Wednesday, March 18, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: ব্যালফার ডিক্লারেশন

(৪) ব্যালফার ডিক্লারেশন (১৯১৭)

আর্চিবল্ড ওয়াভেল - প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্যালেস্টাইন অভিযানে যিনি অ্যালেনবির বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এবং চল্লিশের দশকের ক্রিটিকাল সময়ে যিনি আসবেন ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে - প্যারিসের শান্তি সম্মেলনের পর একটা কথা বলেছিলেন – "After 'the war to end war' they seem to have been pretty much successful in Paris at making a 'Peace to end Peace'" - প্যারিস শান্তি সম্মেলন সম্পর্কে এত সহজ বাস্তব বর্ণনা কেউ আজ অবধি দিতে পারেননি। যেমন, সাইকস-পিকট চুক্তি নিয়ে টিই লরেন্স (মানে লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া) বলেছিলেন - "a purely British and French show"...
কেন এই কথাগুলো এসেছিল, সেটা স্পষ্ট হবে যদি আমরা ১৯১৭ সালের ব্যালফার ডিক্লারেশনের ইতিহাসটা একবার দেখি। কালো কালিতে লেখা ডিক্লারেশন শেষ অবধি ইতিহাসকে লিখেছিল রক্তের অক্ষরে।
১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর - ব্রিটিশ ফরেন সেক্রেটারি আর্থার জেমস ব্যালফার ব্রিটিশ ইহুদী কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় লর্ড রথসচাইল্ডের উদ্দেশ্যে একটা ছোট চিঠি লেখেন। মাত্র সাতষট্টি শব্দের এই চিঠি মধ্যপ্রাচ্যকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছিল, যার ফলাফল আমরা আজও টের পাই। কী লেখা ছিল সেই চিঠিতে?
"His Majesty's government view with favour the establishment in Palestine of a national home for the Jewish people, and will use their best endeavours to facilitate the achievement of this object, it being clearly understood that nothing shall be done which may prejudice the civil and religious rights of existing non-Jewish communities in Palestine, or the rights and political status enjoyed by Jews in any other country."
১৯১৭ সালের আগে জায়নিস্টরা একাধিক ইম্পিরিয়াল শক্তির (অটোমান সাম্রাজ্য, জার্মানি, রাশিয়া ইত্যাদি) সামনে দরবার করলেও কেউই জায়নিস্টদের "ন্যাশনাল হোম"-এর দাবীকে সমর্থন করেনি। আর্থার ব্যালফার এই ডিক্লারেশনের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবার কোনও ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক শক্তি (ইনসিডেন্টালি, সেই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি) প্রকাশ্যে জায়নিজমের প্রতি সমর্থন জানালো…
ব্রিটেনের স্বার্থ কী ছিল?
মনে রাখবেন, সেই সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে পুরোদমে। ব্রিটেন চাইছিল রাশিয়া ও আমেরিকায় বসবাসকারী বিশাল ইহুদী জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে সেই দেশগুলোতে চাপ তৈরী করে তাদের মিত্রশক্তির পক্ষে আনার। উইৎজম্যানের নেতৃত্বে জায়নিস্টরা ব্রিটিশ পলিসিমেকারদের একাংশের মধ্যে সিমপ্যাথিও তৈরী করতে সফল হয়েছিল, আরেক অংশ ভেবেছিল ব্রিটেন সমর্থিত ইহুদী রাষ্ট্র সুয়েজ অঞ্চলে ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে উপযোগী "অ্যাসেট" হয়ে উঠবে কোনও এক সময়ে।
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল - এই ঘোষণার টাইমলাইনটাও বিশ্বযুদ্ধের কিছু ঘটনার সাথে খাপে খাপ মিলে গিয়েছিল: ১৯১৭ সালের ৩১ অক্টোবর বেরশেভার যুদ্ধে দক্ষিণ প্যালেস্টাইনের সামরিক অচলাবস্থার অবসান হয়, আর সেইদিনই ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় এই ডিক্লারেশনের অনুমোদনও দেওয়া হয়, বিশ্বব্যাপী ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ডিক্লারেশনের প্রোপাগান্ডা এফেক্টের কথা মাথায় রেখে।
জাতীয় বাসস্থান বা ন্যাশনাল হোমের আন্তর্জাতিক আইনে কোনও প্রিসিডেন্স ছিল না এর আগে। ব্রিটিশ ডিক্লারেশনের মধ্যে জিউয়িশ ন্যাশনাল হোমের সরাসরি মানে ইহুদী রাষ্ট্র না হলেও, জায়নিস্টদের মূল লক্ষ্য ছিল তাই। ব্রিটিশ সরকার পরে ক্ল্যারিফাই করে যে এই ঘোষণায় প্যালেস্টাইন বলতে তারা গোটা প্যালেস্টাইন জুড়ে ইহুদী ন্যাশনাল হোমের কথা বোঝাতে চায়নি। এবং, চিঠির শেষাংশ, মানে "existing non-Jewish communities" কথাগুলো এই ঘোষণার বিরোধী যাঁরা বাস্তবে ওই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্ভাব্য ক্ষোভ এবং বিশ্বজোড়া "অ্যান্টিসেমিটিজম"-এর আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের সন্তুষ্ট করার জন্যে জোড়া হয়েছিল।
ডিক্লারেশনের বেসিক কন্ট্রাডিকশনগুলো নিমেষেই স্পষ্ট হয়ে ওঠেঃ ব্রিটেন এমন এক ভূখণ্ডে ইহুদী ন্যাশনাল হোম গড়ে তোলার কমিটমেন্ট করছে যেখানে প্রায় ৯৪% অধিবাসীই প্যালেস্টিনীয় আরব জনগোষ্ঠীর মানুষ। প্যালেস্টিনীয় লেখক রেফাত ইব্রাহিম এই ডিক্লারেশন সম্পর্কে লিখেছিলেন - "Balfour promised what he did not own to those who did not deserve it." 

সাতষট্টি শব্দের এই চিঠিতে প্যালেস্টাইনের ৯৪% আরব অধিবাসীদের কলমের এক খোঁচায় "নন-জিউয়িশ কমিউনিটি" বলে ছেড়ে দেওয়া হল। তাদের জন্যে রইল শুধু "সিভিল অ্যান্ড রিলিজিয়াস রাইটস" - খেয়াল করবেন, রাজনৈতিক অধিকার বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার - এই শব্দগুলো এই বিশাল সংখ্যাধিক্য মানুষের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। বরং জনসংখ্যার মাত্র ৬% অংশকে সেই এলাকায় "ন্যাশনাল হোম" বানানোর অধিকার দেওয়া হল, দেওয়া হল রাজনৈতিক অধিকার, এও বলা হল যে এই চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে অন্য কোনও দেশে ইহুদী অধিবাসীদের অধিকার এবং রাজনৈতিক মর্যাদার কোনও হেরফের হবে না।
১৯১৯ সালে, আর্থার ব্যালফার এক আভ্যন্তরীণ চিঠিতে আরও ভয়ানক কথা লিখেছিলেন - "In Palestine, we do not believe in the principle of self-determination for the existing population." কলোনিয়াল শাসনের ইতিহাস যদি ঘাঁটি, দেখতে পাব সেই আমলে ইউরোপীয় কলোনিয়াল শক্তির মনোভাব ছিল এইরকমই - স্থানীয় অধিবাসীদের দাবী, সত্ত্বা, পরিচয়কে পুরোপুরি অস্বীকার করা, এবং এক সময়ে মুছে ফেলা। শুধু আরব নয়, ভারত সম্পর্কেও ব্রিটিশ সরকারের এক বড় অংশের মনোভাব ছিল এমনই – অশিক্ষিত নেটিভ হিদেন।
আর্থার ব্যালফারের এই ডিক্লারেশনকে শেষ অবধি প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেটে জায়গা দেওয়া হয়, ব্রিটেন আইনতঃ বাধ্য হয়ে পড়ে এই ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করতে, কারণ ব্যালফার ডিক্লারেশন আন্তর্জাতিক আইনে একটা চিঠির বেশি কিছু না হলেও, লীগ অফ নেশনসের প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেট মেনে চলা বাধ্যতামূলক। ব্রিটেনের পক্ষে একই সঙ্গে ইহুদীদের ন্যাশনাল হোম তৈরী করার পাশাপাশি আরব অধিবাসীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা বাস্তবে একটা অসম্ভব "ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট" হয়ে দাঁড়ায়। এবং, দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা সংঘাতের সূচনা করে দেয়…
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আর্নল্ড টোয়েনবি ১৯৪৮ সালের নাকবা (প্যালেস্টিনীয়দের দেশছাড়া হওয়ার ঘটনা) সম্পর্কে লিখেছিলেন - "natural outcome of the Balfour Declaration, not a deviation from it." প্যালেস্টিনীয়দের কাছে এই ডিক্লারেশন আজও একটা উন্মুক্ত ক্ষত। রেফাত ইব্রাহিমের ভাষায় - "Children who have lost their homes know Balfour's name before they know the names of current leaders. They instinctively understand that what is happening is not merely a war, but a continuation of a promise written over a century ago and still enforced on their bodies."

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: আরব বিদ্রোহ

(৩) আরব বিদ্রোহ (১৯১৬-১৯১৮)
দশই জুন, ১৯১৬ - মক্কার বাতাস চিরে ভেসে আসে একটা মাত্র গুলির আওয়াজ। অটোমান সৈন্যদের গ্যারিসনে সেই গুলিটা চালিয়েছিলেন মুসলমানদের পবিত্রতম তীর্থের রক্ষক, শরিফ হুসেইন বিন আলি। এর পাঁচদিন আগেই মদিনার অটোমান গ্যারিসনের ওপর আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে আরব বিদ্রোহী সৈন্যদল। শরিফ হুসেইনের চালানো গুলি আরব বিদ্রোহের পাব্লিক ডিক্লারেশন আর আরব অঞ্চলে অটোমান শাসনের অবসানের সংকেত। 
এই আরব বিদ্রোহ আচমকা আকাশ থেকে এসে পড়েনি। বরং বেশ কয়েকটা ঘটনার ওপর নির্ভর করে এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল অনেক পরিকল্পনা করেই। এই বিদ্রোহের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে বলা যায় তুর্কী জাতীয়তাবাদের কথা - ১৯০৮ সালে তরুণ তুর্কী মুভমেন্টের শুরু থেকেই যে চেতনা ক্রমশঃ অটোমান সাম্রাজ্যের বাদবাকি আরব অধিবাসীদের ক্রমশঃ বিচ্ছিন্ন করে দিতে শুরু করে। বলা যায় আরব জাতীয়তাবাদী চেতনার কথাও - সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার বুদ্ধিজীবী এবং কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে ক্রমশঃ উদ্ভূত হতে থাকা স্বতন্ত্র আরব পরিচিতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্খা। এবং অবশ্যই ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতি - শরিফ হুসেইন এবং ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্সের মধ্যে থেকে তৈরী হওয়া ধারণা যে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করলে আরব অধিবাসীদের স্বাধীনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবী ব্রিটিশ সরকার স্বীকার করে নেবে।
শরিফ হুসেইনের নিজস্ব উচ্চাশাও ছিল - যুদ্ধের বাজারে নিজেকে অটোমান শাসন থেকে বের করে এনে স্বাধীন স্বতন্ত্র আরবভূমিতে হাশেমাইট বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করা…
বিদ্রোহের শুরুর দিকে ফোকাস ছিল আরবের পবিত্র শহরগুলোকে দখল করা। ১০ই জুন ১৯১৬ - হুসেইনের দুই ছেলে, আলি আর ফয়জলের নেতৃত্বে আরব বাহিনী মক্কা দখল করে ফেলে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর দৌলতে জেড্ডার বন্দরও আরব বাহিনীর হাতে আসে অল্প সময়ের মধ্যেই। তবে আরব বাহিনীর যাত্রা পুরোপুরি নিষ্কন্টক ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রায় পুরো সময়টা জুড়েই মদিনার অটোমান গ্যারিসন ঘেরাও হয়ে থাকলেও শহর হাতছাড়া হতে দেয়নি। আর, এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য কখনোই অনেক এলাকা দখল করে ফেলা ছিল না, বরং গেরিলা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অটোমান সৈন্যবাহিনীকে এনগেজ করে রাখা আর তাদের সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
পিটার ও'টুল অভিনীত ডেভিড লীনের ১৯৬২ সালের সিনেমা লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া দেখেননি বা নামও শোনেননি এমন মানুষ বিরল, অন্তত আমাদের জেনারেশন অবধি তো বটেই। সেই সিনেমাটা পুরো আকাশ থেকে পড়া কাল্পনিক কাহিনী নয়, বরং এক ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার, আর্কিওলজিস্ট এবং ডিপ্লোম্যাট থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সের জীবনের ঘটনার ওপর তৈরী। এই লরেন্সই সিনেমার লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া, পাকেচক্রে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এই আরব বিদ্রোহের এক মুখ্য চরিত্র। তাঁকে প্রথমে পাঠানো হয়েছিল হেজাজে - পর্য্যবেক্ষক হিসেবে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই লরেন্স শরিফ হুসেইনের দুই ছেলে, আলি আর ফয়জলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে হয়ে ওঠেন আরব বাহিনীর অন্যতম প্রধান উপদেষ্টাও। লরেন্স একদম সঠিকভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে আরব বাহিনী খোলা মাঠে অটোমার সৈন্যদের মুখোমুখি হয়ে কিছু করে উঠতে পারবে না, বরং আচমকা গেরিলা হানাই তাদের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। আরব নেতৃত্বকে বুঝিয়েসুঝিয়ে লরেন্স আক্রমণের মূল কেন্দ্র করেন আরব এলাকার উত্তরাঞ্চলকে, বিশেষ করে আক্রমণ শানানো হয় হেজাজের রেলওয়ে লাইনের ওপর। এই রেললাইনই ছিল অটোমান সৈন্যবাহিনীর প্রধান সাপ্লাই লাইন - মদিনা এবং সিরিয়ার বাকি অঞ্চলের গ্যারিসনে রসদ পৌঁছত এই লাইনের মাধ্যমেই। আরব গেরিলা বাহিনী, যাদের পরিচয় ইতিহাসে লেখা রয়েছে নর্দার্ন আর্মি বলে - মূলতঃ প্রাক্তন অটোমান অফিসার এবং আদিবাসী বেদুইনদের নিয়ে তৈরী, মরুভূমির ওই এলাকা ছিল যাদের হাতের নখের মত পরিচিত - উটে সওয়ার হয়ে আক্রমণ চালায় যায় এই রেললাইনের ওপর। একের পর এক ব্রিজ উড়ে যায়, ধ্বংস হয় রেলওয়ে ট্র্যাক। হাজারো অটোমান ফৌজ ক্রমাগত ব্যস্ত থেকে যায় এই রেললাইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।
১৯১৭-১৮ সাল নাগাদ আরব রিভোল্ট তার শিখরে পৌঁছয়। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে নর্দার্ন আর্মি দখল করে আকাবা বন্দর - ফলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পক্ষে রসদ পৌঁছে দেওয়ার কাজ সহজ হয়ে পড়ে। এবং প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ জেনারেল এডমন্ড অ্যালেনবির অভিযানের সময় তাঁর ডান হাত হিসেবে কাজ করেছিল এই নর্দার্ন আর্মিই। ক্রমাগত অটোমান সাপ্লাই লাইনে হানা, অটোমান এলাকার মধ্যে থেকে ইন্টেলিজেন্স সরবরাহের কাজ – আরব বাহিনীর এই সাফল্য যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে অটোমান আর্মিকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল, ফলে এই ইস্টার্ন ফ্রন্টে অটোমান সৈন্যরা সেরকম কার্যকরী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই পারেনি। আরব অভিযানের চূড়ান্ত সাফল্য ছিল ১৯১৮ সালের অক্টোবরের শুরুতে দামাস্কাসের দখল নেওয়া - যার কিছুদিন পরেই অটোমান শক্তি মিত্রপক্ষের সামনে আত্মসমর্পণ করে। আমির ফয়জল বিজয়ীর বেশে দামাস্কাসে প্রবেশ করেন, তৈরী হয় স্বাধীন আরব সরকার - অল্প কিছুদিনের জন্যে হলেও যে ঘটনা একটা ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন আরব রাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

তবে কলোনিয়াল আমল তো। গোটা কলোনিয়াল আমলই বেসিকালি নানান বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনায় ভর্তি। এখানেও আলাদা কিছু হয়নি।

আরব বিদ্রোহ তার ইমিডিয়েট মিলিটারি লক্ষ্য — অটোমান সাম্রাজ্যের হার — নিশ্চিত করতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হয়ে যায় যুদ্ধের পরে আলোচনার টেবিলে।
আরবরা শরিফ হুসেইন আর ম্যাকমোহনের মধ্যে আলোচনা (যার কথা আগের পর্বে লিখেছি) আর স্বাধীন আরব রাজ্যের ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা যে ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের সঙ্গে গোটা আরব এলাকার ভাগাভাগি করে নিয়েছে সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে, সেটা প্রকাশ পায় এই সময়েই। ব্রিটেন আর ফ্রান্সের এই দ্বিচারিতা ফাঁস করে দেয় নভেম্বর বিপ্লব পরবর্তী রাশিয়ার বলশেভিক সরকার। প্রকাশ্যে আসে ১৯১৭ সালের ব্যালফার ডিক্লারেশনের কথাও — যেখানে ব্রিটিশরা জায়নিস্টদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিল যে প্যালেস্টাইনেই তারা ইহুদী হোমল্যান্ড বানাতে সাহায্য করবে, সেই প্যালেস্টাইন যাকে আরবরা নিজেদের জমি হিসেবেই দেখত (হুসেইন-ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স অনুযায়ী আরবদের বিশ্বাস ছিল এরকমটাই)।
বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে উইৎজম্যানের (যিনি পরে ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট হবেন) সঙ্গে চুক্তিতে ফয়জল প্যালেস্টাইনে ইহুদী সেটলমেন্ট তৈরীর কথা মেনে নেন, শুধুমাত্র যদি আরব স্বাধীনতার গ্যারান্টি থাকে তবেই। সেই বছরেই, প্যারিসে শুরু হয় শান্তি সম্মেলন। সেখানে হুসেইনের প্রতিনিধি হিসেবে আমীর ফয়জল আরবদের দাবী পেশ করেন। অবভিয়াসলি, কেউ সে কথা কানে তোলেনি। ফয়জল ও উইৎজম্যানের চুক্তিও নাল অ্যান্ড ভয়েড হয়ে যায় তখনই। লীগ অফ নেশনস ১৯২০ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে একটা ম্যান্ডেট তৈরী করে, যেখানে সিরিয়া আর লেবাননকে তুলে দেওয়া হয় ফরাসীদের হাতে; ইরাক, প্যালেস্টাইন আর ট্রান্সজর্ডনকে দেওয়া হয় ব্রিটিশদের। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ফয়জলকে সিরিয়াস রাজা হিসেবে বেছে নেয় সিরিয়ার জাতীয় কংগ্রেস। ওই বছরের ২৪শে জুলাই তারিখেই মায়সালানের যুদ্ধের পর ফরাসীরা তাঁকে তাড়িয়ে দেয়। ব্রিটিশরা, তাদের গুডউইলের নিদর্শন হিসেবে ফয়জলকে ইরাকের গদিতে বসায়, আর ফয়জলের ভাই আবদুল্লাহকে বসায় ট্রান্সজর্ডনে।

শেষ হয় আরব বিদ্রোহের এই পরিচ্ছেদ, দিনের শেষে সামরিক সফলতা হলেও যেটা হয়ে দাঁড়ায় চূড়ান্ত রাজনৈতিক ব্যর্থতা। এই বিদ্রোহের সময়ে আরব জাতীয়তাবাদী চেতনা আর সামরিক শক্তির উত্থান হলেও সেসব ধুলোয় মিশে যায় কলোনিয়াল পাওয়ার পলিটিক্সের বাস্তব দুনিয়ার সামনে। আরবরা স্বাধীনতা পাওয়ার উদ্দেশ্যে লড়লেও শেষ অবধি অটোমান শাসকের বদলে মাথার ওপরে পায় নতুন ইউরোপীয় শাসককে। আর এই অভিজ্ঞতা আর বিট্রেয়ালের অনুভূতিই লংটার্মে আরব রাজনৈতিক চেতনা আর গোটা এলাকার অস্থিরতার অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে থেকে গেছে...

