Wednesday, March 25, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: রক্তক্ষয়ের শুরু

এই পর্ব শুরু করার আগে একটা কথা স্পষ্ট করে বলে নেওয়া ভালো। প্যালেস্টাইনে আরব এবং ইহুদীদের সম্পর্ক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কয়েক বছর আগে অবধিও এত জটিল ছিল না। বরং বিংশ শতকের গোড়া অবধি আরব মুসলমান এবং প্যালেস্তিনীয় ইহুদীরা পাশাপাশিই ঘর বেঁধে থেকেছে, তাদের মধ্যে ধর্মীয় আদানপ্রদানও চালু প্র্যাকটিস ছিল। যে নবী মুসা উৎসবের কথা বলে এই রক্তক্ষয়ের পর্ব শুরু করব, সেই নবী মুসা উৎসব বিশ্বযুদ্ধের আগে অবধি সকলে একসঙ্গেই পালন করেছে, বস্তুতঃ ক্রিশ্চান ইস্টার উৎসবের সঙ্গে মিশে গিয়ে। ইহুদী এলাকায় ইহুদীদের পুরিম উৎসব একসঙ্গে পালন করত ক্রিশ্চান আর মুসলমান তরুণরাও - অটোমান নাগরিক হিসেবে। গোটা ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় চলতি প্র্যাকটিস এরকমই সিঙ্ক্রেটাইজেশনের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়েছিল। সব বদলাতে শুরু করে জায়নিস্ট ধ্যানধারণার প্রচলনের সময় থেকে। ইউরোপীয় নেশন স্টেটের ধাঁচে কোন এক বহু প্রাচীন ঐতিহাসিক সময়কে সামনে রেখে জায়নিস্টরা প্যালেস্টাইনেই নিজেদের নেশন স্টেট তৈরীর দাবী তোলে, এবং বিভিন্ন কলোনিয়াল শক্তির প্রশ্রয়ে জায়নিস্টদের কাজকর্মের (সংগঠিত অভিবাসন, ঢালাও জমি কিনে আরবদের বাস্তুচ্যুত করা, রাজনৈতিক উত্থান এবং আরবদের প্রতিস্থাপিত করে ইহুদী নেশন স্টেট তৈরীর প্রকাশ্য ঘোষণা) ফলে আগের সহাবস্থান বদলে যায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে চরম চাপা উত্তেজনায়। তারপরের ঘটনা লিখব এবারে...

[সোনালি অতীতকে সামনে রেখে সঙ্কীর্ণ ধর্মীয় চিন্তাধারার ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদের উত্থানের গল্পটা ভারতেও খানিকটা একই ধাঁচের। আশা করি এই সিমিলারিটিগুলো সকলে খেয়াল করতে পারছেন।] 

(৬) রক্তক্ষয়ের শুরুর দিনগুলোঃ ১৯২০ – ১৯৩৫

ব্রিটিশ ম্যান্ডেটের এক বছরও হয়নি তখনো - প্যালেস্টাইনে প্রথমবার রক্ত ঝরতে শুরু করে ১৯২০ সালের এপ্রিলে, জেরুজালেমে নবী মুসা উৎসবের দিন। আরবদের জমায়েতে স্বাধীন প্যালেস্টাইনের স্লোগান ওঠে, ভিড়ের সঙ্গে আচমকাই ইহুদী পথচারীদের হাতাহাতি শুরু হয়। ছোটখাটো একটা ব্রিটিশ গ্যারিসন - লোকের অভাবে বা সাহসের অভাবে - বেকুবের মত দাঁড়িয়ে থাকে। গণ্ডগোলের শেষে দেখা যায় পাঁচজন ইহুদীর মৃত্যু হয়েছে, দুশোর ওপর লোক আহত। আকস্মিক এই হিংসার ঘটনায় স্তম্ভিত দুই সম্প্রদায়ই বুঝতে পারে ম্যান্ডেটের মধ্যে দিয়ে শান্তি ও স্বাধীনতা আসবে, এমন আশা দুরাশা মাত্র।

জায়নিস্ট নেতৃত্বের কাছে একটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়ে যায় - আরবরা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের জমির ওপর জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম তৈরীর সিদ্ধান্ত মেনে নেবে না। তারা নিজেদের পালটা জঙ্গি সংগঠন আর সামরিক প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা তৈরী করতে শুরু করে। সেই বছরই, জুন মাসে, তৈরী হয় হাগানাহ্‌, জিউয়িশ আন্ডারগ্রাউন্ড ডিফেন্স ফোর্স - যারা গোপনে সামরিক মহড়া আর চোরাই অস্ত্র যোগাড় করে পরের সংঘাতের জন্যে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে।

আরবদের কাছে জেরুজালেমের ঘটনা একটা ওয়ার্নিং হয়ে দাঁড়ায়। আরব স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সত্ত্বেও ব্রিটিশ সরকার হাজারে হাজারে ইহুদী অভিবাসীকে প্যালেস্টাইনে এসে আরব জমিতে বসতি বানাতে দেওয়া, এবং যে কোনও প্রতিবাদের শাস্তি হিসেবে আরবদের জেল বা সমষ্টিগতভাবে জরিমানার সম্মুখীন হতে হওয়ার ফলে নড়বড়ে বিশ্বাসের ভিতে আরও চওড়া ফাটল দেখা দেয়।

এর পরের ঘটনা ঘটে বছরখানেক পরে, ১৯২১ সালের মে মাসে, জাফায়। জায়নিস্ট সোশ্যালিস্টদের এক প্যারেড থেকে রাস্তায় হাতাহাতি শুরু হয়, সেখান থেকে পুরোদমে দাঙ্গা। ক্ষিপ্ত আরব জনতা ইহুদীদের বাড়িঘর আর দোকানের ওপর হামলা করে, ইহুদী প্যারামিলিটারি বাহিনী পালটা হামলা চালায়। ব্রিটিশ বাহিনী যতক্ষণে মাঠে নামে, ততক্ষণে প্রাণ গেছে সাতচল্লিশজন ইহুদীর আর প্রায় সমসংখ্যক আরবের, আহত কয়েকশো মানুষ। আর এই গণ্ডগোল ক্রমশঃ ছড়িয়ে যায় আরও দূরে, পেতাহ্‌ টিকভা, রিহোভেত, এমনকি জেরুজালেমের আশেপাশেও।

১৯২১ সালের এই দাঙ্গার পর ব্রিটিশরা প্রথমবার একটা অফিশিয়াল অনুসন্ধান কমিটি তৈরী করে প্যালেস্টাইনের চিফ জাস্টিস স্যার থমাস হেক্রাফটের নেতৃত্বে। কমিশনের রিপোর্টে ইহুদী অভিবাসন এবং জমি কেনাবেচা নিয়ে আরবদের ভয়ভীতির কথা তুলে ধরা হয়, বলা হয় বিধিনিষেধ আরোপ করার কথাও। ব্রিটিশ সরকার কমিশনের রিপোর্ট ধামাচাপা দিয়ে একটা হোয়াইট পেপার প্রকাশ করে ব্যালফার ডিক্লারেশনের প্রতি নিজেদের দায়বদ্ধতার কথা আবার একবার ঘোষণা করে। তার সঙ্গে বলে যে ইহুদী অভিবাসনের সংখ্যা নির্ভর করবে সেই দেশের অভিবাসীদের গ্রহণ করার অর্থনৈতিক ক্ষমতার ওপর। ইহুদী আর আরব - দুই পক্ষই এতে অখুশী থেকে যায়।

বিপর্যয় আসে ১৯২৯ সালে।

ওই বছর, আগস্ট মাসে, একটা আপাততুচ্ছ বিষয় নিয়ে এত দিনের চাপা উত্তেজনা ফেটে বেরোয় - জেরুজালেমের ওয়েস্টার্ন ওয়াল বা পশ্চিম প্রাচীরের অধিকার নিয়ে। আরব মুসলমানদের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল যে ওই প্রাচীর আসলে পবিত্র হারাম-আল-শরিফ চত্বরের অংশবিশেষ। ইহুদীদের দাবী দেওয়ালটা তাদের পবিত্রতম প্রার্থনাস্থল। জায়নিস্টরা দেওয়ালের সামনে বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে জড়ো হয়ে তাদের পতাকা তুলে ইহুদী জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিতে থাকে। মুসলিম ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ সেটাকে উস্কানি হিসেবে দেখে। অথচ বিশ্বযুদ্ধের আগে অবধিও ওই প্রাচীরের পাশে উভয় সম্প্রদায়ই বিনা ঝঞ্ঝাটে উপাসনা করত...

২৩শে আগস্ট ব্যাপক গণ্ডগোল শুরু হয়। প্রথমে গুজব ছড়ায় যে জায়নিস্টরা আল আক্‌সা মসজিদ আক্রমণ করেছে। লাঠি আর ছুরি হাতে আরব গ্রামবাসীরা দলে দলে বেরিয়ে পড়ে রওনা দেয় জেরুজালেমের পথে। পরের গোটা সপ্তাহ জুড়ে চরম দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। হেব্রনে দাঙ্গায় মারা যায় ৬৭ জন ইহুদী - পুরুষ, নারী, শিশু। বেঁচে যায় তারা যাদের আরব প্রতিবেশীরা নিজদের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছিল। সাফেদে আরেক সংগঠিত হত্যাকাণ্ডে মারা যায় আরও জনা কুড়ি ইহুদী। সব মিলিয়ে, ওই এক সপ্তাহে ইহুদীদের মধ্যে নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৩, আহত শতাধিক। উল্টোদিকে, ব্রিটিশ সুরক্ষা বাহিনী আর ইহুদী মিলিশিয়ার হাতে মারা যায় ১১৬ জন আরব, আহত হয় শতাধিক বা আরও বেশি। সাধারণভাবে, ব্রিটিশ সুরক্ষা বাহিনী পরিস্থিতির সামাল দিতে হিমশিম খেয়ে যায়। আর কোথাও কোথাও বেবাক দাঁড়িয়ে তাদের চোখের সামনেই নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চলতে দেয়।

স্যার ওয়াল্টার শ-য়ের নেতৃত্বে শ কমিশন আসে ঘটনার তদন্ত করতে। এবং এই কমিশনের দেওয়া রিপোর্টকে বলা যায় এই সময়ের একটা ল্যান্ডমার্ক রিপোর্ট। রিপোর্টে লেখা হয় যে পশ্চিম দেওয়াল নিয়ে বিতর্ক আদৌ এই পুরো ঘটনার মূল কারণ নয়। বরং ম্যান্ডেট শুরু হওয়ার দিন থেকে আরবদের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে, সেই সম্পর্কে তাদের মনোভাবকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে। রিপোর্টে এও লেখা হয় যে ব্রিটিশ সরকারের উচিত পাবলিক স্টেটমেন্ট দিয়ে ম্যান্ডেটের রক্ষক হিসেবে দুই সম্প্রদায়ের প্রতিই তাদের দায়বদ্ধতা আবার করে ব্যক্ত করা, এবং পাশাপাশি নির্বিচারে ইহুদী অভিবাসন এবং জমি কেনার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা। এই রিপোর্টের এক বছরের মধ্যেই, ১৯৩০ সালের হোপ সিম্পসন রিপোর্ট জানায় যে আরব অধিবাসীদের উচ্ছেদ না করে ইহুদী বসতি তৈরীর মত সারপ্লাস জমি প্যালেস্টাইনে নেই।

এক মুহূর্তের জন্যে প্যালেস্তিনীয়রা ভেবেছিল যে ব্রিটিশ সরকার হয়ত তাদের মনোভাব বদলাচ্ছে। ১৯৩০ সালের পাসফিল্ড হোয়াইট পেপার, শ কমিশন আর হোপ কমিশনের রেকমেন্ডেশনগুলোকে অনুমোদন জানিয়ে অভিবাসনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধের প্রস্তাব করে। এবং প্রত্যাশিতভাবেই জায়নিস্টদের দিক থেকে জোরালো রিয়্যাকশন উঠে আসে। জিউয়িশ এজেন্সির নেতা, ওয়াইৎজম্যান, ব্রিটেনের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছেদ করার হুমকি দেন। চরম চাপের মুখে, ১৯৩১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র‍্যামসে ম্যাকডোনাল্ড একটা চিঠি লেখেন, যাতে পাসফিল্ড হোয়াইট পেপারকে বাতিল করা হয়, এবং বলা হয় ইহুদী অভিবাসন এবং জমি কেনা অব্যাহত থাকবে, ব্রিটিশদের তরফে কোনোরকম বাধা দেওয়া হবে না। "কালো চিঠি" বা "ব্ল্যাক লেটার" বলে এই চিঠি প্যালেস্তিনীয়দের মধ্যে কুখ্যাত হয়ে রয়েছে - ব্রিটিশ সরকার যে প্রতিবারই জায়নিস্ট চাপের মুখে নতিস্বীকার করবে, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হিসেবে।

এরকম সময়েই উঠে আসেন ইযয আদ-দিন আল কাসাম। ১৯২৯ সালের পর থেকেই প্যালেস্টাইনে শুরু হয়েছিল সংগঠিত সশস্ত্র প্রতিরোধ। তার মধ্যেই, জন্মসূত্রে সিরিয়ার মানুষ, এক ধর্মগুরু, হাইফা বাসিন্দা শেইখ আল কাসাম, শহুরে প্যালেস্তিনীয় সিভিল সোসাইটি আর আরব রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর ভরসা না করে, গরীব বঞ্চিত আরব, বিশেষ করে যারা ইহুদীদের হাতে জমি বা রুজিরুটি হারিয়েছে বা বাস্তুচ্যুত হয়েছে, তাদের নিয়ে গোপনে ছোট ছোট সংগঠন তৈরী করছিলেন। কাসামের বার্তা ছিল উপনিবেশ বিরোধিতা আর ইসলামের এক মিশেল, যার মাধ্যমে তিনি প্যালেস্টাইনকে দখলমুক্ত করার জন্যে সশস্ত্র জিহাদের ডাক দিয়েছিলেন। ১৯৩০ সালের মাঝামাঝি কাসাম একটা ছোট গেরিলা সংগঠন তৈরী করে ইহুদী বসতি আর ব্রিটিশ ছাউনির ওপর ক্রমাগত অতর্কিত আক্রমণ শুরু করেন। ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স শত চেষ্টা করেও বহুদিন আল-কাফ আল-আসওয়াদ (বা "ব্ল্যাক হ্যান্ড") নামের এই বাহিনীর নাগাল পায়নি। শেষ অবধি, ১৯৩০ সালের ২০শে নভেম্বর, জেনিনের অদূরে গুহায় লুকিয়ে থাকা কাসাম ও তাঁর বাহিনীকে ঘিরে ফেলে ব্রিটিশ পুলিশ। গুলির লড়াইয়ে কাসাম নিহত হ'ন। হাইফায় কাসামের শেষকৃত্যের মিছিলে জড়ো হয়েছিল হাজারে হাজারে মানুষ - নিমেষেই শহীদের মর্যাদা পেয়ে যান কাসাম। কাসামের বিদ্রোহ আর শাহাদাত নিয়ে লেখা হয় গান - সেই গান ছড়িয়ে পড়ে গোটা প্যালেস্টাইনে। চলতে থাকা জমি দখলে ক্ষুব্ধ সেই সময়ের তরুণ প্রজন্ম, যারা ক্রমশঃ পুরনো নেতৃত্বের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছিল, তাদের সামনে কাসাম হয়ে ওঠেন প্রতিরোধের আদর্শ।

