Wednesday, March 18, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: ব্যালফার ডিক্লারেশন

(৪) ব্যালফার ডিক্লারেশন (১৯১৭)

আর্চিবল্ড ওয়াভেল - প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্যালেস্টাইন অভিযানে যিনি অ্যালেনবির বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এবং চল্লিশের দশকের ক্রিটিকাল সময়ে যিনি আসবেন ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে - প্যারিসের শান্তি সম্মেলনের পর একটা কথা বলেছিলেন – "After 'the war to end war' they seem to have been pretty much successful in Paris at making a 'Peace to end Peace'" - প্যারিস শান্তি সম্মেলন সম্পর্কে এত সহজ বাস্তব বর্ণনা কেউ আজ অবধি দিতে পারেননি। যেমন, সাইকস-পিকট চুক্তি নিয়ে টিই লরেন্স (মানে লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া) বলেছিলেন - "a purely British and French show"...
কেন এই কথাগুলো এসেছিল, সেটা স্পষ্ট হবে যদি আমরা ১৯১৭ সালের ব্যালফার ডিক্লারেশনের ইতিহাসটা একবার দেখি। কালো কালিতে লেখা ডিক্লারেশন শেষ অবধি ইতিহাসকে লিখেছিল রক্তের অক্ষরে।
১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর - ব্রিটিশ ফরেন সেক্রেটারি আর্থার জেমস ব্যালফার ব্রিটিশ ইহুদী কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় লর্ড রথসচাইল্ডের উদ্দেশ্যে একটা ছোট চিঠি লেখেন। মাত্র সাতষট্টি শব্দের এই চিঠি মধ্যপ্রাচ্যকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছিল, যার ফলাফল আমরা আজও টের পাই। কী লেখা ছিল সেই চিঠিতে?
"His Majesty's government view with favour the establishment in Palestine of a national home for the Jewish people, and will use their best endeavours to facilitate the achievement of this object, it being clearly understood that nothing shall be done which may prejudice the civil and religious rights of existing non-Jewish communities in Palestine, or the rights and political status enjoyed by Jews in any other country."
১৯১৭ সালের আগে জায়নিস্টরা একাধিক ইম্পিরিয়াল শক্তির (অটোমান সাম্রাজ্য, জার্মানি, রাশিয়া ইত্যাদি) সামনে দরবার করলেও কেউই জায়নিস্টদের "ন্যাশনাল হোম"-এর দাবীকে সমর্থন করেনি। আর্থার ব্যালফার এই ডিক্লারেশনের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবার কোনও ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক শক্তি (ইনসিডেন্টালি, সেই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি) প্রকাশ্যে জায়নিজমের প্রতি সমর্থন জানালো…
ব্রিটেনের স্বার্থ কী ছিল?
মনে রাখবেন, সেই সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে পুরোদমে। ব্রিটেন চাইছিল রাশিয়া ও আমেরিকায় বসবাসকারী বিশাল ইহুদী জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে সেই দেশগুলোতে চাপ তৈরী করে তাদের মিত্রশক্তির পক্ষে আনার। উইৎজম্যানের নেতৃত্বে জায়নিস্টরা ব্রিটিশ পলিসিমেকারদের একাংশের মধ্যে সিমপ্যাথিও তৈরী করতে সফল হয়েছিল, আরেক অংশ ভেবেছিল ব্রিটেন সমর্থিত ইহুদী রাষ্ট্র সুয়েজ অঞ্চলে ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে উপযোগী "অ্যাসেট" হয়ে উঠবে কোনও এক সময়ে।
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল - এই ঘোষণার টাইমলাইনটাও বিশ্বযুদ্ধের কিছু ঘটনার সাথে খাপে খাপ মিলে গিয়েছিল: ১৯১৭ সালের ৩১ অক্টোবর বেরশেভার যুদ্ধে দক্ষিণ প্যালেস্টাইনের সামরিক অচলাবস্থার অবসান হয়, আর সেইদিনই ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় এই ডিক্লারেশনের অনুমোদনও দেওয়া হয়, বিশ্বব্যাপী ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ডিক্লারেশনের প্রোপাগান্ডা এফেক্টের কথা মাথায় রেখে।
জাতীয় বাসস্থান বা ন্যাশনাল হোমের আন্তর্জাতিক আইনে কোনও প্রিসিডেন্স ছিল না এর আগে। ব্রিটিশ ডিক্লারেশনের মধ্যে জিউয়িশ ন্যাশনাল হোমের সরাসরি মানে ইহুদী রাষ্ট্র না হলেও, জায়নিস্টদের মূল লক্ষ্য ছিল তাই। ব্রিটিশ সরকার পরে ক্ল্যারিফাই করে যে এই ঘোষণায় প্যালেস্টাইন বলতে তারা গোটা প্যালেস্টাইন জুড়ে ইহুদী ন্যাশনাল হোমের কথা বোঝাতে চায়নি। এবং, চিঠির শেষাংশ, মানে "existing non-Jewish communities" কথাগুলো এই ঘোষণার বিরোধী যাঁরা বাস্তবে ওই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্ভাব্য ক্ষোভ এবং বিশ্বজোড়া "অ্যান্টিসেমিটিজম"-এর আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের সন্তুষ্ট করার জন্যে জোড়া হয়েছিল।
ডিক্লারেশনের বেসিক কন্ট্রাডিকশনগুলো নিমেষেই স্পষ্ট হয়ে ওঠেঃ ব্রিটেন এমন এক ভূখণ্ডে ইহুদী ন্যাশনাল হোম গড়ে তোলার কমিটমেন্ট করছে যেখানে প্রায় ৯৪% অধিবাসীই প্যালেস্টিনীয় আরব জনগোষ্ঠীর মানুষ। প্যালেস্টিনীয় লেখক রেফাত ইব্রাহিম এই ডিক্লারেশন সম্পর্কে লিখেছিলেন - "Balfour promised what he did not own to those who did not deserve it." 