এই জটের অন্যতম প্রধান গ্রন্থি হল ব্যালফার ডিক্লারেশন, যাকে আজকের রাজনীতিকরা ধামাচাপা দিয়ে রাখেন, অথচ সাইকস-পিকট চুক্তি, হুসেইন-ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স আর ব্যালফার ডিক্লারেশন — এই তিনের জটের পরিণতিই আজকের মধ্যপ্রাচ্য। পরের পর্বে, ব্যালফার ডিক্লারেশন।

Monday, March 16, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: হুসেইন ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স

দুদিন আগে সাইকস-পিকট চুক্তি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এই সিরিজটা নিয়ে এগোনোর আগে পটভূমিটা আরও একটু ব্যাখ্যা করা জরুরী।

ঐতিহাসিক টাইমলাইন দেখলে ঘটনাপ্রবাহের শুরু ১৯০৮ সালে পারস্যে মাটির নীচে তেলের খোঁজ পাওয়া থেকে। খুব স্পেসিফিকালি বলতে গেলে ১৯০৮ সালের ২৬শে মে, পারস্যের দক্ষিণ পশ্চিমে মসজিদ সুলেইমান নামের এক প্রত্যন্ত এলাকায় ব্রিটিশ ড্রিলিং টিম প্রথম তেল স্ট্রাইক করে - বাণিজ্যিকভাবে তাৎপর্য্যপূর্ণ প্রথম অয়েল স্ট্রাইক, যেটা পরবর্তীকালে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে প্রবলভাবে বদলে দেবে। এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই, ১৯০৯ সালে তৈরী হয় অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি (APOC) আর ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের তৎকালীন ফার্স্ট লর্ড অফ অ্যাডমিরালটি উইনস্টন চার্চিলের সুপারিশে ব্রিটিশ সরকার এই নতুন কোম্পানির ৫১% শেয়ার কিনে নেয়, রয়্যাল নেভির জন্যে শস্তায় তেলের ব্যবস্থা করার জন্যে। সেই সময়েই রয়্যাল নেভি নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলোকে কয়লার শক্তি থেকে তেলে নিয়ে যাওয়া শুরু করে।
তেলের এই আবিষ্কার নিমেষের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যকে বিশ্বের তেল-মানচিত্রে জায়গা করে দেয় আর গোটা এলাকার কৌশলগত গুরুত্বকে আমূল বদলে দেয়। যে এলাকা এতদিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের এক অখ্যাত অঞ্চল, সেটাই এরপর হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। আজও ঠিক তাই।

১৯১৪ সালের ২৮শে জুন, সারায়েভোতে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্দ আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সেইদিনই টার্কিশ অয়েল কোম্পানি মেসোপটেমিয়ায় (আজকের ইরাক) তেলের খোঁজ করার বরাত পায়। এই টার্কিশ অয়েল কোম্পানির মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার ছিল অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি, বকলমে ব্রিটিশ সরকার। এর ঠিক এক মাস পর, ২৮শে জুলাই, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কয়েকদিনের মধ্যেই জারের রাশিয়া সার্বিয়াকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। এবং জার্মানি যুদ্ধ ঘোষণা করে রাশিয়া এবং রাশিয়ার বন্ধুদেশ ফ্রান্সের বিপক্ষে। ইংল্যান্ডও জড়িয়ে পড়ে এই যুদ্ধে। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আগস্ট মাসে রাশিয়ার আক্রমণের ভয়ে এবং নিজেদের হারানো এলাকা ফিরে পাওয়ার আশায় জার্মানির সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ক্ষয়িষ্ণু অটোমান সাম্রাজ্যও। ১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে মিত্রশক্তি পৌঁছয় অটোমান সাম্রাজ্যয়ের গ্যালিপোলি উপকূলে। এর কিছুদিনের মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটে যায়, যেটা পরের দিকে গোটা অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহের ওপর ছাপ ফেলে যাবে। সাইকস-পিকট চুক্তির মতই, ইজিপ্টের ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমোহন আর মক্কার শরিফ, হুসেইন বিন আলি আল-হাশিমির মধ্যে চিঠিচাপাটির ঘটনা শুনতে অকিঞ্চিৎকর ঠেকলেও, বাস্তবে প্রচণ্ডই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯১৫ সালের জুলাই থেকে ১৯১৬ সালের মার্চের মধ্যে, হুসেইন বিন আলি এবং স্যার হেনরির মধ্যে খান দশেক চিঠি লেখালেখি চলে - আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে যেটা এখনও একটা অনগোয়িং ডিবেট। ‘ম্যাকমোহন-হুসেইন করেসপন্ডেন্স’ হিসেবে খ্যাত এই চিঠিগুলোয় অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহের বিনিময়ে আরবদের স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার, কারণ সেই সময়ে জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়া অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে ইংল্যান্ড মরিয়া হয়ে বন্ধু খুঁজতে ব্যস্ত। মজার ব্যাপার হল, পরোক্ষভাবে ভারত ঠিক এইখানেই এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের কোনোকিছুই যে আইসোলেটেড নয়, তার অন্যতম প্রমাণ এই ধরণের ঘটনা থেকেই পাবেন।

অটোমান খলিফা তখন মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন, এবং ব্রিটিশদের আশঙ্কা ছিল এই জিহাদ যদি ভারতে (ভারতে তখন প্রায় সাত কোটি মুসলমানের বাস) ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের সাধের ক্রাউন জুয়েল হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। খেয়াল রাখবেন, ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। কংগ্রেস ক্রমশঃ শক্তিশালী হচ্ছে, আরও নানা ধরণের বৈপ্লবিক কাজকর্মও চলছে ভারতে। কাজেই, অটোমান খলিফার জিহাদের আহ্বানকে কাউন্টার করার জন্যে জরুরী হয়ে ওঠে এই আরব বিদ্রোহের পরিকল্পনা, এবং ইসলামের পবিত্রতম তীর্থস্থানের রক্ষক হিসেবে শরিফ হুসেইনের ক্ষমতা ছিল অটোমান সুলতানের ধর্মীয় আবেদনের কাউন্টার করার। তাছাড়াও, তার কিছুদিন আগেই হুসেইনের বড় ছেলে ফয়সলের কাছে আরবের বিভিন্ন গোপন জাতীয়তাবাদী সংগঠনের কাছ থেকে আবেদন আসে অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের।
অন্ততঃ দশটা পারস্পরিক চিঠির মধ্যে ১৯১৫ সালের ২৪শে অক্টোবর তারিখে লেখা ম্যাকমোহনের চিঠিটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই চিঠিতেই ম্যাকমোহন লেখেন যে শরিফের দাবী মেনে একটা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আরবদের স্বাধীনতাকে ব্রিটিশ সরকার স্বীকৃতি দেবে ও সমর্থন জানাবে। ম্যাকমোহন কিছু এলাকাকে সুস্পষ্টভাবে এই সীমানার বাইরে রাখেন - যেমন মেরসিন ও আলেকজান্দ্রেত্তা অঞ্চল, আর দামাস্কাস, হোমস, হামা ও আলেপ্পো এলাকাসমূহের পশ্চিমে অবস্থিত সিরিয়ার অংশবিশেষ - কারণ এই এলাকাগুলোকে নির্দিষ্টভাবে আরব এলাকা বলা যায় না।

প্যালেস্টাইন নিয়ে ধোঁয়াশার শুরুও এইখান থেকেই। ব্রিটিশরা, তাদের স্বভাবমতনই, প্যালেস্টাইন সম্পর্কে অস্পষ্টতা রেখে দিয়েছিল চিঠিতে। আন্দাজ করা যেতে পারে এর কারণ জায়নিস্টদের প্রতি পক্ষপাতই হবে, কারণ ১৯০৫ সালে থেকেই জায়নিস্টদের একমাত্র ফোকাস ছিল প্যালেস্টাইনের ওপরে।

শরিফ হুসেইন এবং অধিকাংশ আরবের কাছেই প্যালেস্টাইন ছিল আরব এলাকা, কাজেই আরবদের স্বাধীন এলাকার মধ্যে তাঁরা প্যালেস্টাইনকেও ধরে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা অন্য কথা বলে - যেহেতু অটোমান আমলে সুলতান বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে জেরুজালেমে বসবাস করার অনুমতি দিয়েছিলেন, কাজেই প্যালেস্টাইনকে শুধুমাত্র আরব এলাকা হিসেবে দেখা যাবে না।

দুপক্ষের চিঠিগুলো আনঅফিশিয়ালি প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে, আর তারপর অফিশিয়ালি ১৯৩৯ সালে। এর মধ্যে ১৯১৯ সালে প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ জোরালোভাবে বলেছিলেন যে এই ম্যাকমোহন-হুসেইন করেসপন্ডেনস দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাধ্যবাধকতার মধ্যেই পড়া উচিত। কিন্তু সাইকস-পিকট চুক্তি আর বালফ্যুর ডিক্লারেশন যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন দেখা যায় যে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের গোপন বোঝাপড়া আর জায়নিস্টদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি, দুইই ম্যাকমোহনের প্রতিশ্রুতির একেবারে উলটো।

এই জটের শেষ কম্পোনেন্ট বালফ্যুর ডিক্লারেশন। কিন্তু তার আগে আরব বিদ্রোহের গল্পটাও লিখব। ভীষণই ইন্টারেস্টিং। বালফ্যুর ডিক্লারেশন আসবে তার পরের পর্বে। সঙ্গে থাকুন।

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: সাইকস পিকট চুক্তি

মধ্যপ্রাচ্য বুঝতে গেলে আপনাকে শুরু করতে হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় থেকে। হ্যাঁ, তার আগেও যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে—রাজতন্ত্রের আমলে যা হয়েই থাকে। কিন্তু আজকের এই অশান্তির শুরু ওই অঞ্চলে মাটির নীচে তেল আবিষ্কার হওয়ার পরে। এই ইতিহাসটুকু না জানলে আপনি ওই গোলগোল ঘুরেই যাবেন আর হোয়া ইউনির অধ্যাপকদের গুলবাজি শুনে ফালতু লাফাবেন।

শুরু বলা যায় সাইকস-পিকট এগ্রীমেন্ট থেকে।

১৯১৫ সালের শেষের দিক থেকে ১৯১৬ সালের শুরুর মধ্যে, স্যার মার্কস সাইকস (এক ব্রিটিশ এমপি, যিনি ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ওয়ার লর্ড কিচেনারের ঘনিষ্ঠ) আর জর্জ-পিকট (এক ফরাসী কূটনীতিক) নিজেদের মধ্যে চুপিচুপি মিটিং শিটিং করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে ফেলেছিলেন। একটা জিনিস মাথায় রাখবেন—বিশ্বযুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি, আর এর মাত্র কিছুদিন আগেই মধ্যপ্রাচ্যে তেলের খোঁজ পাওয়া যায়...

সাইকস আর পিকটের মধ্যে চুক্তি হয় যে উত্তরে Acre (বর্তমানে ইজরায়েল যেখানে) থেকে উত্তরপূর্বে পারস্যের বর্ডার অবধি একটা কাল্পনিক লাইনের এপাশ ওপাশ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নেবে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স। সিরিয়া আর লেবানন যাবে ফ্রান্সের ভাগে, আর ইংল্যান্ড পাবে মেসোপটেমিয়া, প্যালেস্টাইন আর সুয়েজ অঞ্চল। দুই পক্ষই বেশ জোর দিয়ে আমেরিকাকে (আমেরিকা তখনও জিওপলিটিক্সের হিসেবে বাচ্চা) বোঝায় যে তারা নিজেদের স্বার্থে যুদ্ধ করছে না, বরং মানুষের স্বাধীনতা আর মানবতাকে রক্ষা করাই তাদের উদ্দেশ্য।

সেই সময়ের কলোনিয়াল শক্তি, যেমন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ইত্যাদিরা তখনও যা অজুহাত দিত, আজকের নিও-কলোনিয়াল আমেরিকাও একই অজুহাত দেয়। শোনা যায়, এডওয়ার্ড হাউজ, যিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট উইলসনের বিদেশনীতির অ্যাডভাইসর, তিনি এই গোপন চুক্তির খবর পেয়ে বলেছিলেন যে ফরাসী ও ব্রিটিশরা এই মধ্যপ্রাচ্যকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের আঁতুরঘর বানিয়ে ফেলছে। এগজ্যাক্ট ইংরিজী লাইনটা এইরকম—"[They] are making [the Middle East] a breeding place for future war."

একদম খাপে খাপ তাই না? আজকের অস্থিরতার শুরু ঠিক এইখান থেকেই—প্রথমে পারস্যে মাটির নীচে বিপুল তেলের সন্ধান পাওয়া, মেসোপটেমিয়াতেও (আজকের ইরাক) একই সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া...

অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি সেই সময়েই পারস্যের সঙ্গে ষাট বছরের চুক্তি করে ফেলেছে। আর টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি, যাদের মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার ছিল অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি, মেসোপটেমিয়ায় তেলের খোঁজ করার লোভনীয় বরাত পায় সেইদিনই যেদিন ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্দ নিহত হন—১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ট্রিগার্ড হয় যে ঘটনা থেকে।

মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত দেশের তৎকালীন সরকারগুলোকে আর সাধারণ মানুষকে যাই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকুক না কেন, আসল সত্যিটা হল—কলোনিয়াল শক্তি সেই সময়েই নিজেদের মধ্যে গোপনে গোটা অঞ্চলের ভাগ বাঁটোয়ারা সেরে ফেলেছিল, ওই এলাকার ভবিষ্যত চেহারা কী হবে সেসব নিয়ে স্বপ্নটপ্নও দেখে ফেলেছিল। কলোনিয়াল শাসকের অফিসার, রাজনীতিক আর ব্যবসায়ীদের একটাই লক্ষ্য ছিল—তেলের খনি আর যে পাইপলাইন ধরে তেল পৌঁছবে বিভিন্ন বন্দরে, ট্যাঙ্কারে লোড হতে, সেই পাইপলাইন আর বন্দরের দখলদারি...

গল্পটা আজও বদলায়নি এক ফোঁটাও। শুধু নতুন একটা নাম জুড়েছে—ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা—তারা এই দৌড়ে পয়লা নম্বর হতে শুরু করে সুয়েজ ক্রাইসিসের পর, ষাটের দশকে দুষ্টু কমিউনিস্টদের ঠেকানোর দাবী তুলে...

গোটা পশ্চিমী বিশ্ব—পুরনো বনেদী সমস্ত কলোনিয়াল শক্তি, বা নব্য কলোনিয়াল শক্তি—তারা চায় মধ্যপ্রাচ্যকে বোমা ফেলে একদম সমতল বানিয়ে তাদের স্বাধীন এবং সভ্য করে তুলতে 😊

উইলিয়াম ডালরিম্পল আর অনিতা আনন্দের এম্পায়ার পডকাস্টটা দেখে ফেলতে পারেন। লিঙ্ক কমেন্টে। যদি সময় পাই, মাঝেমধ্যে এই টুকরো ইতিহাসগুলো পোস্ট করব—১৯০৮ সালে পারস্যে তেলের খোঁজ পাওয়া থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হওয়া অবধি সমস্য ঘটনাবলীর একটা ন্যারেটিভ। যেমন, সাইকস-পিকট চুক্তির অল্প কিছুদিন আগেই ইজিপ্টে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হেনরি ম্যাকমোহন আর মক্কার শরিফ হুসেইন বিন আলির মধ্যে চিঠি চালাচালি, যেখানে ম্যাকমোহন আরবদের স্বাধীন দেশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অটোমান শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পুরস্কার হিসেবে (লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া সিনেমাটা নিশ্চয় দেখেছেন), আর এর ঠিক পরের বড় ঘটনা হল বালফ্যুর ডিক্লারেশন—যাকে আজকের আরব ইজরায়েলি কনফ্লিক্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বলা যায়।

#MiddleEast #ArabIsraelConflict #History

Saturday, February 14, 2026

ভারতমাতার জন্মকাহিনী


শুরুতেই TL;DR ডিসক্লেমার দিয়ে রাখি। বোর হওয়া স্বাভাবিক, এবং বোর হলে কাটিয়ে দেবেন।

শিক্ষিত উঁচু জাতের বাঙালি ভদ্রলোকের হাতে ভারতমাতার জন্মের এই গল্পটা অনেকদিন ধরেই লেখার ইচ্ছে ছিল। অনেক টালবাহানার পর লিখেই ফেললাম, কারণ আজকের দিনে এই ন্যারেটিভটা জানা জরুরী। অবশ্যই মৌলিক কিছু নয়, মূলতঃ তনিকা সরকার, সুমিত সরকার, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আশিস নন্দী, মৃণালিনী সিনহা — এরকম বেশ কিছু স্কলারের লেখা পড়ার পর একটা সাধারণ ভাষায় সিন্থেসিস। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই, মানে এই বিষয়ে ফর্মাল কোনো ট্রেনিং নেই। নিজের ইচ্ছেতে কিছু বই পড়ি। পরিচিত লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করে বোঝার চেষ্টা করি। এই লেখাটা সেইরকমই — ঠিক বুঝলাম কিনা সেইটা যাচাই করার জন্যে। ভুল থাকাই বরং স্বাভাবিক। তাই, যাঁরা ইতিহাসের ছাত্র, তাঁরা শুধরে দিলে উপকৃতই হব।

গল্পটা ঊনবিংশ শতকের আলোকপ্রাপ্ত বাঙালি ভদ্রলোক সমাজকে নিয়ে — যাঁরা সাধারণভাবে শিক্ষিত আর অবশ্যই উঁচু জাতের। গল্পের ক্লাইম্যাক্স ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে, যে সময়ে নানান কারণে তাঁরা খানিকটা অস্বস্তিকর জমির ওপরে দাঁড়িয়ে। কলোনিয়াল ইতিহাসের গবেষকরা মনে করেন এই জমি থেকেই জন্ম নিয়েছিল হিন্দু পুনরুত্থান বা রিভাইভালিজমের ধারণা, যার চূড়ান্ত ফলাফল হয়ে দাঁড়ায় একটা ভৌগোলিক অঞ্চলকে দেবীর রূপে দেখতে শুরু করা। ঐতিহাসিকভাবে যে কথাটা মনে রাখা দরকার, সেটা হল এই মাতৃমূর্তির জন্ম পুরাণকথা থেকে হয়নি, কারণ ভারত অ্যাজ আ স্টেট/রাষ্ট্র কনসেপ্টটা ব্রিটিশ আমলের। আজকের নেশন-স্টেটের ধারণার মতনই এই দেবীপ্রতিমার ধারণাও আদপেই "টাইমলেস" নয়, বরং এর জন্ম হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের বাংলার কঠিন বাস্তবের মধ্যে। একের পর এক  সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ধাক্কায় ক্ষতবিক্ষত বাঙালি ভদ্রলোক বাঙালি তখন পরিচয়ের সংকটে ভুগছে। সেই অবস্থার মধ্যে জাতীয়তাবাদী ইন্টেলেকচুয়ালরা একটা আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র তৈরী করে নিয়েছিলেন — খানিকটা স্যাংচুয়ারি বলা যায় — ঘরবাড়ি সংসার, বাড়ির মেয়েরা, আর পরিবার — যে স্যাংচুয়ারিতে কলোনিয়াল শাসকের কর্তৃত্ব থাকবে না, সেই অধিকার থাকবে শুধু পরিবারের কর্তা বাঙালি ভদ্রলোকের হাতেই। এই আবহেই জন্ম হয় "দেশমাতৃকা'-র, বলা যায় বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেই, এবং অচিরেই এই মাতৃমূর্তি ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আইকন "ভারতমাতা" হয়ে ওঠে। 

একটা ক্রনোলজিকাল অর্ডারে এই ঘটনাগুলো পর পর সাজাতে পারলে আমরা সেই সময়ের ছবিটা খুঁজে পাব। 

এই সময়টাকে জানতে হলে আমাদের শুরু করতে হবে ১৭৯৩ সালের পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট অ্যাক্ট, অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আইন থেকে। অভিজাত হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক জমিদার শ্রেণী, বা ল্যান্ডহোল্ডিং ক্লাস — আমাদের গল্পের এক চরিত্র — এর জন্মও এই আইনের পরেই। এই আইন অনুযায়ী ভদ্রলোক জমিদারেরা কোম্পানি বাহাদুরকে দেওয়া পূর্বনির্ধারিত খাজনার বিনিময়ে পাকাপাকিভাবে তাদের এস্টেটের মালিক পরিচিতি পেয়ে যায়, পেয়ে যায় রায়তদের ওপর যেমন খুশী খাজনা চাপানোর স্বাধীনতা। বেসিক্যালি পরজীবী বা প্যারাসাইট বলতেই পারেন এই ক্লাসকে — কারণ এদের বেঁচে থাকা ছিল অন্যের পরিশ্রমের ফসলের ওপর নির্ভরশীল, আর একই সঙ্গে তাদের স্ট্যাটাসও পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল কলোনিয়াল শক্তির ওপর। উল্টোদিকে, এই ভদ্রলোক শ্রেণী আবার নিজেদের অধিকার আর আধিপত্যের ব্যাপারে ছিল মারাত্মক রক্ষণশীল। এই শ্রেণীরই একটা অংশের উচ্চাশা ছিল জমিদারির বাইরেও কলোনিয়াল শাসকের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে নানান ধরণের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, যেমন জাহাজ বা ব্যাঙ্কিং ইত্যাদিতে বাঙালি ভদ্রলোক ভালোই পরিচিতি পেয়েছিল — দ্বারকানাথ, রামদুলাল দে (মানে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাবা) ইত্যাদি নাম ইতিহাসে পড়ে থাকবেন। তবে ওপর ওপর আশাব্যঞ্জক হলেও খানিক অনিশ্চয়তাও ছিল সেই যুগের এই অন্ত্রপ্রনরশিপে।

অভিজাত ভদ্রলোক বাঙালির ব্যবসায়িক আশাভঙ্গ হয় ১৮৪০ নাগাদ, যখন একাধিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এসে একের পর এক ধাক্কা মারতে শুরু করে। একাধিক ইউরোপীয় ব্যাঙ্কিং সংস্থা, যেমন ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যায়। এই ব্যাঙ্কগুলোর আমানতে থাকা বাঙালি পুঁজি পুরোপুরি মুছে যায় বাজার থেকে। কোম্পানি সরকার এই সংকটের সময়ে জাতিবিদ্বেষের ধ্রুপদী সংজ্ঞা মেনে সাদা চামড়ার ইউরোপীয় পুঁজির স্বার্থ দেখায় মন দেয়। বাঙালি তথা ভারতীয় আমানতকারীদের কাছে একটা স্পষ্ট বার্তা পৌঁছয় — যে আধুনিক পুঁজিবাদী ভবিষ্যতের দরজা দেশীয় পুঁজিপতিদের জন্যে বন্ধ। ওসব সাহেবদের খেলার মাঠ, নেটিভ বাঙালির সেখানে জায়গা নেই। বাঙালি উচ্চবিত্ত ভদ্রলোক আচমকা ধাক্কা খেয়ে পিছু হটে আসে, আর তার নিরাপদ এলাকা, অর্থাৎ জমিজমা সম্পত্তির মধ্যে গুটিয়ে যায়। সম্ভাব্য অন্ত্রপ্রনর থেকে বাঙালি উচ্চবিত্ত ভদ্রলোক হয়ে যায় পুরোদস্তুর ভূস্বামী। তাদের পুঁজি সীমাবদ্ধ থেকে যায় খাজনা বা রেন্টের মধ্যেই। ইউরোপীয়দের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার স্বপ্ন দেখা বাঙালি ভদ্রলোক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে অন্তর্মুখী।

অর্থনৈতিক পরিসর ছোট হয়ে আসার পাশাপাশি ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে আরও দুটো বড় ধাক্কা খায় এই রক্ষণশীল হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক। এবং এই দুটোকেই সে দ্যাখে তার নিজের সনাতনী সাংস্কৃতিক এবং গার্হস্থ্য জীবনের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে। প্রথম ঘটনা ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা রদের আইন এবং দ্বিতীয় ঘটনা ১৮৫৬ সালের বিধবাবিবাহ আইন। রেনেসাঁর সময় থেকে মুক্তচিন্তায় শিক্ষিত এক শ্রেণীর বাঙালি এই দুই আইনকে প্রয়োজনীয় সামাজিক সংস্কার হিসেবে দেখলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সনাতনী হিন্দু বাঙালির কাছে এই দুটো আইন ছিল পবিত্র ধর্মীয় আচারের মূলে অযাচিত কলোনিয়াল/বিদেশী আক্রমণ। তার কারণটাও সহজবোধ্য। হিন্দু পুরুষের চিরকালীন কনসেপ্ট ছিল স্ত্রীসুলভ ভক্তি, বংশগৌরব আর বিয়ের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতা। সতীদাহ রদ আর বিধবাবিবাহ — দুটোই সেই চিরকালীন সনাতনী হিন্দু পৌরুষের ধারণার ওপর আক্রমণ। হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোকের অন্দরমহলে পুরুষই ছিল সর্বময় কর্তা, তার হাতেই যেখানে নিয়ন্ত্রিত হত লিঙ্গ, জাতি আর ধর্মের সমস্ত আচার, পুরুষই ছিল পারিবারিক পবিত্রতার রক্ষক। সেই অন্দরমহলের ভিতরে কলোনিয়াল আইনের ঢুকে পড়ার ধাক্কা সমস্ত সনাতনী ধ্যানধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল সেই সময়ে। রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর সেই যুগের ভদ্রলোক বাঙালির কাছে হয়ে ওঠেন খলনায়ক।

[এবং আজও এর অন্যথা হয় না। উত্তর ভারতীয় সনাতনী হিন্দুর ডেফিনেশনে আজও স্ত্রীকে মুখ বুজে স্বামীর হুকুম মানতে হয়। আজও রক্তের শুদ্ধতা সনাতনী হিন্দুর কাছে জরুরী। এবং আজও অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা মানে অলঙ্ঘনীয় জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক। বেশ কয়েক দশক আমরা কিছুটা স্বাধীনভাবে ভাবতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু উত্তর ভারতীয় সনাতনী হিন্দুত্বের ছোঁয়ায় নতুন করে সনাতনী হয়ে ওঠা সেদিনের সনাতনী হিন্দু বাঙালির বংশধর আধুনিক বাঙালির মধ্যে যদি আপনি রামমোহন বা বিদ্যাসাগর সম্পর্কে একই ঘৃণার আভাস পান, তাহলে বুঝব এই লেখার উদ্দেশ্য সফল।]

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর কোম্পানির হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশ সরকারের হাতে। ইংরিজী শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক তখন বিভিন্ন সরকারি অফিসে চাকরি করে। তার পরিচিতি "বাবু" হিসেবে। সে সাহেবের অনুগত কর্মচারী (যে আনুগত্য খানিকটা ১৮৫৭ সালের ব্যর্থ বিদ্রোহের ফসল), তাকে ছাড়া সাহেবের একটা দিনও চলে না। মোটামুটি এই শতকের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি দপ্তর আর সওদাগরি অফিসে চালু হয় ঘড়ির ব্যবহার — ইউরোপীয় স্টাইলে ক্লক টাইম। বাবুর চাকরি বাঁধা পড়ে ঘড়ির নিয়মানুবর্তিতায় — দশটা পাঁচটার অফিসের বাঁধনে — বাঙালি বাবুর কাছে যেটা ছিল পুরোপুরি অচেনা একটা ব্যবস্থা। দুই দশকের মধ্যেই সাহেবের অনুগত কর্মচারীর কাছে রোজকার এই সাবর্ডিনেশন আর ঘন্টা মিনিটের চাপ ক্রমশ: দাসত্বের মত মনে হতে থাকে। অফিসের বাইরে বাড়িই তার নিরাপদ স্যাংচুয়ারি হয়ে ওঠে, যেখানে সে তার একান্ত ব্যক্তিগত কোলাহলহীন জগতের অভ্যন্তরে নীরবে ধার্মিক চিন্তাভাবনার সময় পায় — মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে যা তার বাইরের জীবনের ফাঁপা দাসত্বের একদম উলটো পিঠ। দাসত্বের চাপ মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের কাছে বোঝা হয়ে উঠতে শুরু করে।

এই সময়েই আসে ভূমিকম্প (অবশ্যই প্রতীকী অর্থে)। যে জমি ছিল অভিজাত জমিদার শ্রেণীর মূলধন বা আশ্রয়, সেই জমিই ভয়ানকভাবে কেঁপে ওঠে তাদের পায়ের নীচে — ১৮৭৩ সালে পাবনার রায়তি দাঙ্গার সময়ে। প্রধাণতঃ মুসলমান এবং নীচু জাতের হিন্দু রায়তরা বাড়তে থাকা খাজনা আর জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে রুখে দাঁড়ায়। জমিদার আর প্রজাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কটা পিতা ও সন্তানের মত — বহু বছর ধরে সযত্নে লালিত এই কল্পকথা রাতারাতি মুখ থুবড়ে পড়ে এই রায়তি বিদ্রোহে। তবে এই বিদ্রোহের ধাক্কার চেয়েও ভদ্রলোক জমিদারদের কাছে বড় ধাক্কা ছিল কলোনিয়াল শাসকের প্রতিক্রিয়া — অনুগত জমিদারদের প্রতি নয়, বরং রায়তদের প্রতি সরকারি সহানুভূতি, খাজনার অবস্থা যাচাই করার উদ্দেশ্যে রেন্ট কমিশন তৈরী আর প্রজার অধিকার সংক্রান্ত আলোচনার শুরু। হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক নিজেদের দুই দিক থেকে আক্রান্ত মনে করতে শুরু করে — একদিকে তাদের এতদিনের প্রজাদের ঔদ্ধত্য বা ইনসাবর্ডিনেশন, অন্যদিকে সরকার তরফ থেকে তাদের আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে পাওয়া বিশ্বাসঘাতকতা। সেই সময়ের বাংলা কাগজে জমিদারি সম্পত্তির ক্ষতির পাশাপাশি ফলাও করে "নীচুজাতের অপমান”-এর কথাও ছাপা হতে থাকে। লেখা হয় "নারীর অবমাননা" বা "সতীত্ব লঙ্ঘন”-এর কথাও। জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে অপবিত্র ছোটজাত আর মুসলমানদের রুখে দাঁড়ানোর এই ঘটনা অভিজাত মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে বাঙালি ভদ্রলোক সমাজে হয়ে দাঁড়ায় কালচারাল এবং সেক্সুয়াল পলিউশন — হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তঃপুরের ক্ষেত্রে যেটা চরমতম অপমান। 

শেষ ধাক্কাটা আসে ১৮৮৩ সালে — ইলবার্ট বিলের সময়ে। ব্রিটিশ সরকার একটা আইন আনার চেষ্টা করে যাতে বলা হয় ভারতীয় (অর্থাৎ কালো চামড়ার নেটিভ) ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ইউরোপীয়দের বিচার হতে পারবে। খুবই সাধারণ একটা মানবিক আইন — বিচারব্যবস্থায় একটা সমতা আনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ব্রিটিশ রাজের চরম জাতিবিদ্বেষকে একদম উলঙ্গ করে দেয় সকলের চোখের সামনে। সরকার এই জাতিবিদ্বেষের সামনে আত্মসমর্পণ করে এবং প্রমাণ করে দেয় যে পশ্চিমী শিক্ষা বা আনুগত্য কোন কিছুর বিনিময়েই কালো চামড়ার ভদ্রলোক "বাবু" ব্রিটিশদের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারবে না; সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে এই শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী চিরকালই সাদা চামড়ার সাহেবের পায়ের নীচেই থাকবে, অফিস কাছারিতে দশটা পাঁচটার দাসত্ব করবে — ব্লাডি নেটিভ হিসেবে।

১৭৯৩ থেকে ১৮৯০ — এই একশো বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, কৃষি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একের পর এক ধাক্কা খাওয়ার পর একমাত্র একটাই জায়গা হিন্দু ভদ্রলোক বাঙালির কর্তৃত্বের আওতায় থেকে গিয়েছিল — আর সেটা হল অন্দরমহলের নারীশরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ। শিশু বয়সে বিয়ে, এবং দশ বছর বয়সে রজঃস্বলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গর্ভাধানের জন্যে জোর করে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার আচারের ফলে একাধিক ১০-১২-১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে জবরদস্তি শারীরিক সঙ্গমের ফলে মারা যায়। আদালতে বেশ কিছু মামলা ওঠার পরে ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ে, এবং ১৮৯১ সালে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে তারা এজ অফ কনসেন্ট বিলের প্রস্তাব আনে বিয়ের বয়স দশ থেকে বাড়িয়ে বারো করার জন্যে। প্রস্তাব আসার সঙ্গে সঙ্গেই সর্বগ্রাসী প্রতিরোধ শুরু হয় সমাজের চতুর্দিক থেকে। হিন্দু বাঙালি মনে করে মেয়েদের বিয়ের বয়স দুই বছর বাড়ানোর এই প্রস্তাব মোটেও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কারণে নয়, বরং হিন্দু আচারব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত যার ফলে মেয়েদের গর্ভ কলুষিত হবে, বংশধারা দূষিত হবে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে পতন হবে বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের শেষ দুর্গ, অর্থাৎ নারীশরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার। নারীশরীরকে নিয়ন্ত্রণের এই অধিকার রক্ষাই হয়ে ওঠে চারপাশ থেকে আক্রান্ত হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার সমান। একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল — এই এজ অফ কনসেন্ট বিলের সময়ে, না ব্রিটিশ সরকার, না বিলের সমর্থক বা বিরোধী বাঙালি জনগণ — কেউই এই বিল আসলে যাদের জন্যে আনা, সেই মেয়েদের সম্মতি নেওয়ার কথা ভাবেনি।

[হিন্দু খতরে মে হ্যায় – এনিওয়ান?]

রেনেসাঁর আলোকপ্রাপ্ত বাঙালির প্রগতিশীল রিফর্মার থেকে হিন্দু রিভাইভালিস্ট হয়ে ওঠার গতিপথের ধারণা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় যদি আমরা বঙ্কিমের লেখা খুঁটিয়ে দেখি। বঙ্কিমের পরিবর্তনও ঊনবিংশ শতকের এই ক্রাইসিসগুলোর মধ্যে দিয়েই এসেছিল। লেখকজীবনের একদম শুরুর দিকে বঙ্কিম ছিলেন ক্ষুরধার সমালোচক — বিশেষ করে নানান পিতৃতান্ত্রিক এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী ট্র্যাডিশনের। যেমন ধরুন "সাম্য" (যদিও পরের দিকে বঙ্কিম নিজে এই রচনাকে প্র্যাক্টিকালি অস্বীকার করেন) রচনায় বঙ্কিম এই ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং পিতৃতান্ত্রিক আচারব্যবস্থাকে কলোনিয়াল শাসনের চেয়েও খারাপ বলে অভিহিত করেছিলেন। কপালকুণ্ডলায় নায়িকার মুখে শোনা যায় — “যদি জানিতাম যে, স্ত্রীলোকের বিবাহ দাসীত্ব, তবে কদাপি বিবাহ করিতাম না"। বা "বিষবৃক্ষ" উপন্যাসে পুরুষের বহুগামিতা এবং কামনা, ব্রাহ্মণ্যবাদের নানান আচারের মধ্যে মেয়েদের দমবন্ধ করা অবস্থার সরাসরি সমালোচনা পাওয়া যায়। এই পিরিয়ডে বঙ্কিম পশ্চিমী ধ্যানধারণার আদলেই সামাজিক গোঁড়ামোকে আঘাত করেছিলেন। ব্যঙ্গ করেছিলেন ইংরিজী চালচলনের নকলকারী বাবুদেরও। আবার, বঙ্কিমের ধারণা যে খানিক ফ্র্যাকচার্ড ছিল, তারও প্রমাণ পাওয়া যায় ১৮৭৫ সালে লেখা কমলাকান্তে যেখানে তিনি স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়া নারীর মধ্যে স্ত্রীলোকের আসল রূপ কল্পনা করেন — 

"যখন আমি উৎকৃষ্টা, যোষিদ্বর্গের বিষয়ে চিন্তা করিতে যাই, তখনই আমার মানস—পটে, সহমরণপ্রবৃত্তা সতীর মূর্ত্তি জাগিয়া উঠে। আমি দেখিতে পাই যে, চিতা জ্বলিতেছে, পতির পদ সাদরে বক্ষে ধারণ করিয়া প্রজ্বলিত হুতাশন মধ্যে সাধ্বী বসিয়া আছেন। আস্তে আস্তে বহ্নি বিস্ত‌ৃত হইতেছে, এক অঙ্গ দগ্ধ করিয়া অপর অঙ্গে প্রবেশ করিতেছে। অগ্নিদগ্ধা স্বামিচরণ ধ্যান করিতেছেন, মধ্যে মধ্যে হরিবোল বলিতে বলিতেছেন বা সঙ্কেত করিতেছেন। দৈহিক ক্লেশ-পরিচায়ক লক্ষণ নাই। আনন প্রফুল্ল। ক্রমে পাবকশিখা বাড়িল, জীবন ছাড়িল, কায়া ভস্মীভূত হইল। ধন্য সহিষ্ণুতা! ধন্য প্রীতি! ধন্য ভক্তি!" [স্ত্রীলোকের রূপ, কমলাকান্ত]

কিন্তু ওই পাবনা রায়ট, ইলবার্ট বিল এবং এজ অফ কনসেন্ট বিল নিয়ে কূটকচালির সময় থেকেই বঙ্কিমের বদলের ট্র্যাজেক্টরিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে রেভারেন্ড হেস্টির সঙ্গে ১৮৮২ সালের একটা বিতর্কের পর থেকেই। রেভারেন্ড হেস্টি (স্কটিশ থিওলজিয়ান এবং স্কটিশ চার্চ কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল) সনাতনী হিন্দু ধ্যানধারণাকে আক্রমণ করেছিলেন ব্যাকওয়ার্ড বলে (কলকাতার অ্যালবার্ট হলে ক্রিশ্চানিটি অ্যান্ড কমন সেন্স অফ ম্যানকাইন্ড বলে একটা পাবলিক লেকচার সিরিজে) — মূলতঃ মূর্তিপূজা, এথিকস (যেখানে কৃষ্ণের লীলাপ্রসঙ্গ উঠে আসে) এবং র‍্যাশনালিটি নিয়ে। বঙ্কিম সম্পর্কে অভিযোগ করেন যে তিনি পাশ্চাত্য চিন্তাভাবনা থেকে সিলেক্টিভলি কিছু কিছু জিনিস বেছে নিয়েছেন, এবং হিপোক্রিটের মত হিন্দুধর্মকে ডিফেন্ড করেছেন। ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে বাংলার শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজের সার্বিক অসহায়তার অনুভূতি থেকেই বঙ্কিমের মধ্যেও বদল আসতে শুরু করে। হেস্টির আক্রমণের জবাবে বঙ্কিম বঙ্গদর্শনে একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, এবং এই বিতর্কের পর থেকেই হিন্দু রিভাইভালিজমের ছাপ দেখতে পাওয়া যায় বঙ্কিমের পরবর্তী রচনাগুলোতে — যেমন কৃষ্ণচরিত্র, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি। 

বঙ্কিম তাঁর আগের প্রগতিশীল রচনাগুলোকে অস্বীকার করতে শুরু করেন (সাম্য ফর এগজাম্পল), পাশাপাশি গড়তে শুরু করেন জাতীয়তাবাদের একটা নতুন ছবি, যেখানে দেশপ্রেম একই সঙ্গে মিলিট্যান্ট এবং ভক্তিমূলক।

জন্ম হয় দেশমাতৃকার আইডিয়ার — ১৮৮২ সালে আনন্দমঠের মধ্যে দিয়ে। কলমের আঁচড়ে বঙ্কিম সংঘাতের কেন্দ্রে থাকা এই পবিত্র, বিপন্ন, আদর্শ হিন্দু নারীসত্ত্বাকে রূপান্তরিত করলেন এক দেবী চরিত্রে। আঁকলেন পূর্বের গৌরবের ছবি (মা যাহা ছিলেন — সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা), ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের আবহে আঁকলেন কালরূপিণী এক নারীকে (মা যাহা হইয়াছেন — অত্যাচারী শাসকের হাতে দেশ যখন শোষিত, দরিদ্র, এবং মৃতপ্রায়), এবং কোন এক ভবিষ্যতে বিদেশী শাসনের অবসানের পর বাংলাপ্রদেশের আইকন — দেবী দুর্গা (মা যাহা হইবেন — দশপ্রহরণধারিণী)। এই মাতৃরূপিণীর দেহ হয়ে উঠল গোটা জাতির মানচিত্র — পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয়, যে কোন কলোনিয়াল আইন বা জমির খাজনার আন্দোলন থেকে বহু দূরের এক সত্ত্বা। 

এই মাতৃমূর্তি বা ডিভাইন মাদার, বাঙালি ভদ্রলোকের এতদিনের অপমানের জবাব দেওয়ার এক রাস্তা খুলে দিল। এইখানে একটা জিনিস ক্ল্যারিফাই করে দেওয়া দরকার — এই বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীকে একটা মনোলিথিক ব্লক হিসেবে দেখলে ভুল করা হবে। এই ভদ্রলোক শ্রেণীর মধ্যে স্তরবিন্যাস ছিল। একদম ওপরে ছিল অভিজাত ল্যান্ডেড ক্লাস, যাদের মূল উৎকন্ঠা ছিল পাবনা রায়তি বিদ্রোহ আর রেন্ট অ্যাক্টকে ঘিরে — মুসলমান এবং নীচু জাতের বিদ্রোহ ছিল তাদের অথরিটির প্রতি চ্যালেঞ্জ, এবং কলোনিয়াল সরকারের প্রতি ক্ষোভ তৈরী হয় এইখান থেকেই। এই অভিজাত শ্রেণীর নীচের স্তরে ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত — প্রধাণত: চাকরিজীবী — যারা সেই মুহূর্তে ক্রমাগত বর্ণবিদ্বেষ, পৌরুষত্ব নিয়ে উপহাস আর ঘন্টা-মিনিটের জাঁতাকলে আটকে পড়েছিল। দেশমাতৃকার মূর্তি ওপর থেকে নীচ অবধি পুরো ভদ্রলোক শ্রেণীর কাছেই অ্যাপীল করে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আদালতে, বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরুষত্বহীন ভদ্রলোক নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল এই দেশমাতৃকার একনিষ্ঠ সন্তান এবং রক্ষক হিসেবে। তার রাজনৈতিক অক্ষমতা বদলে গেল পবিত্র সামরিক কর্তব্যে। তার আহত পৌরুষের নিরাময় হল বীরের আত্মত্যাগের প্রতিশ্রুতিতে। নানান জটিল সামাজিক সংস্কার আর বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের কাছে পিটিশন দিয়ে আপোস করার বদলে জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠল আবেগ আর ভক্তির মিশেলের পবিত্র ধর্মযুদ্ধ।

এই ছিল দেশমাতৃকার জন্মের ঐতিহাসিক পটভূমি — অনেকদিন ধরে চলে আসা ক্রাইসিসের মধ্যে থেকে তৈরী হওয়া বিপন্ন মাতৃমূর্তি, যাকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করা মায়ের যে কোন সন্তানের কর্তব্য। 

এই অবধি কোন গোল নেই, সাধারণভাবে গোটা ব্যাকগ্রাউন্ডটা খানিক জটিল হলেও। শুধু প্রশ্ন থেকে যায় বঙ্কিমের এই দেশমাতৃকা কবে এবং কীভাবে ভারতমাতা হয়ে উঠলেন?

বঙ্কিমের মূল উপন্যাসের দিকে যদি তাকাই, দেখব আনন্দমঠে সন্তানদের মূলশত্রু মুসলমান নবাব এবং অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকের দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষয়িষ্ণু মুঘল প্রশাসন। আনন্দমঠের শেষাংশে ব্রিটিশ শত্রু তো নয়ই, বরং শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়ের শাসনের প্রবর্তক — সত্যানন্দ ও চিকিৎসক/মহাপুরুষের মধ্যে বাক্যালাপ মনে করুন...তাহলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে এই ব্রিটিশপন্থী, মুসলিমবিরোধী আখ্যান কীভাবে উপনিবেশ—বিরোধী জাতীয়তাবাদের বাইবেল হয়ে উঠল?

আনন্দমঠ, দেশমাতৃকা আর বন্দেমাতরমের এই ট্রান্সফর্মেশন ঘটেছিল জাতীয়তাবাদের স্ট্র্যাটেজিক কারণে। বঙ্কিম নিজে ১৮৮০-র দশকে বসে ১৭৭০ সালের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে আনন্দমঠ লিখেছিলেন। তাঁর প্রজন্মের কাছে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে একটা কমপ্লিকেটেড ও খানিক মোহভঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও আশাবাদ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সেই প্রজন্ম ব্রিটিশ শাসনকে হিন্দু অনৈক্য এবং দুর্বলতার সাজা হিসেবে দেখেছিল, আর ব্রিটিশ শাসককে দেখেছিল আধুনিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের শিক্ষা দেওয়া স্কুলমাস্টার হিসেবে —  যাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভারতীয় হিন্দুরা একদিন স্বশাসনের যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। 

“সনাতনধর্মের পুনরুদ্ধার করিতে গেলে, আগে বহির্বিষয়ক জ্ঞানের প্রচার করা আবশ্যক। এখন এদেশে বহির্বিষয়ক জ্ঞান নাই — শিখায় এমন লোক নাই; আমরা লোকশিক্ষায় পটু নহি। অতএব ভিন্ন দেশ হইতে বহির্বিষয়ক জ্ঞান আনিতে হইবে। ইংরেজ বহির্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত, লোকশিক্ষায় বড় সুপটু। সুতরাং ইংরেজকে রাজা করিব। ইংরেজী শিক্ষায় এদেশীয় লোক বহিস্তত্ত্বে সুশিক্ষিত হইয়া অন্তস্তত্ত্ব বুঝিতে সক্ষম হইবে। তখন সনাতনধর্ম প্রচারের আর বিঘ্ন থাকিবে না। তখন প্রকৃত ধর্ম আপনা আপনি পুনরুদ্দীপ্ত হইবে। যত দিন না তা হয়, যত দিন না হিন্দু আবার জ্ঞানবান গুণবান আর বলবান হয়, তত দিন ইংরেজরাজ্য অক্ষয় থাকিবে। ইংরেজরাজ্যে প্রজা সুখী হইবে — নিষ্কণ্টকে ধর্মাচরণ করিবে। অতএব হে বুদ্ধিমান — ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে নিরস্ত হইয়া আমার অনুসরণ কর।" [আনন্দমঠ]

বঙ্কিমের এক প্রজন্ম পরে, ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময়, রাজনৈতিক আবহাওয়া ক্রমশঃ আরও উগ্র হয়ে ওঠে। দুর্ভিক্ষ, জাতিবিদ্বেষ, আর বঙ্গভঙ্গের পরে সাধারণ মানুষের ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে হতাশ হতে শুরু করে। অরবিন্দ ঘোষের মত বিপ্লবীরা মনে করতে শুরু করেন যে তাঁদের গণআন্দোলনের জন্যে প্রয়োজন একটা শক্তিশালী প্রতীকের। এবং শুধুমাত্র স্ট্র্যাটেজিক কারণেই তাঁরা আনন্দমঠের একটা সিলেক্টিভ ন্যারেটিভ বেছে নেন, যেখানে উপন্যাসের শেষে ব্রিটিশপন্থী অংশটুকু বাদ দেওয়া হয়। গল্প শেষ হয় যুদ্ধের ধ্বনি দিয়ে, ব্রিটিশ শাসনকে বৈধতা দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নয়। একটা কথা মাথায় রাখবেন — আনন্দমঠ লেখা হয়েছিল তৎকালীন বাংলা প্রদেশের (মানে সুবাহ্‌ বাংলা — বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা মিলিয়ে যে প্রদেশ) পটভূমিতে। "সপ্তকোটিকন্ঠ কলকলনিনাদকরালে, দ্বিসপ্তকোটি ভূজৈঃধৃত খরকরবালে" — এখানে সপ্তকোটি অর্থাৎ সাত কোটি সেই সময়ের সেন্সাস অনুযায়ী বাংলা প্রদেশের জনসংখ্যা। এবং ইন্টারেস্টিংলি, সেই জনতার মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমান, সকলেই ছিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রয়োজনে বাংলায় অরবিন্দ, মহারাষ্ট্রে তিলক, আর তামিল প্রদেশে সুব্রমনিয়া ভারতীর হাত ধরে বঙ্কিমের দেশমাতৃকা হয়ে উঠলেন ভারতমাতা, ভারতীয় উপমহাদেশের ম্যাপ হয়ে উঠল ভারতমাতার দেহ, বাংলার সাত কোটি সন্তানের বদলে যার অ্যাপীল ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত দেশবাসীর কাছে, শত্রু আর কোন বিশেষ ধর্মালম্বী রইল না, বরং হয়ে উঠল যে কোন বিদেশী শাসক। মূল উপন্যাস থেকে বন্দেমাতরমকে বের করে আনা হল জাতীয়তাবাদী স্লোগান হিসেবে।

কিন্তু কিছু সমস্যা থেকেই গেল। বন্দেমাতরমের দেবী হিন্দু দেবী, তার ভাষা সংস্কৃত ও বাংলার মিশেল। কিন্তু বাস্তবে অনেক মুসলমান ধর্মাবলম্বীর কাছে এই প্রকট হিন্দু ইমেজকে সরাসরি গ্রহণ করা একটু সমস্যার হয়ে পড়েছিল ধর্মীয় কারণে, এবং সেটা অযৌক্তিকও নয়। মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখলে এটা আপনারও মনে হবে — যদি আপনাকে এলিয়েন কোন ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে কোন জাতীয় অনুষ্ঠানে যেতে হয়। নাস্তিকদের তো যে কোন ধর্মীয় চিহ্নেই অস্বস্তি হবে। তিরিশের দশকে এই বিষয়টা বড়সড় চর্চায় আসে। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে বন্দেমাতরমের প্রথম দুটো স্তবককে আলাদা করে আনার পরেও কিছু ক্ষেত্রে অস্বস্তি থেকেই গিয়েছিল। যেমন, মুসলিম লীগ এই গানের দিকে আঙুল তুলে বলত কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে হিপোক্রেসি, ভুয়ো। উল্টোদিকে হিন্দু দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদের কাছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ হয়ে দাঁড়ায় ভারতমাতার পবিত্র শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করে দেওয়ার সামিল। হিন্দু মহাসভার পোস্টারে বা প্যামফ্লেটে রক্তাক্ত ছিন্ন অঙ্গের ভারতমাতার ছবি ছাপা হত সেই সময়ে...

আমাদের দুর্ভাগ্য, যে এইখান থেকেই শুরু হয়েছিল ভারতমাতার আইডিয়ার ওয়েপনাইজেশন। ঔপনিবেশিক অপমানের জবাব দেওয়ার প্রতীক হিন্দু জাতীয়তাবাদের হাতে হয়ে দাঁড়িয়েছিল সংখ্যাগুরুর অস্ত্র। আজও তার ব্যতিক্রম হয় না, উলটে এই ধারণা আরো পোক্ত হয়েছে বিভিন্ন কারণে। সঙ্ঘ পরিবারের ভারতমাতার প্রতি শ্রদ্ধা বা বন্দেমাতরমের প্রতি আজকের পীরিত আসলে তাদের নিজেদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ভারতকে দেখার উদাহরণ — যেখানে ভারত দেশটাকে ভালোবাসা মানে ভারতমাতার মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো; দেশের মানুষ, নদী, বনজঙ্গল, পাহাড়, পশু পাখি সেখানে গৌণ; এখানে দ্বিধা মানে অবাধ্যতা, দেশদ্রোহ। নিজস্ব পলিটিকাল এজেন্ডার রূপায়ণের উদ্দেশ্যেই সঙ্ঘ পরিবার রামজন্মভূমি আন্দোলনকে রামের পবিত্র ভূখণ্ডকে মুক্ত করার ধর্মযুদ্ধ হিসেবে দেখিয়েছিল। বন্দেমাতরম এদের কাছে দেশপ্রেমের নামে প্রশ্নহীন ভক্তিমূলক আনুগত্যের প্রতীক...

=========================================

ভারতমাতার জন্মের গল্প এইটুকুই। প্রাচীন পুরাণকথা থেকে তাঁর জন্ম হয়নি। বরং, বাস্তবে শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের আগুনে তাঁকে তৈরী করা হয়েছিল। তাঁর সশস্ত্র মূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে ব্যাঙ্ক ফেলিওর, রেন্ট স্ট্রাইক, জাতিবিদ্বেষ, নারীর অধিকার-বাল্যবিবাহ-বৈধব্য ইত্যাদি নিয়ে আদালত এবং সেই সময়ের সমাজমাধ্যমে তির্যক বিতর্কের ইতিহাসের ওপর। তিনি ঊনবিংশ শতকের কঠিন বাস্তবের মাটিতে হেরে যাওয়া হিন্দু ভদ্রলোকের শেষ আশ্রয় — এক কল্পিত অলঙ্ঘনীয় দেবীমন্দিরের প্রতিমা, উঠতি অ্যান্টিকলোনিয়াল "ইম্যাজিনড কমিউনিটির" ভিত্তি, যাঁকে ঘিরে এক বিচিত্র ভূখণ্ডের নানান ধরণের বৈচিত্রসম্পন্ন অসংখ্য মানুষ এক হয়ে দাঁড়িয়েছিল কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে। আবার একই সঙ্গে তাঁর হিন্দু রূপের জন্যেই অহিন্দুদের সামনে অলঙ্ঘনীয় সীমানা তৈরী হয়েছিল একটা সময়ে। যাদের বিশ্বাস বা ওয়ার্ল্ডভিউ কোন দেবদেবীর প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি, তাদের শুরু থেকেই "অপর" করে রাখা হয়েছে।

ভারতমাতার লিগ্যাসি কাজেই অস্পষ্ট। যে প্রতীক কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে ছিল শক্তিশালী অস্ত্র — একটা, সাহস আর আইডেন্টিটির উৎস — সেই একই প্রতীকের ডিএনএর মধ্যেই লুকিয়ে থেকেছে সংখ্যাগুরুর গা-জোয়ারি। স্বাধীনতার পর থেকেই এই লুকিয়ে থাকা শক্তিকে খুঁচিয়ে জাগিয়ে তুলেছে সঙ্ঘপরিবার। "মা যা হইবেন" — দশপ্রহরণধারিণীর পরিবর্তে "মা যা হইয়াছেন" — দেশপ্রেমের এক লিটমাস টেস্ট — যার মাধ্যমে বহিরাগত "অপর"-কে চিহ্নিত করা যায়। ভারতমাতার গল্প তাই যতটা না পবিত্র দেশপ্রেমের কাহিনী, তার চেয়ে অনেক বেশি জাতীয়তাবাদের ধারালো দ্বিমুখী তরোয়াল সম্পর্কে শিক্ষা — যে প্রতীক স্বাধীনতার লড়াইয়ে লক্ষ মানুষের স্লোগান হতে পারে, লক্ষ মানুষকে এক করতে পারে, সেই একই প্রতীক নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে এক দেশ — এক ধর্ম — এক ভাষা — এক পোশাক — এক খাদ্যাভ্যাসের নামে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ইউনিফর্মিটির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, উলটে সামাজিক বিভেদকে তীব্র করার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। 

আধুনিক নেশন-স্টেট নিজেদের লেজিটিমাইজ করার জন্যে যে ধরণের কাহিনী ব্যবহার করে, ভারতমাতা সেই সমস্ত কাহিনীর মধ্যে একইসাথে লুকিয়ে থাকা ঐক্য এবং বিভাজনের ক্ষমতার টেস্টামেন্ট। 

রেফারেন্স (ইন নো পার্টিকুলার অর্ডার):

(১) Hindu Wife, Hindu Nation: Community, Religion, and Cultural Nationalism, Tanika Sarkar, Permanent Black
(২) Rebels, Wives, Saints: Designing Selves and Nations in Colonial Times, Tanika Sarkar, Permanent Black
(৩) The Truths and Lies of Nationalism as Narrated by Charvak, Partha Chatterjee, State University of New York
(৪) The Unhappy Consciousness: Bankimchandra Chattopadhyay and the Formation of Nationalist Discourse in India, Sudipta Kaviraj, OUP India
(৫) The Swadeshi Movement in Bengal, Sumit Sarkar, People’s Publishing House
(৬) ‘Kaliyuga’, ‘Chakri’ and ‘Bhakti’: Ramakrishna and His Times, Sumit Sarkar, Economic and Political Weekly, Vol 27, No 29, Jul 18 1992
(৭) Colonial masculinity: The 'manly Englishman' and the 'effeminate Bengali' in the late nineteenth century, Mrinalini Sinha, Manchester University Press
(৮) Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, Benedict Anderson, Verso

Special thanks to Rajdip Biswas Rudra — একবার ভেরিফাই করে একটা ফাঁক ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। Anjan-দাকেও থ্যাঙ্কস, একবার মুখ খুলতেই পুরনো EPW-এর পেপার খুঁজে দেওয়ার জন্য।

#বন্দেমাতরম #বঙ্কিমচন্দ্র #জাতীয়তাবাদ

Sunday, November 12, 2023

বেঙ্গল ফাইলস: পশ্চিমবঙ্গের জন্মবৃত্তান্ত ও শ্যামাপ্রসাদ

এই বছর, আরেকরকম পত্রিকার পুজো সংখ্যায় অধমের কিছু হাঁউমাউখাঁউ ছেপে বেরিয়েছিল। সংখ্যাটা যেহেতু শুধুই প্রিন্ট ভার্সন, তাই মাসখানেক পর এখানে পোস্ট করলাম...

বেঙ্গল ফাইলস 
পশ্চিমবঙ্গের জন্মবৃত্তান্ত ও শ্যামাপ্রসাদ

(১)

"শ্যামাপ্রসাদ পশ্চিমবঙ্গের জনক" বা "শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে রয়ে গেছে" এই মিথদুটোর বয়স বেশ কয়েকবছর হল। ফি বছর হিন্দুত্ববাদীরা এই নিয়ে প্রচার করে, তার পালটা লেখাও তৈরী হয়, আবার তার পরের বছর একই ঘটনা ঘটে। তবে দুটো মিথকেই সম্পূর্ণ গুঁড়িয়ে দেওয়া যায় কিছু তথ্য আর ম্যাপ দিয়ে। এই লেখার উদ্দেশ্য সেইটাই। যদিও তার আগে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতটা একটু দেখে নেওয়া প্রয়োজন - তার জন্যে খানিক গৌরচন্দ্রিকা…

তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই ম্যাকডোনাল্ড অ্যাওয়ার্ড (কমিউনাল অ্যাওয়ার্ড নামেও ইতিহাসে পরিচিত) আর বেঙ্গল টেনেন্সী অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট - মূলত: এই দুটো ঘটনা, আর গ্রামের দিকে বাড়তে থাকা কৃষক আন্দোলন - এই সবকিছুর জেরে ভদ্রলোক হিন্দুরা কংগ্রেসের দিক থেকে মুখ ফেরাতে শুরু করে। বিশেষ করে যে জমিদার আর হিন্দু ব্যবসায়ীদের চাঁদার ওপর কংগ্রেস ভালোমত নির্ভরশীল ছিল, তারা বিমুখ হওয়ায় কংগ্রেস বেশ চাপে পড়ে যায়। ১৯৩৬-৩৭-এর প্রাদেশিক ভোটে আশিটা সাধারণ আসনের মাত্র আটচল্লিশটা আর বিশেষ সংরক্ষিত হিন্দু আসনের মাত্র চারটে জেতে কংগ্রেস। নির্দল হিন্দু প্রার্থীরা জেতে সাঁইত্রিশটা আসনে, হিন্দু মহাসভা দুটো আসনে।

হিন্দু এবং হিন্দুধর্মকে রক্ষার দাবী নিয়ে ততদিনে হিন্দু ভদ্রলোক আইডেন্টিটি তৈরী হয়ে গেছে - মূলত: শিক্ষিত সমাজকে ঘিরে, যাদের বেশিরভাগের গ্রামের দিকে জমিজমা, বাড়ি আর শহরে চাকরি ছিল - অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা ক্ষমতাশালী উচ্চবিত্ত, বা মধ্যবিত্তের ক্রীমি অংশ। চল্লিশের দশকের শুরুর দিকে প্রান্তিক গোষ্ঠীর লোকজনকেও এই বৃহত্তর হিন্দু সমাজের অংশ হিসেবে টেনে আনার চেষ্টা শুরু হয়। জনপ্রিয় ধর্মীয় উৎসবগুলো হয়ে ওঠে রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র, ফলে গ্রাম বা ছোট মফস্বল শহরের সাধারণ হিন্দুদের মধ্যেও এই প্রবল হিন্দু আইডেন্টিটি ছড়াতে শুরু করে।

১৯৩৬-৩৭ এর ভোটের ফলাফলের পর কংগ্রেসও আর এর বাইরে থাকার কথা ভাবেনি। কমতে থাকা ফান্ড আর সরতে থাকা "ভদ্রলোক সাপোর্টের" ধাক্কায় কংগ্রেসও উঠেপড়ে লেগেছিল হিন্দু প্রোফাইল তৈরী করতে। প্রথম পদক্ষেপ ছিল সুভাষ-শরতের আমলে কংগ্রেস ছেড়ে চলে যাওয়া হিন্দু জমিদারদের খুব কাছের লোক নলিনীরঞ্জন সরকারকে আবার বড় দায়িত্ব দিয়ে ফিরিয়ে আনা। তারপর ক্রমশ: কৃষক আন্দোলন থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়ে উলটে জমিদারদের পক্ষ নেওয়া, সুভাষ-শরতকে একঘরে করে দেওয়া এবং শেষপর্যন্ত সরিয়েই দেওয়া – সবটাই ঘটেছিল বাংলা কংগ্রেসকে ফের ভদ্রলোকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার উদ্দেশ্যে। জয়া চ্যাটার্জী তাঁর বেঙ্গল ডিভাইডেড বইয়ে রীতিমত তথ্য দিয়ে দেখিয়েছেন যে, এই সময়ে, মানে সুভাষ আর শরৎ বসুকে বের করে দেওয়ার পর, হিন্দু মহাসভা আর বাংলা কংগ্রেসের মধ্যে বিশেষ কোনো তফাৎ সাধারণ চোখে ধরাই পড়তো না।

১৯৪৫-৪৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে হাতেনাতে ফল পায় কংগ্রেস এই আইডেন্টিটি পরিবর্তনের - বাংলার হিন্দুরা একজোটে কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দেয় - একাত্তরটা সাধারণ আসন আর পনেরোটা বিশেষ হিন্দু আসন জেতে কংগ্রেস, তার মধ্যে বেশ কয়েকটা হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের হাত থেকে ছিনিয়ে আনা। হিন্দু মহাসভা ছাব্বিশটা আসনে কংগ্রেসের বিপক্ষে লড়ে পায় মোটে ২.৭৩% ভোট। একটা মাত্র আসনে - বিশেষ ইউনিভার্সিটি আসন – সেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দিতায় জেতেন শ্যামাপ্রসাদ। খুব স্পষ্টভাবে, ভদ্রলোক হিন্দুদের রায় ছিল কংগ্রেসের পক্ষেই। অন্যদিকে, সংরক্ষিত তফশিলী আসনের ৮০% জেতে কংগ্রেস, ৩৬-৩৭ সালে যেটা ২৫%-এরও কম ছিল। সব মিলিয়ে মোটামুটি ৯০% হিন্দু ভোটার মনে করেছিল যে কংগ্রেসই তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। সবচেয়ে বড় কথা - ধনী ব্যবসায়ী, জমিদার - যাদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা তিরিশের দ্বিতীয়ভাগ থেকে ক্রমশ: শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তাদেরও বিপুল সমর্থন পেয়েছিল কংগ্রেস - এই নতুন পাওয়া হিন্দু আইডেন্টিটির জোরে [১]।

আলাদা হিন্দু অধ্যুষিত রাজ্যের দাবীও ওঠে এই সময় থেকেই। ১৯৪৬-এর ভোটে সুরাহওয়র্দীর মন্ত্রীসভার ক্ষমতায় আসা, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের সময়ে যে সুরাহওয়র্দীকে নিয়ে প্রবল ক্ষোভ ছিল হিন্দুদের মধ্যে, ছেচল্লিশের কুখ্যাত দাঙ্গা, এবং সেই সময়ে কলকাতার রাস্তায় ঘটে চলা রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ সামলাতে না পারা - সব মিলিয়ে বাংলার হিন্দুদের বদ্ধমূল ধারণা তৈরী হয়ে যায় যে "মুসলমানদের সরকার" থাকলে বাংলার পাকিস্তান হওয়া কেউ আটকাতে পারবে না, হিন্দুদের থেকে যেতে হবে মুসলমানদের অধীনে। স্বয়ং শ্যামাপ্রসাদের হাতে লেখা ছেচল্লিশ সালের একটা নোট [২] পাওয়া যায় এই মর্মে, যার মূল বক্তব্য ছিল – “বাংলা যদি পাকিস্তান হয়ে যায়, বাঙালী হিন্দুদের যদি পাকাপাকি মুসলমান শাসনে থাকতে হয়, তাহলে সেটা হবে বাঙালি হিন্দু সংস্কৃতির শেষ অধ্যায়…নীচু জাতের কিছু হিন্দু যারা মুসলমান হয়েছে, তাদের খুশী করতে হিন্দু সংস্কারকে বলি দেওয়া…”

একসময় "অবিভক্ত বাংলা"-র সমর্থক শ্যামাপ্রসাদ সেই সময়েই কিন্তু বাংলা ভাগের পক্ষে চলে গিয়েছিলেন। আর, ব্রিটিশ রাজের শেষ দুটো বছরে, বাংলার হিন্দু ভদ্রলোকদের মধ্যে হিন্দু মহাসভা বস্তুত: কংগ্রেসের সেকেন্ড ফিডল হিসেবেই থেকে গিয়েছিল।

(২)

ছেচল্লিশের দাঙ্গায় দোষী কে সেই প্রসঙ্গে যাওয়া এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। হাজারো লেখা আছে, বই আছে - পড়ে দেখতে পারেন। যেটা বাস্তব, সেটা হল ১৯৪৭ সালে দেশভাগই যে একমাত্র পথ সেইটা মোটামুটি সমস্ত রাজনৈতিক নেতৃত্বই মেনে নিয়েছিলেন। ১৯৪৭-এর ৮ই মার্চ কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটিও জানিয়ে দেয় যে দেশভাগ যদি হতেই হয়, তাহলে মুসলমান-প্রধান বাংলা আর পাঞ্জাবকেও ভাগ করতে হবে। ৩রা জুন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাটলি ঘোষণা করেন যে দশ সপ্তাহের মধ্যে ইংরেজরা ভারত ছেড়ে যাবে। ১৫ই আগস্ট ব্রিটিশ ভারতের দুই উত্তরসুরীর হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া হবে। দুই মুসলমান প্রধান রাজ্য, বাংলা আর পাঞ্জাবকে ভাগ করে মুসলমান অধ্যুষিত পাশাপাশি জেলাগুলো দেওয়া হবে পাকিস্তানকে, আর অ-মুসলমানপ্রধান বাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে।

মানে, ওই দশ সপ্তাহের মধ্যে বাংলার সব হিন্দু রাজনৈতিক নেতা (কংগ্রেস ও মহাসভা মিলিয়ে) - যাঁরা আগের কয়েক বছর ধরে নিরন্তর রাজ্যভাগের কথা বলে এসেছিলেন - তাঁদের সকলকেও এবার দেশভাগের জমাখরচের হিসেব কষতে হবে…
দেশভাগের অধিকাংশ ইতিহাস জানায় যে স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ তাঁর মর্জিমত কলমের আঁচরে ভারত আর পাকিস্তানকে আলাদা করেছিলেন। তড়িঘড়ি করে করা এই কাজে ভারত আর পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ছিল দাবার বোড়ে মাত্র। বাস্তবে যদিও, যে রাজনীতিকরা দেশভাগের পক্ষে মত দিয়েছিলেন, তাঁরা প্রত্যেকেই স্পষ্ট উদ্দেশ্য নিয়ে এই নতুন রাজ্যের বর্ডার কী হবে সেইটা স্থির করার কাজ করে গিয়েছিলেন।

কাজটা অবশ্যই সহজ ছিল না। ৩রা জুন থেকে ১৭ই আগস্ট - এই অল্প কয়েকটা দিনের মধ্যেই শুধু যে দুই দেশের সীমা নির্ধারণ করতে হবে তা নয়, ভাগ করতে হবে আরো অনেক কিছুই - নদীনালা, রাস্তা, ব্রিজ, রেলপথ, গুদামে থাকা জিনিসপত্র, মায় সরকারি কর্মচারীদেরও। আর, এমনও নয় যে এর কোন ব্লুপ্রিন্ট কোথাও ছিল, যাতে সেটা দেখে দেখে কাজটা সহজেই করে ফেলা যায়। বেসিক গ্রাউন্ডরুল লন্ডন ও দিল্লী থেকেই বলে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু রাজ্যের কোন অঞ্চল কীভাবে ভাগ হবে - সেটা ছাড়া হয়েছিল রাজ্যের ওপরেই। এই গ্রাউন্ডরুল অনুযায়ী বাংলার আইনসভাকে দুটো ভাগে ভাগ করা হবে - মুসলমান আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা ভাগ, আর হিন্দু আসনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আরেকটা ভাগ - দুটো ভাগেই আলাদা করে দেশভাগের ওপর ভোট নেওয়া হবে আর, কোনো একটা ভাগে পার্টিশনের পক্ষে ভোট হলেই ভাগ করা হবে রাজ্যকে। ২০শে জুন ১৯৪৭ - যে দিনটাকে হিন্দুত্ববাদীরা পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করা শুরু করেছে - সেই দিন, বাংলার আইনসভায় এই দুটো ভাগ তৈরী করে ভোট হয়। সেই ঐতিহাসিক ভোটে, একেবারে প্রত্যাশিতভাবেই হিন্দু অংশ ভোট দেয় বাংলা ভাগের পক্ষে আর মুসলমান অংশ ভোট দেয় বিপক্ষে। বাংলার রাজ্যপাল ফ্রেডেরিক বারোওজ টেলেক্স করে মাউন্টব্যাটেনকে জানান -
Separate meetings of members West repeat West Bengal Legislative Assembly this afternoon decided under paragraph six of H.M.G.’s statement by 58 votes to 21 votes that Province should be partitioned; and under paragraph eight of statement by 58 votes to 21 votes again that West Bengal should join existing Constituent Assembly. Separate meeting of members East repeat East Bengal Legislative Assembly this afternoon decided under paragraph six of statement by 106 votes to 35 votes that Province should not repeat not be partitioned; under paragraph eight of statement by 107 votes to 34 that East Bengal should join new Constituent Assembly; and under paragraph thirteen of statement by 105 votes to 34 votes that East Bengal would agree to amalgamation of Sylhet. [৩, ৪]

এখানে যেটা দেখার, সেটা হল বাংলা ভাগের পক্ষে রাজ্যের হিন্দু প্রতিনিধিরা একজোট হয়েই ভোট দিয়েছিলেন, আর সেই সময়ে আইনসভায় হিন্দু মহাসভার তরফে ছিলেন একজনই - শ্যামাপ্রসাদ নিজে। কাজেই, খুব সাধারণ অঙ্কের হিসেবেও ৫৮টা ভোটকেই শ্যামাপ্রসাদ হিসেবে ধরা যায় না (সে ইদানীংকালে কেউ কেউ ২৯৪ আসনে তাঁকেই প্রার্থী হিসেবে দেখতে বললেও)...

মানে, আগে যে ধারণার কথা লিখেছিলাম - বাংলার অধিকাংশ হিন্দু রাজনৈতিক নেতৃত্বই রাজ্যভাগের প্রশ্নে একমত ছিলেন - আইনসভাতে হিন্দু অংশের সংখ্যাগরিষ্ঠের মত সেই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে। আর এই হিন্দু প্রতিনিধিদের প্রায় সকলেই বাংলা কংগ্রেস থেকে আসা। পশ্চিমবঙ্গের গঠনের পিছনে হিন্দু মহাসভা ও শ্যামাপ্রসাদের আলাদা কোনো কৃতিত্ব নেই। বরং বলা ভালো কোনো কৃতিত্বই নেই।
[আদৌ কাউকেই এই কৃতিত্ব দেওয়া যায় কিনা সে সম্পূর্ণ আলাদা প্রসঙ্গ, আলাদাভাবে লেখা প্রয়োজন তাই নিয়ে। শুধু এইটুকু বলি - দেশভাগের হিউম্যান কস্ট আর দুটো দেশেরই ক্ষয়ক্ষতি, বিশেষ করে রিসোর্সের হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বিচার করলে কৃতিত্ব শব্দটাই এখানে বেমানান। দেশভাগ বাঙালীর কাছে একটা যন্ত্রণার ঘটনা, এবং পশ্চিমবঙ্গের পক্ষে এমন একটা ধাক্কা যেখান থেকে এই রাজ্যটা কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি। তাই, অত্যন্ত নোংরা খুনে মানসিকতার লোক না হলে ২০শে জুন তারিখটা নিয়ে উৎসব কেউ করবে না।]

(৩)

এবার আসা যাক অন্য প্রসঙ্গটায় - কলকাতার পশ্চিমবঙ্গে থাকা বা না-থাকা নিয়ে…তার জন্যে আমাদের যেতে হবে ২০শে জুন ১৯৪৭-এর পরের কয়েক সপ্তাহে, ঢুকতে হবে বাউন্ডারি কমিশনের ভিতরে...যার কাজ শুরু হয়েছিল তুমুল অনিশ্চয়তার মধ্যে। বাংলা আর পাঞ্জাব, দুই জায়গাতেই চারজন বিচারককে নিয়ে তৈরী হয়েছিল বাউন্ডারি কমিশন, দুই কমিশনেই চেয়ারপার্সন ছিলেন সিরিল র‍্যাডক্লিফ। আর চারজন বিচারককে মনোনীত করেছিল কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ। বাংলা কংগ্রেসের তরফে এই কমিশনে ছিলেন জাস্টিস বি.কে. মুখার্জী এবং জাস্টিস সি.সি. বিশ্বাস। মুসলিম লীগের মনোনীত সদস্য ছিলেন জাস্টিস আবু সালেহ মহম্মদ আক্রম, এবং জাস্টিস এস.এ. রহমান। এবং স্বাভাবিকভাবে সকলেই রীতিমত অনুগতভাবে নিজের নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাস এবং দলগত নীতির প্রতিনিধিত্ব করে গেছিলেন পুরো সময়টা জুড়ে। মাসখানেক ধরে ৩৬জন উকিল ৩৬টা আবেদন এই কমিশনের সামনে হাজির করলেও (সময়াভাবে আরো ৭১টা আবেদন পেশই করা যায়নি) র‍্যাডক্লিফ পুরো সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন শুধুমাত্র কমিশনের চার সদস্যের আনা দাবী আর পাল্টা-দাবীর ওপর ভিত্তি করে - মানে বাস্তবে কংগ্রেসের "সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটি" আর মুসলিম লীগের পেশ করা বক্তব্যের ওপরেই [৫]।

এই পুরো পর্বটা জুড়েই কংগ্রেস হাইকম্যান্ড বাউন্ডারি কমিশন থেকে হাজার মাইল দূরে দাঁড়িয়ে থেকেছিল, রাজ্যের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত সিদ্ধান্ত আঞ্চলিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ছেড়ে দিয়ে। এই নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি। স্বয়ং বাবাসাহেব আম্বেদকর কংগ্রেসের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছিলেন - তাঁর বক্তব্য ছিল এই সীমানা নির্ধারণ রাজ্যের নয়, দেশের সরকারের দায়িত্ব হওয়ার কথা, এবং এখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের বদলে সেনাবাহিনীর লোকজনের থাকা প্রয়োজন, কারণ শেষ অবধি, সীমানার দেখভালের দায়িত্ব তাদেরই। অবশ্যই আম্বেদকরের এই কথায় বিশেষ কেউ কান দেয়নি - না কংগ্রেস হাইকম্যান্ড, না ব্রিটিশ রাজ, না প্রতিরক্ষা দপ্তরের কেউ (ওই দপ্তর থেকে কেউ বাউন্ডারি কমিশনের সামনে হাজির পর্যন্ত হননি)।
সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটিটা ছিল খানিক খিচুরি সংগঠন - বারো সদস্যের এই কমিটিতে দুজন ছিলেন বাংলা কংগ্রেস থেকে (এই দুজনের একজন ব্যারিস্টার অতুল চন্দ্র গুপ্ত - কমিটির চেয়ারম্যান), বাকি দশজন ছিলেন হিন্দু মহাসভা, ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশনের তরফে। বারোজনের মধ্যে দশজন দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদী - স্পষ্টতই যাকে বলা যায় "বিপর্যয়ের রেসিপি"।

এবার, পার্টিশনের গ্রাউন্ড রুল - যেটা লন্ডন থেকে বলে দেওয়া হয়েছিল - সেটা ছোট করে বুঝে নেওয়া দরকার। লন্ডনের তরফে ৩রা জুনের স্টেটমেন্টটা যদি একবার দেখি -

For the immediate purpose of deciding on the issue of partition, the members of the legislative assemblies of Bengal and the Punjab will sit in two parts according to Muslim majority districts (as laid down in the Appendix) and non-Muslim majority districts. This is only a preliminary step of a purely temporary nature as it is evident that for the purposes of final partition of these provinces a detailed investigation of boundary question will be needed; and as soon as a decision involving partition has been taken for either province a boundary commission will be set up by the Governor-General, the membership and terms of reference of which will be settled in consultation with those concerned. It will be instructed to demarcate the boundaries of the two parts of the Punjab on the basis of ascertaining the contiguous majority areas of Muslims and non-Muslims. It will also be instructed to take into account other factors. Similar instructions will be given to the Bengal Boundary Commission. Until the report of a boundary commission has been put into effect, the provisional boundaries indicated in the Appendix will be used. [৬]

পাশাপাশি অবস্থিত মুসলমানপ্রধান জেলাগুলো যাবে পাকিস্তানে, আর বাদবাকি জেলাগুলো থেকে যাবে ভারতে - শুধু এই নিয়মের ভিত্তিতে যদি বাংলা ভাগ করা হয়, তাহলে ভাগীরথী-হুগলীর পূর্বদিকের প্রায় পুরো অঞ্চলই বাদ দিতে হয়, বাদ দিতে হয় গঙ্গার উত্তরের একটা বড় অংশও। ভদ্রলোক হিন্দু বাঙালি পার্টিশন চেয়েছিল কারণ তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সঙ্গে একসাথে থাকতে চায়নি, ক্ষমতার ভাগাভাগি চায়নি। সেক্ষেত্রে মুসলমান প্রধান জেলাগুলোকে বাদ দিয়ে দিলে পশ্চিমবঙ্গের ভাগে পড়ে থাকে দক্ষিণবঙ্গের অর্ধেক - শুধু বর্ধমান, হুগলী, হাওড়া, কলকাতা, ২৪ পরগণা, বাঁকুড়া, বীরভূম, আর মেদিনীপুর - মানে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলো - ঠিক যে যে জেলায় পার্টিশনের পক্ষে সবচেয়ে বেশি প্রচার চলেছিল...[প্রথম ছবি: Map 1]
অক্ষরে অক্ষরে নিয়ম মেনে চললে এ বড় কঠিন বাস্তব। যে পশ্চিমবঙ্গের জন্য ভদ্রলোক হিন্দু এতদিন লড়ে এলো, বা যে পাকিস্তানের জন্যে মুসলিম লীগ, সেই সবই যদি এরকম পোকায় কাটা অর্ধেক রাজ্য হয়ে যায়, তাহলে সেই রাজ্য কি আদৌ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে? যে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল নিয়ে এত কথা, এই অর্ধেক রাজ্যে সেই ক্ষমতার কতটুকুই বা বাকি থাকবে?

কাজেই, ওই বেঁধে দেওয়া গ্রাউন্ডরুলের মধ্যে একটা বাক্যের আশ্রয় নিতে হয়েছিল কো-অর্ডিনেশন কমিটি আর লীগকে - “It will also be instructed to take into account other factors" - দুই পক্ষই এই "আদার ফ্যাক্টরস"-কে নিজের মত করে ব্যাখ্যা করে তাদের ভাগের অংশকে বাড়ানোর চেষ্টা করে গেছিল ক্রমাগত। তবে, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য পয়েন্ট হল যে এই "আদার ফ্যাক্টরস" শব্দবন্ধকে ব্যবহার করে কতটা জমি পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হবে, তাই নিয়ে কো-অর্ডিনেশন কমিটির মধ্যেই বড়সড় মতভেদ ছিল, আর সেটা একেবারে শুরুতেই সামনে আসে।

এই মতবিরোধটাই এই প্রসঙ্গে আপাতত জরুরী। শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছিল কিনা সেটা যাচাই করতে আমাদের ঠিক এই জায়গাতেই যেতে হবে...

(৪)

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল পশ্চিমবঙ্গ কত বড় হলে রাজ্যভাগের রাজনীতির আঙিনার চরিত্ররা সন্তুষ্ট হবেন, আর এই নতুন রাজ্যটাও অর্থনৈতিকভাবে কার্য্যকর হবে। আর এই প্রশ্নে সেন্ট্রাল কো-অর্ডিনেশন কমিটির বিভিন্ন পক্ষ একে অপরের সম্পূর্ণ উলটো মেরুতে বসে ছিলেন। একদল ছিলেন রাজ্যের কলেবর যতটা সম্ভব বাড়ানোর পক্ষে, আরেকদল ছিলেন ছোট কমপ্যাক্ট রাজ্যের পক্ষে - যা শাসন করা অপেক্ষাকৃত সহজ। আর, এই বিভেদ ছিল একেবারে পার্টি লাইন বরাবর। ছোট দলগুলোর দাবী ছিল আকাশপ্রমাণ। হিন্দু মহাসভা আর নিউ বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন চেয়েছিল যতটা সম্ভব এলাকা দাবী করতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওই "আদার ফ্যাক্টরস" শব্দবন্ধকে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অসম্ভব বাড়িয়ে তুলে। এগারোটা হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা (বর্ধমান, মেদিনীপুর, বীরভূম, বাঁকুড়া, হাওড়া, হুগলী, কলকাতা, ২৪ পরগণা, খুলনা, দার্জিলিং আর জলপাইগুড়ি) ছাড়াও মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অনেক অংশও এদের দাবীর মধ্যে ছিল - যেমন নদীয়ার বড় অংশ, ফরিদপুর, দিনাজপুর, এবং রংপুর আর রাজশাহীর বেশ কিছু অঞ্চল। মহাসভা আর নিউ বেঙ্গলের দাবী মানলে পশ্চিমবঙ্গে আসতো অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের প্রায় তিন ভাগ [দ্বিতীয় ছবি - Map 2][৭]
উল্টোদিকে, অতুল চন্দ্র গুপ্তর নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্যাম্পের দাবী তুলনামূলকভাবে অনেক নিচু স্কেলে বাঁধা ছিল। তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন যে অহেতুক অযৌক্তিক দাবীর ফলে পশ্চিমবঙ্গের সীমানা সংক্রান্ত সমস্ত দাবীই লঘু হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থেকে যায়। হিন্দু জাতীয়তাবাদী দলগুলোর প্রতিনিধিরা এই প্রস্তাব নাকচ করলে অতুল চন্দ্র গুপ্ত স্ট্র্যাটেজি বদলে দুটো প্রস্তাব রাখেন - একটা "কংগ্রেস স্কিম", যেখানে অনেক বড় আকারে দাবী পেশ করা হয়েছিল - মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলার অংশ জুড়ে (যদিও সেটাও মহাসভার দাবীর চেয়ে কমই ছিল), আর দ্বিতীয়টা "কংগ্রেস প্ল্যান", যেখানে প্রথম স্কিমের চেয়ে কম এলাকা চাওয়া হলেও সেটা মোটামুটিভাবে ওই মৌলিক তত্ত্ব মেনেই, অর্থাৎ হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলোকেই নিয়ে। "আদার ফ্যাক্টরস" হিসেবে অল্প কিছু মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল চাওয়া হয়েছিল এই প্ল্যানে। তৃতীয় ছবি, অর্থাৎ Map 3 খেয়াল করে দেখলে দেখতে পাবেন কংগ্রেস স্কিম আর কংগ্রেস প্ল্যান - দুটোর ক্ষেত্রেই প্রস্তাবিত এলাকা দাগ দিয়ে বোঝানো রয়েছে। এবং, দুটো ম্যাপেই কলকাতা কিন্তু প্রস্তাবিত পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই রয়েছে। হিন্দু মহাসভা এই প্রস্তাবও মানেনি। শেষ অবধি তারা আলাদাভাবে পিটিশন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। Map 2 তারই ফসল।
মোদ্দা কথা হল, যে কয়েকটা পিটিশন জমা পড়েছিল কংগ্রেস আর হিন্দু মহাসভার তরফে, তার প্রতিটাতেই কলকাতা ছিল পশ্চিমবঙ্গের মধ্যেই। অর্থাৎ, হিন্দুত্ববাদীদের দ্বিতীয় দাবী, যে শ্যামাপ্রসাদের জন্যেই কলকাতা পশ্চিমবঙ্গে এসেছে, সেই দাবীটিকেও এই ম্যাপের দৌলতে সহজেই নস্যাৎ করে দেওয়া যায়। 
    
(৫)

এই লেখাটা এইখানেই শেষ করে দেওয়া যেত। কিন্তু মনে হল সম্পূর্ণতার খাতিরে আরো কিছু তথ্য জুড়ে দেওয়া দরকার। উদ্দেশ্য শ্যামাপ্রসাদ ও হিন্দু মহাসভা, এবং আজকের বিজেপি – উগ্র দক্ষিণপন্থার আসল মানসিকতাটা চিনে নেওয়া…

চল্লিশের দশকের রাজ্যভাগের রাজনীতির সঙ্গীদের থেকে পশ্চিমবঙ্গের জন্যে অনেক কম এলাকা দাবী করে কংগ্রেস বেশ বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়েছিল। যেহেতু দেশভাগের পর তারাই সরকারে বসবে, অর্থাৎ তারাই হবে ব্রিটিশ রাজের উত্তরাধিকারী, সেহেতু, তাদের বিরুদ্ধে “বাংলার জন্মগত অধিকার খর্ব করা” বা “ভারতের নিজস্ব ভৌগলিক এলাকা শত্রুর হাতে তুলে দেওয়া” জাতীয় অভিযোগ তোলা সহজেই সম্ভব। কংগ্রেসের যুক্তিটা এখানে কংগ্রেসেরই দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে হবে - তাদের লক্ষ্য ছিল এই নতুন রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা, শুধু উত্তরাধিকারী হিসেবে নয়, তার পরেও। এবং তার জন্যে যদি এই অভিযোগের জবাব দিতে হয়, তাহলে সেটাই এই ক্ষমতা ধরে রাখার দাম। এবং হিন্দু মহাসভাও এইটা ভালোমতনই বুঝে গেছিল। 

হিন্দু কো-অর্ডিনেশন কমিটি পাকাপাকি ভেঙে যাওয়ার পর হিন্দু মহাসভা আর তাদের সঙ্গীরা বুঝে যায় যে তাদের আর হারানোর কিছু নেই, এবং তারা চাইলে নির্বিচারে আরো যুক্তিহীন দাবীও তুলতে পারে। এবং দক্ষিণপন্থী হিন্দুদের সামনে এই দেখনদারি চেঁচামেচিতে বরং তাদের লাভ হওয়ার সম্ভাবনাও থেকে যায় (যেটা আজ একেবারে ১০০% বাস্তব)। চরম দক্ষিণপন্থী সংগঠনগুলো আরো চমকপ্রদ দাবী তুলতে থাকে মহাসভার উস্কানিতে...যেমন আর্য্য রাষ্ট্র সংঘ (হয়তো হাতে গোনা একশোটা লোক ছিল এতে) অবিভক্ত বাংলার পাঁচভাগের চারভাগ চেয়ে বসে, সঙ্গে বাংলার প্রত্যেকটা শহরও, কারণ বাংলার শহরাঞ্চলে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি…

মহাসভা এই নতুন জন্মানো রাজ্যের সীমানা নিয়ে ক্রমশঃ আরো উদ্ভট দাবী করতে শুরু করে কারণ তারা পুরোপুরি বুঝে গিয়েছিল যে এই নতুন রাজ্যে তাদের কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। কাজেই, পাশাপাশি জেলার তত্ত্ব উড়িয়ে দিয়ে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ যে কোনো জেলাকেই তারা পশ্চিমবঙ্গে ঢোকানোর কথা বলে ওই "আদার ফ্যাক্টরস"-এর হিসেবে। যেমন, গোটা নদীয়া চেয়ে বসে শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থান হিসেবে, রাজশাহী চেয়ে বসে সেখানে বারেন্দ্র রিসার্চ সেন্টার রয়েছে বলে, এবং বরিশাল - সেখানকার হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের জন্যে। মহাসভা জানতো যে তাদের এই দাবীগুলো কোথাওই কোনো গুরুত্ব পাবে না, তা সত্ত্বেও নিজেদের "হিন্দুস্বার্থ রক্ষার সৈন্য" হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টায় খামতি রাখেনি। দুইদিকেই লাভ - একদিকে হিন্দুস্বার্থ রক্ষার একনিষ্ঠ সৈনিকের খ্যাতি - যদি দাবীগুলোর একটাও বাস্তবে সত্যি না হয়; অন্যদিকে কংগ্রেসের প্ল্যানের বাইরে সামান্য এলাকাও পশ্চিমবঙ্গে এলে তার কৃতিত্ব নেওয়ার সুযোগ...একই সঙ্গে ভবিষ্যতের ইলেকশন যুদ্ধে নিজেদের জায়গা পোক্ত করা। বস্তুতঃ প্রোপাগান্ডাই ছিল মহাসভার মূল উদ্দেশ্য। সেদিনও যা ছিল, আজও তাই।

উল্টোদিকে কংগ্রেসের হাতে এই কল্পনাবিলাসের সুযোগ ছিল না। নতুন যে রাজ্য তৈরী হবে, তাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল, আর তাদের প্রতি পদক্ষেপ ছিল সেই লক্ষ্যে। অতুল গুপ্তের তত্ত্বাবধানে কংগ্রেসের কমিটি রাজ্যের প্রতিটা থানার জনসংখ্যার পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসেব করেছিল সেন্সাস রিপোর্টের সাহায্য নিয়ে [চতুর্থ ছবি - Map 4]। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে দেখলে, কংগ্রেস প্ল্যানে অনেক সমস্যা চোখে পড়লেও, কংগ্রেসের প্ল্যানাররা মোটামুটিভাবে পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির কথা ভেবেই সীমানা নির্ধারণের চেষ্টা করেছিলেন। দার্জিলিং এর চা-বাগান এলাকা, ভাগিরথী-হুগলীর নদীপথ, এবং কলকাতা বন্দরের কথা ভেবে মালদা-মুর্শিদাবাদ-নদীয়া - এগুলো সব তাঁদের প্ল্যানে ধরা ছিল - “this territory has been included in West Bengal for the most compelling factor of essential necessity for requirements and preservation of the Port of Calcutta. The life of the Province of West Bengal is mostly dependent on Calcutta, and with the partition it will become wholly so dependent” [৮] - অর্থাৎ, এখানেও কলকাতাকে বাদ দিয়ে কোনো প্ল্যানই ছিল না। পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত প্ল্যান তৈরী হয়েছিল কলকাতাকে তার কেন্দ্রে রেখেই।
আরো অনেক হিসেবনিকেশ ছিল কংগ্রেস প্ল্যানে। সেই হিসেবগুলো যে ঠিক, সে কথা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে বলা যায় না। এও ভাবতে আশ্চর্য্য লাগে যে এই প্ল্যানের মধ্যে বেশ কিছু এমন "অনুমান" ছিল, যেগুলো রেট্রোস্পেক্টে দেখলে ধৃষ্টতা মনে হয়। পিছন ফিরে তাকিয়ে এও মনে হয় যে সেই সময়ে গণপরিষদে বাংলার প্রতিনিধিদের সমস্ত পদক্ষেপই ছিল যেনতেনপ্রকারেণ এই নতুন রাজ্যের ক্ষমতা ধরে রাখার দিকে তাকিয়ে। কংগ্রেসের নিজের মধ্যেও দ্বন্দ্ব ছিল এই প্ল্যান নিয়ে। অতুল্য ঘোষ এবং তাঁর গোষ্ঠীর তরফে আরো সংক্ষিপ্ত রাজ্যের একটা প্ল্যান দেওয়া হয়েছিল শুধুমাত্র দক্ষিণবঙ্গের হিন্দুপ্রধান জেলাগুলোকে নিয়ে (যদিও কংগ্রেস সেই প্ল্যান জমা দেয়নি) - যেখানে অতুল্য ঘোষের মূল উদ্দেশ্য সম্ভবত: ছিল নতুন রাজ্যে তাঁর গোষ্ঠীর (মানে হুগলী-বর্ধমান জেলার) নেতাদের ক্ষমতা সুরক্ষিত করা। এত কিছু সত্ত্বেও, বিশেষ করে দূরদর্শিতার অভাব থাকলেও, এইটুকু বলাই যায় যে বাউন্ডারি কমিশনের সামনে জমা দেওয়া প্ল্যানের মধ্যে প্রোপাগান্ডা ছিল না, জনতাকে উত্তেজিত করার উদ্দেশ্যে দেখনদারি ছিল না। এইটাই আসল কথা - আর এই বাস্তবটা ওই সময়ের কিছু ডকুমেন্ট খুঁটিয়ে দেখলেই জানা যায়।
শেষ অবধি, সিরিল র‍্যাডক্লিফ যে পার্টিশন লাইনটা টানেন, সেটা মোটামুটিভাবে কংগ্রেস প্ল্যানের সঙ্গেই মিলে গিয়েছিল। শুধু খুলনার বদলে পশ্চিমবঙ্গে আসে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ মুর্শিদাবাদ - গঙ্গা-ভাগিরথী রিভার সিস্টেমকে অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে।
আজ এই অবধি থাক। অন্য কোনোদিন চেষ্টা করবো পার্টিশনের জমাখরচ নিয়ে লিখতে। বারবার শুধু এইটাই বলার – হিন্দুত্ববাদীরা সেদিনও প্রোপাগান্ডাকেই তাদের অস্ত্র করেছিল, আজও তাই। ফ্যাসিবাদী শক্তি তার জন্মলগ্ন থেকে এই কাজই করে এসেছে। ভারতের এই নয়া ফ্যাসিস্টরা তাদের রাজনৈতিক শিক্ষাগুরু গোয়েবলসের শিক্ষাই মেনে চলেছে – সেদিনও, আর আজও।

 তথ্যসূত্র -
[১] Bengal Divided: Hindu Communalism and Partition, 1932-1947, Joya Chatterji, Cambridge University Press
[২] Shyama Prasad Mookerjee Papers, II-IV Instalment, File No. 75/1945-46
[৩] The Spoils of Partition: Bengal and India 1947-1967, Joya Chatterji, Cambridge University Press
[৪] Constitutional Relations between Britain and India: Transfer of Power, 1942-7, Volume XI The Mountbatten Viceroyalty, Announcement and Reception of the 3 June Plan, 31 May – 7 July 1947, ed: Nicholas Mansergh, Penderel Moon
[৫] The Fashioning of a Frontier: The Radcliffe Line and Bengal’s Border Landscape, 1947-52, Joya Chatterji, Modern Asian Studies / Cambridge University Press
[৬] Statement by His Majesty’s Government, dated the 3rd June 1947, PP I, p. 2
[৭] Memorandum for the Bengal Boundary Commission. Submitted by the Bengal Provincial Hindu Mahasabha and the New Bengal Association, Shyama Prasad Mookerjee Papers, 1st Instalment, Printed Material, File No. 17 (Serial No. 8).
[৮] Memorandum on the partition of Bengal presented on behalf of the Indian National Congress before the Boundary Commission, p. 7.
(সমস্ত ছবির সোর্স: জয়া চ্যাটার্জীর "স্পয়েলস অফ পার্টিশন")

Monday, August 08, 2022

#ShadowArmiesOfHindutva - Part 6

২৯শে সেপ্টেম্বর ২০০৮ - রমজানের সময়ে, রাত্রি সাড়ে ন'টা নাগাদ মালেগাঁওয়ের অঞ্জুমান চক আর ভিকু চকের মাঝে শাকিল গুডস ট্রান্সপোর্ট কোম্পানির বাড়ির সামনে, জনবহুল একটা এলাকায় বিস্ফোরণ হয়। বিস্ফোরক ডিভাইস বসানো ছিলো একটা LML Freedom স্কুটারে, রেজিস্ট্রেশন নম্বর MH-15-P-4572 - বিস্ফোরণের ফলে ছ'জন মারা যায়, আহত হয় আরো শ'খানেক লোক, সম্পত্তি নষ্টের পরিমাণ চার লক্ষ টাকার ওপর। যেহেতু সেই সময়টা ছিলো রমজানের, আর ঠিক পরের দিন, মানে ৩০শে সেপ্টেম্বর শুরু হওয়ার কথা ছিলো নবরাত্রি উৎসবের, বোঝাই যায়, যে বিস্ফোরণ যারা ঘটিয়েছিলো তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিলো আতঙ্ক ছড়ানো, আর মানুষ মেরে, সম্পত্তি ধ্বংস করে সাম্প্রদায়িক বিভেদ তৈরী করা। ঘটনার পরেই বিশাল পুলিশবাহিনী স্পটে পৌঁছে যায়, কিন্তু প্রায় হাজার পনেরো ক্ষুব্ধ মানুষের ভিড়ে থমকে যায়। ইঁট ছোঁড়ে বিক্ষুব্ধ জনতা, বেশ কয়েকজন পুলিশ আহত হয়, কয়েকটা গাড়িও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষোভ প্রশমিত হওয়ার পরেই বিস্ফোরণের তদন্তে নামে পুলিশ। এই গন্ডগোলের জন্যে আলাদা করে রায়টিং এর কেস নথিভুক্ত হয় আজাদ নগর থানায়, কেস নম্বরঃ ১৩১/২০০৮।

বোমা বিস্ফোরণ নিয়ে আজাদ নগর থানাতেই কেস রেজিস্টার হয় ৩০শে সেপ্টেম্বর ভোর তিনটেয়, কেস নম্বরঃ ১৩০/২০০৮, আইপিসি ৩০২, ৩০৭, ৩২৬, ৩২৪, ৪২৭, ১৫৩-এ, ১২০-বি, এক্সপ্লোসিভ সাবস্ট্যান্সেস অ্যাক্টের ৩/৪/৫ ধারায়। পুলিশ একে একে গ্রেপ্তার করে বেশ কয়েকজনকে - যাদের মধ্যে ছিলেন সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, শিবনারায়ণ গোপালসিং কালসাংরা, শ্যাম ভওয়রলাল সাহু, রমেশ শিবজী উপাধ্যায়, সমীর শারদ কুলকার্নি, অজয় ওরফে রাজা একনাথ রাহিরকর, রাকেশ দত্তাত্রেয় ধাওরে, জগদিশ চিন্তামন মাহত্রে, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শ্রীকান্ত প্রসাদ পুরোহিত ওরফে বলবন্ত রাও ওরফে শ্রেয়ক রণদিভে, সুধাকর উদয়ভান ধর দ্বিবেদী ওরফে দয়ানন্দ পান্ডে ওরফে স্বামী অমৃতানন্দ দেবতীর্থ ওরফে সারদা সর্বজ্ঞ পীঠের শঙ্করাচার্য্য আর সুধাকর ওঙ্কার চতুর্বেদী। ওয়ান্টেড লিস্টে নাম ওঠে রামজী রামচন্দ্র গোপালসিং কালসাংরা, সন্দীপ বিশ্বাস ডাঙ্গে, প্রভীন মুতালিক ইত্যাদিদের।

বিস্ফোরণের তদন্তে নেমে নাসিকের ফরেন্সিক টিম জানায় যে সেই বিস্ফোরণে আরডিএক্স আর অ্যামোনিয়াম নাইট্রেট ব্যবহার হয়েছিলো। বিস্ফোরণে ব্যবহৃত আরো একটি বাইক (রেজিস্ট্রেশন নম্বর GJ-05-BR-1920) রেজিস্টার্ড ছিলো প্রজ্ঞাসিং চন্দ্রপালসিং ঠাকুরের নামে। ওয়ান্টেড লিস্টে নাম থাকা তিনজন এবং আরো কিছু লোক মিলে সেই এলএমএল ফ্রীডম বাইকে বিস্ফোরক ডিভাইস বসিয়েছিলো।

খুব ছোট করে, এই হল মালেগাঁও ব্লাস্ট কেসের সামারি - যেটা আপনারা হয়তো খবরের কাগজে পড়ে থাকবেন। ঘটনাটা মনে করিয়ে দিলাম, নামধামসহ - এর পরের কথাগুলো রিলেট করতে সুবিধা হবে বলে।

এগারোজন অভিযুক্তের নাম ছিলো পুলিশ রিপোর্টে - আর খেয়াল করলে দেখা যায় যে এদের মধ্যে তিনটে ডিসটিংক্ট গ্রুপ রয়েছে - প্রথমতঃ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, দ্বিতীয়তঃ সেনাবাহিনীর বর্তমান ও প্রাক্তন সদস্য, আর তৃতীয়তঃ সংঘ পরিবারের বর্তমান ও প্রাক্তন কর্মী/সদস্য। এবং, ঘটনাচক্রে, এদের অধিকাংশই মহারাষ্ট্রীয় ব্রাহ্মণ, বিশেষ করে চিৎপাবন - একেবারে সেই হিন্দু মহাসভার রমরমার দিনগুলোর সময় সাভারকরের শিষ্যদের মত। সেই বছরের ২৬শে জানুয়ারি হওয়া ফরিদাবাদের যে মিটিঙের কথা আগের পর্বে লিখেছিলাম, সেই মিটিঙেই এঁরা ভারতের এক নতুন সংবিধানের খসরা তৈরী করা শুরু করেন - যেখানে এই চিৎপাবন ব্রাহ্মণদের ভারতীয় এয়ারফোর্সে ঢোকানোর জন্যে আলাদা ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়…

যে তিন ধরণের মানুষের কথা লিখলাম, তাদের মধ্যে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বরা - সন্ন্যাসী বা মহন্ত - চিরকালই হিন্দু জাতীয়তাবাদী মুভমেন্টের সাথে জড়িয়ে ছিলেন - অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মীয় নেতা হিসেবে বৈধতা দেওয়ার জন্যে, কিছু ক্ষেত্রে সক্রিয় সদস্য হিসেবেও। এর আগেও হিন্দু মহাসভাকে সমর্থন করেছেন কবীর পীঠের শঙ্করাচার্য্যের মত ব্যক্তিত্ব, বা গোরক্ষনাথ মঠের আচার্য্য মহন্ত দিগ্বিজয়নাথ…যাঁদের উত্তরাধিকারীরা হিন্দু মহাসভা থেকে ক্রমে ভারতীয় জনতা পার্টিতে চলে এসেছেন। নব্বইয়ের দশকে, বিজেপির জনা ছয়েক সাংসদ ছিলেন গেরুয়াধারী সন্ন্যাসী, যদিও এঁদের বেশিরভাগেরই সেরকম কোনো ধর্মীয় জনভিত্তি ছিলো না - হয় তাঁরা নামীদামী কোনো সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী ছিলেন না, বা একদম শূন্য থেকে নিজেদের আশ্রম তৈরী করেছিলেন। যদিও, এঁদের প্রধান সম্পদ ছিলো জোরালো বক্তব্য রাখার ক্ষমতা - প্রধাণতঃ জঙ্গি মনোভাবের - যেমন সাধ্বী ঋতম্ভরা বা উমা ভারতীর মত লোকেরা…

অমৃতানন্দ দেবতীর্থ ছিলেন এই দ্বিতীয় ক্যাটেগরির ধর্মীয় নেতা - জঙ্গি মনোভাব আর চরম মুসলমান বিদ্বেষ ছিলো যাঁর অস্ত্র। উনি নিজেকে শ্রীসারদা সর্বজ্ঞপীঠের শঙ্করাচার্য্য বলে দাবী করতেন আর সেই পীঠের ধর্মীয় আচার ফের শুরু করার চেষ্টায় ছিলেন, যদিও বাস্তবে সারদাপীঠ বর্তমানে কাশ্মীরের লাইন অফ কন্ট্রোলের ওপারে (এই সমস্ত পীঠের সংখ্যা, মাহাত্ম্য আর কে শঙ্করাচার্য্য হবেন তাই নিয়ে বর্তমান এবং হলেও-হতে-পারেন শঙ্করাচার্য্যদের মধ্যেই প্রচন্ড বিতর্ক আর রেষারেষি রয়েছে - উৎসাহী পাঠক চাইলে ধীরেন্দ্র কুমার ঝা-এর Ascetic Games পড়ে দেখতে পারেন। মালেগাঁও ব্লাস্ট নিয়ে লেখায় এর ডিটেলড আলোচনা আর করছি না)।

দ্বিতীয় যে গোষ্ঠীর কথা বললাম - সেনাবাহিনীর প্রাক্তন ও বর্তমান সদস্য - হিন্দু জাতীয়তাবাদী মুভমেন্টে এঁদেরও উপস্থিতি নেহাত কম নয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদ শুরু থেকেই এই মুভমেন্টে একটা মার্শাল বা সামরিক রূপ দিতে চেয়েছে। সাভারকরের ক্ষেত্রে যেমন "হিন্দুধর্মের সামরিকীকরণ" (militarise Hindudom) শুধুমাত্র একটা স্লোগান ছিলো না - দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সাভারকর সক্রিয়ভাবে কমবয়সী হিন্দু ছেলেদের আর্মিতে ঢোকানোর পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, লক্ষ্য ছিলো এই প্রশিক্ষিত হিন্দু সৈন্যরা ভবিষ্যতে মুসলমানদের সাথে অবশ্যম্ভাবী সিভিল ওয়ারে হিন্দুত্বের পরম শক্তিশালী খুঁটি হয়ে উঠবে। হিন্দু মহাসভায় তাঁর অনুগামী ডঃ বিএস মুঞ্জে যে ভোঁসলে মিলিটারি স্কুল তৈরী করেছিলেন - যার কথা এই সিরিজের একদম প্রথম পোস্টে ছিলো - সেই স্কুলের পিছনেও সাভারকরের পূর্ণ সমর্থন ছিলো। এবং, অভিনব ভারতের সঙ্গেও ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলের যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়। ২৬শে জানুয়ারির ফরিদাবাদ মিটিঙে কর্ণেল পুরোহিত জোরগলায় বলেছিলেন - "Whatever I have said today is in fact taken care of by the officers sitting there. The entire school is in my hands."

একটা ছোট্ট পরিসংখ্যান দিই - ইন্টারেস্টিং লাগতেও পারে।

১৯৮৯-৯১ সাল নাগাদ, মানে যে সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টি কোমর বেঁধে ইলেকশনে নামে, সেই সময়ে পার্টিতে বেশ কিছু এক্স-আর্মি লোকজনকে নেওয়া হয়, যাঁদের মধ্যে ছিলেন - দুজন রিটায়ার্ড এয়ারমার্শাল, ছ'জন রিটায়ার্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল, চারজন রিটায়ার্ড মেজর জেনারেল, চারজন রিটায়ার্ড ব্রিগেডিয়ার, চারজন রিটায়ার্ড কর্ণেল, দুজন রিটায়ার্ড মেজর, তিনজন রিটায়ার্ড ক্যাপ্টেন, দুজন রিটায়ার্ড উইং কম্যান্ডার, আর একজন করে রিটায়ার্ড এয়ার কমোডোর, লেফটেন্যান্ট কর্ণেল, স্কোয়াড্রন লীডার আর ফ্লায়িং অফিসার। এঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে বসানো হয় বিজেপির জাতীয় কার্য্যসমিতিতে আর পার্টির ডিফেন্স সেল-এ। এঁদের বিজেপিতে যোগ দেওয়ার কিছুদিন আগে আরো বেশ কয়েকজন প্রাক্তন সেনা হিন্দুত্ব ফোল্ডে চলে এসেছিলেন - যাঁদের মধ্যে একজন, ক্যাপ্টেন জগৎ বীর সিং দ্রোণ ততদিনে কানপুরের আরএসএস প্রধান। শুধু আর্মি নয়, আশি আর নব্বইয়ের দশকে পুলিশের বেশ কিছু বড়কর্তাও একে একে যোগ দিয়েছিলেন বিজেপিতে।

একটা কথা মনে রাখা ভালো - স্বাধীনতার অনেক বছর পরেও একটা সময় অবধি ধর্মীয় দাঙ্গার সময়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পারফরমেন্সে কোনো কালির দাগ ছিলো না। তবে ওই নব্বইয়ের দশকের শুরুতে একসাথে এতজন আর্মি অফিসারের বিজেপিতে যোগ দেওয়া স্বাভাবিকভাবে আর্মির ভিতরের "চেঞ্জিং ডায়নামিক্স" নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয়। ২০০৩ সালে তেহেলকার এক সার্ভেতে জানা যায় সেনাবাহিনীর জওয়ানদের মধ্যে ১৯% কোনো না কোনো সময়ে ধর্মীয় বৈষম্যের মুখোমুখি হয়েছেন। সার্ভেতে যাঁরা পার্টিসিপেট করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে ২৪% মুসলমান।

গত শতাব্দীর শেষের দিক থেকে সেনাবাহিনীর ভিতরের ডায়নামিক্স যদি বদলেও থাকে, ২০০৮ এর আগে হিন্দু মৌলবাদী কোনো ঘটনায় কখনো আর্মি অফিসারকে জড়িত থাকতে দেখা যায়নি। অভিনব ভারত সেই ধারণার মূলে সজোরে আঘাত করে - সেই প্রথম - যখন অন্ততঃ দুজন আর্মি অফিসারের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়। একদম শুরুতেই গ্রেপ্তার হয়েছিলেন মেজর রমেশ উপাধ্যায় - প্রাক্তন ডিফেন্স সার্ভিসেস অফিসার - যিনি খুব জলদিই স্বীকার করেন যে নাসিকের ভোঁসলে মিলিটারি স্কুল কমপ্লেক্সের মধ্যেই সাধ্বী প্রজ্ঞা এবং আরো কয়েকজনের সাথে তিনি গোটা ঘটনার প্ল্যান তৈরীর মিটিঙে অংশ নিয়েছিলেন। পাব্লিক প্রসিকিউটর অজয় মিসার কোর্টে জানান - "Upadhyaya, who was posted in the artillery department while working with the Indian military, is suspected to have guided the arrested accused on how to assemble a bomb and procure RDX"  (Retd Major trained Sadhvi in bomb-making: Prosecutor, Times of India, October 30, 2008).

বেশ কিছু প্রেস রিপোর্ট অনুযায়ী রমেশ উপাধ্যায় ছিলেন অভিনব ভারতের অ্যাক্টিং প্রেসিডেন্ট, যখন হিমানী সাভারকর ছিলেন প্রেসিডেন্ট। তবে গোটা গ্রুপের আসল কর্ণধার ছিলেন সেনাবাহিনীর আরেক সদস্য - লেফটেন্যান্ট কর্ণেল শ্রীকান্ত পুরোহিত - রমেশ উপাধ্যায় নাসিকে লিয়াজঁ অফিসার হিসেবে পোস্টেড থাকাকালীন পুরোহিতই তাঁর সাথে যোগাযোগ করেন। পুরোহিত এবং উপাধ্যায় একসাথেই কমবয়সী সদস্যদের মিলিটারি ট্রেনিং দিতেন, অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবস্থাও করতেন। ২০০৪-০৫ সালে জম্মুকাশ্মীরে পোস্টেড থাকাকালীন পুরোহিত ডকুমেন্ট জাল করতে শুরু করেছিলেন - অন্যদের অস্ত্রের লাইসেন্সের জন্যে। ২০০৮ সালের জুলাই নাগাদ মধ্যপ্রদেশের পাঁচমারিতে পোস্টেড হয়ে আসার পর লাগাতার বেশ কিছু ট্রেনিং ক্যাম্পের ব্যবস্থা করেন হিন্দুত্বের সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিতে। এর মধ্যে অধিকাংশ ক্যাম্পই হত নাসিকের ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলে - সেখানে যদিও পুরোহিতই প্রথম নয়, বরং ১৯৭৩ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল অবধি রিটায়ার্ড মেজর পিবি কুলকার্নি এই ক্যাম্পগুলো চালাতেন। মেজর কুলকার্নির সাথে আরএসএস এর সম্পর্ক সেই ১৯৩৫ সাল থেকেই। আর শুধু অভিনব ভারত নয়, তার আগে ২০০১ সালেও বজরং দল ওই একই ভোঁসলে মিলিটারি স্কুলে অস্ত্রশিক্ষার ক্যাম্প করেছে - যেখানে ১০-১৫ বছরের ছেলেদের আগ্নেয়াস্ত্রের শিক্ষা দেওয়া হত।

মালেগাঁও ব্লাস্টের বিভিন্ন নথি, টেস্টিমোনিয়াল ঘেঁটে বোঝা যায় যে শুধু এই দুজন ন'ন, আরো বেশ কয়েকজন আর্মি অফিসার অভিনব ভারতের সাথে জড়িয়েছিলেন। কর্ণেল পুরোহিত মেইন ইনফ্লুয়েন্সার/রিক্রুটার হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন আরো বেশি বেশি করে সেনাবাহিনীর লোককে হিন্দুত্বের ছাতার তলায় টেনে আনার। শুধু সেনাবাহিনী নয়, সংঘ পরিবারের অন্যান্য সংগঠনের মধ্যে থাকা চরমপন্থী লোকেদেরও টেনে আনার…

"The interrogation of Purohit establishes him as a man with forthright views on Hindu extremism. He was extremely frank in expressing his concerns about Hindus getting killed by jehadi terror groups and strongly felt that something had to be done about it. He had shared such views – that Hindus needed to retaliate – on several occasions with his colleagues in the Army. Of course, none of these colleagues realised the seriousness of his opinion or that it would lead him to plot real revenge attacks.[...] Purohit was the key man behind Abhinav Bharat, building its cadre by drawing ‘extremist’ elements from VHP [Vishwa Hindu Parishad] and RSS. An expert at liaisoning, Purohit had a unique sixth sense in identifying radical members of the right-wing outfits like VHP and then motivating them to join Abhinav Bharat." ["I masterminded Malegaon Blast: Lt. Col", The Economic Times, 7 November 2008]

হিন্দুত্বের ইতিহাস ফলো করলে দেখবেন - সাভারকর নিজেও আরএসএসের তথাকথিত নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষুব্ধ নাথুরাম গডসেকে টেনে এনেছিলেন নিজের হিন্দু রাষ্ট্র দলে - কারণ আরএসএস "বিশ্বাসঘাতক" গান্ধী আর মুসলমানদের বিরুদ্ধে "অ্যাকশন" নিতে দেরী করছিলো। পরের ঘটনা তো সবাই জানে…

বাকি রইলো মালেগাঁও ব্লাস্টে জড়িত তৃতীয় গোষ্ঠী - মানে সংঘ পরিবারের কর্মী/সদস্য…

রমেশ উপাধ্যায় নিজেই একসময় মুম্বইয়ে বিজেপির এক্স-সার্ভিসমেন সেল এর মাথায় ছিলেন। মালেগাঁও বিস্ফোরণের তদন্তে প্রথম গ্রেপ্তার হ'ন সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর - ইন্দোর এবং উজ্জয়িনীর অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের নেত্রী ছিলেন ১৯৯৭ সাল অবধি - এবিভিপির জাতীয় কর্মসমিতিতে যাওয়ার আগে অবধি। সমীর কুলকার্নি - যিনি অ্যাপারেন্টলি মধ্যপ্রদেশে অভিনব ভারত শুরু করেছিলেন (হিমানী সাভারকরের ভাষ্য অনুযায়ী) - ছিলেন আরএসএস এর সক্রিয় কর্মী। তবে সংঘ পরিবারের তথাকথিত "নিষ্ক্রিয়তা" দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে অভিনব ভারতে আসার সেরা উদাহরণ বিএল শর্মা - যিনি ১৯৪০ থেকে আরএসএস এর সাথে যুক্ত ছিলেন, আর রামজন্মভূমি আন্দোলনের সময় বিশ্ব হিন্দু পরিষদের হয়ে মাঠে নামেন। ১৯৯১ আর ১৯৯৬ সালে বিজেপির টিকিটে লোকসভা ভোটে জেতার পরে ১৯৯৭ সালে সাংসদ পদ আর বিজেপি থেকে বেরিয়ে এসে পুরোদস্তুর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কাজে জড়িয়ে পড়েন রাজ্য সম্পাদক হিসেবে। "অখন্ড ভারত" নিয়ে এগোতে বিজেপির "অনীহা" দেখে ক্ষুব্ধ হয়ে লালকৃষ্ণ আদবানিকে একটা কড়া চিঠি লিখেছিলেন সেই সময়ে যেটা তিনি ২৬শে জানুয়ারির ফরিদাবাদ মিটিঙে পড়ে শোনান…

"The country should be taken over by the Army. How far is it feasible? It’s been a year that I have sent some three lakh letters, distributed 20,000 maps of Akhand Bharat on 26 January, but these Brahmins and traders have never done anything and neither will they do. I do not talk of casteism. It’s just that they don’t have the potential; they don’t have the aptitude for this kind of feelings. Ultimately they do things that are feasible. One Chanakya comes up and becomes a moderate ruler. Even if people have the capability it is only when a seed is planted in the mind [that] it can make huge differences. It is not that physical power is the only way to make a difference but to awaken people mentally. I believe that you have [to] set fire in the society, at least a spark."