এই সময়টা জুড়ে, র‍্যাডিকালাইজেশনের দিক থেকে ইহুদীরাও কোনো অংশে পিছিয়ে ছিল না। ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে হাগানাহ্‌ ক্রমশঃ কলেবরে বেড়ে উঠেছিল। গোপনে অস্ত্র আমদানি চলেছিল পুরো দমে। যেমন, আল কাসামের মৃত্যুর মাসখানেক আগেই জাফা বন্দরে হাগানাহ্‌র জন্যে চালানে আসা জাহাজভর্তি অস্ত্র আবিষ্কারের পর আরব জনমত আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। হাগানাহ্‌র পাশাপাশি তৈরী হয়েছিল আরও বেশ কয়েকটা জঙ্গি সংগঠন। ১৯৩১ সালে হাগানাহ্‌ থেকে একটা অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে তৈরী করে ইরগুন (পুরো নাম Irgun Tzvai Leumi অথবা National Military Organization) – যারা হাগানাহ্‌র প্রতিরোধের নীতির বদলে সরাসরি প্রতিআক্রমণের কথা বলতে শুরু করে। "শক্তির মাধ্যমেই শত্রুকে ইহুদী জাতীয় ভূমি থেকে বিতারণ করা সম্ভব" – এই হয়ে ওঠে তাদের স্লোগান। ইরগুন তাদের নিজস্ব জঙ্গি কাজকর্ম চালাতে থাকে - রাস্তাঘাটে, বাসে, দোকানবাজারে আরব জনতার ভিড়ের মধ্যে বোমা ছোঁড়া থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিকদের টার্গেট করে হত্যা, ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া - সবই চলতে থাকে নির্বিচারে। আক্রমণ, প্রতিরোধ, পালটা আক্রমণ - রক্তের সাইক্ল চলতেই থাকে, এবং পুরো সময়টা জুড়েই লোকের অভাবে ভোগা ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বিশেষ কিছুই করে উঠতে পারেনি।

১৯৩৫ সাল নাগাদ, আরব এবং ইহুদী, দুই সম্প্রদায়ই পুরোদস্তুর সশস্ত্র অবস্থায় সহিংস জঙ্গি কার্যকলাপে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতা করার জন্যে তৈরী ব্রিটিশ ম্যান্ডেটই হয়ে ওঠে যুদ্ধের ময়দান।

আর, এর কয়েক মাসের মধ্যেই ছোট্ট একটা স্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে ১৯৩৬ সালের আরব মহাবিদ্রোহ...

ছবিতে: (উপরে) আরব প্রতিবাদের ওপর ব্রিটিশ পুলিশের আক্রমণ, (নীচে) জেরুজালেমের পশ্চিম প্রাচীরে নিশ্চিন্তে প্রার্থনারত প্যালেস্তিনীয় ইহুদী বাসিন্দাদের ভিড়

Monday, March 23, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: ম্যান্ডেট প্যালেস্টাইন

(৫) প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটঃ কলোনিয়ালিজমের মুখোশ আর জমির অঙ্ক

১৯২২ সালের জুলাই মাসে লীগ অফ নেশন্স প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটকে মান্যতা দেয়। ব্রিটিশ ম্যান্ডেটরি শক্তির হাত ধরেই "নেটিভরা" একদিন নিজেরাই নিজেদের শাসন করতে শিখবে - বাকি পৃথিবীর সামনে এই বলে ম্যান্ডেটকে সভ্যতার পবিত্র আমানত হিসেবে দেখানো হলেও, প্যালেস্টিনীয়দের কাছে এটা ছিল তার ঠিক উলটো। একদম উলটো।

ম্যান্ডেটটা ঠিক কাদের জন্যে ছিল এইটা বুঝতে চাইলে ম্যান্ডেটের শর্তগুলো একবার দেখে নিতে হবে। অনুচ্ছেদ দুইয়ে বলা হয় যে ব্রিটেনের হাতেই দায়িত্ব থাকবে ইহুদীদের জন্যে ন্যাশনাল হোম তৈরীর (“ securing the establishment of the Jewish national home") আর চার নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয় যে একটা ইহুদী সংস্থাকে (এজেন্সি) পাবলিক বডি হিসেবে তৈরী করে বিশেষ স্বীকৃতি দিয়ে তাদের হাতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হবে। জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম আর জিউয়িশ এজেন্সি নিয়ে এত কিছু বলা হলেও নেটিভ আরবদের কোনও এজেন্সি সম্পর্কে ম্যান্ডেট ছিল নীরব। নেটিভদের পরামর্শ আবার শোনার কী আছে - এই হয়তো ছিল মনোভাব। ফাইনালি, ছয় নম্বর অনুচ্ছেদে ব্রিটিশদের হাতে দায়িত্ব দেওয়া হয় যাতে তারা উপযুক্ত শর্ত অনুযায়ী ইহুদী অভিবাসন সুনিশ্চিত করে আর প্যালেস্টাইনের জমিতে ইহুদী বসতি স্থাপনে উৎসাহ দেয়।

আরবদের অভিবাসন বা বসতি নিয়ে ম্যান্ডেটে একটা শব্দও ছিল না। আরব স্বকীয়তাকে স্বীকৃতি দেওয়া নিয়ে একটা অনুচ্ছেদও লেখা হয়নি ম্যান্ডেটে। সবদিক থেকেই এই ম্যান্ডেটের মাধ্যমে সাংবিধানিকভাবে ব্যালফার ডিক্লারেশনকে বাস্তবায়িত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ সরকারকে। ১৯১৭ সালের চিঠিটা বদলে গেছিল আন্তর্জাতিক আইনে।

প্যালেস্টাইনে বসবাসকারী প্রায় ৯০ শতাংশ আরব জনজাতির মানুষ (কলোনিয়ালিজমের ভাষায় নেটিভ) ম্যান্ডেটকে আমানত হিসেবে দেখে উঠতে পারেনি। তাদের কাছে এই ম্যান্ডেট ছিল একটা শাস্তি। প্যালেস্টিনীয়দের ক্রমশঃ কমতে থাকা অধিকার এই ম্যান্ডেটের মধ্যে দিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক আর আইনী রূপ নিতে শুরু করেছিল। কার্টেসি, ব্রিটেন। এবং, কার্টেসি ঠুঁটো জগন্নাথ লীগ অফ নেশন্স।

কীভাবে?

প্রথমতঃ, ১৯২১ থেকে ১৯২৫ সালের মধ্যে জমির রেজিস্ট্রেশনের বদল। অটোমান আমলে, বেশিরভাগ জমির মালিকানা ছিল হয় রাষ্ট্রের হাতে (মিরি), অথবা ব্যক্তির হাতে (মুল্ক) আর নয়তো ধর্মীয় অনুদানের ওপর (ওয়াকফ)। ব্রিটিশরা একটা নতুন রেজিস্ট্রেশন পদ্ধতি আনে যেখানে জমির মালিকানার প্রক্রিয়া অনেক সহজ হয়ে ওঠার পাশাপাশি জমির হাতবদলও খুব সোজা হয়ে দাঁড়ায়। আরব অধিবাসীদের বেশিরভাগই সেই সময়ে তৃতীয় বিশ্বের বাকি দেশগুলোর মতই নিরক্ষর - কাজেই না আইনকানুন না বুঝেই সেই সময়ে অনেকেই জমির রেজিস্ট্রেশন করেনি। এছাড়া, খরচ আর অবিশ্বাসও বড় কারণ ছিল। এই আইনে আনরেজিস্টার্ড জমি রাষ্ট্রের হাতে চলে যেত, এবং রাষ্ট্র সেই জমি বিক্রি করে দিত। রাষ্ট্র তখন ব্রিটিশের, তাদের ওপর জিউয়িশ হোমল্যান্ড তৈরীর বড় দায়িত্ব, কাজেই বুঝতেই পারছেন এই জমিগুলো কাদের হাতে চলে যেত...

দ্বিতীয়তঃ, ১৯২৫ সালের নাগরিকত্ব আইন। এই আইন অনুযায়ী, প্যালেস্টাইনে বসবাসকারী আরবদের নাগরিকত্ব দেওয়া হলেও, সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। ইহুদী অভিবাসীদের জন্যে নাগরিকত্ব লাভের প্রক্রিয়া ছিল অনেক সহজ—মাত্র দুই বছর বসবাস করলেই তারা নাগরিক হতে পারত। অথচ, যেসব আরব অটোমান আমলে প্যালেস্টাইন ছেড়ে প্রতিবেশী দেশে গিয়েছিলেন, তারা ফিরে এসেও সহজে নাগরিকত্ব পেতেন না, কারণ যুদ্ধের বাজারে অটোমান আমলের দলিলপত্র দেখানো সকলের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে, রাজনৈতিক অধিকারের মাঠটা প্রথম থেকেই ছিল অসম। এই ব্যাপারটা আপনাদের বেশ চেনা ঠেকলেও ঠেকতে পারে, এনআরসি আর এসআইআরের বাজারে...

তৃতীয়তঃ, জিউয়িশ এজেন্সির বিশেষ মর্যাদা বা প্রিভিলেজড স্টেটাস। ম্যান্ডেট অনুযায়ী এই জিউয়িশ এজেন্সি তাদের বিশেষ প্রিভিলেজড অবস্থান অনুযায়ী দেশের প্রশাসনে অংশগ্রহণ করার ক্ষমতা পেয়ে গেছিল। আরবদের এরকম কোনও এজেন্সিও ছিল না, কোনও ক্ষমতাও ছিল না। কাগজে কলমে ক্ষমতা ব্রিটিশদের হাতে থাকলেও, এই জিউয়িশ এজেন্সি নির্বিচারে ভূমি অধিগ্রহণ, অভিবাসনের সার্টিফিকেট দেওয়া, বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রকল্পের মত ব্যাপারগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারত ম্যান্ডেট অনুযায়ী। সরকারের মধ্যে আরেকটা সরকার বলা যায়; বলা যায় ইহুদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি পর্ব।

এই পুরো সময়ে বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল জমির অধিকার। জায়নিস্টদের কাছে জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম তৈরীর প্রথম ধাপ ছিল জমির দখল নেওয়া। আর প্যালেস্তিনীয়দের কাছে, এক একটা জমি বিক্রি বা বেদখল হওয়া মানে ছিল পৈতৃক ভিটে হারানো, বা বাস্তুচ্যুত হওয়া - ফলত: তাদের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের সংকোচন। ১৯২০ থেকে ১৯৪৮ সালের মধ্যে প্যালেস্টাইনে ইহুদীদের হাতে থাকা জমির পরিমাণ ২-৩% থেকে বেড়ে হয়ে দাঁড়ায় ৬-৭%, আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল (যেটা পরিসংখ্যানের নীচে প্রায়শই চাপা পড়ে যায়) - জমির দখল নেওয়ার সময় ইহুদীদের চোখ ছিল প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর এবং চাষযোগ্য জমিগুলোকে তাদের আওতায় আনা - যেমন উপকুলের সমতল এলাকা, জেজরিল উপত্যকা, বা উত্তর গ্যালিলি - যে জমিগুলোতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আরব বর্গাদারেরা চাষ করে এসেছিল...

এর মধ্যেও, বিশের দশকে, বেইরুটে বসবাসকারী গ্রীক অর্থোডক্স জমিদার Sursock পরিবারের জমি হস্তান্তরের গল্পটা সবচেয়ে প্যাথেটিক। এই পরিবার জেজরিল উপত্যকা অঞ্চলের প্রায় ৮০০০০ একর জমি বিক্রি করে দেন জিউয়িশ ন্যাশনাল ফান্ডকে, প্রায় সারে সাত লক্ষ পাউন্ডের বিনিময়ে। এই জমিতে বছরের পর বছর ধরে কাজ করে আসা হাজারো বর্গাদারকে নিমেষের মধ্যে উচ্ছেদ করা হয়। এবং, ম্যান্ডেট অনুযায়ী জিউয়িশ ন্যাশনাল হোম তৈরীর কাজে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়ায় ব্রিটিশ সরকার প্র্যাক্টিকালি কোনোরকমের সুরক্ষার ব্যবস্থা করেনি...এক ব্রিটিশ সরকারি কর্মচারীর ভাষায়ঃ “The evicted tenants, who had cultivated the land for generations, were turned out without compensation. Many of them became homeless, and the villages they had built up were demolished.” 

উচ্ছেদ হওয়া চাষিরা দলে দলে ভিড় জমায় হাইফা আর জাফায়, চাষ ছেড়ে দিনমজুরির কাজে, কলেবরে বেরে ওঠে ওই অঞ্চলের বস্তিগুলোর চেহারা, এবং সেখানকার মানুষের মনে জমতে থাকা রাগ...১৯৩৬ সালে যার বিস্ফোরণ ঘটে।

১৯৩৬-৩৯ সালের বিদ্রোহ দমন করার পর, ব্রিটিশ সরকার ১৯৩৯ সালের মে মাসে হোয়াইট পেপার প্রকাশ করে, যেখানে ইহুদী অভিবাসন ও জমি বিক্রির ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়। তারপর, ১৯৪০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জারি করা হয় ল্যান্ড ট্রান্সফার রেগুলেশনস। এই রেগুলেশন অনুযায়ী প্যালেস্টাইনকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়ঃ জোন এ - যেখানে ইহুদীদের কোনও জমি বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়, জোন বি - নিয়ন্ত্রণাধীন জমি বিক্রি, এবং জোন সি - যেখানে বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা নেই। জোন এ ছিল মূলতঃ প্যালেস্টাইনের পার্বত্য হার্টল্যান্ড, যেখানে আরব জনগোষ্ঠীর ঘনত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। জোন সি অর্থাৎ জেজরিল উপত্যকা, বা উপকুলের সমভূমি অঞ্চল আর গ্যালিলি - সেখানে ইহুদী বসতি ততদিনে তৈরী হয়ে গেছে। আরব বিদ্রোহে খানিক ধাক্কা খেয়ে ব্রিটিশ সরকার এই সময়ে চেষ্টা করে ইহুদী আধিপত্য থাকা অঞ্চলের মধ্যেই আরও সম্প্রসারণের। জায়নিস্টরা প্রবলভাবে এই বিধির বিরোধিতা শুরু করে (খানিক ভায়োলেন্ট বিরোধিতাও ছিল এর মধ্যে)। আরবরা এই বিধি মেনে নিলেও তারা জানত যে ততদিনে অনেকটাই দেরী হয়ে গেছে, প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর মূল্যবান জমি ততদিনে ইহুদীদের হাতেই চলে গেছে...

১৯২২ সালের প্রথম সেন্সাস অনুযায়ী প্যালেস্টাইনে ইহুদী বসবাসকারীর সংখ্যা ছিল ৮৩,৭৯০ (১১%)। সেই সংখ্যা ক্রমশঃ বাড়তে বাড়তে ১৯৩১ সালে হয় ১,৭৪,৬১০ (১৭%), ১৯৩৬ সালে প্রায় চার লক্ষ (৩৩%), এবং ১৯৪৭ সালে ছয় লক্ষেরও বেশি (৩৩%)। শতাংশের হিসেবে ৩৩% সংখ্যাটা স্থির থাকলেও, বাস্তবতা ছিল ভয়াবহ। ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে ইহুদী জনসংখ্যা বেড়েছিল আড়াই লাখের বেশি, অর্থাৎ, প্রায় ৬০ শতাংশ। আরব জনসংখ্যাও বেড়েছিল প্রায় সাড়ে চার লাখ - স্বাভাবিক জন্মহার আর প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা অভিবাসনের ফলে। ফলে, শতাংশের হিসেবে ইহুদীরা এক-তৃতীয়াংশেই থেকে গেলেও, নিরঙ্কুশ সংখ্যায় তাদের উপস্থিতি ছিল আগের চেয়ে অনেক বেশি ঘন, আর তাদের বসতি ছিল প্যালেস্টাইনের সবচেয়ে উর্বর ভূমিতে।

১৯৩১ থেকে ১৯৩৬ এর মধ্যে ইউরোপে নাৎসী আমলে ইহুদীর ওপর চরম অত্যাচার শুরু হওয়ার ফলে ইহুদী অভিবাসন বেড়ে ওঠে। আরবরা এই আচমকা জনস্রোতে আতঙ্কিত হয়ে দেখে যে তাদেরই চাষআবাদের জমির ওপর গড়ে উঠছে নতুন নতুন বসতি। শহরাঞ্চলে কলেকারখানার দিনমজুরির ক্ষেত্রে আরবদের কম্পিটিশনে নামতে হয় নতুন অভিবাসী ইহুদীদের সঙ্গে। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন নিয়ে অধিবাসীদের একই মনোভাব থাকলেও, প্যালেস্তিনীয় আরবদের ক্ষেত্রে যে ব্যাপারটা সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছিল সেটা হল এই অভিবাসনের ফলে প্যালেস্টাইনের ডেমোগ্রাফির আমূল বদলে যাওয়া। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আরবরা বুঝতে পারে যে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা - ভবিষ্যতে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের একমাত্র নিশ্চয়তা - ক্রমশঃ কমে আসছে।

এই পুরো সময় জুড়ে ব্রিটিশদের নীতির গতিবিধি থেকেছে খানিক পেন্ডুলামের মত। আরবদের দিক থেকে চাপ এলে তারা অভিবাসনের দরজা বন্ধ করেছে। আবার জায়নিস্টদের দিক থেকে চাপ এলে তারা আরও আরও অভিবাসনের অনুমতি দিয়েছে। তিরিশের দশকের শেষের দিকে এসে দেখা যায় এই পেন্ডুলামের নীতি কাউকেই খুশী করতে পারেনি। বরং বিবদমান দুই পক্ষই আরও বেশি র‍্যাডিক্যাল হয়ে উঠেছে...

Wednesday, March 18, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: ব্যালফার ডিক্লারেশন

(৪) ব্যালফার ডিক্লারেশন (১৯১৭)

আর্চিবল্ড ওয়াভেল - প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে প্যালেস্টাইন অভিযানে যিনি অ্যালেনবির বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এবং চল্লিশের দশকের ক্রিটিকাল সময়ে যিনি আসবেন ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়ে - প্যারিসের শান্তি সম্মেলনের পর একটা কথা বলেছিলেন – "After 'the war to end war' they seem to have been pretty much successful in Paris at making a 'Peace to end Peace'" - প্যারিস শান্তি সম্মেলন সম্পর্কে এত সহজ বাস্তব বর্ণনা কেউ আজ অবধি দিতে পারেননি। যেমন, সাইকস-পিকট চুক্তি নিয়ে টিই লরেন্স (মানে লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া) বলেছিলেন - "a purely British and French show"...
কেন এই কথাগুলো এসেছিল, সেটা স্পষ্ট হবে যদি আমরা ১৯১৭ সালের ব্যালফার ডিক্লারেশনের ইতিহাসটা একবার দেখি। কালো কালিতে লেখা ডিক্লারেশন শেষ অবধি ইতিহাসকে লিখেছিল রক্তের অক্ষরে।
১৯১৭ সালের ২রা নভেম্বর - ব্রিটিশ ফরেন সেক্রেটারি আর্থার জেমস ব্যালফার ব্রিটিশ ইহুদী কমিউনিটির নেতৃস্থানীয় লর্ড রথসচাইল্ডের উদ্দেশ্যে একটা ছোট চিঠি লেখেন। মাত্র সাতষট্টি শব্দের এই চিঠি মধ্যপ্রাচ্যকে সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দিয়েছিল, যার ফলাফল আমরা আজও টের পাই। কী লেখা ছিল সেই চিঠিতে?
"His Majesty's government view with favour the establishment in Palestine of a national home for the Jewish people, and will use their best endeavours to facilitate the achievement of this object, it being clearly understood that nothing shall be done which may prejudice the civil and religious rights of existing non-Jewish communities in Palestine, or the rights and political status enjoyed by Jews in any other country."
১৯১৭ সালের আগে জায়নিস্টরা একাধিক ইম্পিরিয়াল শক্তির (অটোমান সাম্রাজ্য, জার্মানি, রাশিয়া ইত্যাদি) সামনে দরবার করলেও কেউই জায়নিস্টদের "ন্যাশনাল হোম"-এর দাবীকে সমর্থন করেনি। আর্থার ব্যালফার এই ডিক্লারেশনের মাধ্যমে ইতিহাসে প্রথমবার কোনও ক্ষমতাশালী রাজনৈতিক শক্তি (ইনসিডেন্টালি, সেই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি) প্রকাশ্যে জায়নিজমের প্রতি সমর্থন জানালো…
ব্রিটেনের স্বার্থ কী ছিল?
মনে রাখবেন, সেই সময়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছে পুরোদমে। ব্রিটেন চাইছিল রাশিয়া ও আমেরিকায় বসবাসকারী বিশাল ইহুদী জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে সেই দেশগুলোতে চাপ তৈরী করে তাদের মিত্রশক্তির পক্ষে আনার। উইৎজম্যানের নেতৃত্বে জায়নিস্টরা ব্রিটিশ পলিসিমেকারদের একাংশের মধ্যে সিমপ্যাথিও তৈরী করতে সফল হয়েছিল, আরেক অংশ ভেবেছিল ব্রিটেন সমর্থিত ইহুদী রাষ্ট্র সুয়েজ অঞ্চলে ভূরাজনীতির ক্ষেত্রে উপযোগী "অ্যাসেট" হয়ে উঠবে কোনও এক সময়ে।
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল - এই ঘোষণার টাইমলাইনটাও বিশ্বযুদ্ধের কিছু ঘটনার সাথে খাপে খাপ মিলে গিয়েছিল: ১৯১৭ সালের ৩১ অক্টোবর বেরশেভার যুদ্ধে দক্ষিণ প্যালেস্টাইনের সামরিক অচলাবস্থার অবসান হয়, আর সেইদিনই ব্রিটিশ মন্ত্রিসভায় এই ডিক্লারেশনের অনুমোদনও দেওয়া হয়, বিশ্বব্যাপী ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ডিক্লারেশনের প্রোপাগান্ডা এফেক্টের কথা মাথায় রেখে।
জাতীয় বাসস্থান বা ন্যাশনাল হোমের আন্তর্জাতিক আইনে কোনও প্রিসিডেন্স ছিল না এর আগে। ব্রিটিশ ডিক্লারেশনের মধ্যে জিউয়িশ ন্যাশনাল হোমের সরাসরি মানে ইহুদী রাষ্ট্র না হলেও, জায়নিস্টদের মূল লক্ষ্য ছিল তাই। ব্রিটিশ সরকার পরে ক্ল্যারিফাই করে যে এই ঘোষণায় প্যালেস্টাইন বলতে তারা গোটা প্যালেস্টাইন জুড়ে ইহুদী ন্যাশনাল হোমের কথা বোঝাতে চায়নি। এবং, চিঠির শেষাংশ, মানে "existing non-Jewish communities" কথাগুলো এই ঘোষণার বিরোধী যাঁরা বাস্তবে ওই অঞ্চলের স্থানীয় বাসিন্দাদের সম্ভাব্য ক্ষোভ এবং বিশ্বজোড়া "অ্যান্টিসেমিটিজম"-এর আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁদের সন্তুষ্ট করার জন্যে জোড়া হয়েছিল।
ডিক্লারেশনের বেসিক কন্ট্রাডিকশনগুলো নিমেষেই স্পষ্ট হয়ে ওঠেঃ ব্রিটেন এমন এক ভূখণ্ডে ইহুদী ন্যাশনাল হোম গড়ে তোলার কমিটমেন্ট করছে যেখানে প্রায় ৯৪% অধিবাসীই প্যালেস্টিনীয় আরব জনগোষ্ঠীর মানুষ। প্যালেস্টিনীয় লেখক রেফাত ইব্রাহিম এই ডিক্লারেশন সম্পর্কে লিখেছিলেন - "Balfour promised what he did not own to those who did not deserve it." 

সাতষট্টি শব্দের এই চিঠিতে প্যালেস্টাইনের ৯৪% আরব অধিবাসীদের কলমের এক খোঁচায় "নন-জিউয়িশ কমিউনিটি" বলে ছেড়ে দেওয়া হল। তাদের জন্যে রইল শুধু "সিভিল অ্যান্ড রিলিজিয়াস রাইটস" - খেয়াল করবেন, রাজনৈতিক অধিকার বা আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার - এই শব্দগুলো এই বিশাল সংখ্যাধিক্য মানুষের ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। বরং জনসংখ্যার মাত্র ৬% অংশকে সেই এলাকায় "ন্যাশনাল হোম" বানানোর অধিকার দেওয়া হল, দেওয়া হল রাজনৈতিক অধিকার, এও বলা হল যে এই চুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে অন্য কোনও দেশে ইহুদী অধিবাসীদের অধিকার এবং রাজনৈতিক মর্যাদার কোনও হেরফের হবে না।
১৯১৯ সালে, আর্থার ব্যালফার এক আভ্যন্তরীণ চিঠিতে আরও ভয়ানক কথা লিখেছিলেন - "In Palestine, we do not believe in the principle of self-determination for the existing population." কলোনিয়াল শাসনের ইতিহাস যদি ঘাঁটি, দেখতে পাব সেই আমলে ইউরোপীয় কলোনিয়াল শক্তির মনোভাব ছিল এইরকমই - স্থানীয় অধিবাসীদের দাবী, সত্ত্বা, পরিচয়কে পুরোপুরি অস্বীকার করা, এবং এক সময়ে মুছে ফেলা। শুধু আরব নয়, ভারত সম্পর্কেও ব্রিটিশ সরকারের এক বড় অংশের মনোভাব ছিল এমনই – অশিক্ষিত নেটিভ হিদেন।
আর্থার ব্যালফারের এই ডিক্লারেশনকে শেষ অবধি প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেটে জায়গা দেওয়া হয়, ব্রিটেন আইনতঃ বাধ্য হয়ে পড়ে এই ঘোষণাকে বাস্তবায়িত করতে, কারণ ব্যালফার ডিক্লারেশন আন্তর্জাতিক আইনে একটা চিঠির বেশি কিছু না হলেও, লীগ অফ নেশনসের প্যালেস্টাইন ম্যান্ডেট মেনে চলা বাধ্যতামূলক। ব্রিটেনের পক্ষে একই সঙ্গে ইহুদীদের ন্যাশনাল হোম তৈরী করার পাশাপাশি আরব অধিবাসীদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা বাস্তবে একটা অসম্ভব "ব্যালেন্সিং অ্যাক্ট" হয়ে দাঁড়ায়। এবং, দশকের পর দশক ধরে চলতে থাকা সংঘাতের সূচনা করে দেয়…
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক আর্নল্ড টোয়েনবি ১৯৪৮ সালের নাকবা (প্যালেস্টিনীয়দের দেশছাড়া হওয়ার ঘটনা) সম্পর্কে লিখেছিলেন - "natural outcome of the Balfour Declaration, not a deviation from it." প্যালেস্টিনীয়দের কাছে এই ডিক্লারেশন আজও একটা উন্মুক্ত ক্ষত। রেফাত ইব্রাহিমের ভাষায় - "Children who have lost their homes know Balfour's name before they know the names of current leaders. They instinctively understand that what is happening is not merely a war, but a continuation of a promise written over a century ago and still enforced on their bodies."