সাতষট্টি শব্দের এই চিঠিতে প্যালেস্টাইনের ৯৪% আরব অধিবাসীদের কলমের এক খোঁচায় "নন-জিউয়িশ কমিউনিটি" বলে ছেড়ে দেওয়া হল। তাদের জন্যে রইল শুধু "সিভিল অ্যান্ড রিলিজিয়াস রাইটস" - খেয়াল করবেন, রাজনৈতিক অধিকার বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার - এই শব্দগুলো এই বিশাল সংখ্যাধিক্য মানুষের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। বরং জনসংখ্যার মাত্র ৬% অংশকে সেই এলাকায় "ন্যাশনাল হোম" বানানোর অধিকার দেওয়া হল, দেওয়া হল রাজনৈতিক অধিকার, এও বলা হল যে এই চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে অন্য কোনও দেশে ইহুদী অধিবাসীদের অধিকার এবং রাজনৈতিক মর্যাদার কোনও হেরফের হবে না।
১৯১৯ সালে, আর্থার ব্যালফার এক আভ্যন্তরীণ চিঠিতে আরও ভয়ানক কথা লিখেছিলেন - "In Palestine, we do not believe in the principle of self-determination for the existing population." কলোনিয়াল শাসনের ইতিহাস যদি ঘাঁটি, দেখতে পাব সেই আমলে ইউরোপীয় কলোনিয়াল শক্তির মনোভাব ছিল এইরকমই - স্থানীয় অধিবাসীদের দাবী, সত্ত্বা, পরিচয়কে পুরোপুরি অস্বীকার করা, এবং এক সময়ে মুছে ফেলা। শুধু আরব নয়, ভারত সম্পর্কেও ব্রিটিশ সরকারের এক বড় অংশের মনোভাব ছিল এমনই – অশিক্ষিত নেটিভ হিদেন।
আর্থার ব্যালফারের এই ডিক্লারেশনকে শেষ অবধি প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেটে জায়গা দেওয়া হয়, ব্রিটেন আইনতঃ বাধ্য হয়ে পড়ে এই ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করতে, কারণ ব্যালফার ডিক্লারেশন আন্তর্জাতিক আইনে একটা চিঠির বেশি কিছু না হলেও, লীগ অফ নেশনসের প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেট মেনে চলা বাধ্যতামূলক। ব্রিটেনের পক্ষে একই সঙ্গে ইহুদীদের ন্যাশনাল হোম তৈরী করার পাশাপাশি আরব অধিবাসীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা বাস্তবে একটা অসম্ভব "ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট" হয়ে দাঁড়ায়। এবং, দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা সংঘাতের সূচনা করে দেয়…
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আর্নল্ড টোয়েনবি ১৯৪৮ সালের নাকবা (প্যালেস্টিনীয়দের দেশছাড়া হওয়ার ঘটনা) সম্পর্কে লিখেছিলেন - "natural outcome of the Balfour Declaration, not a deviation from it." প্যালেস্টিনীয়দের কাছে এই ডিক্লারেশন আজও একটা উন্মুক্ত ক্ষত। রেফাত ইব্রাহিমের ভাষায় - "Children who have lost their homes know Balfour's name before they know the names of current leaders. They instinctively understand that what is happening is not merely a war, but a continuation of a promise written over a century ago and still enforced on their bodies."

No comments: