুযায়ী। সরকারের মধ্যে আরেকটা সরকার বলা যায়; বলা যায় ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি পর্ব।

এই পুরো সময়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল জমির অধিকার। জায়নিস্টদের কাছে জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম তৈরীর প্রথম ধাপ ছিল জমির দখল নেওয়া। আর প্যালেস্তিনীয়দের কাছে, এক একটা জমি বিক্রি বা বেদখল হওয়া মানে ছিল পৈতৃক ভিটে হারানো, বা বাস্তুচ্যুত হওয়া - ফলত: তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সংকোচন। ১৯২০ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের হাতে থাকা জমির পরিমাণ ২-৩% থেকে বেড়ে হয়ে দাঁড়ায় ৬-৭%, আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল (যেটা পরিসংখ্যানের নীচে প্রায়শই চাপা পড়ে যায়) - জমির দখল নেওয়ার সময় ইহুদীদের চোখ ছিল প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর এবং চাষযোগ্য জমিগুলোকে তাদের আওতায় আনা - যেমন উপকুলের সমতল এলাকা, জেজরিল উপত্যকা, বা উত্তর গ্যালিলি - যে জমিগুলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আরব বর্গাদারেরা চাষ করে এসেছিল...

এর মধ্যেও, বিশের দশকে, বেইরুটে বসবাসকারী গ্রীক অর্থোডক্স জমিদার Sursock পরিবারের জমি হস্তান্তরের গল্পটা সবচেয়ে প্যাথেটিক। এই পরিবার জেজরিল উপত্যকা অঞ্চলের প্রায় ৮০০০০ একর জমি বিক্রি করে দেন জিউয়িশ ন্যাশনাল ফান্ডকে, প্রায় সারে সাত লক্ষ পাউন্ডের বিনিময়ে। এই জমিতে বছরের পর বছর ধরে কাজ করে আসা হাজারো বর্গাদারকে নিমেষের মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়। এবং, ম্যান্ডেট অনুযায়ী জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম তৈরীর কাজে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার প্র্যাক্টিকালি কোনোরকমের সুরক্ষার ব্যবস্থা করেনি...এক ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারীর ভাষায়ঃ “The evicted tenants, who had cultivated the land for generations, were turned out without compensation. Many of them became homeless, and the villages they had built up were demolished.” 

উচ্ছেদ হওয়া চাষিরা দলে দলে ভিড় জমায় হাইফা আর জাফায়, চাষ ছেড়ে দিনমজুরির কাজে, কলেবরে বেরে ওঠে ওই অঞ্চলের বস্তিগুলোর চেহারা, এবং সেখানকার মানুষের মনে জমতে থাকা রাগ...১৯৩৬ সালে যার বিস্ফোরণ ঘটে।

১৯৩৬-৩৯ সালের বিদ্রোহ দমন করার পর, ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৯ সালের মে মাসে হোয়াইট পেপার প্রকাশ করে, যেখানে ইহুদী অভিবাসন ও জমি বিক্রির ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়। তারপর, ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা হয় ল্যান্ড ট্রান্সফার রেগুলেশনস। এই রেগুলেশন অনুযায়ী প্যালেস্টাইনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ঃ জোন এ - যেখানে ইহুদীদের কোনও জমি বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়, জোন বি - নিয়ন্ত্রণাধীন জমি বিক্রি, এবং জোন সি - যেখানে বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই। জোন এ ছিল মূলতঃ প্যালেস্টাইনের পার্বত্য হার্টল্যান্ড, যেখানে আরব জনগোষ্ঠীর ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। জোন সি অর্থাৎ জেজরিল উপত্যকা, বা উপকুলের সমভূমি অঞ্চল আর গ্যালিলি - সেখানে ইহুদী বসতি ততদিনে তৈরী হয়ে গেছে। আরব বিদ্রোহে খানিক ধাক্কা খেয়ে ব্রিটিশ সরকার এই সময়ে চেষ্টা করে ইহুদী আধিপত্য থাকা অঞ্চলের মধ্যেই আরও সম্প্রসারণের। জায়নিস্টরা প্রবলভাবে এই বিধির বিরোধিতা শুরু করে (খানিক ভায়োলেন্ট বিরোধিতাও ছিল এর মধ্যে)। আরবরা এই বিধি মেনে নিলেও তারা জানত যে ততদিনে অনেকটাই দেরী হয়ে গেছে, প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর মূল্যবান জমি ততদিনে ইহুদীদের হাতেই চলে গেছে...

১৯২২ সালের প্রথম সেন্সাস অনুযায়ী প্যালেস্টাইনে ইহুদী বসবাসকারীর সংখ্যা ছিল ৮৩,৭৯০ (১১%)। সেই সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়তে বাড়তে ১৯৩১ সালে হয় ১,৭৪,৬১০ (১৭%), ১৯৩৬ সালে প্রায় চার লক্ষ (৩৩%), এবং ১৯৪৭ সালে ছয় লক্ষেরও বেশি (৩৩%)। শতাংশের হিসেবে ৩৩% সংখ্যাটা স্থির থাকলেও, বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ইহুদী জনসংখ্যা বেড়েছিল আড়াই লাখের বেশি, অর্থাৎ, প্রায় ৬০ শতাংশ। আরব জনসংখ্যাও বেড়েছিল প্রায় সাড়ে চার লাখ - স্বাভাবিক জন্মহার আর প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অভিবাসনের ফলে। ফলে, শতাংশের হিসেবে ইহুদীরা এক-তৃতীয়াংশেই থেকে গেলেও, নিরঙ্কুশ সংখ্যায় তাদের উপস্থিতি ছিল আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন, আর তাদের বসতি ছিল প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর ভূমিতে।

১৯৩১ থেকে ১৯৩৬ এর মধ্যে ইউরোপে নাৎসী আমলে ইহুদীর ওপর চরম অত্যাচার শুরু হওয়ার ফলে ইহুদী অভিবাসন বেড়ে ওঠে। আরবরা এই আচমকা জনস্রোতে আতঙ্কিত হয়ে দেখে যে তাদেরই চাষআবাদের জমির ওপর গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতি। শহরাঞ্চলে কলেকারখানার দিনমজুরির ক্ষেত্রে আরবদের কম্পিটিশনে নামতে হয় নতুন অভিবাসী ইহুদীদের সঙ্গে। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন নিয়ে অধিবাসীদের একই মনোভাব থাকলেও, প্যালেস্তিনীয় আরবদের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল সেটা হল এই অভিবাসনের ফলে প্যালেস্টাইনের ডেমোগ্রাফির আমূল বদলে যাওয়া। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আরবরা বুঝতে পারে যে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা - ভবিষ্যতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের একমাত্র নিশ্চয়তা - ক্রমশঃ কমে আসছে।

এই পুরো সময় জুড়ে ব্রিটিশদের নীতির গতিবিধি থেকেছে খানিক পেন্ডুলামের মত। আরবদের দিক থেকে চাপ এলে তারা অভিবাসনের দরজা বন্ধ করেছে। আবার জায়নিস্টদের দিক থেকে চাপ এলে তারা আরও আরও অভিবাসনের অনুমতি দিয়েছে। তিরিশের দশকের শেষের দিকে এসে দেখা যায় এই পেন্ডুলামের নীতি কাউকেই খুশী করতে পারেনি। বরং বিবদমান দুই পক্ষই আরও বেশি র‍্যাডিক্যাল হয়ে উঠেছে...

No comments: