Thursday, December 06, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (শেষ পর্ব)

ভোর চারটেতে অ্যালার্ম দিয়ে উঠে তৈরী হয়ে নিলাম। পাঁচটায় গাড়ি আসবে, তার আগে যতটা সম্ভব কাজ এগিয়ে রাখলে সাফারি থেকে ফিরে ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে পড়া যাবে। সেদিন অনেক দূর যাওয়া - সেই মালদা অবধি। গোছগাছ সব সারা। গাড়ি (মাথাখোলা জিপসি) এসে গেলো ঠিক পাঁচটায়। সওয়া পাঁচটার মধ্যে আটজন জঙ্গলপিপাসুকে নিয়ে গাড়ি রওনা দিলো চিলাপাতা ফরেস্ট অফিসের দিকে - পারমিট নিতে হবে। মেন্ডাবাড়ি থেকে বেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই কিছুদূর গিয়ে একবার বড় রাস্তায় উঠতে হয় - সেখান দিয়ে অল্প দূরে গিয়েই ফরেস্ট অফিস। ফরেস্ট অফিসের আশেপাশে সব বাড়িই একটু উঁচুতে - থামের ওপরে তোলা। দুটো কারণে - (এক) বর্ষায় জল তলা দিয়ে বেরিয়ে যায়, আর (দুই) ছোটখাটো জন্তুজানোয়ার এলে বাড়িতে ধাক্কা মারতে পারে না।

পারমিট নিতে মিনিট দশেক, তারপর আবার জঙ্গলের রাস্তা। রাস্তার কথা আগেই বলেছি - শুধু চোখ বন্ধ করে একবার ভেবে নিন - ভারতের দ্বিতীয় ঘন জঙ্গল, সুন্দরবনের পরেই - তার চেহারা কেমন হতে পারে। সূর্য্য তখনো পুরো ওঠেনি, অল্প আলো ফুটেছে। পাশের জঙ্গলে তখনো আলোআঁধারির খেলা। রাস্তাটা চলে গেছে দূরে কোন গভীরের দিকে জানি না। শুধু দূরে দেখা যায় আবছা আলোয় টানেলের মত গাছের আড়ালে ঘুরে গেছে রাস্তাটা...অল্প কুয়াশা নেমেছে সেখানে...বাঁকের পরে কোন রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কে বলতে পারে। চাপড়ামারির মত গাড়ির ভিড় নেই, সেই মুহুর্তে শুধু একটাই গাড়ি শুকনো পাতার ওপর অল্প আওয়াজ করে এগিয়ে চলেছে। পাশের জঙ্গলে খড়মড় করে অল্প আওয়াজ, তাকিয়ে দেখবেন দুটো হরিণ অবাক চোখে তাকিয়ে রয়েছে - গাড়িটা দেখেই উল্টোদিকে ঘুরে দৌড়। ফিসফিসিয়ে কথা বলুন, আশেপাশে পাখি রয়েছে অনেক - কান খাড়া করে রাখলে তাদের কথা বলা শুনতে পাবেন। গাছের মাথা থেকে হুউউউউট হুউউউট করে আওয়াজ শুনে তাকিয়ে দেখুন - পেঁচা বসে রয়েছে একটা। গাছের ডালে খড়খড় ঝাপটা - তাকিয়ে দেখুন কয়েকটা বাঁদর ডাল বদলে বসলো...




আস্তে আস্তে গাড়ি চলছে, সূর্য্য উঠলো বুঝতে পারছি - গাছের ফাঁকে ফাঁকে আলো দেখা যাচ্ছে। অক্টোবরের ভোরে অল্প ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে...হাওয়ায় ঝিরঝির করে সাড়া দিচ্ছে চিলাপাতা...আমাদের নজর দুদিকের জঙ্গলে...। মিনিট কয়েকের মধ্যে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়লো। সামনে দেখলাম আরো দুটো জিপসি রাস্তার মধ্যে দাঁড়িয়ে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার ফিসফিস করে বললেন - হাতি। ডানপাশের জঙ্গলে, হার্ডলি তিরিশ ফুট দূরে তিনটে হাতির একটা পরিবার পাতা খেতে ব্যস্ত। ক্যামেরা তুলে তাক করে দাঁড়িয়ে রইলাম, যদি সুযোগ পাই একটা। কিন্তু সামনের দিকে না এসে একটা হাতি আরেকটু দূরে গিয়ে রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকের জঙ্গলে ঢুকে গেলো...একটা মাঝারি সাইজের দাঁতাল। তার বউটা তখনো বাচ্চাটাকে নিয়ে ডানদিকের জঙ্গলেই রয়েছে। আমরাও দাঁড়িয়ে রয়েছি। এর মধ্যে আমাদের গাড়িটা রিভার্স করে আরো ফুট দশেক জঙ্গলের ভিতরে ঢুকে পড়লো, আরো কাছে - খুব বেশি হলে কুড়ি ফুট দূরে, একটা বড় ঝোপের আড়ালে দেখতে পাচ্ছি মা হাতিটার শরীরের ওপরের দিকটা, আর তার সামনেই বাচ্চাটাও রয়েছে, একদম পাহারা দিয়ে রেখেছে যেন। একদম চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি আমরা কজন, নিঃশ্বাসও ফেলছি না প্রায়...ওদিকে হাতি দুটোও তাই। কতক্ষণ হবে? মিনিট দশেক প্রায়? তারপর খস খস করে আওয়াজ পেলাম, ক্রমশ সেটা দূরে মিলিয়ে গেলো। বুঝলাম মা হাতিটা বাচ্চাটাকে নিয়ে আরো গভীরে ঢুকে গেছে। ভেবেছিলাম আরো কিছুক্ষণ দাঁড়াই, কিন্তু গাইড যিনি, তিনি বললেন যে দাঁতালটা রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকে গেছে, সেটা পরিচিত হাতি, আর তার খানিক ইতিহাসও আছে ফিরে আসার, আর সেটা সুখকর নয়, না দাঁড়ানোই ভালো।

[গল্প (বা ঘটনাটা) পরে শুনেছিলাম দেবাশিসের কাছে। ঠিক গোধূলির মুখে, জঙ্গলের মধ্যে রাস্তায় হাতি প্রায় ব্যাকগ্রাউন্ডের সাথে মিশে যায়, ভালো বোঝা যায় না। এই কিছুদিন আগেই - মাস দুয়েক হবে হয়তো - দুটি ছেলে চিলাপাতার গেটের কাছেই পিচরাস্তায় বাইক নিয়ে যাচ্ছিলো একটু জোরেই। এই দাঁতালটাই একটা বাঁকের মুখে বসে ছিলো। ছেলেদুটো বাঁক ঘুরেই হাতিটাকে ধাক্কা মারে। বাইক ছিটকে পড়ে যায়, ছেলে দুটোও উল্টে গিয়ে পড়ে - একজন বাইকের পাশেই, আরেকজন বাইক থেকে অল্প দূরে জঙ্গলের পাশে। হাতিটা প্রথমে বাইকের পাশের ছেলেটাকে আছড়ে আছড়ে মারে, তারপর বাইকটাকে পা দিয়ে থ্যাঁতলায়। তারপর উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটা দেয়। এর মধ্যে অন্য ছেলেটা এইসব দেখে হামাগুড়ি দিয়ে সরে যাচ্ছিলো - এর মধ্যে তার মোবাইলটা বেজে ওঠে। হাতিটা ফিরে যেতে গিয়েও ঘুরে আসে, ছেলেটাকে শুঁড়ে তুলে আছড়ে ফেলে পা দিয়ে থেঁতলে মাংসপিন্ড বানিয়ে তারপর আবার জঙ্গলে ঢুকে যায়।]

গাইডের বারণ শুনে আর দাঁড়াইনি। ছবি পেলাম না ঠিকই, কিন্তু ওই দশটা মিনিট প্রায় নিশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষার মুহুর্তগুলো সেই যে সিন্দুকটা থাকে যেখানে বিশেষ বিশেষ কিছু ছবি/কথা জমানো থাকে, সেখানে ঢুকে গেছে।

চিলাপাতার ক্লাইম্যাক্স এইটাই। এর পরেও জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে বেড়ালাম প্রায় সাড়ে সাতটা অবধি। টুকটাক পাখি, খরগোশ, হরিণ চোখে পড়লেও আর সেরকম কোনো ঘটনা ঘটেনি। মাঝে একটা গড় চোখে পড়লো - পুরনো কেল্লার ধ্বংসাবশেষ - বলে নলরাজা গড়, গুপ্ত যুগের সময়কার নল রাজাদের কেল্লা। তার সামনের গেটটা এখনো দেখা যায় মাটির ওপর কিছুটা জেগে রয়েছে। আগে ভিতরে ঘুরে বেড়ানো যেত, কিন্তু এখন জঙ্গল এতটাই ঘন যে আর ওদিকে যেতে দেয় না।

আরো এদিক সেদিক কিছুক্ষণ ঘুরে একটা ওয়াচটাওয়ারের পাশ দিয়ে প্রায় সাড়ে সাতটা নাগাদ ফিরে এলাম ফের মেন্ডাবাড়িতে। সাফারি শেষ। আমাদের বেড়ানোও। এবার ফেরার পালা।

ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে সব জিনিসপত্র গাড়িতে তুলে রওনা দিলাম। দেবাশিস আগে কালজানি বলে একটা নদীর ধারে ঘোরাতে নিয়ে গেল - এমনিই বেশ সুন্দর জায়গা। তারপর টিপিক্যাল হাইওয়েতে না উঠে ফালাকাটা-ধূপগুড়ি-ময়নাগুড়ির রাস্তা ধরলাম - কারণ চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে এই রাস্তাটা অসম্ভব সুন্দর, এবং তাড়াতাড়ি ফুলবাড়ি বাইপাস হয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েতে ওঠা যাবে। এতে এবারের মত মালবাজারে বাপীদার হোটেলে বোরোলি বা অন্যান্য মাছ খাওয়া হল না বটে, কিন্তু সন্ধ্যের মধ্যে মালদা পৌঁছনোর প্ল্যানটা ঠিকই রইলো। বাপিদার হোটেলে খাওয়া শুরু হয় বারোটার পর - ততক্ষণ অপেক্ষা করতে গেলে দেরি হয়ে যেত।

এরপর আর সেরকম ঘটনা নেই। ফুলবাড়ি বাইপাস ধরে এনএইচ ১২ এ উঠলাম, হাইওয়ের ধারে একটা রেস্তোরাঁয় ছেলেমেয়ের শখ মিটিয়ে চীনে খাবার প্যাক করানো হল। আমার খেতে সময় লাগে না বলে আমি পার্কিংএই দাঁড়িয়ে পটাপট খেয়ে গাড়িতে স্টার্ট দিলুম, বাকিরা গাড়িতে খেতে খেতে চললো।

ইসলামপুর ছাড়িয়ে ফের বোতলবাড়ি-রসখোয়া রোড। দুপাশে গ্রামের পর গ্রাম ফেলে রেখে রায়গঞ্জ হয়ে মালদা। মালদা টাউনে ঢোকার আগে গোল্ডেন পার্ক বলে একটা হোটেল/রিসর্ট আছে - যেখানে আগে থেকেছিলাম মালদায় বেড়াতে আসার সময়ে - সেখানেই উঠলাম সেদিন রাতের মত।

পরের দিন সকালে টোস্ট-অমলেটের ব্রেকফাস্ট সেরে মালদা পেরিয়ে ফারাক্কা হয়ে বহরমপুরের একটু আগে মোরগ্রামে এনএইচ ১২/৩৪ ছেড়ে ধরলাম স্টেট হাইওয়ে ৭ - যেটা মুর্শিদাবাদের মধ্যে দিয়ে আসে বর্ধমান অবধি। এনএইচ ৩৪ এর ট্রাফিক যদি এড়াতে চান তাহলে এই রাস্তাটাই নেওয়া ভালো - মুশকিলের মধ্যে খাবার জায়গা পাবেন না বিশেষ - ছোটখাটো ভাতের হোটেলের বাইরে বিশেষ কিছুই নেই। সেদিন বেকারি বন্ধ বলে কোথাও পাঁউরুটিও পাওয়া যায়নি। শেষে খড়গ্রামের কাছে একটা ভাতের হোটেলেই বিরিয়ানি পাওয়া গেল - মোটের ওপর মন্দ নয়, শুধু মিষ্টতাটা বেশি। বিকেল নাগাদ বর্ধমান - সেখানে একটা মিষ্টির দোকান থেকে সীতাভোগ/মিহিদানা কিনে সোওওজা দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে। শক্তিগড়ে দাঁড়িয়ে ল্যাংচামহলের ল্যাংচা, আর পাশের চায়ের দোকানে চা খেয়ে ফের রওনা। অবশেষে রাত আটটা নাগাদ গাড়ি পার্ক করলাম বাড়িতে। ট্রিপমিটার তখন দেখাচ্ছে ১৮৩১.৯ কিমি।


বেড়ানো শেষ আবার বছর দেড়েকের জন্যে। ২০২০তে ঋকের উচ্চমাধ্যমিক - তাই এর মধ্যে আর সবাই মিলে বড়্সড় বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হবে না। শুরুতেই লিখেছিলাম - স্কুলের ছুটির চেয়ে বড় টিউশন থেকে ফাঁক পাওয়া - সেটা ওই পুজোর কয়েকটা দিন ছাড়া সম্ভব নয়। যদি পারি, পরের বছর পুজোর ছোটো করে একটা রোডট্রিপ সেরে নেবো, আর নয়তো একটা গ্র্যান্ড প্ল্যান রয়েছে ২০২০ সালের জন্যে। ফের একটা ট্র্যাভেলগ নিয়ে আসবো তখন।

এই ট্রিপে দুটো পার্সোনাল রেকর্ড হল -

(১) একটানা ১৮ ঘন্টা গাড়ি চালানো, একদিনে
(২) স্কটিশ হাইল্যান্ডস বা লেক ডিস্ট্রিক্ট ছাড়া, এখানকার পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো

দেখা যাক, পরের প্ল্যানটা নামাতে পারি কিনা।

আমার কথাটি ফুরলো
নটেগাছটি মুড়লো।

(আগের কথা)

Wednesday, December 05, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (১০ম পর্ব)

শেষ হয়ে আসছে বেড়ানোর দিন। পানঝরা থেকে আমরা যাবো মেন্ডাবাড়ি - সেখান থেকে আবার ফেরা শুরু। বহুদিন পরের বেড়ানোটা এখনো অবধি দিব্যি হয়েছে। আমাদের প্রথমবার ডুয়ার্স আসা - এখনো অবধি সেভাবে বোর হতে হয়নি কোথাও।

আলিপুরদুয়ার থেকে মোটামুটি কুড়ি কিলোমিটার দূরে, জলদাপাড়ার পাশেই চিলাপাতা ফরেস্ট, হাসিমারা থেকে খুবই কাছে। এর মধ্যেই কোদাল বস্তির পাশে হল মেন্ডাবাড়ি জাঙ্গল ক্যাম্প - ডুয়ার্সের মধ্যে আরো একটা ইকো টুরিস্ট রিসর্ট। সময়মত গেলে আর কপালে থাকলে ক্যাম্পে বসেই আশেপাশে বুনো জন্তুজানোয়ার দেখতে পাওয়া যায় - কারণ চিলাপাতা রেঞ্জটা জলদাপাড়া আর বক্সা টাইগার রিজার্ভের মধ্যে একটা ন্যাচারাল করিডরের কাজ করে। এখানে যেতে হলে আপনাকে চাপড়ামারি ছাড়িয়ে নাগরাকাটা, বানরহাট, বীরপাড়া পেরিয়ে যেতে হবে হাসিমারা। হাসিমারা গুরদোয়ারা পেরিয়ে আরেকটু এগোলেই চিলাপাতার শুরু। যাওয়ার পথটা জলদাপাড়ার পাশ দিয়ে চলে গেছে সোজা গৌহাটির দিকে, দুধারে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য চা-বাগান। মাঝে কথা হয়েছিলো এই রাস্তাটাকে ৪-লেন হাইওয়ে বানানোর - তাতে চা-বাগান তো নষ্ট হতই, আরো অনেক গাছ কাটা পড়তো - এমনকি জলদাপাড়ার গায়েও হাত পড়তো। কাজও শুরু হয়ে গেছিলো - নানা জায়গায় সেই কাজের চিহ্ন দেখতে পাবেন। কিন্তু পরিবেশের চাপে ভাগ্যক্রমে এই প্ল্যান বাতিল করে অন্য একটা রাস্তাকে চওড়া করার কাজ শুরু হয়েছে। বেঁচে গেছে অনেকটা জঙ্গল। জানা নেই যদিও কতদিনের জন্যে - সভ্যতা ক্রমশ ডুয়ার্সের দিকে হাত বাড়ানো শুরু করেছে বেশ কিছুদিন হল...