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: আরব বিদ্রোহ

(৩) আরব বিদ্রোহ (১৯১৬-১৯১৮)
দশই জুন, ১৯১৬ - মক্কার বাতাস চিরে ভেসে আসে একটা মাত্র গুলির আওয়াজ। অটোমান সৈন্যদের গ্যারিসনে সেই গুলিটা চালিয়েছিলেন মুসলমানদের পবিত্রতম তীর্থের রক্ষক, শরিফ হুসেইন বিন আলি। এর পাঁচদিন আগেই মদিনার অটোমান গ্যারিসনের ওপর আক্রমণ শুরু করে দিয়েছে আরব বিদ্রোহী সৈন্যদল। শরিফ হুসেইনের চালানো গুলি আরব বিদ্রোহের পাব্লিক ডিক্লারেশন আর আরব অঞ্চলে অটোমান শাসনের অবসানের সংকেত। 
এই আরব বিদ্রোহ আচমকা আকাশ থেকে এসে পড়েনি। বরং বেশ কয়েকটা ঘটনার ওপর নির্ভর করে এই বিদ্রোহ সংগঠিত হয়েছিল অনেক পরিকল্পনা করেই। এই বিদ্রোহের ব্যাকগ্রাউন্ড হিসেবে বলা যায় তুর্কী জাতীয়তাবাদের কথা - ১৯০৮ সালে তরুণ তুর্কী মুভমেন্টের শুরু থেকেই যে চেতনা ক্রমশঃ অটোমান সাম্রাজ্যের বাদবাকি আরব অধিবাসীদের ক্রমশঃ বিচ্ছিন্ন করে দিতে শুরু করে। বলা যায় আরব জাতীয়তাবাদী চেতনার কথাও - সিরিয়া ও মেসোপটেমিয়ার বুদ্ধিজীবী এবং কর্তাব্যক্তিদের মধ্যে ক্রমশঃ উদ্ভূত হতে থাকা স্বতন্ত্র আরব পরিচিতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের আকাঙ্খা। এবং অবশ্যই ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতি - শরিফ হুসেইন এবং ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্সের মধ্যে থেকে তৈরী হওয়া ধারণা যে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করলে আরব অধিবাসীদের স্বাধীনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবী ব্রিটিশ সরকার স্বীকার করে নেবে।
শরিফ হুসেইনের নিজস্ব উচ্চাশাও ছিল - যুদ্ধের বাজারে নিজেকে অটোমান শাসন থেকে বের করে এনে স্বাধীন স্বতন্ত্র আরবভূমিতে হাশেমাইট বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা করা…
বিদ্রোহের শুরুর দিকে ফোকাস ছিল আরবের পবিত্র শহরগুলোকে দখল করা। ১০ই জুন ১৯১৬ - হুসেইনের দুই ছেলে, আলি আর ফয়জলের নেতৃত্বে আরব বাহিনী মক্কা দখল করে ফেলে। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর দৌলতে জেড্ডার বন্দরও আরব বাহিনীর হাতে আসে অল্প সময়ের মধ্যেই। তবে আরব বাহিনীর যাত্রা পুরোপুরি নিষ্কন্টক ছিল না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রায় পুরো সময়টা জুড়েই মদিনার অটোমান গ্যারিসন ঘেরাও হয়ে থাকলেও শহর হাতছাড়া হতে দেয়নি। আর, এই বিদ্রোহের মূল লক্ষ্য কখনোই অনেক এলাকা দখল করে ফেলা ছিল না, বরং গেরিলা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অটোমান সৈন্যবাহিনীকে এনগেজ করে রাখা আর তাদের সাপ্লাই লাইন কেটে দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।
পিটার ও'টুল অভিনীত ডেভিড লীনের ১৯৬২ সালের সিনেমা লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া দেখেননি বা নামও শোনেননি এমন মানুষ বিরল, অন্তত আমাদের জেনারেশন অবধি তো বটেই। সেই সিনেমাটা পুরো আকাশ থেকে পড়া কাল্পনিক কাহিনী নয়, বরং এক ব্রিটিশ ইন্টেলিজেন্স অফিসার, আর্কিওলজিস্ট এবং ডিপ্লোম্যাট থমাস এডওয়ার্ড লরেন্সের জীবনের ঘটনার ওপর তৈরী। এই লরেন্সই সিনেমার লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া, পাকেচক্রে যিনি হয়ে উঠেছিলেন এই আরব বিদ্রোহের এক মুখ্য চরিত্র। তাঁকে প্রথমে পাঠানো হয়েছিল হেজাজে - পর্য্যবেক্ষক হিসেবে। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই লরেন্স শরিফ হুসেইনের দুই ছেলে, আলি আর ফয়জলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে হয়ে ওঠেন আরব বাহিনীর অন্যতম প্রধান উপদেষ্টাও। লরেন্স একদম সঠিকভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে আরব বাহিনী খোলা মাঠে অটোমার সৈন্যদের মুখোমুখি হয়ে কিছু করে উঠতে পারবে না, বরং আচমকা গেরিলা হানাই তাদের শক্তি হয়ে উঠতে পারে। আরব নেতৃত্বকে বুঝিয়েসুঝিয়ে লরেন্স আক্রমণের মূল কেন্দ্র করেন আরব এলাকার উত্তরাঞ্চলকে, বিশেষ করে আক্রমণ শানানো হয় হেজাজের রেলওয়ে লাইনের ওপর। এই রেললাইনই ছিল অটোমান সৈন্যবাহিনীর প্রধান সাপ্লাই লাইন - মদিনা এবং সিরিয়ার বাকি অঞ্চলের গ্যারিসনে রসদ পৌঁছত এই লাইনের মাধ্যমেই। আরব গেরিলা বাহিনী, যাদের পরিচয় ইতিহাসে লেখা রয়েছে নর্দার্ন আর্মি বলে - মূলতঃ প্রাক্তন অটোমান অফিসার এবং আদিবাসী বেদুইনদের নিয়ে তৈরী, মরুভূমির ওই এলাকা ছিল যাদের হাতের নখের মত পরিচিত - উটে সওয়ার হয়ে আক্রমণ চালায় যায় এই রেললাইনের ওপর। একের পর এক ব্রিজ উড়ে যায়, ধ্বংস হয় রেলওয়ে ট্র্যাক। হাজারো অটোমান ফৌজ ক্রমাগত ব্যস্ত থেকে যায় এই রেললাইনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে।
১৯১৭-১৮ সাল নাগাদ আরব রিভোল্ট তার শিখরে পৌঁছয়। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে নর্দার্ন আর্মি দখল করে আকাবা বন্দর - ফলে ব্রিটিশ নৌবাহিনীর পক্ষে রসদ পৌঁছে দেওয়ার কাজ সহজ হয়ে পড়ে। এবং প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ জেনারেল এডমন্ড অ্যালেনবির অভিযানের সময় তাঁর ডান হাত হিসেবে কাজ করেছিল এই নর্দার্ন আর্মিই। ক্রমাগত অটোমান সাপ্লাই লাইনে হানা, অটোমান এলাকার মধ্যে থেকে ইন্টেলিজেন্স সরবরাহের কাজ – আরব বাহিনীর এই সাফল্য যুদ্ধের পুরো সময় জুড়ে অটোমান আর্মিকে ব্যতিব্যস্ত করে রেখেছিল, ফলে এই ইস্টার্ন ফ্রন্টে অটোমান সৈন্যরা সেরকম কার্যকরী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতেই পারেনি। আরব অভিযানের চূড়ান্ত সাফল্য ছিল ১৯১৮ সালের অক্টোবরের শুরুতে দামাস্কাসের দখল নেওয়া - যার কিছুদিন পরেই অটোমান শক্তি মিত্রপক্ষের সামনে আত্মসমর্পণ করে। আমির ফয়জল বিজয়ীর বেশে দামাস্কাসে প্রবেশ করেন, তৈরী হয় স্বাধীন আরব সরকার - অল্প কিছুদিনের জন্যে হলেও যে ঘটনা একটা ঐক্যবদ্ধ স্বাধীন আরব রাজ্যের স্বপ্ন দেখিয়েছিল।

তবে কলোনিয়াল আমল তো। গোটা কলোনিয়াল আমলই বেসিকালি নানান বিশ্বাসঘাতকতার ঘটনায় ভর্তি। এখানেও আলাদা কিছু হয়নি।

আরব বিদ্রোহ তার ইমিডিয়েট মিলিটারি লক্ষ্য — অটোমান সাম্রাজ্যের হার — নিশ্চিত করতে পেরেছিল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক স্বপ্ন ভেঙে চৌচির হয়ে যায় যুদ্ধের পরে আলোচনার টেবিলে।
আরবরা শরিফ হুসেইন আর ম্যাকমোহনের মধ্যে আলোচনা (যার কথা আগের পর্বে লিখেছি) আর স্বাধীন আরব রাজ্যের ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিল। কিন্তু ব্রিটিশরা যে ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের সঙ্গে গোটা আরব এলাকার ভাগাভাগি করে নিয়েছে সাইকস-পিকট চুক্তির মাধ্যমে, সেটা প্রকাশ পায় এই সময়েই। ব্রিটেন আর ফ্রান্সের এই দ্বিচারিতা ফাঁস করে দেয় নভেম্বর বিপ্লব পরবর্তী রাশিয়ার বলশেভিক সরকার। প্রকাশ্যে আসে ১৯১৭ সালের ব্যালফার ডিক্লারেশনের কথাও — যেখানে ব্রিটিশরা জায়নিস্টদের প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছিল যে প্যালেস্টাইনেই তারা ইহুদী হোমল্যান্ড বানাতে সাহায্য করবে, সেই প্যালেস্টাইন যাকে আরবরা নিজেদের জমি হিসেবেই দেখত (হুসেইন-ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স অনুযায়ী আরবদের বিশ্বাস ছিল এরকমটাই)।
বিশ্বযুদ্ধের পর, ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে উইৎজম্যানের (যিনি পরে ইজরায়েলের প্রেসিডেন্ট হবেন) সঙ্গে চুক্তিতে ফয়জল প্যালেস্টাইনে ইহুদী সেটলমেন্ট তৈরীর কথা মেনে নেন, শুধুমাত্র যদি আরব স্বাধীনতার গ্যারান্টি থাকে তবেই। সেই বছরেই, প্যারিসে শুরু হয় শান্তি সম্মেলন। সেখানে হুসেইনের প্রতিনিধি হিসেবে আমীর ফয়জল আরবদের দাবী পেশ করেন। অবভিয়াসলি, কেউ সে কথা কানে তোলেনি। ফয়জল ও উইৎজম্যানের চুক্তিও নাল অ্যান্ড ভয়েড হয়ে যায় তখনই। লীগ অফ নেশনস ১৯২০ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যে একটা ম্যান্ডেট তৈরী করে, যেখানে সিরিয়া আর লেবাননকে তুলে দেওয়া হয় ফরাসীদের হাতে; ইরাক, প্যালেস্টাইন আর ট্রান্সজর্ডনকে দেওয়া হয় ব্রিটিশদের। ১৯২০ সালের মার্চ মাসে ফয়জলকে সিরিয়াস রাজা হিসেবে বেছে নেয় সিরিয়ার জাতীয় কংগ্রেস। ওই বছরের ২৪শে জুলাই তারিখেই মায়সালানের যুদ্ধের পর ফরাসীরা তাঁকে তাড়িয়ে দেয়। ব্রিটিশরা, তাদের গুডউইলের নিদর্শন হিসেবে ফয়জলকে ইরাকের গদিতে বসায়, আর ফয়জলের ভাই আবদুল্লাহকে বসায় ট্রান্সজর্ডনে।

শেষ হয় আরব বিদ্রোহের এই পরিচ্ছেদ, দিনের শেষে সামরিক সফলতা হলেও যেটা হয়ে দাঁড়ায় চূড়ান্ত রাজনৈতিক ব্যর্থতা। এই বিদ্রোহের সময়ে আরব জাতীয়তাবাদী চেতনা আর সামরিক শক্তির উত্থান হলেও সেসব ধুলোয় মিশে যায় কলোনিয়াল পাওয়ার পলিটিক্সের বাস্তব দুনিয়ার সামনে। আরবরা স্বাধীনতা পাওয়ার উদ্দেশ্যে লড়লেও শেষ অবধি অটোমান শাসকের বদলে মাথার ওপরে পায় নতুন ইউরোপীয় শাসককে। আর এই অভিজ্ঞতা আর বিট্রেয়ালের অনুভূতিই লংটার্মে আরব রাজনৈতিক চেতনা আর গোটা এলাকার অস্থিরতার অন্যতম প্রধান উপাদান হয়ে থেকে গেছে...

এই জটের অন্যতম প্রধান গ্রন্থি হল ব্যালফার ডিক্লারেশন, যাকে আজকের রাজনীতিকরা ধামাচাপা দিয়ে রাখেন, অথচ সাইকস-পিকট চুক্তি, হুসেইন-ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স আর ব্যালফার ডিক্লারেশন — এই তিনের জটের পরিণতিই আজকের মধ্যপ্রাচ্য। পরের পর্বে, ব্যালফার ডিক্লারেশন।

Monday, March 16, 2026

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: হুসেইন ম্যাকমোহন করেসপন্ডেন্স

দুদিন আগে সাইকস-পিকট চুক্তি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এই সিরিজটা নিয়ে এগোনোর আগে পটভূমিটা আরও একটু ব্যাখ্যা করা জরুরী।

ঐতিহাসিক টাইমলাইন দেখলে ঘটনাপ্রবাহের শুরু ১৯০৮ সালে পারস্যে মাটির নীচে তেলের খোঁজ পাওয়া থেকে। খুব স্পেসিফিকালি বলতে গেলে ১৯০৮ সালের ২৬শে মে, পারস্যের দক্ষিণ পশ্চিমে মসজিদ সুলেইমান নামের এক প্রত্যন্ত এলাকায় ব্রিটিশ ড্রিলিং টিম প্রথম তেল স্ট্রাইক করে - বাণিজ্যিকভাবে তাৎপর্য্যপূর্ণ প্রথম অয়েল স্ট্রাইক, যেটা পরবর্তীকালে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে প্রবলভাবে বদলে দেবে। এই ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই, ১৯০৯ সালে তৈরী হয় অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি (APOC) আর ১৯১৪ সালে ব্রিটিশ সরকারের তৎকালীন ফার্স্ট লর্ড অফ অ্যাডমিরালটি উইনস্টন চার্চিলের সুপারিশে ব্রিটিশ সরকার এই নতুন কোম্পানির ৫১% শেয়ার কিনে নেয়, রয়্যাল নেভির জন্যে শস্তায় তেলের ব্যবস্থা করার জন্যে। সেই সময়েই রয়্যাল নেভি নিজেদের যুদ্ধজাহাজগুলোকে কয়লার শক্তি থেকে তেলে নিয়ে যাওয়া শুরু করে।
তেলের এই আবিষ্কার নিমেষের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যকে বিশ্বের তেল-মানচিত্রে জায়গা করে দেয় আর গোটা এলাকার কৌশলগত গুরুত্বকে আমূল বদলে দেয়। যে এলাকা এতদিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের এক অখ্যাত অঞ্চল, সেটাই এরপর হয়ে ওঠে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী দেশগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দু। আজও ঠিক তাই।

১৯১৪ সালের ২৮শে জুন, সারায়েভোতে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্দ আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। সেইদিনই টার্কিশ অয়েল কোম্পানি মেসোপটেমিয়ায় (আজকের ইরাক) তেলের খোঁজ করার বরাত পায়। এই টার্কিশ অয়েল কোম্পানির মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার ছিল অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি, বকলমে ব্রিটিশ সরকার। এর ঠিক এক মাস পর, ২৮শে জুলাই, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কয়েকদিনের মধ্যেই জারের রাশিয়া সার্বিয়াকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। এবং জার্মানি যুদ্ধ ঘোষণা করে রাশিয়া এবং রাশিয়ার বন্ধুদেশ ফ্রান্সের বিপক্ষে। ইংল্যান্ডও জড়িয়ে পড়ে এই যুদ্ধে। শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। আগস্ট মাসে রাশিয়ার আক্রমণের ভয়ে এবং নিজেদের হারানো এলাকা ফিরে পাওয়ার আশায় জার্মানির সঙ্গে গোপন চুক্তি করে ক্ষয়িষ্ণু অটোমান সাম্রাজ্যও। ১৯১৫ সালের এপ্রিল মাসে মিত্রশক্তি পৌঁছয় অটোমান সাম্রাজ্যয়ের গ্যালিপোলি উপকূলে। এর কিছুদিনের মধ্যেই একটা ঘটনা ঘটে যায়, যেটা পরের দিকে গোটা অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহের ওপর ছাপ ফেলে যাবে। সাইকস-পিকট চুক্তির মতই, ইজিপ্টের ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমোহন আর মক্কার শরিফ, হুসেইন বিন আলি আল-হাশিমির মধ্যে চিঠিচাপাটির ঘটনা শুনতে অকিঞ্চিৎকর ঠেকলেও, বাস্তবে প্রচণ্ডই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯১৫ সালের জুলাই থেকে ১৯১৬ সালের মার্চের মধ্যে, হুসেইন বিন আলি এবং স্যার হেনরির মধ্যে খান দশেক চিঠি লেখালেখি চলে - আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে যেটা এখনও একটা অনগোয়িং ডিবেট। ‘ম্যাকমোহন-হুসেইন করেসপন্ডেন্স’ হিসেবে খ্যাত এই চিঠিগুলোয় অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহের বিনিময়ে আরবদের স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার, কারণ সেই সময়ে জার্মানির পক্ষে যুদ্ধে যোগ দেওয়া অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের জন্যে ইংল্যান্ড মরিয়া হয়ে বন্ধু খুঁজতে ব্যস্ত। মজার ব্যাপার হল, পরোক্ষভাবে ভারত ঠিক এইখানেই এর মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসের কোনোকিছুই যে আইসোলেটেড নয়, তার অন্যতম প্রমাণ এই ধরণের ঘটনা থেকেই পাবেন।

অটোমান খলিফা তখন মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছেন, এবং ব্রিটিশদের আশঙ্কা ছিল এই জিহাদ যদি ভারতে (ভারতে তখন প্রায় সাত কোটি মুসলমানের বাস) ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে তাদের সাধের ক্রাউন জুয়েল হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে। খেয়াল রাখবেন, ভারতে তখন ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বাঁধছে। কংগ্রেস ক্রমশঃ শক্তিশালী হচ্ছে, আরও নানা ধরণের বৈপ্লবিক কাজকর্মও চলছে ভারতে। কাজেই, অটোমান খলিফার জিহাদের আহ্বানকে কাউন্টার করার জন্যে জরুরী হয়ে ওঠে এই আরব বিদ্রোহের পরিকল্পনা, এবং ইসলামের পবিত্রতম তীর্থস্থানের রক্ষক হিসেবে শরিফ হুসেইনের ক্ষমতা ছিল অটোমান সুলতানের ধর্মীয় আবেদনের কাউন্টার করার। তাছাড়াও, তার কিছুদিন আগেই হুসেইনের বড় ছেলে ফয়সলের কাছে আরবের বিভিন্ন গোপন জাতীয়তাবাদী সংগঠনের কাছ থেকে আবেদন আসে অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের।
অন্ততঃ দশটা পারস্পরিক চিঠির মধ্যে ১৯১৫ সালের ২৪শে অক্টোবর তারিখে লেখা ম্যাকমোহনের চিঠিটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই চিঠিতেই ম্যাকমোহন লেখেন যে শরিফের দাবী মেনে একটা নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে আরবদের স্বাধীনতাকে ব্রিটিশ সরকার স্বীকৃতি দেবে ও সমর্থন জানাবে। ম্যাকমোহন কিছু এলাকাকে সুস্পষ্টভাবে এই সীমানার বাইরে রাখেন - যেমন মেরসিন ও আলেকজান্দ্রেত্তা অঞ্চল, আর দামাস্কাস, হোমস, হামা ও আলেপ্পো এলাকাসমূহের পশ্চিমে অবস্থিত সিরিয়ার অংশবিশেষ - কারণ এই এলাকাগুলোকে নির্দিষ্টভাবে আরব এলাকা বলা যায় না।

প্যালেস্টাইন নিয়ে ধোঁয়াশার শুরুও এইখান থেকেই। ব্রিটিশরা, তাদের স্বভাবমতনই, প্যালেস্টাইন সম্পর্কে অস্পষ্টতা রেখে দিয়েছিল চিঠিতে। আন্দাজ করা যেতে পারে এর কারণ জায়নিস্টদের প্রতি পক্ষপাতই হবে, কারণ ১৯০৫ সালে থেকেই জায়নিস্টদের একমাত্র ফোকাস ছিল প্যালেস্টাইনের ওপরে।

শরিফ হুসেইন এবং অধিকাংশ আরবের কাছেই প্যালেস্টাইন ছিল আরব এলাকা, কাজেই আরবদের স্বাধীন এলাকার মধ্যে তাঁরা প্যালেস্টাইনকেও ধরে নিয়েছিলেন। ব্রিটিশরা অন্য কথা বলে - যেহেতু অটোমান আমলে সুলতান বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীকে জেরুজালেমে বসবাস করার অনুমতি দিয়েছিলেন, কাজেই প্যালেস্টাইনকে শুধুমাত্র আরব এলাকা হিসেবে দেখা যাবে না।

দুপক্ষের চিঠিগুলো আনঅফিশিয়ালি প্রকাশিত হয় ১৯২৩ সালে, আর তারপর অফিশিয়ালি ১৯৩৯ সালে। এর মধ্যে ১৯১৯ সালে প্যারিসের শান্তি সম্মেলনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লয়েড জর্জ জোরালোভাবে বলেছিলেন যে এই ম্যাকমোহন-হুসেইন করেসপন্ডেনস দ্বিপাক্ষিক চুক্তির বাধ্যবাধকতার মধ্যেই পড়া উচিত। কিন্তু সাইকস-পিকট চুক্তি আর বালফ্যুর ডিক্লারেশন যখন প্রকাশ্যে আসে, তখন দেখা যায় যে ব্রিটেন আর ফ্রান্সের গোপন বোঝাপড়া আর জায়নিস্টদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি, দুইই ম্যাকমোহনের প্রতিশ্রুতির একেবারে উলটো।

এই জটের শেষ কম্পোনেন্ট বালফ্যুর ডিক্লারেশন। কিন্তু তার আগে আরব বিদ্রোহের গল্পটাও লিখব। ভীষণই ইন্টারেস্টিং। বালফ্যুর ডিক্লারেশন আসবে তার পরের পর্বে। সঙ্গে থাকুন।

মধ্যপ্রাচ্যের টাইমলাইন: সাইকস পিকট চুক্তি

মধ্যপ্রাচ্য বুঝতে গেলে আপনাকে শুরু করতে হবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময় থেকে। হ্যাঁ, তার আগেও যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে—রাজতন্ত্রের আমলে যা হয়েই থাকে। কিন্তু আজকের এই অশান্তির শুরু ওই অঞ্চলে মাটির নীচে তেল আবিষ্কার হওয়ার পরে। এই ইতিহাসটুকু না জানলে আপনি ওই গোলগোল ঘুরেই যাবেন আর হোয়া ইউনির অধ্যাপকদের গুলবাজি শুনে ফালতু লাফাবেন।

শুরু বলা যায় সাইকস-পিকট এগ্রীমেন্ট থেকে।

১৯১৫ সালের শেষের দিক থেকে ১৯১৬ সালের শুরুর মধ্যে, স্যার মার্কস সাইকস (এক ব্রিটিশ এমপি, যিনি ছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ওয়ার লর্ড কিচেনারের ঘনিষ্ঠ) আর জর্জ-পিকট (এক ফরাসী কূটনীতিক) নিজেদের মধ্যে চুপিচুপি মিটিং শিটিং করে গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে ফেলেছিলেন। একটা জিনিস মাথায় রাখবেন—বিশ্বযুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি, আর এর মাত্র কিছুদিন আগেই মধ্যপ্রাচ্যে তেলের খোঁজ পাওয়া যায়...

সাইকস আর পিকটের মধ্যে চুক্তি হয় যে উত্তরে Acre (বর্তমানে ইজরায়েল যেখানে) থেকে উত্তরপূর্বে পারস্যের বর্ডার অবধি একটা কাল্পনিক লাইনের এপাশ ওপাশ নিজেদের মধ্যে ভাগ বাঁটোয়ারা করে নেবে ইংল্যান্ড আর ফ্রান্স। সিরিয়া আর লেবানন যাবে ফ্রান্সের ভাগে, আর ইংল্যান্ড পাবে মেসোপটেমিয়া, প্যালেস্টাইন আর সুয়েজ অঞ্চল। দুই পক্ষই বেশ জোর দিয়ে আমেরিকাকে (আমেরিকা তখনও জিওপলিটিক্সের হিসেবে বাচ্চা) বোঝায় যে তারা নিজেদের স্বার্থে যুদ্ধ করছে না, বরং মানুষের স্বাধীনতা আর মানবতাকে রক্ষা করাই তাদের উদ্দেশ্য।

সেই সময়ের কলোনিয়াল শক্তি, যেমন ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ইত্যাদিরা তখনও যা অজুহাত দিত, আজকের নিও-কলোনিয়াল আমেরিকাও একই অজুহাত দেয়। শোনা যায়, এডওয়ার্ড হাউজ, যিনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট উইলসনের বিদেশনীতির অ্যাডভাইসর, তিনি এই গোপন চুক্তির খবর পেয়ে বলেছিলেন যে ফরাসী ও ব্রিটিশরা এই মধ্যপ্রাচ্যকে ভবিষ্যতের যুদ্ধের আঁতুরঘর বানিয়ে ফেলছে। এগজ্যাক্ট ইংরিজী লাইনটা এইরকম—"[They] are making [the Middle East] a breeding place for future war."

একদম খাপে খাপ তাই না? আজকের অস্থিরতার শুরু ঠিক এইখান থেকেই—প্রথমে পারস্যে মাটির নীচে বিপুল তেলের সন্ধান পাওয়া, মেসোপটেমিয়াতেও (আজকের ইরাক) একই সম্ভাবনার ইঙ্গিত পাওয়া...

অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি সেই সময়েই পারস্যের সঙ্গে ষাট বছরের চুক্তি করে ফেলেছে। আর টার্কিশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি, যাদের মেজরিটি শেয়ার হোল্ডার ছিল অ্যাংলো-পার্সিয়ান অয়েল কোম্পানি, মেসোপটেমিয়ায় তেলের খোঁজ করার লোভনীয় বরাত পায় সেইদিনই যেদিন ফ্রাঞ্জ ফার্দিন্যান্দ নিহত হন—১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ট্রিগার্ড হয় যে ঘটনা থেকে।

মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত দেশের তৎকালীন সরকারগুলোকে আর সাধারণ মানুষকে যাই প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়ে থাকুক না কেন, আসল সত্যিটা হল—কলোনিয়াল শক্তি সেই সময়েই নিজেদের মধ্যে গোপনে গোটা অঞ্চলের ভাগ বাঁটোয়ারা সেরে ফেলেছিল, ওই এলাকার ভবিষ্যত চেহারা কী হবে সেসব নিয়ে স্বপ্নটপ্নও দেখে ফেলেছিল। কলোনিয়াল শাসকের অফিসার, রাজনীতিক আর ব্যবসায়ীদের একটাই লক্ষ্য ছিল—তেলের খনি আর যে পাইপলাইন ধরে তেল পৌঁছবে বিভিন্ন বন্দরে, ট্যাঙ্কারে লোড হতে, সেই পাইপলাইন আর বন্দরের দখলদারি...

গল্পটা আজও বদলায়নি এক ফোঁটাও। শুধু নতুন একটা নাম জুড়েছে—ইউনাইটেড স্টেটস অফ আমেরিকা—তারা এই দৌড়ে পয়লা নম্বর হতে শুরু করে সুয়েজ ক্রাইসিসের পর, ষাটের দশকে দুষ্টু কমিউনিস্টদের ঠেকানোর দাবী তুলে...

গোটা পশ্চিমী বিশ্ব—পুরনো বনেদী সমস্ত কলোনিয়াল শক্তি, বা নব্য কলোনিয়াল শক্তি—তারা চায় মধ্যপ্রাচ্যকে বোমা ফেলে একদম সমতল বানিয়ে তাদের স্বাধীন এবং সভ্য করে তুলতে 😊

উইলিয়াম ডালরিম্পল আর অনিতা আনন্দের এম্পায়ার পডকাস্টটা দেখে ফেলতে পারেন। লিঙ্ক কমেন্টে। যদি সময় পাই, মাঝেমধ্যে এই টুকরো ইতিহাসগুলো পোস্ট করব—১৯০৮ সালে পারস্যে তেলের খোঁজ পাওয়া থেকে শুরু করে ১৯৪৮ সালে প্যালেস্টাইনে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট শেষ হওয়া অবধি সমস্য ঘটনাবলীর একটা ন্যারেটিভ। যেমন, সাইকস-পিকট চুক্তির অল্প কিছুদিন আগেই ইজিপ্টে ব্রিটিশ হাইকমিশনার হেনরি ম্যাকমোহন আর মক্কার শরিফ হুসেইন বিন আলির মধ্যে চিঠি চালাচালি, যেখানে ম্যাকমোহন আরবদের স্বাধীন দেশের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অটোমান শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পুরস্কার হিসেবে (লরেন্স অফ অ্যারাবিয়া সিনেমাটা নিশ্চয় দেখেছেন), আর এর ঠিক পরের বড় ঘটনা হল বালফ্যুর ডিক্লারেশন—যাকে আজকের আরব ইজরায়েলি কনফ্লিক্টের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বলা যায়।

#MiddleEast #ArabIsraelConflict #History

Saturday, February 14, 2026

ভারতমাতার জন্মকাহিনী


শুরুতেই TL;DR ডিসক্লেমার দিয়ে রাখি। বোর হওয়া স্বাভাবিক, এবং বোর হলে কাটিয়ে দেবেন।

শিক্ষিত উঁচু জাতের বাঙালি ভদ্রলোকের হাতে ভারতমাতার জন্মের এই গল্পটা অনেকদিন ধরেই লেখার ইচ্ছে ছিল। অনেক টালবাহানার পর লিখেই ফেললাম, কারণ আজকের দিনে এই ন্যারেটিভটা জানা জরুরী। অবশ্যই মৌলিক কিছু নয়, মূলতঃ তনিকা সরকার, সুমিত সরকার, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আশিস নন্দী, মৃণালিনী সিনহা — এরকম বেশ কিছু স্কলারের লেখা পড়ার পর একটা সাধারণ ভাষায় সিন্থেসিস। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই, মানে এই বিষয়ে ফর্মাল কোনো ট্রেনিং নেই। নিজের ইচ্ছেতে কিছু বই পড়ি। পরিচিত লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করে বোঝার চেষ্টা করি। এই লেখাটা সেইরকমই — ঠিক বুঝলাম কিনা সেইটা যাচাই করার জন্যে। ভুল থাকাই বরং স্বাভাবিক। তাই, যাঁরা ইতিহাসের ছাত্র, তাঁরা শুধরে দিলে উপকৃতই হব।

গল্পটা ঊনবিংশ শতকের আলোকপ্রাপ্ত বাঙালি ভদ্রলোক সমাজকে নিয়ে — যাঁরা সাধারণভাবে শিক্ষিত আর অবশ্যই উঁচু জাতের। গল্পের ক্লাইম্যাক্স ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে, যে সময়ে নানান কারণে তাঁরা খানিকটা অস্বস্তিকর জমির ওপরে দাঁড়িয়ে। কলোনিয়াল ইতিহাসের গবেষকরা মনে করেন এই জমি থেকেই জন্ম নিয়েছিল হিন্দু পুনরুত্থান বা রিভাইভালিজমের ধারণা, যার চূড়ান্ত ফলাফল হয়ে দাঁড়ায় একটা ভৌগোলিক অঞ্চলকে দেবীর রূপে দেখতে শুরু করা। ঐতিহাসিকভাবে যে কথাটা মনে রাখা দরকার, সেটা হল এই মাতৃমূর্তির জন্ম পুরাণকথা থেকে হয়নি, কারণ ভারত অ্যাজ আ স্টেট/রাষ্ট্র কনসেপ্টটা ব্রিটিশ আমলের। আজকের নেশন-স্টেটের ধারণার মতনই এই দেবীপ্রতিমার ধারণাও আদপেই "টাইমলেস" নয়, বরং এর জন্ম হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের বাংলার কঠিন বাস্তবের মধ্যে। একের পর এক  সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ধাক্কায় ক্ষতবিক্ষত বাঙালি ভদ্রলোক বাঙালি তখন পরিচয়ের সংকটে ভুগছে। সেই অবস্থার মধ্যে জাতীয়তাবাদী ইন্টেলেকচুয়ালরা একটা আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র তৈরী করে নিয়েছিলেন — খানিকটা স্যাংচুয়ারি বলা যায় — ঘরবাড়ি সংসার, বাড়ির মেয়েরা, আর পরিবার — যে স্যাংচুয়ারিতে কলোনিয়াল শাসকের কর্তৃত্ব থাকবে না, সেই অধিকার থাকবে শুধু পরিবারের কর্তা বাঙালি ভদ্রলোকের হাতেই। এই আবহেই জন্ম হয় "দেশমাতৃকা'-র, বলা যায় বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেই, এবং অচিরেই এই মাতৃমূর্তি ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আইকন "ভারতমাতা" হয়ে ওঠে। 

একটা ক্রনোলজিকাল অর্ডারে এই ঘটনাগুলো পর পর সাজাতে পারলে আমরা সেই সময়ের ছবিটা খুঁজে পাব। 

এই সময়টাকে জানতে হলে আমাদের শুরু করতে হবে ১৭৯৩ সালের পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট অ্যাক্ট, অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আইন থেকে। অভিজাত হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক জমিদার শ্রেণী, বা ল্যান্ডহোল্ডিং ক্লাস — আমাদের গল্পের এক চরিত্র — এর জন্মও এই আইনের পরেই। এই আইন অনুযায়ী ভদ্রলোক জমিদারেরা কোম্পানি বাহাদুরকে দেওয়া পূর্বনির্ধারিত খাজনার বিনিময়ে পাকাপাকিভাবে তাদের এস্টেটের মালিক পরিচিতি পেয়ে যায়, পেয়ে যায় রায়তদের ওপর যেমন খুশী খাজনা চাপানোর স্বাধীনতা। বেসিক্যালি পরজীবী বা প্যারাসাইট বলতেই পারেন এই ক্লাসকে — কারণ এদের বেঁচে থাকা ছিল অন্যের পরিশ্রমের ফসলের ওপর নির্ভরশীল, আর একই সঙ্গে তাদের স্ট্যাটাসও পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল কলোনিয়াল শক্তির ওপর। উল্টোদিকে, এই ভদ্রলোক শ্রেণী আবার নিজেদের অধিকার আর আধিপত্যের ব্যাপারে ছিল মারাত্মক রক্ষণশীল। এই শ্রেণীরই একটা অংশের উচ্চাশা ছিল জমিদারির বাইরেও কলোনিয়াল শাসকের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে নানান ধরণের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, যেমন জাহাজ বা ব্যাঙ্কিং ইত্যাদিতে বাঙালি ভদ্রলোক ভালোই পরিচিতি পেয়েছিল — দ্বারকানাথ, রামদুলাল দে (মানে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাবা) ইত্যাদি নাম ইতিহাসে পড়ে থাকবেন। তবে ওপর ওপর আশাব্যঞ্জক হলেও খানিক অনিশ্চয়তাও ছিল সেই যুগের এই অন্ত্রপ্রনরশিপে।

অভিজাত ভদ্রলোক বাঙালির ব্যবসায়িক আশাভঙ্গ হয় ১৮৪০ নাগাদ, যখন একাধিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এসে একের পর এক ধাক্কা মারতে শুরু করে। একাধিক ইউরোপীয় ব্যাঙ্কিং সংস্থা, যেমন ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যায়। এই ব্যাঙ্কগুলোর আমানতে থাকা বাঙালি পুঁজি পুরোপুরি মুছে যায় বাজার থেকে। কোম্পানি সরকার এই সংকটের সময়ে জাতিবিদ্বেষের ধ্রুপদী সংজ্ঞা মেনে সাদা চামড়ার ইউরোপীয় পুঁজির স্বার্থ দেখায় মন দেয়। বাঙালি তথা ভারতীয় আমানতকারীদের কাছে একটা স্পষ্ট বার্তা পৌঁছয় — যে আধুনিক পুঁজিবাদী ভবিষ্যতের দরজা দেশীয় পুঁজিপতিদের জন্যে বন্ধ। ওসব সাহেবদের খেলার মাঠ, নেটিভ বাঙালির সেখানে জায়গা নেই। বাঙালি উচ্চবিত্ত ভদ্রলোক আচমকা ধাক্কা খেয়ে পিছু হটে আসে, আর তার নিরাপদ এলাকা, অর্থাৎ জমিজমা সম্পত্তির মধ্যে গুটিয়ে যায়। সম্ভাব্য অন্ত্রপ্রনর থেকে বাঙালি উচ্চবিত্ত ভদ্রলোক হয়ে যায় পুরোদস্তুর ভূস্বামী। তাদের পুঁজি সীমাবদ্ধ থেকে যায় খাজনা বা রেন্টের মধ্যেই। ইউরোপীয়দের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার স্বপ্ন দেখা বাঙালি ভদ্রলোক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে অন্তর্মুখী।

অর্থনৈতিক পরিসর ছোট হয়ে আসার পাশাপাশি ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে আরও দুটো বড় ধাক্কা খায় এই রক্ষণশীল হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক। এবং এই দুটোকেই সে দ্যাখে তার নিজের সনাতনী সাংস্কৃতিক এবং গার্হস্থ্য জীবনের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে। প্রথম ঘটনা ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা রদের আইন এবং দ্বিতীয় ঘটনা ১৮৫৬ সালের বিধবাবিবাহ আইন। রেনেসাঁর সময় থেকে মুক্তচিন্তায় শিক্ষিত এক শ্রেণীর বাঙালি এই দুই আইনকে প্রয়োজনীয় সামাজিক সংস্কার হিসেবে দেখলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সনাতনী হিন্দু বাঙালির কাছে এই দুটো আইন ছিল পবিত্র ধর্মীয় আচারের মূলে অযাচিত কলোনিয়াল/বিদেশী আক্রমণ। তার কারণটাও সহজবোধ্য। হিন্দু পুরুষের চিরকালীন কনসেপ্ট ছিল স্ত্রীসুলভ ভক্তি, বংশগৌরব আর বিয়ের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতা। সতীদাহ রদ আর বিধবাবিবাহ — দুটোই সেই চিরকালীন সনাতনী হিন্দু পৌরুষের ধারণার ওপর আক্রমণ। হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোকের অন্দরমহলে পুরুষই ছিল সর্বময় কর্তা, তার হাতেই যেখানে নিয়ন্ত্রিত হত লিঙ্গ, জাতি আর ধর্মের সমস্ত আচার, পুরুষই ছিল পারিবারিক পবিত্রতার রক্ষক। সেই অন্দরমহলের ভিতরে কলোনিয়াল আইনের ঢুকে পড়ার ধাক্কা সমস্ত সনাতনী ধ্যানধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল সেই সময়ে। রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর সেই যুগের ভদ্রলোক বাঙালির কাছে হয়ে ওঠেন খলনায়ক।

[এবং আজও এর অন্যথা হয় না। উত্তর ভারতীয় সনাতনী হিন্দুর ডেফিনেশনে আজও স্ত্রীকে মুখ বুজে স্বামীর হুকুম মানতে হয়। আজও রক্তের শুদ্ধতা সনাতনী হিন্দুর কাছে জরুরী। এবং আজও অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা মানে অলঙ্ঘনীয় জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক। বেশ কয়েক দশক আমরা কিছুটা স্বাধীনভাবে ভাবতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু উত্তর ভারতীয় সনাতনী হিন্দুত্বের ছোঁয়ায় নতুন করে সনাতনী হয়ে ওঠা সেদিনের সনাতনী হিন্দু বাঙালির বংশধর আধুনিক বাঙালির মধ্যে যদি আপনি রামমোহন বা বিদ্যাসাগর সম্পর্কে একই ঘৃণার আভাস পান, তাহলে বুঝব এই লেখার উদ্দেশ্য সফল।]

১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর কোম্পানির হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশ সরকারের হাতে। ইংরিজী শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক তখন বিভিন্ন সরকারি অফিসে চাকরি করে। তার পরিচিতি "বাবু" হিসেবে। সে সাহেবের অনুগত কর্মচারী (যে আনুগত্য খানিকটা ১৮৫৭ সালের ব্যর্থ বিদ্রোহের ফসল), তাকে ছাড়া সাহেবের একটা দিনও চলে না। মোটামুটি এই শতকের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি দপ্তর আর সওদাগরি অফিসে চালু হয় ঘড়ির ব্যবহার — ইউরোপীয় স্টাইলে ক্লক টাইম। বাবুর চাকরি বাঁধা পড়ে ঘড়ির নিয়মানুবর্তিতায় — দশটা পাঁচটার অফিসের বাঁধনে — বাঙালি বাবুর কাছে যেটা ছিল পুরোপুরি অচেনা একটা ব্যবস্থা। দুই দশকের মধ্যেই সাহেবের অনুগত কর্মচারীর কাছে রোজকার এই সাবর্ডিনেশন আর ঘন্টা মিনিটের চাপ ক্রমশ: দাসত্বের মত মনে হতে থাকে। অফিসের বাইরে বাড়িই তার নিরাপদ স্যাংচুয়ারি হয়ে ওঠে, যেখানে সে তার একান্ত ব্যক্তিগত কোলাহলহীন জগতের অভ্যন্তরে নীরবে ধার্মিক চিন্তাভাবনার সময় পায় — মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে যা তার বাইরের জীবনের ফাঁপা দাসত্বের একদম উলটো পিঠ। দাসত্বের চাপ মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের কাছে বোঝা হয়ে উঠতে শুরু করে।

এই সময়েই আসে ভূমিকম্প (অবশ্যই প্রতীকী অর্থে)। যে জমি ছিল অভিজাত জমিদার শ্রেণীর মূলধন বা আশ্রয়, সেই জমিই ভয়ানকভাবে কেঁপে ওঠে তাদের পায়ের নীচে — ১৮৭৩ সালে পাবনার রায়তি দাঙ্গার সময়ে। প্রধাণতঃ মুসলমান এবং নীচু জাতের হিন্দু রায়তরা বাড়তে থাকা খাজনা আর জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে রুখে দাঁড়ায়। জমিদার আর প্রজাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কটা পিতা ও সন্তানের মত — বহু বছর ধরে সযত্নে লালিত এই কল্পকথা রাতারাতি মুখ থুবড়ে পড়ে এই রায়তি বিদ্রোহে। তবে এই বিদ্রোহের ধাক্কার চেয়েও ভদ্রলোক জমিদারদের কাছে বড় ধাক্কা ছিল কলোনিয়াল শাসকের প্রতিক্রিয়া — অনুগত জমিদারদের প্রতি নয়, বরং রায়তদের প্রতি সরকারি সহানুভূতি, খাজনার অবস্থা যাচাই করার উদ্দেশ্যে রেন্ট কমিশন তৈরী আর প্রজার অধিকার সংক্রান্ত আলোচনার শুরু। হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক নিজেদের দুই দিক থেকে আক্রান্ত মনে করতে শুরু করে — একদিকে তাদের এতদিনের প্রজাদের ঔদ্ধত্য বা ইনসাবর্ডিনেশন, অন্যদিকে সরকার তরফ থেকে তাদের আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে পাওয়া বিশ্বাসঘাতকতা। সেই সময়ের বাংলা কাগজে জমিদারি সম্পত্তির ক্ষতির পাশাপাশি ফলাও করে "নীচুজাতের অপমান”-এর কথাও ছাপা হতে থাকে। লেখা হয় "নারীর অবমাননা" বা "সতীত্ব লঙ্ঘন”-এর কথাও। জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে অপবিত্র ছোটজাত আর মুসলমানদের রুখে দাঁড়ানোর এই ঘটনা অভিজাত মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে বাঙালি ভদ্রলোক সমাজে হয়ে দাঁড়ায় কালচারাল এবং সেক্সুয়াল পলিউশন — হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তঃপুরের ক্ষেত্রে যেটা চরমতম অপমান। 

শেষ ধাক্কাটা আসে ১৮৮৩ সালে — ইলবার্ট বিলের সময়ে। ব্রিটিশ সরকার একটা আইন আনার চেষ্টা করে যাতে বলা হয় ভারতীয় (অর্থাৎ কালো চামড়ার নেটিভ) ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ইউরোপীয়দের বিচার হতে পারবে। খুবই সাধারণ একটা মানবিক আইন — বিচারব্যবস্থায় একটা সমতা আনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ব্রিটিশ রাজের চরম জাতিবিদ্বেষকে একদম উলঙ্গ করে দেয় সকলের চোখের সামনে। সরকার এই জাতিবিদ্বেষের সামনে আত্মসমর্পণ করে এবং প্রমাণ করে দেয় যে পশ্চিমী শিক্ষা বা আনুগত্য কোন কিছুর বিনিময়েই কালো চামড়ার ভদ্রলোক "বাবু" ব্রিটিশদের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারবে না; সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে এই শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী চিরকালই সাদা চামড়ার সাহেবের পায়ের নীচেই থাকবে, অফিস কাছারিতে দশটা পাঁচটার দাসত্ব করবে — ব্লাডি নেটিভ হিসেবে।

১৭৯৩ থেকে ১৮৯০ — এই একশো বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, কৃষি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একের পর এক ধাক্কা খাওয়ার পর একমাত্র একটাই জায়গা হিন্দু ভদ্রলোক বাঙালির কর্তৃত্বের আওতায় থেকে গিয়েছিল — আর সেটা হল অন্দরমহলের নারীশরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ। শিশু বয়সে বিয়ে, এবং দশ বছর বয়সে রজঃস্বলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গর্ভাধানের জন্যে জোর করে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার আচারের ফলে একাধিক ১০-১২-১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে জবরদস্তি শারীরিক সঙ্গমের ফলে মারা যায়। আদালতে বেশ কিছু মামলা ওঠার পরে ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ে, এবং ১৮৯১ সালে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে তারা এজ অফ কনসেন্ট বিলের প্রস্তাব আনে বিয়ের বয়স দশ থেকে বাড়িয়ে বারো করার জন্যে। প্রস্তাব আসার সঙ্গে সঙ্গেই সর্বগ্রাসী প্রতিরোধ শুরু হয় সমাজের চতুর্দিক থেকে। হিন্দু বাঙালি মনে করে মেয়েদের বিয়ের বয়স দুই বছর বাড়ানোর এই প্রস্তাব মোটেও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কারণে নয়, বরং হিন্দু আচারব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত যার ফলে মেয়েদের গর্ভ কলুষিত হবে, বংশধারা দূষিত হবে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে পতন হবে বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের শেষ দুর্গ, অর্থাৎ নারীশরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার। নারীশরীরকে নিয়ন্ত্রণের এই অধিকার রক্ষাই হয়ে ওঠে চারপাশ থেকে আক্রান্ত হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার সমান। একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল — এই এজ অফ কনসেন্ট বিলের সময়ে, না ব্রিটিশ সরকার, না বিলের সমর্থক বা বিরোধী বাঙালি জনগণ — কেউই এই বিল আসলে যাদের জন্যে আনা, সেই মেয়েদের সম্মতি নেওয়ার কথা ভাবেনি।

[হিন্দু খতরে মে হ্যায় – এনিওয়ান?]

রেনেসাঁর আলোকপ্রাপ্ত বাঙালির প্রগতিশীল রিফর্মার থেকে হিন্দু রিভাইভালিস্ট হয়ে ওঠার গতিপথের ধারণা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় যদি আমরা বঙ্কিমের লেখা খুঁটিয়ে দেখি। বঙ্কিমের পরিবর্তনও ঊনবিংশ শতকের এই ক্রাইসিসগুলোর মধ্যে দিয়েই এসেছিল। লেখকজীবনের একদম শুরুর দিকে বঙ্কিম ছিলেন ক্ষুরধার সমালোচক — বিশেষ করে নানান পিতৃতান্ত্রিক এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী ট্র্যাডিশনের। যেমন ধরুন "সাম্য" (যদিও পরের দিকে বঙ্কিম নিজে এই রচনাকে প্র্যাক্টিকালি অস্বীকার করেন) রচনায় বঙ্কিম এই ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং পিতৃতান্ত্রিক আচারব্যবস্থাকে কলোনিয়াল শাসনের চেয়েও খারাপ বলে অভিহিত করেছিলেন। কপালকুণ্ডলায় নায়িকার মুখে শোনা যায় — “যদি জানিতাম যে, স্ত্রীলোকের বিবাহ দাসীত্ব, তবে কদাপি বিবাহ করিতাম না"। বা "বিষবৃক্ষ" উপন্যাসে পুরুষের বহুগামিতা এবং কামনা, ব্রাহ্মণ্যবাদের নানান আচারের মধ্যে মেয়েদের দমবন্ধ করা অবস্থার সরাসরি সমালোচনা পাওয়া যায়। এই পিরিয়ডে বঙ্কিম পশ্চিমী ধ্যানধারণার আদলেই সামাজিক গোঁড়ামোকে আঘাত করেছিলেন। ব্যঙ্গ করেছিলেন ইংরিজী চালচলনের নকলকারী বাবুদেরও। আবার, বঙ্কিমের ধারণা যে খানিক ফ্র্যাকচার্ড ছিল, তারও প্রমাণ পাওয়া যায় ১৮৭৫ সালে লেখা কমলাকান্তে যেখানে তিনি স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়া নারীর মধ্যে স্ত্রীলোকের আসল রূপ কল্পনা করেন — 

"যখন আমি উৎকৃষ্টা, যোষিদ্বর্গের বিষয়ে চিন্তা করিতে যাই, তখনই আমার মানস—পটে, সহমরণপ্রবৃত্তা সতীর মূর্ত্তি জাগিয়া উঠে। আমি দেখিতে পাই যে, চিতা জ্বলিতেছে, পতির পদ সাদরে বক্ষে ধারণ করিয়া প্রজ্বলিত হুতাশন মধ্যে সাধ্বী বসিয়া আছেন। আস্তে আস্তে বহ্নি বিস্ত‌ৃত হইতেছে, এক অঙ্গ দগ্ধ করিয়া অপর অঙ্গে প্রবেশ করিতেছে। অগ্নিদগ্ধা স্বামিচরণ ধ্যান করিতেছেন, মধ্যে মধ্যে হরিবোল বলিতে বলিতেছেন বা সঙ্কেত করিতেছেন। দৈহিক ক্লেশ-পরিচায়ক লক্ষণ নাই। আনন প্রফুল্ল। ক্রমে পাবকশিখা বাড়িল, জীবন ছাড়িল, কায়া ভস্মীভূত হইল। ধন্য সহিষ্ণুতা! ধন্য প্রীতি! ধন্য ভক্তি!" [স্ত্রীলোকের রূপ, কমলাকান্ত]

কিন্তু ওই পাবনা রায়ট, ইলবার্ট বিল এবং এজ অফ কনসেন্ট বিল নিয়ে কূটকচালির সময় থেকেই বঙ্কিমের বদলের ট্র্যাজেক্টরিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে রেভারেন্ড হেস্টির সঙ্গে ১৮৮২ সালের একটা বিতর্কের পর থেকেই। রেভারেন্ড হেস্টি (স্কটিশ থিওলজিয়ান এবং স্কটিশ চার্চ কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল) সনাতনী হিন্দু ধ্যানধারণাকে আক্রমণ করেছিলেন ব্যাকওয়ার্ড বলে (কলকাতার অ্যালবার্ট হলে ক্রিশ্চানিটি অ্যান্ড কমন সেন্স অফ ম্যানকাইন্ড বলে একটা পাবলিক লেকচার সিরিজে) — মূলতঃ মূর্তিপূজা, এথিকস (যেখানে কৃষ্ণের লীলাপ্রসঙ্গ উঠে আসে) এবং র‍্যাশনালিটি নিয়ে। বঙ্কিম সম্পর্কে অভিযোগ করেন যে তিনি পাশ্চাত্য চিন্তাভাবনা থেকে সিলেক্টিভলি কিছু কিছু জিনিস বেছে নিয়েছেন, এবং হিপোক্রিটের মত হিন্দুধর্মকে ডিফেন্ড করেছেন। ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে বাংলার শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজের সার্বিক অসহায়তার অনুভূতি থেকেই বঙ্কিমের মধ্যেও বদল আসতে শুরু করে। হেস্টির আক্রমণের জবাবে বঙ্কিম বঙ্গদর্শনে একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, এবং এই বিতর্কের পর থেকেই হিন্দু রিভাইভালিজমের ছাপ দেখতে পাওয়া যায় বঙ্কিমের পরবর্তী রচনাগুলোতে — যেমন কৃষ্ণচরিত্র, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি। 

বঙ্কিম তাঁর আগের প্রগতিশীল রচনাগুলোকে অস্বীকার করতে শুরু করেন (সাম্য ফর এগজাম্পল), পাশাপাশি গড়তে শুরু করেন জাতীয়তাবাদের একটা নতুন ছবি, যেখানে দেশপ্রেম একই সঙ্গে মিলিট্যান্ট এবং ভক্তিমূলক।

জন্ম হয় দেশমাতৃকার আইডিয়ার — ১৮৮২ সালে আনন্দমঠের মধ্যে দিয়ে। কলমের আঁচড়ে বঙ্কিম সংঘাতের কেন্দ্রে থাকা এই পবিত্র, বিপন্ন, আদর্শ হিন্দু নারীসত্ত্বাকে রূপান্তরিত করলেন এক দেবী চরিত্রে। আঁকলেন পূর্বের গৌরবের ছবি (মা যাহা ছিলেন — সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা), ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের আবহে আঁকলেন কালরূপিণী এক নারীকে (মা যাহা হইয়াছেন — অত্যাচারী শাসকের হাতে দেশ যখন শোষিত, দরিদ্র, এবং মৃতপ্রায়), এবং কোন এক ভবিষ্যতে বিদেশী শাসনের অবসানের পর বাংলাপ্রদেশের আইকন — দেবী দুর্গা (মা যাহা হইবেন — দশপ্রহরণধারিণী)। এই মাতৃরূপিণীর দেহ হয়ে উঠল গোটা জাতির মানচিত্র — পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয়, যে কোন কলোনিয়াল আইন বা জমির খাজনার আন্দোলন থেকে বহু দূরের এক সত্ত্বা। 

এই মাতৃমূর্তি বা ডিভাইন মাদার, বাঙালি ভদ্রলোকের এতদিনের অপমানের জবাব দেওয়ার এক রাস্তা খুলে দিল। এইখানে একটা জিনিস ক্ল্যারিফাই করে দেওয়া দরকার — এই বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীকে একটা মনোলিথিক ব্লক হিসেবে দেখলে ভুল করা হবে। এই ভদ্রলোক শ্রেণীর মধ্যে স্তরবিন্যাস ছিল। একদম ওপরে ছিল অভিজাত ল্যান্ডেড ক্লাস, যাদের মূল উৎকন্ঠা ছিল পাবনা রায়তি বিদ্রোহ আর রেন্ট অ্যাক্টকে ঘিরে — মুসলমান এবং নীচু জাতের বিদ্রোহ ছিল তাদের অথরিটির প্রতি চ্যালেঞ্জ, এবং কলোনিয়াল সরকারের প্রতি ক্ষোভ তৈরী হয় এইখান থেকেই। এই অভিজাত শ্রেণীর নীচের স্তরে ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত — প্রধাণত: চাকরিজীবী — যারা সেই মুহূর্তে ক্রমাগত বর্ণবিদ্বেষ, পৌরুষত্ব নিয়ে উপহাস আর ঘন্টা-মিনিটের জাঁতাকলে আটকে পড়েছিল। দেশমাতৃকার মূর্তি ওপর থেকে নীচ অবধি পুরো ভদ্রলোক শ্রেণীর কাছেই অ্যাপীল করে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আদালতে, বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরুষত্বহীন ভদ্রলোক নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল এই দেশমাতৃকার একনিষ্ঠ সন্তান এবং রক্ষক হিসেবে। তার রাজনৈতিক অক্ষমতা বদলে গেল পবিত্র সামরিক কর্তব্যে। তার আহত পৌরুষের নিরাময় হল বীরের আত্মত্যাগের প্রতিশ্রুতিতে। নানান জটিল সামাজিক সংস্কার আর বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের কাছে পিটিশন দিয়ে আপোস করার বদলে জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠল আবেগ আর ভক্তির মিশেলের পবিত্র ধর্মযুদ্ধ।

এই ছিল দেশমাতৃকার জন্মের ঐতিহাসিক পটভূমি — অনেকদিন ধরে চলে আসা ক্রাইসিসের মধ্যে থেকে তৈরী হওয়া বিপন্ন মাতৃমূর্তি, যাকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করা মায়ের যে কোন সন্তানের কর্তব্য। 

এই অবধি কোন গোল নেই, সাধারণভাবে গোটা ব্যাকগ্রাউন্ডটা খানিক জটিল হলেও। শুধু প্রশ্ন থেকে যায় বঙ্কিমের এই দেশমাতৃকা কবে এবং কীভাবে ভারতমাতা হয়ে উঠলেন?