যদিও এই চিঠি লেখা সত্ত্বেও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অনুরোধে ফের ২০০৯ সালে শর্মা বিজেপির প্রার্থী হয়েছিলেন…মানে তথাকথিত "নিষ্ক্রিয়তা" নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও সংঘ পরিবারের মধ্যে থেকেই এঁরা প্রত্যেকে অভিনব ভারতের পরিকল্পনায় অংশ নিয়েছিলেন বিভিন্ন ক্যাপাসিটিতে।

মালেগাঁও ব্লাস্ট সেই গোটা পরিকল্পনার একটা ছোট্ট অংশ। পুরো পরিকল্পনা কী ছিলো? লিখবো আস্তে আস্তে।

#ShadowArmiesOfHindutva

(১) Shadow Armies - Fringe Organisations and Foot Soldiers of Hindutva, Dhirendra Kr. Jha
(২) Abhinav Bharat, the Malegao Blast and Hindu Nationalism: Resisting and Emulating Islamist Terrorism, Christophe Jaffrelot, Economic & Political Weekly, Vol. 45, Issue No. 36, 04 Sep, 2010
(৩) Chargesheets and Miscellaneous Documents regarding the Malegaon Case

#ShadowArmiesOfHindutva - Part 5

শুরুটা ধীরেন্দ্র কুমার ঝা-এর ভাষাতেই করি...

১২ই অক্টোবর ২০১৫ - রাতভর বৃষ্টির পর সেদিন সকালে পুণের বৈকুণ্ঠ শ্মশানঘাটের ইলেকট্রিক চুল্লিতে হিমানী সাভারকরের দেহ যখন তোলা হয়, হিমানীর ছেলে সাত্যকি সাভারকরের সঙ্গে শ্মশানে দাঁড়িয়েছিলো অভিনব ভারতের সমস্ত সদস্য। হিমানীর দেহ ছাই হয়ে যাওয়ার পর সকলে যখন সাত্যকির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যাচ্ছে, তখন একটাই কথা তারা প্রত্যেকে জানিয়েছিলো - হিমানীর মৃত্যুর সাথেই ছিঁড়ে গেছে তাদের সকলের "আদর্শ" দুই ঐতিহাসিক চরিত্রের সঙ্গে একমাত্র জীবন্ত যোগসূত্রটা। 

কে এই হিমানী সাভারকর?

একদিকে গোপাল গডসে, অর্থাৎ নাথুরাম গডসের ভাইয়ের মেয়ে, অন্যদিকে বিনায়ক দামোদর সাভারকরের ভাই নারায়ণ সাভারকরের ছেলের বউ - হিমানী সাভারকর - একই সাথে সংঘ পরিবারের দুই সুপ্রীম নেতার লেগ্যাসি বহন করতেন। পেশায় ছিলেন আর্কিটেক্ট - ১৯৭৪ সালে থেকে ২০০০ সাল অবধি নিজের পেশাতেই নিযুক্ত ছিলেন মুম্বইয়ে। ২০০০ সালে আর্কিটেক্টের কাজ ছেড়ে পুণে চলে আসেন সাভারকরের সমস্ত লেখাপত্রের একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে সেইসব দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে। গডসে এবং সাভারকর পরিবারের যৌথ লেগ্যাসিই তাঁকে নিয়ে আসে অভিনব ভারতের ছাতার তলায়। ২০০৮ সালের মালেগাঁও বিস্ফোরণে যখন অভিনব ভারতের সদস্যদের জড়িয়ে থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, হিমানী তখন প্রকাশ্যে অভিনব ভারতকে ডিফেন্ড করতে গিয়ে বলেছিলেন - "বুলেটের বদলা বুলেট যদি হয়, তাহলে বিস্ফোরণের বদলা বিস্ফোরণ কেন হবে না?" [‘If we can have bullet for bullet, why not blast for blast?’, Outlook , 17 November 2008.]

অভিনব ভারতের প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটা একটু ধোঁয়াশায় ঢাকা। সংগঠনের নামটা অবশ্যই ১৯০৫ সালে ফার্গুসন কলেজে পড়ার সময় সাভারকরের তৈরী গুপ্ত সংগঠনের নামে - সেই সময়ে সাভারকর এই সংগঠনের নাম রেখেছিলেন গাইসেপ্পে মাজিনির "ইয়াং ইটালি" অনুপ্রেরণায়। প্রথমবার গ্রেপ্তার হওয়ার আগে অবধি সাভারকর বাস্তবিকই সশস্ত্র বিপ্লবে আস্থা রেখেছিলেন - সেই আদর্শের ওপর ভিত্তি করেই অভিনব ভারতের সদস্যদের হাতে একাধিক ব্রিটিশ অফিসার খুনও হয়েছিলেন - ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে। ব্রিটিশ শাসন এবং ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রাম সম্পর্কে সাভারকরের মনোভাব সম্পূর্ণ বদলে যায় গ্রেপ্তারির পর, এবং আবারও ইতিহাস সাক্ষী - যে আরএসএস বা হিন্দু মহাসভা পরবর্তীকালে ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতার রাস্তাতেই হেঁটেছে। সাভারকরের তৈরী সেই অভিনব ভারত বন্ধ হয়ে যায় ১৯৫২ সালে। 

২০০৮ সালে, মালেগাঁও বিস্ফোরণের পর আউটলুকের ওই সাক্ষাৎকারে হিমানী জানান যে ১৯৫২ সালের আরো পঞ্চাশ বছরেরও কিছু পরে নতুনভাবে অভিনব ভারত শুরু করেছিলেন সমীর কুলকার্নি, আর তিনিই হিমানীকে অনুরোধ করেছিলেন সংগঠনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিতে - হিমানী সেই সময়ে ছিলেন হিন্দু মহাসভার সভাপতি। ২০০৮ সালে পুলিশের কাছে হিমানী জানান যে ওই বছরেরই এপ্রিল মাসে ভোপালে একটা মিটিঙে তাঁকে সংগঠনের সভাপতি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হিমানীর জবানবন্দী অনুযায়ী সমীর কুলকার্নি মূলতঃ মধ্যপ্রদেশেই ভিতরেই চেষ্টা করছিলেন অভিনব ভারতকে তৈরী করার। যে মিটিঙে তাঁকে সভাপতি স্থির করা হয়, সেই মিটিঙে উপস্থিত ছিলেন আরও কয়েকজন - স্বামী অমৃতানন্দ দেবতীর্থ (যাঁকে আরও অন্য কিছু নামে জানা যায় -  সুধাকর দ্বিবেদী, সুধাকর ধর, আর দয়ানন্দ পাণ্ডে যার মধ্যে অন্যতম, এবং হিমানী যাঁকে জম্মু কাশ্মীর শঙ্করাচার্য্য বলে ডাকতেন), সাধ্বী প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর, মেজর রমেশ উপাধ্যায়, সুধাকর চতুর্বেদী, এবং কর্ণেল শ্রীকান্ত প্রসাদ পুরোহিত - এই শেষের জনকে হিমানী অন্ততঃ দু বছর আগে থেকেই চিনতেন, পারিবারিক সম্পর্কের কারণে।

I know colonel Purohit personally, for over two years but our families have ties that go back a long time. But, he has never ever spoken to me about the Abhinav Bharat Trust – either that he founded it or about its work. Similarly, I do not know if he as involved with the Abhinav Bharat Sangathan in Madhya Pradesh.” [Interrogatories: 8, Malegaon Blast Documents]

তবে, মালেগাঁও বিস্ফোরণের অন্যান্য টেস্টিমোনিয়াল থেকে মনে হয়ে অভিনব ভারতের আসল সংগঠক ছিলেন শ্রীকান্ত পুরোহিত নিজেই। তিনিই ২০০৬ সালের জুন মাসে ষোলোজন লোককে নিয়ে রায়গড়ে ছত্রপতি শিবাজীর দূর্গে অভিনব ভারত ট্রাস্টের সূচনা করেছিলেন। পুলিশের জেরায় সেই ষোলোজনের একজন জানান - “We took the blessings of Shivaji Maharaj’s throne and decided to name the trust Abhinav Bharat and prayed for its success” [Interrogatories: 1, Malegaon Blast Documents]। এর পরের বৈঠক হয় ২০০৬ সালের ১৬ই ডিসেম্বর - যেদিন উপস্থিত সদস্যরা একসাথে বিজয়দিবস (বাংলাদেশ যুদ্ধে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের জয়) সেলিব্রেট করেন। যদিও, ট্রাস্টের প্রথম অফিশিয়াল মিটিং হয় ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, পুণের কারভে রোডের সন্ত কৃপা অ্যাপার্টমেন্টের এক ঠিকানায় - ট্রাস্টের অফিশিয়াল ঠিকানাও ছিলো এখানেই, ট্রাস্টের সদস্য এবং ট্রেজারার অজয় রাহিরকরের বাড়িতে। 

পরের মিটিং সম্ভবত হয় ২০০৭-এর জুন মাসে, নাসিকে, যেখানে পরশুরাম সাইখেদকর থিয়েটারে ট্রাস্টের উদ্বোধন হয়। কর্ণেল পুরোহিত মুম্বই থেকে বেশ কয়েকজন লোককে নিয়ে সেখানে গেছিলেন...গেছিলেন দেওলালি ক্যাম্পেও - যেখানে অমৃতানন্দ দেবতীর্থ তাঁর শিষ্যদের "দর্শন" দিচ্ছিলেন সেই সময়েই। পুরোহিতের সঙ্গে যাঁরা গিয়েছিলেন দেওলালিতে, তাঁদের একজন ১৪ই ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে পুলিশের কাছে জানান যে এই মিটিঙেই কর্ণেল পুরোহিত দেশের অবস্থা সম্পর্কে অনেক কথা বলেন - বলেন দেশে যা হচ্ছে তার অনেক কিছুই ভুল, এবং সেই ভুলগুলো শুধরোতে হবে - তার জন্যে একতা জরুরী। শঙ্করাচার্য্য, মানে অমৃতানন্দ বলেন - হিন্দু ধর্মকে রক্ষা করতে হবে, হিন্দু ধর্ম বিপদে (সেই বিখ্যাত "হিন্দু খতরে মে হ্যাঁয়") - আমাদের দায়িত্ব হিন্দুধর্মকে রক্ষা করা। সেই জন্যে দেশের সব হিন্দুকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে…শঙ্করাচার্য্যের বক্তৃতার সময়েই পুরোহিত টেবিলে নিজের ল্যাপটপ রেখে চালু করেন মিটিং রেকর্ড করার উদ্দেশ্যে। পুরোহিত নিজে জোরগলায় দাবী করেন যে মুসলমানদের সঙ্গে লড়াই করতে গেলে দরকারে বোমা বিস্ফোরণ অবধি যেতে হবে - যদিও কয়েকজন এই বক্তব্যের বিরোধিতা করেন। একজন সদস্য পুরোহিতকে বলেন এই ধরণের মিটিঙে যেখানে বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্ক হতে পারে, সেখানে বোমা ইত্যাদিতে উৎসাহী কাউকে না ডাকতে, এবং তিনি নিজে বোমা বিস্ফোরণ, দাঙ্গা বা অন্যান্য হিংসাত্মক পন্থার বিপক্ষে - অভিনব ভারত ট্রাস্ট সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন করার জন্যে তৈরী হয়নি, ইত্যাদি... [Interrogatories: 2, Malegaon Blast Documents]। 

সেই বছরেরই সেপ্টেম্বর মাসে দেওলালিতে আরও একটা বৈঠক বসে - আবারও মুম্বই থেকে আসা বেশ কিছু লোক, এবং কর্ণেল পুরোহিত ছিলেন সেখানে। এইবারে আরেকজন নতুন লোক ছিলেন - পূর্ব দিল্লীর সাংসদ, ভারতীয় জনতা পার্টির বিএল শর্মা। শর্মার সঙ্গে অমৃতানন্দর পরিচয় আগেই ছিলো - ২০০৪ সালে, নিজের লোকসভা কেন্দ্র ঘোরার সময়ে - সেই কেন্দ্রের কাশ্মীরি পণ্ডিত উদ্বাস্তুদের মধ্যে অমৃতানন্দ বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। ২৬শে ডিসেম্বর ২০০৮ তারিখে পুলিশের প্রশ্নের উত্তরে শর্মা জানান যে সেই মিটিঙে অমৃতানন্দ নিজের ল্যাপটপে ইসলামিক উগ্রপন্থীদের নানান ভয়ানক কাজের ভিডিও দেখিয়েছিলেন। ২০০৭ সালের নাসিকের বৈঠকে অমৃতানন্দই শর্মাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেদিন তিনি অখণ্ড ভারতের আইডিয়ার কথা বলেন - কীভাবে অভিনব ভারতের হাত ধরে ভারতবর্ষ হিন্দুরাষ্ট্র হয়ে উঠবে... 

"There he spoke about his idea of Akhand Bharat and of making India a Hindu Rashtra and he also talked about the Abhinav Bharat organisation. He told us that Prasad Purohit was trying to achieve Akhand Bharat through his Abhinav Bharat organisation. We were told that Sudhakar Chaturvedi was working full-time for the organisation. Our meeting lasted one hour during which we discussed the rape of Hindu women in J and K, their murder, etc…. I returned to Delhi after the meeting [Interrogatories: 6, Malegaon Blast Documents].

পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, মালেগাঁও বিস্ফোরণের গোটা ছক এবং তার খুঁটিনাটি  তৈরী হয়েছিলো ২০০৮ সালে হওয়া চারটে মিটিঙে [Chargesheets and Miscellaneous Documents – Malegaon Case: 61]। 

২০০৮ সালের ২৫-২৭শে জানুয়ারি প্রথম মিটিঙে কর্ণেল পুরোহিত, মেজর উপাধ্যায়, সমীর কুলকার্নি, সুধাকর চতুর্বেদী এবং অমৃতানন্দ দেবতীর্থ দেখা করেন ফরিদাবাদে "সেভ আওয়ার সোল" সংস্থার এক বাড়িতে যেখানে অমৃতানন্দ সেই সময়ে থাকতেন। এই মিটিঙের একটা বড় অংশ ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিকাল উইকলির ওয়েবসাইটে পাওয়া যায় - ক্রিস্টফ জাফ্রেলোর আর্টিকলের সাথে। পুলিশ তদন্তের সময়ে অমৃতানন্দের রেকর্ড করা এই মিটিঙের পুরো ভিডিও খুঁজে পেয়েছিলো - সেই ভিডিও থেকে জানা যায় যে আরও তিনজন ব্যক্তি এই মিটিঙে উপস্থিত ছিলেন - সাংসদ বিএল শর্মা, অ্যাপোলো হাসপাতালের ডঃ আরপি সিং, আর কর্ণেল আদিত্য ধর। ফরিদাবাদের এই মিটিঙে আরপি সিং গল্পচ্ছলে বলেছিলেন যে তিনি কীভাবে মকবুল ফিদা হুসেনের নামে মামলা করেছিলেন, এমনকি জামিয়া মিলিয়ায় এক অনুষ্ঠানে যেখানে হুসেনের বক্তৃতা দেওয়ার কথা ছিলো, সেখানেও উনি পৌঁছে গেছিলেন ১৫ লিটার পেট্রল নিয়ে - হুসেনকে আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে - যদিও সুযোগ পাননি, কারণ অসুস্থতার কারণে হুসেন সেই অনুষ্ঠানে যাননি...

এপ্রিলের ১১-১২ তারিখে এঁরাই (মানে, মূল পাঁচজন - পুরোহিত, উপাধ্যায়, কুলকার্নি, চতুর্বেদী আর অমৃতানন্দ) ভোপালে দেখা করেন প্রজ্ঞা সিং ঠাকুরের সঙ্গে, এবং মালেগাঁওয়ের কোনও একটা জনবহুল এলাকায় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মুসলমানদের ওপর বদলা নেওয়ার কথা স্থির করেন। পুরোহিত দায়িত্ব নেন বিস্ফোরক যোগাড়ের, প্রজ্ঞা সিং ঠাকুর দায়িত্ব নেন বিস্ফোরণ ঘটানোর লোক যোগান দেওয়ার...এবং এই মিটিঙে উপস্থিত প্রত্যেকে একযোগে এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন। পুলিশ এও প্রমাণ করেছিলো যে বিস্ফোরণে মূল অভিযুক্তরা ছাড়া অন্য কয়েকজনও এই মিটিঙে ছিলেন - এমনকি হিমানী সাভারকরও - তাঁর নিজের জবানবন্দী অনুযায়ীই।

এরপর, ১১ই জুনের পরবর্তী মিটিঙে সাধ্বী প্রজ্ঞা তাঁর সঙ্গে আনেন আরও দুজন লোককে - রামচন্দ্র কালসাংরা, আর সন্দীপ ডাঙ্গে - বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা যারা মালেগাঁওয়ে বোমা রাখার আসল কাজটা করবে - এইভাবেই এদের পরিচয় করিয়ে দেন অমৃতানন্দের সঙ্গে [Chargesheets and Miscellaneous Documents – Malegaon Case: 65]।

৩রা আগস্ট উজ্জয়িনীর মহাকালেশ্বর মন্দিরের ধর্মশালায় হওয়া এক মিটিঙে কর্ণেল পুরোহিতকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কালসাংরা আর ডাঙ্গের জন্যে আরডিএক্স যোগাড় করার। পুরোহিতের নির্দেশে তাঁর সহযোগী রাকেশ ধাওরে (পুরোহিতের ভাষায় “a trained expert in committing explosions and assembling improvised explosive devices”),  আগস্টের ৯/১০ তারিখে পুণেতে কালসাংরা আর ডাঙ্গের সঙ্গে দেখা করে তাদের হাতে বিস্ফোরক তুলে দেন [Chargesheets and Miscellaneous Documents – Malegaon Case: 66]।

শুরু হয় চূড়ান্ত প্রস্তুতি - যার ফল মালেগাঁও বিস্ফোরণ, এবং সেই বিস্ফোরণের তদন্তের সময়েই প্রথম সামনে আসে স্যাফ্রন টেরর বা হিন্দু উগ্রপন্থার কথা।

এরপর বিভিন্ন চরিত্রগুলোর সাথে পরিচয় করাবো একে একে, আর দেখাবো এর আগে বার দুয়েক হাইলাইট করে দেওয়া জাতিগত পরিচয়ের রেফারেন্স কেন আর কতটা জরুরী।

#ShadowArmiesOfHindutva

(১) Shadow Armies - Fringe Organisations and Foot Soldiers of Hindutva, Dhirendra Kr. Jha
(২) Abhinav Bharat, the Malegao Blast and Hindu Nationalism: Resisting and Emulating Islamist Terrorism, Christophe Jaffrelot, Economic & Political Weekly, Vol. 45, Issue No. 36, 04 Sep, 2010
(৩) Chargesheets and Miscellaneous Documents regarding the Malegaon Case