চাপড়ামারি থেকে হাসিমারা লাগলো ঘন্টাখানেক। দূরত্ব বেশি নয়, কিন্তু ৪০ কিলোমিটারের স্পীড লিমিট বাঁধা রয়েছে গোটা পথেই। হাসিমারা এয়ারবেস এর কাছেই রাস্তার ধারে দেবাশিসরা দাঁড়িয়েছিলো। ওরাও যাবে আমাদের সাথে মেন্ডাবাড়ি। বাকি পথটা দেবাশিসই চিনিয়ে নিয়ে গেলো আমাদের আগে আগে গিয়ে।

পিচমোড়া রাস্তা থেকে হঠাৎই একটা কাঁচা রাস্তা ঢুকে পড়েছে বাঁদিকে জঙ্গলের মধ্যে - সেই রাস্তা ধরতেই চোখের সামনে দৃশ্য পুরো বদলে যায়। চিলাপাতায় ঢুকলে চাপড়ামারিকে মনে হবে ঝোপঝাড়ের চেয়ে অল্প বড় কিছু। একইভাবে গাড়ি চলে চলে দুটো সমান্তরাল দাগ হয়ে রয়েছে - সেটাই রাস্তা। দুধারে ঘন জঙ্গল, গাড়ির গায়ে ছোঁয়া দিয়ে যায়। চাকার দাগদুটোর মধ্যেকার ঝোপঝাড় আরো অনেক ঘন। রাস্তার পাশেই খানায়েক ময়ূর খেলে বেড়াচ্ছে - গাড়িদুটোর দিকে একবার তাকিয়ে ফের খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। চলতে চলতে এসে পড়লাম কোদাল বস্তির সামনে। একটা ছোটো খাল পেরোতে হয় এখানে - আগে জলের মধ্যে দিয়েই পার হতে হত, কিছুদিন হল একটা কাঠের সাঁকো বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। জঙ্গলের মধ্যে একটা খোলা জায়গায় দুটো বাড়ি পিলারের ওপর দাঁড়িয়ে রয়েছে, আর একটা কাঠের গোল বাড়ি - সেটা খাওয়ার জায়গা। দুটো দোলনা রয়েছে খেলার জন্যে। আর ওই চত্ত্বরেই ঘুরে বেড়াচ্ছে আরো কয়েকটা ময়ূর। চারপাশে তারের উঁচু বেড়া দিয়ে ঘেরা, পাশেই ছোটো গ্রামটা, আর বড় বড় গাছে ঘেরা চারদিক...অসংখ্য পাখি, বিশেষ করে টিয়ার মেলা...বাইরে গ্রামের দিকটায় একটা কুনকী হাতি দাঁড়িয়ে কান নাড়িয়ে চলেছে, বড় নয়, বাচ্চা একটা। গ্রামে দুর্গাপুজো হচ্ছে - তার ঢাকের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি। হাতিটা যেন সেইটা শুনেই মাঝে মাঝে দুলে উঠছে, যেন নাচছে।

 (https://media-cdn.tripadvisor.com/media/photo-s/09/1e/4e/4b/chilapata-
jungle-camp.jpg -
বাড়িটার ছবি তুলতে ভুলে গেছি, তাই ট্রিপ অ্যাডভাইসর থেকে একটা ছবি দিলাম)

বাড়িটার দোতলায় (নাকি একতলাই বলা উচিৎ) দুটো বড় ঘর আছে - ডর্মিটরি টাইপের। এক একটা ঘরে পাঁচ ছয়্জন থাকতে পারে। ঘরগুলো বিশেষ মেন্টেইন হয় না - কারণ মেন্ডাবাড়ির গ্ল্যামার কোশেন্ট কমই বলা চলে। ঠিক luxurious জায়গা তো নয়। বাথরুমের অবস্থাও খুব ভালো নয় - একটু ভাঙা ভাঙা। কিন্তু চলে যায়। ইন ফ্যাক্ট, এরকম জঙ্গলের মধ্যে ঝাঁ চকচকে ঘরদোর বেমানানই লাগতো হয়তো।

[আর একটা বাড়ি আছে এখানে - সেটা আরেকটু উন্নত বলা যায়, কারণ এসি মেশিন বসানো রয়েছে - বছর দুয়েক আগে রাণিমা পদধূলি দিয়েছিলেন বলে বসানো হয়েছিলো। ভোল্টেজ এতই কম যে সে মেশিন বিশেষ চলেই না।]

(https://northbengaltourism.com/images/govt-resorts/mendabari_jungle_ca
mp_1_1024.jpg  -
এই ছবিটা নর্থ বেঙ্গল টুরিজমের সাইট থেকে দিলাম)

দুপুরের খাওয়া অ্যাজ ইউজুয়াল - ভাত, আলুভাজা, ডাল, তরকারি আর ডিমের ঝোল। সেদিন আমরা আটজন, পরিমাণও সেই অনুপাতে। রাঁধুনী আর কেয়ারটেকার দেবাশিসের পরিচিত - সেই কারণে, নাকি দেবাশিসের বক্তব্য অনুযায়ী গাঁজার ধুমকিতে - কে জানে - আট জনের জন্যে দুই ডজন ডিম! ডিমখোড়ের মধ্যে পড়ি আমি, সুমনা আর দেবাশিস...তাতেও একটা/দুটো এক্সট্রা হলে কথা ছিল - আটটা ডিম বেশি - ভাত খাওয়ার পর কোনোমতেই শেষ করা সম্ভব নয়।

খাওয়াদাওয়া শেষে বেলা পড়ে আসার আগে দুটো গাড়িতে রওনা দিলাম জয়ন্তী নদীর দিকে। হাইওয়ে ধরে কিছুদূর গিয়ে বক্সা টাইগার রিজার্ভের সীমানা। তার মধ্যে দিয়েই চলে গেছে হাইওয়েটা সোজা ভুটান সীমান্তের দিকে। শুধু গেট পার হওয়ার আগে টিকিট কাটতে হয় - টোলও বলা যায়। কালো চকচকে পিচঢালা রাস্তা, দুপাশে বেশ ঘন জঙ্গল। কিন্তু যদি জন্তুজানোয়ার দেখার ইচ্ছে থাকে, এই পথে সেই ইচ্ছে পুরো সফল হবে না, কারণ শ'য়ে শ'য়ে মোটরগাড়ি আর মোটরসাইকেল যাচ্ছে এই রাস্তায়। এমনকি বাসও। পাখির ডাক শুনতে পাবেন - যদি না জঙ্গল কাঁপিয়ে কোনো বাইক চলে যায়। কিছু পাখি দেখতেও হয়তো পাবেন। দু একটা ছোটখাটো জন্তুও হয়তো - যেমন হরিণ (আমরা পেলাম একটা বার্কিং ডিয়ার)। তার বেশি কিছু চাইলে এখানকার সাফারি ছাড়া উপায় নেই।


এই পথটা জঙ্গলের মধ্যে দুভাগ হয়ে একটা ভাগ চলে যায় জয়ন্তী নদীর দিকে। সেখানে বিকেলের দিকে যেন মেলা বসে যায়। নদী পেরিয়ে জঙ্গলের মধ্যে একটা ওয়াচটাওয়ার আছে - কিন্তু সেখানে যেতে চাইলে জিপসি জাতীয় গাড়ি নেওয়াই ভালো। আমরা হয়তো পেরিয়ে যেতে পারতাম বিআরভি নিয়ে, কিন্তু দেবাশিসদের ছোট গাড়ি, এগজস্টে জল ঢুকে গেলে চিত্তির। তাই নদী না পেরিয়ে নদীর ধারেই কিছুটা সময় কাটানো হল।

নদীর খাতটা বেশ চওড়া - হয়তো বর্ষার সময় পুরো ভরে যায়। পুজোর সময় জল শুধু মাঝে অল্প কিছুটা, বড়জোর তিরিশ ফুট। নুড়িপাথরে মোড়া খাত, জুতো খুলে নদীর জলে নামলে টের পাবেন যে সেটা পাহাড় থেকে নেমেছে। উল্টোদিকে আবছা নীলচে ভুটান পাহাড় দেখা যায়। ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে সময় কাটানোর পক্ষে বেশ ভালো জায়গা, শুধু একমাত্র আপদ গাদা গাদা মোটরসাইকেল, আর তাদের স্টান্টবাজি। নুড়িপাথরের মধ্যে চাকার গ্রিপ ভালো ধরে না, তাই হাতের কাছে অফরোডিং এর সাইট হল এইটা...বাইক নিয়ে গোঁ গোঁ করে জলে নামছে, নদীর মধ্যে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আবার গোঁ গোঁ করছে, তারপর আবার উল্টোদিকে ফিরে যাচ্ছে - এইটাই ওদের স্টান্ট। এর মধ্যে আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়িয়ে, নদীর পাথর কুড়িয়ে ব্যাংবাজি করে ঘন্টাখানেক সময় কাটিয়ে ফেললাম। তারপর সন্ধ্যে নামতে আবার বক্সার জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মেন্ডাবাড়ি অবধি। মাঝে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে উত্তরবঙ্গের রসগোল্লা...




মেন্ডাবাড়িতে সেদিন আমাদের প্রথম আর শেষ রাত্রি। ডুয়ার্সেও শেষ রাত্রি। শুধু বাকি রয়েছে পরের দিন ভোরবেলার সাফারি। চাপড়ামারির মত চিলাপাতায় কিন্তু অত বেশি সংখ্যক গাড়ি আসে না। ভোর পাঁচটায় আর বিকেল তিনটের সময় মেন্ডাবাড়ি থেকে দুটো, চিলাপাতা বাংলো থেকে চারটে - এই ছ'টা গাড়িই একসময় জঙ্গলে ঢুকতে পারে। সেরকমই একটা জিপসি আমরা বুক করে রাখলাম পরের দিন সকালের জন্যে।

রাতে খাওয়ার (ঠিক ধরেছেন, রুটি আর চিকেন) পর বারান্দায় গল্প করছি। হঠাৎ নিস্তব্ধ জঙ্গল খানখান হয়ে গেল টিন পেটানোর আওয়াজে। সাথে তুমুল জোরে ঢাকের আওয়াজ, আর লোকজনের চেঁচামেচি। পাশের কোদাল বস্তি পুরো জেগে গেছে। কারণ বাংলোর ঠিক পাশের জঙ্গলে হাতি এসেছে। যদিও টর্চ ফেলেও আমরা কিছু দেখতে পাইনি। বাংলোয় সার্চলাইট থাকলে হয়তো দেখা যেত, হয়তো যেত না। শুনলাম হাতি চাইলে প্রায় নিঃশব্দেই যাওয়াআসা করতে পারে - কেউ টেরটিও পাবে না। আধ ঘন্টা টিন পেটানো, ঢাক, চিৎকারের পর সব শান্ত হল। আমরা ঘুমোতে চলে গেলাম। ভোর পাঁচটায় গাড়ি এসে যাবে।

(চলবে)

(আগের কথা)

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৯ম পর্ব)

দ্বিতীয়দিন থেকে একটু বোর লাগা শুরু হল - একেবারেই কিছু করার না থাকলে যা হয়। আকাশটা একটু ভালো থাকলে পিছনের পাহাড়টায় ঘুরে আসা যেত, কিন্তু সেও গুড়ে বালি। অগত্যা বই আর ঘুম, ঘুম আর বই। মাঝে সকালে পুরী-সবজি, দুপুরে ডিমের ঝোল, ডাল আলুভাজা আর ভাত, রাতে রুটি আর দেশি মুরগীর ঝোল। এর মধ্যে দোতলায় যাঁরা ছিলেন, তাঁরা চলে গেলেন। ফোর্সের একটা ভাড়ার গাড়ি এসে নিয়ে গেলো। তখনই শুনলাম - নিজের গাড়ি নিয়ে ওপরে আমরাই প্রথম যাত্রী।

সেদিন বিকেল থেকে ঋতিরও মুখ একটু ভার। কী ব্যাপার? না পরের দিন ওই রাস্তায় নামতে হবে, তাই একটু...ওই আর কী...পেট গুড়গুড় করছে। আরে তুই তো নর্থ সিকিমও ঘুরে এলি - তখন তো বলিসনি। জানলাম তখনও নাকি ভয় ভয়ই করেছিলো। তা আমি যে পরের বার গাড়ি নিয়ে অরুণাচল যাবো - তুই যাবি না? সোজা উত্তর - না।

পরের দিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে ব্যাগপত্র গুছিয়ে গাড়িতে তুলতে তুলতে ন'টা বেজে গেলো। টিপ টিপ করে বৃষ্টি পড়ছিলো - তাই দেরী না করে নামতে শুরু করলাম, আবার ওই পাথর মোড়া রাস্তায়। নামার সময় আর অত চিন্তা নেই - একবার উঠেছি যখন, রাস্তা জানা হয়ে গেছে, অজানা কোথাও যাচ্ছি না আর। তবে সাবধানতাটা বেশি, কারণ নিউটনসায়েবের থিওরি, আর প্রাকৃতিক নিয়ম। নামার আগে বলেছিলাম একটু ভিডিও করে রাখতে - সেও করা হল, অপেক্ষকৃত কম দুলুনি যেখানে সেখানে। দুলতে দুলতে, লাফাতে লাফাতে অবশেষে ফের ফাড়ি বস্তি...মোমোর দোকান ইত্যাদি।

(ফাড়ি বস্তিতে নেমে ঋতিকে বল্লাম - এই তো দ্যাখ, কেমন সুন্দর নেমে এলাম। এবার অরুণাচল যাবি তো? ঋতি উত্তর দিলো - আগে আমাকে "আনস্ক্র্যাচড" অবস্থায় বাড়ি পৌঁছে দাও, তারপর ভাববো। অথচ, এর আগে চিলিকা, পুরী, সাতকোশিয়ার সময় এত ভাবনা ছিলো না। অবিশ্যি সেও বছর পাঁচেক আগের কথা।)

গাড়ি দাঁড় করিয়ে একটু নীচের দিকের রাস্তা ধরে হেঁটে রিভার ক্যাম্পও ঘুরে এলাম। আসল রিভার ক্যাম্প, যেটা মূর্তির ধারেই ছিলো, সেটা বন্ধ হয়ে পাহাড়ের গায়ে একটা নতুন রিসর্ট হয়েছে। নদীর ধারটা এখন পিকনিক স্পট। ডুয়ার্সে বেড়াতে আসা লোকজন সান্তালেখোলা অবধি নিজেদের গাড়িতে এসে ফাড়ি বস্তি থেকে লোকাল ভাড়ার গাড়ি নিয়ে পিকনিক করতে যান।




সান্তালেখোলার পর্ব শেষ। এখান থেকে আমরা যাবো পানঝরা - চাপড়ামারি রিজার্ভের ভিতরে। যে রাস্তায় এসেছিলাম, সেই পথেই ফিরলাম - এক দুবার একটু রাস্তা জিগ্গেস করতে হল বটে, কিন্তু মোটামুটি ঠিকভাবেই সেই সামসিং চাবাগানের মধ্যে এসে পড়লাম। এর পরেই মূর্তি ব্রীজ, আর তারপর নয়াবস্তি পেরিয়ে আরেকটু গিয়েই চাপড়ামারির গেট। গেটে সমস্ত কাগজ দেখাতে হল, নামধাম এন্ট্রি করতে হল, তারপর ঢুকলাম জঙ্গলের মধ্যে। জঙ্গলের বাইরের রাস্তা আর জঙ্গলের ভিতরের পরিবেশের মধ্যে আকাশপাতাল তফাত। নিঝুম জঙ্গলে শুধু পাখির ডাক আর ঝিঁঝিপোকা - গাছের পাতার ফাঁকে ফাঁকে অল্প আলো এসে পড়ছে - ভেজা ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে মাটি। রাস্তাটা একটা গাড়ি যাওয়ার মতন, কোথাও কোথাও পাশের ঝোপঝাড় গাড়িতে ঠেকে যায়। নীচে গাড়ির চাকা গিয়ে গিয়ে দুটো সমান্তরাল মাটির লাইন হয়ে রয়েছে, তার মাঝখানে ঝোপঝাড় যে কে সেই - গাড়ির নীচে নানারকম বাজনা বাজায় - খসখস - খুট - টুংটাং...

কিলোমিটার খানেক গিয়ে ফরেস্ট বাংলো - সরকারি এলাকা, তার মধ্যে একটা ওয়াচটাওয়ার (যেখানে আমরা বিকেলে আসবো)। বাংলোটার সামনে দিয়ে বাঁদিক ঘুরে আরো ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আরো আড়াই তিন কিলোমিটার গিয়ে চাপড়ামারির ঠিক বাইরে একটা খালি জমিতে পানঝরা রিসর্ট। কাঠের তৈরী চারটে না পাঁচটা কেবিন, সামনে একটু লন - সেখানে বাচ্চারা দৌড়োদৌড়ি করতে পারে, তার পরেই বেড়া, আর একপাশে ইলেক্ট্রিক ফেন্স - হাতি আটকানোর জন্যে। সামনে দিয়ে মূর্তি নদী চলে গেছে, কোনের দিকটায় মূর্তির ওপর রেলব্রীজ আর গাড়ি চলার ব্রীজ।





মোটের ওপর জায়গাটা বেশ সুন্দর। একেবারে জঙ্গলের মধ্যে নয় বটে, কিন্তু জঙ্গলের গায়েই। ইলেক্ট্রিক ফেন্স মানে হাতি বা অন্য জন্তু চলে আসার ইতিহাস রয়েছে। টুরিস্ট বলতে সেই মুহুর্তে শুধুই আমরা। কটেজগুলোর মাঝে একটা কমন বারান্দাওয়ালা রান্নাঘর কাম খাবার জায়গা কাম রিসেপশন। সেখানে কাগজপত্র দেখাতে আমাদের দুটো কটেজ খুলে দিলো। সান্তালেখোলায় ঠান্ডা আর ল্যাদ কাটিয়ে কেউই চানটান আর মাথায় আনেনি। এখানে গরমজল পেয়ে আগে চান, তারপর আবার গরম গরম ভাত-ডাল-আলুভাজা আর বড়সড় মাছ। খাবার দেওয়ার সময়েই বলে দিলো সাড়ে তিনটে নাগাদ ওয়াচটাওয়ারে চলে যেতে, তারপর সাড়ে পাঁচটায় ট্রাইবাল ডান্স হবে রিসর্টে, সাথে চা আর পকোড়ার স্ন্যাক্স।


চাপড়ামারি কিন্তু বেশ পুরনো। ব্রিটিশ আমলে একে ন্যাশনাল রিজার্ভ ফরেস্ট হিসেবে ঘোষণা করা হয়। চাপড়ামারি ওয়াইল্ডলাইফ রিজার্ভ নামটা চালু হয় ১৯৪০ নাগাদ, আর ১৯৯৮ সালে একে ন্যাশনাল ওয়াইল্ডলাইফ স্যাংচুয়ারি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। আর চাপড়ামারি নামটা এসেছে "চাপড়া" - এক ধরণের ছোট মাছ, যেটা কিনা এই এলাকায় অজস্র ("মারি") পাওয়া যায়। কী পাওয়া যায়? প্রধাণতঃ হাতি। চাপড়ামারি বিখ্যাত হাতির জন্যে। তাছাড়া ভারতীয় বাইসন (বা গৌড়), লেপার্ড, হরিণ, শুওর ইত্যাদি পাবেন কপালে থাকলে, আর অনেক পাখি - অনেক রকমফের তাদের। যেমন ধরুন - ড্রঙ্গো, বা ফিঙে - সে কলকাতায় বাড়ির সামনে ইলেক্ট্রিক তারের ওপরেই বসে থাকতে দেখেছি (ইদানিং অবশ্য কমে গেছে)। কিন্তু র‌্যাকেট-টেইলড ড্রঙ্গো - তাদের ন্যাজে দুটো আলাদা লম্বা পালক - এসব শুধু এদিকেই পাবেন।

এসব খবর পেলাম ফোন ঘেঁটে। সাড়ে তিনটের সময় গাড়ি নিয়ে গুটি গুটি গিয়ে হাজির হলাম ওয়াচটাওয়ারের কাছে। সেখানে একটা বড় বোর্ডে বড় বড় করে লেখা রয়েছে কী কী ধরণের গাছ আর জন্তুজানোয়ার চাপড়ামারির অধিবাসী। ওয়াচটাওয়ারের সামনে একটু ফাঁকা জায়গা, তারপর তারের বেড়া (সম্ভবতঃ ইলেক্ট্রিক ফেন্স), তারপর একটা জলাজমি, তারপর একটা সল্ট লিক্‌ আর ওয়াটার হোল। টাওয়ার থেকে ওয়াটার হোলটা দুশো মিটার মতন হবে হয়তো। টাওয়ারটা তিনতলা - মানে মাটির ওপরে একটা লেভেল, তার ওপর আরেকটা। আমরা সোজা ওপরে চলে গেলাম...কেউ কোত্থাও নেই...দূরে জলাটার ওপাড়ে খান কয়েক বাইসন (গৌড়) কাদার মধ্যে ঝিমোচ্ছে, সেগুলোর কয়েকটার পিঠের ওপর খান কয়েক বক বসে (সম্ভবতঃ পোকা খাচ্ছে)।

জঙ্গলের সমস্যা হল এইসব জন্তু জানোয়ারগুলো ওই দূরে দূরেই থাকে। ঠিকঠাক ইকুইপমেন্ট না থাকলে ওই দূর থেকে দেখেই ক্ষান্ত থাকতে হবে। আর যদি ভালো কোয়ালিটির ছবিটবি তুলতে চান, তাইলে পেল্লায় লেন্স ঘাড়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। মুশকিল হল এই ধরনের লেন্স শুধু এই নেচার ফটোগ্রাফিতেই কাজে আসে, আর আমার সেদিকে খুব একটা আগ্রহ কখনোই ছিলো না বলে এসব লেন্সও আমার নেই। তবে ওয়াচটাওয়ারে উঠে মনে হল না এনে বোকামো হয়েছে। আমার ২৪-৭০মিমি লেন্স দিয়ে কিস্যু হবে না। অন্ততঃ ক্লাবের কারো কাছ থেকে একটা ৮০-৪০০ বা নিদেনপক্ষে ৭০-২০০ ধার নিয়ে আসা উচিত ছিলো। তা এখন আর আপশোস করে কীই বা হবে এই ভেবে ওই ২৪-৭০ দিয়েই অল্প সল্প চেষ্টা করলাম। বিশেষ কিসুই হল না। বিশেষ করে খান কয়েক ধণেশ (হর্নবিল) খালি এদিক ওদিক করছিলো - ওগুলোর ছবি তুলতে পারলে কাজের কাজ হত...


দিব্যি বসেছিলুম ওয়াচটাওয়ারে একখান মাদুর পেতে। হঠাৎ গোঁ গোঁ করে বেশ কয়েকটাই জিপসি ধেয়ে এলো বাইরের দিক থেকে। আর সেগুলো থেকে পিল পিল করে লোক। জিপসিপিছু ছজন মতন - কাজেই শ-খানেক বা আরো বেশি লোক তো হবেই। তারা এসেই খুব হন্তদন্ত হয়ে টাওয়ারের সামনে ফাঁকা জমিটাতে নেমে পড়লো - খুব হইচই - মোবাইলে ছবি, সেল্ফি স্টিকে মোবাইল লাগিয়ে দুশো মিটার দূর থেকে ভিডিও তোলার প্রচেষ্টা, সেটা হয় না বলে আরো খানিক হইচই, অবশেষে দুদ্দাড় করে টাওয়ারে ওঠা, টাওয়ারে খানিক ভূমিকম্পের এফেক্ট...আমরা না, মোটামুটি হাঁ হয়ে বসে আছি তখন...মানে ব্যাপারটা কী হচ্ছে বুঝতে না পেরে। ওয়াচটাওয়ারটা ফরেস্ট বাংলোর পাশেই, আর সেই সময়ে বাংলোর সামনে কিছু কাজ হচ্ছিলো - তার কিছু খুটখাট আওয়াজও ছিলো - যদিও সেই আওয়াজটা জঙ্গলের অ্যাম্বিয়েন্সে বেখাপ্পা ঠেকছিলো না। হঠাৎ, টাওয়ারের তলা থেকে বাজখাঁই গলায় কেউ চেঁচিয়ে উঠলেন - "আমরা মাল দিয়ে দেখতে এসেছি, তোরা এরকম আওয়াজ করলে আর জানোয়ার আসবে?"

দুশো মিটার দূরে ওয়াটার হোলটায় চারটে বাইসন ছিলো, দুটো উল্টোদিকে ঘুরে হাঁটা দিলো।


আরো অনেক কিছুই হচ্ছিলো। টাওয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে নীচে কারো উদ্দেশ্যে (তারস্বরে) বলা - এই আমার একটা ছবি তুলে দে তো, বা এর উল্টোটাও। স্টর্ক জাতীয় পাখি দু একটা হেঁটে বেড়াচ্ছিলো জলায় - সেগুলো দেখিয়ে "ওই দ্যাখ বাবু, ওই দ্যাখ - হর্নবিল"। একটা ময়ূরী জলার পাশে আসার চেষ্টা করছিলো - তার পেখম না থাকায় এমনই সমবেত দুঃখ হল, এ ময়ূরীটা লজ্জা পেয়ে আর এলোই না।

সবুজ পোশাক পরা কয়েকজনকে দেখে বুঝলাম এরা ফরেস্ট গার্ড। তাদের কাছে জানলাম - এইসব গাড়িগুলো ডেইলি টুরিস্টদের গাড়ি। এঁরা বিভিন্ন জায়গা থেকে ডুয়ার্স বেড়াতে এসে চালসা/মালবাজারের হোটেলে থাকেন, ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট সকালে দু ঘন্টা আর বিকেলে দু ঘন্টার সাফারি চালায়, সেই টিকিট কেটে এঁরা জঙ্গলে ঘোরেন। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের দায়িত্ব হওয়া উচিৎ ছিলো জঙ্গলে কী কী করা যায় আর কী কী করা যায় না সেগুলো বুঝিয়ে দেওয়া - সেটা হয় বলে মনে হল না। কারণ যা যা করার কথা নয় - উজ্জ্বল রঙের জামাকাপড় পরা থেকে শুরু করে চেঁচামেচি, হইচই, সেল্ফি স্টিক - সমস্তই হচ্ছিলো, এবং অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে। আর একটা কাজ তো অবশ্যই করা উচিৎ - গাড়ির সংখ্যার ওপর একটা লিমিট রাখা। কারণ বিরক্ত হয়ে যখন নেমে এলাম, তখন অন্ততঃ খান পঁচিশেক জিপসি ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।

নেমে আসাটা অবশ্য বোকামো হয়েছিলো - কারণ সেই যে ট্রাইবাল নাচের কথা বলেছিলাম - সেটা এই ডেইলি টুরিস্টদের প্যাকেজেরই অংশ। অত গাড়ির মিছিল সব গিয়ে পৌঁছলো পানঝরাতেই। আমরা পৌঁছে দেখি তখনই সামনের লনটা পুরো ভর্তি। টাওয়ারে থেকে গেলে সেখানটা খালিই পেতাম, হয়তো কিছুক্ষণ দাঁড়ালে হাতির দেখা পেলেও পেতে পারতাম...

যাই হোক - ভিড়ের মধ্যে আর নাচ দেখতে যাইনি, বরং বাংলোর সামনে রকে বসে চা আর পকোড়া খেয়ে গল্পসল্প করলুম। যখন বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে (এবং সব টুরিস্ট ফিরে গেছে), আমি একটু বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছিলুম - তখন হঠাৎ কসম্‌সে বলছি - টায়ার ফাটার মত একটা আওয়াজ এলো উল্টোদিকে নদী পেরিয়ে জঙ্গলের দিক থেকে, আর তার পরেই "আঃ" করে একটা চিৎকার - বাজি ফেলে বলতে পারি সেটা মানুষের গলার, আর আওয়াজটা বন্দুক জাতীয় কিছুর। তারপরেই বড় বড় টর্চের আলো ওদিক থেকে দেখা যেতে লাগলো। পানঝরার কেয়ারটেকার দুজন বল্ল হাতি এসেছে সম্ভবতঃ, যদিও ওদের টর্চের আলো (সাথে আমার সাথে আনা বড় ক্যাম্প লাইটের আলো) দিয়েও কিছু দেখা গেল না। ওদিকের আলোগুলো কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরে আবার নিভে গেলো। কী হয়েছিলো বুঝলাম না, তবে পরের দিন দেবাশিসের সাথে কথা বলে মনে হল চোরাশিকারের ঘটনা হলেও হতে পারে - ওদিকে বেশ কয়েকটা জঙ্গলের সিকিউরিটির দায়িত্ব এখন এসএসবির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, কারণ ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ছড়াচ্ছে - এবং এসএসবির মুখের আগে গুলি চলে। ঠিক কী হয়েছিলো সেদিন, তা হয়তো কখনোই জানতে পারবো না - পরের দিন কাগজ বা লোকাল লোকের মুখেও কিছু শুনিনি, তবে যতবার ব্যাপারটা মনে পড়ে, ততবারই চোরাশিকারের ধারণাটাই আরো গেঁথে বসে।

যাই হোক, পানঝরায় আমাদের এক রাতেরই থাকা ছিলো। জিনিসপত্র রাতেই গুছিয়ে রাখলাম। পরের দিন ব্রেকফাস্ট সেরেই বেরিয়ে যাবো - গৌহাটি যাওয়ার রাস্তা ধরে জলদাপাড়া পেরিয়ে মেন্ডাবাড়ি/চিলাপাতা।

(চলবে)

(আগের কথা)

Tuesday, November 27, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৮ম পর্ব)

সম্পূর্ণ নির্জনতা চান? টোটাল সলিটিউড? যেখানে অন্য ট্যুরিস্ট এসে লাফালাফি করবে না...শুধু আপনি, আপনার অল্প কয়েকজন সঙ্গী, ক্যামেরা, বই? মৌচুকী ক্যাম্প একেবারেই তাই। যে একদিন বা দুদিন এখানে থাকবেন, আপনার সঙ্গী বলতে (সঙ্গে যারা আছে তারা বাদ দিয়ে) চারপাশের জঙ্গল, বেশ কিছু পাখি, ঝিঁঝিঁপোকার ডাক, সন্ধ্যেবেলা আলো দেখে ধেয়ে আসা দলে দলে পোকা, দুটো হৃষ্টপুষ্ট কুকুর, আর বুদ্ধ - মানে মৌচুকীর কেয়ারটেকার। টুরিস্টের ভিড় নেই, মেমোরেবিলিয়ার দোকান নেই, গাড়ির আওয়াজ নেই...নিশ্ছিদ্র নিশ্চুপ নির্জনতা।

পাখির সীজনে গেলে - মানে আরেকটু শীত পড়লে - আপনি হেঁটে হেঁটে পিছনের পাহাড়টায় উঠতে পারেন - পাখির ছবিশিকারীদের স্বর্গ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে পূবদিকে ভুটান পাহাড় স্পষ্ট দেখা যায়। আর যদি আরেকটু অ্যাডভেঞ্চারের ইচ্ছে থাকে, তাহলে যে পাথরবসানো রাস্তায় উঠেছেন, সেই পথ বেয়েই নেমে যেতে পারেন পনেরো কিলোমিটার মতন দূরে মূর্তি নদীর ওপর একটা ছোট ঝরনার ধারে - জায়গাটার নাম ওরা দিয়েছে "রকি আইল্যান্ড", বা পিকনিক করে আসতে পারেন রিভার ক্যাম্পের কাছে মূর্তির ধারে। আর যেতে পারেন যুগলে, দ্বিতীয় বা তৃতীয় বা nth মধুচন্দ্রিমার জন্যে - ঠকবেন না গ্রান্টী।

আমরা গেছিলাম ল্যাদ খাবো বলে। আর আমার সুপ্ত ইচ্ছে ছিলো একটু pampered হওয়ার। ঋতিকে বললাম - রোজ তো আমি তোদের সবাইকে ঘুম থেকে তুলে স্কুল যাবার জন্যে তৈরী করি, এই কদিন না হয় তোরা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলবি, ব্রেকফাস্ট খাওয়াবি, ঘুরতে নিয়ে যাবি...ঋতি শুনে এক কথায় উত্তর দিলো - "আহ্লাদী":-)

সেদিন মৌচুকী পৌঁছে দেখলাম দোতলা কাঠের বাড়িটায় নীচের তলায় দুটো ঘর খালি, দোতলায় একটা ফ্যামিলি রয়েছে - তারা পরের দিন ফিরে যাবে। নীচের দুটো ঘরের মাঝখানে খাবার জায়গা। তিনবেলা খাবার পাবেন - সকালে ব্রেকফাস্ট, দুপুরের লাঞ্চ, রাতের ডিনার। এর মাঝে চা পেয়ে যাবেন চাইলে। নীচের ঘরে জিনিসপত্র রেখে একটু আশপাশটা দেখতে দেখতেই দুপুরের খাবার ডাক পড়লো। সাধারণ খাওয়া - ডাল, ভাত, তরকারি আর ডিমের ঝোল, কিন্তু পরিমাণ দেখে চক্ষু চড়কগাছ। বুদ্ধ মনে হয় খোদ আবদুর রহমানের হাতে ট্রেনিংপ্রাপ্ত। একটা পেল্লায় ক্যাসারোলে ভাত, প্রায় সেরকমই বড় পাত্রে ডাল/তরকারি...ডিমের ঝোলে ডিমের সংখ্যা অবশ্য মাথাপিছু দুটো করে। খাবার দেখিয়ে বুদ্ধ বললো - কম পড়লে বলবেন, আরো দিয়ে যাচ্ছি। খাওয়া শেষে দেখলাম ভাতের ক্যাসারোলের ওপরের ১/৩ কমেছে মাত্র, ডাল প্রায় যেমনকার তেমনি রয়ে গেছে, তরকারি - মানে তেলতেলে আলুভাজাটাই পুরো শেষ, আর ডিমের ঝোলটা। বুদ্ধকে জানিয়ে দিতে হল যে ভাত/ডালের পরিমাণটা একটু কম হলেই ভালো...

দুপুরে বাংলো খালি হয়ে যায় - বুদ্ধ আর ওকে সাহায্য করে বাচ্চামতন একটা ছেলে - ওরা নীচে ওদের গ্রামে যায়। একা থাকার অভ্যেস না থাকলে সেই সময়টা মনে হবে ভূতের বাড়িতে বসে আছেন। আলো পড়ে আসে তাড়াতাড়িই, পাহাড়ের গা বেয়ে মেঘ নামে - আস্তে আস্তে অল্প অল্প দেখতে পাওয়া ভুটান পাহাড় পুরো মেঘে ঢেকে যায়। নীচে কয়েক কিলোমিটার দূরে গ্রামটার ছোট ছোট বাড়িগুলোও চলে যায় মেঘের আড়ালে। কিছুক্ষণ পর বাড়িগুলোতে আলো জ্বলে উঠলে মেঘের মধ্যে দিয়ে আবছা আলোটা দেখা যায়। আর দেখা যায় উল্টোদিকের পাহাড়ের গায়ের বাড়িগুলোর আলো।

বারান্দায় বসে বই পড়ছিলাম, উঠে আলোটা জ্বালাতে হল। আর তার কিছুক্ষণ পরেই দলে দলে পোকা ধেয়ে এলো। প্রথমদিকে কত রকমের পোকা সেটা গোণার একটা ক্ষীণ চেষ্টা করেছিলাম - অল্প সময়ের মধ্যেই হাল ছাড়তে হল - কারণ পোকার সংখ্যা আর তার রকমের সংখ্যা হাতের বাইরে ততক্ষনে। বুদ্ধ এসে চা দিলো, তারপর আবার বই পড়া বা বকবক করা - কাজ বলতে এই। ছেলেমেয়ে কিছুক্ষণ বই পড়লো, কিছুক্ষণ মোবাইলে গেম খেললো। ওপরের পরিবারের লোকজনের সাথে দুটো চারটে কথা হল চা খাওয়ার সময়...

রাতের খাবারের সময় সেই একই হাল - দুপুরের মত। রুটি কটা লাগবে তা আর বলা হয়নি - অতএব খান পঁচিশেক রুটি এসে হাজির। সাথে আবার তেলতেলে আলুভাজা, ডাল আর চিকেন। অল্প ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়া, সাথে গরম রুটি, ডাল ইত্যাদি - রোজকার দুটো রুটির লিমিট পেরিয়ে সেদিন মনে হয় খান আষ্টেক খেয়ে ফেলেছিলাম। রান্নাও এখানে ভালোই করে, আর মুরগীটাও পোলট্রির পানসে মুরগী নয়...

ন'টা বাজতেই পাহাড়ে মাঝরাত হয়ে যায়। নিঝুম অন্ধকারে চারপাশে ঝিঁঝির ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। ও হ্যাঁ, দোতলায় পায়ে চলার জন্যে কাঠের মেঝের ক্যাঁচকোঁচ আওয়াজ ছাড়া।



(চলবে)



(আগের কথা)

Monday, November 12, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৭ম পর্ব)

দুপাশে চাপড়ামারির জঙ্গল ফেলে রেখে কালো কুচকুচে পিচ ঢালা কুমানি রোড চলে গেছে সাম্তালেখোলার দিকে। দু চোখ যদি খোলা রাখেন, পাশের জঙ্গলে হঠাৎ করে হরিণ দেখে ফেলতেই পারেন। আর পাখি তো অগুণতি, তেমন তাদের রকমারি ডাক। কলকাতা স্টাইলে জানলা বন্ধ করে এসি চালিয়ে গাড়ি চালালে এসব কিছুই মিস করে যাবেন - তাই জানলা খুলে গাড়ি আস্তে চালান - পরিষ্কার হাওয়ার সাথে জঙ্গলের গন্ধ নাকে এসে ঢুকবে। গাড়ির স্টিরিওটাও বন্ধ রাখুন - বরং এই জঙ্গলের গান শুনুন - হরেক রকমের পাখির ডাক, অন্ততঃ তিন চার রকমের ঝিঁঝিঁর ডাক, হাওয়ার ধাক্কায় লম্বা গাছের পাতার ঝিরিঝিরি আওয়াজ...

সিপচু শহীদ বলিদান পার্ক ছাড়িয়ে আরো কিছুটা এগোলে পড়বে খুনিয়া মোড় - একটা তেমাথা। ডানদিকের রাস্তা চলে গেছে ঝালং এর দিকে, আপনি ঘুরবেন বাঁদিকে - নয়া বস্তির দিকে। নয়া বস্তিতে পড়েই দেখবেন জিটিএ এলাকায় এসে গেছেন। আর একটু এগিয়ে একটা তেমাথায় প্রায় হেয়ারপিন বেন্ড (রাস্তা প্রায় ভাঙাই এখানে) ঘুরে নেমে যাবেন মূর্তি নদীর দিকে। একটা সরু ব্রীজের ওপর দিয়ে নদী পেরিয়ে শুরু ডুয়ার্স অঞ্চলের চা-বাগান - এইটাই সামসিং। সরু রাস্তা চা-বাগানের মধ্যে ঘুরে ঘুরে অল্প ওপরের দিকে উঠে গেছে - রাস্তার দুপাশে একটু কালচে সবুজ পাতাওয়ালা চা-গাছ (দেশের যাবতীয় সিটিসি চা সাপ্লাই যায় ডুয়ার্সের এইরকম চা-বাগানগুলো থেকেই), আর ইতস্ততঃ ছড়িয়ে আছে প্রচূর পাথর - সম্ভবতঃ মূর্তি নদীর সাথে বয়ে এসেছিলো কোনোকালে। শুনলাম খুব সকালে এখানে আসতে পারলে অল্প দূরে ভুটান পাহাড়ের পিছন থেকে অসামান্য সূর্য্যোদয় দেখা যায় - যদি আকাশ পরিষ্কার থাকে। আর থাকে নানা রকমের পাখি - যদি আপনার পাখির ছবি তোলার শখ থাকে...



সামসিং চা বাগান পেরিয়ে পর পর কয়েকটা ছোট গ্রামের মধ্যে দিয়ে ঘুরে ঘুরে রাস্তা চলে গেছে সান্তালেখোলার দিকে - চেনা না থাকলে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রচুর, তাই মাঝে মাঝেই মোড়ের মাথায় জিগ্গেস করে নিতে হচ্ছিলো - বিশেষ করে এক দুই জায়গায় রাস্তার কাজের জন্যে ডাইভার্শন থাকায় - এবং তার ফলে বার দুয়েক অফরোডিং ও করতে হল। দেবাশিসের ছোট গাড়িতে চারজন ছিলো বলে এক জায়গায় তিনজনকে নেমে গাড়ির ওজন কমিয়ে গাড়ি পার করতে হল। একটু বেশি গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স হওয়ার দরুণ আমরা বেঁচে গেলাম।

কিছুদূর এগোতেই পড়বে ফাড়ি বস্তি - ছোট্ট একটা গ্রাম। রাস্তা এখানেই শেষ - মানে বাইরে থেকে আসা এমনি গাড়ির। সামনে একটা গেট রয়েছে যেটা পেরোতে হলে আপনার কাছে হয় সান্তালেখোলা রিভার ক্যাম্প বা মৌচুকি ফরেস্ট বাংলোর বুকিং থাকতে হবে। যদি নদীর ধারে পিকনিকে যেতে চান, বা পাহাড়ের পথে হাইকিং করতে চান - হেঁটে যেতে পারেন, অথবা ওখানে কিছু মারুতি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে - তাদের ভাড়ায় নিতে পারেন। গাড়ি নিয়ে গেট পেরোতে গেলে আপনার কাছে কাগজ থাকতেই হবে।

তখন প্রায় বারোটা বাজে বলে একটা ছোট দোকানে বসে আমরা একটু মোমো আর চা খেলাম। আর একটা দোকান নজরে পড়লো - যার সামনে বড় ফ্লেক্স লাগানো - ছবিসহ - কবে যেন "তিনি" এখানে এসে মোমো আর চা খেয়ে দাম দিয়েছিলেন!!!

দেবাশিসদের টাটা করে রওনা দিলাম ফরেস্ট বাংলোর দিকে - ওরা ফিরবে জলপাইগুড়ি। আমরা যেদিন মেন্ডাবাড়ি যাবো, সেদিন আবার ওদের সাথে দেখা হবে।

গেট পেরিয়ে রাস্তা জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে নেমে গেছে নীচে - নদীর ধারে রিভার ক্যাম্পের দিকে, আর একটা সরু ইঁট পাতা রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে - সেইটাই ধরতে হবে আমাদের।

এখানে আগে একটা ডিসক্লেমার দিয়ে রাখি। সান্তালেখোলা রিভার ক্যাম্প বুক না করে মৌচুকি বুক করার ছোট একটা কারণ আছে। আগে, বহুদিন ধরে বহুবার বিলেতের লেক ডিস্ট্রিক্ট বা স্কটিশ হাইল্যান্ডস বা আমেরিকায় রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কের পাহাড়ি রাস্তা গাড়ি নিয়ে চষে ফেলেছিলাম, এমনকি আমেরিকায় যেটাকে হায়েস্ট মোটোরেবল রোড বলে - রকি মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কে - প্রায় সাড়ে বারো হাজার ফুট উঁচু - তাও। কিন্তু এই গাড়ি নিয়ে পাহাড়ে যাবো শুনলেই চেনাজানা প্রায় সকলেই হাঁ হাঁ করে ওঠেন - পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো কী মুখের কথা ইত্যাদি বলে - তাঁদের কাছে লেক ডিস্ট্রিক্ট/স্কটিশ হাইল্যান্ডসের রাস্তা কলকেই পায় না একেবারে। তা হাত মকশো করার জন্যে (বরং বলা ভালো হাত যে মকশো যে করাই আছে সেটা দেখানোর জন্যেই) মৌচুকি যাওয়া, রিভার ক্যাম্পে না গিয়ে। একটুখানি অফরোডিং। একটুখানি প্রমাণ।

পাহাড়টা বিশেষ উঁচু নয়, পাশে গভীর খাদও নেই। যেটা আছে সেটা হল না-থাকা একটা রাস্তা। গুগুল ম্যাপে এখনো যদি দেখেন, দেখবেন ফাড়ি বস্তি থেকে একটা ডটেড লাইন উঠে গেছে মৌচুকি অবধি। কিছুদিন আগে অবধিও এই পথে গাড়ি যেত না। ইদানিং পাথর ফেলে একটা রাস্তা বানানো হয়েছে - চড়াইটাও মন্দ নয় - জঙ্গলের মধ্যে ঘুরে ঘুরে এই পাথর ফেলা পথ উঠে গেছে প্রায় সাত কিলোমিটার। গাড়ি চলবে দুলে দুলে, ঝড়ের নদীতে নৌকোর মত। সামান্য অসাবধান হলেই হয় চাকা পাথরে ঠেকবে, বা গাড়ির তলায় জানান দেবে - মোবিল ট্যাঙ্ক ফেটে গেলেই চিত্তির। পথে বিশেষ অসুবিধা আর কিছু নেই - মুশকিলটা হল ওটাই রাস্তা কিনা সেইটা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। ওই গ্রেডিয়েন্টে আর অসমান পাথরের মধ্যে ফার্স্ট গিয়ারের ওপরে গাড়ি উঠবে না, আর কাজেই যেতে হচ্ছে বেজায় আস্তে - মানে সাত কিলোমিটার পেরোতে ঢের সময় লাগবে। কাউকে জিগ্গেস করার উপায় নেই, কারণ কেউ কোত্থাও নেই, আর মোবাইলও মৃত। বেশ খানিকটা ওঠার পর (ততক্ষণে গাড়ির মধ্যে পিনড্রপ সাইলেন্স - শুধু বাইরে ঝিঁঝিঁর ডাক ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই - দুটি চ্যাটারবক্সই একেবারে সুইচড অফ) একটা দুটো বাড়ি চোখে পড়লো - রাস্তাটা দুভাগ হয়ে গেছে এখানে। নেমে গিয়ে ডাকাডাকি করে একজনকে পেলাম - জানতে পারলাম রাস্তা ঠিকই আছে, আরো কিছুটা ওপরে উঠতে হবে, মানে প্রায় পাহাড়টার মাথায়। নিশ্চিন্ত হয়ে এগোতে এগোতে দুটো বাঁক পেরোতেই দেখি একটা গেট (মানে ওই লেভেল ক্রসিং এর গেটের মত) আর তাতে তালা বন্ধ। আর ওপর দিকে দেখা যাচ্ছে সবুজ কাঠের দোতলা একটা বাড়ি - ওইটাই ফরেস্ট বাংলো।

খেয়েছে। এবার আবার কাকে ডেকে তালা খোলাতে হবে? একটু এপাশ ওপাশ ঘুরে কাউকে না দেখে বাধ্য হয়ে বার দুই তিন হর্ন বাজালাম। সাথে সাথেই বাংলোর একটা কোণা থেকে দুটো মুন্ডু বেরিয়ে এলো। অত দূরে চেঁচালে শোনা যাবে না মোটে, তাই হাত নাড়িয়ে ইশারা করাতে একজন মিনিট কয়েকের মধ্যে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে চলে এলো। বুকিং রয়েছে জানাতেই খুল যা সিম সিম...আর খান তিনেক মোড় ঘুরতেই একটা ফাঁকা জায়গা, তার মধ্যে সবুজ দোতলা কাঠের বাড়িটা।

(ফিরে আসার পরে একটা জিনিস খেয়াল করলাম - মৌচুকি ফরেস্ট বাংলো বলে একটা সিনেমাও আছে। অজানা একটা জঙ্গলে তিনটে ছেলের প্যারানর্মাল অভিজ্ঞতা নিয়ে - সেটা নাকি একটা কুড়িয়ে পাওয়া হ্যান্ডি-ক্যাম থেকে বের করা। টুক করে সিনেমাটা দেখে ফেলতে পারেন। মৌচুকির গল্পে পরে আসবো।

https://www.imdb.com/title/tt7855306/)

(চলবে)

Wednesday, November 07, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৬ষ্ঠ পর্ব)

রাত সাড়ে এগারোটায় প্রায় টলতে টলতে, (আর গাড়ির বাকিরা ধুঁকতে ধুঁকতে) টিলাবাড়ি পৌঁছে আর কিছু নজর করার অবস্থা ছিলো না। সকালে ঘুম ভাঙতে দেখলাম কমপ্লেক্সটা বেশ বড়। মানে বেশ ভালোই বড়। সাজানো বাগান, পাথরের ফোয়ারা, বড় পার্কিং লট, মিউজিয়াম, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি। কটেজগুলোর যা সাইজ, একটায় অনায়াসে চারজন থাকা যায়, কিন্তু ব্যবস্থা এবং নিয়ম করে রেখেছে দুজনের। বছর দুয়েক হল তৈরী হয়েছে এই কমপ্লেক্সটা, উত্তর বঙ্গে ট্যুরিজম বাড়ানোর জন্যে, যদিও, ফরেস্ট লজ বলতে যা বোঝায় টিলাবাড়ি একেবারেই সেরকম নয়, বরং গরুমারার জঙ্গলে এতটা জায়গা নিয়ে ট্যুরিস্ট কমপ্লেক্স একটু বাড়াবাড়ি (এবং বেখাপ্পা) ঠেকেছে। জঙ্গল এলাকার বাইরে হলে ব্যাপারটা অন্যরকম হত। ক্যামেরা আর বের করতে ইচ্ছে করছিলো না - হাতের কাছে মোবাইল ছিলো, তাতেই এদিক ওদিক কয়েকটা ছবি তুলে রেখেছিলো জনতা, ডকুমেন্টেশনের জন্যে (হোয়াটস অ্যাপের দৌলতে রিয়েলটাইম খবরাখবর যায় বিভিন্ন জায়গায়)।

আরো একটা জিনিস দেখে ছেলেমেয়ের খুব মজা - রাতে যেখানে গাড়ি রেখেছিলাম, তার পাশে একই মেক/মডেল/ট্রিম এবং কাছাকাছি রেজিস্ট্রেশন নম্বরের আর একটা গাড়ি, শুধু রঙটা আলাদা।






ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি - তার লিস্টে বেশ কিছু নাম থাকলেও পুরী-তরকারি আর টোস্ট ছাড়া আর কিছু পাওয়া গেলো না। খেতে খেতে আলাপ হল অন্য গাড়িটার লোকজনের সাথে - তাঁরা কলকাতার সেটা তো অবভিয়াস - যাবেনও সান্তালেখোলা - তবে থাকবেন রিভার ক্যাম্পে (আমরা পাহাড়ের ওপর মৌচুকি জাঙ্গল ক্যাম্পে), তারপর যাবেন "পারেন" আর "জলদাপাড়া"।

স্নানটান সারতে সারতে দেবাশিস ফোন করলো - পানঝরা, সান্তালেখোলা, মেন্ডাবাড়ির কাগজপত্র সব ওর কাছে আছে - ও এসে দিয়ে যাবে। আর আসছেই যখন, তখন পানঝরার রাস্তাটা চিনিয়ে দিয়ে যাবে, কারণ গুগুল ম্যাপে শুধু চাপড়ামারির গেটটা দেখা যায় - সেটাও একটু এদিক ওদিক ঘুরে। দশটা নাগাদ চেক-আউট করলাম। এসব সরকারি গেস্ট হাউজে এখন চেক-আউটের সময় একটা করে গিফট-প্যাক দিচ্ছে (রুম পিছু একটা) - বাঁশের পেনদানি গোছের কিছু, আর একটা চকোলেট।

এর মধ্যে দেবাশিসও এসে গেল, সাথে পুরো পরিবার - স্বাতী (দেবাশিসের বৌ), আর যমজ ছেলেমেয়ে। এই ফাঁকে পরিচয়টা দিয়ে রাখি - দেবাশিসের সাথে আমার আলাপ আমাদের ফটোগ্রাফি ক্লাবে। মধ্যমগ্রামে থাকতো, পেশা ছিলো পড়ানো - স্কুলে টুলে নয়, পুরো টিউশনি। অবসরে ছবি তোলা। ক্লাবের একজনের মেয়েকে পড়াতো, তাই ক্লাবে সবাই "দেবুস্যার" বলেই ডাকে। ভালোই ছিলো, হঠাৎ একদিন কী খেয়াল হল - কলকাতা/মধ্যমগ্রাম ছেড়ে দিয়ে চিলাপাতায় রওনা দিয়ে দিলো - সেখানেই থাকে, জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়, জমি কিনে ফার্মিং করে, আর ট্যুর অপারেটরের ব্যবসা। ভালোই চলে - ইদানিং পাহাড়ে (মানে সিকিম) আর জঙ্গলে (মানে ডুয়ার্সে) ভালো পরিচিতি হয়ে গেছে। লোক খুবই ভালো, শুধু মাথাটা...মানে মাঝেমাঝেই বেশ আজগুবি দাবীদাওয়া করে থাকে...মাসখানেকে হিমালয়কে চক্কর দেওয়ার মতন।

টিলাবাড়ি থেকে বেরোতে পৌনে এগারোটা বাজলো। তেল নিতে হবে - গেলাম চালসার দিকে। সেখান থেকে আবার ঘুরে মূর্তি রিভার ক্যাম্পের পাশ দিয়ে একটা সরু ব্রীজ পেরিয়ে চাপড়ামারির রাস্তায় উঠলাম। আগের দিন রাতের মত অন্ধকারে হাতড়ানো নয় আর - দুপাশে ঘন জঙ্গল দেখা যাচ্ছে, হঠাৎ একটা হরিণও...এরা মাঝেমাঝেই লাফিয়ে রাস্তায় চলে আসে বলে এই পুরো এলাকাতেই স্পীড লিমিট বাঁধা। বেশ জোরে পাখির ডাক শোনা যায়। আর একটা কনস্ট্যান্ট উঁচুতারে ঝিঁঝিঁর ডাক - আমাদের কলকাতা শহরতলির ঝিঁঝিঁর চেয়ে অনেকটাই অন্যরকম।

(চলবে)

(আগের কথা)


Thursday, November 01, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৫ম পর্ব)

ঝটকা সামলে লরি ড্রাইভার আর চা-দোকানীর সাথে কথা বলে যা বুঝলাম সেইটা হল এই রকম -

আমরা ভাগলপুর থেকে পঁচিশ কিলোমিটার মত দূরে। সামনে দুটো উপায় আছে - এক, ওই পথেই এগিয়ে ভাগলপুর হয়ে মোকামা পৌঁছে গঙ্গা পার হওয়া - সেক্ষেত্রে আরো অনেকটা পশ্চিমে যেতে হচ্ছে, ফের আবার পূবদিকে ঘুরে পূর্ণিয়া যেতে হবে; আর দুই, কিছুটা পিছিয়ে বাঁদিকে গোড্ডা বলে একটা জায়গার ডিরেকশন পাওয়া যাবে - সেই রাস্তা ধরে গেলে পাকুড় পেরিয়ে ধূলিয়ানে গিয়ে ফের ন্যাশনাল হাইওয়ে ৩৪ (গুগুলের বক্তব্য অনুযায়ী ন্যাশনাল হাইওয়ে ১২) পাওয়া যাবে। সেই রাস্তা কিছুদিন আগে অবধি বন্ধ ছিলো, সদ্য খুলেছে, আশা করা যায় আমরা পেরিয়ে যেতে পারবো। এছাড়া উপায় হল দুমকা অবধি ফেরৎ যাওয়া - মানে আরো অনেক বেশি উল্টো পথে ঘোরা আর সময় নষ্ট। দেবাশিসকে ফোন করলাম - ও শুনে গোড্ডার রাস্তাটাই সাজেস্ট করলো। ম্যাপে দেখলাম - ধূলিয়ান প্রায় ১৬০ কিলোমিটার, লরি ড্রাইভার বললো ঘন্টা চারেক লাগতে পারে। গুগুল ম্যাপও দেখলাম বলছে সাড়ে চার ঘন্টা। অর্থাৎ, সেদিন সকালে বেরনোর সময় যে দূরত্বটা ছিলো ৫০০কিলোমিটার (বারো ঘন্টার ড্রাইভ), সেইটাই হয়ে দাঁড়াচ্ছে ৬৭৩ কিলোমিটার, প্রায় আঠারো ঘন্টার জার্নি! ছিলো রুমাল, হয়ে গেলো একটা বেড়াল। কিন্তু উপায় তো নেই।


গাড়ি উল্টোদিকে ঘুরলো। যে জায়গাটায় আমরা পৌঁছেছিলাম, সেটার নাম হাতপুরৈনী (Hatpuraini/हातपुरैनी)। উল্টোপথে কিছুটা গিয়ে পড়লো পঞ্জওয়ারা/গোড্ডার রাস্তা। আরো এক প্রস্থ লোকজনকে জিজ্ঞেস করে ঢুকে পড়লাম - সেটা সম্ভবত স্টেট হাইওয়ে ৮৪।

লরি ড্রাইভার কেন "আশা করছিলো যে আমাদের গাড়ি চলে যাবে" সেটা বোঝা গেল খানিকটা। সেই প্রথমবার গাড়ি নিয়ে চিলিকা গেছিলাম যখন, তখন স্থানীয় লোকজন পুরী যাওয়ার একটা শর্টকাট বাতলেছিলো - সেই পথে গিয়ে হাল ঢিলে হওয়ার যোগাড় হয়েছিলো সেবার - খানাখন্দ ভর্তি, আর একদিন ধরে রাস্তা বাঁধানোর কাজ চলছে - রাস্তার দুটো দিকের উচ্চতার মধ্যে ফুটখানেকের তফাৎ। এও একই অবস্থা। কিছুদূর পরে পরেই ডাইভার্সন - সেটা নীচে কালভার্টের তলা অবধি নেমে গর্ত পেরিয়ে আবার ওপরে উঠছে - এর মধ্যেই বাস, অটো (সেও জাম্বো অটো), লরি, কনস্ট্রাকশন ভেহিকল - সবই চলছে। গতিক নাই, আমরাও চল্লুম। গোড্ডা পেরিয়ে রাস্তাটা ঠিকঠাক হল। তখন আমরা ঢুকছি সুন্দরপাহাড়ি বলে একটা জায়গায়...

সুন্দরপাহাড়ি জায়গাটা বেশ মিষ্টি মতন। ঝাড়খন্ডের এই অঞ্চলটা হল রাজমহল পাহাড়ের অংশ - সাঁওতাল পরগনা বললে আরো চেনা লাগবে। ছোটনাগপুর মালভূমির কাছাকাছি হলেও দিব্যি সবুজে ঢাকা, রুক্ষ নয়। হয়তো গঙ্গার অববাহিকার মধ্যে থাকার কারণেই। ঋকের প্রিয় সাবজেক্ট ছিলো ভূগোল - গড়গড়িয়ে কিছু রানিং কমেন্টারি দিয়ে গেলো - রাজমহল পাহাড়ের এই পাহাড়গুলো জুরাসিক আমলের, অগ্নুৎপাতের কারণে তৈরী, সাঁওতাল পরগনার উত্তর-দক্ষিণ বরাবর রয়েছে, এখানেই গঙ্গা তার দক্ষিণমুখী গতিপথ বদলে পূর্বদিকে যাওয়া শুরু করে; পাহাড়ের ওপরদিকে থাকে পাহাড়িয়া উপজাতিরা, আর নীচে উপত্যকা অঞ্চলে সাঁওতালরা - যাদের জীবিকা চাষবাস।

রাস্তাটা এখানে বেশ নির্জন। উল্টো দিক থেকে কচ্চিৎকখনো দু একটা গাড়ি আর রাস্তার পাশের ঘন শালবনে শুকনো পাতা বা কাঠ কুড়োতে আসা কিছু সাঁওতাল মেয়ে ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না। সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ, নিঝ্ঝুম জঙ্গল দুপুরে ঘুমিয়ে রয়েছে। তার মধ্যে দিয়ে এঁকে বেঁকে একটা উঁচুনীচু রাস্তা এগিয়ে গেছে - মাঝে মাঝেই চড়া বাঁক...

সুন্দরপাহাড়ির পরে জোলো, যোগেশ্বর, লিটিপাড়া, হিরণপুর পেরিয়ে পাকুড়। পাকুড়ে এসেই রাস্তাটা কেমন আবার ঘিঞ্জি হয়ে গেলো। গাদা গাদা লরি, অটো, বাস। মাঝে মাঝেই লম্বা লরির লাইন। এদিকে সেদিন আর আমাদের হাতে সময় নেই বলে উল্টো লেন দিয়েই মাঝে মাঝে এগোচ্ছি। বাজার মত একটা জায়গা পেরিয়ে আরো কিছুটা যেতেই দেখলাম সামনেই হাইওয়ে - ন্যাশনাল হাইওয়ে ১২ (বা ৩৪) - যেখান থেকে আমাদের আবার বাঁদিকে হাইওয়ে ধরে চলে যেতে হবে ফারাক্কার দিকে। ওই মোড় থেকে ফারাক্কা আরো আঠারো কুড়ি কিলোমিটার মত। কিন্তু ওখান থেকেই ৪-লেন হাইওয়ের বাঁ দিকের পুরোটাই বন্ধ করে লরি দাঁড়িয়ে রয়েছে। শ'য়ে শ'য়ে, বা হাজারে হাজারে। ঘড়িতে তখন প্রায় তিনটে বাজে, টিলাবাড়ি আরো প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার...

ফারাক্কায় আপাতত ওয়ান-ওয়ে একটা সিস্টেম চালু করেছে। আধ ঘন্টা করে মালদার দিক থেকে আসা গাড়ি ছাড়া হচ্ছে, আধ ঘন্টা করে দক্ষিণ থেকে উত্তরে যাওয়ার গাড়ি। সেটা ছাড়াও, এনএইচ ৩৪ (বা ১২) তেও চতুর্দিকে কাজ হচ্ছে, ফলে অনেক ডাইভার্সন, খোঁড়াখুঁড়ি। যেমন, ফারাক্কায় ঢোকার আগে একটা ব্রীজ পেরোতে হয় - টেম্পোরারি ব্রীজ - সেটাও ওয়ান ওয়ে, কিন্তু সেখানে দুদিকে গাড়ি আটকানোর জন্যে কেউ নেই। ইন ফ্যাক্ট, আমাদেরই ব্রীজে কিছুদূর উঠেও পিছিয়ে আসতে হল - কারণ উল্টোদিকে বাস উঠে এলো - আর জানেনই তো, হাইওয়েতে (আসলে ভারতের সব রাস্তাতেই) সাইজ ম্যাটারস - রাইট অফ দ্য ওয়ে (right of the way) বস্তুটি এখানে নেই।

ঘটনাচক্রে, এবং কিছুটা এদিক ওদিক দিয়ে নাক গলিয়ে (সচরাচর এই কাজগুলো নিজে করি না, কিন্তু সেদিন লাটাগুড়ি পৌঁছনোর জন্যে যা থাকে কপালে করে চালাতে হয়েছে) একটা আধ ঘন্টার ফ্লো-এর মধ্যে ঢুকে ব্যারেজে উঠে পড়লাম। এইবার পুরো ব্যারেজটাই ঢিকির ঢিকির। প্রায় আড়াই কিলোমিটারের ব্যারেজ - যতক্ষণ লাগলো, হেঁটে গেলেও মনে হয় তার চেয়ে কম সময়ে পৌঁছে যেতাম। তবে লোকে কেন ফারাক্কা ব্যারেজের রাস্তাকে গাল দেয় সেটা স্পষ্ট বোঝা গেল - মানে ওখানে ঠিক রাস্তা বলে কিছু নেই। অসংখ্য উঁচুনীচু পিচের বাটিকে কেউ যদি সিমেন্ট দিয়ে জুড়ে রাখে তাহলে যা হবে, ফারাক্কার অবস্থা তাই। আসলে গর্ত দিয়ে তৈরী বললেই হয়। লীলা মজুমদারের টংলিং এ যেমন সেই পাঁউরুটি দেখে বলেছিলো - পষ্ট দেখতে পাচ্ছি কতগুলো ফুটো জুড়ে জুড়ে তৈরী...

এর কিছুদিন আগেই মাঝেরহাট ব্রীজ ভেঙে পড়েছে - অতএব, চতুর্দিকে সাজো সাজো রব (গত সাত বছরে কী করছিলেন সেই প্রশ্ন করা যায় না) - তাই ফারাক্কার একটা লেন বন্ধ করে পিচের লেয়ার খুঁড়ে তোলা হচ্ছে, অন্য লেন দিয়ে ওয়ান ওয়ে সিস্টেমে গাড়ি চলছে। শামুকের মতন গতিতে গড়াচ্ছে বললেই ভালো। আড়াই কিলোমিটারের ব্রীজ পেরোতে প্রায় আধ ঘন্টা। তুমুল ধুলো - জানলা খুলবেন তার উপায় নেই। রাস্তার পাশে রেললাইনের ধারে সংখ্যা লেখা রয়েছে - সম্ভবত মাইলস্টোন। কড়িকাঠ নেই বলে সবাই সেইগুলো গুণতে গুণতেই সময় কাটালো...কী আর করবে। এর মধ্যে দুটো ব্যাপার চোখে পড়লো।

এক - লরি রাত ন'টার পরে ছাড়ার কথা হলেও, ওই দুপুরেও কিছু লরি ফারাক্কা পেরোচ্ছে। কীভাবে পেরোচ্ছে আন্দাজ করার জন্যে নকুলদানা নেই।

আর দুই - পিচের লেয়ার কাটা হচ্ছে বড় পাওয়ার ড্রিল দিয়ে, তুমুল আওয়াজ আর ভাইব্রেশন। সেফটি রুল অনুযায়ী (এটা সুমনা দেখেই বললো, কারণ ওদের নানা দেশের কনস্ট্রাকশন প্রোজেক্ট হ্যান্ডল করতে হয়) ওই পাওয়ার ড্রিল কোনো মানুষের মিনিট পাঁচেকের বেশি একটানা ধরে থাকার কথা নয় - মারাত্মক শারীরিক ক্ষতি হয়। একাধিক লোকের পালা করে কাজটা করার কথা। এখানে হেলথ অ্যান্ড সেফটির এই নিয়মের কথা হয় কেউ জানে না, বা খরচ বাঁচানোর জন্যে নিয়মের তোয়াক্কা কেউ করে না। মানুষ এখানে বড়ই শস্তা।

শেষমেষ সাড়ে তিনটের একটু আগে ফারাক্কা পেরিয়ে গেলাম; তারপর কালিয়াচক - ট্র্যাফিক জ্যামের জন্যে কুখ্যাত - সেটাও পেরোলাম খুব অল্পই দাঁড়িয়ে। দুপুরে খেতে হবে - সকালের পাঁউরুটি আর বালুসাই অনেকক্ষণ হজম হয়ে গেছে, আর যে পথে এসেছি সেখানে শালের গুঁড়ি আর গাছের পাতা ছাড়া খাওয়ার মত কিছু চোখে পড়েনি; তাছাড়া ফারাক্কা পার হওয়ার তাড়াও ছিলো। কালিয়াচক থেকে মালদা অবধি রাস্তা কখনো ভাঙা, কখনো মোটামুটি - আর ঠিকঠাক হোটেল ছাড়ুন, ধাবাও বিশেষ চোখে পড়ে না। তার মধ্যেই একটা ছোট হোটেলে রুটি-সবজি-ডিমভাজা খেয়ে আর ঋক/ঋতির খাবার প্যাক করে (ওরা দুজনে তখন পালা করে পাবজি নিয়ে ব্যস্ত বলে খাওয়ার সময় পায়নি) এগিয়ে পড়লাম। যেখানে সুযোগ পাচ্ছি, স্পীড বাড়িয়ে সময় বাঁচানোর চেষ্টা করছি - এই জিনিসটাও সচরাচর করি না। মালদায় কতটা জ্যামে পড়বো তাই নিয়ে চিন্তায় ছিলাম - কারণ দেবাশিসের কাছে ওর অভিজ্ঞতার কথা শুনেছি আগে। ভাগ্যক্রমে, এবং সম্ভবত ফারাক্কার দৌলতে, মালদায় জ্যামে দাঁড়াতেই হল না প্রায়। মালদা শহর ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূর অবধি রাস্তা ভালো - চওড়া চার লেন - সেখানেও গাড়ি দৌড় করানো যায়।

তখনো ঠিক করে রেখেছি অন্ততঃ শিলিগুড়ি অবধি চলে যাই। যদি খুবই দেরী হয়ে যায়, শিলিগুড়িতে একটা কোনো হোটেলে দাঁড়িয়ে যাবো, টিলাবাড়ির রিজার্ভেশনটা না হয় নষ্টই হবে। আর যদি মনে হয় পৌঁছে যেতে পারবো, তাহলে টিলাবাড়িতে ফোন করে রাতের খাবারের কথা জানিয়ে রাখবো। বেশ কিছুটা রাস্তা একটু জোরে ছুটিয়ে কিছুটা সময় মেকাপ করে ছটার একটু আগে রায়গঞ্জ পেরোলাম। রোড ট্রিপের প্রাইমারি নিয়ম - যে প্রতি দুই থেকে তিন ঘন্টায় একবার দাঁড়ানো - সেদিনের মত ভুলে গিয়ে। ততক্ষণে বারো ঘন্টা পেরিয়ে গেছে আমি একটানা স্টিয়ারিং ধরে আছি - মাঝে ওই এক দু বার চা খেতে দশ মিনিট, আর দুপুরে খাওয়া আধ ঘন্টা বাদ দিলে...

রায়গঞ্জ পেরিয়ে বালিহারা, মকদমপুর ছাড়িয়ে আসে আলতাপুর। এনএইচ ৩৪ (বা ১২) এখান থেকে সোজা চলে গেছে করণদিঘি ছাড়িয়ে ডালখোলা - এখানে পূর্ণিয়া থেকে আসা এনএইচ ২৭ আর এনএইচ ৩৪ মিশে যাচ্ছে - যেটা কিষণগঞ্জ হয়ে শিলিগুড়ি যাচ্ছে। এই রুটটা বিহার-পশ্চিমবঙ্গ মিশিয়ে। গুগুল ম্যাপ আমাকে অন্য রাস্তা দেখালো - আলতাপুর থেকে একটা রাস্তা ডানদিকে ঢুকে গেছে - গুগুলের উচ্চারণ বুঝতে পারবেন না, কাজেই যদি কখনো এই রোড ট্রিপে যান, তাই মনে করে রেখে দিন - বোতলবাড়ি-রসখোয়া রোড - চলে যাচ্ছে সাবধান (ভয় নেই - এটা একটা জায়গার নাম), রুদেল, গোয়াগাঁও হয়ে একেবারে ধানতলা - যেখানে রাস্তাটা ফের ন্যাশনাল হাইওয়ের সাথে মেশে। প্রায় সত্তর কিলোমিটার রাস্তা, পুরোটাই উত্তর দিনাজপুরের গ্রামাঞ্চলের মধ্যে দিয়ে। মনে আছে, প্রথমদিন যে সেকমপুর-সাহাপুর রোড (ন্যাশনাল হাইওয়ে ১১৪) ধরে গুশকরা পেরিয়ে সিউড়ি এসেছিলাম? এই রাস্তাটাও সেরকমই। ধানক্ষেত, মাঠের মধ্যে দিয়ে পাক খেয়ে যাওয়া রাস্তা, মাঝে মাঝে দুপাশে ছোট ছোট গ্রাম পড়ছে, বা খুব ছোট ছোট বাজার - এই গ্রাম বা বাজারগুলোতে ঢোকা আর বেরনোর সময় হয় ছোট ছোট বাম্প, বা ব্যারিকেড - গাড়ির স্পীড কমানোর জন্যে। এই জনপদগুলো বাদ দিলে রাস্তা ঘুটঘুটে অন্ধকার - শুধু উল্টোদিকের গাড়ির হেডলাইট ছাড়া। অনেকেই আজকাল ডালখোলা এড়ানোর জন্যে এই রাস্তাটা ব্যবহার করে - কারণ ডালখোলা পুরোপুরি আনপ্রেডিক্টেবল - আধ ঘন্টাতেও পেরোতে পারেন, তিন ঘন্টাও আটকে থাকতে হতে পারে। তবে বড় লরি এদিকে বিশেষ আসে না - বেশিরভাগই ছোট গাড়ি, ছোট ম্যাটাডোর আর কিছু বাস।

নীচে রুটটা দিয়ে দিলাম।


কুয়াশা এদিন আরও বেশি। আর তার চেয়ে বড় সমস্যা উল্টোদিকের গাড়ির হাই বীমের হেডলাইট। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমি একবার করে হেডলাইটে ছোট ফ্লিকার মারলে উল্টোদিকের গাড়ির আলোও নেমে আসছে বটে, কিন্তু ঠিক পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় ফের চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে হাই বীম করে দিয়ে। কিছুক্ষণ পরে কারণটা বুঝলাম - নিজে এক দুইবার এক্সপেরিমেন্ট করে। এই কাজটা করে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উল্টোদিকের গাড়ির বাউন্ডারিটা দেখতে পাওয়ার জন্যে - যেটা সাধারণ হেডলাইটের আলোতে চাপা পড়ে যায় - যদিও এইটাও না করাই কাম্য। রাতে এরকম রাস্তায় চালানোর সেরা উপায় (যদি নিজেও যস্মিন দেশে যদাচার না করতে চান) হল উল্টোদিকের গাড়ির মাথার দিকে লক্ষ্য রাখা, আর নিজের বাঁদিকে রাস্তার বাউন্ডারি দেখে গাড়ি চালানো - আমি সাধারণতঃ ডানদিকে অল্প ঘুরে বসি - তাতে কিছুটা সুবিধা হয়। যদিও সেদিন যদিও অত টেকনিক্যালিটি ভাবার সময় ছিলো না। অন্ধকার নেমেছে, অন্য গাড়ির আলো ছাড়া পথে কোনো আলো নেই, তায় কুয়াশা, তায় বার বার চোখ ঘড়ির দিকে আর মোবাইলে অন করে রাখা গুগুল ম্যাপের দিকে যাচ্ছে। এস্টিমেটেড অ্যারাইভাল টাইম (টিলাবাড়িতে) তখন রাত সাড়ে দশটার কাছাকাছি। থ্যাঙ্কফুলি, টিলাবাড়ি ঠিক জঙ্গলের ভিতরে নয় যে গেট বন্ধ হয়ে যাবে - তাই দেরী হলেও ঢুকতে পারবো। কিন্তু পৌঁছতে পারবো কিনা, সেইটা বড় প্রশ্ন তখনও।

ঘন্টা দেড়েক লাগলো এই সত্তর কিলোমিটার পার হতে। মাঝে শুধু একবার চা খেতে দশ মিনিট দাঁড়িয়েছি - সেদিনের মত শেষ স্টপ। ঠিক করে রেখেছি একেবারে টিলাবাড়ি পৌঁছে, বা নেহাতই না পারলে শিলিগুড়িতে দাঁড়াবো। এই স্টেট হাইওয়ের একদম শেষের দিকে - যখন গুগুল ম্যাপ বলছে "দুশো মিটার পর ন্যাশনাল হাইওয়ে ২৭ এ ডানদিকে ঘুরতে হবে" - মানে যে রাস্তাটা ডালখোলা হয়ে এসেছে, সেটাতে উঠতে হবে - হেডলাইটের আলোয় যা দেখলাম, সেটা মোটামুটি চোখ কপালে তুলে দেওয়ার মত। রাস্তা সিম্পলি নেই। হয়তো কোনো কালে ছিলো - শের শাহ এর আমলে - আপাতত পুরোটাই ঢেউ খেলানো পাথুরে জমি। একটা দুটো গাড়ি পেরোচ্ছে সামনে দেখতে পাচ্ছি - উত্তাল নদীতে দুলন্ত নৌকোর মত - রাস্তার বাঁদিক থেকে ডানদিক আড়াআড়ি গিয়ে গর্ত আর পাথরের পাশ কাটাতে কাটাতে।

[পরে জানা গেছিলো এইটা নাকি বেশ কয়েক বছর ধরে একই রকম হয়ে আছে, প্রতি বর্ষায় আরো একটু করে যন্ত্রণা বাড়ে। এবং বহুবার জানানো সত্ত্বেও কোনো পরিবর্তন হয়নি। অনেকে বলে ব্যাপারটা ইচ্ছাকৃত, হাইওয়ে থেকে বাস বা লরি যাতে এই রাস্তায় ঢুকে না আসে, সেইটা নিশ্চিত করার জন্যে। কথা হল বাস বা লরির বরং এই রাস্তায় কিচ্ছুটি হবে না - ঘটাং ঘটাং করে পৌঁছে যাবে। চাপ হবে ছোটো গাড়ির। ২০৯ মিমি গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স নিয়েও বিআর-ভি এর তলা একবার ঘষে গেলো - একটা জায়গায় সময়মতন আড়াআড়ি কাটাতে না পেরে। আরো ছোটো মারুতি ইত্যাদি তো আরোই ঠেকে যেতে পারে খুব সাবধানে না পার হলে। যদি এই পথে যান ছোটো গাড়ি নিয়ে, আগে গাড়ি থেকে বাকি যাত্রীদের নামিয়ে দিয়ে খালি গাড়ি নিয়ে পার হবেন। অথবা এই রাস্তার ডানদিকে প্রায় সমান্তরালভাবে আরেকটা রাস্তা চলে গেছে গোয়ালপোখর হয়ে ইসলামপুর অবধি - যেটা "বেঙ্গল-বেঙ্গল" হিসেবে পরিচিত। সেইটা ধরে ইসলামপুর চলে গেলে ধানতলার কাছে এই ভয়ানক অংশটা এড়াতে পারবেন। সমস্যা হল এই পথটার একটু বদনাম রয়েছে - ছিনতাই সংক্রান্ত।]

খুব আস্তে আস্তে এই অংশটা পেরিয়ে (একবার ঘষে গেলো, বার দুয়েক গাড়িতে বসা অন্যদের মাথা ঠুকে গেলো...) উঠলাম ন্যাশনাল হাইওয়ে ২৭ এ, এর পর টার্গেট যতটা সম্ভব সময় মেকাপ করে শিলিগুড়ি বাইপাস ধরা। টিলাবাড়ি তখনও দেড়শো কিলোমিটার। মাঝে রয়েছে ইসলামপুর - আরেকটি বটলনেক। ইসলামপুরের কাছাকাছি পৌঁছে দেখি লম্বা লরির লাইন - দুই তিন কিলোমিটার তো হবেই। তখন ফের সেই উল্টোদিক দিয়ে এগিয়ে দরকারমত আবার ভিতরে সরে এসে (মানে যেসব জিনিস দেখে কলকাতার রাস্তায় এতদিন গালিই দিয়ে এসেছি) ইসলামপুর মোড় পেরিয়ে গেলাম। জ্যামের মূল কারণ রাস্তার ওপর বাজারের মধ্যে পেল্লায় একটা পুজো। দেবাশিস বার দুয়েক ফোন করে খোঁজ নিয়েছে। আর বলে দিয়েছে ইসলামপুর ছাড়ানোর বেশ খানিকটা পরে, মানে এই তিরিশ কিলোমিটার পরে আসবে টোলগেট। তারপর একটা নির্মীয়মান ফ্লাইওভারের পাশ দিয়ে ডানদিকে ঘুরে ধরতে হবে শিলিগুড়ি বাইপাস - মানে ফুলবাড়ি-ঘোষপুকুর রোড। সেই রাস্তা নিয়ে যাবে গাজলডোবা হয়ে জলপাইগুড়ির দিকে। শিলিগুড়ি এমনিতেই খুব ঘিঞ্জি - দুটি মোটে রাস্তা - সেবক রোড, আর হিলকার্ট রোড - যা কিছু আছে শিলিগুড়ির, সবই এই দুটো রাস্তার ওপর - কাজেই সাধারণ সময়েই ভিড় থাকে, পুজোর সময় আরোই ক্যাচাল - শিলিগুড়ি না গিয়ে বাইপাস ধরে জলপাইগুড়ি যাওয়াই তুলনামূলকভাবে ভালো অপশন।

এর মধ্যে টিলাবাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি যে আমরা শিলিগুড়ি বাইপাসে পৌঁছে গেছি - আর ঘন্টা দেড়েকের মধ্যে টিলাবাড়ি পৌঁছে যাবো। কিছু খাবারও বলে দেওয়া হয়েছে - ওরা রেখে দেবে - যদিও ইন-রুম ডাইনিং ওদের নিয়মে নেই, তাও কেয়ারটেকার ভদ্রলোক সেই রাতে আমাদের নিরুপায় দেখে সেই ব্যবস্থাই করে রেখেছেন।

গুগুল ম্যাপ এই একবারই ভুল রাস্তা দেখালো। আমবাড়ি ক্যানাল রোড ধরার জন্যে এক জায়গায় বাঁদিকে যেতে বলে - সেই রাস্তাটা নেইই, সবে তৈরী হচ্ছে। একটা বেড়া দেওয়া রয়েছে - বাইক নিয়ে লোকে সেই বেড়া পেরিয়ে চলে যাচ্ছে - গাড়ি যাওয়ার কোনো উপায় নেই। গাড়ি নিয়ে যেতে হলে আরো একটু এগিয়ে বাঁদিকে রেলগেট পেরিয়ে চলে যেতে হবে গাজলডোবার দিকে। গাজলডোবায় তিস্তা ব্যারেজ পার হয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে রাস্তা চলে গেছে। রাত পৌনে এগারোটায় এই ক্যানাল রোডে আর একটাও গাড়ি চোখে পড়ছে না। হেডলাইটের আলোয় যতদূর দেখা যাচ্ছে শুধু জঙ্গল। এইটা পুরোটাই একসময় বৈকুন্ঠপুর জঙ্গলের অংশ ছিলো - এখন কিছু কিছু জায়গায় জনবসতি হওয়ার ফলে আলাদা হয়ে গেছে জঙ্গলগুলো।

বৈকুন্ঠপুর মনে পড়ে? ভবানী পাঠক? দেবী চৌধুরানী? এই সেই বৈকুন্ঠপুরের জঙ্গল, আর এইখানেই তিস্তায় (বঙ্কিম যাকে ত্রিস্রোতা লিখেছেন) ভাসতো দেবীর বজরা।

ঋক আর ঋতিকে গল্পটা বলতে চাইলাম - কিন্তু দুটি চ্যাটারবক্সই তখন অদ্ভুতভাবে চুপ করে গেছে। সারাদিনের ক্লান্তি হতে পারতো, কিন্তু ঋতি যা জানালো তাতে বুঝলাম দুজনেই একটু ভয় পেয়েছে। রাস্তার একপাশে মাঝে মাঝে একটা দুটো চা বাগান দেখা যাচ্ছে, বাকিটা জঙ্গল, অন্যপাশটা শুধুই ঘন জঙ্গল, তার মাঝে কুয়াশা, গাড়ির হেডলাইট ছাড়া আর একটাও আলো নেই, এর মধ্যে একটা একলা রাস্তা এঁকেবেঁকে চলে গেছে কোথায় কতদূরে তা জানি না, কোনও মাইলফলকও চোখে পড়ছে না। আর সম্পূর্ণ জনমানবহীন অন্ধকারে শুধু গাড়ির হেডলাইটে চারদিক একটা পরিত্যক্ত ভুতুড়ে এলাকার মত লাগছে। হয় এদিকে কোনো জনবসতি নেই, নয়তো ততক্ষণে সকলের মাঝরাত হয়ে গেছে। এমনিতেই বৈকুন্ঠপুর জঙ্গলের একটু বদনাম রয়েছে হাতির জন্যে, যদিও সেটা ঋক বা ঋতির জানার কথা নয়। কিন্তু ওই জঙ্গলে, রাতে, যদি গাড়ি খারাপ হয়, বা পাশের জঙ্গল থেকে কিছু বেরিয়ে আসে - এই ভয়ে ঋতি বিশেষ করে খুবই টেনশনে। টেনশন আমারও যে অল্প হচ্ছিলো না তা নয়। গুগুল এদিক দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আর কোনো গাড়ি নেই কেন? এই চিন্তাটা মাথায় ঘুরছিলো - কাটলো রাস্তার পাশে একটা বোর্ডে লাটাগুড়ি ৩০ কিলোমিটার দেখে - এতক্ষণ পরে এই একটা সাইনপোস্ট। তার কিছু পরেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে একটু দূরে বাঁদিক থেকে আসা গাড়ির আলো চোখে পড়লো - বুঝলাম আর একটা রাস্তার সাথে মিশছি, এবং সেই রাস্তায় গাড়ি যাচ্ছে। এখনো।

অল্প পরেই গরুমারার সাইনপোস্ট চোখে পড়লো - বুঝলাম প্রায় এসে গেছি। ম্যাপও বলছে আর মাত্র কয়েক কিলোমিটার। অবশেষে, ঘড়িতে তখন বাজে সাড়ে এগারোটা - টিলাবাড়ি টুরিস্ট কমপ্লেক্সের অফিস বিল্ডিং এর সামনে দাঁড়ালাম। ভিতরে তখনো দু তিনজন রয়েছে - আমাদের জন্যেই বসে আছে রাত্তির সাড়ে এগারোটায়।

গাড়ি থেকে নামতেই পা-টা টলে গেলো। সামলে দাঁড়াতেই বুঝতে পারলাম এতক্ষণের টেনশন ঠিক কতটা ছিলো, আর এতক্ষণ - মানে সেই ভোর পৌনে পাঁচটা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা - মাঝে বড়জোর আধ ঘন্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ব্রেক - মানে প্রায় একটানা আঠারো ঘন্টা একই ভাবে গাড়ি চালানোর ফল কীভাবে মাথায় জানান দিচ্ছে...তখনও মাথাটা দুলছে বেশ বুঝতে পারছি, মনে হচ্ছে একটা লাগাতার মোশনের মধ্যে রয়েছি...তখনও মনে হচ্ছে চলছি যেন...একা কি আমারই মনে হচ্ছে? সুমনা জানালো ওরও এই মোশনের অনুভূতিটা হচ্ছে। এর ওপরে আমি তখন চোখে হলুদ ফ্ল্যাশ দেখছি - সারা সন্ধ্যে উল্টোদিকের গাড়ির আলো চোখে পড়ার এফেক্ট - লিটারেলি সর্ষেফুল দেখা যাকে বলে।

চেকইন করে ঘরে পৌঁছতেই খাবার দিয়ে গেলো - রুটি, আলুভাজা, কপির তরকারি। ক্ষিদেও পেয়েছিলো - গোগ্রাসে খেলাম। তারপরে বিছানায় বডি ফেলতেই সেদিনের মত ব্ল্যাক আউট।

(চলবে)

[পরে শুনেছি, গাজলডোবার পরে জঙ্গলের মধ্যে ওই রাস্তাতেও একসময় ছিনতাই লেগে থাকতো। ইদানীং অনেকে বলছেন যে সেটা কমে গেছে। তবু, বেশি রাতের দিকে ওই পথে না যাওয়াই ভালো। বরং ফালাকাটা-ময়নাগুড়ি হয়ে যেতে পারেন, বা সেবক-মালবাজার-চালসা হয়েও।]


(আগের কথা)

Wednesday, October 31, 2018

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৪র্থ পর্ব)


আমার একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে - ঘড়িতে যে সময়েই অ্যালার্ম দিই না কেন, তার মিনিট কুড়ি আগে ঘুম ভাঙবে, একদম ভাঙবেই। খুব রেয়ার কিছু দিন ছাড়া এত বছরে এর কোনো নড়চড় হয়নি। এদিনও তাই হল। ভোর সাড়ে তিনটেতে অ্যালার্ম দিয়ে থাকলেও ঘুম ভেঙে গেল তিনটের পরে পরেই। কিছুক্ষণ ল্যাদ খেয়ে উঠে পাশের ঘরে টোকা মেরে সুমনাকে ঘুম থেকে তুলে নিজে তৈরী হয়ে ঋককে তুললাম। ওদিকে, সুমনাও তৈরী হয়ে ঋতিকে তুলে দিলো। তারপর রিসেপশনে চাবি দিয়ে গাড়িতে ফের জিনিসপত্র তুলে, নীচে দারোয়ানকে ঘুম থেকে তুলে গেট খুলিয়ে বেরোতে বেরোতে সেই পৌনে পাঁচটা হয়েই গেলো।

ওই ভোরে সিউড়ির রাস্তায় একটাও জনমনিষ্যি নেই, শুধু রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলো একা একা দাঁড়িয়ে আছে। রওনা দিলাম সিউড়ি-দুমকা হাইওয়ের দিকে। পথে একটা পেট্রোল পাম্প দেখে ট্যাংক ভরে নিলাম। তারপর ফের চলা শুরু।

এখানে প্রধান ভরসা গুগুল ম্যাপ, কারণ মিচেলিনের পুরনো ম্যাপে বর্ধমান থেকে সিউড়ির যে রাস্তা দিয়ে এসেছি সেটা নেইই। আর যেহেতু গুগুল ম্যাপ বেশ সুন্দরভাবে নিয়ে এসেছে, তাই ভরসাও বেড়েছে। তা এক্ষেত্রেও গুগুল ম্যাপ ধরেই চলতে চলতে একটা বড় রাস্তায় এসে পড়লাম - সেখান থেকে লরি ছুটছে দেখতে পাচ্ছি। মনে হল এটাই হয়তো সিউড়ি-দুমকা হাইওয়ে হবে, কিন্তু গুগুল তো আমাকে সোজা এইটা পেরিয়ে উল্টোদিকের অন্ধকার রাস্তাতে যেতে বলছে। কেউ নেই যে জিগ্গেস করবো, কাজেই, গুগুলকে ভরসা করে সোজা চলেই গেলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি সে রাস্তা মাঠঘাটের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে চলছে, হাইওয়ের সাথে বিন্দুমাত্র মেলে না, আর বেশিটাই মাটির - আর প্রায় কাদা মাটির, আর সুড়কি। এইটাই কি ঠিক রাস্তা? কে জানে বাবা...এগিয়ে তো যাচ্ছি। আর মাঝেমাঝেই আগের দিনের সন্ধ্যের মত হঠাৎ হঠাৎ কুয়াশা ধেয়ে আসছে কাঁচের ওপর। চার পাঁচ কিলোমিটার এভাবেই চলার পর চোখে পড়লো একটা গুমটিঘর - তার সামনে একটা লোক কুপি জ্বালিয়ে বসে রয়েছে। তাকেই শুধোলাম - এইটা কি দুমকার রাস্তা? সে বল্ল হাঁ হাঁ, ইটাই। তারপর জিগ্গেস করলুম - আর কতটা এরকম রাস্তা? সে বল্ল আরো কিলোমিটার দুয়েক।

অন্ততঃ হাঁফ ছেড়ে বাঁচা গেলো - যে ভুল রাস্তায় আসিনি। দুই কিলোমিটারটা ঠিক দুই ছিলো না, চার পাঁচ হবে হয়তো - তারপর পাকা রাস্তা দেখা গেলো। ততক্ষণে আলোও ফুটেছে, আশপাশটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে - মাঠ, কাশের বন, লাল মাটি...ঋক/ঋতিকে দেখানোর ইচ্ছে ছিলো - কিন্তু দুজনের একজন পিছনের সীটে, আরেকজন মাঝের সীটে লম্বা হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।

রাস্তাটা ক্রমশঃ ভালো হল, তারপর বেশ ভালো হল। ভোরের হালকা শিশিরে ভেজা কালো পিচঢালা রাস্তা এগিয়েছে দুপাশে ছোট ছোট গ্রাম ফেলে রেখে - রঙপুর, ধানিয়াগ্রাম, বড়া চতুরি, সিধুলি...শেষে কেঁদুলী (এই সম্ভবত জয়দেবের কেঁদুলী - ঠিক জানি না) ছাড়িয়ে ঢুকে গেলাম ঝাড়খন্ডে। গুগুল ক্রমাগত রাস্তার নাম বলে চলে, প্রায় প্রতি জাংশনে - আর সে এক কিম্ভুত উচ্চারণে। ঝাড়খন্ডে ঢুকে পড়েছি বোঝা গেল আশেপাশে দোকানের বোর্ডে ভাষা বদলে যাওয়ায়। প্রথম যে জায়গাটার নাম খেয়াল করলাম সেটা হল দিগুলী। জানি না, সিধুলি, কেঁদুলী আর দিগুলী - এই তিনটে পর পর জায়গার মধ্যে কোনো লিংক রয়েছে কিনা, নামের মিল রয়েছে তা তো দেখাই যাচ্ছে।

সিউড়ি থেকে ম্যাসাঞ্জোর প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার - এক ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া উচিৎ ছিলো - কিন্তু শুরুর ওই দশ কিলোমিটার মাটি-সুড়কির গর্তভরা রাস্তায় সময় খেয়ে নেওয়ায় ম্যাসাঞ্জোর ব্যারেজের পাশে এসে পৌঁছলাম তখন ছ'টা বেজে গেছে। মনটা চা চা করছে - সেই ভোরে উঠেছি, চা খাইনি। অথচ সকালের চা-টা দুধ চিনি ছাড়া লিকার খেতে ইচ্ছে করে না - অনেকদিনের অভ্যেস। ড্যামের একদম শুরুতেই একটা চায়ের দোকান - ভাবলুম যদি চা পাই। গিয়ে দেখি সে একটা বাচ্চা ছেলে বসে রয়েছে - সে সবে দোকান খুলেছে, হয়তো তার বাপ বা মা কেউ এসে উনুন ধরাবে। কাজেই চা পাওয়া গেল না, বরং ওইখানেই গাড়ি দাঁড় করিয়ে সাথে আনা গরমজলের সদ্ব্যবহার করে সেই লিকার চা-ই খেলাম। ঋক/ঋতি তখনো গভীর ঘুমে, কাজেই আমি একটা ধোঁয়াও টেনে নিলাম (টেরিয়ে তাকাবেন না মোটে, এই লম্বা ড্রাইভে আমার অফিশিয়াল পারমিশন থাকে)। তারপর ম্যাসাঞ্জোর লেকের ধার ধরে এগোলাম দুমকার দিকে।

রাস্তার এই অংশটা বড় সুন্দর। ছোট ছোট লালচে পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে রাস্তাটা এঁকেবেঁকে শুয়ে রয়েছে ঝাঝাপাড়া ছাড়িয়ে আরো কিছু দূর অবধি। তারপর পাহাড় শেষ হয়ে বিস্তীর্ণ রুক্ষ লালচে জমির মধ্যে দিয়ে সোজা টানা রাস্তা - মাঝে মাঝে ওঠে নামে, আর কালো পিচের ওপর লালচে ধূলো ছড়িয়ে ছুটে যায় একের পর এক লরি....

ম্যাসাঞ্জোর থেকে দুমকা হয়ে যে রাস্তাটা ভাগলপুরের দিকে চলে গেছে সেটা ন্যাশনাল হাইওয়ে ১১৪এ। দুমকা অবধি এই নাম, তারপর দুমকা শহর বাঁদিকে ফেলে রেখে ডানদিকে ঘুরে ন্যাশনাল হাইওয়ে ১৭ সোজা চলে গেছে ভাগলপুর। সিউড়ি থেকে হিসেব করলে সাত ঘন্টায় পূর্ণিয়া পৌঁছনোর কথা। ভোর পাঁচটায় বেরিয়েছি - অর্থাৎ, দুপুরের মধ্যে পূর্ণিয়া পৌঁছে যাবো। দুপুরের খাওয়া পূর্ণিয়া ছাড়িয়ে কোনো একটা ধাবায় সেরে নেবো, আপাতত সকালের জন্যে কিছু পেটে দিতে হবে। দেবাশিস আগেই বলেছিলো এই রাস্তায় ভালো খাবারের দোকান পাওয়া একটু চাপের, ওর সাজেশন ছিলো হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরনো, বা প্যাক করে নিয়ে আসা - কিন্তু ভোর সাড়ে চারটেয় ওসব হবে কোত্থেকে? আগের দিন বাড়ি থেকে রওনা দেওয়ার সময় কিছু মিষ্টি ছাঁদায় বাঁধা ছিলো, আর ছিলো একটা পাঁউরুটির প্যাকেট। ঠিক হল কোথাও থেকে ডিম কলা কিনে নেওয়া হবে, তাই দিয়ে ব্রেকফাস্ট মোটামুটি হয়ে যাবে।

হাইওয়ে দিয়ে যেতে যেতে মাঝেমাঝেই ছোটো ছোটো গ্রাম, বা আরেকটু বড় - ঠিক শহর নয়, মাঝামাঝি কিছু বলা যায় - পেরোতে হয়। সেখানে বাজার টাজার বসেছে। গাড়ি দাঁড় করানো একটু কঠিন - কারণ যে রাস্তায় বাজার, সেই একই রাস্তায় বাস, লরি, অটো, টোটো, গরু, মোষ, ছাগল, হাঁস, মুরগি, মানুষ সবই একসাথে সহাবস্থান করে। দুমকার একটু আগে থেকেই হাইওয়ের মসৃণ পিচের সাড়ে দেড়টা বেজে গেছে। পুরো ভাঙ্গা না হলেও, টুকটাক ভাঙাচোরা, বাম্পার, ধুলো...আবার এই ছোটো বাজারগুলো পেরিয়ে গেলে মোটামুটি ঠিকঠাক।

তো এরকম একটা বাজার, যেখানে একটু চওড়া রাস্তা, আর রাস্তার পাশে কিছুটা ফাঁকা জায়গা পেলাম, সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে একটা দোকানে কলা কিনলাম। কোনো দোকানে ডিম পাওয়া যাবে? সেদ্ধ? কলার দোকানদার বল্ল - ইঁয়েহি মিল যায়েগা, আভি ফুন লাগাতে হেঁ। সে দিব্যি মোবাইল বের করে কাউকে একটা ফোন করলো - আমায় বল্ল - আন্ডেওয়ালেকো ফুন কিয়া। তা আমাদের দুর্ভাগ্য, আন্ডেওয়ালা তখনই সিদ্ধ ডিম দিতে পারলো না। কিন্তু লোকটা আমাদের মত আরবিট লোকের জন্যে চেষ্টা তো করেছিলো - সেটাকেই বাহবা দিতে হয়। আরো দু চার জায়গায় খোঁজ করলাম - চায়ের দোকান ইত্যাদিতে। একজন বল্ল - নবরাত্রি শুরু হয়ে গেছে, আর কি কোথাও পাবেন...হুঁ, সেইটা কারণ হতেই পারে। ডিমের আশা ছেড়ে দিয়ে এগোতে এগোতে দেখলাম অনেক মিষ্টির দোকান পড়ছে - থরে থরে লাড্ডু, পেঁড়া সাজানো। আচ্ছা, যদি নোনতা কিছু পাই...পুরি-সবজি, আলু-পরোটা? আমাদের একজন আবার সুগারের রুগী, কাজেই শুধু পাঁউরুটি/কলা/মিষ্টিতে একটু আপত্তি আছে। নাঃ, পুরি-সবজিও পাওয়া গেলো না, তবে বালুসাই দেখে লোভ হল। ফ্রেশ বানানো, মাছি বসছে যদিও, আর গরুতে চেটেও থাকতে পারে - খোলা রাখা রয়েছে, গরু আশেপাশেই ঘুরছে দোকানের সামনে...তা জাতীয় মা বলে কথা, চেটে দিলে দোষ নেই - এই ভেবে খান কয়েক কিনেই ফেল্লাম। মাইরি বলছি - কলকাতায় অনেক বালুসাই খেয়েছি, কিন্তু ফ্রেশ বালুসাই, সে রাস্তার দোকানে খোলা বিক্রি হলেও - জায়গার কল্যাণে কিনা জানি না - ঝক্কাস টেস্ট। আমি তো খেলামই, ছেলেমেয়েও পটাপট খেয়ে ফেললো, এমনকি সুগারের রুগীও খেয়ে নিলো। জায়গাটা খুব সম্ভবত হংসডিহা বা হাঁসডিহা - একদম বিহার-ঝাড়খন্ড বর্ডারের কাছেই।

ঝাড়খন্ড পেরোলাম, বিহারে ঢুকতে মনে হল এই যে নীতিশবাউকে লোকে এত তোল্লাই দেয় - রাস্তা টাস্তা নাকি ব্যাপক বানিয়েছেন - সেটা কী সম্পূর্ণ ঢপ? মানে যা দেখলাম তাতে মনে হল পূর্ণিয়ার বহু আগে, এমনকি ভাগলপুর পৌঁছনোরও আগে সকালে যা খেয়েছি সব হজম হয়ে যাবে। রাস্তার ধারে বাজারের সংখ্যাও বাড়ছে, ভিড়ও বাড়ছে - এইভাবে চললো বেশ কিছুটা। ভাগলপুর থেকে তখন ওই পঁচিশ-তিরিশ কিলোমিটার দূরে - একটা পেট্রোল পাম্পে দাঁড়ালাম, একটু হাল্কা হওয়া দকরকার সবারই। পাম্পের ঠিক মুখে একটা চায়ের দোকান - সেখান থেকে একটু গরম জল ফ্লাস্কে ভরে নিতে হবে, আর চাও খাবো ভাবলাম। চা খেতে খেতে দোকানীর পাশে একজনের সাথে কিছু কথা হল...

কাঁহাসে আ রাহেঁ হেঁ?

কলকত্তেসে।

কাঁহা যাইয়েগা?

শিলিগুড়ি যায়েঙ্গে।

শিলিগুড়ি ইঁহাসে ক্যাইসে যায়েঙ্গে?

কিঁউ? ভাগলপুর-পূর্ণিয়া হো কর?

সাব, ভাগলপুর তো যায়েঙ্গে, পর পূর্ণিয়া ক্যায়সে যায়েঙ্গে?

যা শালা, আমি তো হুব্বা। ভাগলপুর দিয়েই তো বিক্রমশীলা ব্রীজ টপকে পূর্ণিয়া যায়। আমি তাই বল্লুম। যা উত্তর দিলো শুনে সাথে সাথে যেন ঝড়-ঝঞ্ঝা-বজ্রপাত-সুনামি-ভূমিকম্প-অগ্নুৎপাত-দাবানল সব একসাথে...

সাব, হাম ইয়াঁহা তিন দিনসে বইঠে হ্যায়। বিক্রমশীলা ব্রীজ পুরা বন্‌ধ হ্যায়, সতরা তারিখ কো চালু হোগা! উও দেখিয়ে, উও মেরা ট্রাক।

কেলেঙ্কারি করেছে। গুগুল ম্যাপ তো দিব্যি দেখাচ্ছে বিক্রমশীলা ব্রীজে স্লো ট্রাফিক। বন্ধ তো বলছে না। কিছুক্ষণ কথা বলে বুঝলাম ২৭শে সেপ্টেম্বর বিক্রমশীলা ব্রীজ বন্ধ হয়েছে, ১৭ই অক্টোবর খোলার কথা। সেই সময়ে একদম মাঝের একটা ৩৪ মিটারের স্প্যানে কাজ হচ্ছে বলে এপার থেকে ছোট গাড়ি (অটো ইত্যাদি) কিছুদূর যাচ্ছে, তারপর হেঁটে পেরিয়ে ওপার থেকে আবার সেই অটো/টোটো। সেই জন্যেই ট্রাফিক বন্ধ দেখাচ্ছে না, কনজেস্টেড বা স্লো দেখাচ্ছে।

(কথা বলতে বলতে গুগুলে সার্চ মেরে দেখলাম - ঠিকই, ২৪শে সেপ্টেম্বরের টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় খবর আছে - সেখানেও বলেছে ১৭ই অক্টোবর খুলবে - আমাদেরই দোষ - ফারাক্কা এড়ানোর জন্যে যখন নতুন প্ল্যান করলাম, তখনই চেক করে নেওয়া উচিৎ ছিলো - কিন্তু এ জিনিস মাথায় আসবে কী করে যে এরকম একটা ভাইটাল ব্রীজ বন্ধ হওয়া সত্ত্বেও ফারাক্কায় এই সময়েই মেনটেনেন্স শুরু হবে...)

তখন বাজে প্রায় বেলা এগারোটা। কী করি? আবার দুমকা অবধি ফিরে যেতে হবে?

(চলবে)

(আগের কথা)

দিকশূন্যপুরের রাস্তায় - The Road to Nowhere (৩য় পর্ব)

১৩ তারিখ সকাল থেকে অল্প টেনশন ছিলো - একেবারে ছিলো না বলা যাবে না। কারণটা মূলতঃ অনেক দিন পরে লঙ ড্রাইভে বেরোনো। সেই ২০১৩ সালের পর। এর মধ্যে বয়স বেড়েছে, রিফ্লেক্স কমে থাকতেই পারে। আর যেটা হয়েছে সেটা হল প্রোগ্রেসিভ লেন্স - মানে চালশেও ধরেছে আর কী। রোজ দুবেলা নেতাজীনগর - নিউটাউন গাড়ি ঠ্যাঙালেও, হাইওয়েতে যাওয়াআসা নিয়ে দেড় হাজার কিলোমিটার একটু অন্য জিনিস। তবে সে বেশিক্ষণ থাকেনি - হাইওয়েতে পড়তেই আবার সেই চেনা অনুভূতিটা ফিরে এলো - কালো পিচঢালা রাস্তায় দৌড় দৌড় দৌড়...

সেদিন মনে হয় পঞ্চমী ছিলো। এই প্রায় মহালয়া থেকে পুজো উদ্বোধন শুরু করে কী রেটে যে হাল বেহাল হয়েছে সেটা কলকাতায় না থাকলে বোঝা অসম্ভব। মোটামুটি দ্বিতীয়া থেকেই রাস্তায় কুলকুলিয়ে লোক নেমে গেছে, বাকিরা দেখে ফেলার আগেই ঠাকুর দেখতে হবে এরকম কিছু মানসিকতা নিয়ে মনে হয়। মহালয়ার দিন উত্তর থেকে ফেরার সময় সন্ধ্যেবেলা দেখেছি মণি স্কোয়্যার থেকে লেক টাউন অবধি জ্যাম - তা পঞ্চমীর দিন কী হতে পারে বুঝতেই পারছেন। ওই দুপুরবেলাতেও লর্ডস মোড় পেরোতে কান্নাকাটির অবস্থা। এর মধ্যে দুটো চল্লিশ বেজেও গেছে, ছেলে স্কুল থেকে বেরিয়ে তিনবার ফোনও করে ফেলেছে। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে পৌঁছে তাকে তুলতে তুলতেই তিনটে বেজে গেলো। তারপর আবার ডোভার রোড ঘুরে বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে এসে জ্যাম। গুরুসদয় দত্ত রোডে জ্যাম। থিয়েটার রোডে জ্যাম। তো সেসব পেরিয়ে এজেসি বোস রোড ফ্লাইওভারে উঠতেই সাড়ে তিনটে। সেকেন্ড ব্রীজ পেরোতে প্রায় চারটে। ওদিকে সিউড়ি যেতেই লাগবে ঘন্টা পাঁচেক - মানে সাড়ে আটটা - ন'টার আগে কোনোভাবেই পৌঁছনো যাবে না।

এবার সেকেন্ড হুগলী ব্রীজ পেরিয়েই দেখি কোণা এক্সপ্রেসওয়ে পুরো জ্যাম। জানলাম পুজোর সময় শহরে ট্রাক ঢোকার উপর রেসট্রিকশন রয়েছে, যেগুলো ঢুকেছিলো সেগুলো তখন বেরিয়ে যাচ্ছে, কাজেই রাস্তার হাল খারাপ। সে জ্যাম চললো সাঁতরাগাছি ব্রীজ অবধি। তারপরেও রেহাই নেই - ডানকুনিতেও বাজে জ্যাম। ওই অবধি পৌঁছতেই জ্যামে জ্যামে হাল বেহাল।

ডানকুনি পেরোনোর পরে হাইওয়ে ফাঁকা পেলাম - বর্ধমান অবধি কোনো চাপ নেই। বর্ধমান থেকে দুটো উপায়ে সিউড়ি যাওয়া যায় - এক) গুশকরা - সুরুল হয়ে, দূরত্ব ২০৫ কিমি - রাস্তাটা ন্যাশনাল হাইওয়ে হলেও দুটো লেনের; আর দুই) দুর্গাপুর/অন্ডাল হয়ে - দূরত্ব একটু বেশি, রাস্তাও চওড়া, কিন্তু সময় বেশি লাগছে - অর্থাৎ, গুশকরা-সুরুলের রাস্তা সরু হলেও, অসুবিধাজনক নয় বলেই মনে হয়।


বর্ধমান পৌঁছে ডানদিকে ঘুরে ন্যাশনাল হাইওয়ে ১১৪ (সেকমপুর-সাহাপুর রোড) - সোজা চলে গেছে গুশকরার দিকে। এই রাস্তাটা ওই প্রায় জিটি রোডের মত - একটা যাওয়ার লেন, একটা আসার লেন, মাঝে কোথাও কোথাও মিডিয়ান মার্ক করা আছে, কোথাও নেই। আর প্রপার গ্রামবাংলার মধ্যে দিয়ে রাস্তা। দুদিকে ক্ষেত, রাস্তার ধারে কাশবনের ছড়াছড়ি, আর, সন্ধ্যের মুখে সেসব ক্ষেতে আর মাঠে হু হা কুয়াশা। মাঝে মাঝে এক একটা গ্রামে তখনো প্যান্ডেল বাঁধার কাজ চলছে (ওদিকে কলকাতায় পুজোর অর্ধেক হয়ে গেছে সেটা মনে রাখবেন)। উল্টোদিক থেকে গাড়ি ধেয়ে আসছে ডিপারের তোয়াক্কা না করে - সেই সময়টুকু চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়া ছাড়া এই রাস্তাটা নির্ঝঞ্ঝাট বলাই যায়। শুধু মাঝে মাঝে কিছু জায়গায় কুয়াশা রাস্তা ঢেকে দেয় - গাড়ির উইন্ডশিল্ডের ওপর হইহই করে ধেয়ে আসে - গাড়ির হেডলাইট হাই-বীমে দিলে আরোই বরং বেশি জ্বলজ্বল করে ওঠে, চোখ ধাঁধায়। কোথাও কোথাও রাস্তার ধারের গাছগুলো দুপাশ থেকে বেঁকে এসে টানেলের মত তৈরী করে দিয়েছে - গাড়ি থেকে দেখলে মনে হয় পাতামোড়া একটা টানেলের মধ্যে দিয়ে হু হু করে এগিয়ে যাচ্ছি - ওই দূরে টানেলের মুখ, সেখান দিয়ে বেরোলেই একটা নতুন কিছু দেখতে পাবো...

এই রাস্তাটা গুশকরা পেরিয়ে আপনাকে নিয়ে যাবে সুরুল অবধি। সেখানে শান্তিনিকেতনকে ডানদিকে ফেলে রেখে আপনি সিউড়ি-বোলপুর রোড ধরে আরো এগিয়ে যাবেন। আশেপাশে শান্তিনিকেতন অঞ্চলের চেনা কিছু নামের বোর্ড দেখতে পাবেন - প্রান্তিক যেমন একটা। আরো এগিয়ে অবশেষে সিউড়ি। বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে অল্প এগোলেই বাঁদিকে হোটেল সাগর।

গাড়ি পার্ক করে রাতের জন্যে দরকারি ব্যাগ, আর ক্যামেরা ব্যাগ নিয়ে চেকইন করলুম। প্রথম প্রশ্ন - "আপনারা কি তারাপীঠ যাবেন?" কে জানে, সিউড়িতে যারাই যায় তারা তারাপীঠ যায় কিনা। যাই হোক, ঘরগুলো ভালোই (তবে এক একটা ঘরে দুজন করেই - তাই আমাদের চারজনের জন্যে দুটো ঘর নিতে হয়েছিলো)। ছেলেমেয়ে বায়না করলো বাড়ি থেকে বেরিয়েছি, বাড়ির মত ভাত-ডাল-রুটি খাবো না, এলোমেলো খাবো। এবার এদের এলোমেলো মানে পিজ্জা/বার্গার - সে আর কোথায় পাওয়া যাবে - চাউমিন আর চিলি চিকেনই সই। খেয়েদেয়ে চটপট ঘুমিয়ে পড়ার কথা, কারণ পরের দিন অনেকটা পথ চালাতে হবে - প্রায় পাঁচশো কিলোমিটার, কাজেই ভোরে বেরোতে হোবে। টার্গেট দিলাম সাড়ে চারটে, আর সাড়ে তিনটেতে অ্যালার্ম দিয়ে সেদিনের মত গুডনাইট।

পরের দিনের গন্তব্য লাটাগুড়ি পেরিয়ে টিলাবাড়ি টুরিস্ট কমপ্লেক্স।

(চলবে)

(আগের কথা)