বঙ্কিমের মূল উপন্যাসের দিকে যদি তাকাই, দেখব আনন্দমঠে সন্তানদের মূলশত্রু মুসলমান নবাব এবং অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকের দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষয়িষ্ণু মুঘল প্রশাসন। আনন্দমঠের শেষাংশে ব্রিটিশ শত্রু তো নয়ই, বরং শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়ের শাসনের প্রবর্তক — সত্যানন্দ ও চিকিৎসক/মহাপুরুষের মধ্যে বাক্যালাপ মনে করুন...তাহলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে এই ব্রিটিশপন্থী, মুসলিমবিরোধী আখ্যান কীভাবে উপনিবেশ—বিরোধী জাতীয়তাবাদের বাইবেল হয়ে উঠল?

আনন্দমঠ, দেশমাতৃকা আর বন্দেমাতরমের এই ট্রান্সফর্মেশন ঘটেছিল জাতীয়তাবাদের স্ট্র্যাটেজিক কারণে। বঙ্কিম নিজে ১৮৮০-র দশকে বসে ১৭৭০ সালের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে আনন্দমঠ লিখেছিলেন। তাঁর প্রজন্মের কাছে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে একটা কমপ্লিকেটেড ও খানিক মোহভঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও আশাবাদ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সেই প্রজন্ম ব্রিটিশ শাসনকে হিন্দু অনৈক্য এবং দুর্বলতার সাজা হিসেবে দেখেছিল, আর ব্রিটিশ শাসককে দেখেছিল আধুনিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের শিক্ষা দেওয়া স্কুলমাস্টার হিসেবে —  যাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভারতীয় হিন্দুরা একদিন স্বশাসনের যোগ্য হয়ে উঠতে পারে। 

“সনাতনধর্মের পুনরুদ্ধার করিতে গেলে, আগে বহির্বিষয়ক জ্ঞানের প্রচার করা আবশ্যক। এখন এদেশে বহির্বিষয়ক জ্ঞান নাই — শিখায় এমন লোক নাই; আমরা লোকশিক্ষায় পটু নহি। অতএব ভিন্ন দেশ হইতে বহির্বিষয়ক জ্ঞান আনিতে হইবে। ইংরেজ বহির্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত, লোকশিক্ষায় বড় সুপটু। সুতরাং ইংরেজকে রাজা করিব। ইংরেজী শিক্ষায় এদেশীয় লোক বহিস্তত্ত্বে সুশিক্ষিত হইয়া অন্তস্তত্ত্ব বুঝিতে সক্ষম হইবে। তখন সনাতনধর্ম প্রচারের আর বিঘ্ন থাকিবে না। তখন প্রকৃত ধর্ম আপনা আপনি পুনরুদ্দীপ্ত হইবে। যত দিন না তা হয়, যত দিন না হিন্দু আবার জ্ঞানবান গুণবান আর বলবান হয়, তত দিন ইংরেজরাজ্য অক্ষয় থাকিবে। ইংরেজরাজ্যে প্রজা সুখী হইবে — নিষ্কণ্টকে ধর্মাচরণ করিবে। অতএব হে বুদ্ধিমান — ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে নিরস্ত হইয়া আমার অনুসরণ কর।" [আনন্দমঠ]

বঙ্কিমের এক প্রজন্ম পরে, ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময়, রাজনৈতিক আবহাওয়া ক্রমশঃ আরও উগ্র হয়ে ওঠে। দুর্ভিক্ষ, জাতিবিদ্বেষ, আর বঙ্গভঙ্গের পরে সাধারণ মানুষের ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে হতাশ হতে শুরু করে। অরবিন্দ ঘোষের মত বিপ্লবীরা মনে করতে শুরু করেন যে তাঁদের গণআন্দোলনের জন্যে প্রয়োজন একটা শক্তিশালী প্রতীকের। এবং শুধুমাত্র স্ট্র্যাটেজিক কারণেই তাঁরা আনন্দমঠের একটা সিলেক্টিভ ন্যারেটিভ বেছে নেন, যেখানে উপন্যাসের শেষে ব্রিটিশপন্থী অংশটুকু বাদ দেওয়া হয়। গল্প শেষ হয় যুদ্ধের ধ্বনি দিয়ে, ব্রিটিশ শাসনকে বৈধতা দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নয়। একটা কথা মাথায় রাখবেন — আনন্দমঠ লেখা হয়েছিল তৎকালীন বাংলা প্রদেশের (মানে সুবাহ্‌ বাংলা — বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা মিলিয়ে যে প্রদেশ) পটভূমিতে। "সপ্তকোটিকন্ঠ কলকলনিনাদকরালে, দ্বিসপ্তকোটি ভূজৈঃধৃত খরকরবালে" — এখানে সপ্তকোটি অর্থাৎ সাত কোটি সেই সময়ের সেন্সাস অনুযায়ী বাংলা প্রদেশের জনসংখ্যা। এবং ইন্টারেস্টিংলি, সেই জনতার মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমান, সকলেই ছিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রয়োজনে বাংলায় অরবিন্দ, মহারাষ্ট্রে তিলক, আর তামিল প্রদেশে সুব্রমনিয়া ভারতীর হাত ধরে বঙ্কিমের দেশমাতৃকা হয়ে উঠলেন ভারতমাতা, ভারতীয় উপমহাদেশের ম্যাপ হয়ে উঠল ভারতমাতার দেহ, বাংলার সাত কোটি সন্তানের বদলে যার অ্যাপীল ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত দেশবাসীর কাছে, শত্রু আর কোন বিশেষ ধর্মালম্বী রইল না, বরং হয়ে উঠল যে কোন বিদেশী শাসক। মূল উপন্যাস থেকে বন্দেমাতরমকে বের করে আনা হল জাতীয়তাবাদী স্লোগান হিসেবে।

কিন্তু কিছু সমস্যা থেকেই গেল। বন্দেমাতরমের দেবী হিন্দু দেবী, তার ভাষা সংস্কৃত ও বাংলার মিশেল। কিন্তু বাস্তবে অনেক মুসলমান ধর্মাবলম্বীর কাছে এই প্রকট হিন্দু ইমেজকে সরাসরি গ্রহণ করা একটু সমস্যার হয়ে পড়েছিল ধর্মীয় কারণে, এবং সেটা অযৌক্তিকও নয়। মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখলে এটা আপনারও মনে হবে — যদি আপনাকে এলিয়েন কোন ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে কোন জাতীয় অনুষ্ঠানে যেতে হয়। নাস্তিকদের তো যে কোন ধর্মীয় চিহ্নেই অস্বস্তি হবে। তিরিশের দশকে এই বিষয়টা বড়সড় চর্চায় আসে। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে বন্দেমাতরমের প্রথম দুটো স্তবককে আলাদা করে আনার পরেও কিছু ক্ষেত্রে অস্বস্তি থেকেই গিয়েছিল। যেমন, মুসলিম লীগ এই গানের দিকে আঙুল তুলে বলত কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে হিপোক্রেসি, ভুয়ো। উল্টোদিকে হিন্দু দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদের কাছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ হয়ে দাঁড়ায় ভারতমাতার পবিত্র শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করে দেওয়ার সামিল। হিন্দু মহাসভার পোস্টারে বা প্যামফ্লেটে রক্তাক্ত ছিন্ন অঙ্গের ভারতমাতার ছবি ছাপা হত সেই সময়ে...

আমাদের দুর্ভাগ্য, যে এইখান থেকেই শুরু হয়েছিল ভারতমাতার আইডিয়ার ওয়েপনাইজেশন। ঔপনিবেশিক অপমানের জবাব দেওয়ার প্রতীক হিন্দু জাতীয়তাবাদের হাতে হয়ে দাঁড়িয়েছিল সংখ্যাগুরুর অস্ত্র। আজও তার ব্যতিক্রম হয় না, উলটে এই ধারণা আরো পোক্ত হয়েছে বিভিন্ন কারণে। সঙ্ঘ পরিবারের ভারতমাতার প্রতি শ্রদ্ধা বা বন্দেমাতরমের প্রতি আজকের পীরিত আসলে তাদের নিজেদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ভারতকে দেখার উদাহরণ — যেখানে ভারত দেশটাকে ভালোবাসা মানে ভারতমাতার মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো; দেশের মানুষ, নদী, বনজঙ্গল, পাহাড়, পশু পাখি সেখানে গৌণ; এখানে দ্বিধা মানে অবাধ্যতা, দেশদ্রোহ। নিজস্ব পলিটিকাল এজেন্ডার রূপায়ণের উদ্দেশ্যেই সঙ্ঘ পরিবার রামজন্মভূমি আন্দোলনকে রামের পবিত্র ভূখণ্ডকে মুক্ত করার ধর্মযুদ্ধ হিসেবে দেখিয়েছিল। বন্দেমাতরম এদের কাছে দেশপ্রেমের নামে প্রশ্নহীন ভক্তিমূলক আনুগত্যের প্রতীক...

=========================================

ভারতমাতার জন্মের গল্প এইটুকুই। প্রাচীন পুরাণকথা থেকে তাঁর জন্ম হয়নি। বরং, বাস্তবে শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের আগুনে তাঁকে তৈরী করা হয়েছিল। তাঁর সশস্ত্র মূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে ব্যাঙ্ক ফেলিওর, রেন্ট স্ট্রাইক, জাতিবিদ্বেষ, নারীর অধিকার-বাল্যবিবাহ-বৈধব্য ইত্যাদি নিয়ে আদালত এবং সেই সময়ের সমাজমাধ্যমে তির্যক বিতর্কের ইতিহাসের ওপর। তিনি ঊনবিংশ শতকের কঠিন বাস্তবের মাটিতে হেরে যাওয়া হিন্দু ভদ্রলোকের শেষ আশ্রয় — এক কল্পিত অলঙ্ঘনীয় দেবীমন্দিরের প্রতিমা, উঠতি অ্যান্টিকলোনিয়াল "ইম্যাজিনড কমিউনিটির" ভিত্তি, যাঁকে ঘিরে এক বিচিত্র ভূখণ্ডের নানান ধরণের বৈচিত্রসম্পন্ন অসংখ্য মানুষ এক হয়ে দাঁড়িয়েছিল কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে। আবার একই সঙ্গে তাঁর হিন্দু রূপের জন্যেই অহিন্দুদের সামনে অলঙ্ঘনীয় সীমানা তৈরী হয়েছিল একটা সময়ে। যাদের বিশ্বাস বা ওয়ার্ল্ডভিউ কোন দেবদেবীর প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি, তাদের শুরু থেকেই "অপর" করে রাখা হয়েছে।

ভারতমাতার লিগ্যাসি কাজেই অস্পষ্ট। যে প্রতীক কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে ছিল শক্তিশালী অস্ত্র — একটা, সাহস আর আইডেন্টিটির উৎস — সেই একই প্রতীকের ডিএনএর মধ্যেই লুকিয়ে থেকেছে সংখ্যাগুরুর গা-জোয়ারি। স্বাধীনতার পর থেকেই এই লুকিয়ে থাকা শক্তিকে খুঁচিয়ে জাগিয়ে তুলেছে সঙ্ঘপরিবার। "মা যা হইবেন" — দশপ্রহরণধারিণীর পরিবর্তে "মা যা হইয়াছেন" — দেশপ্রেমের এক লিটমাস টেস্ট — যার মাধ্যমে বহিরাগত "অপর"-কে চিহ্নিত করা যায়। ভারতমাতার গল্প তাই যতটা না পবিত্র দেশপ্রেমের কাহিনী, তার চেয়ে অনেক বেশি জাতীয়তাবাদের ধারালো দ্বিমুখী তরোয়াল সম্পর্কে শিক্ষা — যে প্রতীক স্বাধীনতার লড়াইয়ে লক্ষ মানুষের স্লোগান হতে পারে, লক্ষ মানুষকে এক করতে পারে, সেই একই প্রতীক নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে এক দেশ — এক ধর্ম — এক ভাষা — এক পোশাক — এক খাদ্যাভ্যাসের নামে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ইউনিফর্মিটির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, উলটে সামাজিক বিভেদকে তীব্র করার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে। 

আধুনিক নেশন-স্টেট নিজেদের লেজিটিমাইজ করার জন্যে যে ধরণের কাহিনী ব্যবহার করে, ভারতমাতা সেই সমস্ত কাহিনীর মধ্যে একইসাথে লুকিয়ে থাকা ঐক্য এবং বিভাজনের ক্ষমতার টেস্টামেন্ট। 

রেফারেন্স (ইন নো পার্টিকুলার অর্ডার):

(১) Hindu Wife, Hindu Nation: Community, Religion, and Cultural Nationalism, Tanika Sarkar, Permanent Black
(২) Rebels, Wives, Saints: Designing Selves and Nations in Colonial Times, Tanika Sarkar, Permanent Black
(৩) The Truths and Lies of Nationalism as Narrated by Charvak, Partha Chatterjee, State University of New York
(৪) The Unhappy Consciousness: Bankimchandra Chattopadhyay and the Formation of Nationalist Discourse in India, Sudipta Kaviraj, OUP India
(৫) The Swadeshi Movement in Bengal, Sumit Sarkar, People’s Publishing House
(৬) ‘Kaliyuga’, ‘Chakri’ and ‘Bhakti’: Ramakrishna and His Times, Sumit Sarkar, Economic and Political Weekly, Vol 27, No 29, Jul 18 1992
(৭) Colonial masculinity: The 'manly Englishman' and the 'effeminate Bengali' in the late nineteenth century, Mrinalini Sinha, Manchester University Press
(৮) Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, Benedict Anderson, Verso

Special thanks to Rajdip Biswas Rudra — একবার ভেরিফাই করে একটা ফাঁক ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। Anjan-দাকেও থ্যাঙ্কস, একবার মুখ খুলতেই পুরনো EPW-এর পেপার খুঁজে দেওয়ার জন্য।

#বন্দেমাতরম #বঙ্কিমচন্দ্র #জাতীয়তাবাদ